রক্তের সম্পর্ক কিংবা আত্মার সম্পর্ক— যা হোক না কেন, প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে কারোর মৃত্যু হলে মানুষের মনের মধ্যে শোক এবং স্বজন হারানোর বেদনার মেঘ জমে, তবে সেই মেঘ কালবৈশাখীর তাণ্ডব হয়ে দেখা দেয়, যদি সেই মৃত্যু হয় অস্বাভাবিক কারণে, যেমন অপ্রত্যাশিত আত্মহত্যা কিংবা আকস্মিক দুর্ঘটনা| হয়তো তেমনই কাছের প্রিয় মানুষের হঠাৎ করে চলে যাওয়ার কারণ ছিল নোবেল বিজয়ী জাপানি কথাসাহিত্যিক ইয়াসুনারি কাওয়াবাতার আত্মঘাতীর আড়ালে| কেননা তিনি আত্মহত্যার কারণ সম্পর্কে কোনো চিরকুট (সুইসাইড নোট) রেখে যাননি, যেখানে তিনি নির্দিষ্ট করে বলে গিয়েছেন| তবে বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায় যে, তাঁর আত্মহত্যার বেশ কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ থাকতে পারে, কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো কারণই চূড়ান্ত হিসাবে চিহ্নিত করা যায়নি|
‘ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা: ধোঁয়াশার চাদরে ঢাকা লেখকের আত্মহত্যা’ প্রবন্ধের মূল উদ্দেশ্য হলো যেভাবে তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন, তাঁর অস্বাভাবিক মৃত্যুর আলোচিত সম্ভাব্য কারণ, আত্মঘাতীর আগে তাঁর মানসিক অবস্থা ও শারীরিক অসুস্থতা এবং জাপানি সমাজ ব্যবস্থা ও শিল্প-সাহিত্য মহলে তাঁর আত্মহত্যার প্রভাব| তবে এসবের আগে ইয়াসুনারি কাওয়াবাতার জীবন ও সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দেওয়া হলো| উল্লেখ্য, এই লেখায় লেখকের সাহিত্যকর্মের চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়নি, তবে প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখযোগ্য রচনার কথা এসেছে|
২
সাহিত্যে প্রথম নোবেল পুরস্কার বিজয়ী জাপানি ঔপন্যাসিক এবং ছোটগল্প লেখক ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা ১৮৯৯ সালের ১১ জুন ওসাকা শহরের এক সম্ভ্রান্ত ও সাংস্কৃতিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন| তিনি বিশ্ব সাহিত্যাঙ্গণে ‘অল্প কথার গল্প’ (ফ্ল্যাশ ফিকশন) লেখক হিসাবে বিখ্যাত এবং অত্যন্ত পরিচিত|
ইয়াসুনারি কাওয়াবাতার ˆশশব কেটেছে একাকীত্বে, কারণ পনের বছর বয়সের মধ্যে তিনি পিতা-মাতাসহ নিকটতম অনেক আত্মীয়¯^জন হারিয়েছেন| তিনি ১৯২৪ সালে টোকিও ইম্পেরিয়াল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করার দু’বছর পর, অর্থাৎ ১৯২৬ সালে, প্রথম গ্রন্থ দ্য ডান্সিং গার্ল ইজু প্রকাশ করেন| তাঁর পরবর্তী গ্রন্থ (দ্য স্কারলেট গ্যাং অব আসাকুসা) প্রকাশিত হয় ১৯৩০ সালে| তবে ইংরেজিতে অনূদিত তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে স্নো কান্ট্রি (১৯৫৬), থাউজ্যান্ড ক্রেইনস& (১৯৫৮), দ্য সাউন্ড অব দ্য মাউন্টেন (১৯৭০), মাস্টার অব গো (১৯৭২), বিউটি অ্যান্ড স্যাডনেস (১৯৭৫) এবং দ্য ওল্ড ক্যাপিটাল (১৯৮৭ ও ২০০৬)| এছাড়া পাম অব দ্যা হ্যান্ড স্টোরিজ তাঁর বিখ্যাত ছোটগল্প সংকলন, যা ১৯৮৮ সালে ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়েছে|
ইয়াসুনারি কাওয়াবাতার উপন্যাসে একাকীত্ব, মৃত্যু নিয়ে ব্যস্ততা, বিষাদ এবং সুন্দর ও কুরুচিকর জিনিসের সমš^য়ের বিভিন্ন বিষয় অত্যন্ত গভীরভাবে উঠে এসেছে| তাঁর লেখা ‘ড্যাডা এবং এক্সপ্রেশনিজম’১-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত, যা তাঁর গল্পে চমকপ্রদ চিত্রকল্প ও আকস্মিক পরিবর্তনের ব্যবহার দেখা যায়| এছাড়া তিনি রেনা-গো (সংযুক্ত ছন্দ) কৌশল ব্যবহার করে ঐতিহ্যবাহী জাপানি কাব্যিক ˆশলীর সঙ্গে আধুনিক গল্প বলার কৌশলকে সংমিশ্রণ করেছেন|
ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা তাঁর সংযত, কাব্যময় এবং নিগূঢ় গদ্য রচনার জন্য ১৯৬৮ সালে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন| উল্লেখ্য, নোবেল কমিটি তাঁর তিনটি উপন্যাস উল্লেখ করেছে, স্নো কান্ট্রি, থাউজ্যান্ড ক্রেইনস& এবং দ্য ওল্ড ক্যাপিটাল| তাঁর বিভিন্ন লেখা আন্তর্জাতিক সুধী মহলে প্রচুর প্রশংসা কুড়িয়েছে|
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা দীর্ঘ সময় (১৯৪৮-১৯৬৫) জাপানি পেন-সংস্থার সভাপতি ছিলেন এবং সেই সময় তিনি জাপানি সাহিত্যকে ইংরেজি ও অন্যান্য পশ্চিমা ভাষায় অনুবাদ করানোর পিছনে একটি শক্তিশালী প্রেরণাশীল উদ্যোক্তা হিসাবে কাজ করেছেন|
ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা ১৯৭২ সালে কানাগাওয়া প্রদেশের জুশি শহরে আত্মহত্যা করেন| বলা হয়, জীবনের শেষ দিকে ভগ্ন স্বা এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মৃত্যুর শোক সহ্য করতে না পারা ছিল তাঁর অস্বাভাবিক মৃত্যুর কারণ| অথচ নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করার সময় তিনি বলেছিলেন যে, তিনি তাঁর লেখায় মৃত্যুকে সুন্দর করার চেষ্টা করেছেন এবং মানুষ, প্রকৃতি ও শূন্যতার মধ্যে সামঞ্জস্য খুঁজতে চেয়েছেন|
৩
আত্মঘাতী হওয়ার আগে থেকেই ইয়াসুনারি কাওয়াবাতার মধ্যে আত্মহননের বিষয়টি কাজ করেছিল| বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায়, তিনি আত্মহত্যা করার আগে ভীষণ অস্থিতিশীল মানসিক অবস্থায় ছিলেন| তিনি রাতে ঘুমাতে পারতেন না| তিনি শারীরিক রোগে কষ্ট পাচ্ছিলেন, যার জন্য সব সময় নিরাশ ও হতাশ অনুভব করতেন এবং প্রায়ই বিষণ্ন ও একাকী থাকতেন| এছাড়া তিনি তাঁর সাহিত্যিক অর্জন নিয়ে হতাশ ছিলেন| তাই হয়তো কোনো এক সময় তিনি একটা চিরকুট লিখেছিলেন, যেখানে লেখা ছিল, ‘আমি সেই স্তরে পৌঁছে গেছি, যেখানে আমি আর এসব কিছু সহ্য করতে পারছি না এবং আমি আর এগোতে পারব না|’
৪
দিনটি ছিল রবিবার, ১৬ এপ্রিল ১৯৭২| আনুমানিক দুপুর ৩টায় ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা দক্ষিণ ইয়োকোহামার অদূরে জুশি শহরের সমুদ্রের পাড়ে অবস্থিত অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের উদ্দেশ্যে নিজেদের বাসা থেকে বেরিয়ে যান| তিনি সেই অ্যাপার্টমেন্টটি ভাড়া নিয়েছিলেন এবং নিজের লেখালেখির অফিস হিসাবে ব্যবহার করতেন| তিনি যাওয়ার আগে তাঁর স্ত্রীকে বলেছিলেন যে, হাঁটাহাঁটির জন্য বাইরে যাচ্ছেন|
যখন ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা রাতের দিকে ফিরতে ব্যর্থ হন, তখন একজন কাজের মানুষ সেই অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে যায়| কক্ষের দরজাটি শেকল দিয়ে বন্ধ ছিল এবং ভেতর থেকে শক্তিশালী গ্যাসের উৎকট গন্ধ বের হচ্ছিল| তৎক্ষণাৎ পুলিশকে ডাকা হয়েছিল| পুলিশ এসে দরজা খুলে তাঁকে বাথরুমের মেঝেতে শুয়ে থাকতে দেখে এবং তাঁর মুখে কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসের নল লাগানো ছিল| তাঁর স্ত্রী এবং অন্য অনেক ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও বন্ধু মনে করেন যে, তাঁর মৃত্যু ছিল দুর্ঘটনা| তাঁরা বলেছিলেন যে, তিনি গোসলের জন্য আনজাম করার সময় ভুলক্রমে গ্যাসের নলটি খুলে ফেলেছিলেন| তবে কাছাকাছি জায়গায় হুইস্কির একটি খালি বোতল ছিল এবং ময়নাতদন্ত করার পর পাওয়া গেছে যে, মৃত্যুর আগে তিনি মদ্যপান করেছিলেন| তাঁর গায়ে ছিল পোলো শার্ট এবং তিনি বিজনেস স্যুট পরেছিলেন|
যাহোক, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ইয়াসুনারি কাওয়াবাতার দায়িত্বশীল ডাক্তার দ্রুত অ্যাপার্টমেন্টে ছুটে যান| যদিও তখন তাঁর হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, তবুও ডাক্তার কৃত্রিমভাবে অক্সিজেন দিয়েছিলেন এবং আশা করেছিলেন যে, হয়তো অলৌকিক ঘটনা ঘটবে| কিন্তু শেষ পর্যন্ত ডাক্তারের সমস্ত চেষ্টা বৃথা যায়|
মৃতদেহ, চোখের মণি এবং ত্বকের নিচে রক্তক্ষরণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর ঘটনাস্থলে থাকা ফরেনসিক চিকিৎসক বলেন, ‘এটা স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে যে, তিনি শ্বাসের সঙ্গে বিষাক্ত গ্যাস সেবন করে আত্মহত্যা করেছেন| শ্বাস-প্রশ্বাসের কষ্টের জন্য তাঁর পিঠে উজ্জ্বল লাল রঙের চিহ্ন রয়েছে, যা গ্যাসের বিষক্রিয়ার কারণে হয়েছে| সত্যি, অদ্ভুত লক্ষণ|’ তিনি আরও যোগ করে বলেন, ‘সন্ধ্যা ছয়টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়েছে| মৃতের অভিব্যক্তি শান্ত ছিল, যা হয়তো জীবনের সুখী সমাপ্তির ইঙ্গিত দিয়েছিল|’
ইয়াসুনারি কাওয়াবাতার অস্বাভাবিক মৃত্যুর খবর শুধু জাপানি সাহিত্য মহলে নয়, বরং পুরো বিশ্বকে হতবাক ও শোকাহত করে দিয়েছিল| পরের দিন বিখ্যাত ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর প্রথম পৃষ্ঠার নিচের ডান কোণে একটি বিশেষ নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল|
ইয়াসুনারি কাওয়াবাতার আত্মহত্যার সম্ভাব্য কারণ ও বিশেষজ্ঞদের অভিমত
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাস সেবন করে আত্মঘাতী হয়েছেন ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা| জানা যায়, মৃত্যুর আগে তিনি আত্মহত্যার কারণ হিসাবে কোনো চিরকূট লিখে যাননি, এমনকি তিনি তাঁর লেখায় নিজের জীবন নেওয়ার বিষয় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে আলোচনাও করেননি| তাই তাঁর আত্মহত্যার প্রেরণা কিংবা কারণ এখনো বিতর্কিত এবং অস্পষ্ট রয়ে গেছে|
কিছু মানুষ বিশ্বাস করেন যে, ইয়াসুনারি কাওয়াবাতার আত্মহত্যা শারীরিক অসুস্থতা এবং মানসিক চাপের কারণে হয়েছিল| আবার অনেকে মনে করেন যে, তাঁর আত্মহত্যা সাহিত্যিক অর্জনের প্রতি অসন্তুষ্টি এবং হতাশার কারণে মৃত্যু হয়েছে| অন্যদিকে কেউ কেউ বলেন যে, আত্মহননের আগে তিনি সংক্রমিত পিত্তথলির সমস্যায় কষ্ট পাচ্ছিলেন| এছাড়া অনেকে মনে করেন যে, তিনি ঘুমের ওষুধের বিষক্রিয়ার জন্য হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন| একজন বলেছিল যে, ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা তাঁর বন্ধু ইউকিও মিশিমা২-র আত্মহত্যার খবর শুনে গভীরভাবে শোকার্ত ছিলেন|
ইয়াসুনারি কাওয়াবাতার মৃত্যুর কারণ বা প্রেরণা সম্পর্কিত জাপানি সাহিত্যিক মহল এবং অন্যান্য ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের সবসময় বিভিন্ন মত পোষণ করেছেন, তবে প্রধান অনুমান কিংবা তত্ত্ব মূলত নিম্নলিখিত এক বা একাধিক কারণের ওপর নির্ভর করে, যেমন:
১. শারীরিক অসুস্থতা এবং ভগ্নস্বাস্থ্য: ইয়াসুনারি কাওয়াবাতার আত্মহত্যার পরের দিন (অর্থাৎ ১৭ এপ্রিল) জাপানের বহুল পরিচিত ˆদনিক পত্রিকা সাহী শিনবুন রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল এবং সেখানে বলা হয়েছিল: ‘তাঁর (ইয়াসুনারি কাওয়াবাতার) মৃত্যুর এক রাত হয়েছে, কিন্তু তাঁর আত্মীয় স্বজন এবং বন্ধুদের মধ্যে এখনো সন্দেহ রয়েছে এবং অনেকেই অনুমান করছেন যে, তাঁর হয়তো ক্যান্সারের মতো কোনো মারাত্মক রোগ ছিল| জানা যায়, ইউসুনারি কাওয়াবাতা অসুস্থতার (তীব্র অ্যাপেন্ডিসাইটিস) কারণে এক মাস আগে (৭ু১৫ মার্চ) হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন| তখন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সমস্ত দর্শনার্থী এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের আগমন নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল| তবে অস্ত্রোপচারের পর তিনি ভালোভাবে সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন|
২. ˆশশবের বিয়োগান্তক অভিজ্ঞতা: ইয়াসুনারি কাওয়াবাতার শিশু কালীন অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে জানা যায় যে, তাঁর জীবনে অসহায়ত্ব কীভাবে প্রকাশ পেয়েছে এবং পরবর্তীতে তাঁর কাছে মনে হয়েছিল, জীবন আসলে অর্থহীন|
যখন ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা মাত্র দেড় বছরের ছিলেন, তখন তাঁর পিতা যক্ষা রোগে মৃত্যু বরণ করেন| পিতার মৃত্যুর এক বছরের মধ্যে তাঁর মা-ও একই রোগে মারা যান| তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র আড়াই বছর| সেই বয়সে তিনি বুঝতে পারেননি যে, তাঁর সঙ্গে ভাগ্য কেন এমন অন্যায় করছে| পরে ১৯০৯ সালের জুলাই মাসে তাঁর একমাত্র বড় বোন ইয়োশিকো জ্বর ও হৃৎপিণ্ডের অসুখে মারা যায়| শুধু তাই নয়, ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা দাদা ও দাদীর মৃত্যুর অভিজ্ঞতা অনুভব করেছিলেন, যাদের উপর তিনি নির্ভর করেছিলেন| এ কথা স্পষ্ট যে, ˆশশবে স্বজন হারানোর বিয়োগান্তক অভিজ্ঞতা তাঁর মানসিক অবসাদের ওপর বিশাল প্রভাব ফেলেছিল| জানা যায়, পরিবারের অসংখ্য দাফনের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার কারণে তাঁকে ডাকনাম দেওয়া হয়েছিল: ‘দাফনে উপস্থিত হওয়া সেলিব্রিটি|’
৩. দীর্ঘ সময় ঘুমের ওষুধ ব্যবহারের প্রতিক্রিয়া: ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা হাই স্কুলে পড়াকালীন সময়ে ঘুমের ওষুধ সেবন করা শুরু করেছিলেন| ছোটবেলায় তাঁর ঘুম ছিল হালকা এবং তিনি খুবই সংবেদনশীল ছিলেন| তাই তাঁকে নিয়মিত ঘুমের ওষুধ খেতে হতো| এই অভ্যাস থেকে তিনি বিবাহিত জীবনেও মুক্তি পাননি| এ প্রসঙ্গে স্ত্রী হিদেকো নিজের স্মৃতিচারণায় লিখেছেন যে, তাঁর ¯^ামী খুব বেশি ঘুমের ওষুধ খেতেন এবং দিনের বেলাও ঘুমের ওষুধের কার্যকারিতা থাকত না| তবে দিনের বেলা অনেক সময় চলাফেরা করার সময় তিনি খুঁটির সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছেন| তিনি জীবনে কখনো ঘুমের ওষুধ ছাড়েননি|
এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে| মৃত্যুর এক সপ্তাহ আগে (১০ এপ্রিল) ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা তাঁর প্রিয় নাপিতের দোকানে চুল কাটাতে গিয়েছিলেন| তবে সেদিন নাপিতের দোকানের মালিক তাঁর আচরণ সাধারণ অবস্থা থেকে ভিন্ন লক্ষ্য করেছিল, বিশেষ করে তাঁর ক্রমাগত দুশ্চিন্তায় শরীর নড়াচড়া করা, আঙুল দিয়ে অযথা চুলে বিলি কাটা, এবং তাঁকে খুবই অস্থির দেখাচ্ছিল| নাপিত তাঁকে বলেছিল, ‘আপনি ভীষণ ক্লান্ত|’ জবাবে তিনি (ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা) ক্লান্ত-অবসন্ন মলিন গলায় বলেছিলেন, ‘আসলে আমি চার রাত ধরে ঘুমাইনি|’
যাহোক, পরবর্তীতে নাপিতের সঙ্গে এই কথোপকথন মানুষদের মধ্যে ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা ঘুমানোর ওষুধ খাওয়া নিয়ে কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছিল| তাই কিছু জাপানি পণ্ডিত এবং গবেষক মনে করেন যে, কাওয়াবাতা ঘুমের ওষুধের বিষক্রিয়ায় মারা গেছেন|
৪. অতিরিক্ত মানসিক চাপ: ইয়াসুনারি কাওয়াবাতার নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির পর পুরো জাপান আনন্দ-উল্লাসে মাতোয়ারা ছিল, এমনকি এ ঘটনা নিয়ে সংবাদপত্র ধারাবাহিক প্রবন্ধ প্রকাশ করেছিল| সম্রাট হিরোহিতো ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে শুভেচ্ছা জানাতে প্রাসাদের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং প্রধানমন্ত্রী আইসাকু সাতোর মাধ্যমে ফোন করেছিলেন| জানা যায়, সেই সাক্ষাতের পর থেকে ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা কোনো উল্লেখযোগ্য রচনা লিখতে পারেননি| একজন সামাজিক সেলিব্রেটি হিসাবে তাঁর ওপরে অতিরিক্ত মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়েছিল এবং অনেকের মতে সেই চাপ থেকে মুক্তির উপায় হিসাবে তিনি আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন|
৫. মানসিকভাবে ভেঙে পড়া এবং সাহিত্যিক সংকট: চীনের ওপর জাপানের আগ্রাসনের সময়২ ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা জাপানি সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসী সেনাবাহিনীর সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেছেন এবং অপরাধমূলক কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করার জন্য গোপনে তিনি চীনে প্রবেশ করেছিলেন| দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান আত্মসমর্পণ করার পর তিনি জাপানি সাম্রাজ্যবাদের পরাজয়ের জন্য ভীষণভাবে মর্মাহত হন| এ প্রসঙ্গে তিনি তাঁর একাধিক প্রবন্ধে লিখেছিলেন যে, জাপান আত্মসমর্পণ করার পর তাঁর ‘দুঃখ’ প্রতিটি হাড়ের ভেতর প্রবেশ করেছে| তাঁর সেই মানসিক টানাপোড়েন প্রসঙ্গে গবেষক এবং পণ্ডিত ব্যক্তিরা উল্লেখ করেছেন যে, ‘কাওয়াবাতার রাজনৈতিক অবনতি অবশ্যম্ভাবীভাবে মানসিক ধ্বংস এবং সাহিত্যিক সংকটে নিয়ে যাবে, যা তাঁকে আত্মহত্যার দিকে নিয়ে ঠেলে দিতে পারে|’
৬. ইউকিও মিশিমার আত্মহনন: কয়েকজন জাপানি পণ্ডিত এবং লেখক ইয়াসুনারি কাওয়াবাতার আত্মঘাতীর উদ্দেশ্য নিয়ে অনুমান করেছিলেন এবং তাঁরা বিশ্বাস করেছিলেন যে, ইউকিও মিশিমার আত্মহনন শেষ পর্যন্ত ইয়াসুনারি কাওয়াবাতার মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে| তবে তাঁর জাপানি জীবনী লেখক, তাকেও ওকুনো, বর্ণনা করেছেন যে, তিনি (ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা) ইউকিও মিশিমার মৃত্যুর পর বের কয়েক মাস ধারাবাহিকভাবে দুঃ¯^প্ন দেখেছেন এবং মিশিমার আতঙ্ক তাঁকে অবিরত তাড়া করেছে| এমন স্থায়ীভাবে মনোবলহীন অবস্থায় তিনি জীবনের শেষ দিকে প্রায়ই বন্ধুদের বলতেন যে, তিনি মাঝে মধ্যে আশা করতেন যে একদিন তাঁর বিমান দুর্ঘটনায় আছড়ে পড়বে|
৭. টোকিওর গভর্নরের নির্বাচনে আকিরা হাতানোর পরাজয়: অনেক জাপানি পণ্ডিত এবং বিশিষ্ট লোকজন এই মতকে সমর্থন করেন| ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা একবার প্রকাশ্যে পুলিশ প্রধান আকিরা হাতানোকে টোকিওর গভর্নর পদে নির্বাচনে সমর্থন করেছিলেন| তিনি মনে করেছিলেন যে, হাতানো নিজের মর্যাদা ও খ্যাতি দিয়ে নির্বাচনে সফল হবেন, কিন্তু তিনি অপ্রত্যাশিতভাবে ব্যর্থ হন| ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা এই আঘাত সহ্য করতে পারেননি এবং হয়তো আত্মহত্যায় স্বস্তি খুঁজতে বাধ্য হন|
যাহোক, উপরোল্লিখিত কোনো অনুমান কিংবা তত্ত্ব প্রমাণিত হয়নি| তাই ইয়াসুনারি কাওয়াবাতার আত্মহননের প্রেরণা কিংবা কারণ এখনো বিতর্কিত এবং অস্পষ্ট রয়ে গেছে, হয়তো অধরাই থেকে যাবে|
জাপানী সমাজ ব্যবস্থা ও শিল্প-সাহিত্যে ইয়াসুনারি কাওয়াবাতার আত্মহত্যার প্রভাব: ইয়াসুনারি কাওবাতার আত্মহত্যা জাপানি সমাজ ও শিল্প-সাহিত্য জগতে গভীর প্রভাব ফেলেছে এবং জাপানি সংস্কৃতিতে আত্মহত্যা নিয়ে আরও মনোযোগ এবং প্রতিফলন এনেছে, যেমন:
১. জাপানি সাহিত্য জগতের প্রতিক্রিয়া: ইয়াসুনারি কাওয়াবাতার আত্মহত্যা জাপানি সাহিত্য জগতের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ ও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে| অনেক সহকর্মী এবং পাঠক তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন| এছাড়া অনেক সাহিত্য সমালোচকও তাঁর সাহিত্যকর্মকে পুনর্মূল্যায়ন এবং বিশ্লেষণ করেছেন|
২. সামাজিক প্রতিক্রিয়া: ইয়াসুনারি কাওয়াবাতার আত্মহত্যা জাপানি সমাজেও ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে| অনেকেই মনে করেন যে, তাঁর আত্মহত্যা জাপানি সমাজের অনেক সমস্যার প্রতিফলন, যেমন সাংস্কৃতিক চাপ, কর্মস্থলের চাপ এবং শারীরিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যা ঘটিয়েছে| এছাড়া তাঁর আত্মহত্যা পর জাপানি সমাজে আত্মহত্যার প্রতি মনোযোগও বৃদ্ধি পেয়েছে| অনেক মানুষ আত্মহত্যা রোধ এবং মানসিক অসুস্থতার দিকে নজর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছে এবং সংশ্লিষ্ট গবেষণা ও সচেতনতা মূলক কাজ শুরু করেছে|
৩. জাপানি সংস্কৃতি: ইয়াসুনারি কাওবাতার আত্মহত্যা জাপানি সংস্কৃতিতে বিভিন্নভাবে গভীর প্রভাব ফেলেছিল, যেমন:
— তাঁর গ্রন্থাবলি জাপানি সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠে এবং তাঁর আত্মহত্যা জাপানি সংস্কৃতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসাবে ধরা হয়েছে;
— অনেকেই বিশ্বাস করেন যে, ইয়াসুনারি কাওবাতার আত্মহত্যা জাপানি সংস্কৃতিতে কিছু সমস্যাকে চিহ্নিত করেছে, যেমন সাফল্য এবং অর্জনের অতিরিক্ত অনুসরণ, শারীরিক স্বাস্থ্যের অবহেলা ইত্যাদি;
— ইয়াসুনারি কাওবাতার আত্মহত্যা জাপানি সংস্কৃতিতে আত্মহত্যা নিয়ে আরও মনোযোগ এবং প্রতিফলন এনেছে| জাপানি সমাজ আত্মহত্যা প্রতিরোধ এবং মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে গবেষণা এবং প্রচারণায় মনোনিবেশ করতে শুরু করে, যাতে আত্মহত্যার ঘটনা কমানো যায়|
ইয়াসুনারি কাওবাতার রহস্যময় মৃত্যুর চুয়ান্ন বছর পরও বিষয়টি বিতর্কিত: তাঁর মৃত্যু কি দুর্ঘটনা ছিল, নাকি আত্মহত্যা?
তবে বিভিন্ন তথ্য সূত্রে ইয়াসুনারি কেন আত্মহত্যা করেছেন, এ বিষয়ে গবেষকরা এখনো স্পষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি| তাই আজও ধোঁয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ে আছে তাঁর আত্মহত্যার আসল কারণ| যদিও তাঁর সৃজনশীল সাহিত্যকর্ম তুলনামূলকভাবে জটিল ছিল এবং প্রথম ও শেষ দিকের রচনায় ভিন্ন রাজনৈতিক ধারা প্রতিফলিত হয়েছিল, তবে মৃত্যুর আগে তিনি এমন কোনো লক্ষণ দেখাননি কিংবা কোনো চিরকুট লিখে যাননি, যা থেকে প্রমাণিত হয় যে তিনি আত্মহত্যা করেছেন| তবে তিনি শারীরিক ও মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন| আর এ কারণে গবেষক এবং মনোবিজ্ঞানীদের পর্যালোচনা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পাল্লা আত্মঘাতীর দিকেই বেশি ভারি|
হয়তো আগামীতে কখনো সেই ধোঁয়া কেটে গিয়ে সত্যের মুখ দেখবে, হয়তো কোনোদিনই জানা যাবে না তাঁর আত্মহত্যার আড়ালে লুকিয়ে থাকা আসল কারণ এবং অধরাই থেকে যাবে|
এ কথা সত্যি যে, ইয়াসুনারি কাওবাতার আত্মহত্যা জাপানি সমাজ ও শিল্প-সাহিত্য জগতে গভীর প্রভাব ফেলেছে এবং একই সঙ্গে আত্মহত্যার ঘটনা কমানোর জন্য সচেনতা ও মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে গবেষণা এবং প্রচারণা শুরু হয়েছে|
পরিশেষে বলা যায় যে, ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা জীবনে যা বিশ্বাস করতেন কিংবা বলেছেন, অথচ দেখা যায় বাস্তবে তিনি বিপরীত কাজ করেছেন| এ প্রসঙ্গে দু’টি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে, যেমন:
১. বিখ্যাত মার্কিন অভিনেত্রী মেরিলিন মনরো অতিরিক্ত ঘুমের ঔষধ খেয়ে ১৯৬২ সালের ৪ আগস্ট আত্মহত্যা করেন| তাঁর মৃত্যুর পর ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা বলেছিলেন, ‘যদি এটি আত্মহত্যার ঘটনা হয়, তবে কোনো চিরকুট না রেখে যাওয়াই ভালো| নীরব মৃত্যু হলো একটি অনন্ত শব্দ|’ ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! দশ বছর পরে সেই কথাটি তাঁর নিজের সমাধিসূচক বাক্য হয়ে ওঠে: ‘তিনি কোনো চিরকুট রেখে যাননি|’
২. স্টকহোমে নোবেল বক্তৃতায় তিনি আত্মহত্যার বিভিন্ন সমস্যার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন এবং তিরস্কার করে বলেছিলেন: ‘একজন ব্যক্তি বিশ্বের সব কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হোক না কেন, আত্মহত্যা কোনো সম্মানযোগ্য সমাধান নয়| যতটা প্রশংসনীয় হোক না কেন, যে মানুষ আত্মহত্যা করে, সে জ্ঞানের আলোকিত রাজ্য থেকে অনেক দূরে থাকে|’
টীকা:
১ ড্যাডাইজম হলো এক ধরনের শিল্প-সংস্কৃতি এবং যুদ্ধ-বিরোধী আন্দোলন| প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে (১৯১৬-১৯২০) জুরিখে (সুইজারল্যান্ড) উদ্ভব হয়েছিল| তখন অনেকেই বিশ্বাস করত যে, যুদ্ধ এবং জাতীয়তাবাদের প্রতিক্রিয়া হিসাবে ড্যাডাইজম অত্যন্ত জরুরি| অন্যদিকে এক্সপ্রেশনিজম ব্যক্তিগত আবেগপূর্ণ প্রকাশ এবং অন্তর্মুখী অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভরশীল| এটি মূলত বিংশ শতাব্দীর শুরুতে জার্মানিতে বিকশিত হয়েছে|
২ চীনের ওপর জাপানের আগ্রাসন শুরু করেছিল ১৮ই সেপ্টে¤^র, ১৯৩১ সালে, যখন জাপান চীনের মানচুরিয়া প্রদেশে আক্রমণ করেছিল| তারপর ১৯৩৭ সালের ৭ই জুলাই থেকে মার্কো পোলো ব্রিজ ঘটনার মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসন শুরু হয়েছিল, যা ‘দ্বিতীয় চীন-জাপান যুদ্ধ’ হিসাবে পরিচিত| দুই দেশের সেই দ্বন্দ্ব চলতে থাকে ১৯৪৫ পর্যন্ত|
৩ ইউকিও মিশিমা ছদ্মনাম এবং তাঁর আসল নাম কিমিতাকে হিরাওকা (১৯২৫ু১৯৭০)| তিনি একজন জাপানি লেখক, নাট্যকার, অভিনেতা, মার্শাল আর্টস অনুশীলন শিক্ষক এবং মডেল| তিনি উগ্রপন্থী রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন এবং একটি অভ্যুত্থানের নেতা ছিলেন| কিন্তু দুর্ভাগ্য ক্রমে অভ্যুত্থান সফল হয়নি| ফলে তাঁকে জাপানের সনাতন পদ্ধতি সেপুকু বা হারা-কিরি) করে ১৯৭০ সালের ২৫ নভেম্বর আত্মঘাতী হতে হয়েছিলেন| তিনি ইয়াসুনারি কাওবাতার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন|
৪ আকিরা হাতানো (১৯১১-২০০২) জাপানি রাজনীতিবিদ| তিনি ১৯৮২ থেকে ১৯৮৩ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী ইয়াসুহিরো নাকাসোনের অধীনে বিচার মন্ত্রী করেছিলেন| তিনি ১৯৭১ সালে টোকিওর গভর্নর পদে নির্বাচন করেছিলেন এবং পরাজিত হন|
কৃতজ্ঞতা স্বীকার: বর্তমান প্রবন্ধ লেখার জন্য আমি আমি বিভিন্ন সূত্র, যেমন বিভিন্ন গবেষণা পত্র ও রচনা, খবরের কাগজে প্রকাশিত প্রবন্ধ ও নিবন্ধ, অনলাইন ম্যাগাজিন এবং এমনকি মনস্তাত্ত্বিক জার্নালে প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্য ব্যবহার করেছি| আমি সমস্ত লেখকদের কাছে বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ|

বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৩ এপ্রিল ২০২৬
রক্তের সম্পর্ক কিংবা আত্মার সম্পর্ক— যা হোক না কেন, প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে কারোর মৃত্যু হলে মানুষের মনের মধ্যে শোক এবং স্বজন হারানোর বেদনার মেঘ জমে, তবে সেই মেঘ কালবৈশাখীর তাণ্ডব হয়ে দেখা দেয়, যদি সেই মৃত্যু হয় অস্বাভাবিক কারণে, যেমন অপ্রত্যাশিত আত্মহত্যা কিংবা আকস্মিক দুর্ঘটনা| হয়তো তেমনই কাছের প্রিয় মানুষের হঠাৎ করে চলে যাওয়ার কারণ ছিল নোবেল বিজয়ী জাপানি কথাসাহিত্যিক ইয়াসুনারি কাওয়াবাতার আত্মঘাতীর আড়ালে| কেননা তিনি আত্মহত্যার কারণ সম্পর্কে কোনো চিরকুট (সুইসাইড নোট) রেখে যাননি, যেখানে তিনি নির্দিষ্ট করে বলে গিয়েছেন| তবে বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায় যে, তাঁর আত্মহত্যার বেশ কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ থাকতে পারে, কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো কারণই চূড়ান্ত হিসাবে চিহ্নিত করা যায়নি|
‘ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা: ধোঁয়াশার চাদরে ঢাকা লেখকের আত্মহত্যা’ প্রবন্ধের মূল উদ্দেশ্য হলো যেভাবে তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন, তাঁর অস্বাভাবিক মৃত্যুর আলোচিত সম্ভাব্য কারণ, আত্মঘাতীর আগে তাঁর মানসিক অবস্থা ও শারীরিক অসুস্থতা এবং জাপানি সমাজ ব্যবস্থা ও শিল্প-সাহিত্য মহলে তাঁর আত্মহত্যার প্রভাব| তবে এসবের আগে ইয়াসুনারি কাওয়াবাতার জীবন ও সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দেওয়া হলো| উল্লেখ্য, এই লেখায় লেখকের সাহিত্যকর্মের চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়নি, তবে প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখযোগ্য রচনার কথা এসেছে|
২
সাহিত্যে প্রথম নোবেল পুরস্কার বিজয়ী জাপানি ঔপন্যাসিক এবং ছোটগল্প লেখক ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা ১৮৯৯ সালের ১১ জুন ওসাকা শহরের এক সম্ভ্রান্ত ও সাংস্কৃতিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন| তিনি বিশ্ব সাহিত্যাঙ্গণে ‘অল্প কথার গল্প’ (ফ্ল্যাশ ফিকশন) লেখক হিসাবে বিখ্যাত এবং অত্যন্ত পরিচিত|
ইয়াসুনারি কাওয়াবাতার ˆশশব কেটেছে একাকীত্বে, কারণ পনের বছর বয়সের মধ্যে তিনি পিতা-মাতাসহ নিকটতম অনেক আত্মীয়¯^জন হারিয়েছেন| তিনি ১৯২৪ সালে টোকিও ইম্পেরিয়াল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করার দু’বছর পর, অর্থাৎ ১৯২৬ সালে, প্রথম গ্রন্থ দ্য ডান্সিং গার্ল ইজু প্রকাশ করেন| তাঁর পরবর্তী গ্রন্থ (দ্য স্কারলেট গ্যাং অব আসাকুসা) প্রকাশিত হয় ১৯৩০ সালে| তবে ইংরেজিতে অনূদিত তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে স্নো কান্ট্রি (১৯৫৬), থাউজ্যান্ড ক্রেইনস& (১৯৫৮), দ্য সাউন্ড অব দ্য মাউন্টেন (১৯৭০), মাস্টার অব গো (১৯৭২), বিউটি অ্যান্ড স্যাডনেস (১৯৭৫) এবং দ্য ওল্ড ক্যাপিটাল (১৯৮৭ ও ২০০৬)| এছাড়া পাম অব দ্যা হ্যান্ড স্টোরিজ তাঁর বিখ্যাত ছোটগল্প সংকলন, যা ১৯৮৮ সালে ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়েছে|
ইয়াসুনারি কাওয়াবাতার উপন্যাসে একাকীত্ব, মৃত্যু নিয়ে ব্যস্ততা, বিষাদ এবং সুন্দর ও কুরুচিকর জিনিসের সমš^য়ের বিভিন্ন বিষয় অত্যন্ত গভীরভাবে উঠে এসেছে| তাঁর লেখা ‘ড্যাডা এবং এক্সপ্রেশনিজম’১-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত, যা তাঁর গল্পে চমকপ্রদ চিত্রকল্প ও আকস্মিক পরিবর্তনের ব্যবহার দেখা যায়| এছাড়া তিনি রেনা-গো (সংযুক্ত ছন্দ) কৌশল ব্যবহার করে ঐতিহ্যবাহী জাপানি কাব্যিক ˆশলীর সঙ্গে আধুনিক গল্প বলার কৌশলকে সংমিশ্রণ করেছেন|
ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা তাঁর সংযত, কাব্যময় এবং নিগূঢ় গদ্য রচনার জন্য ১৯৬৮ সালে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন| উল্লেখ্য, নোবেল কমিটি তাঁর তিনটি উপন্যাস উল্লেখ করেছে, স্নো কান্ট্রি, থাউজ্যান্ড ক্রেইনস& এবং দ্য ওল্ড ক্যাপিটাল| তাঁর বিভিন্ন লেখা আন্তর্জাতিক সুধী মহলে প্রচুর প্রশংসা কুড়িয়েছে|
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা দীর্ঘ সময় (১৯৪৮-১৯৬৫) জাপানি পেন-সংস্থার সভাপতি ছিলেন এবং সেই সময় তিনি জাপানি সাহিত্যকে ইংরেজি ও অন্যান্য পশ্চিমা ভাষায় অনুবাদ করানোর পিছনে একটি শক্তিশালী প্রেরণাশীল উদ্যোক্তা হিসাবে কাজ করেছেন|
ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা ১৯৭২ সালে কানাগাওয়া প্রদেশের জুশি শহরে আত্মহত্যা করেন| বলা হয়, জীবনের শেষ দিকে ভগ্ন স্বা এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মৃত্যুর শোক সহ্য করতে না পারা ছিল তাঁর অস্বাভাবিক মৃত্যুর কারণ| অথচ নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করার সময় তিনি বলেছিলেন যে, তিনি তাঁর লেখায় মৃত্যুকে সুন্দর করার চেষ্টা করেছেন এবং মানুষ, প্রকৃতি ও শূন্যতার মধ্যে সামঞ্জস্য খুঁজতে চেয়েছেন|
৩
আত্মঘাতী হওয়ার আগে থেকেই ইয়াসুনারি কাওয়াবাতার মধ্যে আত্মহননের বিষয়টি কাজ করেছিল| বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায়, তিনি আত্মহত্যা করার আগে ভীষণ অস্থিতিশীল মানসিক অবস্থায় ছিলেন| তিনি রাতে ঘুমাতে পারতেন না| তিনি শারীরিক রোগে কষ্ট পাচ্ছিলেন, যার জন্য সব সময় নিরাশ ও হতাশ অনুভব করতেন এবং প্রায়ই বিষণ্ন ও একাকী থাকতেন| এছাড়া তিনি তাঁর সাহিত্যিক অর্জন নিয়ে হতাশ ছিলেন| তাই হয়তো কোনো এক সময় তিনি একটা চিরকুট লিখেছিলেন, যেখানে লেখা ছিল, ‘আমি সেই স্তরে পৌঁছে গেছি, যেখানে আমি আর এসব কিছু সহ্য করতে পারছি না এবং আমি আর এগোতে পারব না|’
৪
দিনটি ছিল রবিবার, ১৬ এপ্রিল ১৯৭২| আনুমানিক দুপুর ৩টায় ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা দক্ষিণ ইয়োকোহামার অদূরে জুশি শহরের সমুদ্রের পাড়ে অবস্থিত অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের উদ্দেশ্যে নিজেদের বাসা থেকে বেরিয়ে যান| তিনি সেই অ্যাপার্টমেন্টটি ভাড়া নিয়েছিলেন এবং নিজের লেখালেখির অফিস হিসাবে ব্যবহার করতেন| তিনি যাওয়ার আগে তাঁর স্ত্রীকে বলেছিলেন যে, হাঁটাহাঁটির জন্য বাইরে যাচ্ছেন|
যখন ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা রাতের দিকে ফিরতে ব্যর্থ হন, তখন একজন কাজের মানুষ সেই অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে যায়| কক্ষের দরজাটি শেকল দিয়ে বন্ধ ছিল এবং ভেতর থেকে শক্তিশালী গ্যাসের উৎকট গন্ধ বের হচ্ছিল| তৎক্ষণাৎ পুলিশকে ডাকা হয়েছিল| পুলিশ এসে দরজা খুলে তাঁকে বাথরুমের মেঝেতে শুয়ে থাকতে দেখে এবং তাঁর মুখে কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসের নল লাগানো ছিল| তাঁর স্ত্রী এবং অন্য অনেক ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও বন্ধু মনে করেন যে, তাঁর মৃত্যু ছিল দুর্ঘটনা| তাঁরা বলেছিলেন যে, তিনি গোসলের জন্য আনজাম করার সময় ভুলক্রমে গ্যাসের নলটি খুলে ফেলেছিলেন| তবে কাছাকাছি জায়গায় হুইস্কির একটি খালি বোতল ছিল এবং ময়নাতদন্ত করার পর পাওয়া গেছে যে, মৃত্যুর আগে তিনি মদ্যপান করেছিলেন| তাঁর গায়ে ছিল পোলো শার্ট এবং তিনি বিজনেস স্যুট পরেছিলেন|
যাহোক, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ইয়াসুনারি কাওয়াবাতার দায়িত্বশীল ডাক্তার দ্রুত অ্যাপার্টমেন্টে ছুটে যান| যদিও তখন তাঁর হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, তবুও ডাক্তার কৃত্রিমভাবে অক্সিজেন দিয়েছিলেন এবং আশা করেছিলেন যে, হয়তো অলৌকিক ঘটনা ঘটবে| কিন্তু শেষ পর্যন্ত ডাক্তারের সমস্ত চেষ্টা বৃথা যায়|
মৃতদেহ, চোখের মণি এবং ত্বকের নিচে রক্তক্ষরণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর ঘটনাস্থলে থাকা ফরেনসিক চিকিৎসক বলেন, ‘এটা স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে যে, তিনি শ্বাসের সঙ্গে বিষাক্ত গ্যাস সেবন করে আত্মহত্যা করেছেন| শ্বাস-প্রশ্বাসের কষ্টের জন্য তাঁর পিঠে উজ্জ্বল লাল রঙের চিহ্ন রয়েছে, যা গ্যাসের বিষক্রিয়ার কারণে হয়েছে| সত্যি, অদ্ভুত লক্ষণ|’ তিনি আরও যোগ করে বলেন, ‘সন্ধ্যা ছয়টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়েছে| মৃতের অভিব্যক্তি শান্ত ছিল, যা হয়তো জীবনের সুখী সমাপ্তির ইঙ্গিত দিয়েছিল|’
ইয়াসুনারি কাওয়াবাতার অস্বাভাবিক মৃত্যুর খবর শুধু জাপানি সাহিত্য মহলে নয়, বরং পুরো বিশ্বকে হতবাক ও শোকাহত করে দিয়েছিল| পরের দিন বিখ্যাত ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর প্রথম পৃষ্ঠার নিচের ডান কোণে একটি বিশেষ নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল|
ইয়াসুনারি কাওয়াবাতার আত্মহত্যার সম্ভাব্য কারণ ও বিশেষজ্ঞদের অভিমত
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাস সেবন করে আত্মঘাতী হয়েছেন ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা| জানা যায়, মৃত্যুর আগে তিনি আত্মহত্যার কারণ হিসাবে কোনো চিরকূট লিখে যাননি, এমনকি তিনি তাঁর লেখায় নিজের জীবন নেওয়ার বিষয় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে আলোচনাও করেননি| তাই তাঁর আত্মহত্যার প্রেরণা কিংবা কারণ এখনো বিতর্কিত এবং অস্পষ্ট রয়ে গেছে|
কিছু মানুষ বিশ্বাস করেন যে, ইয়াসুনারি কাওয়াবাতার আত্মহত্যা শারীরিক অসুস্থতা এবং মানসিক চাপের কারণে হয়েছিল| আবার অনেকে মনে করেন যে, তাঁর আত্মহত্যা সাহিত্যিক অর্জনের প্রতি অসন্তুষ্টি এবং হতাশার কারণে মৃত্যু হয়েছে| অন্যদিকে কেউ কেউ বলেন যে, আত্মহননের আগে তিনি সংক্রমিত পিত্তথলির সমস্যায় কষ্ট পাচ্ছিলেন| এছাড়া অনেকে মনে করেন যে, তিনি ঘুমের ওষুধের বিষক্রিয়ার জন্য হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন| একজন বলেছিল যে, ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা তাঁর বন্ধু ইউকিও মিশিমা২-র আত্মহত্যার খবর শুনে গভীরভাবে শোকার্ত ছিলেন|
ইয়াসুনারি কাওয়াবাতার মৃত্যুর কারণ বা প্রেরণা সম্পর্কিত জাপানি সাহিত্যিক মহল এবং অন্যান্য ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের সবসময় বিভিন্ন মত পোষণ করেছেন, তবে প্রধান অনুমান কিংবা তত্ত্ব মূলত নিম্নলিখিত এক বা একাধিক কারণের ওপর নির্ভর করে, যেমন:
১. শারীরিক অসুস্থতা এবং ভগ্নস্বাস্থ্য: ইয়াসুনারি কাওয়াবাতার আত্মহত্যার পরের দিন (অর্থাৎ ১৭ এপ্রিল) জাপানের বহুল পরিচিত ˆদনিক পত্রিকা সাহী শিনবুন রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল এবং সেখানে বলা হয়েছিল: ‘তাঁর (ইয়াসুনারি কাওয়াবাতার) মৃত্যুর এক রাত হয়েছে, কিন্তু তাঁর আত্মীয় স্বজন এবং বন্ধুদের মধ্যে এখনো সন্দেহ রয়েছে এবং অনেকেই অনুমান করছেন যে, তাঁর হয়তো ক্যান্সারের মতো কোনো মারাত্মক রোগ ছিল| জানা যায়, ইউসুনারি কাওয়াবাতা অসুস্থতার (তীব্র অ্যাপেন্ডিসাইটিস) কারণে এক মাস আগে (৭ু১৫ মার্চ) হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন| তখন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সমস্ত দর্শনার্থী এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের আগমন নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল| তবে অস্ত্রোপচারের পর তিনি ভালোভাবে সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন|
২. ˆশশবের বিয়োগান্তক অভিজ্ঞতা: ইয়াসুনারি কাওয়াবাতার শিশু কালীন অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে জানা যায় যে, তাঁর জীবনে অসহায়ত্ব কীভাবে প্রকাশ পেয়েছে এবং পরবর্তীতে তাঁর কাছে মনে হয়েছিল, জীবন আসলে অর্থহীন|
যখন ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা মাত্র দেড় বছরের ছিলেন, তখন তাঁর পিতা যক্ষা রোগে মৃত্যু বরণ করেন| পিতার মৃত্যুর এক বছরের মধ্যে তাঁর মা-ও একই রোগে মারা যান| তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র আড়াই বছর| সেই বয়সে তিনি বুঝতে পারেননি যে, তাঁর সঙ্গে ভাগ্য কেন এমন অন্যায় করছে| পরে ১৯০৯ সালের জুলাই মাসে তাঁর একমাত্র বড় বোন ইয়োশিকো জ্বর ও হৃৎপিণ্ডের অসুখে মারা যায়| শুধু তাই নয়, ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা দাদা ও দাদীর মৃত্যুর অভিজ্ঞতা অনুভব করেছিলেন, যাদের উপর তিনি নির্ভর করেছিলেন| এ কথা স্পষ্ট যে, ˆশশবে স্বজন হারানোর বিয়োগান্তক অভিজ্ঞতা তাঁর মানসিক অবসাদের ওপর বিশাল প্রভাব ফেলেছিল| জানা যায়, পরিবারের অসংখ্য দাফনের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার কারণে তাঁকে ডাকনাম দেওয়া হয়েছিল: ‘দাফনে উপস্থিত হওয়া সেলিব্রিটি|’
৩. দীর্ঘ সময় ঘুমের ওষুধ ব্যবহারের প্রতিক্রিয়া: ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা হাই স্কুলে পড়াকালীন সময়ে ঘুমের ওষুধ সেবন করা শুরু করেছিলেন| ছোটবেলায় তাঁর ঘুম ছিল হালকা এবং তিনি খুবই সংবেদনশীল ছিলেন| তাই তাঁকে নিয়মিত ঘুমের ওষুধ খেতে হতো| এই অভ্যাস থেকে তিনি বিবাহিত জীবনেও মুক্তি পাননি| এ প্রসঙ্গে স্ত্রী হিদেকো নিজের স্মৃতিচারণায় লিখেছেন যে, তাঁর ¯^ামী খুব বেশি ঘুমের ওষুধ খেতেন এবং দিনের বেলাও ঘুমের ওষুধের কার্যকারিতা থাকত না| তবে দিনের বেলা অনেক সময় চলাফেরা করার সময় তিনি খুঁটির সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছেন| তিনি জীবনে কখনো ঘুমের ওষুধ ছাড়েননি|
এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে| মৃত্যুর এক সপ্তাহ আগে (১০ এপ্রিল) ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা তাঁর প্রিয় নাপিতের দোকানে চুল কাটাতে গিয়েছিলেন| তবে সেদিন নাপিতের দোকানের মালিক তাঁর আচরণ সাধারণ অবস্থা থেকে ভিন্ন লক্ষ্য করেছিল, বিশেষ করে তাঁর ক্রমাগত দুশ্চিন্তায় শরীর নড়াচড়া করা, আঙুল দিয়ে অযথা চুলে বিলি কাটা, এবং তাঁকে খুবই অস্থির দেখাচ্ছিল| নাপিত তাঁকে বলেছিল, ‘আপনি ভীষণ ক্লান্ত|’ জবাবে তিনি (ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা) ক্লান্ত-অবসন্ন মলিন গলায় বলেছিলেন, ‘আসলে আমি চার রাত ধরে ঘুমাইনি|’
যাহোক, পরবর্তীতে নাপিতের সঙ্গে এই কথোপকথন মানুষদের মধ্যে ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা ঘুমানোর ওষুধ খাওয়া নিয়ে কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছিল| তাই কিছু জাপানি পণ্ডিত এবং গবেষক মনে করেন যে, কাওয়াবাতা ঘুমের ওষুধের বিষক্রিয়ায় মারা গেছেন|
৪. অতিরিক্ত মানসিক চাপ: ইয়াসুনারি কাওয়াবাতার নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির পর পুরো জাপান আনন্দ-উল্লাসে মাতোয়ারা ছিল, এমনকি এ ঘটনা নিয়ে সংবাদপত্র ধারাবাহিক প্রবন্ধ প্রকাশ করেছিল| সম্রাট হিরোহিতো ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে শুভেচ্ছা জানাতে প্রাসাদের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং প্রধানমন্ত্রী আইসাকু সাতোর মাধ্যমে ফোন করেছিলেন| জানা যায়, সেই সাক্ষাতের পর থেকে ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা কোনো উল্লেখযোগ্য রচনা লিখতে পারেননি| একজন সামাজিক সেলিব্রেটি হিসাবে তাঁর ওপরে অতিরিক্ত মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়েছিল এবং অনেকের মতে সেই চাপ থেকে মুক্তির উপায় হিসাবে তিনি আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন|
৫. মানসিকভাবে ভেঙে পড়া এবং সাহিত্যিক সংকট: চীনের ওপর জাপানের আগ্রাসনের সময়২ ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা জাপানি সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসী সেনাবাহিনীর সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেছেন এবং অপরাধমূলক কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করার জন্য গোপনে তিনি চীনে প্রবেশ করেছিলেন| দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান আত্মসমর্পণ করার পর তিনি জাপানি সাম্রাজ্যবাদের পরাজয়ের জন্য ভীষণভাবে মর্মাহত হন| এ প্রসঙ্গে তিনি তাঁর একাধিক প্রবন্ধে লিখেছিলেন যে, জাপান আত্মসমর্পণ করার পর তাঁর ‘দুঃখ’ প্রতিটি হাড়ের ভেতর প্রবেশ করেছে| তাঁর সেই মানসিক টানাপোড়েন প্রসঙ্গে গবেষক এবং পণ্ডিত ব্যক্তিরা উল্লেখ করেছেন যে, ‘কাওয়াবাতার রাজনৈতিক অবনতি অবশ্যম্ভাবীভাবে মানসিক ধ্বংস এবং সাহিত্যিক সংকটে নিয়ে যাবে, যা তাঁকে আত্মহত্যার দিকে নিয়ে ঠেলে দিতে পারে|’
৬. ইউকিও মিশিমার আত্মহনন: কয়েকজন জাপানি পণ্ডিত এবং লেখক ইয়াসুনারি কাওয়াবাতার আত্মঘাতীর উদ্দেশ্য নিয়ে অনুমান করেছিলেন এবং তাঁরা বিশ্বাস করেছিলেন যে, ইউকিও মিশিমার আত্মহনন শেষ পর্যন্ত ইয়াসুনারি কাওয়াবাতার মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে| তবে তাঁর জাপানি জীবনী লেখক, তাকেও ওকুনো, বর্ণনা করেছেন যে, তিনি (ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা) ইউকিও মিশিমার মৃত্যুর পর বের কয়েক মাস ধারাবাহিকভাবে দুঃ¯^প্ন দেখেছেন এবং মিশিমার আতঙ্ক তাঁকে অবিরত তাড়া করেছে| এমন স্থায়ীভাবে মনোবলহীন অবস্থায় তিনি জীবনের শেষ দিকে প্রায়ই বন্ধুদের বলতেন যে, তিনি মাঝে মধ্যে আশা করতেন যে একদিন তাঁর বিমান দুর্ঘটনায় আছড়ে পড়বে|
৭. টোকিওর গভর্নরের নির্বাচনে আকিরা হাতানোর পরাজয়: অনেক জাপানি পণ্ডিত এবং বিশিষ্ট লোকজন এই মতকে সমর্থন করেন| ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা একবার প্রকাশ্যে পুলিশ প্রধান আকিরা হাতানোকে টোকিওর গভর্নর পদে নির্বাচনে সমর্থন করেছিলেন| তিনি মনে করেছিলেন যে, হাতানো নিজের মর্যাদা ও খ্যাতি দিয়ে নির্বাচনে সফল হবেন, কিন্তু তিনি অপ্রত্যাশিতভাবে ব্যর্থ হন| ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা এই আঘাত সহ্য করতে পারেননি এবং হয়তো আত্মহত্যায় স্বস্তি খুঁজতে বাধ্য হন|
যাহোক, উপরোল্লিখিত কোনো অনুমান কিংবা তত্ত্ব প্রমাণিত হয়নি| তাই ইয়াসুনারি কাওয়াবাতার আত্মহননের প্রেরণা কিংবা কারণ এখনো বিতর্কিত এবং অস্পষ্ট রয়ে গেছে, হয়তো অধরাই থেকে যাবে|
জাপানী সমাজ ব্যবস্থা ও শিল্প-সাহিত্যে ইয়াসুনারি কাওয়াবাতার আত্মহত্যার প্রভাব: ইয়াসুনারি কাওবাতার আত্মহত্যা জাপানি সমাজ ও শিল্প-সাহিত্য জগতে গভীর প্রভাব ফেলেছে এবং জাপানি সংস্কৃতিতে আত্মহত্যা নিয়ে আরও মনোযোগ এবং প্রতিফলন এনেছে, যেমন:
১. জাপানি সাহিত্য জগতের প্রতিক্রিয়া: ইয়াসুনারি কাওয়াবাতার আত্মহত্যা জাপানি সাহিত্য জগতের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ ও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে| অনেক সহকর্মী এবং পাঠক তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন| এছাড়া অনেক সাহিত্য সমালোচকও তাঁর সাহিত্যকর্মকে পুনর্মূল্যায়ন এবং বিশ্লেষণ করেছেন|
২. সামাজিক প্রতিক্রিয়া: ইয়াসুনারি কাওয়াবাতার আত্মহত্যা জাপানি সমাজেও ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে| অনেকেই মনে করেন যে, তাঁর আত্মহত্যা জাপানি সমাজের অনেক সমস্যার প্রতিফলন, যেমন সাংস্কৃতিক চাপ, কর্মস্থলের চাপ এবং শারীরিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যা ঘটিয়েছে| এছাড়া তাঁর আত্মহত্যা পর জাপানি সমাজে আত্মহত্যার প্রতি মনোযোগও বৃদ্ধি পেয়েছে| অনেক মানুষ আত্মহত্যা রোধ এবং মানসিক অসুস্থতার দিকে নজর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছে এবং সংশ্লিষ্ট গবেষণা ও সচেতনতা মূলক কাজ শুরু করেছে|
৩. জাপানি সংস্কৃতি: ইয়াসুনারি কাওবাতার আত্মহত্যা জাপানি সংস্কৃতিতে বিভিন্নভাবে গভীর প্রভাব ফেলেছিল, যেমন:
— তাঁর গ্রন্থাবলি জাপানি সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠে এবং তাঁর আত্মহত্যা জাপানি সংস্কৃতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসাবে ধরা হয়েছে;
— অনেকেই বিশ্বাস করেন যে, ইয়াসুনারি কাওবাতার আত্মহত্যা জাপানি সংস্কৃতিতে কিছু সমস্যাকে চিহ্নিত করেছে, যেমন সাফল্য এবং অর্জনের অতিরিক্ত অনুসরণ, শারীরিক স্বাস্থ্যের অবহেলা ইত্যাদি;
— ইয়াসুনারি কাওবাতার আত্মহত্যা জাপানি সংস্কৃতিতে আত্মহত্যা নিয়ে আরও মনোযোগ এবং প্রতিফলন এনেছে| জাপানি সমাজ আত্মহত্যা প্রতিরোধ এবং মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে গবেষণা এবং প্রচারণায় মনোনিবেশ করতে শুরু করে, যাতে আত্মহত্যার ঘটনা কমানো যায়|
ইয়াসুনারি কাওবাতার রহস্যময় মৃত্যুর চুয়ান্ন বছর পরও বিষয়টি বিতর্কিত: তাঁর মৃত্যু কি দুর্ঘটনা ছিল, নাকি আত্মহত্যা?
তবে বিভিন্ন তথ্য সূত্রে ইয়াসুনারি কেন আত্মহত্যা করেছেন, এ বিষয়ে গবেষকরা এখনো স্পষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি| তাই আজও ধোঁয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ে আছে তাঁর আত্মহত্যার আসল কারণ| যদিও তাঁর সৃজনশীল সাহিত্যকর্ম তুলনামূলকভাবে জটিল ছিল এবং প্রথম ও শেষ দিকের রচনায় ভিন্ন রাজনৈতিক ধারা প্রতিফলিত হয়েছিল, তবে মৃত্যুর আগে তিনি এমন কোনো লক্ষণ দেখাননি কিংবা কোনো চিরকুট লিখে যাননি, যা থেকে প্রমাণিত হয় যে তিনি আত্মহত্যা করেছেন| তবে তিনি শারীরিক ও মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন| আর এ কারণে গবেষক এবং মনোবিজ্ঞানীদের পর্যালোচনা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পাল্লা আত্মঘাতীর দিকেই বেশি ভারি|
হয়তো আগামীতে কখনো সেই ধোঁয়া কেটে গিয়ে সত্যের মুখ দেখবে, হয়তো কোনোদিনই জানা যাবে না তাঁর আত্মহত্যার আড়ালে লুকিয়ে থাকা আসল কারণ এবং অধরাই থেকে যাবে|
এ কথা সত্যি যে, ইয়াসুনারি কাওবাতার আত্মহত্যা জাপানি সমাজ ও শিল্প-সাহিত্য জগতে গভীর প্রভাব ফেলেছে এবং একই সঙ্গে আত্মহত্যার ঘটনা কমানোর জন্য সচেনতা ও মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে গবেষণা এবং প্রচারণা শুরু হয়েছে|
পরিশেষে বলা যায় যে, ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা জীবনে যা বিশ্বাস করতেন কিংবা বলেছেন, অথচ দেখা যায় বাস্তবে তিনি বিপরীত কাজ করেছেন| এ প্রসঙ্গে দু’টি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে, যেমন:
১. বিখ্যাত মার্কিন অভিনেত্রী মেরিলিন মনরো অতিরিক্ত ঘুমের ঔষধ খেয়ে ১৯৬২ সালের ৪ আগস্ট আত্মহত্যা করেন| তাঁর মৃত্যুর পর ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা বলেছিলেন, ‘যদি এটি আত্মহত্যার ঘটনা হয়, তবে কোনো চিরকুট না রেখে যাওয়াই ভালো| নীরব মৃত্যু হলো একটি অনন্ত শব্দ|’ ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! দশ বছর পরে সেই কথাটি তাঁর নিজের সমাধিসূচক বাক্য হয়ে ওঠে: ‘তিনি কোনো চিরকুট রেখে যাননি|’
২. স্টকহোমে নোবেল বক্তৃতায় তিনি আত্মহত্যার বিভিন্ন সমস্যার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন এবং তিরস্কার করে বলেছিলেন: ‘একজন ব্যক্তি বিশ্বের সব কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হোক না কেন, আত্মহত্যা কোনো সম্মানযোগ্য সমাধান নয়| যতটা প্রশংসনীয় হোক না কেন, যে মানুষ আত্মহত্যা করে, সে জ্ঞানের আলোকিত রাজ্য থেকে অনেক দূরে থাকে|’
টীকা:
১ ড্যাডাইজম হলো এক ধরনের শিল্প-সংস্কৃতি এবং যুদ্ধ-বিরোধী আন্দোলন| প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে (১৯১৬-১৯২০) জুরিখে (সুইজারল্যান্ড) উদ্ভব হয়েছিল| তখন অনেকেই বিশ্বাস করত যে, যুদ্ধ এবং জাতীয়তাবাদের প্রতিক্রিয়া হিসাবে ড্যাডাইজম অত্যন্ত জরুরি| অন্যদিকে এক্সপ্রেশনিজম ব্যক্তিগত আবেগপূর্ণ প্রকাশ এবং অন্তর্মুখী অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভরশীল| এটি মূলত বিংশ শতাব্দীর শুরুতে জার্মানিতে বিকশিত হয়েছে|
২ চীনের ওপর জাপানের আগ্রাসন শুরু করেছিল ১৮ই সেপ্টে¤^র, ১৯৩১ সালে, যখন জাপান চীনের মানচুরিয়া প্রদেশে আক্রমণ করেছিল| তারপর ১৯৩৭ সালের ৭ই জুলাই থেকে মার্কো পোলো ব্রিজ ঘটনার মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসন শুরু হয়েছিল, যা ‘দ্বিতীয় চীন-জাপান যুদ্ধ’ হিসাবে পরিচিত| দুই দেশের সেই দ্বন্দ্ব চলতে থাকে ১৯৪৫ পর্যন্ত|
৩ ইউকিও মিশিমা ছদ্মনাম এবং তাঁর আসল নাম কিমিতাকে হিরাওকা (১৯২৫ু১৯৭০)| তিনি একজন জাপানি লেখক, নাট্যকার, অভিনেতা, মার্শাল আর্টস অনুশীলন শিক্ষক এবং মডেল| তিনি উগ্রপন্থী রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন এবং একটি অভ্যুত্থানের নেতা ছিলেন| কিন্তু দুর্ভাগ্য ক্রমে অভ্যুত্থান সফল হয়নি| ফলে তাঁকে জাপানের সনাতন পদ্ধতি সেপুকু বা হারা-কিরি) করে ১৯৭০ সালের ২৫ নভেম্বর আত্মঘাতী হতে হয়েছিলেন| তিনি ইয়াসুনারি কাওবাতার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন|
৪ আকিরা হাতানো (১৯১১-২০০২) জাপানি রাজনীতিবিদ| তিনি ১৯৮২ থেকে ১৯৮৩ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী ইয়াসুহিরো নাকাসোনের অধীনে বিচার মন্ত্রী করেছিলেন| তিনি ১৯৭১ সালে টোকিওর গভর্নর পদে নির্বাচন করেছিলেন এবং পরাজিত হন|
কৃতজ্ঞতা স্বীকার: বর্তমান প্রবন্ধ লেখার জন্য আমি আমি বিভিন্ন সূত্র, যেমন বিভিন্ন গবেষণা পত্র ও রচনা, খবরের কাগজে প্রকাশিত প্রবন্ধ ও নিবন্ধ, অনলাইন ম্যাগাজিন এবং এমনকি মনস্তাত্ত্বিক জার্নালে প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্য ব্যবহার করেছি| আমি সমস্ত লেখকদের কাছে বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ|

আপনার মতামত লিখুন