সংবাদ

করুণা নয়, নিজের দক্ষতায় আজ সফল বায়েজিদ


প্রতিনিধি, সাতক্ষীরা
প্রতিনিধি, সাতক্ষীরা
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৪২ পিএম

করুণা নয়, নিজের দক্ষতায় আজ সফল বায়েজিদ
বায়েজিদ হাসান। ছবি : সংবাদ

জন্মগত শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ও চাকরি না পাওয়ার হতাশা–কোনোটিই দমিয়ে রাখতে পারেনি মোহাম্মদ বায়েজিদ হাসানকে। মানুষের করুণার ওপর নির্ভর না করে নিজের মেধা, শ্রম ও ইচ্ছাশক্তিতে গড়ে তুলেছেন কর্মসংস্থান। কম্পিউটারের কাজ করে জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি সামলান সংসারের দায়িত্ব। নিজে স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি এলাকার অন্যদেরও কম্পিউটারের কাজ শিখিয়ে কর্মসংস্থানের পথ দেখাচ্ছেন সাতক্ষীরার এই উদ্যমী তরুণ।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার কামালনগর গ্রামের সন্তান বায়েজিদ জন্ম থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার। শৈশবে দুই পায়ের গঠন স্বাভাবিক ছিল না। ছয় বছর বয়সে ঢাকার পিজি হাসপাতালে তার দুই পায়ে অস্ত্রোপচার করা হয়। দীর্ঘ অনুশীলনের পর লাঠির সাহায্যে হাঁটতে শেখেন তিনি।

বায়েজিদের মা ফরিদা রহমান ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে কখনো হাল ছাড়েননি। সমাজের নানা কথা উপেক্ষা করে ছেলেকে শিক্ষিত করে তোলার উদ্যোগ নেন তিনি। ফরিদা রহমান বলেন, “মানুষ বলত, ছেলে প্রতিবন্ধী, তাকে লেখাপড়া করিয়ে কী হবে? আমি বলতাম, তবুও সে সমাজের একজন হবে, তার একটা পরিচয় থাকবে। আমি কখনো চাইনি আমার ছেলে রাস্তায় বসে মানুষের কাছে হাত পাতুক। আমি চেয়েছি, সে লেখাপড়া শিখে নিজের পায়ে দাঁড়াক।”

মায়ের সেই স্বপ্ন পূরণে অবিচল থেকে লেখাপড়া চালিয়ে যান বায়েজিদ। ১৯৯৭ সালে সাতক্ষীরা পিএন হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করার পর উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। এরপর সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ থেকে বাংলায় অনার্স এবং খুলনার বিএল কলেজ থেকে ২০০৬ সালে বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। উচ্চশিক্ষা শেষে একাধিকবার চাকরির পরীক্ষায় অংশ নিলেও শেষ পর্যন্ত চাকরি মেলেনি।

তবে দমে যাননি বায়েজিদ। ২০০৮ সালে শুরু করেন কম্পিউটারের ব্যবসা। বর্তমানে তার দোকানে ই-জিপি ও ই-টেন্ডার, পাসপোর্ট ও ভিসা-সংক্রান্ত কাজ এবং বিভিন্ন সরকারি চাকরির আবেদন পূরণসহ নানা ধরনের ডিজিটাল সেবা দেওয়া হয়। এই আয়েই চলে তার সংসার। ২০০৯ সালে বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের দায়িত্ব আরও বাড়ে। বর্তমানে স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে তার সংসার।

বায়েজিদ হাসান বলেন, “আমার জীবন-জীবিকা সম্পূর্ণভাবে এই কম্পিউটারের দোকানের ওপর নির্ভরশীল। এই কাজের আয় দিয়েই সংসার চলে। আমি আমার দুই বন্ধুকে কম্পিউটারের কাজ শিখিয়েছি। তারা এখন এই কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। আমার জীবনের অর্জনের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান আমার মা ও পরিবারের।”

স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আব্দুর রহমান সিদ্দিক জানান, বায়েজিদ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কম্পিউটারের কাজ করেন। ব্যক্তিগত নানা প্রয়োজনে তিনি তার কাছে যান। নিজের পরিশ্রমে সংসার চালানো বায়েজিদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করেন তিনি।

আরেক স্থানীয় বাসিন্দা শেখ মমতাজ আহমেদ বলেন, প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও বায়েজিদ লেখাপড়া শিখে কম্পিউটারের কাজের মাধ্যমে নিজের কর্মসংস্থান তৈরি করেছেন। তার এই উদ্যোগ সমাজের জন্য অনুকরণীয়। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান ও স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ তৈরিতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আরও এগিয়ে আসা উচিত।

বায়েজিদের চমৎকার ব্যবহার ও আচরণের প্রশংসা করেন প্রান্ত সরকার। তার মতে, মানুষের সঙ্গে সুন্দর ব্যবহার ও কাজের প্রতি আন্তরিকতা বায়েজিদকে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।

বায়েজিদ প্রতিবন্ধী শিশুদের পরিবারকে তাদের সন্তানদের লেখাপড়া শেখানোর আহ্বান জানান। একই সঙ্গে সরকারের প্রতি প্রতিবন্ধী শিশু ও তরুণদের প্রশিক্ষণ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।

বায়েজিদের জীবনসংগ্রাম প্রমাণ করে, যথাযথ শিক্ষা, পারিবারিক সহযোগিতা ও কাজের সুযোগ পেলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা আত্মনির্ভরশীল হয়ে পরিবার ও সমাজের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন। তার প্রত্যাশা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতি করুণার দৃষ্টিভঙ্গি নয়, বরং তাদের যোগ্যতা ও কাজের মূল্যায়ন করা হোক।

/ 

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬


করুণা নয়, নিজের দক্ষতায় আজ সফল বায়েজিদ

প্রকাশের তারিখ : ২৭ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

জন্মগত শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ও চাকরি না পাওয়ার হতাশা–কোনোটিই দমিয়ে রাখতে পারেনি মোহাম্মদ বায়েজিদ হাসানকে। মানুষের করুণার ওপর নির্ভর না করে নিজের মেধা, শ্রম ও ইচ্ছাশক্তিতে গড়ে তুলেছেন কর্মসংস্থান। কম্পিউটারের কাজ করে জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি সামলান সংসারের দায়িত্ব। নিজে স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি এলাকার অন্যদেরও কম্পিউটারের কাজ শিখিয়ে কর্মসংস্থানের পথ দেখাচ্ছেন সাতক্ষীরার এই উদ্যমী তরুণ।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার কামালনগর গ্রামের সন্তান বায়েজিদ জন্ম থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার। শৈশবে দুই পায়ের গঠন স্বাভাবিক ছিল না। ছয় বছর বয়সে ঢাকার পিজি হাসপাতালে তার দুই পায়ে অস্ত্রোপচার করা হয়। দীর্ঘ অনুশীলনের পর লাঠির সাহায্যে হাঁটতে শেখেন তিনি।

বায়েজিদের মা ফরিদা রহমান ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে কখনো হাল ছাড়েননি। সমাজের নানা কথা উপেক্ষা করে ছেলেকে শিক্ষিত করে তোলার উদ্যোগ নেন তিনি। ফরিদা রহমান বলেন, “মানুষ বলত, ছেলে প্রতিবন্ধী, তাকে লেখাপড়া করিয়ে কী হবে? আমি বলতাম, তবুও সে সমাজের একজন হবে, তার একটা পরিচয় থাকবে। আমি কখনো চাইনি আমার ছেলে রাস্তায় বসে মানুষের কাছে হাত পাতুক। আমি চেয়েছি, সে লেখাপড়া শিখে নিজের পায়ে দাঁড়াক।”

মায়ের সেই স্বপ্ন পূরণে অবিচল থেকে লেখাপড়া চালিয়ে যান বায়েজিদ। ১৯৯৭ সালে সাতক্ষীরা পিএন হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করার পর উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। এরপর সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ থেকে বাংলায় অনার্স এবং খুলনার বিএল কলেজ থেকে ২০০৬ সালে বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। উচ্চশিক্ষা শেষে একাধিকবার চাকরির পরীক্ষায় অংশ নিলেও শেষ পর্যন্ত চাকরি মেলেনি।

তবে দমে যাননি বায়েজিদ। ২০০৮ সালে শুরু করেন কম্পিউটারের ব্যবসা। বর্তমানে তার দোকানে ই-জিপি ও ই-টেন্ডার, পাসপোর্ট ও ভিসা-সংক্রান্ত কাজ এবং বিভিন্ন সরকারি চাকরির আবেদন পূরণসহ নানা ধরনের ডিজিটাল সেবা দেওয়া হয়। এই আয়েই চলে তার সংসার। ২০০৯ সালে বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের দায়িত্ব আরও বাড়ে। বর্তমানে স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে তার সংসার।

বায়েজিদ হাসান বলেন, “আমার জীবন-জীবিকা সম্পূর্ণভাবে এই কম্পিউটারের দোকানের ওপর নির্ভরশীল। এই কাজের আয় দিয়েই সংসার চলে। আমি আমার দুই বন্ধুকে কম্পিউটারের কাজ শিখিয়েছি। তারা এখন এই কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। আমার জীবনের অর্জনের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান আমার মা ও পরিবারের।”

স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আব্দুর রহমান সিদ্দিক জানান, বায়েজিদ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কম্পিউটারের কাজ করেন। ব্যক্তিগত নানা প্রয়োজনে তিনি তার কাছে যান। নিজের পরিশ্রমে সংসার চালানো বায়েজিদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করেন তিনি।

আরেক স্থানীয় বাসিন্দা শেখ মমতাজ আহমেদ বলেন, প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও বায়েজিদ লেখাপড়া শিখে কম্পিউটারের কাজের মাধ্যমে নিজের কর্মসংস্থান তৈরি করেছেন। তার এই উদ্যোগ সমাজের জন্য অনুকরণীয়। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান ও স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ তৈরিতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আরও এগিয়ে আসা উচিত।

বায়েজিদের চমৎকার ব্যবহার ও আচরণের প্রশংসা করেন প্রান্ত সরকার। তার মতে, মানুষের সঙ্গে সুন্দর ব্যবহার ও কাজের প্রতি আন্তরিকতা বায়েজিদকে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।

বায়েজিদ প্রতিবন্ধী শিশুদের পরিবারকে তাদের সন্তানদের লেখাপড়া শেখানোর আহ্বান জানান। একই সঙ্গে সরকারের প্রতি প্রতিবন্ধী শিশু ও তরুণদের প্রশিক্ষণ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।

বায়েজিদের জীবনসংগ্রাম প্রমাণ করে, যথাযথ শিক্ষা, পারিবারিক সহযোগিতা ও কাজের সুযোগ পেলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা আত্মনির্ভরশীল হয়ে পরিবার ও সমাজের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন। তার প্রত্যাশা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতি করুণার দৃষ্টিভঙ্গি নয়, বরং তাদের যোগ্যতা ও কাজের মূল্যায়ন করা হোক।

/ 


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত