সংবাদ

‘আমার সুইটিরে আইনা দ্যাও, আমি ওরে দেহুম’


প্রতিনিধি, মির্জাপুর (টাঙ্গাইল)
প্রতিনিধি, মির্জাপুর (টাঙ্গাইল)
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৩১ পিএম

‘আমার সুইটিরে আইনা দ্যাও, আমি ওরে দেহুম’
প্রতীকী ছবি।

অভাবের তাড়নায় ভাগ্য বদলের আশায় বুক বেঁধেছিলেন টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার হতদরিদ্র ঘরের মেয়ে সুইটি আক্তার। অষ্টম শ্রেণীতে পড়ার সময়েই বিয়ে হয়েছিল তার। সেই সংসার আরও টেকেনি। ফলে একমাত্র কন্যাসন্তানকে বুকে আগলে ফিরেছিলেন বাবার ভিটায়।

পাঁচ বোনের মধ্যে সবার ছোট ছিলেন সুইটি। পরিবারের চাপ আর পেটের দায়ে এরপর দ্বিতীয় বিয়ে হলেও কপাল সেখানেও ফেরেনি। স্বামী সৌদি আরব যাওয়ার পর সব যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। কুলকিনারা না পেয়ে অবুঝ মেয়ের ভবিষ্যৎ আর পরিবারের নুন আনতে পান্তা ফুরানো সংসার সচল করতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিন বছর আগে পাড়ি জেমছিলেন প্রবাসে। কিন্তু কে জানত, সেই প্রবাস জীবনই তার শেষ ঠিকানা হয়ে দাঁড়াবে?

পরিবারের সঙ্গে শেষ কথা হওয়ার দু’দিনের মাথায় সৌদি আরবের কারাগারে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে সুইটি আক্তারের। পবিত্র মক্কা নগরীর একটি মসজিদে অনৈতিক কাজের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করার কথা বলে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে গত ১৪ অক্টোবর এই মর্মান্তিক সংবাদ প্রকাশ করে সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ)।

সেই খবর শোনার পর থেকে মির্জাপুরের সেই বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। ঘরের বারান্দায় বসে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন মা জহুরা বেগম। মেয়ের কথা বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়ে বুক চাপড়ে তিনি বলেন, ‘আমি কেমনে বাঁচুম? আমার সুইটিরে আইনা দ্যাও।’

একটুখানি দম নিয়ে জহুরা বেগম চিৎকার দিয়ে ওঠেন। বলেন, ‘মা তুই কত দুঃখ পাইয়া গেছস, কেউর কাছে কইলি না। আমার কাছেও কইলি না... আমার মাইয়ার লাশ আইনা দাও। আমি ওরে দেহুম।’

সুইটির বাবা মো. ফজল মিয়া। মাটি কেটে সংসার চালানো অতি সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, ২০২৩ সালের মার্চে একটি এজেন্সির মাধ্যমে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ নিয়ে সৌদি গিয়েছিলেন সুইটি। যাওয়ার পর প্রথম ছয় মাস নিয়মিত কথা হয়। তবে হঠাৎ একদিন জেলখানা থেকে ফোন করে মেয়ে জানায়, সঙ্গে কাজ করা অন্য নারীরা অবৈধভাবে একটি গাড়ি কেনায় তাদের সঙ্গে তাকেও অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। 

ফজল মিয়ার ভাষ্য, সেই ঘটনার পর থেকে কখনো এক সপ্তাহ, কখনো এক মাস পর যোগাযোগ হতো। মেয়ের বিরুদ্ধে আনা এই অভিযোগ পরিবার কোনোভাবেই বিশ্বাস করে না; তাদের দৃঢ় বিশ্বাস, সুইটি কোনো গভীর ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন।

সুইটির বাবা আরও জানান, দীর্ঘ এক বছর যোগাযোগ বন্ধ থাকার পর জেলখানা থেকেই ফের চার মাস নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছিল সুইটি। সর্বশেষ গত ১৩ অক্টোবর মাগরিবের নামাজের পর বাবার সঙ্গে তার শেষ কথা হয়। কিন্তু সেদিনও মৃত্যুর পরোয়ানা বা বিচার নিয়ে একটি টু শব্দও করেনি সে। শুধু বলেছিল, ফোন দিতে না পারলে যেন পরিবার দুশ্চিন্তা না করে। অথচ তার দুদিন পরই এল চিরবিদায়ের নির্মম বার্তা।

সুইটির চাচাতো বোন সালমা আক্তার বলেন, ‘আমার চাচায় মাটি কাইট্যা ভাত খায়। অভাবের সংসার। ওর যে এই অবস্থা অইবো, জানলে কি আর বিদেশে যাইবার দিতাম।’ 

মির্জাপুরের সেই বাড়িতে শোকের মাতম

সুইটির রেখে যাওয়া ৯ বছরের শিশুকন্যাটি এখন স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ে। মায়ের কোলছাড়া সেই অবুঝ শিশুটি এখনো জানে না তার পৃথিবীটা কতখানি শূন্য হয়ে গেছে।

মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জহুরুল আলম বলেন তারা সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার বিষয়টি জেনেছেন।

সংসারের অভাব ঘোচাতে গিয়ে লাশ হয়ে কফিনবন্দী হয়ে দেশে ফেরার অপেক্ষায় থাকা সুইটির এই করুণ পরিণতি কেবল একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ নয়, এটি প্রবাসের মাটিতে অসহায় এক নারীর জীবন সংগ্রামের এক নিদারুণ ট্র্যাজেডি।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬


‘আমার সুইটিরে আইনা দ্যাও, আমি ওরে দেহুম’

প্রকাশের তারিখ : ২০ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

অভাবের তাড়নায় ভাগ্য বদলের আশায় বুক বেঁধেছিলেন টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার হতদরিদ্র ঘরের মেয়ে সুইটি আক্তার। অষ্টম শ্রেণীতে পড়ার সময়েই বিয়ে হয়েছিল তার। সেই সংসার আরও টেকেনি। ফলে একমাত্র কন্যাসন্তানকে বুকে আগলে ফিরেছিলেন বাবার ভিটায়।

পাঁচ বোনের মধ্যে সবার ছোট ছিলেন সুইটি। পরিবারের চাপ আর পেটের দায়ে এরপর দ্বিতীয় বিয়ে হলেও কপাল সেখানেও ফেরেনি। স্বামী সৌদি আরব যাওয়ার পর সব যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। কুলকিনারা না পেয়ে অবুঝ মেয়ের ভবিষ্যৎ আর পরিবারের নুন আনতে পান্তা ফুরানো সংসার সচল করতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিন বছর আগে পাড়ি জেমছিলেন প্রবাসে। কিন্তু কে জানত, সেই প্রবাস জীবনই তার শেষ ঠিকানা হয়ে দাঁড়াবে?

পরিবারের সঙ্গে শেষ কথা হওয়ার দু’দিনের মাথায় সৌদি আরবের কারাগারে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে সুইটি আক্তারের। পবিত্র মক্কা নগরীর একটি মসজিদে অনৈতিক কাজের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করার কথা বলে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে গত ১৪ অক্টোবর এই মর্মান্তিক সংবাদ প্রকাশ করে সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ)।

সেই খবর শোনার পর থেকে মির্জাপুরের সেই বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। ঘরের বারান্দায় বসে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন মা জহুরা বেগম। মেয়ের কথা বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়ে বুক চাপড়ে তিনি বলেন, ‘আমি কেমনে বাঁচুম? আমার সুইটিরে আইনা দ্যাও।’

একটুখানি দম নিয়ে জহুরা বেগম চিৎকার দিয়ে ওঠেন। বলেন, ‘মা তুই কত দুঃখ পাইয়া গেছস, কেউর কাছে কইলি না। আমার কাছেও কইলি না... আমার মাইয়ার লাশ আইনা দাও। আমি ওরে দেহুম।’

সুইটির বাবা মো. ফজল মিয়া। মাটি কেটে সংসার চালানো অতি সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, ২০২৩ সালের মার্চে একটি এজেন্সির মাধ্যমে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ নিয়ে সৌদি গিয়েছিলেন সুইটি। যাওয়ার পর প্রথম ছয় মাস নিয়মিত কথা হয়। তবে হঠাৎ একদিন জেলখানা থেকে ফোন করে মেয়ে জানায়, সঙ্গে কাজ করা অন্য নারীরা অবৈধভাবে একটি গাড়ি কেনায় তাদের সঙ্গে তাকেও অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। 

ফজল মিয়ার ভাষ্য, সেই ঘটনার পর থেকে কখনো এক সপ্তাহ, কখনো এক মাস পর যোগাযোগ হতো। মেয়ের বিরুদ্ধে আনা এই অভিযোগ পরিবার কোনোভাবেই বিশ্বাস করে না; তাদের দৃঢ় বিশ্বাস, সুইটি কোনো গভীর ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন।

সুইটির বাবা আরও জানান, দীর্ঘ এক বছর যোগাযোগ বন্ধ থাকার পর জেলখানা থেকেই ফের চার মাস নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছিল সুইটি। সর্বশেষ গত ১৩ অক্টোবর মাগরিবের নামাজের পর বাবার সঙ্গে তার শেষ কথা হয়। কিন্তু সেদিনও মৃত্যুর পরোয়ানা বা বিচার নিয়ে একটি টু শব্দও করেনি সে। শুধু বলেছিল, ফোন দিতে না পারলে যেন পরিবার দুশ্চিন্তা না করে। অথচ তার দুদিন পরই এল চিরবিদায়ের নির্মম বার্তা।

সুইটির চাচাতো বোন সালমা আক্তার বলেন, ‘আমার চাচায় মাটি কাইট্যা ভাত খায়। অভাবের সংসার। ওর যে এই অবস্থা অইবো, জানলে কি আর বিদেশে যাইবার দিতাম।’ 

মির্জাপুরের সেই বাড়িতে শোকের মাতম

সুইটির রেখে যাওয়া ৯ বছরের শিশুকন্যাটি এখন স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ে। মায়ের কোলছাড়া সেই অবুঝ শিশুটি এখনো জানে না তার পৃথিবীটা কতখানি শূন্য হয়ে গেছে।

মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জহুরুল আলম বলেন তারা সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার বিষয়টি জেনেছেন।

সংসারের অভাব ঘোচাতে গিয়ে লাশ হয়ে কফিনবন্দী হয়ে দেশে ফেরার অপেক্ষায় থাকা সুইটির এই করুণ পরিণতি কেবল একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ নয়, এটি প্রবাসের মাটিতে অসহায় এক নারীর জীবন সংগ্রামের এক নিদারুণ ট্র্যাজেডি।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত