উৎসবের দিনগুলোতে খাবারের আয়োজনে থাকে নানা বৈচিত্র্য। পোলাও, বিরিয়ানি, মাংস, ভাজাপোড়া, মিষ্টি কিংবা চিনিযুক্ত পানীয় - সব মিলিয়ে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেকেই বেশি খেয়ে থাকেন। মাঝেমধ্যে এমন আয়োজন উপভোগ করা স্বাভাবিক হলেও নিয়মিত অতিরিক্ত খাওয়ার অভ্যাস শরীরের বিপাকীয় স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে লিভারেও।
বিশেষ করে টাইপ-২ ডায়াবেটিস, স্থূলত্ব, উচ্চ কোলেস্টেরল কিংবা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সে আক্রান্ত ব্যক্তিদের খাবারের বিষয়ে বাড়তি সচেতন থাকা প্রয়োজন। এসব সমস্যার সঙ্গে ফ্যাটি লিভারের সম্পর্ক রয়েছে।
লিভারের কোষে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি চর্বি জমলে তাকে ফ্যাটি লিভার বলা হয়। বিপাকীয় সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত এই অবস্থার চিকিৎসাবিজ্ঞানের নাম এমএএসএলডি।
ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স থাকলে শরীর ইনসুলিনকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারে না। এতে রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ফ্যাটের বিপাকেও পরিবর্তন আসে। ফলে রক্তের ফ্যাটি অ্যাসিড বেশি পরিমাণে লিভারে পৌঁছে সেখানে চর্বি জমাতে পারে।
শুরুর দিকে সাধারণত স্পষ্ট কোনো উপসর্গ দেখা যায় না। তবে দীর্ঘদিন এই অবস্থা চলতে থাকলে লিভারে প্রদাহ ও কোষের ক্ষতি হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে ফাইব্রোসিস বা সিরোসিসের মতো জটিলতাও দেখা দিতে পারে।
উৎসবের খাবারে প্রায়ই তেল, চিনি, ময়দা ও স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণ বেশি থাকে। অল্প সময়ে এসব খাবার বেশি খেলে শরীরে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ক্যালরি জমা হয়। এর সঙ্গে অনিয়মিত সময়ে খাওয়া, রাতে জেগে খাবার গ্রহণ এবং শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়ার অভ্যাস যুক্ত হলে বিপাকীয় স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
ডায়াবেটিস বা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স থাকলে অতিরিক্ত মিষ্টি ও পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়াতে পারে। দীর্ঘদিন শরীরে প্রয়োজনের অতিরিক্ত শক্তি জমতে থাকলে তার একটি অংশ চর্বিতে রূপান্তরিত হয়ে লিভারে জমার ঝুঁকি তৈরি করে। একইভাবে অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড ফ্যাট রক্তের লিপিডের মাত্রা ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
কয়েকটি শারীরিক ও বিপাকীয় অবস্থার
সঙ্গে ফ্যাটি লিভারের সম্পর্ক রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য-
· টাইপ-২ ডায়াবেটিস
· পেটের চারপাশে অতিরিক্ত মেদ
· রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বেশি থাকা
· উচ্চ রক্তচাপ
· ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স
বিশেষ করে পেটের ভেতরের অঙ্গগুলোর চারপাশে জমে থাকা ভিসেরাল ফ্যাট থেকে ফ্যাটি অ্যাসিড নির্গত হয়ে লিভারে পৌঁছাতে পারে। এতে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স এবং লিভারে চর্বি জমার প্রবণতা বাড়তে পারে।
উৎসবে এক-দুই দিন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি খেলে রাতারাতি ফ্যাটি লিভার তৈরি হয় না। তাই পছন্দের খাবার খাওয়া নিয়ে অযথা দুশ্চিন্তার কারণ নেই।
তবে অতিরিক্ত খাওয়ার অভ্যাস নিয়মিত হয়ে গেলে ঝুঁকি বাড়তে পারে। দীর্ঘদিন বেশি ক্যালরিযুক্ত খাবার গ্রহণ, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, ওজন বৃদ্ধি এবং অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস ফ্যাটি লিভারের আশঙ্কা বাড়ায়।
অ্যালকোহল গ্রহণের বিষয়েও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। আগে থেকেই লিভারের সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যালকোহল পান করা উচিত নয়।
খাবারের আনন্দ বজায় রেখেই লিভারের যত্ন নেওয়া সম্ভব। এ জন্য কয়েকটি
অভ্যাস অনুসরণ করা যেতে পারে-
· একসঙ্গে অনেক খাবার না নিয়ে পছন্দের পদ অল্প পরিমাণে খান।
· খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ফল, ডাল ও আঁশযুক্ত খাবার রাখুন।
· চিনিযুক্ত পানীয়ের বদলে পানি পান করুন।
· খাবারের পর কিছুক্ষণ হাঁটুন।
· প্রতিদিনের শারীরিক কর্মকাণ্ড বজায় রাখুন।
· ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল বা স্থূলত্ব থাকলে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলুন।
উৎসবের আনন্দ উপভোগের পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনে ভারসাম্য রাখাও জরুরি। কারণ সাময়িক আনন্দের জন্য দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি না করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

রোববার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৮ নভেম্বর ২০২৬
উৎসবের দিনগুলোতে খাবারের আয়োজনে থাকে নানা বৈচিত্র্য। পোলাও, বিরিয়ানি, মাংস, ভাজাপোড়া, মিষ্টি কিংবা চিনিযুক্ত পানীয় - সব মিলিয়ে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেকেই বেশি খেয়ে থাকেন। মাঝেমধ্যে এমন আয়োজন উপভোগ করা স্বাভাবিক হলেও নিয়মিত অতিরিক্ত খাওয়ার অভ্যাস শরীরের বিপাকীয় স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে লিভারেও।
বিশেষ করে টাইপ-২ ডায়াবেটিস, স্থূলত্ব, উচ্চ কোলেস্টেরল কিংবা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সে আক্রান্ত ব্যক্তিদের খাবারের বিষয়ে বাড়তি সচেতন থাকা প্রয়োজন। এসব সমস্যার সঙ্গে ফ্যাটি লিভারের সম্পর্ক রয়েছে।
লিভারের কোষে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি চর্বি জমলে তাকে ফ্যাটি লিভার বলা হয়। বিপাকীয় সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত এই অবস্থার চিকিৎসাবিজ্ঞানের নাম এমএএসএলডি।
ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স থাকলে শরীর ইনসুলিনকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারে না। এতে রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ফ্যাটের বিপাকেও পরিবর্তন আসে। ফলে রক্তের ফ্যাটি অ্যাসিড বেশি পরিমাণে লিভারে পৌঁছে সেখানে চর্বি জমাতে পারে।
শুরুর দিকে সাধারণত স্পষ্ট কোনো উপসর্গ দেখা যায় না। তবে দীর্ঘদিন এই অবস্থা চলতে থাকলে লিভারে প্রদাহ ও কোষের ক্ষতি হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে ফাইব্রোসিস বা সিরোসিসের মতো জটিলতাও দেখা দিতে পারে।
উৎসবের খাবারে প্রায়ই তেল, চিনি, ময়দা ও স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণ বেশি থাকে। অল্প সময়ে এসব খাবার বেশি খেলে শরীরে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ক্যালরি জমা হয়। এর সঙ্গে অনিয়মিত সময়ে খাওয়া, রাতে জেগে খাবার গ্রহণ এবং শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়ার অভ্যাস যুক্ত হলে বিপাকীয় স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
ডায়াবেটিস বা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স থাকলে অতিরিক্ত মিষ্টি ও পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়াতে পারে। দীর্ঘদিন শরীরে প্রয়োজনের অতিরিক্ত শক্তি জমতে থাকলে তার একটি অংশ চর্বিতে রূপান্তরিত হয়ে লিভারে জমার ঝুঁকি তৈরি করে। একইভাবে অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড ফ্যাট রক্তের লিপিডের মাত্রা ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
কয়েকটি শারীরিক ও বিপাকীয় অবস্থার
সঙ্গে ফ্যাটি লিভারের সম্পর্ক রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য-
· টাইপ-২ ডায়াবেটিস
· পেটের চারপাশে অতিরিক্ত মেদ
· রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বেশি থাকা
· উচ্চ রক্তচাপ
· ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স
বিশেষ করে পেটের ভেতরের অঙ্গগুলোর চারপাশে জমে থাকা ভিসেরাল ফ্যাট থেকে ফ্যাটি অ্যাসিড নির্গত হয়ে লিভারে পৌঁছাতে পারে। এতে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স এবং লিভারে চর্বি জমার প্রবণতা বাড়তে পারে।
উৎসবে এক-দুই দিন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি খেলে রাতারাতি ফ্যাটি লিভার তৈরি হয় না। তাই পছন্দের খাবার খাওয়া নিয়ে অযথা দুশ্চিন্তার কারণ নেই।
তবে অতিরিক্ত খাওয়ার অভ্যাস নিয়মিত হয়ে গেলে ঝুঁকি বাড়তে পারে। দীর্ঘদিন বেশি ক্যালরিযুক্ত খাবার গ্রহণ, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, ওজন বৃদ্ধি এবং অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস ফ্যাটি লিভারের আশঙ্কা বাড়ায়।
অ্যালকোহল গ্রহণের বিষয়েও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। আগে থেকেই লিভারের সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যালকোহল পান করা উচিত নয়।
খাবারের আনন্দ বজায় রেখেই লিভারের যত্ন নেওয়া সম্ভব। এ জন্য কয়েকটি
অভ্যাস অনুসরণ করা যেতে পারে-
· একসঙ্গে অনেক খাবার না নিয়ে পছন্দের পদ অল্প পরিমাণে খান।
· খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ফল, ডাল ও আঁশযুক্ত খাবার রাখুন।
· চিনিযুক্ত পানীয়ের বদলে পানি পান করুন।
· খাবারের পর কিছুক্ষণ হাঁটুন।
· প্রতিদিনের শারীরিক কর্মকাণ্ড বজায় রাখুন।
· ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল বা স্থূলত্ব থাকলে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলুন।
উৎসবের আনন্দ উপভোগের পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনে ভারসাম্য রাখাও জরুরি। কারণ সাময়িক আনন্দের জন্য দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি না করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

আপনার মতামত লিখুন