সাঁওতালদের সহজ-সরল জীবন, প্রশান্তিময় হাসি ও উচ্ছল আনন্দে ভরা দিনযাপন সংগ্রামের কঠিন পাতাগুলোকেও রঙিন করে তোলে| সভ্যতার প্রান্তে অবস্থান করা আরণ্যক সাঁওতালদের এই সারল্য বহু মনীষীকেই গভীরভাবে মুগ্ধ করেছে— যেমন মুগ্ধ করেছিলেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে| তাদের জীবনঘনিষ্ঠ বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করেই চিত্রশিল্পী জয়নুল আবেদিন আলোড়িত হয়েছিলেন| ছাত্রজীবনেই সাঁওতাল পরগনার দুমকা, ময়ূরাক্ষী নদী এবং সাঁওতালদের ছন্দময় জীবনযাত্রা তার মনে দোলা দিয়েছিল| বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামও এই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবন থেকে প্রেরণা পেয়েছিলেন|
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কেন সাঁওতাল অধ্যুষিত কর্মাটাঁড়কে নিজের আবাস হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন—এই প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর না মিললেও নানা ঘটনা ও প্রেক্ষাপট থেকে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়| একমাত্র পুত্র নারায়ণচন্দ্রের আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে ১৮৭২ সালে তাকে ত্যাজ্য ঘোষণা করেন তিনি| এর কিছুদিন পর প্রিয় স্ত্রীর মৃত্যু তার জীবনে গভীর কূন্যতা তৈরি করে| কেউ কেউ মনে করেন, শহুরে শিক্ষিত সমাজের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে তিনি মানসিক শান্তির খোঁজে কর্মাটাঁড়ে চলে যান| তবে এই ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ গ্রহণযোগ্য নয়| বরং বলা যায়, কাছের মানুষের কাছ থেকে আঘাত ও প্রতারণা পেলেও বিদ্যাসাগরের চরিত্রে আত্মসমর্পণের বদলে সংগ্রামের দৃষ্টান্তই বেশি স্পষ্ট|
সম্ভবত শুরুতে সস্তায় জমি পাওয়া এবং নিরিবিলি পরিবেশে পড়াশোনা ও লেখালেখির উদ্দেশেই তিনি কর্মাটাঁড়কে বেছে নিয়েছিলেন| কিন্তু সেখানে এসে তিনি প্রত্যক্ষ করেন সাঁওতালদের কঠিন জীবনসংগ্রাম—অন্ন-বস্ত্রের অভাব, শিক্ষার অনুপস্থিতি, দারিদ্র্য ও বঞ্চনা| এই বাস্তবতা তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়| তিনি উপলব্ধি করেন, এই মানুষদের পাশে দাঁড়ানোই তার প্রকৃত কর্তব্য| ফলে ব্যক্তিগত সাধ-আহ্লাদকে পাশ কাটিয়ে তিনি আত্মনিয়োগ করেন তাদের উন্নয়নে|
সাঁওতালদের জন্য তিনি প্রতিষ্ঠা করেন অবৈতনিক বিদ্যালয়, চালু করেন দাতব্য চিকিৎসালয়| খাদ্য, বস্ত্র ও আশ্রয়ের মতো মৌলিক চাহিদা পূরণে নিরলসভাবে কাজ করতে থাকেন| একই সঙ্গে নিজের পড়াশোনা ও লেখালেখিও চালিয়ে যান কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে|
১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর জন্ম নেয়া বিদ্যাসাগর ১৮৭৩ সালে জামতাড়া-মধুপুর রেলপথের মাঝামাঝি কর্মাটাঁড়ে একটি বাড়ি ক্রয় করেন| প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে ঘেরা এই বাড়িতেই তিনি জীবনের শেষ ১৮ বছর অতিবাহিত করেন| ‘নন্দন কানন’ নামের এই বাসভবনে বসেই তিনি সাঁওতালদের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলেন| তাদের মধ্যে তিনি খুঁজে পান সরলতা, সততা ও আন্তরিকতার এক বিরল সমš^য়|
সাঁওতালদের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল আত্মীয়তার মতো| কেউ তাকে দাদা, কেউ বাবা, কেউ জেঠা বলে ডাকত| তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বালিকা বিদ্যালয় ও প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য রাত্রিকালীন শিক্ষা কার্যক্রম| বিনামূল্যে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা দিতেন এবং দরিদ্র মানুষের প্রয়োজন মেটাতে অকাতরে সাহায্য করতেন|
সাঁওতালদের সত্যবাদিতা তাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল| একটি ঘটনার বর্ণনায় দেখা যায়, জমি-সংক্রান্ত এক মামলায় মিথ্যা বলতে বাধ্য হলেও সাঁওতালরা শেষ পর্যন্ত সত্য প্রকাশ করে| এই সরল সত্যনিষ্ঠা বিদ্যাসাগরের মনে তাদের প্রতি অটল ভালোবাসা সৃষ্টি করে|
তিনি প্রায়ই বলতেন, ভদ্রসমাজের চেয়ে সাঁওতালদের সান্নিধ্যেই তিনি বেশি আনন্দ পান| তাদের সঙ্গে বসে খাওয়া, গল্প করা, চিকিৎসা করা—সবকিছুতেই তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন এক অনাবিল মানবিকতা| তাদের দুঃখে তিনি কেঁদেছেন, অসুখে ছুটে গিয়েছেন, প্রয়োজন মেটাতে নিজের সামর্থ্যের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছেন|
সাঁওতালদের কাছেও বিদ্যাসাগর ছিলেন আপনজনের চেয়েও বেশি কিছু—একজন আশ্রয়দাতা, পথপ্রদর্শক, এমনকি অনেকের কাছে ঈশ্বরতুল্য| তার অসুস্থতার খবর পেয়ে তারা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠত, আবার তার সামান্য আঘাতেও প্রতিবাদে ফেটে পড়ত|
১৮৯১ সালের ২৯ জুলাই বিদ্যাসাগরের মৃত্যু হলে কর্মাটাঁড়ের সাঁওতালরা গভীর শোকাহত হয়ে পড়ে| তাদের জীবনে তিনি যে মানবিকতার আলো জ্বালিয়েছিলেন, তা আজও ইতিহাসের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে|
বিদ্যাসাগরের এই কর্মযজ্ঞ শুধু সমাজসংস্কারের উদাহরণ নয়, এটি মানুষের প্রতি মানুষের নিঃস্বার্থ ভালোবাসার এক বিরল দলিল| তার কর্মভূমি কর্মাটাঁড় আজও স্মরণ করিয়ে দেয়—প্রকৃত মানবতা কোনো শ্রেণী, জাতি বা অবস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তা হৃদয়ের গভীরতম স্থান থেকেই উৎসারিত হয়|
[লেখক: কলামিস্ট]

শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৫ এপ্রিল ২০২৬
সাঁওতালদের সহজ-সরল জীবন, প্রশান্তিময় হাসি ও উচ্ছল আনন্দে ভরা দিনযাপন সংগ্রামের কঠিন পাতাগুলোকেও রঙিন করে তোলে| সভ্যতার প্রান্তে অবস্থান করা আরণ্যক সাঁওতালদের এই সারল্য বহু মনীষীকেই গভীরভাবে মুগ্ধ করেছে— যেমন মুগ্ধ করেছিলেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে| তাদের জীবনঘনিষ্ঠ বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করেই চিত্রশিল্পী জয়নুল আবেদিন আলোড়িত হয়েছিলেন| ছাত্রজীবনেই সাঁওতাল পরগনার দুমকা, ময়ূরাক্ষী নদী এবং সাঁওতালদের ছন্দময় জীবনযাত্রা তার মনে দোলা দিয়েছিল| বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামও এই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবন থেকে প্রেরণা পেয়েছিলেন|
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কেন সাঁওতাল অধ্যুষিত কর্মাটাঁড়কে নিজের আবাস হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন—এই প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর না মিললেও নানা ঘটনা ও প্রেক্ষাপট থেকে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়| একমাত্র পুত্র নারায়ণচন্দ্রের আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে ১৮৭২ সালে তাকে ত্যাজ্য ঘোষণা করেন তিনি| এর কিছুদিন পর প্রিয় স্ত্রীর মৃত্যু তার জীবনে গভীর কূন্যতা তৈরি করে| কেউ কেউ মনে করেন, শহুরে শিক্ষিত সমাজের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে তিনি মানসিক শান্তির খোঁজে কর্মাটাঁড়ে চলে যান| তবে এই ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ গ্রহণযোগ্য নয়| বরং বলা যায়, কাছের মানুষের কাছ থেকে আঘাত ও প্রতারণা পেলেও বিদ্যাসাগরের চরিত্রে আত্মসমর্পণের বদলে সংগ্রামের দৃষ্টান্তই বেশি স্পষ্ট|
সম্ভবত শুরুতে সস্তায় জমি পাওয়া এবং নিরিবিলি পরিবেশে পড়াশোনা ও লেখালেখির উদ্দেশেই তিনি কর্মাটাঁড়কে বেছে নিয়েছিলেন| কিন্তু সেখানে এসে তিনি প্রত্যক্ষ করেন সাঁওতালদের কঠিন জীবনসংগ্রাম—অন্ন-বস্ত্রের অভাব, শিক্ষার অনুপস্থিতি, দারিদ্র্য ও বঞ্চনা| এই বাস্তবতা তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়| তিনি উপলব্ধি করেন, এই মানুষদের পাশে দাঁড়ানোই তার প্রকৃত কর্তব্য| ফলে ব্যক্তিগত সাধ-আহ্লাদকে পাশ কাটিয়ে তিনি আত্মনিয়োগ করেন তাদের উন্নয়নে|
সাঁওতালদের জন্য তিনি প্রতিষ্ঠা করেন অবৈতনিক বিদ্যালয়, চালু করেন দাতব্য চিকিৎসালয়| খাদ্য, বস্ত্র ও আশ্রয়ের মতো মৌলিক চাহিদা পূরণে নিরলসভাবে কাজ করতে থাকেন| একই সঙ্গে নিজের পড়াশোনা ও লেখালেখিও চালিয়ে যান কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে|
১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর জন্ম নেয়া বিদ্যাসাগর ১৮৭৩ সালে জামতাড়া-মধুপুর রেলপথের মাঝামাঝি কর্মাটাঁড়ে একটি বাড়ি ক্রয় করেন| প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে ঘেরা এই বাড়িতেই তিনি জীবনের শেষ ১৮ বছর অতিবাহিত করেন| ‘নন্দন কানন’ নামের এই বাসভবনে বসেই তিনি সাঁওতালদের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলেন| তাদের মধ্যে তিনি খুঁজে পান সরলতা, সততা ও আন্তরিকতার এক বিরল সমš^য়|
সাঁওতালদের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল আত্মীয়তার মতো| কেউ তাকে দাদা, কেউ বাবা, কেউ জেঠা বলে ডাকত| তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বালিকা বিদ্যালয় ও প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য রাত্রিকালীন শিক্ষা কার্যক্রম| বিনামূল্যে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা দিতেন এবং দরিদ্র মানুষের প্রয়োজন মেটাতে অকাতরে সাহায্য করতেন|
সাঁওতালদের সত্যবাদিতা তাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল| একটি ঘটনার বর্ণনায় দেখা যায়, জমি-সংক্রান্ত এক মামলায় মিথ্যা বলতে বাধ্য হলেও সাঁওতালরা শেষ পর্যন্ত সত্য প্রকাশ করে| এই সরল সত্যনিষ্ঠা বিদ্যাসাগরের মনে তাদের প্রতি অটল ভালোবাসা সৃষ্টি করে|
তিনি প্রায়ই বলতেন, ভদ্রসমাজের চেয়ে সাঁওতালদের সান্নিধ্যেই তিনি বেশি আনন্দ পান| তাদের সঙ্গে বসে খাওয়া, গল্প করা, চিকিৎসা করা—সবকিছুতেই তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন এক অনাবিল মানবিকতা| তাদের দুঃখে তিনি কেঁদেছেন, অসুখে ছুটে গিয়েছেন, প্রয়োজন মেটাতে নিজের সামর্থ্যের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছেন|
সাঁওতালদের কাছেও বিদ্যাসাগর ছিলেন আপনজনের চেয়েও বেশি কিছু—একজন আশ্রয়দাতা, পথপ্রদর্শক, এমনকি অনেকের কাছে ঈশ্বরতুল্য| তার অসুস্থতার খবর পেয়ে তারা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠত, আবার তার সামান্য আঘাতেও প্রতিবাদে ফেটে পড়ত|
১৮৯১ সালের ২৯ জুলাই বিদ্যাসাগরের মৃত্যু হলে কর্মাটাঁড়ের সাঁওতালরা গভীর শোকাহত হয়ে পড়ে| তাদের জীবনে তিনি যে মানবিকতার আলো জ্বালিয়েছিলেন, তা আজও ইতিহাসের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে|
বিদ্যাসাগরের এই কর্মযজ্ঞ শুধু সমাজসংস্কারের উদাহরণ নয়, এটি মানুষের প্রতি মানুষের নিঃস্বার্থ ভালোবাসার এক বিরল দলিল| তার কর্মভূমি কর্মাটাঁড় আজও স্মরণ করিয়ে দেয়—প্রকৃত মানবতা কোনো শ্রেণী, জাতি বা অবস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তা হৃদয়ের গভীরতম স্থান থেকেই উৎসারিত হয়|
[লেখক: কলামিস্ট]

আপনার মতামত লিখুন