কোনো দেশ বা জাতির উন্নতির অন্যতম পূর্বশর্ত হলো সুষ্ঠু শিক্ষাব্যবস্থা। আর একটি সুষ্ঠু শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট শিক্ষানীতি। এই নীতির আলোকে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালিত ও বাস্তবায়িত হয়।
শিক্ষানীতি কী?
শিক্ষানীতি হলো শিক্ষার লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম পরিচালনা, কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দিকনির্দেশনা। বাংলাদেশে শিল্প, বাণিজ্য ও প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। শিক্ষানীতি এসব নীতিমালার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ।
সাধারণভাবে শিক্ষা বলতে মানুষের জ্ঞান, দক্ষতা, চিন্তাভাবনা ও আচরণে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনকে বোঝায়। অন্যদিকে, শিক্ষানীতি হলো একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনার আলোকে শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন স্তর পরিচালনা এবং দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের উপযুক্ত শিক্ষা নিশ্চিত করার দিকনির্দেশনা।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করার নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে একটি সুসংহত ও দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে নানা সীমাবদ্ধতা দেখা গেছে।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হলো জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০। এটি প্রণয়নের এক দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। তাই এখন এ নীতির বাস্তবায়ন কতটা হয়েছে, তা পর্যালোচনা করা জরুরি। এই নীতিতে শিক্ষার সমতা, গুণগত মান, সবার জন্য শিক্ষার সুযোগ এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার অঙ্গীকার করা হয়েছিল। প্রশ্ন হলো, সেই অঙ্গীকার কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে এবং কোথায় সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে?
জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০
জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ স্বাধীন বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও রূপান্তরের লক্ষ্যে প্রণীত একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। অধ্যাপক কবির চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত শিক্ষা কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে নীতিটি চূড়ান্ত করা হয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল নৈতিক, মানবিক, বিজ্ঞানমনস্ক, অসাম্প্রদায়িক ও দেশপ্রেমিক নাগরিক গড়ে তোলা।
মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
ক. সাংবিধানিক নির্দেশনা বাস্তবায়ন: শিক্ষার সব স্তরে সংবিধানের নির্দেশনার প্রতিফলন ঘটানো এবং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় শিক্ষার্থীদের সচেতন করে তোলা।
খ. মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধ: শিক্ষার্থীদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, দেশপ্রেম, মানবিকতা ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের মানসিকতা তৈরি করা।
গ. চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীলতার বিকাশ: মুখস্থবিদ্যার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে শিক্ষার্থীদের স্বাধীন চিন্তা, যুক্তিবোধ ও সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটানো।
ঘ. তথ্যপ্রযুক্তি ও বিজ্ঞানশিক্ষা: দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি এবং উৎপাদনমুখী বিজ্ঞানশিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া।
ঙ. বৈষম্যহীন ও মানসম্মত শিক্ষা: সব নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি এবং বৈষম্যহীন, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা।
সমস্যা চিহ্নিতকরণ ও সমাধানের প্রস্তাব
শিক্ষানীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল সবার জন্য শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা এবং শিক্ষাকে জাতীয় উন্নয়নের চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তোলা। এ ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতি হয়েছে। প্রাথমিক স্তরে ভর্তির সুযোগ বেড়েছে, বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার হার কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং নারীশিক্ষার প্রসার ঘটেছে। অনেক এলাকায় বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও অংশগ্রহণেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।
তবে এসব অগ্রগতির পাশাপাশি নানা সীমাবদ্ধতাও রয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে অবকাঠামোগত সংকট, শিক্ষকঘাটতি ও শিক্ষার মানের বৈষম্য। শহর ও গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সুযোগ-সুবিধায় এখনো বড় পার্থক্য রয়েছে। অনেক বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, বিজ্ঞানাগার ও প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ নেই। শিক্ষকের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি তাদের মানসম্মত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করাও জরুরি।
শিক্ষাকে কর্মমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক করার লক্ষ্য থাকলেও বাস্তবে অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনা শেষ করে কর্মসংস্থান খুঁজে পেতে সমস্যায় পড়েন। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সুযোগও প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়েনি। ফলে একদিকে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে চাকরির বাজারে প্রয়োজনীয় দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীর ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো শিক্ষায় পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দের অভাব। দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দীর্ঘদিন ধরেই কম। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিভিন্ন মানদণ্ডে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৪ থেকে ৬ শতাংশ ব্যয়ের সুপারিশ করা হয়। বাংলাদেশে এ লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে বরাদ্দের বড় ব্যবধান রয়েছে। অর্থের সীমাবদ্ধতায় অনেক পরিকল্পনা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না।
শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা যায়নি। তাই সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
১. নীতিগত ও রাজনৈতিক উদ্যোগ
ক. স্বাধীন শিক্ষা কমিশন গঠন: রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, স্থায়ী ও স্বায়ত্তশাসিত জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন করা যেতে পারে। কমিশনটি রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে থেকে দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষানীতির বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন করবে।
খ. শিক্ষানীতির ধারাবাহিকতা রক্ষা: সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষানীতি ও শিক্ষাক্রমে আমূল পরিবর্তন করা উচিত নয়। আগের নীতির কার্যকর দিকগুলো বজায় রেখে প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধন করতে হবে। এতে শিক্ষাব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা আসবে।
২. অবকাঠামোগত উন্নয়ন
ক. শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি: শিক্ষার মানোন্নয়ন ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পর্যায়ক্রমে বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন।
খ. দুর্নীতি ও অপচয় রোধ: শিক্ষা প্রশাসনের সব স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বরাদ্দ করা অর্থের যথাযথ ব্যবহার এবং উন্নয়নকাজের মান নিয়মিত তদারক করতে হবে।
গ. পিছিয়ে পড়া অঞ্চলে সুযোগ সৃষ্টি: শহর ও গ্রামের শিক্ষাবৈষম্য কমাতে প্রত্যন্ত ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। পথশিশু, প্রতিবন্ধী ও অন্যান্য সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীর জন্য উপযোগী শিক্ষার পরিবেশ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
৩. শিক্ষক ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষার মানোন্নয়ন
ক. মেধাবীদের শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করা: শিক্ষকদের বেতন-ভাতা, কর্মপরিবেশ ও সামাজিক মর্যাদা বাড়াতে হবে। এতে মেধাবী তরুণ-তরুণীরা শিক্ষকতা পেশায় আসতে আগ্রহী হবেন।
খ. যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ: আধুনিক শিক্ষাক্রম, শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক পাঠদান, সৃজনশীল মূল্যায়ন ও তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বিষয়ে শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিতে হবে। প্রশিক্ষণ যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
৪. শিক্ষাক্রম ও মূল্যায়ন পদ্ধতির আধুনিকায়ন
ক. কর্মমুখী ও কারিগরি শিক্ষার প্রসার: সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে হবে। শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ও যোগ্যতা অনুযায়ী এ শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে বাস্তব কাজের প্রশিক্ষণ ও আত্মকর্মসংস্থানের পথ সহজ করতে হবে।
খ. পরীক্ষানির্ভরতা ও মুখস্থবিদ্যা কমানো: শুধু জিপিএ বা সনদের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের যোগ্যতা বিচার করা উচিত নয়। তাদের সৃজনশীলতা, যুক্তিবোধ, বাস্তব জ্ঞান ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা যাচাইয়ের কার্যকর পদ্ধতি চালু রাখতে হবে। মূল্যায়ন পদ্ধতি এমন হতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা বুঝে শেখার প্রতি আগ্রহী হয়।
একটি দেশের ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে তার শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তির ওপর। একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও যুগোপযোগী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দক্ষতাভিত্তিক করতে হবে। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের পাশাপাশি বর্তমান সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী এর সীমাবদ্ধতাগুলো পর্যালোচনা করা জরুরি।
এ জন্য প্রয়োজন সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ, দক্ষ শিক্ষক তৈরি, দুর্নীতি রোধ এবং শিক্ষার সব পর্যায়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করা। সরকার, শিক্ষক, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বিত উদ্যোগেই একটি মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। দক্ষ, মানবিক ও সৃজনশীল প্রজন্ম তৈরি করতে পারলেই বাংলাদেশ ভবিষ্যতের বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও সক্ষম হয়ে উঠবে।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: প্রধান শিক্ষক, চরফ্যাসন টাউন মাধ্যমিক বিদ্যালয়]

শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ অক্টোবর ২০২৬
কোনো দেশ বা জাতির উন্নতির অন্যতম পূর্বশর্ত হলো সুষ্ঠু শিক্ষাব্যবস্থা। আর একটি সুষ্ঠু শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট শিক্ষানীতি। এই নীতির আলোকে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালিত ও বাস্তবায়িত হয়।
শিক্ষানীতি কী?
শিক্ষানীতি হলো শিক্ষার লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম পরিচালনা, কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দিকনির্দেশনা। বাংলাদেশে শিল্প, বাণিজ্য ও প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। শিক্ষানীতি এসব নীতিমালার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ।
সাধারণভাবে শিক্ষা বলতে মানুষের জ্ঞান, দক্ষতা, চিন্তাভাবনা ও আচরণে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনকে বোঝায়। অন্যদিকে, শিক্ষানীতি হলো একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনার আলোকে শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন স্তর পরিচালনা এবং দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের উপযুক্ত শিক্ষা নিশ্চিত করার দিকনির্দেশনা।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করার নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে একটি সুসংহত ও দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে নানা সীমাবদ্ধতা দেখা গেছে।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হলো জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০। এটি প্রণয়নের এক দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। তাই এখন এ নীতির বাস্তবায়ন কতটা হয়েছে, তা পর্যালোচনা করা জরুরি। এই নীতিতে শিক্ষার সমতা, গুণগত মান, সবার জন্য শিক্ষার সুযোগ এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার অঙ্গীকার করা হয়েছিল। প্রশ্ন হলো, সেই অঙ্গীকার কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে এবং কোথায় সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে?
জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০
জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ স্বাধীন বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও রূপান্তরের লক্ষ্যে প্রণীত একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। অধ্যাপক কবির চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত শিক্ষা কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে নীতিটি চূড়ান্ত করা হয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল নৈতিক, মানবিক, বিজ্ঞানমনস্ক, অসাম্প্রদায়িক ও দেশপ্রেমিক নাগরিক গড়ে তোলা।
মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
ক. সাংবিধানিক নির্দেশনা বাস্তবায়ন: শিক্ষার সব স্তরে সংবিধানের নির্দেশনার প্রতিফলন ঘটানো এবং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় শিক্ষার্থীদের সচেতন করে তোলা।
খ. মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধ: শিক্ষার্থীদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, দেশপ্রেম, মানবিকতা ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের মানসিকতা তৈরি করা।
গ. চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীলতার বিকাশ: মুখস্থবিদ্যার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে শিক্ষার্থীদের স্বাধীন চিন্তা, যুক্তিবোধ ও সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটানো।
ঘ. তথ্যপ্রযুক্তি ও বিজ্ঞানশিক্ষা: দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি এবং উৎপাদনমুখী বিজ্ঞানশিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া।
ঙ. বৈষম্যহীন ও মানসম্মত শিক্ষা: সব নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি এবং বৈষম্যহীন, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা।
সমস্যা চিহ্নিতকরণ ও সমাধানের প্রস্তাব
শিক্ষানীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল সবার জন্য শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা এবং শিক্ষাকে জাতীয় উন্নয়নের চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তোলা। এ ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতি হয়েছে। প্রাথমিক স্তরে ভর্তির সুযোগ বেড়েছে, বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার হার কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং নারীশিক্ষার প্রসার ঘটেছে। অনেক এলাকায় বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও অংশগ্রহণেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।
তবে এসব অগ্রগতির পাশাপাশি নানা সীমাবদ্ধতাও রয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে অবকাঠামোগত সংকট, শিক্ষকঘাটতি ও শিক্ষার মানের বৈষম্য। শহর ও গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সুযোগ-সুবিধায় এখনো বড় পার্থক্য রয়েছে। অনেক বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, বিজ্ঞানাগার ও প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ নেই। শিক্ষকের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি তাদের মানসম্মত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করাও জরুরি।
শিক্ষাকে কর্মমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক করার লক্ষ্য থাকলেও বাস্তবে অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনা শেষ করে কর্মসংস্থান খুঁজে পেতে সমস্যায় পড়েন। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সুযোগও প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়েনি। ফলে একদিকে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে চাকরির বাজারে প্রয়োজনীয় দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীর ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো শিক্ষায় পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দের অভাব। দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দীর্ঘদিন ধরেই কম। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিভিন্ন মানদণ্ডে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৪ থেকে ৬ শতাংশ ব্যয়ের সুপারিশ করা হয়। বাংলাদেশে এ লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে বরাদ্দের বড় ব্যবধান রয়েছে। অর্থের সীমাবদ্ধতায় অনেক পরিকল্পনা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না।
শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা যায়নি। তাই সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
১. নীতিগত ও রাজনৈতিক উদ্যোগ
ক. স্বাধীন শিক্ষা কমিশন গঠন: রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, স্থায়ী ও স্বায়ত্তশাসিত জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন করা যেতে পারে। কমিশনটি রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে থেকে দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষানীতির বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন করবে।
খ. শিক্ষানীতির ধারাবাহিকতা রক্ষা: সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষানীতি ও শিক্ষাক্রমে আমূল পরিবর্তন করা উচিত নয়। আগের নীতির কার্যকর দিকগুলো বজায় রেখে প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধন করতে হবে। এতে শিক্ষাব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা আসবে।
২. অবকাঠামোগত উন্নয়ন
ক. শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি: শিক্ষার মানোন্নয়ন ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পর্যায়ক্রমে বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন।
খ. দুর্নীতি ও অপচয় রোধ: শিক্ষা প্রশাসনের সব স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বরাদ্দ করা অর্থের যথাযথ ব্যবহার এবং উন্নয়নকাজের মান নিয়মিত তদারক করতে হবে।
গ. পিছিয়ে পড়া অঞ্চলে সুযোগ সৃষ্টি: শহর ও গ্রামের শিক্ষাবৈষম্য কমাতে প্রত্যন্ত ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। পথশিশু, প্রতিবন্ধী ও অন্যান্য সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীর জন্য উপযোগী শিক্ষার পরিবেশ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
৩. শিক্ষক ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষার মানোন্নয়ন
ক. মেধাবীদের শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করা: শিক্ষকদের বেতন-ভাতা, কর্মপরিবেশ ও সামাজিক মর্যাদা বাড়াতে হবে। এতে মেধাবী তরুণ-তরুণীরা শিক্ষকতা পেশায় আসতে আগ্রহী হবেন।
খ. যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ: আধুনিক শিক্ষাক্রম, শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক পাঠদান, সৃজনশীল মূল্যায়ন ও তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বিষয়ে শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিতে হবে। প্রশিক্ষণ যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
৪. শিক্ষাক্রম ও মূল্যায়ন পদ্ধতির আধুনিকায়ন
ক. কর্মমুখী ও কারিগরি শিক্ষার প্রসার: সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে হবে। শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ও যোগ্যতা অনুযায়ী এ শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে বাস্তব কাজের প্রশিক্ষণ ও আত্মকর্মসংস্থানের পথ সহজ করতে হবে।
খ. পরীক্ষানির্ভরতা ও মুখস্থবিদ্যা কমানো: শুধু জিপিএ বা সনদের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের যোগ্যতা বিচার করা উচিত নয়। তাদের সৃজনশীলতা, যুক্তিবোধ, বাস্তব জ্ঞান ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা যাচাইয়ের কার্যকর পদ্ধতি চালু রাখতে হবে। মূল্যায়ন পদ্ধতি এমন হতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা বুঝে শেখার প্রতি আগ্রহী হয়।
একটি দেশের ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে তার শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তির ওপর। একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও যুগোপযোগী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দক্ষতাভিত্তিক করতে হবে। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের পাশাপাশি বর্তমান সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী এর সীমাবদ্ধতাগুলো পর্যালোচনা করা জরুরি।
এ জন্য প্রয়োজন সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ, দক্ষ শিক্ষক তৈরি, দুর্নীতি রোধ এবং শিক্ষার সব পর্যায়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করা। সরকার, শিক্ষক, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বিত উদ্যোগেই একটি মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। দক্ষ, মানবিক ও সৃজনশীল প্রজন্ম তৈরি করতে পারলেই বাংলাদেশ ভবিষ্যতের বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও সক্ষম হয়ে উঠবে।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: প্রধান শিক্ষক, চরফ্যাসন টাউন মাধ্যমিক বিদ্যালয়]

আপনার মতামত লিখুন