পাকা ধানের সোনালি আভা ছড়িয়েছে হবিগঞ্জের হাওরে। চারদিকে শুধু ফসলের সমারোহ। কিন্তু সেই ফসল ঘরে তুলতে হিমশিম খাচ্ছেন কৃষক। এক দিকে ডিজেল সংকট, অন্য দিকে শ্রমিকের তীব্র অভাব। তার ওপর আকাশের দিকে তাকালেই শিলাবৃষ্টি ও কালবৈশাখীর ঝড়ের শঙ্কা। হাওরের কৃষকরা বলছেন, ‘হাতে সময় নেই, আর কিছুদিন বিলম্ব হলেই পুরো ফসল নষ্ট হয়ে যাবে।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে হবিগঞ্জে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে ১ লাখ ২৩ হাজার ৮৪৮ হেক্টর জমিতে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ লাখ ৯৪ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন ধান, যা থেকে ৫ লাখ ২৯ হাজার ৬০০ মেট্রিক টন চাল পাওয়ার আশা করছে কৃষি বিভাগ। কিন্তু সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জেলায় বোরো ধান কাটার জন্য রয়েছে ৪৩২টি হারভেস্টার মেশিন, অসংখ্য ট্রাক্টর, ট্রলি ও ছোট মাড়াই মেশিন। একটি হারভেস্টার চালাতে প্রতিদিন গড়ে ১৫০ লিটার ডিজেল লাগে। হিসাব অনুযায়ী, জেলাজুড়ে প্রতিদিন ডিজেলের চাহিদা প্রায় ৬৪ হাজার ৮০০ লিটার। অথচ ১২ জন ডিলার দৈনিক ১ লাখ ২০ হাজার লিটার চাহিদা দিলেও ডিপো থেকে মিলছে মাত্র ২০ হাজার লিটার। ফলে প্রতিদিন প্রায় ১ লাখ লিটার ডিজেলের ঘাটতি থাকছে।
বানিয়াচং উপজেলার জাতুকর্ণপাড়া মহল্লার আবেদ আলীর ছেলে আমিরুল ইসলাম হৃদয় বলেন, ‘আমার মেশিন শুধু দিনে চালাই বিধায় দৈনিক ১০০ লিটার লাগে। খোলা বাজারে লিটারে ২০ টাকা বেশি দিয়ে মাত্র ৩০ লিটার পেয়েছি। পরে এলাকায় তেলের সংকট দেখে মেশিন নিয়ে সুনামগঞ্জে চলে গেছি।’
একই উপজেলার তাতারী মহল্লার আজিজ মিয়ার ছেলে নজরুল ইসলাম ও আনহার মিয়া জানান, ডিজেলের অভাবে তারা অন্য জেলায় কাজ খোঁজার চেষ্টা করছেন। শাহেদ আলী নামের আরেক হারভেস্টার চালক বলেন, ‘ধান কাটার সময় ডিজেলচালিত নানা যন্ত্র চলে। সরবরাহ দ্রুত না বাড়লে ধান কাটায় চরম ব্যাঘাত ঘটবে।’
শুধু ডিজেল সংকট নয়- শ্রমিক সংকট আরও ভয়াবহ। বিশেষ করে জেলার ভাটি অঞ্চল হিসেবে খ্যাত বানিয়াচং উপজেলায় (৩৩ হাজার ৭০৫ হেক্টর) ও আজমিরীগঞ্জ উপজেলায় (১৪ হাজার ৬০০ হেক্টর) অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। কৃষকেরা ঘুরছেন, কিন্তু শ্রমিক পাচ্ছেন না। যারা পাচ্ছেন, তারা বিঘাপ্রতি অতিরিক্ত নগদ টাকা দাবি করছেন।
কৃষক মতিউর রহমান বলেন, ‘হাওরে ধান পেকে গেছে। তা কাটার জন্য স্থানীয় শ্রমিকের কাছে তিন দিন ধরে ঘুরছি, পাচ্ছি না। শ্রমিকের সংখ্যা কম হওয়ায় তাদের চাহিদা বেশি। দিতে হচ্ছে নগদ টাকা।’কৃষক পারভেজ আলম বলেন, ‘স্থানীয় শ্রমিক দিয়ে হাওরের সব ধান কাটা সম্ভব নয়। জেলার বাইরে থেকে শ্রমিক না এলে এ সংকট কাটবে না।’
আলাউদ্দিন চৌধুরী নামের আরেক কৃষক বাধ্য হয়ে দুই বিঘা পুরো জমির ধান মাত্র ১০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘শ্রমিক সংকটের জন্য জমির ধান কাটতে পারিনি। ধান পচে যাওয়ার ভয়ে যা পাচ্ছি, তাই নিয়ে নিচ্ছি।’
হবিগঞ্জের নিচু এলাকার জমিগুলো ইতিমধ্যে বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে। তার ওপর শ্রমিক ও ডিজেল সংকট কৃষকের দুশ্চিন্তা দ্বিগুণ করেছে। শ্রমিকরা বলছেন, ‘আমরাও আতঙ্কে থাকি। বৃষ্টি বা শিলাবৃষ্টি এলে ধান মাঠেই নষ্ট হয়ে যাবে।’
শিলাবৃষ্টি আর ঢলের শঙ্কায় বোরো চাষিরা।
হবিগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক দ্বীপক কুমার পাল বলেন, ‘ধান কাটায় অগ্রাধিকার দিয়ে ডিজেল সরবরাহের নির্দেশনা রয়েছে। চাহিদাপত্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। দ্রুত সরবরাহ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।’
হবিগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের জেলা প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আনোয়ারুল হক বলেন, ‘শ্রমিক সংকটের বিষয়টি আমাদের মাথায় রয়েছে। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন, কৃষি বিভাগের চাহিদার ভিত্তিতে ডিজেল বরাদ্দ বাড়ানোর জন্য জ্বালানি বিভাগে জরুরি চিঠি পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি জেলার বাইরে থেকে শ্রমিক আনার জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সরেজমিনে হাওর ঘুরে দেখা গেছে, কৃষকদের একটাই দাবি- দ্রুত ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে, জেলার বাইরে থেকে শ্রমিক আনার ব্যবস্থা করতে হবে এবং শিলাবৃষ্টি ও ঝড়ের আগেই যেন ধান কাটা শেষ করা যায়।

শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৫ এপ্রিল ২০২৬
পাকা ধানের সোনালি আভা ছড়িয়েছে হবিগঞ্জের হাওরে। চারদিকে শুধু ফসলের সমারোহ। কিন্তু সেই ফসল ঘরে তুলতে হিমশিম খাচ্ছেন কৃষক। এক দিকে ডিজেল সংকট, অন্য দিকে শ্রমিকের তীব্র অভাব। তার ওপর আকাশের দিকে তাকালেই শিলাবৃষ্টি ও কালবৈশাখীর ঝড়ের শঙ্কা। হাওরের কৃষকরা বলছেন, ‘হাতে সময় নেই, আর কিছুদিন বিলম্ব হলেই পুরো ফসল নষ্ট হয়ে যাবে।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে হবিগঞ্জে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে ১ লাখ ২৩ হাজার ৮৪৮ হেক্টর জমিতে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ লাখ ৯৪ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন ধান, যা থেকে ৫ লাখ ২৯ হাজার ৬০০ মেট্রিক টন চাল পাওয়ার আশা করছে কৃষি বিভাগ। কিন্তু সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জেলায় বোরো ধান কাটার জন্য রয়েছে ৪৩২টি হারভেস্টার মেশিন, অসংখ্য ট্রাক্টর, ট্রলি ও ছোট মাড়াই মেশিন। একটি হারভেস্টার চালাতে প্রতিদিন গড়ে ১৫০ লিটার ডিজেল লাগে। হিসাব অনুযায়ী, জেলাজুড়ে প্রতিদিন ডিজেলের চাহিদা প্রায় ৬৪ হাজার ৮০০ লিটার। অথচ ১২ জন ডিলার দৈনিক ১ লাখ ২০ হাজার লিটার চাহিদা দিলেও ডিপো থেকে মিলছে মাত্র ২০ হাজার লিটার। ফলে প্রতিদিন প্রায় ১ লাখ লিটার ডিজেলের ঘাটতি থাকছে।
বানিয়াচং উপজেলার জাতুকর্ণপাড়া মহল্লার আবেদ আলীর ছেলে আমিরুল ইসলাম হৃদয় বলেন, ‘আমার মেশিন শুধু দিনে চালাই বিধায় দৈনিক ১০০ লিটার লাগে। খোলা বাজারে লিটারে ২০ টাকা বেশি দিয়ে মাত্র ৩০ লিটার পেয়েছি। পরে এলাকায় তেলের সংকট দেখে মেশিন নিয়ে সুনামগঞ্জে চলে গেছি।’
একই উপজেলার তাতারী মহল্লার আজিজ মিয়ার ছেলে নজরুল ইসলাম ও আনহার মিয়া জানান, ডিজেলের অভাবে তারা অন্য জেলায় কাজ খোঁজার চেষ্টা করছেন। শাহেদ আলী নামের আরেক হারভেস্টার চালক বলেন, ‘ধান কাটার সময় ডিজেলচালিত নানা যন্ত্র চলে। সরবরাহ দ্রুত না বাড়লে ধান কাটায় চরম ব্যাঘাত ঘটবে।’
শুধু ডিজেল সংকট নয়- শ্রমিক সংকট আরও ভয়াবহ। বিশেষ করে জেলার ভাটি অঞ্চল হিসেবে খ্যাত বানিয়াচং উপজেলায় (৩৩ হাজার ৭০৫ হেক্টর) ও আজমিরীগঞ্জ উপজেলায় (১৪ হাজার ৬০০ হেক্টর) অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। কৃষকেরা ঘুরছেন, কিন্তু শ্রমিক পাচ্ছেন না। যারা পাচ্ছেন, তারা বিঘাপ্রতি অতিরিক্ত নগদ টাকা দাবি করছেন।
কৃষক মতিউর রহমান বলেন, ‘হাওরে ধান পেকে গেছে। তা কাটার জন্য স্থানীয় শ্রমিকের কাছে তিন দিন ধরে ঘুরছি, পাচ্ছি না। শ্রমিকের সংখ্যা কম হওয়ায় তাদের চাহিদা বেশি। দিতে হচ্ছে নগদ টাকা।’কৃষক পারভেজ আলম বলেন, ‘স্থানীয় শ্রমিক দিয়ে হাওরের সব ধান কাটা সম্ভব নয়। জেলার বাইরে থেকে শ্রমিক না এলে এ সংকট কাটবে না।’
আলাউদ্দিন চৌধুরী নামের আরেক কৃষক বাধ্য হয়ে দুই বিঘা পুরো জমির ধান মাত্র ১০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘শ্রমিক সংকটের জন্য জমির ধান কাটতে পারিনি। ধান পচে যাওয়ার ভয়ে যা পাচ্ছি, তাই নিয়ে নিচ্ছি।’
হবিগঞ্জের নিচু এলাকার জমিগুলো ইতিমধ্যে বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে। তার ওপর শ্রমিক ও ডিজেল সংকট কৃষকের দুশ্চিন্তা দ্বিগুণ করেছে। শ্রমিকরা বলছেন, ‘আমরাও আতঙ্কে থাকি। বৃষ্টি বা শিলাবৃষ্টি এলে ধান মাঠেই নষ্ট হয়ে যাবে।’
শিলাবৃষ্টি আর ঢলের শঙ্কায় বোরো চাষিরা।
হবিগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক দ্বীপক কুমার পাল বলেন, ‘ধান কাটায় অগ্রাধিকার দিয়ে ডিজেল সরবরাহের নির্দেশনা রয়েছে। চাহিদাপত্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। দ্রুত সরবরাহ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।’
হবিগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের জেলা প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আনোয়ারুল হক বলেন, ‘শ্রমিক সংকটের বিষয়টি আমাদের মাথায় রয়েছে। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন, কৃষি বিভাগের চাহিদার ভিত্তিতে ডিজেল বরাদ্দ বাড়ানোর জন্য জ্বালানি বিভাগে জরুরি চিঠি পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি জেলার বাইরে থেকে শ্রমিক আনার জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সরেজমিনে হাওর ঘুরে দেখা গেছে, কৃষকদের একটাই দাবি- দ্রুত ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে, জেলার বাইরে থেকে শ্রমিক আনার ব্যবস্থা করতে হবে এবং শিলাবৃষ্টি ও ঝড়ের আগেই যেন ধান কাটা শেষ করা যায়।

আপনার মতামত লিখুন