বিদ্যুৎ সংকট, গ্যাসের ঘাটতি কিংবা রান্নার বাড়তি খরচ; বর্তমান সময়ে প্রতিটি গৃহিণীর কাছেই এক বড় চিন্তার বিষয়। এই নিত্যদিনের দুর্ভোগ থেকে মুক্তি দিতে বিকল্প হিসেবে দেশের বাজারে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে সৌরবিদ্যুৎচালিত রান্নার বিভিন্ন যন্ত্র।
এর মধ্যে ১২ ও ২৪ ভোল্টের চুলা, মাল্টি কুকার এবং রাইস কুকারের প্রতি মানুষের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। তবে সোলার কুকার কেনার আগে এর কার্যপদ্ধতি ও সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো যন্ত্রে ১২ বা ২৪ ভোল্ট লেখা থাকলেই তা সরাসরি সোলার প্যানেলে যুক্ত করে রান্না করা সম্ভব নয়। রান্নার জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে সোলার প্যানেলের ক্ষমতা, ব্যাটারি এবং চার্জ কন্ট্রোলারের সঠিক সামঞ্জস্য বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাজারে সাধারণত দুই ধরনের সৌর রান্নার প্রযুক্তি রয়েছে। প্রথমটি হলো সৌরবিদ্যুতে চালিত ইলেকট্রিক কুকার, যেখানে সোলার প্যানেল থেকে উৎপন্ন ডিসি বিদ্যুৎ সরাসরি কিংবা ব্যাটারিতে জমিয়ে বিশেষভাবে তৈরি রাইস কুকার বা হিটিং পট চালানো হয়। দ্বিতীয়টি হলো সরাসরি সূর্যের তাপে রান্নার কুকার, যেখানে কোনো ধরনের বিদ্যুৎ বা ব্যাটারির প্রয়োজন হয় না; বরং প্রতিফলক আয়না বা সৌর টিউবের মাধ্যমে সূর্যের তাপ একটি নির্দিষ্ট পাত্রে কেন্দ্রীভূত করে রান্না করা হয়।
বাংলাদেশে এই প্রযুক্তির বাজার ধীরে ধীরে প্রসারিত হচ্ছে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অনলাইন শপ এবং ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলোতেও সোলার চুলা ও মাল্টি কুকার পাওয়া যাচ্ছে। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, মানভেদে কেবল চুলার দাম ৫ থেকে ৮ হাজার টাকার মধ্যে হতে পারে। তবে সম্পূর্ণ সেটআপ বা প্যাকেজভেদে এর দাম ৭০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
তবে পণ্য কেনার আগে অবশ্যই বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে পণ্যের মজুত, ওয়ারেন্টি এবং ভোল্টেজ ভালোভাবে নিশ্চিত করে নেওয়া উচিত। পাশাপাশি প্যাকেজটির মূল্য শুধু চুলার জন্য নাকি এর সঙ্গে ব্যাটারি ও উপযুক্ত হাঁড়ি-পাতিলও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, তা যাচাই করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
সোলার রাইস কুকার ব্যবহারের নিয়ম সম্পর্কে জানা যায়, প্রথমে সোলার প্যানেলটিকে একটি এমপিটিটি চার্জ কন্ট্রোলারের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হয়। এরপর কন্ট্রোলারের মাধ্যমে ব্যাটারি চার্জ হওয়ার পর নির্দিষ্ট ভোল্টেজের ডিসি বিদ্যুৎ কুকারে সরবরাহ করা হয়। এতে সাধারণ নিয়মে ভাত রান্না ছাড়াও স্যুপ তৈরি, সবজি সিদ্ধ বা খাবার গরম করার সুবিধা পাওয়া যায়।
অন্যদিকে, সূর্যের তাপে রান্নার কুকার ব্যবহারের ক্ষেত্রে খাবারের পাত্র নির্দিষ্ট স্থানে বসিয়ে সূর্যের আলো সঠিকভাবে প্রতিফলিত করতে হয়। তবে রোদ কম বা মেঘলা দিনে এ ধরনের চুলায় রান্না কিছুটা ধীরগতির হতে পারে।
এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। শুধু ভোল্টেজ দেখে পণ্য না কিনে কুকারটির ওয়াট বা বিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষমতা, ব্যাটারির ধারণক্ষমতা এবং কতক্ষণ এটি চালানো যাবে সে বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা নিতে হবে। বিশেষ করে ১২ ভোল্টের কুকার চালাতে তুলনামূলক বেশি কারেন্ট প্রয়োজন হওয়ায় নিম্নমানের বা পাতলা তার ব্যবহার করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে সোলার কুকিং প্রযুক্তি নিয়ে ইতোমধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা হয়েছে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এনার্জির গবেষক এস. এম. এন. শামস, এফ. সুলতানা, এ. সাহা এবং এম. এ. হক ‘পাওয়ার পয়েন্ট ট্র্যাকার মাউন্টেড সোলার পাওয়ারড ডিসি ইন্ডাকশন কুকার’ শীর্ষক একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন, যা বাংলাদেশ জার্নাল অব সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চে (বিজেএসআইআর) স্থান পায়।
সার্বিকভাবে লোডশেডিং বা গ্যাস সংকটের বিকল্প হিসেবে সোলার কুকার বেশ কার্যকর হলেও এর প্রাথমিক স্থাপন খরচ রয়েছে। তাই পরিবারের দৈনিক রান্নার চাহিদা ও সঠিক সক্ষমতা বিবেচনা করেই এই আধুনিক প্রযুক্তিটি বেছে নেওয়া উচিত।

রোববার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৮ নভেম্বর ২০২৬
বিদ্যুৎ সংকট, গ্যাসের ঘাটতি কিংবা রান্নার বাড়তি খরচ; বর্তমান সময়ে প্রতিটি গৃহিণীর কাছেই এক বড় চিন্তার বিষয়। এই নিত্যদিনের দুর্ভোগ থেকে মুক্তি দিতে বিকল্প হিসেবে দেশের বাজারে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে সৌরবিদ্যুৎচালিত রান্নার বিভিন্ন যন্ত্র।
এর মধ্যে ১২ ও ২৪ ভোল্টের চুলা, মাল্টি কুকার এবং রাইস কুকারের প্রতি মানুষের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। তবে সোলার কুকার কেনার আগে এর কার্যপদ্ধতি ও সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো যন্ত্রে ১২ বা ২৪ ভোল্ট লেখা থাকলেই তা সরাসরি সোলার প্যানেলে যুক্ত করে রান্না করা সম্ভব নয়। রান্নার জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে সোলার প্যানেলের ক্ষমতা, ব্যাটারি এবং চার্জ কন্ট্রোলারের সঠিক সামঞ্জস্য বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাজারে সাধারণত দুই ধরনের সৌর রান্নার প্রযুক্তি রয়েছে। প্রথমটি হলো সৌরবিদ্যুতে চালিত ইলেকট্রিক কুকার, যেখানে সোলার প্যানেল থেকে উৎপন্ন ডিসি বিদ্যুৎ সরাসরি কিংবা ব্যাটারিতে জমিয়ে বিশেষভাবে তৈরি রাইস কুকার বা হিটিং পট চালানো হয়। দ্বিতীয়টি হলো সরাসরি সূর্যের তাপে রান্নার কুকার, যেখানে কোনো ধরনের বিদ্যুৎ বা ব্যাটারির প্রয়োজন হয় না; বরং প্রতিফলক আয়না বা সৌর টিউবের মাধ্যমে সূর্যের তাপ একটি নির্দিষ্ট পাত্রে কেন্দ্রীভূত করে রান্না করা হয়।
বাংলাদেশে এই প্রযুক্তির বাজার ধীরে ধীরে প্রসারিত হচ্ছে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অনলাইন শপ এবং ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলোতেও সোলার চুলা ও মাল্টি কুকার পাওয়া যাচ্ছে। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, মানভেদে কেবল চুলার দাম ৫ থেকে ৮ হাজার টাকার মধ্যে হতে পারে। তবে সম্পূর্ণ সেটআপ বা প্যাকেজভেদে এর দাম ৭০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
তবে পণ্য কেনার আগে অবশ্যই বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে পণ্যের মজুত, ওয়ারেন্টি এবং ভোল্টেজ ভালোভাবে নিশ্চিত করে নেওয়া উচিত। পাশাপাশি প্যাকেজটির মূল্য শুধু চুলার জন্য নাকি এর সঙ্গে ব্যাটারি ও উপযুক্ত হাঁড়ি-পাতিলও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, তা যাচাই করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
সোলার রাইস কুকার ব্যবহারের নিয়ম সম্পর্কে জানা যায়, প্রথমে সোলার প্যানেলটিকে একটি এমপিটিটি চার্জ কন্ট্রোলারের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হয়। এরপর কন্ট্রোলারের মাধ্যমে ব্যাটারি চার্জ হওয়ার পর নির্দিষ্ট ভোল্টেজের ডিসি বিদ্যুৎ কুকারে সরবরাহ করা হয়। এতে সাধারণ নিয়মে ভাত রান্না ছাড়াও স্যুপ তৈরি, সবজি সিদ্ধ বা খাবার গরম করার সুবিধা পাওয়া যায়।
অন্যদিকে, সূর্যের তাপে রান্নার কুকার ব্যবহারের ক্ষেত্রে খাবারের পাত্র নির্দিষ্ট স্থানে বসিয়ে সূর্যের আলো সঠিকভাবে প্রতিফলিত করতে হয়। তবে রোদ কম বা মেঘলা দিনে এ ধরনের চুলায় রান্না কিছুটা ধীরগতির হতে পারে।
এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। শুধু ভোল্টেজ দেখে পণ্য না কিনে কুকারটির ওয়াট বা বিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষমতা, ব্যাটারির ধারণক্ষমতা এবং কতক্ষণ এটি চালানো যাবে সে বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা নিতে হবে। বিশেষ করে ১২ ভোল্টের কুকার চালাতে তুলনামূলক বেশি কারেন্ট প্রয়োজন হওয়ায় নিম্নমানের বা পাতলা তার ব্যবহার করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে সোলার কুকিং প্রযুক্তি নিয়ে ইতোমধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা হয়েছে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এনার্জির গবেষক এস. এম. এন. শামস, এফ. সুলতানা, এ. সাহা এবং এম. এ. হক ‘পাওয়ার পয়েন্ট ট্র্যাকার মাউন্টেড সোলার পাওয়ারড ডিসি ইন্ডাকশন কুকার’ শীর্ষক একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন, যা বাংলাদেশ জার্নাল অব সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চে (বিজেএসআইআর) স্থান পায়।
সার্বিকভাবে লোডশেডিং বা গ্যাস সংকটের বিকল্প হিসেবে সোলার কুকার বেশ কার্যকর হলেও এর প্রাথমিক স্থাপন খরচ রয়েছে। তাই পরিবারের দৈনিক রান্নার চাহিদা ও সঠিক সক্ষমতা বিবেচনা করেই এই আধুনিক প্রযুক্তিটি বেছে নেওয়া উচিত।

আপনার মতামত লিখুন