সিলেটের ট্রেনের টিকিট যেন সোনার হরিণ। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে টিকিট ছাড়ার পরপরই তা উধাও হয়ে যায়। সাধারণ যাত্রীরা টিকিটের নাগাল পান না। অথচ পরে বিভিন্ন মাধ্যমে বেশি দামে টিকিট বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘদিনের এই অভিযোগের সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে আদালতের স্বপ্রণোদিত মামলা। মামলাটি তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
শুধু টিকিট নয়, সিলেটের রেল যোগাযোগের সামগ্রিক চিত্রও হতাশাজনক। নতুন আন্তনগর ট্রেন চালুর ঘোষণা এসেছে, কিন্তু ট্রেন চালু হয়নি। ডাবল লাইন নির্মাণের প্রতিশ্রুতি ছিল, সেটিও থমকে আছে। ময়মনসিংহের সঙ্গে সরাসরি রেল যোগাযোগের কথা বহু বছর ধরে বলা হলেও বাস্তবায়নের দেখা নেই। ‘টাঙ্গুয়া এক্সপ্রেস’ চালুর নির্দিষ্ট তারিখ সংসদে ঘোষণা করা হলেও ৩ সেপ্টেম্বর পেরিয়ে গেছে, ট্রেনের দেখা মেলেনি।
অন্যদিকে সড়কপথেও স্বস্তি নেই। দীর্ঘ যানজট, ধীরগতির উন্নয়নকাজ, ভাঙাচোরা রাস্তা ও অসংখ্য গর্ত পেরিয়ে সিলেটে যাতায়াত অনেক সময় দুর্ভোগের আরেক নাম হয়ে ওঠে। ফলে রেল ও সড়ক—দুই পথেই সিলেটবাসীর যাতায়াত যেন ভোগান্তির বৃত্তে আটকে আছে।
টিকিট ছাড়ার কয়েক মিনিটেই শেষ
সিলেট থেকে ঢাকায় উপবন, কালনী, জয়ন্তিকা ও পারাবত এবং চট্টগ্রামগামী পাহাড়িকা ও উদয়ন এক্সপ্রেস চলাচল করে। এসব ট্রেনের টিকিট অনলাইন প্ল্যাটফর্মে উন্মুক্ত হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই সব বিক্রি হয়ে যাওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
বিষয়টি নজরে আসে সিলেটের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল্লাহ আল নোমানের। আদালত ট্রেনের টিকিট বিক্রির সরকারি ওয়েবসাইট পরিদর্শন করে দেখতে পান, নির্দিষ্ট দিনের টিকিট বিক্রির জন্য উন্মুক্ত হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিপুলসংখ্যক টিকিট বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। এত অল্প সময়ে সব টিকিট বিক্রি হয়ে যাওয়াকে সন্দেহজনক মনে হয় আদালতের।
এর পরিপ্রেক্ষিতে গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে স্বপ্রণোদিত হয়ে মিস মামলা নং-০১/২০২৬ দায়ের করেন আবদুল্লাহ আল নোমান। এজাহারে কালোবাজারি ও মজুদদারির মতো অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়।
মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে পিবিআই সিলেটকে। ৭ অক্টোবর মামলার নথিপত্র পিবিআইয়ের কাছে পৌঁছেছে। বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছেন পিবিআই সিলেটের উপপরিদর্শক আবদুল আহাদ। তিনি জানিয়েছেন, আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে দায়ের করা মামলাটিই তিনি তদন্ত করছেন।
মামলার নথিতে বলা হয়েছে, একটি চক্র ট্রেনের টিকিট বাজারজাতকরণের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের কারও কারও সহযোগিতায় মুহূর্তের মধ্যে টিকিট সরিয়ে নিয়ে পরে তা অধিক মূল্যে যাত্রীদের কাছে বিক্রি করে থাকতে পারে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড সাধারণ যাত্রীদের হয়রানির পাশাপাশি সিলেটের পর্যটনশিল্পের বিকাশেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
অনলাইন টিকিটেও ‘ব্লকের’ অভিযোগ
ট্রেনের টিকিট নিয়ে অভিযোগের আরেকটি দিক উঠে এসেছে পরিবহন অডিট অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক অডিট রিপোর্টে। সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ রেলওয়ের অনলাইন টিকিট সাধারণ যাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত করার এক থেকে পাঁচ দিন আগেই তা অবৈধভাবে ব্লক করে রাখার ঘটনা ঘটেছে।
অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী, টিকিট বিক্রি ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা ভেন্ডর প্রতিষ্ঠান ‘সহজ ডট কম’ (Shohoz.com)-এর কর্মীদের হাতে সিস্টেমের মূল নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী তাঁদের কাজ হওয়ার কথা ছিল কেবল কারিগরি রক্ষণাবেক্ষণ। কিন্তু বিভিন্ন স্টেশনের প্রায় ১৬৯টি অ্যাডমিন অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে টিকিট ব্লক ও আসন সংরক্ষণের মতো কাজ নিয়ন্ত্রণ করার অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে।
সাধারণ যাত্রীদের সুবিধার জন্য চালু করা ই-টিকিটিং ব্যবস্থাই যদি নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের হাতে টিকিট নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি করে, তাহলে ডিজিটাল ব্যবস্থার উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এভাবে অনলাইন ব্যবস্থাও টিকিট কালোবাজারির আধুনিক রূপ ধারণ করতে পারে।
সিলেট রেলস্টেশনের ব্যবস্থাপক নুরুল ইসলাম ধন্যবাদদম কর্মীদের অবশ্য বলেছেন, রেলের টিকিট অনলাইনে কিনতে হয়। কেউ কেউ সরাসরি কাউন্টার থেকেও কেনেন। টিকিট বিক্রিতে স্টেশন কর্তৃপক্ষের কোনো হাত নেই।
ঘোষণার পরও নেই ‘টাঙ্গুয়া এক্সপ্রেস’
সিলেটের রেল যোগাযোগ নিয়ে সাম্প্রতিক হতাশার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ ‘টাঙ্গুয়া এক্সপ্রেস’। সিলেটবাসীর প্রত্যাশা ছিল, নতুন এই ট্রেন ঢাকার সঙ্গে সিলেটের রেল যোগাযোগকে আরও দ্রুত ও আধুনিক করবে।
সিলেট-৬ আসনের এমপি এমরান আহমদ চৌধুরীর এক প্রশ্নের জবাবে সংসদে সড়ক ও সেতুমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, ৩ সেপ্টেম্বর থেকে সিলেট–ঢাকা রেলপথে ‘টাঙ্গুয়া’ নামে নতুন একটি ট্রেন চালু হবে। মে ও জুন মাসে এ নিয়ে আলোচনা হয়।
কিন্তু নির্ধারিত ৩ সেপ্টেম্বর পেরিয়ে গেছে। ট্রেন চালুর কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়নি। রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকেও এ বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। এমরান আহমদ চৌধুরী জানিয়েছেন, তিনি বিষয়টি আবার সংসদে তুলবেন।
এর আগে ২০২৩ সালে অনুমোদন পাওয়া এই ট্রেনকে ঘিরে সিলেটবাসীর প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। আধুনিক, ননস্টপ ও আন্তর্জাতিক মানের সেবা দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু প্রশাসনিক জটিলতা, ইঞ্জিনের স্বল্পতা ও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সমন্বয়হীনতার কারণে ট্রেনটি চালু হয়নি।
ময়মনসিংহ–সিলেট রেল যোগাযোগও কাগজে
ময়মনসিংহ ও সিলেটের মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের সামাজিক, পারিবারিক ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু দুই বিভাগকে সরাসরি রেলপথে যুক্ত করা যায়নি। ২০১৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহে এক জনসভায় তৎকালীন ধর্মমন্ত্রী প্রিন্সিপাল মতিউর রহমান বলেছিলেন, “ময়মনসিংহ–সিলেট রেলপথে শিগগিরই আন্তঃনগর ট্রেন চালু করা হবে।”
এরপর ২০১৯ সালে সিলেট–চট্টগ্রাম এবং ময়মনসিংহ–সিলেট রুটে নতুন দুটি আন্তনগর ট্রেন চালুর পরিকল্পনার কথা জানায় রেলওয়ে। সে সময় ইন্দোনেশিয়ার PT INKA থেকে আধুনিক কোচও আমদানি করা হয়। এসব কোচের একটি অংশ ওই রুটে ব্যবহারের কথা ছিল। কিন্তু বছর পেরিয়ে গেলেও ট্রেন চালু হয়নি।
২০২১ সালের ৯ অক্টোবর রাজধানীর বেইলি রোডের অফিসার্স ক্লাবে বৃহত্তর ময়মনসিংহ সমন্বয় পরিষদের বার্ষিক সম্মেলনে তৎকালীন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান জানিয়েছিলেন, ময়মনসিংহের সঙ্গে সিলেটের সরাসরি রেল যোগাযোগ স্থাপনে জরিপ চলছে।
তিনি আরও বলেছিলেন, সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ থেকে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ পর্যন্ত ১৪ কিলোমিটার উড়ালসড়ক নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী। হাওরাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা সহজ করাই ছিল এর উদ্দেশ্য। কিন্তু এসব ঘোষণার পরও মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
বর্তমানে সিলেট থেকে ময়মনসিংহ যেতে যাত্রীদের ঘুরপথে যেতে হয়। কখনো ঢাকা, কখনো ভৈরব হয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। এতে সময় লাগে প্রায় ১৫ থেকে ২০ ঘণ্টা। অথচ সরাসরি রেল যোগাযোগ চালু করা গেলে এই যাত্রা প্রায় ৭ ঘণ্টায় নামিয়ে আনা সম্ভব হতো।
ডাবল লাইনের প্রতিশ্রুতিও থমকে
সিলেটের রেল যোগাযোগের বড় সীমাবদ্ধতা একক রেললাইন। ২০১৯ সালে আখাউড়া–সিলেট রেলপথ ডাবল লাইনে উন্নীত করার প্রকল্পের ঘোষণা সিলেটবাসীর মধ্যে আশার সৃষ্টি করেছিল। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকা ও সিলেটের মধ্যে রেলযাত্রা আরও দ্রুত, নিরাপদ ও আধুনিক হওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু অর্থসংকটের কারণে প্রকল্পটি স্থগিত রয়েছে। ফলে সিলেটের সঙ্গে দেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও যোগাযোগকেন্দ্রগুলোর রেলসংযোগের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নও থমকে আছে।
এই রেলপথের গুরুত্ব শুধু ঢাকা–সিলেট যাতায়াতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং ভারতের আগরতলার সঙ্গে সম্ভাব্য যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক সম্প্রসারণের বিষয়টিও যুক্ত। প্রকল্পটি দীর্ঘদিন বাস্তবায়িত না হওয়ায় আঞ্চলিক যোগাযোগের সম্ভাবনাও পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
আন্তনগর ট্রেনেও স্বস্তি নেই
নতুন ট্রেন না পাওয়ার পাশাপাশি বিদ্যমান আন্তনগর ট্রেনের সেবা নিয়েও সিলেটবাসীর অভিযোগ রয়েছে। সিলেট থেকে ঢাকাগামী আন্তনগর ট্রেনগুলোতে পথে বিভিন্ন স্টেশনে ব্যাপক যাত্রী ওঠানামার কারণে অনেক সময় ট্রেনের ভেতরে চলাচলের জায়গা থাকে না।
আশুগঞ্জ, ভৈরব বাজার, নরসিংদীসহ বিভিন্ন স্টেশন থেকে যাত্রী ওঠায় সিলেট থেকে যাত্রা করা অনেক যাত্রীকে দীর্ঘ পথ দাঁড়িয়ে যেতে হয়—এমন অভিযোগ রয়েছে।
এ নিয়ে সম্প্রতি সিলেটবাসী মানববন্ধনও করেছেন। তাঁদের দাবি, ঢাকা বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনের দিকে যাওয়ার পথে আন্তনগর ট্রেনের স্টপেজ কমানো হোক, যাতে দীর্ঘ দূরত্বের যাত্রীরা তুলনামূলক স্বস্তিতে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন।
যাত্রীদের বক্তব্য, আন্তনগর ট্রেনের মূল বৈশিষ্ট্যই হলো দ্রুত ও তুলনামূলক আরামদায়ক যাত্রা। কিন্তু পথে অতিরিক্ত স্টপেজ ও যাত্রী ওঠানামার কারণে সেই সুবিধা অনেকটাই নষ্ট হচ্ছে।
পর্যটনের সম্ভাবনা, যোগাযোগে পিছিয়ে
সিলেট বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র শ্রীমঙ্গল। চা-বাগান, পাহাড়, বনাঞ্চল, হাওর ও বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রকে ঘিরে শ্রীমঙ্গল দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য। প্রতিদিন দেশি-বিদেশি পর্যটকের আনাগোনা রয়েছে এখানে।
রাধানগরসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে হোটেল, রিসোর্ট ও পর্যটনকেন্দ্র। লেবু, আনারস, কাঁঠাল ও চা-বাগানের বিস্তৃত চাষাবাদকে ঘিরেও গড়ে উঠেছে স্থানীয় অর্থনীতি। এসব খাতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে শত শত মানুষ জীবিকা নির্বাহ করছেন।
রাধানগরের ইতিহাসও এ অঞ্চলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ১৭৮ বিঘা জমির ডলুছড়া পাহাড় ব্রিটিশ শাসনামলে শ্রীমঙ্গলের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও দানবীর রাধা নাথ দেব চৌধুরী কিনেছিলেন। পরে তিনি জমিটি তাঁর চার সন্তানের মধ্যে বণ্টন করেন। তাঁদের কেউ কেউ জমি বিক্রি করেন, আর অবশিষ্ট জমির একটি অংশ সময়ের ব্যবধানে বিভিন্ন কারণে হাতছাড়া হয়ে যায়। তাঁর নাম থেকেই গড়ে ওঠে ‘রাধানগর’, যা বর্তমানে সিলেট বিভাগের অন্যতম উন্নত ও সম্ভাবনাময় এলাকা হিসেবে পরিচিত।
এত সম্ভাবনার পরও শ্রীমঙ্গলসহ সিলেট বিভাগের পর্যটনকেন্দ্রগুলোকে ঘিরে আধুনিক রেলসেবা এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। জাফলং, রাতারগুল, বিছানাকান্দি, লালাখান কিংবা শ্রীমঙ্গলের চা-বাগান—প্রতিটি পর্যটনকেন্দ্রই দেশের পর্যটন খাতকে আরও বড় করার সম্ভাবনা রাখে। কিন্তু আধুনিক ও দ্রুত রেল যোগাযোগের অভাব সেই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগানোর পথে বড় সীমাবদ্ধতা।
সড়কেও দুর্ভোগ
রেলের দুরবস্থার পাশাপাশি সড়কপথেও সিলেটবাসীর স্বস্তি নেই। ঢাকা বা দেশের অন্য অঞ্চল থেকে সড়কপথে সিলেটে আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় লাগে। বিভিন্ন সড়কে উন্নয়নকাজ ধীরগতিতে চলার পাশাপাশি কোথাও কোথাও ভাঙাচোরা রাস্তা, গর্ত ও অমসৃণ সড়কের কারণে বাস, কার ও জিপসহ বিভিন্ন যানবাহনের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয়।
এর সঙ্গে রয়েছে তীব্র যানজট। দীর্ঘ পথের যানজট, সড়কের দুরবস্থা ও নির্মাণকাজ মিলিয়ে অনেক সময় গন্তব্যে পৌঁছানোই যাত্রীদের কাছে স্বপ্নের মতো মনে হয়। ফলে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য রেল যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তা সিলেটবাসীর কাছে কেবল আরামের বিষয় নয়; এটি হয়ে উঠেছে সময়, অর্থনীতি ও দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
অর্থনীতির সঙ্গে জড়িয়ে রেল
সিলেট বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবাসী ও অর্থনৈতিক অঞ্চল। বিপুল প্রবাসী আয়, চা শিল্প, প্রাকৃতিক গ্যাস ও পর্যটন—সব মিলিয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে এ অঞ্চলের গুরুত্ব উল্লেখযোগ্য।
একটি কার্যকর রেলপথ শুধু যাত্রী পরিবহন করে না। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন, কর্মসংস্থান, পণ্য পরিবহন এবং আঞ্চলিক অর্থনীতির গতি। ময়মনসিংহের সঙ্গে সরাসরি রেল যোগাযোগ চালু হলে দুই অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামাজিক যোগাযোগ বাড়তে পারে। ডাবল লাইন হলে ঢাকা ও সিলেটের মধ্যে রেল চলাচলের সক্ষমতা বাড়বে। নতুন আন্তনগর ট্রেন চালু হলে সড়কপথের ওপর চাপও কমতে পারে। কিন্তু একের পর এক ঘোষণার পরও যখন প্রকল্প বাস্তবায়ন হয় না, তখন স্বাভাবিকভাবেই মানুষের আস্থায় প্রশ্ন তৈরি হয়।
আর ঘোষণা নয়, বাস্তবায়ন চান সিলেটবাসী
২০১৭ সাল থেকে পরবর্তী বছরগুলোতে সিলেটের রেল যোগাযোগ নিয়ে একের পর এক ঘোষণা এসেছে। নতুন ট্রেন, ডাবল লাইন, সরাসরি ময়মনসিংহ–সিলেট রেল যোগাযোগ, সিলেট–জাফলং রেলসড়ক—প্রতিটি উদ্যোগই মানুষের মনে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে। কিন্তু প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবায়নের দূরত্ব দিন দিন স্পষ্ট হয়েছে।
রেলের টিকিট সাধারণ যাত্রীর নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার অভিযোগ, অনলাইনে টিকিট ছাড়ার মুহূর্তেই টিকিট শেষ হয়ে যাওয়া, কালোবাজারি ও মজুদদারির অভিযোগ, নতুন ট্রেন চালুর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়া, পুরোনো রেললাইন ও ধীরগতির ট্রেন—সব মিলিয়ে সিলেটের রেলযাত্রা এখন এক দীর্ঘ ভোগান্তির নাম।
সিলেটবাসীর কাছে তাই প্রশ্নটি শুধু ‘টাঙ্গুয়া এক্সপ্রেস কবে চলবে’—এতটুকু নয়। প্রশ্ন আরও বড়: দীর্ঘদিনের প্রতিশ্রুতিগুলো কবে বাস্তবে রূপ নেবে? ৩ সেপ্টেম্বর পেরিয়ে গেছে। সংসদে ঘোষিত তারিখও এখন অতীত। কিন্তু সিলেটবাসীর অপেক্ষা শেষ হয়নি।
তারা আর নতুন কোনো তারিখ শুনতে চান না। তাঁরা দেখতে চান ট্রেন, আধুনিক রেললাইন, দ্রুতগামী ও নির্ভরযোগ্য রেলসেবা। একই সঙ্গে তাঁরা চান সড়ক যোগাযোগের চলমান সমস্যাগুলোরও দ্রুত সমাধান। সিলেটের রেলপথ যেন আর প্রতিশ্রুতির স্টেশনে দাঁড়িয়ে না থাকে—এটাই এখন এই অঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা।

শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১০ অক্টোবর ২০২৬
সিলেটের ট্রেনের টিকিট যেন সোনার হরিণ। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে টিকিট ছাড়ার পরপরই তা উধাও হয়ে যায়। সাধারণ যাত্রীরা টিকিটের নাগাল পান না। অথচ পরে বিভিন্ন মাধ্যমে বেশি দামে টিকিট বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘদিনের এই অভিযোগের সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে আদালতের স্বপ্রণোদিত মামলা। মামলাটি তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
শুধু টিকিট নয়, সিলেটের রেল যোগাযোগের সামগ্রিক চিত্রও হতাশাজনক। নতুন আন্তনগর ট্রেন চালুর ঘোষণা এসেছে, কিন্তু ট্রেন চালু হয়নি। ডাবল লাইন নির্মাণের প্রতিশ্রুতি ছিল, সেটিও থমকে আছে। ময়মনসিংহের সঙ্গে সরাসরি রেল যোগাযোগের কথা বহু বছর ধরে বলা হলেও বাস্তবায়নের দেখা নেই। ‘টাঙ্গুয়া এক্সপ্রেস’ চালুর নির্দিষ্ট তারিখ সংসদে ঘোষণা করা হলেও ৩ সেপ্টেম্বর পেরিয়ে গেছে, ট্রেনের দেখা মেলেনি।
অন্যদিকে সড়কপথেও স্বস্তি নেই। দীর্ঘ যানজট, ধীরগতির উন্নয়নকাজ, ভাঙাচোরা রাস্তা ও অসংখ্য গর্ত পেরিয়ে সিলেটে যাতায়াত অনেক সময় দুর্ভোগের আরেক নাম হয়ে ওঠে। ফলে রেল ও সড়ক—দুই পথেই সিলেটবাসীর যাতায়াত যেন ভোগান্তির বৃত্তে আটকে আছে।
টিকিট ছাড়ার কয়েক মিনিটেই শেষ
সিলেট থেকে ঢাকায় উপবন, কালনী, জয়ন্তিকা ও পারাবত এবং চট্টগ্রামগামী পাহাড়িকা ও উদয়ন এক্সপ্রেস চলাচল করে। এসব ট্রেনের টিকিট অনলাইন প্ল্যাটফর্মে উন্মুক্ত হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই সব বিক্রি হয়ে যাওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
বিষয়টি নজরে আসে সিলেটের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল্লাহ আল নোমানের। আদালত ট্রেনের টিকিট বিক্রির সরকারি ওয়েবসাইট পরিদর্শন করে দেখতে পান, নির্দিষ্ট দিনের টিকিট বিক্রির জন্য উন্মুক্ত হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিপুলসংখ্যক টিকিট বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। এত অল্প সময়ে সব টিকিট বিক্রি হয়ে যাওয়াকে সন্দেহজনক মনে হয় আদালতের।
এর পরিপ্রেক্ষিতে গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে স্বপ্রণোদিত হয়ে মিস মামলা নং-০১/২০২৬ দায়ের করেন আবদুল্লাহ আল নোমান। এজাহারে কালোবাজারি ও মজুদদারির মতো অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়।
মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে পিবিআই সিলেটকে। ৭ অক্টোবর মামলার নথিপত্র পিবিআইয়ের কাছে পৌঁছেছে। বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছেন পিবিআই সিলেটের উপপরিদর্শক আবদুল আহাদ। তিনি জানিয়েছেন, আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে দায়ের করা মামলাটিই তিনি তদন্ত করছেন।
মামলার নথিতে বলা হয়েছে, একটি চক্র ট্রেনের টিকিট বাজারজাতকরণের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের কারও কারও সহযোগিতায় মুহূর্তের মধ্যে টিকিট সরিয়ে নিয়ে পরে তা অধিক মূল্যে যাত্রীদের কাছে বিক্রি করে থাকতে পারে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড সাধারণ যাত্রীদের হয়রানির পাশাপাশি সিলেটের পর্যটনশিল্পের বিকাশেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
অনলাইন টিকিটেও ‘ব্লকের’ অভিযোগ
ট্রেনের টিকিট নিয়ে অভিযোগের আরেকটি দিক উঠে এসেছে পরিবহন অডিট অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক অডিট রিপোর্টে। সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ রেলওয়ের অনলাইন টিকিট সাধারণ যাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত করার এক থেকে পাঁচ দিন আগেই তা অবৈধভাবে ব্লক করে রাখার ঘটনা ঘটেছে।
অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী, টিকিট বিক্রি ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা ভেন্ডর প্রতিষ্ঠান ‘সহজ ডট কম’ (Shohoz.com)-এর কর্মীদের হাতে সিস্টেমের মূল নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী তাঁদের কাজ হওয়ার কথা ছিল কেবল কারিগরি রক্ষণাবেক্ষণ। কিন্তু বিভিন্ন স্টেশনের প্রায় ১৬৯টি অ্যাডমিন অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে টিকিট ব্লক ও আসন সংরক্ষণের মতো কাজ নিয়ন্ত্রণ করার অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে।
সাধারণ যাত্রীদের সুবিধার জন্য চালু করা ই-টিকিটিং ব্যবস্থাই যদি নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের হাতে টিকিট নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি করে, তাহলে ডিজিটাল ব্যবস্থার উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এভাবে অনলাইন ব্যবস্থাও টিকিট কালোবাজারির আধুনিক রূপ ধারণ করতে পারে।
সিলেট রেলস্টেশনের ব্যবস্থাপক নুরুল ইসলাম ধন্যবাদদম কর্মীদের অবশ্য বলেছেন, রেলের টিকিট অনলাইনে কিনতে হয়। কেউ কেউ সরাসরি কাউন্টার থেকেও কেনেন। টিকিট বিক্রিতে স্টেশন কর্তৃপক্ষের কোনো হাত নেই।
ঘোষণার পরও নেই ‘টাঙ্গুয়া এক্সপ্রেস’
সিলেটের রেল যোগাযোগ নিয়ে সাম্প্রতিক হতাশার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ ‘টাঙ্গুয়া এক্সপ্রেস’। সিলেটবাসীর প্রত্যাশা ছিল, নতুন এই ট্রেন ঢাকার সঙ্গে সিলেটের রেল যোগাযোগকে আরও দ্রুত ও আধুনিক করবে।
সিলেট-৬ আসনের এমপি এমরান আহমদ চৌধুরীর এক প্রশ্নের জবাবে সংসদে সড়ক ও সেতুমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, ৩ সেপ্টেম্বর থেকে সিলেট–ঢাকা রেলপথে ‘টাঙ্গুয়া’ নামে নতুন একটি ট্রেন চালু হবে। মে ও জুন মাসে এ নিয়ে আলোচনা হয়।
কিন্তু নির্ধারিত ৩ সেপ্টেম্বর পেরিয়ে গেছে। ট্রেন চালুর কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়নি। রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকেও এ বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। এমরান আহমদ চৌধুরী জানিয়েছেন, তিনি বিষয়টি আবার সংসদে তুলবেন।
এর আগে ২০২৩ সালে অনুমোদন পাওয়া এই ট্রেনকে ঘিরে সিলেটবাসীর প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। আধুনিক, ননস্টপ ও আন্তর্জাতিক মানের সেবা দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু প্রশাসনিক জটিলতা, ইঞ্জিনের স্বল্পতা ও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সমন্বয়হীনতার কারণে ট্রেনটি চালু হয়নি।
ময়মনসিংহ–সিলেট রেল যোগাযোগও কাগজে
ময়মনসিংহ ও সিলেটের মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের সামাজিক, পারিবারিক ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু দুই বিভাগকে সরাসরি রেলপথে যুক্ত করা যায়নি। ২০১৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহে এক জনসভায় তৎকালীন ধর্মমন্ত্রী প্রিন্সিপাল মতিউর রহমান বলেছিলেন, “ময়মনসিংহ–সিলেট রেলপথে শিগগিরই আন্তঃনগর ট্রেন চালু করা হবে।”
এরপর ২০১৯ সালে সিলেট–চট্টগ্রাম এবং ময়মনসিংহ–সিলেট রুটে নতুন দুটি আন্তনগর ট্রেন চালুর পরিকল্পনার কথা জানায় রেলওয়ে। সে সময় ইন্দোনেশিয়ার PT INKA থেকে আধুনিক কোচও আমদানি করা হয়। এসব কোচের একটি অংশ ওই রুটে ব্যবহারের কথা ছিল। কিন্তু বছর পেরিয়ে গেলেও ট্রেন চালু হয়নি।
২০২১ সালের ৯ অক্টোবর রাজধানীর বেইলি রোডের অফিসার্স ক্লাবে বৃহত্তর ময়মনসিংহ সমন্বয় পরিষদের বার্ষিক সম্মেলনে তৎকালীন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান জানিয়েছিলেন, ময়মনসিংহের সঙ্গে সিলেটের সরাসরি রেল যোগাযোগ স্থাপনে জরিপ চলছে।
তিনি আরও বলেছিলেন, সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ থেকে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ পর্যন্ত ১৪ কিলোমিটার উড়ালসড়ক নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী। হাওরাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা সহজ করাই ছিল এর উদ্দেশ্য। কিন্তু এসব ঘোষণার পরও মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
বর্তমানে সিলেট থেকে ময়মনসিংহ যেতে যাত্রীদের ঘুরপথে যেতে হয়। কখনো ঢাকা, কখনো ভৈরব হয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। এতে সময় লাগে প্রায় ১৫ থেকে ২০ ঘণ্টা। অথচ সরাসরি রেল যোগাযোগ চালু করা গেলে এই যাত্রা প্রায় ৭ ঘণ্টায় নামিয়ে আনা সম্ভব হতো।
ডাবল লাইনের প্রতিশ্রুতিও থমকে
সিলেটের রেল যোগাযোগের বড় সীমাবদ্ধতা একক রেললাইন। ২০১৯ সালে আখাউড়া–সিলেট রেলপথ ডাবল লাইনে উন্নীত করার প্রকল্পের ঘোষণা সিলেটবাসীর মধ্যে আশার সৃষ্টি করেছিল। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকা ও সিলেটের মধ্যে রেলযাত্রা আরও দ্রুত, নিরাপদ ও আধুনিক হওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু অর্থসংকটের কারণে প্রকল্পটি স্থগিত রয়েছে। ফলে সিলেটের সঙ্গে দেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও যোগাযোগকেন্দ্রগুলোর রেলসংযোগের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নও থমকে আছে।
এই রেলপথের গুরুত্ব শুধু ঢাকা–সিলেট যাতায়াতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং ভারতের আগরতলার সঙ্গে সম্ভাব্য যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক সম্প্রসারণের বিষয়টিও যুক্ত। প্রকল্পটি দীর্ঘদিন বাস্তবায়িত না হওয়ায় আঞ্চলিক যোগাযোগের সম্ভাবনাও পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
আন্তনগর ট্রেনেও স্বস্তি নেই
নতুন ট্রেন না পাওয়ার পাশাপাশি বিদ্যমান আন্তনগর ট্রেনের সেবা নিয়েও সিলেটবাসীর অভিযোগ রয়েছে। সিলেট থেকে ঢাকাগামী আন্তনগর ট্রেনগুলোতে পথে বিভিন্ন স্টেশনে ব্যাপক যাত্রী ওঠানামার কারণে অনেক সময় ট্রেনের ভেতরে চলাচলের জায়গা থাকে না।
আশুগঞ্জ, ভৈরব বাজার, নরসিংদীসহ বিভিন্ন স্টেশন থেকে যাত্রী ওঠায় সিলেট থেকে যাত্রা করা অনেক যাত্রীকে দীর্ঘ পথ দাঁড়িয়ে যেতে হয়—এমন অভিযোগ রয়েছে।
এ নিয়ে সম্প্রতি সিলেটবাসী মানববন্ধনও করেছেন। তাঁদের দাবি, ঢাকা বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনের দিকে যাওয়ার পথে আন্তনগর ট্রেনের স্টপেজ কমানো হোক, যাতে দীর্ঘ দূরত্বের যাত্রীরা তুলনামূলক স্বস্তিতে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন।
যাত্রীদের বক্তব্য, আন্তনগর ট্রেনের মূল বৈশিষ্ট্যই হলো দ্রুত ও তুলনামূলক আরামদায়ক যাত্রা। কিন্তু পথে অতিরিক্ত স্টপেজ ও যাত্রী ওঠানামার কারণে সেই সুবিধা অনেকটাই নষ্ট হচ্ছে।
পর্যটনের সম্ভাবনা, যোগাযোগে পিছিয়ে
সিলেট বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র শ্রীমঙ্গল। চা-বাগান, পাহাড়, বনাঞ্চল, হাওর ও বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রকে ঘিরে শ্রীমঙ্গল দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য। প্রতিদিন দেশি-বিদেশি পর্যটকের আনাগোনা রয়েছে এখানে।
রাধানগরসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে হোটেল, রিসোর্ট ও পর্যটনকেন্দ্র। লেবু, আনারস, কাঁঠাল ও চা-বাগানের বিস্তৃত চাষাবাদকে ঘিরেও গড়ে উঠেছে স্থানীয় অর্থনীতি। এসব খাতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে শত শত মানুষ জীবিকা নির্বাহ করছেন।
রাধানগরের ইতিহাসও এ অঞ্চলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ১৭৮ বিঘা জমির ডলুছড়া পাহাড় ব্রিটিশ শাসনামলে শ্রীমঙ্গলের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও দানবীর রাধা নাথ দেব চৌধুরী কিনেছিলেন। পরে তিনি জমিটি তাঁর চার সন্তানের মধ্যে বণ্টন করেন। তাঁদের কেউ কেউ জমি বিক্রি করেন, আর অবশিষ্ট জমির একটি অংশ সময়ের ব্যবধানে বিভিন্ন কারণে হাতছাড়া হয়ে যায়। তাঁর নাম থেকেই গড়ে ওঠে ‘রাধানগর’, যা বর্তমানে সিলেট বিভাগের অন্যতম উন্নত ও সম্ভাবনাময় এলাকা হিসেবে পরিচিত।
এত সম্ভাবনার পরও শ্রীমঙ্গলসহ সিলেট বিভাগের পর্যটনকেন্দ্রগুলোকে ঘিরে আধুনিক রেলসেবা এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। জাফলং, রাতারগুল, বিছানাকান্দি, লালাখান কিংবা শ্রীমঙ্গলের চা-বাগান—প্রতিটি পর্যটনকেন্দ্রই দেশের পর্যটন খাতকে আরও বড় করার সম্ভাবনা রাখে। কিন্তু আধুনিক ও দ্রুত রেল যোগাযোগের অভাব সেই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগানোর পথে বড় সীমাবদ্ধতা।
সড়কেও দুর্ভোগ
রেলের দুরবস্থার পাশাপাশি সড়কপথেও সিলেটবাসীর স্বস্তি নেই। ঢাকা বা দেশের অন্য অঞ্চল থেকে সড়কপথে সিলেটে আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় লাগে। বিভিন্ন সড়কে উন্নয়নকাজ ধীরগতিতে চলার পাশাপাশি কোথাও কোথাও ভাঙাচোরা রাস্তা, গর্ত ও অমসৃণ সড়কের কারণে বাস, কার ও জিপসহ বিভিন্ন যানবাহনের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয়।
এর সঙ্গে রয়েছে তীব্র যানজট। দীর্ঘ পথের যানজট, সড়কের দুরবস্থা ও নির্মাণকাজ মিলিয়ে অনেক সময় গন্তব্যে পৌঁছানোই যাত্রীদের কাছে স্বপ্নের মতো মনে হয়। ফলে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য রেল যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তা সিলেটবাসীর কাছে কেবল আরামের বিষয় নয়; এটি হয়ে উঠেছে সময়, অর্থনীতি ও দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
অর্থনীতির সঙ্গে জড়িয়ে রেল
সিলেট বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবাসী ও অর্থনৈতিক অঞ্চল। বিপুল প্রবাসী আয়, চা শিল্প, প্রাকৃতিক গ্যাস ও পর্যটন—সব মিলিয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে এ অঞ্চলের গুরুত্ব উল্লেখযোগ্য।
একটি কার্যকর রেলপথ শুধু যাত্রী পরিবহন করে না। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন, কর্মসংস্থান, পণ্য পরিবহন এবং আঞ্চলিক অর্থনীতির গতি। ময়মনসিংহের সঙ্গে সরাসরি রেল যোগাযোগ চালু হলে দুই অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামাজিক যোগাযোগ বাড়তে পারে। ডাবল লাইন হলে ঢাকা ও সিলেটের মধ্যে রেল চলাচলের সক্ষমতা বাড়বে। নতুন আন্তনগর ট্রেন চালু হলে সড়কপথের ওপর চাপও কমতে পারে। কিন্তু একের পর এক ঘোষণার পরও যখন প্রকল্প বাস্তবায়ন হয় না, তখন স্বাভাবিকভাবেই মানুষের আস্থায় প্রশ্ন তৈরি হয়।
আর ঘোষণা নয়, বাস্তবায়ন চান সিলেটবাসী
২০১৭ সাল থেকে পরবর্তী বছরগুলোতে সিলেটের রেল যোগাযোগ নিয়ে একের পর এক ঘোষণা এসেছে। নতুন ট্রেন, ডাবল লাইন, সরাসরি ময়মনসিংহ–সিলেট রেল যোগাযোগ, সিলেট–জাফলং রেলসড়ক—প্রতিটি উদ্যোগই মানুষের মনে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে। কিন্তু প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবায়নের দূরত্ব দিন দিন স্পষ্ট হয়েছে।
রেলের টিকিট সাধারণ যাত্রীর নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার অভিযোগ, অনলাইনে টিকিট ছাড়ার মুহূর্তেই টিকিট শেষ হয়ে যাওয়া, কালোবাজারি ও মজুদদারির অভিযোগ, নতুন ট্রেন চালুর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়া, পুরোনো রেললাইন ও ধীরগতির ট্রেন—সব মিলিয়ে সিলেটের রেলযাত্রা এখন এক দীর্ঘ ভোগান্তির নাম।
সিলেটবাসীর কাছে তাই প্রশ্নটি শুধু ‘টাঙ্গুয়া এক্সপ্রেস কবে চলবে’—এতটুকু নয়। প্রশ্ন আরও বড়: দীর্ঘদিনের প্রতিশ্রুতিগুলো কবে বাস্তবে রূপ নেবে? ৩ সেপ্টেম্বর পেরিয়ে গেছে। সংসদে ঘোষিত তারিখও এখন অতীত। কিন্তু সিলেটবাসীর অপেক্ষা শেষ হয়নি।
তারা আর নতুন কোনো তারিখ শুনতে চান না। তাঁরা দেখতে চান ট্রেন, আধুনিক রেললাইন, দ্রুতগামী ও নির্ভরযোগ্য রেলসেবা। একই সঙ্গে তাঁরা চান সড়ক যোগাযোগের চলমান সমস্যাগুলোরও দ্রুত সমাধান। সিলেটের রেলপথ যেন আর প্রতিশ্রুতির স্টেশনে দাঁড়িয়ে না থাকে—এটাই এখন এই অঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা।

আপনার মতামত লিখুন