পারমাণবিক সংঘাত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার ও জলবায়ু পরিবর্তন - আগামী ৭৫ বছরে মানবজাতির অস্তিত্ব এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে এসব বিষয়কে চিহ্নিত করেছে দ্য ল্যানসেটের একটি বৈশ্বিক মূল্যায়ন। এতে বলা হয়েছে, শিশুদের অপুষ্টি, বায়ুদূষণ এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ও স্বাস্থ্যসহায়তা কমে যাওয়াও ব্যাপক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
দ্য ল্যানসেট কমিশন অন টোয়েন্টি-ফার্স্ট সেঞ্চুরি গ্লোবাল থ্রেটস টু হেলথের মূল্যায়নে মানবস্বাস্থ্যের জন্য মোট ১৭টি বড় হুমকির কথা তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঝুঁকিগুলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। ফলে একটি সমস্যাকে অন্যগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন করে মোকাবিলা করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। তবে প্রতিটি ঝুঁকি কমানোর বাস্তবসম্মত উপায় রয়েছে বলেও জানিয়েছেন তাঁরা।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিকস অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশনের পরিচালক এবং কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক ক্রিস্টোফার মারের ভাষ্য, বর্তমান নেতাদের সিদ্ধান্তই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য ও সুস্থতার ওপর বড় প্রভাব ফেলবে।
কমিশনের মূল্যায়নে পারমাণবিক যুদ্ধ এবং এআই ব্যবহার করে প্রাণঘাতী জৈব অস্ত্র তৈরির ঝুঁকিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এমন ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম হলেও পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ।
পারমাণবিক যুদ্ধের ফলে বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে বিপুল পরিমাণ কণা ছড়িয়ে সূর্যের আলো বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এর প্রভাবে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ও কৃষি উৎপাদনে বড় বিপর্যয় নেমে আসতে পারে, দেখা দিতে পারে ব্যাপক দুর্ভিক্ষ। একইভাবে এআইয়ের সাহায্যে তৈরি প্রাণঘাতী জৈব অস্ত্র মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
প্রতিবেদনের সঙ্গে প্রকাশিত দ্য ল্যানসেটের সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, এসব ঝুঁকি বাস্তবে রূপ নিলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা মহাপ্রলয়ের মতো হতে পারে।
পারমাণবিক সংঘাত ও এআইয়ের অপব্যবহারের বাইরে আরও ১৫টি ঝুঁকি চিহ্নিত করেছে কমিশন। এগুলোর প্রতিটির সঙ্গে সম্মিলিতভাবে ১০০ কোটির বেশি স্বাস্থ্যকর জীবনবর্ষ হারানোর আশঙ্কার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তালিকায় রয়েছে:
· বায়ুদূষণ
· জীবাণুর অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে ওঠা
· শিশুদের অপুষ্টি
· জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিপর্যয়
· প্রচলিত যুদ্ধ ও সংঘাত
· আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ও স্বাস্থ্যসহায়তা কমে যাওয়া
· অতিরিক্ত মদ্যপান
· উচ্চ রক্তচাপ
· আয়বৈষম্য
· নিম্নমানের শিক্ষা ও শিক্ষাগত অর্জনের ঘাটতি
· প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট মহামারি
· স্থূলতা
· মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি
· ধূমপান
· অস্বাস্থ্যকর বার্ধক্য
ঝুঁকিগুলো নির্ধারণের সময় সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি সেগুলো মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগও বিবেচনা করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ নিলে বিপুলসংখ্যক মানুষের সুস্থ জীবন রক্ষা করা সম্ভব বলে মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে।
কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির মাত্রা ৪ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোর বদলে প্রায় ১ দশমিক ৮ ডিগ্রিতে সীমিত রাখা গেলে ১৮৯ কোটি স্বাস্থ্যকর জীবনবর্ষ হারানো ঠেকানো সম্ভব হতে পারে।
এই হিসাবের জন্য প্রতিটি ঝুঁকির সম্ভাব্য সবচেয়ে ভালো ও সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির মডেল তৈরি করা হয়েছে। বর্তমান প্রবণতা বজায় থাকলে কী পরিমাণ স্বাস্থ্যক্ষতি হতে পারে এবং কার্যকর পদক্ষেপে কতটা ক্ষতি এড়ানো সম্ভব, তা তুলনা করে মূল্যায়নটি করা হয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পরিবেশেই সীমাবদ্ধ থাকে না। খাদ্য উৎপাদন, মানুষের জীবনযাপন, রোগের বিস্তার ও স্বাস্থ্যব্যবস্থাও এর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি বড় দাতা দেশ গত এক বছরে বিদেশে সহায়তা খাতে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর ঘোষণা দিয়েছে। কমিশনের আশঙ্কা, আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যসহায়তা ব্যাপকভাবে কমে গেলে বা পুরোপুরি ভেঙে পড়লে ২১০০ সালের আগে সর্বোচ্চ ১৫০ কোটি স্বাস্থ্যকর জীবনবর্ষ হারাতে পারে বিশ্ব।
সম্ভাব্য ক্ষতির প্রায় ৭০ শতাংশ ঘটতে পারে সাহারা-নিম্ন আফ্রিকা অঞ্চলে। শিশুদের অপুষ্টিসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় অঞ্চলটি আগে থেকেই বড় চাপের মধ্যে রয়েছে।
সহায়তা কমে গেলে দরিদ্র দেশগুলোতে স্বাস্থ্যসেবা, রোগ প্রতিরোধ, পুষ্টি কর্মসূচি ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এতে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে স্থূলতা ও মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে। অন্যদিকে, নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে শিক্ষার সুযোগ ও শিক্ষাগত অর্জনের ঘাটতি স্বাস্থ্যক্ষতির গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে।
তাই সব দেশে একই নীতি প্রয়োগ করে এসব সমস্যা মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। অঞ্চলভেদে আর্থসামাজিক বাস্তবতা, স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা ও বিদ্যমান ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে।
অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধক্ষমতা, প্রাকৃতিক মহামারি ও বায়ুদূষণের মতো সমস্যা আবার কোনো একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এ কারণে এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জরুরি।
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের সংক্রামক রোগের মহামারিবিদ্যার অধ্যাপক ও কমিশনের সদস্য ইব্রাহিম আবুবকর জানিয়েছেন, মানবজাতির সামনে থাকা হুমকির তালিকা তুলে ধরার উদ্দেশ্য মানুষকে ভয় দেখানো নয়। বরং নীতিনির্ধারকেরা সম্ভাব্য বিপদের মুখোমুখি হলে কীভাবে পদক্ষেপের মাধ্যমে পরিস্থিতি বদলাতে পারেন, তা বোঝানোই মূল্যায়নের লক্ষ্য।
তাঁর মতে, ঝুঁকিগুলো আগেভাগে শনাক্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া গেলে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। এ জন্য পরিকল্পনা, সম্পদ বরাদ্দ ও দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি প্রয়োজন।
কমিশনের বিশেষজ্ঞরা প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনে বিনিয়োগের পাশাপাশি স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়েছেন। নতুন ঝুঁকি শনাক্ত করা, সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়ন এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সরকারগুলোকে অর্থ ও জনবল বরাদ্দ করতে হবে বলে তাঁদের মত।
অধ্যাপক ক্রিস্টোফার মারে বলেন, তিন বছর আগে কাজ শুরুর সময় তাঁদের ধারণা ছিল সংঘাত, জলবায়ু ও মহামারি - এই তিনটি বড় হুমকি রয়েছে। কিন্তু পরবর্তী মূল্যায়নে উদ্বেগের কারণ হিসেবে আরও অনেক ঝুঁকি উঠে এসেছে।
৩৫ জন বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে গঠিত কমিশনের মূল্যায়নটি জার্মানির বার্লিনে অনুষ্ঠিতব্য ওয়ার্ল্ড হেলথ সামিটে উপস্থাপনের কথা রয়েছে। নতুন তথ্য, পরিবর্তিত পরিস্থিতি ও উদ্ভূত বিপদের ভিত্তিতে ১৭টি ঝুঁকির তালিকা প্রতিবছর হালনাগাদ করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য ও জীবন রক্ষায় বড় সংঘাত বা প্রযুক্তিগত বিপর্যয়ের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন, অপুষ্টি, বৈষম্য, রোগব্যাধি এবং স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগের ঘাটতিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগই সম্ভাব্য ক্ষতি কমানোর পথ তৈরি করতে পারে।

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬
পারমাণবিক সংঘাত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার ও জলবায়ু পরিবর্তন - আগামী ৭৫ বছরে মানবজাতির অস্তিত্ব এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে এসব বিষয়কে চিহ্নিত করেছে দ্য ল্যানসেটের একটি বৈশ্বিক মূল্যায়ন। এতে বলা হয়েছে, শিশুদের অপুষ্টি, বায়ুদূষণ এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ও স্বাস্থ্যসহায়তা কমে যাওয়াও ব্যাপক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
দ্য ল্যানসেট কমিশন অন টোয়েন্টি-ফার্স্ট সেঞ্চুরি গ্লোবাল থ্রেটস টু হেলথের মূল্যায়নে মানবস্বাস্থ্যের জন্য মোট ১৭টি বড় হুমকির কথা তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঝুঁকিগুলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। ফলে একটি সমস্যাকে অন্যগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন করে মোকাবিলা করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। তবে প্রতিটি ঝুঁকি কমানোর বাস্তবসম্মত উপায় রয়েছে বলেও জানিয়েছেন তাঁরা।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিকস অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশনের পরিচালক এবং কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক ক্রিস্টোফার মারের ভাষ্য, বর্তমান নেতাদের সিদ্ধান্তই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য ও সুস্থতার ওপর বড় প্রভাব ফেলবে।
কমিশনের মূল্যায়নে পারমাণবিক যুদ্ধ এবং এআই ব্যবহার করে প্রাণঘাতী জৈব অস্ত্র তৈরির ঝুঁকিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এমন ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম হলেও পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ।
পারমাণবিক যুদ্ধের ফলে বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে বিপুল পরিমাণ কণা ছড়িয়ে সূর্যের আলো বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এর প্রভাবে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ও কৃষি উৎপাদনে বড় বিপর্যয় নেমে আসতে পারে, দেখা দিতে পারে ব্যাপক দুর্ভিক্ষ। একইভাবে এআইয়ের সাহায্যে তৈরি প্রাণঘাতী জৈব অস্ত্র মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
প্রতিবেদনের সঙ্গে প্রকাশিত দ্য ল্যানসেটের সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, এসব ঝুঁকি বাস্তবে রূপ নিলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা মহাপ্রলয়ের মতো হতে পারে।
পারমাণবিক সংঘাত ও এআইয়ের অপব্যবহারের বাইরে আরও ১৫টি ঝুঁকি চিহ্নিত করেছে কমিশন। এগুলোর প্রতিটির সঙ্গে সম্মিলিতভাবে ১০০ কোটির বেশি স্বাস্থ্যকর জীবনবর্ষ হারানোর আশঙ্কার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তালিকায় রয়েছে:
· বায়ুদূষণ
· জীবাণুর অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে ওঠা
· শিশুদের অপুষ্টি
· জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিপর্যয়
· প্রচলিত যুদ্ধ ও সংঘাত
· আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ও স্বাস্থ্যসহায়তা কমে যাওয়া
· অতিরিক্ত মদ্যপান
· উচ্চ রক্তচাপ
· আয়বৈষম্য
· নিম্নমানের শিক্ষা ও শিক্ষাগত অর্জনের ঘাটতি
· প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট মহামারি
· স্থূলতা
· মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি
· ধূমপান
· অস্বাস্থ্যকর বার্ধক্য
ঝুঁকিগুলো নির্ধারণের সময় সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি সেগুলো মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগও বিবেচনা করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ নিলে বিপুলসংখ্যক মানুষের সুস্থ জীবন রক্ষা করা সম্ভব বলে মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে।
কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির মাত্রা ৪ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোর বদলে প্রায় ১ দশমিক ৮ ডিগ্রিতে সীমিত রাখা গেলে ১৮৯ কোটি স্বাস্থ্যকর জীবনবর্ষ হারানো ঠেকানো সম্ভব হতে পারে।
এই হিসাবের জন্য প্রতিটি ঝুঁকির সম্ভাব্য সবচেয়ে ভালো ও সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির মডেল তৈরি করা হয়েছে। বর্তমান প্রবণতা বজায় থাকলে কী পরিমাণ স্বাস্থ্যক্ষতি হতে পারে এবং কার্যকর পদক্ষেপে কতটা ক্ষতি এড়ানো সম্ভব, তা তুলনা করে মূল্যায়নটি করা হয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পরিবেশেই সীমাবদ্ধ থাকে না। খাদ্য উৎপাদন, মানুষের জীবনযাপন, রোগের বিস্তার ও স্বাস্থ্যব্যবস্থাও এর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি বড় দাতা দেশ গত এক বছরে বিদেশে সহায়তা খাতে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর ঘোষণা দিয়েছে। কমিশনের আশঙ্কা, আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যসহায়তা ব্যাপকভাবে কমে গেলে বা পুরোপুরি ভেঙে পড়লে ২১০০ সালের আগে সর্বোচ্চ ১৫০ কোটি স্বাস্থ্যকর জীবনবর্ষ হারাতে পারে বিশ্ব।
সম্ভাব্য ক্ষতির প্রায় ৭০ শতাংশ ঘটতে পারে সাহারা-নিম্ন আফ্রিকা অঞ্চলে। শিশুদের অপুষ্টিসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় অঞ্চলটি আগে থেকেই বড় চাপের মধ্যে রয়েছে।
সহায়তা কমে গেলে দরিদ্র দেশগুলোতে স্বাস্থ্যসেবা, রোগ প্রতিরোধ, পুষ্টি কর্মসূচি ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এতে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে স্থূলতা ও মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে। অন্যদিকে, নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে শিক্ষার সুযোগ ও শিক্ষাগত অর্জনের ঘাটতি স্বাস্থ্যক্ষতির গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে।
তাই সব দেশে একই নীতি প্রয়োগ করে এসব সমস্যা মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। অঞ্চলভেদে আর্থসামাজিক বাস্তবতা, স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা ও বিদ্যমান ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে।
অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধক্ষমতা, প্রাকৃতিক মহামারি ও বায়ুদূষণের মতো সমস্যা আবার কোনো একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এ কারণে এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জরুরি।
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের সংক্রামক রোগের মহামারিবিদ্যার অধ্যাপক ও কমিশনের সদস্য ইব্রাহিম আবুবকর জানিয়েছেন, মানবজাতির সামনে থাকা হুমকির তালিকা তুলে ধরার উদ্দেশ্য মানুষকে ভয় দেখানো নয়। বরং নীতিনির্ধারকেরা সম্ভাব্য বিপদের মুখোমুখি হলে কীভাবে পদক্ষেপের মাধ্যমে পরিস্থিতি বদলাতে পারেন, তা বোঝানোই মূল্যায়নের লক্ষ্য।
তাঁর মতে, ঝুঁকিগুলো আগেভাগে শনাক্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া গেলে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। এ জন্য পরিকল্পনা, সম্পদ বরাদ্দ ও দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি প্রয়োজন।
কমিশনের বিশেষজ্ঞরা প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনে বিনিয়োগের পাশাপাশি স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়েছেন। নতুন ঝুঁকি শনাক্ত করা, সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়ন এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সরকারগুলোকে অর্থ ও জনবল বরাদ্দ করতে হবে বলে তাঁদের মত।
অধ্যাপক ক্রিস্টোফার মারে বলেন, তিন বছর আগে কাজ শুরুর সময় তাঁদের ধারণা ছিল সংঘাত, জলবায়ু ও মহামারি - এই তিনটি বড় হুমকি রয়েছে। কিন্তু পরবর্তী মূল্যায়নে উদ্বেগের কারণ হিসেবে আরও অনেক ঝুঁকি উঠে এসেছে।
৩৫ জন বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে গঠিত কমিশনের মূল্যায়নটি জার্মানির বার্লিনে অনুষ্ঠিতব্য ওয়ার্ল্ড হেলথ সামিটে উপস্থাপনের কথা রয়েছে। নতুন তথ্য, পরিবর্তিত পরিস্থিতি ও উদ্ভূত বিপদের ভিত্তিতে ১৭টি ঝুঁকির তালিকা প্রতিবছর হালনাগাদ করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য ও জীবন রক্ষায় বড় সংঘাত বা প্রযুক্তিগত বিপর্যয়ের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন, অপুষ্টি, বৈষম্য, রোগব্যাধি এবং স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগের ঘাটতিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগই সম্ভাব্য ক্ষতি কমানোর পথ তৈরি করতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন