সংবাদ

অ্যান কারসনের ফ্লাশ ফিকশন

নিখোঁজ ভেড়াগুলো


ভাবান্তর: আরণ্যক শামছ
ভাবান্তর: আরণ্যক শামছ
প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৩৫ এএম

নিখোঁজ ভেড়াগুলো
ছবিসূত্র : ইন্টারনেট


বাইরে ছিল হাড় কাঁপানো শীত আর ঘুটঘুটে অন্ধকার; আমরা খুব দ্রুতই সেখানে পৌঁছে গিয়েছিলাম। পার্টি বা উৎসবের আয়োজন আমার একদমই ভালো লাগে না। তোমার দাদি রান্নাঘরে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর হাত দুটো ছিল অ্যাপ্রনের ওপর আড়াআড়িভাবে রাখা। তাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন কোনো এক পৌরাণিক চরিত্র। তুমি বলেছিলে তোমাকে সবার সাথে মিশতে হবে। পরে, সিঁড়িতে বসে থাকা আমার কাছে তুমি ফিরে এলে। তোমাকে কী ভীষণ খুশি দেখাচ্ছিল। তুমি আমাকে তোমার নতুন সব পরিকল্পনার কথা জানালে। জানালে কনসার্টের মঞ্চের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া, কঠিন সব অডিশনের ধাপ পার হওয়া, আর সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়ানোর পরিকল্পনার কথা। তোমার কপালে যেন তোমার আত্মার দীপ্তি ফুটে উঠছিল। আমার বলার মতো কিছুই ছিল না। আমি মনে মনে প্রার্থনা করছিলাম, যদি কোনো ঝড় এসে তোমার যাওয়া আটকে দিত! কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাতটা শান্তই রইল। তুমি অনর্গল কথা বলেই চললে। ভোরের আলো ফুটতে শুরু করল। আমার একটা গোপন ইচ্ছে ছিল। কোনো হ্রদের জলে যেমন নিঃশব্দে ডুব দেওয়া যায়, ঠিক সেভাবেই তোমার মাঝে নিজেকে বিলীন করে হারিয়ে যাব। কিন্তু ততক্ষণে তুমি উঠে দাঁড়িয়েছিলে আর নিজের গায়ে লেগে থাকা ধুলো ঝেড়ে ফেলছিলে।

পরদিন কালো চশমাটা (তোমার পরামর্শ অনুযায়ী) চোখে দিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে সমুদ্রতীরে গেলাম। পিকনিকের সেই দিনটিতে তুমি আমাকে বলেছিলে, “তুমি ভাবছ একটা সত্যিকারের কবিতা তোমাকে বাঁচিয়ে তুলবে— এটা একটা ভুল ধারণা!” মনে মনে ভাবলাম, ‘কী ক্ষুদ্র এক আবাবিল তুমি!’ আমি সমুদ্রের জলে নেমে পড়লাম। জলটা ছিল তারার মতোই শীতল। কী দীর্ঘ একটা সকাল! আমার কবিতাটা যেন কিছুতেই এগোচ্ছিল না। শেষমেশ বাস ধরে চলে গেলাম গ্র্যান্ড পিয়ানোর এক নিলাম-অনুষ্ঠানে।

“কিটসের সেই গান গাওয়া ভালুকটার শেষ পর্যন্ত কী হয়েছিল?” —নিলামে আলাপ হওয়া কয়েকজন ভদ্রলোক এই বিষয়টা তুলল। বিষয়টি সঙ্গীতবিদ্যার সাথে কিছুটা সম্পর্কিত হওয়ায় হঠাৎ করেই তোমার কথা বড্ড মনে পড়ে গেল। আসলে গান-গাওয়া ভাল্লুকটি কিটসের ছিল না, ছিল বাইরনের— কথাটা বলতে চেয়েও বলিনি। একেকটা ‘বেবি গ্র্যান্ড’ পিয়ানো সাত হাজার ডলারে বিক্রি হচ্ছিল। আর আমার শুধু তোমার কথাই মনে পড়ছিল; তুমি কীভাবে আমাকে চমকে দিতে, তোমার দাঁতগুলো কীভাবে আমাকে চমকে দিত। নিলামটা চলল অনন্তকাল ধরে। রাত নেমে এল। তোমাকে ছাড়াই একটা পুরো দিন পার করে ফেললাম। আর এই যে একাকীত্ব— এর একটা ভালো দিকের কথা বলি, এখন আর সেই বাঁধা-ধরা বাতাই এর দর্শন গিলতে হয় না। তুমি সবসময় এমন সব কথা উদ্ধৃত করতে— যেমন, “ইরোস মানে হলো মৃত্যু পর্যন্ত ভালোবাসাকে ‘হ্যাঁ’ বলা।” পুরোটাই বাজে কথা! আমার শুধুই মনে হতো, আসলে তুমি কি সম্পর্কের রাশটা সব সময় নিজের হাতে রাখতে চাইতে, তাই না?

নিজেরই কাজের সঙ্গে এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতায় তুমি যেন নিজের সংগীততাত্ত্বিক সাধনার ওপর থেকে নিজের কর্তৃত্ব হারিয়ে ফেলেছিলে। তুমি বলেছিলে, তোমার আট কি নয় বছর বয়সে লেখা একটি ছোট্ট নোটবই তোমার দাদি খুঁজে পেয়েছিলেন। তার একটি পাতায় ছিল সুরলিপির কয়েকটি পঙ্ক্তি, যার মধ্যে নিহিত ছিল সংগীত ও সত্য সম্পর্কে পরবর্তী জীবনে তোমার সমস্ত অন্তর্দৃষ্টির বীজ। সেই সামান্য সুরলিপির টুকরোটি তোমার সমস্ত সত্তায় যেন আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল। অথচ পরবর্তী জীবনে তুমি আর কখনো তার চেয়ে উৎকৃষ্ট কিছু সৃষ্টি করতে পারোনি, এমনকি তার সমকক্ষ কিছুও নয়। নিজেরই শৈশবের সৃষ্টির কাছে ঈর্ষায় তুমি জিভ কামড়ে ধরেছিলে, তারপর নোটবইটি সরিয়ে রেখেছিলে। আমার মনে আছে, শীতের শেষভাগের এক সন্ধ্যায় আমরা দুজন হেঁটে যাচ্ছিলাম বনের ভেতর দিয়ে। গলে যাওয়া বরফের জল জমে ছিল ছোট ছোট জলাশয়ে, আর তারই মধ্যে গাছগুলো ঋজু হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, তাদের অবয়বে মিশে ছিল অন্ধকারের কালো ছায়া আর সোনালি আভা।

আমাদের প্রথম দেখা— একটা বক্তৃতার পর পার্টিতে। সার্ত্রে এসেছিলেন সেখানে, অথবা নিজেকে সার্ত্রে বলে দাবি করা অন্য কেউ। পরনে তাঁর ভারি সোয়েটার। তাঁর ভক্তদের গায়ে চাপানো ছিল পশমি কিংবা ভেড়ার চামড়ার কোট। সে রাতে অনেক পরে, তুমি এক ঘণ্টা ধরে আমার যৌনাঙ্গে ওপর মুখ গুঁজে পড়ে রইলে, কিন্তু সহজ ভাষায় যাকে বলে সঙ্গম— তাতে সফল হতে পারলে না। রাত চারটে নাগাদ আমি হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফিরলাম। শহরের বুকে ঠিক যেন একখানা টাটকা রুমাল পড়ে রয়েছে, তুষারপাতের শুভ্রতায় ঝিকমিক করছে চারপাশ। যৌনমিলনের পর একা একা বাড়ি ফেরার মুহূর্তটাই আমার সবচেয়ে প্রিয় ছিল।

এমন কিছু দিন আসে যখন আমার মনে হয় পুরো জীবনটাই কেমন যেন লক্ষ্যহীন, যেন কোনো কিছুর এক কোণে আমি ঝুলছি মাত্র। এই যে মানুষের অনুভূতির রদবদল, এর মূল্যই বা কতটুকু? হাইডেগার নামের এক দার্শনিক বোধহয় বলেছিলেন, মানুষের যদি অনুভূতির এই বদলগুলো না থাকত, তবে সে নাকি টেরই পেত না যে সে বেঁচে আছে! আমার ধারণা উনি খারাপ মেজাজের কথাই বুঝিয়েছিলেন; কারণ ভালো মেজাজে থাকলে আমার নিজের সুন্দর টুপিটার রূপ কিংবা আমার মোটরসাইকেলের গতি ছাড়া অন্য কোনো কিছুর দিকে আমার আর নজরই থাকে না। তবে একটু ভেবে দেখলে মনে হয়, তিনি হয়তো আসলে মেজাজের সেই সন্ধিক্ষণ বা পরিবর্তনের মুহূর্তটির কথাই বলতে চেয়েছিলেন। কারণ, আসল অলৌকিক ব্যাপার তো ওটাই। ধরো, তুমি হয়তো জীবনের একেবারে তলানিতে পড়ে আছ, আত্মাটা যেন শূন্য, বিপর্যস্ত ও রিক্ত; হাল ছেড়ে দেওয়ার উপক্রম— ঠিক তখনই হঠাৎ সব বদলে গেল। সেই সীমানাটা খুলে গেল। ভয়ের ঘোর কেটে গেল। পৃথিবীটা আবার প্রাণ ফিরে পেল। কীভাবে ঘটে এমনটা? এর নিয়ন্ত্রণ কার হাতে? আর কেনই বা আমার মনে হয় না যে এমনটা আবার কখনও ঘটবে? আহা, মৃত সেই কবিতাটি।

কথা প্রসঙ্গে বলি, আমার কবিতাটা কিন্তু মোটেল নিয়ে। প্রায়ই মনে হয়, আমাদের সেরা মুহূর্তগুলো তো ওই মোটেলগুলোতেই কেটেছে। আর মোটেলে কাটানো সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলো ছিল ঘুটঘুটে অন্ধকারে মোটেলের সুইমিং পুলে সাঁতার কাটার সময়টুকু। জলের তলার সেই ফিরোজা রঙের আলো— আমার সবচেয়ে প্রিয় আলো।

রাস্তায় দীর্ঘ ভ্রমণের সময় আগেভাগে যাত্রাপথের মোটেলগুলো খুঁজে বের করার দায়িত্বটা ছিল আমার। দু-একবার ভুলও করেছি; যেমন একবার মরুভূমির এক শহরে গিয়েছিলাম আমার এক অভিনেতা বন্ধুর নতুন নাটক দেখতে। থিয়েটারের পাশেই জ্বলজ্বল করছিল স্থানীয় এক মোটেল; তার ফ্রন্ট অফিসে বসে ছিল এক পাকিস্তানি তরুণ— যার একটা চোখ ছিল অদ্ভুত রকমের চঞ্চল— আর তার হুইলচেয়ারের চারপাশে ব্যস্ত হয়ে ঘুরছিল এক নারী, যে সম্পর্কে তার খালা। বাজে মোটেল, মাছি-ভর্তি বাজে ঘর, আর ‘ম্যাজিক ম্যাড্রিগাল’ নামের এক বাজে নাটক। আমার কাছে ওটা মোটেও জাদুকরী কিছু মনে হয়নি। খুব ছোট থিয়েটার। অভিনেতাদের শ্বাস নেওয়া বা শ্বাস নেওয়ার প্রস্তুতি— সবই দেখা যাচ্ছিল। একে অপরের চোখের দিকে তাকানোর মুহূর্তগুলোও ধরা পড়ছিল। ব্যাপারটা আমাকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল— ‘অস্বস্তি’ কি সঠিক শব্দ? তুমি বলেছিলে, “দর্শকই আসলে সব সময় বেমানান।” আমি বলেছিলাম, “এমন হলে কেমন হয়? পৃথিবীর সব অভিনেতা কেবল একটা ঘরে ঢুকে পায়চারি করবে, তারপর বেরিয়ে যাবে। পর্দা নামবে! শেষ! আর কোনো নাটক নয়।” তুমি হেসেছিলে। কিন্তু আমার মনে পড়ছিল সেই মোটেলের ছেলেটার কথা— যে হুইলচেয়ার-উচ্চতার টেবিলে রাখা কম্পিউটার আর অতিথিদের জন্য কফি মেশিন (সাথে কন্টিনেন্টাল ব্রেকফাস্টের ব্যবস্থাও ছিল) নিয়ে ফ্রন্ট অফিসের সেই ছোট্ট রঙ্গমঞ্চটি সামলাচ্ছিল; আর তার খালা— যেন কোনো মঞ্চকর্মী— প্লাস্টিকের কাঁটাচামচ আর মার্মালেডের ছোট প্যাকেট নিয়ে আসা-যাওয়া করছিলেন। তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হতো, তারা জীবনের কোনো এক দুঃখ-কষ্টের সাথে পরিচিত। আমি ভাবছিলাম, বুয়েনস আইরেসের অভিজাতদের নিয়ে লেখা— যারা ইতালি ও অস্ট্রিয়ার স্মৃতিতে কাতর— ‘ম্যাজিক লায়ার’ নাটকটি তাদের কেমন লাগত? নস্টালজিয়া আমার একদম ভালো লাগে না। হয়তো অভিনয় জিনিসটাই জন্মগতভাবে নস্টালজিক, মানবিক দুঃখ-কষ্টের প্রতি নস্টালজিয়া, যা হয়তো অন্য কোথাও একসময় বাস্তব ছিল। গাড়িতে বসে আমি জেন অস্টিনের ‘ম্যানসফিল্ড পার্ক’ পড়ছিলাম; সেখানে নাটক মঞ্চস্থ করা নিয়ে এক জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়: উপন্যাসের সবচেয়ে সন্দেহভাজন দুই চরিত্র একদল তরুণ-তরুণীকে নিয়ে ‘শৌখিন নাটক’ করার প্রস্তাব দেয়। অন্যরা তাতে অনিচ্ছা প্রকাশ করে; উপন্যাসের নায়িকা ফ্যানি বলে যে, অভিনয় সে ভীষণ অপছন্দ করে। নাটকটির মাত্র দুটি মহড়া হয়েছিল। তারপরই বিদেশ থেকে বাবার আগেভাগে ফিরে আসায় সব ভেস্তে যায়: বাবা এসেই নাটক বন্ধ করে দেন। মহড়া চলাকালীন ধরা পড়ে গিয়ে অভিনেতারা চরম লজ্জায় পড়ে এবং সপ্তাহের পর সপ্তাহ বাবার চোখের দিকে তাকাতে পারে না।

মনটা খারাপ নিয়েই আমরা একদিন আগে মোটেল ছেড়ে বেরিয়ে এলাম। ছেলেটি এবং তার ফুফুর মধ্যে কোনো বিস্ময়ের ভাব দেখা গেল না। তারা জানাল যে আগে চলে গেলেও পুরো ভাড়াই দিতে হবে— এবং আমরা তা-ই করলাম। তখন সবেমাত্র মাঝসকাল; অফিসের সামনের ঘরে আলো জ্বলছে, পর্দা টানা, আর কম্পিউটারের একটানা গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। সব অভিনয়ই যে কাল্পনিক তা নয়; তুমি যদি কনে হও, কিংবা রেস্তোরাঁর প্রধান পরিচারক বা শবযাত্রায় কফিন-বহনকারী —তবে তুমিও এক ধরনের অভিনয়ই করছ। এর মাধ্যমে তোমার মানবিক আচরণেরই নানা রূপ ফুটে উঠছে। বাড়ি ফেরার পথে আমরা একে অপরকে এমন সব কথাই বলছিলাম। কিন্তু তখনই আমার মনে পড়ে গেল খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীর অভিনেতা পোলোসের কথা, যিনি সোফোক্লেসের লেখা খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীর নাটক ‘ইলেকট্রা’-র এক নতুন মঞ্চায়নে অভিনয় করে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। পোলোস এতে ইলেকট্রার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন; নাটকের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ইলেকট্রা একটি পাত্র হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে— তার বিশ্বাস, ওই পাত্রে তার ভাই ওরেস্তেসের চিতাভস্ম রয়েছে। অথচ বাস্তবে পাত্রটি ছিল নকল— তার ভেতর কোনো চিতাভস্মই ছিল না; আর যে ব্যক্তি পাত্রটি ও মিথ্যা খবরটি নিয়ে এসেছিল, সে ছিল স্বয়ং ওরেস্তেস। নাটকের কাহিনিতে এই সব কারসাজি কীভাবে অর্থবহ হয়ে ওঠে তা জানতে হলে তোমাকে নাটকটি পড়তে হবে; তবে তোমার কি মনে হয় না যে, (কথিত) চিতাভস্মে (আসলে) পূর্ণ নয় এমন এই পাত্রটি যেন খোদ নাট্যশিল্পেরই এক চমৎকার রূপক? সব পাত্রই তো নকল! আর বিলাপরত সব ইলেকট্রাই যেন হৃদয়বিদারক অথচ হাস্যকর। আর পোলোস— যিনি তাঁর ‘স্পষ্ট বাচনভঙ্গি ও সুনিপুণ অঙ্গভঙ্গির (আউলাস গেলিয়াসের মতে) জন্য বিখ্যাত ছিলেন— তিনি অভিনেতাদের এই অশ্রু-সংক্রান্ত আপাত-বৈপরীত্যকে আরও এক ধাপ গভীরতর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

পলোস তখন সদ্যই এক ব্যক্তিগত শোকের সম্মুখীন হয়েছিলেন। তাই যখন তাঁকে ‘ইলেকট্রা’র ভূমিকায় অভিনয় করতে বলা হলো, তখন তিনি শোকের পোশাকে নিজেকে সজ্জিত করলেন এবং নিজের মৃত পুত্রের চিতাভস্ম-ভরা পাত্রটি হাতে নিয়ে দর্শকদের সামনে কোনো কৃত্রিম শোক নয়, বরং একজন পিতার অকৃত্রিম ও গভীর বেদনা তুলে ধরলেন।

এই দৃশ্যকল্পে সত্য ও মিথ্যার কত যে স্তর একে অপরের সাথে জড়িয়ে আছে, তা ভাবলেই আমার মাথা ধরে যায়। ছাই— কখনও আসল, কখনও বা কাল্পনিক। অভিনেতা— যারা একই সাথে অভিনয় করছে তাঁরাই আবার শোকও পালন করছে। এমন ঘটছে যে, যারা বোন তাঁরা আসলে বাবার ভূমিকায় অবতীর্ণ; যারা নারী তাঁরা আসলে পুরুষ। গল্পেরই অংশ হয়ে ওঠা ভণ্ডামি হয়ে যাচ্ছে বাস্তব জীবনের ভণ্ডামিও। ছাইয়ের পাত্র, মঞ্চের সাজ-সরঞ্জাম, সবই বাস্তবতার অনুকরণ ও অভিনয়। দর্শক— কেউ বিভ্রান্ত, কেউ আনন্দিত; কেউ নাটকের ছলে প্রতারিত, আবার কেউবা বাস্তবেও প্রতারিত। গভীর রাতে থিয়েটার থেকে বাড়ি ফিরছে পোলোস; মুখে তখনও তার মেকআপ, আর পিঠের ব্যাগে কার্ডবোর্ডের পাত্রে ভরা সেই ছাই।

সেই সফরের পর থেকেই আমার অনিদ্রার সমস্যা শুরু হলো। মাঝরাতে প্রায়ই আমি রান্নাঘরে বসে কিটসের চিঠিগুলো পড়ি; তিনিও আমার মতোই ‘রেস্টলেস-লেগ সিনড্রোম’-এ (পায়ের অস্থিরতা বা অস্বস্তিকর অনুভূতিজনিত সমস্যা) ভুগতেন। বাতির চারপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে একটি নিঃসঙ্গ মথ। সময়টা ১৮১৯ সাল। সেই সময় যখন কিটস তাঁর প্রেমিকা ফ্যানিকে লিখছিলেন আবেগে টলমল করা সব অসংলগ্ন চিঠি; চিঠিতে তিনি কখনো ফ্যানিকে হৃদয়ের খুব কাছে টেনে নিচ্ছেন, আবার পরক্ষণেই দূরে ঠেলে দিচ্ছেন। তিনি দাবি করেন যে ফ্যানি তাঁকে পুরোপুরি ‘গ্রাস’ করে ফেলেছে; আবার তাঁকে এ-ও বলেন যে তিনি হরিণের মতো ‘মুক্ত’ থাকতে চান। জীবনের শেষ অবশিষ্ট বিলাসিতা হিসেবে তিনি ফ্যানিকে মৃত্যুর সমান্তরালে দাঁড় করান। আসলে তাঁর মনের গহীনে তখন কী কাজ করছিল? নিশ্চিতভাবেই তিনি প্রেমে পড়তে চেয়েছিলেন। নিঃসন্দেহে এই চিঠিগুলো লেখার কাজটা তিনি উপভোগ করেন— ভাড়া করা এক ঘরে একা বসে, যেখানে তিনি নিজেকে লিখতে বাধ্য করেন; আর সত্যিই তিনি লেখেন— প্রতিদিন, গভীর মনোযোগের সাথে— তবুও থেকে যায় সেই দীর্ঘ রাতগুলো। প্রেমে পড়লে আমরা সবাই তো কিছুটা লুকোচুরি বা অভিনয়ের আশ্রয় নিই, তাই না? একদিকে থাকে তীব্র ও অকৃত্রিম আবেগের স্ফুরণ, আর অন্যদিকে— কাপড় শুকানোর দড়িতে ঝুলে থাকা সাধারণ সব পোশাক।

কিটস নানা দিক থেকেই ছিলেন অতৃপ্ত ও ক্ষুধার্ত। রক্তচাপ বা শরীরের রক্তকণিকা কমানোর জন্য চিকিৎসকরা তাঁকে যে কঠোর ও স্বল্পাহারের নিয়মের মধ্যে রেখেছিলেন, তা তো ছিলই, এর বাইরেও তিনি চেয়েছিলেন সত্যিকারের ভালোবাসা; চেয়েছিলেন বই প্রকাশের পর কেবল দু-একটি নয়, বরং আরও বেশি পর্যালোচনা বা সমালোচনা; চেয়েছিলেন বইয়ের ভালো বিক্রি ও আয়-রোজগার; চেয়েছিলেন মানুষের ভালোবাসা ও প্রশংসা; সংক্ষেপে, তিনি চেয়েছিলেন বাইরনের মতো খ্যাতি ও প্রাপ্তি! এসব আকাঙ্ক্ষা তাঁর মনকে আচ্ছন্ন ও বিষাদগ্রস্ত করে তুলেছিল। আমার মনে পড়ে, যখন প্রথমবার আমার অনিদ্রার সমস্যা শুরু হলো, তখন আমি অন্যদের কাছে পরামর্শ চেয়েছিলাম। এক বন্ধু বলেছিল, “তুমি ভেড়া গুনতে পারো— তবে মনে মনে সংখ্যা গুনে নয়, বরং ভেড়াগুলোকে চোখের সামনে কল্পনা করে গুনবে।” (সে একজন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী।) সে আরও যোগ করেছিল, “আর যেসব ভেড়া হারিয়ে গেছে, সেগুলোর হিসাব করার কোনো দরকার নেই।” তখন কথাটাকে আমার নিছক কৌতুক বলেই মনে হয়েছিল; কিন্তু সত্যি বলতে, কিটস কি সারা রাত ধরে সেই হারিয়ে যাওয়া ভেড়াগুলোই গুনছিলেন না? কারণ, মানুষের পুরো শরীরটাই তো কখনো কখনো কান্নায় ভেঙে পড়ে। জীবনটা তো এলোমেলো ও বিশৃঙ্খল। আর কোন ভেড়াগুলো হারিয়ে গেছে, তা তো আমি কখনোই জানতে পারি না। কেবল বেদনার টিক-টক শব্দে সময়ের কাঁটা ঘোরে— এভাবেই আমরা এগিয়ে চলি, এভাবেই আমরা এগিয়েছিলাম।

[২০২৫ সালের ২১ আগস্ট দ্য নিউ ইয়র্কার সাময়িকীতে প্রকাশিত] 

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬


নিখোঁজ ভেড়াগুলো

প্রকাশের তারিখ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬

featured Image


বাইরে ছিল হাড় কাঁপানো শীত আর ঘুটঘুটে অন্ধকার; আমরা খুব দ্রুতই সেখানে পৌঁছে গিয়েছিলাম। পার্টি বা উৎসবের আয়োজন আমার একদমই ভালো লাগে না। তোমার দাদি রান্নাঘরে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর হাত দুটো ছিল অ্যাপ্রনের ওপর আড়াআড়িভাবে রাখা। তাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন কোনো এক পৌরাণিক চরিত্র। তুমি বলেছিলে তোমাকে সবার সাথে মিশতে হবে। পরে, সিঁড়িতে বসে থাকা আমার কাছে তুমি ফিরে এলে। তোমাকে কী ভীষণ খুশি দেখাচ্ছিল। তুমি আমাকে তোমার নতুন সব পরিকল্পনার কথা জানালে। জানালে কনসার্টের মঞ্চের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া, কঠিন সব অডিশনের ধাপ পার হওয়া, আর সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়ানোর পরিকল্পনার কথা। তোমার কপালে যেন তোমার আত্মার দীপ্তি ফুটে উঠছিল। আমার বলার মতো কিছুই ছিল না। আমি মনে মনে প্রার্থনা করছিলাম, যদি কোনো ঝড় এসে তোমার যাওয়া আটকে দিত! কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাতটা শান্তই রইল। তুমি অনর্গল কথা বলেই চললে। ভোরের আলো ফুটতে শুরু করল। আমার একটা গোপন ইচ্ছে ছিল। কোনো হ্রদের জলে যেমন নিঃশব্দে ডুব দেওয়া যায়, ঠিক সেভাবেই তোমার মাঝে নিজেকে বিলীন করে হারিয়ে যাব। কিন্তু ততক্ষণে তুমি উঠে দাঁড়িয়েছিলে আর নিজের গায়ে লেগে থাকা ধুলো ঝেড়ে ফেলছিলে।

পরদিন কালো চশমাটা (তোমার পরামর্শ অনুযায়ী) চোখে দিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে সমুদ্রতীরে গেলাম। পিকনিকের সেই দিনটিতে তুমি আমাকে বলেছিলে, “তুমি ভাবছ একটা সত্যিকারের কবিতা তোমাকে বাঁচিয়ে তুলবে— এটা একটা ভুল ধারণা!” মনে মনে ভাবলাম, ‘কী ক্ষুদ্র এক আবাবিল তুমি!’ আমি সমুদ্রের জলে নেমে পড়লাম। জলটা ছিল তারার মতোই শীতল। কী দীর্ঘ একটা সকাল! আমার কবিতাটা যেন কিছুতেই এগোচ্ছিল না। শেষমেশ বাস ধরে চলে গেলাম গ্র্যান্ড পিয়ানোর এক নিলাম-অনুষ্ঠানে।

“কিটসের সেই গান গাওয়া ভালুকটার শেষ পর্যন্ত কী হয়েছিল?” —নিলামে আলাপ হওয়া কয়েকজন ভদ্রলোক এই বিষয়টা তুলল। বিষয়টি সঙ্গীতবিদ্যার সাথে কিছুটা সম্পর্কিত হওয়ায় হঠাৎ করেই তোমার কথা বড্ড মনে পড়ে গেল। আসলে গান-গাওয়া ভাল্লুকটি কিটসের ছিল না, ছিল বাইরনের— কথাটা বলতে চেয়েও বলিনি। একেকটা ‘বেবি গ্র্যান্ড’ পিয়ানো সাত হাজার ডলারে বিক্রি হচ্ছিল। আর আমার শুধু তোমার কথাই মনে পড়ছিল; তুমি কীভাবে আমাকে চমকে দিতে, তোমার দাঁতগুলো কীভাবে আমাকে চমকে দিত। নিলামটা চলল অনন্তকাল ধরে। রাত নেমে এল। তোমাকে ছাড়াই একটা পুরো দিন পার করে ফেললাম। আর এই যে একাকীত্ব— এর একটা ভালো দিকের কথা বলি, এখন আর সেই বাঁধা-ধরা বাতাই এর দর্শন গিলতে হয় না। তুমি সবসময় এমন সব কথা উদ্ধৃত করতে— যেমন, “ইরোস মানে হলো মৃত্যু পর্যন্ত ভালোবাসাকে ‘হ্যাঁ’ বলা।” পুরোটাই বাজে কথা! আমার শুধুই মনে হতো, আসলে তুমি কি সম্পর্কের রাশটা সব সময় নিজের হাতে রাখতে চাইতে, তাই না?

নিজেরই কাজের সঙ্গে এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতায় তুমি যেন নিজের সংগীততাত্ত্বিক সাধনার ওপর থেকে নিজের কর্তৃত্ব হারিয়ে ফেলেছিলে। তুমি বলেছিলে, তোমার আট কি নয় বছর বয়সে লেখা একটি ছোট্ট নোটবই তোমার দাদি খুঁজে পেয়েছিলেন। তার একটি পাতায় ছিল সুরলিপির কয়েকটি পঙ্ক্তি, যার মধ্যে নিহিত ছিল সংগীত ও সত্য সম্পর্কে পরবর্তী জীবনে তোমার সমস্ত অন্তর্দৃষ্টির বীজ। সেই সামান্য সুরলিপির টুকরোটি তোমার সমস্ত সত্তায় যেন আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল। অথচ পরবর্তী জীবনে তুমি আর কখনো তার চেয়ে উৎকৃষ্ট কিছু সৃষ্টি করতে পারোনি, এমনকি তার সমকক্ষ কিছুও নয়। নিজেরই শৈশবের সৃষ্টির কাছে ঈর্ষায় তুমি জিভ কামড়ে ধরেছিলে, তারপর নোটবইটি সরিয়ে রেখেছিলে। আমার মনে আছে, শীতের শেষভাগের এক সন্ধ্যায় আমরা দুজন হেঁটে যাচ্ছিলাম বনের ভেতর দিয়ে। গলে যাওয়া বরফের জল জমে ছিল ছোট ছোট জলাশয়ে, আর তারই মধ্যে গাছগুলো ঋজু হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, তাদের অবয়বে মিশে ছিল অন্ধকারের কালো ছায়া আর সোনালি আভা।

আমাদের প্রথম দেখা— একটা বক্তৃতার পর পার্টিতে। সার্ত্রে এসেছিলেন সেখানে, অথবা নিজেকে সার্ত্রে বলে দাবি করা অন্য কেউ। পরনে তাঁর ভারি সোয়েটার। তাঁর ভক্তদের গায়ে চাপানো ছিল পশমি কিংবা ভেড়ার চামড়ার কোট। সে রাতে অনেক পরে, তুমি এক ঘণ্টা ধরে আমার যৌনাঙ্গে ওপর মুখ গুঁজে পড়ে রইলে, কিন্তু সহজ ভাষায় যাকে বলে সঙ্গম— তাতে সফল হতে পারলে না। রাত চারটে নাগাদ আমি হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফিরলাম। শহরের বুকে ঠিক যেন একখানা টাটকা রুমাল পড়ে রয়েছে, তুষারপাতের শুভ্রতায় ঝিকমিক করছে চারপাশ। যৌনমিলনের পর একা একা বাড়ি ফেরার মুহূর্তটাই আমার সবচেয়ে প্রিয় ছিল।

এমন কিছু দিন আসে যখন আমার মনে হয় পুরো জীবনটাই কেমন যেন লক্ষ্যহীন, যেন কোনো কিছুর এক কোণে আমি ঝুলছি মাত্র। এই যে মানুষের অনুভূতির রদবদল, এর মূল্যই বা কতটুকু? হাইডেগার নামের এক দার্শনিক বোধহয় বলেছিলেন, মানুষের যদি অনুভূতির এই বদলগুলো না থাকত, তবে সে নাকি টেরই পেত না যে সে বেঁচে আছে! আমার ধারণা উনি খারাপ মেজাজের কথাই বুঝিয়েছিলেন; কারণ ভালো মেজাজে থাকলে আমার নিজের সুন্দর টুপিটার রূপ কিংবা আমার মোটরসাইকেলের গতি ছাড়া অন্য কোনো কিছুর দিকে আমার আর নজরই থাকে না। তবে একটু ভেবে দেখলে মনে হয়, তিনি হয়তো আসলে মেজাজের সেই সন্ধিক্ষণ বা পরিবর্তনের মুহূর্তটির কথাই বলতে চেয়েছিলেন। কারণ, আসল অলৌকিক ব্যাপার তো ওটাই। ধরো, তুমি হয়তো জীবনের একেবারে তলানিতে পড়ে আছ, আত্মাটা যেন শূন্য, বিপর্যস্ত ও রিক্ত; হাল ছেড়ে দেওয়ার উপক্রম— ঠিক তখনই হঠাৎ সব বদলে গেল। সেই সীমানাটা খুলে গেল। ভয়ের ঘোর কেটে গেল। পৃথিবীটা আবার প্রাণ ফিরে পেল। কীভাবে ঘটে এমনটা? এর নিয়ন্ত্রণ কার হাতে? আর কেনই বা আমার মনে হয় না যে এমনটা আবার কখনও ঘটবে? আহা, মৃত সেই কবিতাটি।

কথা প্রসঙ্গে বলি, আমার কবিতাটা কিন্তু মোটেল নিয়ে। প্রায়ই মনে হয়, আমাদের সেরা মুহূর্তগুলো তো ওই মোটেলগুলোতেই কেটেছে। আর মোটেলে কাটানো সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলো ছিল ঘুটঘুটে অন্ধকারে মোটেলের সুইমিং পুলে সাঁতার কাটার সময়টুকু। জলের তলার সেই ফিরোজা রঙের আলো— আমার সবচেয়ে প্রিয় আলো।

রাস্তায় দীর্ঘ ভ্রমণের সময় আগেভাগে যাত্রাপথের মোটেলগুলো খুঁজে বের করার দায়িত্বটা ছিল আমার। দু-একবার ভুলও করেছি; যেমন একবার মরুভূমির এক শহরে গিয়েছিলাম আমার এক অভিনেতা বন্ধুর নতুন নাটক দেখতে। থিয়েটারের পাশেই জ্বলজ্বল করছিল স্থানীয় এক মোটেল; তার ফ্রন্ট অফিসে বসে ছিল এক পাকিস্তানি তরুণ— যার একটা চোখ ছিল অদ্ভুত রকমের চঞ্চল— আর তার হুইলচেয়ারের চারপাশে ব্যস্ত হয়ে ঘুরছিল এক নারী, যে সম্পর্কে তার খালা। বাজে মোটেল, মাছি-ভর্তি বাজে ঘর, আর ‘ম্যাজিক ম্যাড্রিগাল’ নামের এক বাজে নাটক। আমার কাছে ওটা মোটেও জাদুকরী কিছু মনে হয়নি। খুব ছোট থিয়েটার। অভিনেতাদের শ্বাস নেওয়া বা শ্বাস নেওয়ার প্রস্তুতি— সবই দেখা যাচ্ছিল। একে অপরের চোখের দিকে তাকানোর মুহূর্তগুলোও ধরা পড়ছিল। ব্যাপারটা আমাকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল— ‘অস্বস্তি’ কি সঠিক শব্দ? তুমি বলেছিলে, “দর্শকই আসলে সব সময় বেমানান।” আমি বলেছিলাম, “এমন হলে কেমন হয়? পৃথিবীর সব অভিনেতা কেবল একটা ঘরে ঢুকে পায়চারি করবে, তারপর বেরিয়ে যাবে। পর্দা নামবে! শেষ! আর কোনো নাটক নয়।” তুমি হেসেছিলে। কিন্তু আমার মনে পড়ছিল সেই মোটেলের ছেলেটার কথা— যে হুইলচেয়ার-উচ্চতার টেবিলে রাখা কম্পিউটার আর অতিথিদের জন্য কফি মেশিন (সাথে কন্টিনেন্টাল ব্রেকফাস্টের ব্যবস্থাও ছিল) নিয়ে ফ্রন্ট অফিসের সেই ছোট্ট রঙ্গমঞ্চটি সামলাচ্ছিল; আর তার খালা— যেন কোনো মঞ্চকর্মী— প্লাস্টিকের কাঁটাচামচ আর মার্মালেডের ছোট প্যাকেট নিয়ে আসা-যাওয়া করছিলেন। তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হতো, তারা জীবনের কোনো এক দুঃখ-কষ্টের সাথে পরিচিত। আমি ভাবছিলাম, বুয়েনস আইরেসের অভিজাতদের নিয়ে লেখা— যারা ইতালি ও অস্ট্রিয়ার স্মৃতিতে কাতর— ‘ম্যাজিক লায়ার’ নাটকটি তাদের কেমন লাগত? নস্টালজিয়া আমার একদম ভালো লাগে না। হয়তো অভিনয় জিনিসটাই জন্মগতভাবে নস্টালজিক, মানবিক দুঃখ-কষ্টের প্রতি নস্টালজিয়া, যা হয়তো অন্য কোথাও একসময় বাস্তব ছিল। গাড়িতে বসে আমি জেন অস্টিনের ‘ম্যানসফিল্ড পার্ক’ পড়ছিলাম; সেখানে নাটক মঞ্চস্থ করা নিয়ে এক জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়: উপন্যাসের সবচেয়ে সন্দেহভাজন দুই চরিত্র একদল তরুণ-তরুণীকে নিয়ে ‘শৌখিন নাটক’ করার প্রস্তাব দেয়। অন্যরা তাতে অনিচ্ছা প্রকাশ করে; উপন্যাসের নায়িকা ফ্যানি বলে যে, অভিনয় সে ভীষণ অপছন্দ করে। নাটকটির মাত্র দুটি মহড়া হয়েছিল। তারপরই বিদেশ থেকে বাবার আগেভাগে ফিরে আসায় সব ভেস্তে যায়: বাবা এসেই নাটক বন্ধ করে দেন। মহড়া চলাকালীন ধরা পড়ে গিয়ে অভিনেতারা চরম লজ্জায় পড়ে এবং সপ্তাহের পর সপ্তাহ বাবার চোখের দিকে তাকাতে পারে না।

মনটা খারাপ নিয়েই আমরা একদিন আগে মোটেল ছেড়ে বেরিয়ে এলাম। ছেলেটি এবং তার ফুফুর মধ্যে কোনো বিস্ময়ের ভাব দেখা গেল না। তারা জানাল যে আগে চলে গেলেও পুরো ভাড়াই দিতে হবে— এবং আমরা তা-ই করলাম। তখন সবেমাত্র মাঝসকাল; অফিসের সামনের ঘরে আলো জ্বলছে, পর্দা টানা, আর কম্পিউটারের একটানা গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। সব অভিনয়ই যে কাল্পনিক তা নয়; তুমি যদি কনে হও, কিংবা রেস্তোরাঁর প্রধান পরিচারক বা শবযাত্রায় কফিন-বহনকারী —তবে তুমিও এক ধরনের অভিনয়ই করছ। এর মাধ্যমে তোমার মানবিক আচরণেরই নানা রূপ ফুটে উঠছে। বাড়ি ফেরার পথে আমরা একে অপরকে এমন সব কথাই বলছিলাম। কিন্তু তখনই আমার মনে পড়ে গেল খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীর অভিনেতা পোলোসের কথা, যিনি সোফোক্লেসের লেখা খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীর নাটক ‘ইলেকট্রা’-র এক নতুন মঞ্চায়নে অভিনয় করে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। পোলোস এতে ইলেকট্রার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন; নাটকের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ইলেকট্রা একটি পাত্র হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে— তার বিশ্বাস, ওই পাত্রে তার ভাই ওরেস্তেসের চিতাভস্ম রয়েছে। অথচ বাস্তবে পাত্রটি ছিল নকল— তার ভেতর কোনো চিতাভস্মই ছিল না; আর যে ব্যক্তি পাত্রটি ও মিথ্যা খবরটি নিয়ে এসেছিল, সে ছিল স্বয়ং ওরেস্তেস। নাটকের কাহিনিতে এই সব কারসাজি কীভাবে অর্থবহ হয়ে ওঠে তা জানতে হলে তোমাকে নাটকটি পড়তে হবে; তবে তোমার কি মনে হয় না যে, (কথিত) চিতাভস্মে (আসলে) পূর্ণ নয় এমন এই পাত্রটি যেন খোদ নাট্যশিল্পেরই এক চমৎকার রূপক? সব পাত্রই তো নকল! আর বিলাপরত সব ইলেকট্রাই যেন হৃদয়বিদারক অথচ হাস্যকর। আর পোলোস— যিনি তাঁর ‘স্পষ্ট বাচনভঙ্গি ও সুনিপুণ অঙ্গভঙ্গির (আউলাস গেলিয়াসের মতে) জন্য বিখ্যাত ছিলেন— তিনি অভিনেতাদের এই অশ্রু-সংক্রান্ত আপাত-বৈপরীত্যকে আরও এক ধাপ গভীরতর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

পলোস তখন সদ্যই এক ব্যক্তিগত শোকের সম্মুখীন হয়েছিলেন। তাই যখন তাঁকে ‘ইলেকট্রা’র ভূমিকায় অভিনয় করতে বলা হলো, তখন তিনি শোকের পোশাকে নিজেকে সজ্জিত করলেন এবং নিজের মৃত পুত্রের চিতাভস্ম-ভরা পাত্রটি হাতে নিয়ে দর্শকদের সামনে কোনো কৃত্রিম শোক নয়, বরং একজন পিতার অকৃত্রিম ও গভীর বেদনা তুলে ধরলেন।

এই দৃশ্যকল্পে সত্য ও মিথ্যার কত যে স্তর একে অপরের সাথে জড়িয়ে আছে, তা ভাবলেই আমার মাথা ধরে যায়। ছাই— কখনও আসল, কখনও বা কাল্পনিক। অভিনেতা— যারা একই সাথে অভিনয় করছে তাঁরাই আবার শোকও পালন করছে। এমন ঘটছে যে, যারা বোন তাঁরা আসলে বাবার ভূমিকায় অবতীর্ণ; যারা নারী তাঁরা আসলে পুরুষ। গল্পেরই অংশ হয়ে ওঠা ভণ্ডামি হয়ে যাচ্ছে বাস্তব জীবনের ভণ্ডামিও। ছাইয়ের পাত্র, মঞ্চের সাজ-সরঞ্জাম, সবই বাস্তবতার অনুকরণ ও অভিনয়। দর্শক— কেউ বিভ্রান্ত, কেউ আনন্দিত; কেউ নাটকের ছলে প্রতারিত, আবার কেউবা বাস্তবেও প্রতারিত। গভীর রাতে থিয়েটার থেকে বাড়ি ফিরছে পোলোস; মুখে তখনও তার মেকআপ, আর পিঠের ব্যাগে কার্ডবোর্ডের পাত্রে ভরা সেই ছাই।

সেই সফরের পর থেকেই আমার অনিদ্রার সমস্যা শুরু হলো। মাঝরাতে প্রায়ই আমি রান্নাঘরে বসে কিটসের চিঠিগুলো পড়ি; তিনিও আমার মতোই ‘রেস্টলেস-লেগ সিনড্রোম’-এ (পায়ের অস্থিরতা বা অস্বস্তিকর অনুভূতিজনিত সমস্যা) ভুগতেন। বাতির চারপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে একটি নিঃসঙ্গ মথ। সময়টা ১৮১৯ সাল। সেই সময় যখন কিটস তাঁর প্রেমিকা ফ্যানিকে লিখছিলেন আবেগে টলমল করা সব অসংলগ্ন চিঠি; চিঠিতে তিনি কখনো ফ্যানিকে হৃদয়ের খুব কাছে টেনে নিচ্ছেন, আবার পরক্ষণেই দূরে ঠেলে দিচ্ছেন। তিনি দাবি করেন যে ফ্যানি তাঁকে পুরোপুরি ‘গ্রাস’ করে ফেলেছে; আবার তাঁকে এ-ও বলেন যে তিনি হরিণের মতো ‘মুক্ত’ থাকতে চান। জীবনের শেষ অবশিষ্ট বিলাসিতা হিসেবে তিনি ফ্যানিকে মৃত্যুর সমান্তরালে দাঁড় করান। আসলে তাঁর মনের গহীনে তখন কী কাজ করছিল? নিশ্চিতভাবেই তিনি প্রেমে পড়তে চেয়েছিলেন। নিঃসন্দেহে এই চিঠিগুলো লেখার কাজটা তিনি উপভোগ করেন— ভাড়া করা এক ঘরে একা বসে, যেখানে তিনি নিজেকে লিখতে বাধ্য করেন; আর সত্যিই তিনি লেখেন— প্রতিদিন, গভীর মনোযোগের সাথে— তবুও থেকে যায় সেই দীর্ঘ রাতগুলো। প্রেমে পড়লে আমরা সবাই তো কিছুটা লুকোচুরি বা অভিনয়ের আশ্রয় নিই, তাই না? একদিকে থাকে তীব্র ও অকৃত্রিম আবেগের স্ফুরণ, আর অন্যদিকে— কাপড় শুকানোর দড়িতে ঝুলে থাকা সাধারণ সব পোশাক।

কিটস নানা দিক থেকেই ছিলেন অতৃপ্ত ও ক্ষুধার্ত। রক্তচাপ বা শরীরের রক্তকণিকা কমানোর জন্য চিকিৎসকরা তাঁকে যে কঠোর ও স্বল্পাহারের নিয়মের মধ্যে রেখেছিলেন, তা তো ছিলই, এর বাইরেও তিনি চেয়েছিলেন সত্যিকারের ভালোবাসা; চেয়েছিলেন বই প্রকাশের পর কেবল দু-একটি নয়, বরং আরও বেশি পর্যালোচনা বা সমালোচনা; চেয়েছিলেন বইয়ের ভালো বিক্রি ও আয়-রোজগার; চেয়েছিলেন মানুষের ভালোবাসা ও প্রশংসা; সংক্ষেপে, তিনি চেয়েছিলেন বাইরনের মতো খ্যাতি ও প্রাপ্তি! এসব আকাঙ্ক্ষা তাঁর মনকে আচ্ছন্ন ও বিষাদগ্রস্ত করে তুলেছিল। আমার মনে পড়ে, যখন প্রথমবার আমার অনিদ্রার সমস্যা শুরু হলো, তখন আমি অন্যদের কাছে পরামর্শ চেয়েছিলাম। এক বন্ধু বলেছিল, “তুমি ভেড়া গুনতে পারো— তবে মনে মনে সংখ্যা গুনে নয়, বরং ভেড়াগুলোকে চোখের সামনে কল্পনা করে গুনবে।” (সে একজন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী।) সে আরও যোগ করেছিল, “আর যেসব ভেড়া হারিয়ে গেছে, সেগুলোর হিসাব করার কোনো দরকার নেই।” তখন কথাটাকে আমার নিছক কৌতুক বলেই মনে হয়েছিল; কিন্তু সত্যি বলতে, কিটস কি সারা রাত ধরে সেই হারিয়ে যাওয়া ভেড়াগুলোই গুনছিলেন না? কারণ, মানুষের পুরো শরীরটাই তো কখনো কখনো কান্নায় ভেঙে পড়ে। জীবনটা তো এলোমেলো ও বিশৃঙ্খল। আর কোন ভেড়াগুলো হারিয়ে গেছে, তা তো আমি কখনোই জানতে পারি না। কেবল বেদনার টিক-টক শব্দে সময়ের কাঁটা ঘোরে— এভাবেই আমরা এগিয়ে চলি, এভাবেই আমরা এগিয়েছিলাম।

[২০২৫ সালের ২১ আগস্ট দ্য নিউ ইয়র্কার সাময়িকীতে প্রকাশিত] 


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত