সংবাদ

সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত : একই জমিতে মসজিদ ও মন্দির


প্রতিনিধি, সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ)
প্রতিনিধি, সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ)
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৪২ এএম

সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত : একই জমিতে মসজিদ ও মন্দির
ছবি : সংবাদ

ইতিহাস ও ঐতিহ্যের রাজধানী নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক চমৎকার দৃষ্টান্ত হয়ে শত শত বছর ধরে একই আঙিনায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে একটি প্রাচীন মন্দির ও একটি ঐতিহাসিক মসজিদ। ধর্মীয় উৎসব, আচার-অনুষ্ঠান ও বিশ্বাসের ধরন আলাদা হলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর গভীর সহনশীলতার মধ্য দিয়ে এখানে পাশাপাশি ধর্মীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছেন হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ।

উপজেলার মোগরাপাড়া ইউনিয়নের মাঝিবাড়ি এলাকায় কয়েক শ বছর ধরে এক অভূতপূর্ব সহাবস্থানে রয়েছে 'ইউসুফগঞ্জ জামে মসজিদ' এবং একই সীমানায় 'শ্রী শ্রী সাধুবাবা শম্ভুনাথ ব্রহ্মচারীর সমাধি ও মন্দির'। প্রতিদিন মসজিদ থেকে ভেসে আসে পবিত্র আজানের ধ্বনি, আর অন্যদিকে শোনা যায় মন্দিরের উলুধ্বনি ও শঙ্খনাদ। এ ছাড়া সমাধি ও মন্দিরের সকল অনুষ্ঠানের পাশাপাশি গত প্রায় এক যুগ (১২ বছর) ধরে এখানে নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা।

ইতিহাসসূত্রে জানা যায়, ইউসুফগঞ্জের এই মসজিদটি সুলতানি আমলে নির্মিত হয়। 'শ্রী শ্রী সাধুবাবা শম্ভুনাথ ব্রহ্মচারীর সমাধি ও মন্দিরের' সেবায়েত ও মন্দির দুর্গাপূজা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক শ্রী রাজয় দাস হরি জানান, মাঝিবাড়ির এই জমিতে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠার কিছু দিন আগে বা পরে মুসলমানেরা তাঁদের প্রার্থনার জন্য পাশাপাশি মসজিদটি নির্মাণ করেন।

একই জমিতে ইউসুফগঞ্জ মসজিদ ও মন্দির প্রতিষ্ঠার এই অনন্য ও সম্প্রীতিময় সহাবস্থানের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন মূলত ‘মুক্তাকেশী মাঝি’ নামের মাঝিবাড়ির এক মহীয়সী নারী। যিনি ছিলেন উদার মনের অধিকারী ও এই মন্দিরের সেবায়েত। শত শত বছর আগের জমিদারী এস্টেট পরিবারের সূত্রে তিনি এখানকার জমির মালিক হন। তিনি ধর্মীয় ভেদাভেদ ভুলে একই সীমানার মধ্যে প্রতিষ্ঠিত মসজিদের জন্য ১০ শতাংশ এবং শ্রী শ্রী সাধুবাবা শম্ভুনাথ ব্রহ্মচারীর মন্দির ও আশ্রমের জন্য ৫ শতাংশ সম্পত্তি দান করেন। তার এই উদার ও দূরদর্শী মানসিকতার কারণেই আজ এখানে সম্প্রীতির আলো ছড়াচ্ছে।

ঐতিহাসিক এই মন্দিরে সনাতন ধর্মীয় যাবতীয় পূজা-পার্বণ অত্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে পালিত হয়। এ ছাড়া প্রতি রবিবার নাম সংকীর্তন, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা পাঠ ও আধ্যাত্মিক আলোচনার মাধ্যমে এখানে সাধু বাবার 'হরিবাসর' অনুষ্ঠিত হয়। পাশাপাশি প্রায় ১২ বছর আগে এই আঙিনায় শুরু হওয়া শারদীয় দুর্গাপূজা এখন এলাকার অন্যতম প্রধান উৎসবে পরিণত হয়েছে। দুর্গাপূজা উপলক্ষে উদযাপন কমিটির পক্ষ থেকে দর্শনার্থীদের জন্য প্রতিদিন প্রসাদ বিতরণের ব্যবস্থা করা হয়।

ইউসুফগঞ্জ জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা ইয়াসিন ও মসজিদ পরিচালনা কমিটির দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা জানান, এখানে ধর্ম নিয়ে কোনো বিভেদ নেই। তারা পরস্পরের ধর্মীয় অনুভূতিকে সর্বোচ্চ সম্মান জানান। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পূজার সময় মসজিদে নামাজ বা জিকির-আজকারে কোনো সমস্যা হয় না। আজান ও নামাজের সময় হলে পূজা কমিটির উদ্যোক্তারা সাময়িকভাবে বাদ্যযন্ত্র বন্ধ রাখেন এবং নামাজ শেষে পুনরায় তাদের ধর্মীয় কার্যক্রম শুরু করেন।

মন্দিরের দুর্গাপূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি বিশ্বনাথ দত্ত বলেন, “এই পবিত্র ভূমি আমাদের দুই সম্প্রদায়ের মাঝে এক নিবিড় আত্মিক বন্ধন তৈরি করেছে। এখানে ধর্ম যার যার হলেও উৎসবের আনন্দ এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্য সবার।”

একই আঙিনায় আজান, নামাজ ও পূজার সহাবস্থান মোগরাপাড়া তথা সোনারগাঁ এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের গৌরব ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের এক জীবন্ত প্রতীক।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬


সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত : একই জমিতে মসজিদ ও মন্দির

প্রকাশের তারিখ : ২০ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

ইতিহাস ও ঐতিহ্যের রাজধানী নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক চমৎকার দৃষ্টান্ত হয়ে শত শত বছর ধরে একই আঙিনায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে একটি প্রাচীন মন্দির ও একটি ঐতিহাসিক মসজিদ। ধর্মীয় উৎসব, আচার-অনুষ্ঠান ও বিশ্বাসের ধরন আলাদা হলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর গভীর সহনশীলতার মধ্য দিয়ে এখানে পাশাপাশি ধর্মীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছেন হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ।

উপজেলার মোগরাপাড়া ইউনিয়নের মাঝিবাড়ি এলাকায় কয়েক শ বছর ধরে এক অভূতপূর্ব সহাবস্থানে রয়েছে 'ইউসুফগঞ্জ জামে মসজিদ' এবং একই সীমানায় 'শ্রী শ্রী সাধুবাবা শম্ভুনাথ ব্রহ্মচারীর সমাধি ও মন্দির'। প্রতিদিন মসজিদ থেকে ভেসে আসে পবিত্র আজানের ধ্বনি, আর অন্যদিকে শোনা যায় মন্দিরের উলুধ্বনি ও শঙ্খনাদ। এ ছাড়া সমাধি ও মন্দিরের সকল অনুষ্ঠানের পাশাপাশি গত প্রায় এক যুগ (১২ বছর) ধরে এখানে নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা।

ইতিহাসসূত্রে জানা যায়, ইউসুফগঞ্জের এই মসজিদটি সুলতানি আমলে নির্মিত হয়। 'শ্রী শ্রী সাধুবাবা শম্ভুনাথ ব্রহ্মচারীর সমাধি ও মন্দিরের' সেবায়েত ও মন্দির দুর্গাপূজা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক শ্রী রাজয় দাস হরি জানান, মাঝিবাড়ির এই জমিতে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠার কিছু দিন আগে বা পরে মুসলমানেরা তাঁদের প্রার্থনার জন্য পাশাপাশি মসজিদটি নির্মাণ করেন।

একই জমিতে ইউসুফগঞ্জ মসজিদ ও মন্দির প্রতিষ্ঠার এই অনন্য ও সম্প্রীতিময় সহাবস্থানের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন মূলত ‘মুক্তাকেশী মাঝি’ নামের মাঝিবাড়ির এক মহীয়সী নারী। যিনি ছিলেন উদার মনের অধিকারী ও এই মন্দিরের সেবায়েত। শত শত বছর আগের জমিদারী এস্টেট পরিবারের সূত্রে তিনি এখানকার জমির মালিক হন। তিনি ধর্মীয় ভেদাভেদ ভুলে একই সীমানার মধ্যে প্রতিষ্ঠিত মসজিদের জন্য ১০ শতাংশ এবং শ্রী শ্রী সাধুবাবা শম্ভুনাথ ব্রহ্মচারীর মন্দির ও আশ্রমের জন্য ৫ শতাংশ সম্পত্তি দান করেন। তার এই উদার ও দূরদর্শী মানসিকতার কারণেই আজ এখানে সম্প্রীতির আলো ছড়াচ্ছে।

ঐতিহাসিক এই মন্দিরে সনাতন ধর্মীয় যাবতীয় পূজা-পার্বণ অত্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে পালিত হয়। এ ছাড়া প্রতি রবিবার নাম সংকীর্তন, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা পাঠ ও আধ্যাত্মিক আলোচনার মাধ্যমে এখানে সাধু বাবার 'হরিবাসর' অনুষ্ঠিত হয়। পাশাপাশি প্রায় ১২ বছর আগে এই আঙিনায় শুরু হওয়া শারদীয় দুর্গাপূজা এখন এলাকার অন্যতম প্রধান উৎসবে পরিণত হয়েছে। দুর্গাপূজা উপলক্ষে উদযাপন কমিটির পক্ষ থেকে দর্শনার্থীদের জন্য প্রতিদিন প্রসাদ বিতরণের ব্যবস্থা করা হয়।

ইউসুফগঞ্জ জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা ইয়াসিন ও মসজিদ পরিচালনা কমিটির দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা জানান, এখানে ধর্ম নিয়ে কোনো বিভেদ নেই। তারা পরস্পরের ধর্মীয় অনুভূতিকে সর্বোচ্চ সম্মান জানান। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পূজার সময় মসজিদে নামাজ বা জিকির-আজকারে কোনো সমস্যা হয় না। আজান ও নামাজের সময় হলে পূজা কমিটির উদ্যোক্তারা সাময়িকভাবে বাদ্যযন্ত্র বন্ধ রাখেন এবং নামাজ শেষে পুনরায় তাদের ধর্মীয় কার্যক্রম শুরু করেন।

মন্দিরের দুর্গাপূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি বিশ্বনাথ দত্ত বলেন, “এই পবিত্র ভূমি আমাদের দুই সম্প্রদায়ের মাঝে এক নিবিড় আত্মিক বন্ধন তৈরি করেছে। এখানে ধর্ম যার যার হলেও উৎসবের আনন্দ এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্য সবার।”

একই আঙিনায় আজান, নামাজ ও পূজার সহাবস্থান মোগরাপাড়া তথা সোনারগাঁ এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের গৌরব ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের এক জীবন্ত প্রতীক।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত