সংবাদ

ফলন ভালো হলেও দামে ‘অখুশি’ কুষ্টিয়ার কৃষক

আড়াই মণ পেঁয়াজের দামেও মিলছে না এক কেজি ইলিশ!


মিজানুর রহমান লাকী, কুষ্টিয়া
মিজানুর রহমান লাকী, কুষ্টিয়া
প্রকাশ: ২০ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৩০ পিএম

আড়াই মণ পেঁয়াজের দামেও মিলছে না এক কেজি ইলিশ!
কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে পেঁয়াজের বাম্পার ফলন হলেও আড়াই মণ পেঁয়াজের দামে মিলছে না এক কেজি ইলিশ । ছবি : সংবাদ

‘পড়াশোনা শেষ করে আধুনিক পদ্ধতিতে চাষবাস শুরু করেছিলাম। এবার প্রায় ৪৫ বিঘা জমিতে হাইব্রিড জাতের পেঁয়াজ লাগিয়েছি। ফলনও হয়েছে চমৎকার, বিঘাপ্রতি ১০০ থেকে ১২০ মণ। কিন্তু বাজারে যে দাম, তাতে আড়াই মণ পেঁয়াজ বিক্রি করেও এক কেজি ইলিশ মাছের দাম মিলছে না।’-আক্ষেপ আর হতাশা নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার চাপড়া ইউনিয়নের তরুণ চাষি মনিরুল ইসলাম।

তার এই হাহাকার কেবল তার একার নয়, কুষ্টিয়ার কুমারখালী ও আশপাশের হাজারো পেঁয়াজ চাষির। এবার জেলায় পেঁয়াজের বাম্পার ফলন হলেও বাজারে ন্যায্যমূল্য না থাকায় কৃষকেরা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এক মণ পেঁয়াজ উৎপাদনে বীজ, সার, সেচ ও শ্রমিকের মজুরি মিলিয়ে খরচ পড়েছে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। অথচ বর্তমানে স্থানীয় হাটগুলোতে প্রতি মণ পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকায়। অর্থাৎ লাভের বদলে অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচই উঠছে না।

অথচ বাজারে এক কেজি ভালো মানের ইলিশ কিনতে অন্তত ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা খরচ করতে হচ্ছে। সেই হিসেবে আড়াই থেকে তিন মণ পেঁয়াজ বিক্রি করলেও এক কেজি ইলিশের দাম উঠছে না।

উপজেলার বরইচারা গ্রামের কৃষক জহির হোসেন সাড়ে ১১ বিঘা জমিতে পেঁয়াজের আবাদ করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘হাটে পেঁয়াজ নিয়ে গিয়েছিলাম। ৭০০ টাকা মণ দর হওয়ায় বিক্রি না করে বাড়িতে ফেরত এনেছি। এই দামে বেচলে সংসার চলবে না।’

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয়ের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে কুমারখালীতে ৪ হাজার ৯২৮ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১২৮ হেক্টর বেশি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ১ লাখ ৩ হাজার মেট্রিক টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে। কিন্তু স্থানীয় চাহিদা মাত্র ১০ হাজার মেট্রিক টন হওয়ায় এবং বাজারে আমদানি বেশি থাকায় দাম কমে গেছে।

সরেজমিনে বাগুলাট ইউনিয়নের বাঁশগ্রামের মাঠে গিয়ে দেখা যায়, চাষিরা জমি থেকে পেঁয়াজ তুলতে ব্যস্ত। কিন্তু সবার মুখেই দুশ্চিন্তার ছাপ। কৃষক আক্কাস আলী বলেন, গত বছর শেষে প্রতি মণ পেঁয়াজ ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছিল। এবার শুরুর দরেই আমরা বিপাকে। শ্রমিকের মজুরি যেখানে দৈনিক ৭০০ টাকা, সেখানে এক মণ পেঁয়াজও সেই দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।

কুষ্টিয়ার বৃহত্তম পেঁয়াজের হাট পান্টিতে গিয়ে দেখা যায়, বাজারে পেঁয়াজের প্রচুর সরবরাহ। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আমদানিকৃত পেঁয়াজ ও বাজারে নতুন পেঁয়াজের আধিক্যের কারণেই দাম এতো কম।

কুমারখালী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রাইসুল ইসলাম বলেন, ফলন এবার অত্যন্ত ভালো হয়েছে। দাম কিছুটা কম হওয়ায় কৃষকের লাভ কম হচ্ছে।

তবে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে বাজার পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা আখতার।

কৃষকদের দাবি, সরকার যদি সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে পেঁয়াজ সংগ্রহের উদ্যোগ না নেয় অথবা রপ্তানির সুযোগ তৈরি না করে, তবে এবার অনেককেই ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে মাঠ ছাড়তে হবে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬


আড়াই মণ পেঁয়াজের দামেও মিলছে না এক কেজি ইলিশ!

প্রকাশের তারিখ : ২০ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

‘পড়াশোনা শেষ করে আধুনিক পদ্ধতিতে চাষবাস শুরু করেছিলাম। এবার প্রায় ৪৫ বিঘা জমিতে হাইব্রিড জাতের পেঁয়াজ লাগিয়েছি। ফলনও হয়েছে চমৎকার, বিঘাপ্রতি ১০০ থেকে ১২০ মণ। কিন্তু বাজারে যে দাম, তাতে আড়াই মণ পেঁয়াজ বিক্রি করেও এক কেজি ইলিশ মাছের দাম মিলছে না।’-আক্ষেপ আর হতাশা নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার চাপড়া ইউনিয়নের তরুণ চাষি মনিরুল ইসলাম।

তার এই হাহাকার কেবল তার একার নয়, কুষ্টিয়ার কুমারখালী ও আশপাশের হাজারো পেঁয়াজ চাষির। এবার জেলায় পেঁয়াজের বাম্পার ফলন হলেও বাজারে ন্যায্যমূল্য না থাকায় কৃষকেরা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এক মণ পেঁয়াজ উৎপাদনে বীজ, সার, সেচ ও শ্রমিকের মজুরি মিলিয়ে খরচ পড়েছে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। অথচ বর্তমানে স্থানীয় হাটগুলোতে প্রতি মণ পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকায়। অর্থাৎ লাভের বদলে অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচই উঠছে না।

অথচ বাজারে এক কেজি ভালো মানের ইলিশ কিনতে অন্তত ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা খরচ করতে হচ্ছে। সেই হিসেবে আড়াই থেকে তিন মণ পেঁয়াজ বিক্রি করলেও এক কেজি ইলিশের দাম উঠছে না।

উপজেলার বরইচারা গ্রামের কৃষক জহির হোসেন সাড়ে ১১ বিঘা জমিতে পেঁয়াজের আবাদ করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘হাটে পেঁয়াজ নিয়ে গিয়েছিলাম। ৭০০ টাকা মণ দর হওয়ায় বিক্রি না করে বাড়িতে ফেরত এনেছি। এই দামে বেচলে সংসার চলবে না।’

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয়ের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে কুমারখালীতে ৪ হাজার ৯২৮ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১২৮ হেক্টর বেশি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ১ লাখ ৩ হাজার মেট্রিক টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে। কিন্তু স্থানীয় চাহিদা মাত্র ১০ হাজার মেট্রিক টন হওয়ায় এবং বাজারে আমদানি বেশি থাকায় দাম কমে গেছে।

সরেজমিনে বাগুলাট ইউনিয়নের বাঁশগ্রামের মাঠে গিয়ে দেখা যায়, চাষিরা জমি থেকে পেঁয়াজ তুলতে ব্যস্ত। কিন্তু সবার মুখেই দুশ্চিন্তার ছাপ। কৃষক আক্কাস আলী বলেন, গত বছর শেষে প্রতি মণ পেঁয়াজ ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছিল। এবার শুরুর দরেই আমরা বিপাকে। শ্রমিকের মজুরি যেখানে দৈনিক ৭০০ টাকা, সেখানে এক মণ পেঁয়াজও সেই দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।

কুষ্টিয়ার বৃহত্তম পেঁয়াজের হাট পান্টিতে গিয়ে দেখা যায়, বাজারে পেঁয়াজের প্রচুর সরবরাহ। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আমদানিকৃত পেঁয়াজ ও বাজারে নতুন পেঁয়াজের আধিক্যের কারণেই দাম এতো কম।

কুমারখালী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রাইসুল ইসলাম বলেন, ফলন এবার অত্যন্ত ভালো হয়েছে। দাম কিছুটা কম হওয়ায় কৃষকের লাভ কম হচ্ছে।

তবে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে বাজার পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা আখতার।

কৃষকদের দাবি, সরকার যদি সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে পেঁয়াজ সংগ্রহের উদ্যোগ না নেয় অথবা রপ্তানির সুযোগ তৈরি না করে, তবে এবার অনেককেই ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে মাঠ ছাড়তে হবে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত