তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপি গ্যাস) বাজারে দেড় মাস ধরে অস্থিরতা চলছে। সরবরাহ-সংকটের সুযোগে দাম বাড়িয়ে বিক্রি করা হচ্ছে। ফলে চাপে পড়েছেন ভোক্তারা। এর মধ্যেই এলপি গ্যাস বিক্রিতে কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাব করেছেন আমদানিকারক, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতা। তিন পক্ষের চাওয়া মেনে কমিশন বাড়ানোর বিষয়ে গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এদিকে, গত আগস্ট-সেপ্টেম্বরে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বাজারে এলপি গ্যাস (এলপিজি) সরবরাহের অভিযোগে কয়েকটি কোম্পানিকে কারণ দর্শানোর নোটিস দিয়েছিল বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। ‘সেই নোটিসের উত্তর পাওয়ার আগেই কেন আবার দাম বৃদ্ধির গণশুনানির আয়োজন করা হলো’- শুনানিতে এমন প্রশ্ন তুলেছে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি। প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে গণশুনানি বয়কট করে সংস্থাটি।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) ঢাকার বিয়াম মিলনায়তনে গণশুনানির আয়োজন করে বিইআরসি। কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদের সভাপতিত্বে কমিশন সদস্য মো. আব্দুর রজ্জাক, মো. মিজানুর রহমান ও অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগে. জেনারেল মোহাম্মদ শাহিদ সারওয়ার শুনানি গ্রহণ করেন।
শুনানিতে এলপিজি অপারেটর বা আমদানিকারকদের নানা অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তোলেন স্বয়ং পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতারা। কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) প্রতিনিধি, সাধারণ ভোক্তাদের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়, যার উত্তর মেলেনি। ফলে গণশুনাতিতে তোপের মুখে পড়তে হয় আমদানিকারক ও বিইআরসিকে।
দেশে সক্রিয় ৩৫টি কোম্পানির মধ্যে এলপিজি আমদানির অবকাঠামোগত সক্ষমতা আছে ২৩টি কোম্পানির। গত মাসে এলপিজি আমদানি করেছে ১০টি কোম্পানি। শুনানিতে এলপিজি আমদানিকারক, পরিবেশক এবং খুচরা বিক্রেতারা প্রায় সবক্ষেত্রেই কমিশন দ্বিগুণ বা তার বেশি করার প্রস্তাব করে। ১২ কেজিতে আমদানিকারকের কমিশন ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ওমেরা ৪৭৮ টাকা, পেট্রোম্যাক্স ৩৪৯ টাকা, ডেল্টা ৩৬০ টাকা, সবচেয়ে কম মেঘনা গ্রুপ ৩০০ টাকা করার প্রস্তাব করে। অন্যদিকে, পরিবেশকরা ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫০ টাকা, খুচরা বিক্রেতারা ৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০ টাকা নির্ধারণের আবেদন করেছে।
বিইআরসির কারিগরি কমিটি ১২ কেজিতে আমদানিকারকের কমিশন ২০০ থেকে বাড়িয়ে ২৮০ টাকা, খুচরা বিক্রেতার কমিশন ৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০ টাকা করার পক্ষে মতামত দেয়। বিইআরসির কারিগরি কমিটির প্রতিবেদন কার্যকর হলে ১২ কেজি এলপিজির দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা থেকে ১৩৯ টাকা বেড়ে ১ হাজার ৯৭৬ টাকা হবে।
সুপারিশকৃত এই মূল্য এখনই বাজারে কার্যকর হচ্ছে না। বিইআরসির নিয়ম অনুযায়ী গণশুনানির প্রাপ্ত মতামত পর্যালোচনা শেষে আগামী কিছুদিন পর বিইআরসির চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত নোটিশ ও প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে চালুর তারিখ ঘোষণা করা হবে। কমিশন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন এলপিজি রেটের তারিখ ঘোষণা না করা পর্যন্ত বর্তমানে বহাল থাকা ১২ কেজি সিলিন্ডার ১৮৩৭ টাকা হারেই কেনাবেচা হওয়ার বিধান রয়েছে।
শুনানি পরবর্তী কোনো বিষয়ে বক্তব্য থাকলে আগামী রোববারের (১ নভেম্বর) মধ্যে লিখিতভাবে বিইআরসিতে জমা দিতে বলা হয়েছে। অর্থাৎ, শুনানির বিষয়ে কমিশনের সিদ্ধান্ত আসবে ১ নভেম্বর বা তার পরে।
মজুতকরণ ও বোতলজাতকরণ চার্জ (অপারেটরের প্লান্ট থেকে ডিস্ট্রিবিউটর পর্যন্ত পরিবহন খরচসহ) চার্জ বর্তমানে প্রতি কেজিতে ১৬ দশমিক ৭৪ টাকা রয়েছে, এই চার্জ নতুন করে প্রস্তাব ২৭ দশমিক ৬২ থেকে ৩৬ দশমিক ৯২ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছিল। এখানে কারিগরি কমিটি প্রতি কেজিতে ২৩ দশমিক ৪৮ টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করে।
ডিস্ট্রিবিউটর চার্জ (রিটেইলারের আঙিনা পর্যন্ত পরিবহন ব্যয়সহ) বর্তমানে প্রতি কেজিতে রয়েছে ৪ দশমিক ১৭ টাকা, যা প্রস্তাবনায় বাড়িয়ে ৮ দশমিক ৩৪ থেকে ১২ দশমিক ৫০ টাকা করার কথা বলা হয়। তবে কারিগরি কমিটি ৬ দশমিক ৬৭ টাকা করার প্রস্তাব করে। রিটেইলার চার্জ (হোম ডেলিভারি চার্জ ব্যতীত) বর্তমানে প্রতি কেজিতে ৩ দশমিক ৭৫ টাকা থাকলেও, প্রস্তাবিত হার ৫ দশমিক ৮৩ থেকে ৭ দশমিক ৫০ টাকা করার কথা বলা হয়। তবে কারিগরি কমিটি ৫ দশমিক ৮৩ টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করে।
রিটেইলার পয়েন্টে সব খরচ মিলিয়ে রিটেইলার প্রতি কেজি এলপিজির বর্তমান মূল্য ১৫৩ দশমিক ৬ টাকা, যা প্রস্তাবে ১৫৮ দশমিক ৯১ থেকে ১৮৫ দশমিক ৯৭ টাকা করার কথা বলা হয়। তবে কারিগরি কমিটি প্রতি কেজি এলপিজি ১৬৪ দশমিক ৬৮ টাকা দাম নির্ধারণের সুপারিশ করে।
পরিবেশকদের সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু তাহের কোরেশি বলেন, “বোতলজাতকৃত এলপিজি আমাদের ঘরে পৌঁছে দেওয়ার কথা। কিন্তু যখনই সংকট শুরু হয়, তারা সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। এতে করে আমাদের বাড়তি খরচ যোগ হলে নির্ধারিত দামে বিক্রি করা সম্ভব হয় না।” তিনি পরিবহন খরচ তাদের হিসাবে যোগ করার প্রস্তাব করেন।
জবাবে কারিগরি কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়, দেশের বিভিন্ন দূরত্বে পৌঁছে দিতে হয়, সে কারণে এটি আমদানিকারকদের প্রান্তে দিয়ে রাখা হয়েছে। তারা কোন ক্ষেত্রে বেশি খরচ করবে আবার কাছের পরিবেশককে অল্প খরচে সরবরাহ করবে।
ক্যাবের উপদেষ্টা খলিলুর রহমান শুনানিতে বলেন, “এলপিজির দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে গ্রাহকদের সুবিধা-অসুবিধা দেখা বিইআরসির দায়িত্ব। সেটি না হলে এই শুনানি সঠিক হবে না।” দাম না বাড়ানো এবং বিইআরসি ঘোষিত দরে বেচাকেনা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
মেঘনা ফ্রেস এলপিজির প্রতিনিধি আবু সাঈদ রাজা বলেন, “বাংলাদেশের এলপিজির বাজার দ্রুত বাড়ছে। এই খাতে বর্তমানে ৪০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ রয়েছে। এই বিনিয়োগের সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। বড় জাহাজে আসে কুতুবদিয়া, সেখান থেকে লাইটারেজ ও সড়ক ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দেই। সেই খরচ যোগ করা হয়নি বিগত ২০২১ সালের গণশুনানিতে।”
ওরিয়ন, বেক্সিমকো, ইউনিগ্যাসসহ কয়েকটি কোম্পানির পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন ওরিয়ন এলপিজির চিফ অপারেটিং অফিসার অনিক কুমার সেন। তিনি বলেন, “নতুন বাস্তবতায় ১০টা কোম্পানি আমদানি করতে পারছে না। তাদের অবকাঠামো অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। এতে বাজারে সিলিন্ডার–সংকট তৈরি হয়েছে। অন্য কোম্পানির কাছ থেকে কিনে নিয়ে বিইআরসির দামে বিক্রি করা সম্ভব নয়। তাই পাইকারি দাম নির্ধারণের দাবি জানান তিনি। তাহলে বাজারে কৃত্রিম সংকট কমবে ও অন্যায্য দাম নেওয়া বন্ধ হবে।”
পরিবেশকদের পক্ষ থেকে মেসার্স উজ্জল ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মনি মুক্তা পাল বলেন, “অপারেটররা যেসব খরচ বাড়ার কথা বলেছে, তাদের মতো পরিবেশকদেরও খরচ বেড়েছে। এক সঙ্গে অলস সিলিন্ডারের বোঝা বহন করতে হচ্ছে। পরিবেশকদের কমিশন প্রতি সিলিন্ডারে ১৫০ টাকা করার দাবি করেন তিনি। তিনি এ বিষয়ে বলেন, এই দাবি পূরণ না হলে বাজারে দাম কমবে না।”
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ সবার উদ্দেশ্যে বলেন, “এখানে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। আমরা বাজার মনিটরিং জোরদার করছি, কেউ কোন রকম কৃত্রিম সংকটের চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একটি সফটওয়ার প্রস্তুত করে হচ্ছে তখন নিবিড়ভাবে মনিটরিং করা সম্ভব হবে।”
এ ছাড়া পরিবহনে ব্যবহৃত অটোগ্যাসের প্রতি লিটারের কমিশন ৮ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়।
অটোগ্যাস সমিতির সভাপতি সিরাজুল মাওলা বলেন, “দুই লাখের বেশি গাড়ি এলপিজি দিয়ে চলে। ২০২১ সালে ৮ টাকা কমিশন নির্ধারণ করেছিল। এরপর পাঁচ বছর চলে গেছে। পরিচালন খরচ বেড়েছে। রাজশাহীর সাদ স্টেশনে মাসে ক্ষতি ৪৫ হাজার টাকা। শহরের কিছু স্টেশন মুনাফা করতে পারছে। তবে ৮০ শতাংশ লোকসান করছে।” তিনি কমিশন ১১ টাকা নির্ধারণের দাবি জানান।
শুনানিতে অর্থনীতি সমিতির পক্ষ থেকে অধ্যাপক সৈয়দ মিজানুর রহমান বলেন, “গোয়েন্দা সংস্থা পাঁচটি কোম্পানির বিরুদ্ধে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির অভিযোগ এনেছে। বিইআরসি সেই প্রেক্ষিতে নোটিসও করেছে। কিন্তু সেগুলোর আর কোনো খবর নেই।” তিনি বলেন, “দাম বাড়িয়ে গত এক মাসে প্রায় ৬৩০ কোটি টাকা বাড়তি আদায় করা হয়েছে। আর ভোক্তা অধিকার খুচরা ব্যবসায়ীদের সেজন্য ১১ লাখ টাকা জরিমানা করেছে। এই জরিমানার মাধ্যমে কী ৬৩০ কোটি টাকা বৈধ হয়ে গেলো?” শুনানিতে এসব প্রশ্নের উত্তর না পাওয়ায় ঘোষণা দিয়ে তিনি শুনানি বর্জন করেন।
দেশে মোট চাহিদার এক শতাংশের কম এলপি গ্যাস সরকারিভাবে সরবরাহ করা হয়। ৯৯ শতাংশের বেশি বাজার বেসরকারি কোম্পানির দখলে। বসুন্ধরা, যমুনা, বেক্সিমকো, ওমেরা, নাভানা, জেএমআই, টোটালগ্যাস, পেট্রোম্যাক্সসহ বড় বড় অনেক প্রতিষ্ঠান বাজারে এলপি গ্যাস সরবরাহ করছে।
বিইআরসি প্রতি মাসেই দাম নির্ধারণ করলেও বাজারে এই দামে এলপি গ্যাস পাওয়া যায় না, এমন অভিযোগ ভোক্তাদের কাছ থেকে সব সময়ই আসছে। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অক্টোবরে সবশেষ নির্ধারণ করা ১ হাজার ৮৩৭ টাকায় ১২ কেজি সিলিন্ডার মেলে না কোন দোকানে। দুই হাজার তিনশ’ থেকে আড়াই হাজার টাকায় কিনতে হয় সমপরিমাণ সিলিন্ডার। তবে বিইআরসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং কমিশন সদস্যদের দাবি, তারা অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেন। এছাড়া, বাজার নজরদারিতে রাখতে ভোক্তা অধিদপ্তর ও প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা কাজ করছেন; তাদের তরফেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
এর আগে পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের ধর্মঘটের হুমকির মুখে তড়িঘড়ি করে গণশুনানির আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছিল বিইআরসি। এলপিজি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি ১৫ ও ১৬ অক্টোবর ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল। সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে ১৪ অক্টোবর সেই কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেয়। আর সেদিনেই গণশুনানির ঘোষণা আসে।

বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৯ অক্টোবর ২০২৬
তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপি গ্যাস) বাজারে দেড় মাস ধরে অস্থিরতা চলছে। সরবরাহ-সংকটের সুযোগে দাম বাড়িয়ে বিক্রি করা হচ্ছে। ফলে চাপে পড়েছেন ভোক্তারা। এর মধ্যেই এলপি গ্যাস বিক্রিতে কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাব করেছেন আমদানিকারক, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতা। তিন পক্ষের চাওয়া মেনে কমিশন বাড়ানোর বিষয়ে গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এদিকে, গত আগস্ট-সেপ্টেম্বরে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বাজারে এলপি গ্যাস (এলপিজি) সরবরাহের অভিযোগে কয়েকটি কোম্পানিকে কারণ দর্শানোর নোটিস দিয়েছিল বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। ‘সেই নোটিসের উত্তর পাওয়ার আগেই কেন আবার দাম বৃদ্ধির গণশুনানির আয়োজন করা হলো’- শুনানিতে এমন প্রশ্ন তুলেছে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি। প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে গণশুনানি বয়কট করে সংস্থাটি।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) ঢাকার বিয়াম মিলনায়তনে গণশুনানির আয়োজন করে বিইআরসি। কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদের সভাপতিত্বে কমিশন সদস্য মো. আব্দুর রজ্জাক, মো. মিজানুর রহমান ও অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগে. জেনারেল মোহাম্মদ শাহিদ সারওয়ার শুনানি গ্রহণ করেন।
শুনানিতে এলপিজি অপারেটর বা আমদানিকারকদের নানা অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তোলেন স্বয়ং পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতারা। কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) প্রতিনিধি, সাধারণ ভোক্তাদের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়, যার উত্তর মেলেনি। ফলে গণশুনাতিতে তোপের মুখে পড়তে হয় আমদানিকারক ও বিইআরসিকে।
দেশে সক্রিয় ৩৫টি কোম্পানির মধ্যে এলপিজি আমদানির অবকাঠামোগত সক্ষমতা আছে ২৩টি কোম্পানির। গত মাসে এলপিজি আমদানি করেছে ১০টি কোম্পানি। শুনানিতে এলপিজি আমদানিকারক, পরিবেশক এবং খুচরা বিক্রেতারা প্রায় সবক্ষেত্রেই কমিশন দ্বিগুণ বা তার বেশি করার প্রস্তাব করে। ১২ কেজিতে আমদানিকারকের কমিশন ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ওমেরা ৪৭৮ টাকা, পেট্রোম্যাক্স ৩৪৯ টাকা, ডেল্টা ৩৬০ টাকা, সবচেয়ে কম মেঘনা গ্রুপ ৩০০ টাকা করার প্রস্তাব করে। অন্যদিকে, পরিবেশকরা ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫০ টাকা, খুচরা বিক্রেতারা ৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০ টাকা নির্ধারণের আবেদন করেছে।
বিইআরসির কারিগরি কমিটি ১২ কেজিতে আমদানিকারকের কমিশন ২০০ থেকে বাড়িয়ে ২৮০ টাকা, খুচরা বিক্রেতার কমিশন ৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০ টাকা করার পক্ষে মতামত দেয়। বিইআরসির কারিগরি কমিটির প্রতিবেদন কার্যকর হলে ১২ কেজি এলপিজির দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা থেকে ১৩৯ টাকা বেড়ে ১ হাজার ৯৭৬ টাকা হবে।
সুপারিশকৃত এই মূল্য এখনই বাজারে কার্যকর হচ্ছে না। বিইআরসির নিয়ম অনুযায়ী গণশুনানির প্রাপ্ত মতামত পর্যালোচনা শেষে আগামী কিছুদিন পর বিইআরসির চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত নোটিশ ও প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে চালুর তারিখ ঘোষণা করা হবে। কমিশন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন এলপিজি রেটের তারিখ ঘোষণা না করা পর্যন্ত বর্তমানে বহাল থাকা ১২ কেজি সিলিন্ডার ১৮৩৭ টাকা হারেই কেনাবেচা হওয়ার বিধান রয়েছে।
শুনানি পরবর্তী কোনো বিষয়ে বক্তব্য থাকলে আগামী রোববারের (১ নভেম্বর) মধ্যে লিখিতভাবে বিইআরসিতে জমা দিতে বলা হয়েছে। অর্থাৎ, শুনানির বিষয়ে কমিশনের সিদ্ধান্ত আসবে ১ নভেম্বর বা তার পরে।
মজুতকরণ ও বোতলজাতকরণ চার্জ (অপারেটরের প্লান্ট থেকে ডিস্ট্রিবিউটর পর্যন্ত পরিবহন খরচসহ) চার্জ বর্তমানে প্রতি কেজিতে ১৬ দশমিক ৭৪ টাকা রয়েছে, এই চার্জ নতুন করে প্রস্তাব ২৭ দশমিক ৬২ থেকে ৩৬ দশমিক ৯২ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছিল। এখানে কারিগরি কমিটি প্রতি কেজিতে ২৩ দশমিক ৪৮ টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করে।
ডিস্ট্রিবিউটর চার্জ (রিটেইলারের আঙিনা পর্যন্ত পরিবহন ব্যয়সহ) বর্তমানে প্রতি কেজিতে রয়েছে ৪ দশমিক ১৭ টাকা, যা প্রস্তাবনায় বাড়িয়ে ৮ দশমিক ৩৪ থেকে ১২ দশমিক ৫০ টাকা করার কথা বলা হয়। তবে কারিগরি কমিটি ৬ দশমিক ৬৭ টাকা করার প্রস্তাব করে। রিটেইলার চার্জ (হোম ডেলিভারি চার্জ ব্যতীত) বর্তমানে প্রতি কেজিতে ৩ দশমিক ৭৫ টাকা থাকলেও, প্রস্তাবিত হার ৫ দশমিক ৮৩ থেকে ৭ দশমিক ৫০ টাকা করার কথা বলা হয়। তবে কারিগরি কমিটি ৫ দশমিক ৮৩ টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করে।
রিটেইলার পয়েন্টে সব খরচ মিলিয়ে রিটেইলার প্রতি কেজি এলপিজির বর্তমান মূল্য ১৫৩ দশমিক ৬ টাকা, যা প্রস্তাবে ১৫৮ দশমিক ৯১ থেকে ১৮৫ দশমিক ৯৭ টাকা করার কথা বলা হয়। তবে কারিগরি কমিটি প্রতি কেজি এলপিজি ১৬৪ দশমিক ৬৮ টাকা দাম নির্ধারণের সুপারিশ করে।
পরিবেশকদের সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু তাহের কোরেশি বলেন, “বোতলজাতকৃত এলপিজি আমাদের ঘরে পৌঁছে দেওয়ার কথা। কিন্তু যখনই সংকট শুরু হয়, তারা সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। এতে করে আমাদের বাড়তি খরচ যোগ হলে নির্ধারিত দামে বিক্রি করা সম্ভব হয় না।” তিনি পরিবহন খরচ তাদের হিসাবে যোগ করার প্রস্তাব করেন।
জবাবে কারিগরি কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়, দেশের বিভিন্ন দূরত্বে পৌঁছে দিতে হয়, সে কারণে এটি আমদানিকারকদের প্রান্তে দিয়ে রাখা হয়েছে। তারা কোন ক্ষেত্রে বেশি খরচ করবে আবার কাছের পরিবেশককে অল্প খরচে সরবরাহ করবে।
ক্যাবের উপদেষ্টা খলিলুর রহমান শুনানিতে বলেন, “এলপিজির দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে গ্রাহকদের সুবিধা-অসুবিধা দেখা বিইআরসির দায়িত্ব। সেটি না হলে এই শুনানি সঠিক হবে না।” দাম না বাড়ানো এবং বিইআরসি ঘোষিত দরে বেচাকেনা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
মেঘনা ফ্রেস এলপিজির প্রতিনিধি আবু সাঈদ রাজা বলেন, “বাংলাদেশের এলপিজির বাজার দ্রুত বাড়ছে। এই খাতে বর্তমানে ৪০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ রয়েছে। এই বিনিয়োগের সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। বড় জাহাজে আসে কুতুবদিয়া, সেখান থেকে লাইটারেজ ও সড়ক ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দেই। সেই খরচ যোগ করা হয়নি বিগত ২০২১ সালের গণশুনানিতে।”
ওরিয়ন, বেক্সিমকো, ইউনিগ্যাসসহ কয়েকটি কোম্পানির পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন ওরিয়ন এলপিজির চিফ অপারেটিং অফিসার অনিক কুমার সেন। তিনি বলেন, “নতুন বাস্তবতায় ১০টা কোম্পানি আমদানি করতে পারছে না। তাদের অবকাঠামো অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। এতে বাজারে সিলিন্ডার–সংকট তৈরি হয়েছে। অন্য কোম্পানির কাছ থেকে কিনে নিয়ে বিইআরসির দামে বিক্রি করা সম্ভব নয়। তাই পাইকারি দাম নির্ধারণের দাবি জানান তিনি। তাহলে বাজারে কৃত্রিম সংকট কমবে ও অন্যায্য দাম নেওয়া বন্ধ হবে।”
পরিবেশকদের পক্ষ থেকে মেসার্স উজ্জল ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মনি মুক্তা পাল বলেন, “অপারেটররা যেসব খরচ বাড়ার কথা বলেছে, তাদের মতো পরিবেশকদেরও খরচ বেড়েছে। এক সঙ্গে অলস সিলিন্ডারের বোঝা বহন করতে হচ্ছে। পরিবেশকদের কমিশন প্রতি সিলিন্ডারে ১৫০ টাকা করার দাবি করেন তিনি। তিনি এ বিষয়ে বলেন, এই দাবি পূরণ না হলে বাজারে দাম কমবে না।”
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ সবার উদ্দেশ্যে বলেন, “এখানে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। আমরা বাজার মনিটরিং জোরদার করছি, কেউ কোন রকম কৃত্রিম সংকটের চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একটি সফটওয়ার প্রস্তুত করে হচ্ছে তখন নিবিড়ভাবে মনিটরিং করা সম্ভব হবে।”
এ ছাড়া পরিবহনে ব্যবহৃত অটোগ্যাসের প্রতি লিটারের কমিশন ৮ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়।
অটোগ্যাস সমিতির সভাপতি সিরাজুল মাওলা বলেন, “দুই লাখের বেশি গাড়ি এলপিজি দিয়ে চলে। ২০২১ সালে ৮ টাকা কমিশন নির্ধারণ করেছিল। এরপর পাঁচ বছর চলে গেছে। পরিচালন খরচ বেড়েছে। রাজশাহীর সাদ স্টেশনে মাসে ক্ষতি ৪৫ হাজার টাকা। শহরের কিছু স্টেশন মুনাফা করতে পারছে। তবে ৮০ শতাংশ লোকসান করছে।” তিনি কমিশন ১১ টাকা নির্ধারণের দাবি জানান।
শুনানিতে অর্থনীতি সমিতির পক্ষ থেকে অধ্যাপক সৈয়দ মিজানুর রহমান বলেন, “গোয়েন্দা সংস্থা পাঁচটি কোম্পানির বিরুদ্ধে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির অভিযোগ এনেছে। বিইআরসি সেই প্রেক্ষিতে নোটিসও করেছে। কিন্তু সেগুলোর আর কোনো খবর নেই।” তিনি বলেন, “দাম বাড়িয়ে গত এক মাসে প্রায় ৬৩০ কোটি টাকা বাড়তি আদায় করা হয়েছে। আর ভোক্তা অধিকার খুচরা ব্যবসায়ীদের সেজন্য ১১ লাখ টাকা জরিমানা করেছে। এই জরিমানার মাধ্যমে কী ৬৩০ কোটি টাকা বৈধ হয়ে গেলো?” শুনানিতে এসব প্রশ্নের উত্তর না পাওয়ায় ঘোষণা দিয়ে তিনি শুনানি বর্জন করেন।
দেশে মোট চাহিদার এক শতাংশের কম এলপি গ্যাস সরকারিভাবে সরবরাহ করা হয়। ৯৯ শতাংশের বেশি বাজার বেসরকারি কোম্পানির দখলে। বসুন্ধরা, যমুনা, বেক্সিমকো, ওমেরা, নাভানা, জেএমআই, টোটালগ্যাস, পেট্রোম্যাক্সসহ বড় বড় অনেক প্রতিষ্ঠান বাজারে এলপি গ্যাস সরবরাহ করছে।
বিইআরসি প্রতি মাসেই দাম নির্ধারণ করলেও বাজারে এই দামে এলপি গ্যাস পাওয়া যায় না, এমন অভিযোগ ভোক্তাদের কাছ থেকে সব সময়ই আসছে। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অক্টোবরে সবশেষ নির্ধারণ করা ১ হাজার ৮৩৭ টাকায় ১২ কেজি সিলিন্ডার মেলে না কোন দোকানে। দুই হাজার তিনশ’ থেকে আড়াই হাজার টাকায় কিনতে হয় সমপরিমাণ সিলিন্ডার। তবে বিইআরসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং কমিশন সদস্যদের দাবি, তারা অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেন। এছাড়া, বাজার নজরদারিতে রাখতে ভোক্তা অধিদপ্তর ও প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা কাজ করছেন; তাদের তরফেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
এর আগে পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের ধর্মঘটের হুমকির মুখে তড়িঘড়ি করে গণশুনানির আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছিল বিইআরসি। এলপিজি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি ১৫ ও ১৬ অক্টোবর ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল। সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে ১৪ অক্টোবর সেই কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেয়। আর সেদিনেই গণশুনানির ঘোষণা আসে।

আপনার মতামত লিখুন