অপরাধের ধরন বদলে গেছে অবিশ্বাস্যভাবে। একসময়ের দুর্ধর্ষ ডাকাত ও ছিনতাইকারীরা এখন জেলের ভেতরে বসেই রপ্ত করছে প্রতারণার নতুন নতুন পাঠ। কারাগারে সাধারণ অপরাধীদের সাথে দেখা করে তারা তৈরি করছে বিশাল সিন্ডিকেট। এরপর জামিনে বেরিয়েই বদলে ফেলছে খোলস।
ঢাকা
ছেড়ে খুলনায় আস্তানা গেড়ে কখনো এসপি,
কখনো ট্রাফিক ইন্সপেক্টর আবার কখনো হাইওয়ে
সার্জেন্ট সেজে সাধারণ মানুষের
সাথে মেতে উঠছে কোটি
টাকার প্রতারণায়। এমনই এক সংঘবদ্ধ
জালিয়াত চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার
করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
তদন্ত
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই
চক্রটি নিজেদের বিশ্বস্ততা বাড়াতে পুলিশের ওয়াকিটকি, লোগো এবং পুলিশের
নাম সম্বলিত ভিজিটিং কার্ড ব্যবহার করে আসছিল। এমনকি
ঠিকানা হিসেবে ব্যবহার করত খুলনা বয়রা
পুলিশ লাইন্সের নাম। তবে তাদের
আসল আস্তানা ছিল শহরের নামী
দামী আবাসিক হোটেলের বিলাসবহুল রুম। সেখানে বসেই
তারা জালিয়াতির জাল বুনত। মূলত
পুলিশের হাতে জব্দ হওয়া
অটোরিকশার ব্যাটারি নিলামে কম দামে বিক্রির
প্রলোভন দেখিয়ে রিকশা মালিকদের কাছ থেকে মোটা
অংকের টাকা হাতিয়ে নেওয়াই
ছিল তাদের প্রধান কাজ।
ঘটনার
সূত্রপাত হয় খুলনা জেলার
সোনাডাঙ্গা থানাধীন শেখপাড়ার বাসিন্দা ও পেশায় পিকআপ
চালক শুক্কর আলীর একটি অভিযোগের
প্রেক্ষিতে। শুক্কর আলীর সাতটি অটোরিকশা
রয়েছে যা তিনি ভাড়া
দেন। গত ৮ জানুয়ারি
তার এক চালক আরিফের
সাথে পরিচয় হয় কথিত এক
হাইওয়ে সার্জেন্টের। সেই ব্যক্তি নিজেকে
তরিকুল ইসলাম পরিচয় দিয়ে একটি ভিজিটিং
কার্ড দেন এবং জানান
যে, পুলিশ লাইন্সে নিলামে কম মূল্যে ব্যাটারি
বিক্রি করা হবে। সরল
বিশ্বাসে শুক্কর আলী ওই নম্বরে
যোগাযোগ করলে তাকে আশ্বস্ত
করা হয় এবং অগ্রিম
হিসেবে বিকাশে ৩ হাজার টাকা
দিতে বলা হয়।
পরদিন
৯ জানুয়ারি তাকে সোনাডাঙ্গার আল
ফারুক মোড়ে আসতে বলা
হয়। সেখানে যাওয়ার পর আরেকজন নিজেকে
পুলিশ পরিচয় দিয়ে ফোন করে
একটি চালানের কপি নেওয়ার জন্য
৮২ হাজার টাকা দাবি করেন।
শুক্কর আলী সেই টাকা
পরিশোধ করে বয়রা পুলিশ
লাইন্সের সামনে ব্যাটারি পাওয়ার আশায় দীর্ঘ সময়
অপেক্ষা করেন। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর ওই সার্জেন্ট
পরিচয়ধারী ব্যক্তি আরও টাকা দাবি
করলে শুক্কর আলীর সন্দেহ হয়।
এক পর্যায়ে তিনি বুঝতে পারেন
তিনি একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক
চক্রের কবলে পড়েছেন।
এই ঘটনার পর ভুক্তভোগী দ্রুত
খুলনা জেলা পিবিআই অফিসে
লিখিত অভিযোগ জানান। পিবিআই প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মোস্তফা কামালের দিক-নির্দেশনায় এবং
জেলা ইউনিট প্রধান এসপি রেশমা শারমিনের
পরিকল্পনায় একটি বিশেষ টিম
মাঠে নামে। আধুনিক তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার
করে গত ১২ জানুয়ারি
মাগুরার ‘রয়েল আবাসিক হোটেল’
থেকে এসএম শাহিন, নাজমুল
হাসান ও ওবায়েদুল বিশ্বাস
নামের তিন প্রতারককে গ্রেপ্তার
করা হয়। তাদের কাছ
থেকে ৪টি মোবাইল ফোন,
একটি ওয়াকিটকি, পুলিশের লোগো সম্বলিত ফরম
এবং তরিকুল ইসলাম নামীয় ভুয়া ভিজিটিং কার্ড
উদ্ধার করা হয়েছে।
তদন্ত
তদারকি কর্মকর্তা ও খুলনার এসপি
রেশমা শারমিন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, “এই
চক্রের সদস্যরা মূলত ঢাকার আশুলিয়া
ও সাভার এলাকার দুর্ধর্ষ ডাকাত এবং ছিনতাইকারী। তারা
এর আগে ডাকাতি মামলায়
জেলও খেটেছে। কারাগারে বসেই তারা পরিকল্পনা
করে যে, জামিনে বেরিয়ে
তারা পেশা বদলে প্রতারণা
শুরু করবে। তারা খুলনায় এসে
পুলিশের বড় কর্মকর্তা ও
সার্জেন্ট পরিচয় দিয়ে মানুষের বিশ্বাস
অর্জন করত। কারাগারে বসেই
এই জালিয়াতির ছক কষা হয়েছিল।”
তিনি আরও জানান, এই
চক্রে মোট ৫ জন
জড়িত যার মধ্যে ৩
জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকিদের
ধরতেও অভিযান চলছে।
মামলার
বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা এসআই সোহানুর রহমান
জানান, আসামিরা তাদের অপরাধের কথা স্বীকার করেছে।
তারা ২০২৪ সালের আগস্ট
মাস থেকে দেশের বিভিন্ন
স্থানে এই জালিয়াতি চালিয়ে
আসছিল। চক্রটি এতটাই চতুর ছিল যে,
তারা পুলিশের প্রতিটি সরঞ্জাম নিখুঁতভাবে তৈরি করে নিয়েছিল।
আসামিদের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে একাধিক মামলা রয়েছে এবং দ্রুততম সময়ের
মধ্যে অর্থাৎ আগামী মাসেই আদালতে এই চাঞ্চল্যকর মামলার
চার্জশিট দাখিল করা হবে। পিবিআই
সূত্র জানিয়েছে, পলাতক বাকি দুই সদস্যকে
গ্রেপ্তার করা গেলে এই
চক্রের জাল কতদূর বিস্তৃত
তা আরও পরিষ্কার হবে।

শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৫ এপ্রিল ২০২৬
অপরাধের ধরন বদলে গেছে অবিশ্বাস্যভাবে। একসময়ের দুর্ধর্ষ ডাকাত ও ছিনতাইকারীরা এখন জেলের ভেতরে বসেই রপ্ত করছে প্রতারণার নতুন নতুন পাঠ। কারাগারে সাধারণ অপরাধীদের সাথে দেখা করে তারা তৈরি করছে বিশাল সিন্ডিকেট। এরপর জামিনে বেরিয়েই বদলে ফেলছে খোলস।
ঢাকা
ছেড়ে খুলনায় আস্তানা গেড়ে কখনো এসপি,
কখনো ট্রাফিক ইন্সপেক্টর আবার কখনো হাইওয়ে
সার্জেন্ট সেজে সাধারণ মানুষের
সাথে মেতে উঠছে কোটি
টাকার প্রতারণায়। এমনই এক সংঘবদ্ধ
জালিয়াত চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার
করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
তদন্ত
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই
চক্রটি নিজেদের বিশ্বস্ততা বাড়াতে পুলিশের ওয়াকিটকি, লোগো এবং পুলিশের
নাম সম্বলিত ভিজিটিং কার্ড ব্যবহার করে আসছিল। এমনকি
ঠিকানা হিসেবে ব্যবহার করত খুলনা বয়রা
পুলিশ লাইন্সের নাম। তবে তাদের
আসল আস্তানা ছিল শহরের নামী
দামী আবাসিক হোটেলের বিলাসবহুল রুম। সেখানে বসেই
তারা জালিয়াতির জাল বুনত। মূলত
পুলিশের হাতে জব্দ হওয়া
অটোরিকশার ব্যাটারি নিলামে কম দামে বিক্রির
প্রলোভন দেখিয়ে রিকশা মালিকদের কাছ থেকে মোটা
অংকের টাকা হাতিয়ে নেওয়াই
ছিল তাদের প্রধান কাজ।
ঘটনার
সূত্রপাত হয় খুলনা জেলার
সোনাডাঙ্গা থানাধীন শেখপাড়ার বাসিন্দা ও পেশায় পিকআপ
চালক শুক্কর আলীর একটি অভিযোগের
প্রেক্ষিতে। শুক্কর আলীর সাতটি অটোরিকশা
রয়েছে যা তিনি ভাড়া
দেন। গত ৮ জানুয়ারি
তার এক চালক আরিফের
সাথে পরিচয় হয় কথিত এক
হাইওয়ে সার্জেন্টের। সেই ব্যক্তি নিজেকে
তরিকুল ইসলাম পরিচয় দিয়ে একটি ভিজিটিং
কার্ড দেন এবং জানান
যে, পুলিশ লাইন্সে নিলামে কম মূল্যে ব্যাটারি
বিক্রি করা হবে। সরল
বিশ্বাসে শুক্কর আলী ওই নম্বরে
যোগাযোগ করলে তাকে আশ্বস্ত
করা হয় এবং অগ্রিম
হিসেবে বিকাশে ৩ হাজার টাকা
দিতে বলা হয়।
পরদিন
৯ জানুয়ারি তাকে সোনাডাঙ্গার আল
ফারুক মোড়ে আসতে বলা
হয়। সেখানে যাওয়ার পর আরেকজন নিজেকে
পুলিশ পরিচয় দিয়ে ফোন করে
একটি চালানের কপি নেওয়ার জন্য
৮২ হাজার টাকা দাবি করেন।
শুক্কর আলী সেই টাকা
পরিশোধ করে বয়রা পুলিশ
লাইন্সের সামনে ব্যাটারি পাওয়ার আশায় দীর্ঘ সময়
অপেক্ষা করেন। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর ওই সার্জেন্ট
পরিচয়ধারী ব্যক্তি আরও টাকা দাবি
করলে শুক্কর আলীর সন্দেহ হয়।
এক পর্যায়ে তিনি বুঝতে পারেন
তিনি একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক
চক্রের কবলে পড়েছেন।
এই ঘটনার পর ভুক্তভোগী দ্রুত
খুলনা জেলা পিবিআই অফিসে
লিখিত অভিযোগ জানান। পিবিআই প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মোস্তফা কামালের দিক-নির্দেশনায় এবং
জেলা ইউনিট প্রধান এসপি রেশমা শারমিনের
পরিকল্পনায় একটি বিশেষ টিম
মাঠে নামে। আধুনিক তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার
করে গত ১২ জানুয়ারি
মাগুরার ‘রয়েল আবাসিক হোটেল’
থেকে এসএম শাহিন, নাজমুল
হাসান ও ওবায়েদুল বিশ্বাস
নামের তিন প্রতারককে গ্রেপ্তার
করা হয়। তাদের কাছ
থেকে ৪টি মোবাইল ফোন,
একটি ওয়াকিটকি, পুলিশের লোগো সম্বলিত ফরম
এবং তরিকুল ইসলাম নামীয় ভুয়া ভিজিটিং কার্ড
উদ্ধার করা হয়েছে।
তদন্ত
তদারকি কর্মকর্তা ও খুলনার এসপি
রেশমা শারমিন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, “এই
চক্রের সদস্যরা মূলত ঢাকার আশুলিয়া
ও সাভার এলাকার দুর্ধর্ষ ডাকাত এবং ছিনতাইকারী। তারা
এর আগে ডাকাতি মামলায়
জেলও খেটেছে। কারাগারে বসেই তারা পরিকল্পনা
করে যে, জামিনে বেরিয়ে
তারা পেশা বদলে প্রতারণা
শুরু করবে। তারা খুলনায় এসে
পুলিশের বড় কর্মকর্তা ও
সার্জেন্ট পরিচয় দিয়ে মানুষের বিশ্বাস
অর্জন করত। কারাগারে বসেই
এই জালিয়াতির ছক কষা হয়েছিল।”
তিনি আরও জানান, এই
চক্রে মোট ৫ জন
জড়িত যার মধ্যে ৩
জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকিদের
ধরতেও অভিযান চলছে।
মামলার
বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা এসআই সোহানুর রহমান
জানান, আসামিরা তাদের অপরাধের কথা স্বীকার করেছে।
তারা ২০২৪ সালের আগস্ট
মাস থেকে দেশের বিভিন্ন
স্থানে এই জালিয়াতি চালিয়ে
আসছিল। চক্রটি এতটাই চতুর ছিল যে,
তারা পুলিশের প্রতিটি সরঞ্জাম নিখুঁতভাবে তৈরি করে নিয়েছিল।
আসামিদের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে একাধিক মামলা রয়েছে এবং দ্রুততম সময়ের
মধ্যে অর্থাৎ আগামী মাসেই আদালতে এই চাঞ্চল্যকর মামলার
চার্জশিট দাখিল করা হবে। পিবিআই
সূত্র জানিয়েছে, পলাতক বাকি দুই সদস্যকে
গ্রেপ্তার করা গেলে এই
চক্রের জাল কতদূর বিস্তৃত
তা আরও পরিষ্কার হবে।

আপনার মতামত লিখুন