সংবাদ

রোজকার পানি কিনে খাওয়া যেখানে স্বাভাবিক


আল শাহারিয়া
আল শাহারিয়া
প্রকাশ: ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৪১ পিএম

রোজকার পানি কিনে খাওয়া যেখানে স্বাভাবিক
এত নদীর দেশে বসে এক গ্লাস সুপেয় পানির জন্য মানুষের এমন সংগ্রাম সত্যিই অবিশ্বাস্য মনে হয়

শহরে আমরা যখন তৃষ্ণা মেটাতে বোতলজাত পানি কিনি তখন সেটি নাগরিক জীবনের একটি অতি সাধারণ চিত্র| অনেক সময় এটি আভিজাত্য, স্বাচ্ছন্দ্য বা স্বাস্থ্য সচেতনতার অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়| কিন্তু বাংলাদেশের দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন| সেখানে প্রতিদিনের খাবার পানি কেনা কোনো শৌখিনতা বা বিলাসিতা নয়| এটি স্রেফ টিকে থাকার এক নির্মম ও রূঢ় সংগ্রাম| চারদিকে থৈ থৈ করছে নদী আর সমুদ্রের জল| অথচ পান করার মতো এক ফোঁটা নিরাপদ ও মিষ্টি পানি তাদের কাছে নেই| নদীমাতৃক এই ভূখণ্ডের সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট কিংবা পটুয়াখালীর বিস্তীর্ণ প্রান্তিক জনপদে গেলে এই বাস্তবতা খুব স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে| এত নদীর দেশে বসে এক গ্লাস সুপেয় পানির জন্য মানুষের এমন সংগ্রাম সত্যিই অবিশ্বাস্য মনে হয়| কিন্তু উপকূলের লাখো মানুষের কাছে এটিই এখন প্রতিদিনের অলঙ্ঘনীয় নিয়তি| 

একসময় এই এলাকার প্রতিটি বাড়িতে নিজস্ব পুকুর ছিল| বৃষ্টির পানি ধরে রাখার প্রাচীন এবং কার্যকর পদ্ধতি এখানকার মানুষের খুব ভালোভাবে জানা ছিল| সমাজবদ্ধভাবে তারা মিষ্টি পানির আধারগুলো সযত্নে রক্ষা করতেন| কিন্তু নব্বইয়ের দশকের পর থেকে এই দৃশ্যপট ক্রমশ বদলাতে শুরু করে| একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়েছে| অন্যদিকে সিডর, আইলা, আম্পান বা রেমালের মতো একের পর এক প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় উপকূলের সমস্ত হিসাব চিরতরে পাল্টে দিয়েছে| জলোচ্ছ্বাসে সমুদ্রের নোনা জল প্রবল বেগে ঢুকে পড়েছে উপকূলের বুক চিরে| নিমেষেই তলিয়ে গেছে মিষ্টি পানির সমস্ত আধার| 

এরপর শুরু হয়েছে আরেক মানবসৃষ্ট এবং ভয়ঙ্কর দুর্যোগ| অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষের জন্য যত্রতত্র বাঁধ কেটে লবণাক্ত পানি লোকালয়ে তোলা হয়েছে| বেশি লাভের আশায় ঘের মালিকরা পরিবেশের যে অপূরণীয় ক্ষতি করেছেন তার চড়া মাশুল গুনছে সাধারণ মানুষ| ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আজ পুরোপুরি পানের অযোগ্য হয়ে পড়েছে| অতিরিক্ত লবণ এবং আর্সেনিকের বিষাক্ত উপস্থিতিতে খাবার পানির এই তীব্র হাহাকার এখন বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে এক স্থায়ী রূপ নিয়েছে| প্রকৃতি ও মানুষের লোভের এই দ্বিমুখী আক্রমণে উপকূলের মিষ্টি পানি আজ শুধুই এক সোনালি অতীত| 

এই বিপন্ন জনপদের মানুষের প্রতিটি সকাল শুরু হয় কেবল এক কলসি পানির সন্ধানে| মাটির কলস বা প্লাস্টিকের পাত্র হাতে নারীদের মাইলের পর মাইল হাঁটার দৃশ্য সেখানে একসময় নৈমিত্তিক ঘটনা ছিল| প্রখর রোদে বা ভারী বৃষ্টিতে হেঁটে এক কলসি পানি আনতে তাদের দিনের একটি বড় অংশ ব্যয় হতো| তবে আজকাল সেই দৃশ্য কিছুটা কমে এসেছে| গ্রামের আঁকাবাঁকা মেঠো পথে এখন নিয়মিত দেখা যায় ইঞ্জিনচালিত ভ্যান| সেই ভ্যানে প্লাস্টিকের বড় বড় জারে করে বিক্রি হচ্ছে খাবার পানি| স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা রিভার্স অসমোসিস প্ল্যান্ট থেকে এই পানি সরবরাহ করা হয়| ভ্যানচালকরা হাঁকডাক দিয়ে পাড়ায় পাড়ায় এই পানি বিক্রি করেন| 

ফিল্টার করা এই পানি কিনে পান করাটাই এখন উপকূলের নতুন স্বাভাবিক চিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে| রোজকার পানি কিনে খাওয়ার এই রীতি এখন তাদের প্রাত্যহিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ| ঘুম থেকে উঠেই তাদের হিসাব করতে হয় আজ কত জার পানি লাগবে এবং তার দাম কীভাবে মেটানো হবে| কিন্তু আমাদের গভীরভাবে ভেবে দেখা দরকার এই স্বাভাবিকতা আসলে কতটা অস্বাভাবিক| বেঁচে থাকার সবচেয়ে আদিম ও মৌলিক উপাদানটি যখন চড়া দামে কিনতে হয় তখন রাষ্ট্রের কল্যাণকামী চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক| 

উপকূলীয় অঞ্চলে খাবার পানির তীব্র সংকট নিয়ে সংবাদমাধ্যমে অনেক প্রতিবেদন হয়| কিন্তু এর আড়ালে সাধারণ মানুষের যে বিশাল অর্থনৈতিক রক্তক্ষরণ হচ্ছে তা নিয়ে আলোচনা খুব কমই চোখে পড়ে| একজন দিনমজুর, জেলে বা প্রান্তিক কৃষক হয়তো সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে সামান্য কিছু টাকা আয় করেন| সেই সামান্য আয়ের একটি বড় অংশ তাকে ব্যয় করতে হয় কেবল পরিবারের খাবার পানি কিনতে| ত্রিশ লিটারের এক জার পানির দাম নেয়া হয় ত্রিশ থেকে পঞ্চাশ টাকা পর্যন্ত| শুষ্ক মৌসুমে বা গ্রীষ্মকালে পানির সংকট বাড়লে এই দাম আরও বেড়ে যায়| 

যে পানি প্রকৃতি থেকে তাদের বিনামূল্যে পাওয়ার কথা ছিল তা আজ চড়া দামে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন তারা| এটি কেবল অর্থনৈতিক শোষণ নয়| এটি প্রান্তিক মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারের চরম লঙ্ঘন| পানির পেছনে এই বাড়তি খরচের কারণে তাদের পুষ্টিকর খাবার কেনার বাজেট বাধ্য হয়ে কমাতে হয়| ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে তাদের হিমশিম খেতে হয়| জরুরি চিকিৎসায় তারা অর্থ ব্যয় করতে পারেন না| ফলে দারিদ্রে?্যর চক্র থেকে তারা কোনোভাবেই বের হতে পারছেন না| পানি নামক এই তৃষ্ণার বাণিজ্য তাদের অর্থনৈতিকভাবে চিরতরে পঙ্গু করে দিচ্ছে| 

সবচেয়ে আশঙ্কার কথা হলো এই চড়া দামে কেনা পানির প্রকৃত মান কেমন! যত্রতত্র গড়ে ওঠা এসব স্থানীয় পানি শোধনাগারে কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা করা হয় না| প্লাস্টিকের নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর জারে করে বছরের পর বছর ধরে একইভাবে পানি বিক্রি হচ্ছে| সেখানে সরকারি কোনো তদারকি বা মান নিয়ন্ত্রণের ন্যূনতম ব্যবস্থা নেই| ফলে গ্রামের সাধারণ মানুষ কষ্টার্জিত টাকা দিয়ে পানি কিনেও মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে মুক্ত হতে পারছেন না| এটি অনেকটা নিরুপায় হয়ে বিষ পানের মতো একটি করুণ অবস্থা| নিরাপদ পানির নামে তারা আসলে কী পান করছেন তা দেখার কেউ নেই| 

এর পাশাপাশি গৃহস্থালির অন্যান্য কাজে বাধ্য হয়ে লবণাক্ত পানি ব্যবহারের ফলে মারাত্মক স্বাস্থ্যগত সংকট তৈরি হচ্ছে| বিশুদ্ধ পানির অভাবে উপকূলের মানুষ নানা ধরনের পানিবাহিত জটিল রোগে ভুগছেন| বিশেষ করে নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্যে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সবচেয়ে ভয়াবহভাবে| গোসল বা কাপড় ধোয়ার মতো নিত্যদিনের কাজে নোনা পানি ব্যবহারে বাধ্য হয়ে তারা জরায়ুর নানা রোগ এবং চর্মরোগসহ দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক জটিলতার শিকার হচ্ছেন| অনেক ক্ষেত্রে এই সমস্যা এতই প্রকট আকার ধারণ করে যে অল্প বয়সেই নারীদের জরায়ু কেটে ফেলতে হয়| এটি এক অবর্ণনীয় মানবিক বিপর্যয় যা নীরবে ঘটে চলেছে| 

পানি কিনে খাওয়ার এই নতুন প্রবণতা আমাদের একটি গভীর রাষ্ট্রীয় সংকটের দিকে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে| রাষ্ট্র যখন নাগরিকদের মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে হোঁচট খায় ঠিক তখনই এমন অমানবিক বাণিজ্যিক সুযোগ তৈরি হয়| মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে কিছু মানুষ রমরমা ব্যবসা ফেঁদে বসেছে| উপকূলের এই পানি সংকটকে কেবল একটি ভৌগোলিক বা প্রাকৃতিক সমস্যা ভাবলে বড় ভুল হবে| এটি একটি জাতীয় সমস্যা এবং এর দ্রুত ও স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন| আমাদের নীতিনির্ধারকদের এই রূঢ় বাস্তবতা অনুধাবন করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি| 

কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর ত্রাণের মতো করে কিছু পানির ট্যাংক বা বোতলজাত পানি পাঠিয়ে এই গভীর সমস্যার সমাধান হবে না| এনজিও বা বেসরকারি সংস্থাগুলোর খণ্ডিত ও সাময়িক উদ্যোগও এর দীর্ঘমেয়াদী সমাধান দিতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে| প্রয়োজন সমন্বিত এবং পরিবেশবান্ধব টেকসই উদ্যোগ| বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য প্রতিটি গ্রামে সরকারি উদ্যোগে বড় আকারের জলাধার বা মেগা রেইনওয়াটার হারভেস্টিং সিস্টেম নির্মাণ করতে হবে| এই জলাধারগুলো নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব স্থানীয় জনগণের হাতে অর্পণ করতে হবে যাতে তারা এর মালিকানা অনুভব করেন| 

পাশাপাশি ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিউনিটি ভিত্তিক উন্নত ও নিরাপদ পানি শোধনাগার স্থাপন করে বিনামূল্যে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে| ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে বেদখল হওয়া পুকুর এবং খালগুলো খনন করে মিষ্টি পানির আধার হিসেবে পুনরায় গড়ে তুলতে হবে| অবৈধভাবে চিংড়ি ঘেরে নোনা পানি তোলা কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে| যারা পরিবেশের ক্ষতি করে নোনা পানি লোকালয়ে ঢোকাচ্ছে তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে| 


[লেখক: শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬


রোজকার পানি কিনে খাওয়া যেখানে স্বাভাবিক

প্রকাশের তারিখ : ১৬ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

শহরে আমরা যখন তৃষ্ণা মেটাতে বোতলজাত পানি কিনি তখন সেটি নাগরিক জীবনের একটি অতি সাধারণ চিত্র| অনেক সময় এটি আভিজাত্য, স্বাচ্ছন্দ্য বা স্বাস্থ্য সচেতনতার অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়| কিন্তু বাংলাদেশের দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন| সেখানে প্রতিদিনের খাবার পানি কেনা কোনো শৌখিনতা বা বিলাসিতা নয়| এটি স্রেফ টিকে থাকার এক নির্মম ও রূঢ় সংগ্রাম| চারদিকে থৈ থৈ করছে নদী আর সমুদ্রের জল| অথচ পান করার মতো এক ফোঁটা নিরাপদ ও মিষ্টি পানি তাদের কাছে নেই| নদীমাতৃক এই ভূখণ্ডের সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট কিংবা পটুয়াখালীর বিস্তীর্ণ প্রান্তিক জনপদে গেলে এই বাস্তবতা খুব স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে| এত নদীর দেশে বসে এক গ্লাস সুপেয় পানির জন্য মানুষের এমন সংগ্রাম সত্যিই অবিশ্বাস্য মনে হয়| কিন্তু উপকূলের লাখো মানুষের কাছে এটিই এখন প্রতিদিনের অলঙ্ঘনীয় নিয়তি| 

একসময় এই এলাকার প্রতিটি বাড়িতে নিজস্ব পুকুর ছিল| বৃষ্টির পানি ধরে রাখার প্রাচীন এবং কার্যকর পদ্ধতি এখানকার মানুষের খুব ভালোভাবে জানা ছিল| সমাজবদ্ধভাবে তারা মিষ্টি পানির আধারগুলো সযত্নে রক্ষা করতেন| কিন্তু নব্বইয়ের দশকের পর থেকে এই দৃশ্যপট ক্রমশ বদলাতে শুরু করে| একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়েছে| অন্যদিকে সিডর, আইলা, আম্পান বা রেমালের মতো একের পর এক প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় উপকূলের সমস্ত হিসাব চিরতরে পাল্টে দিয়েছে| জলোচ্ছ্বাসে সমুদ্রের নোনা জল প্রবল বেগে ঢুকে পড়েছে উপকূলের বুক চিরে| নিমেষেই তলিয়ে গেছে মিষ্টি পানির সমস্ত আধার| 

এরপর শুরু হয়েছে আরেক মানবসৃষ্ট এবং ভয়ঙ্কর দুর্যোগ| অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষের জন্য যত্রতত্র বাঁধ কেটে লবণাক্ত পানি লোকালয়ে তোলা হয়েছে| বেশি লাভের আশায় ঘের মালিকরা পরিবেশের যে অপূরণীয় ক্ষতি করেছেন তার চড়া মাশুল গুনছে সাধারণ মানুষ| ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আজ পুরোপুরি পানের অযোগ্য হয়ে পড়েছে| অতিরিক্ত লবণ এবং আর্সেনিকের বিষাক্ত উপস্থিতিতে খাবার পানির এই তীব্র হাহাকার এখন বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে এক স্থায়ী রূপ নিয়েছে| প্রকৃতি ও মানুষের লোভের এই দ্বিমুখী আক্রমণে উপকূলের মিষ্টি পানি আজ শুধুই এক সোনালি অতীত| 

এই বিপন্ন জনপদের মানুষের প্রতিটি সকাল শুরু হয় কেবল এক কলসি পানির সন্ধানে| মাটির কলস বা প্লাস্টিকের পাত্র হাতে নারীদের মাইলের পর মাইল হাঁটার দৃশ্য সেখানে একসময় নৈমিত্তিক ঘটনা ছিল| প্রখর রোদে বা ভারী বৃষ্টিতে হেঁটে এক কলসি পানি আনতে তাদের দিনের একটি বড় অংশ ব্যয় হতো| তবে আজকাল সেই দৃশ্য কিছুটা কমে এসেছে| গ্রামের আঁকাবাঁকা মেঠো পথে এখন নিয়মিত দেখা যায় ইঞ্জিনচালিত ভ্যান| সেই ভ্যানে প্লাস্টিকের বড় বড় জারে করে বিক্রি হচ্ছে খাবার পানি| স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা রিভার্স অসমোসিস প্ল্যান্ট থেকে এই পানি সরবরাহ করা হয়| ভ্যানচালকরা হাঁকডাক দিয়ে পাড়ায় পাড়ায় এই পানি বিক্রি করেন| 

ফিল্টার করা এই পানি কিনে পান করাটাই এখন উপকূলের নতুন স্বাভাবিক চিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে| রোজকার পানি কিনে খাওয়ার এই রীতি এখন তাদের প্রাত্যহিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ| ঘুম থেকে উঠেই তাদের হিসাব করতে হয় আজ কত জার পানি লাগবে এবং তার দাম কীভাবে মেটানো হবে| কিন্তু আমাদের গভীরভাবে ভেবে দেখা দরকার এই স্বাভাবিকতা আসলে কতটা অস্বাভাবিক| বেঁচে থাকার সবচেয়ে আদিম ও মৌলিক উপাদানটি যখন চড়া দামে কিনতে হয় তখন রাষ্ট্রের কল্যাণকামী চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক| 

উপকূলীয় অঞ্চলে খাবার পানির তীব্র সংকট নিয়ে সংবাদমাধ্যমে অনেক প্রতিবেদন হয়| কিন্তু এর আড়ালে সাধারণ মানুষের যে বিশাল অর্থনৈতিক রক্তক্ষরণ হচ্ছে তা নিয়ে আলোচনা খুব কমই চোখে পড়ে| একজন দিনমজুর, জেলে বা প্রান্তিক কৃষক হয়তো সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে সামান্য কিছু টাকা আয় করেন| সেই সামান্য আয়ের একটি বড় অংশ তাকে ব্যয় করতে হয় কেবল পরিবারের খাবার পানি কিনতে| ত্রিশ লিটারের এক জার পানির দাম নেয়া হয় ত্রিশ থেকে পঞ্চাশ টাকা পর্যন্ত| শুষ্ক মৌসুমে বা গ্রীষ্মকালে পানির সংকট বাড়লে এই দাম আরও বেড়ে যায়| 

যে পানি প্রকৃতি থেকে তাদের বিনামূল্যে পাওয়ার কথা ছিল তা আজ চড়া দামে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন তারা| এটি কেবল অর্থনৈতিক শোষণ নয়| এটি প্রান্তিক মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারের চরম লঙ্ঘন| পানির পেছনে এই বাড়তি খরচের কারণে তাদের পুষ্টিকর খাবার কেনার বাজেট বাধ্য হয়ে কমাতে হয়| ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে তাদের হিমশিম খেতে হয়| জরুরি চিকিৎসায় তারা অর্থ ব্যয় করতে পারেন না| ফলে দারিদ্রে?্যর চক্র থেকে তারা কোনোভাবেই বের হতে পারছেন না| পানি নামক এই তৃষ্ণার বাণিজ্য তাদের অর্থনৈতিকভাবে চিরতরে পঙ্গু করে দিচ্ছে| 

সবচেয়ে আশঙ্কার কথা হলো এই চড়া দামে কেনা পানির প্রকৃত মান কেমন! যত্রতত্র গড়ে ওঠা এসব স্থানীয় পানি শোধনাগারে কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা করা হয় না| প্লাস্টিকের নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর জারে করে বছরের পর বছর ধরে একইভাবে পানি বিক্রি হচ্ছে| সেখানে সরকারি কোনো তদারকি বা মান নিয়ন্ত্রণের ন্যূনতম ব্যবস্থা নেই| ফলে গ্রামের সাধারণ মানুষ কষ্টার্জিত টাকা দিয়ে পানি কিনেও মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে মুক্ত হতে পারছেন না| এটি অনেকটা নিরুপায় হয়ে বিষ পানের মতো একটি করুণ অবস্থা| নিরাপদ পানির নামে তারা আসলে কী পান করছেন তা দেখার কেউ নেই| 

এর পাশাপাশি গৃহস্থালির অন্যান্য কাজে বাধ্য হয়ে লবণাক্ত পানি ব্যবহারের ফলে মারাত্মক স্বাস্থ্যগত সংকট তৈরি হচ্ছে| বিশুদ্ধ পানির অভাবে উপকূলের মানুষ নানা ধরনের পানিবাহিত জটিল রোগে ভুগছেন| বিশেষ করে নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্যে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সবচেয়ে ভয়াবহভাবে| গোসল বা কাপড় ধোয়ার মতো নিত্যদিনের কাজে নোনা পানি ব্যবহারে বাধ্য হয়ে তারা জরায়ুর নানা রোগ এবং চর্মরোগসহ দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক জটিলতার শিকার হচ্ছেন| অনেক ক্ষেত্রে এই সমস্যা এতই প্রকট আকার ধারণ করে যে অল্প বয়সেই নারীদের জরায়ু কেটে ফেলতে হয়| এটি এক অবর্ণনীয় মানবিক বিপর্যয় যা নীরবে ঘটে চলেছে| 

পানি কিনে খাওয়ার এই নতুন প্রবণতা আমাদের একটি গভীর রাষ্ট্রীয় সংকটের দিকে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে| রাষ্ট্র যখন নাগরিকদের মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে হোঁচট খায় ঠিক তখনই এমন অমানবিক বাণিজ্যিক সুযোগ তৈরি হয়| মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে কিছু মানুষ রমরমা ব্যবসা ফেঁদে বসেছে| উপকূলের এই পানি সংকটকে কেবল একটি ভৌগোলিক বা প্রাকৃতিক সমস্যা ভাবলে বড় ভুল হবে| এটি একটি জাতীয় সমস্যা এবং এর দ্রুত ও স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন| আমাদের নীতিনির্ধারকদের এই রূঢ় বাস্তবতা অনুধাবন করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি| 

কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর ত্রাণের মতো করে কিছু পানির ট্যাংক বা বোতলজাত পানি পাঠিয়ে এই গভীর সমস্যার সমাধান হবে না| এনজিও বা বেসরকারি সংস্থাগুলোর খণ্ডিত ও সাময়িক উদ্যোগও এর দীর্ঘমেয়াদী সমাধান দিতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে| প্রয়োজন সমন্বিত এবং পরিবেশবান্ধব টেকসই উদ্যোগ| বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য প্রতিটি গ্রামে সরকারি উদ্যোগে বড় আকারের জলাধার বা মেগা রেইনওয়াটার হারভেস্টিং সিস্টেম নির্মাণ করতে হবে| এই জলাধারগুলো নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব স্থানীয় জনগণের হাতে অর্পণ করতে হবে যাতে তারা এর মালিকানা অনুভব করেন| 

পাশাপাশি ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিউনিটি ভিত্তিক উন্নত ও নিরাপদ পানি শোধনাগার স্থাপন করে বিনামূল্যে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে| ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে বেদখল হওয়া পুকুর এবং খালগুলো খনন করে মিষ্টি পানির আধার হিসেবে পুনরায় গড়ে তুলতে হবে| অবৈধভাবে চিংড়ি ঘেরে নোনা পানি তোলা কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে| যারা পরিবেশের ক্ষতি করে নোনা পানি লোকালয়ে ঢোকাচ্ছে তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে| 


[লেখক: শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত