শুধু সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিকতা নয়, রাজনৈতিক বার্তার সঙ্গে সাংস্কৃতিক পুনর্নির্মাণের এক বড় মঞ্চ হয়ে উঠল শনিবারের ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড। নতুন সরকারের শপথগ্রহণকে ঘিরে বিজেপি এ দিন স্পষ্ট করে দিল, বাংলার মাটি, সংস্কৃতি ও আবেগ এই তিনকেই সামনে রেখেই তারা নিজেদের নতুন রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করতে চাইছে।
দীর্ঘদিন ধরেই বিরোধীদের অভিযোগ ছিল, বিজেপি বাংলার সংস্কৃতির
সঙ্গে সংযোগহীন। সেই অভিযোগকে পাল্টা জবাব দিতেই এ দিনের আয়োজন যেন পরিকল্পিতভাবে বাঙালিয়ানার
আবহে সাজানো। মঞ্চজুড়ে ছিল বাংলার গর্ব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্বামী বিবেকানন্দ, নেতাজি
সুভাষচন্দ্র বসুর প্রতিকৃতি। শুধু প্রতীকী উপস্থিতি নয়, গোটা ব্রিগেড চত্বরে ছড়িয়ে
ছিল বাংলার লোকজ ঐতিহ্যের নানা রূপ।
কোথাও ভেসে আসছে বাউল গানের সুর, কোথাও ঝুমুরের তাল, আবার
কোথাও আদিবাসী নৃত্যের উচ্ছ্বাস গ্রামীণ বাংলার সংস্কৃতিকে শহরের কেন্দ্রে এনে যেন
এক নতুন রাজনৈতিক মঞ্চ তৈরি করা হল। পুরুলিয়ার ছৌয়ের পরিবর্তে এবার বেশি গুরুত্ব দেওয়া
হয় ঝুমুর ও আদিবাসী লোকনৃত্যে, যা পশ্চিমাঞ্চলের বাস্তব সাংস্কৃতিক সত্তাকেই সামনে
আনে। ফলে অনুষ্ঠানটি আরও স্বাভাবিক ও মাটির কাছাকাছি হয়ে ওঠে।
তবে সাংস্কৃতিক প্রদর্শনীর পাশাপাশি নজর কেড়েছে খাবারের
আয়োজন। ব্রিগেডের একাধিক প্রান্তে দেখা যায় ঝালমুড়ির স্টলে উপচে পড়া ভিড়। আয়োজকদের
দাবি, কয়েক হাজার প্যাকেট বিক্রি হয়েছে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই। রাজনৈতিক মহলের মতে, ঝাড়গ্রামে
এক সভায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী-র ঝালমুড়ি খাওয়ার ছবি ভাইরাল হওয়ার পর থেকেই
এই জনপ্রিয় রাস্তার খাবারটিকে ‘বাঙালির প্রতীক’ হিসেবে তুলে ধরার কৌশল নিয়েছে গেরুয়া
শিবির। সেই ধারাবাহিকতাই এ দিন আরও স্পষ্ট।
শুধু ঝালমুড়ি নয়, বাংলার ঐতিহ্যবাহী মিষ্টিও ছিল আকর্ষণের
কেন্দ্র। রসগোল্লা, সন্দেশ, কালাকাঁদ সবকিছুর মধ্যেই ছিল বাঙালিয়ানার ছোঁয়া। এমনকি
পদ্ম চিহ্ন আঁকা বিশেষ মিষ্টি ও গেরুয়া সাজে পরিবেশিত রসগোল্লাও রাজনৈতিক বার্তাকে
সাংস্কৃতিক মোড়কে তুলে ধরার এক অভিনব প্রয়াস।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ২০১৮ সালের পর থেকে বাংলায়
নিজেদের অবস্থান শক্ত করার পাশাপাশি বিজেপি বুঝেছে, শুধুমাত্র সংগঠন নয় সংস্কৃতির সঙ্গেও
সংযোগ তৈরি করা জরুরি। ‘বহিরাগত’ তকমা ঝেড়ে ফেলতে তাই গত কয়েক বছরে তারা ধারাবাহিকভাবে
বাঙালির আবেগ, ঐতিহ্য ও প্রতীককে নিজেদের প্রচারে জায়গা দিতে শুরু করেছে।
শনিবারের ব্রিগেড সেই কৌশলেরই এক বড় প্রদর্শনী। এখানে শপথের
মঞ্চ যেমন ছিল রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতীক, তেমনই তার চারপাশে গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক আবহ
ছিল গ্রহণযোগ্যতা তৈরির প্রচেষ্টা।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই এই ‘বাঙালিয়ানা’র রাজনৈতিক উপস্থাপনা
কি সত্যিই মানুষের মনে জায়গা করে নিতে পারবে, নাকি তা থেকে যাবে শুধুই মঞ্চসজ্জার অংশ
হিসেবে? সেই উত্তরই দেবে আগামী দিনের বাংলা রাজনীতি।

রোববার, ১০ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১০ মে ২০২৬
শুধু সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিকতা নয়, রাজনৈতিক বার্তার সঙ্গে সাংস্কৃতিক পুনর্নির্মাণের এক বড় মঞ্চ হয়ে উঠল শনিবারের ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড। নতুন সরকারের শপথগ্রহণকে ঘিরে বিজেপি এ দিন স্পষ্ট করে দিল, বাংলার মাটি, সংস্কৃতি ও আবেগ এই তিনকেই সামনে রেখেই তারা নিজেদের নতুন রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করতে চাইছে।
দীর্ঘদিন ধরেই বিরোধীদের অভিযোগ ছিল, বিজেপি বাংলার সংস্কৃতির
সঙ্গে সংযোগহীন। সেই অভিযোগকে পাল্টা জবাব দিতেই এ দিনের আয়োজন যেন পরিকল্পিতভাবে বাঙালিয়ানার
আবহে সাজানো। মঞ্চজুড়ে ছিল বাংলার গর্ব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্বামী বিবেকানন্দ, নেতাজি
সুভাষচন্দ্র বসুর প্রতিকৃতি। শুধু প্রতীকী উপস্থিতি নয়, গোটা ব্রিগেড চত্বরে ছড়িয়ে
ছিল বাংলার লোকজ ঐতিহ্যের নানা রূপ।
কোথাও ভেসে আসছে বাউল গানের সুর, কোথাও ঝুমুরের তাল, আবার
কোথাও আদিবাসী নৃত্যের উচ্ছ্বাস গ্রামীণ বাংলার সংস্কৃতিকে শহরের কেন্দ্রে এনে যেন
এক নতুন রাজনৈতিক মঞ্চ তৈরি করা হল। পুরুলিয়ার ছৌয়ের পরিবর্তে এবার বেশি গুরুত্ব দেওয়া
হয় ঝুমুর ও আদিবাসী লোকনৃত্যে, যা পশ্চিমাঞ্চলের বাস্তব সাংস্কৃতিক সত্তাকেই সামনে
আনে। ফলে অনুষ্ঠানটি আরও স্বাভাবিক ও মাটির কাছাকাছি হয়ে ওঠে।
তবে সাংস্কৃতিক প্রদর্শনীর পাশাপাশি নজর কেড়েছে খাবারের
আয়োজন। ব্রিগেডের একাধিক প্রান্তে দেখা যায় ঝালমুড়ির স্টলে উপচে পড়া ভিড়। আয়োজকদের
দাবি, কয়েক হাজার প্যাকেট বিক্রি হয়েছে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই। রাজনৈতিক মহলের মতে, ঝাড়গ্রামে
এক সভায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী-র ঝালমুড়ি খাওয়ার ছবি ভাইরাল হওয়ার পর থেকেই
এই জনপ্রিয় রাস্তার খাবারটিকে ‘বাঙালির প্রতীক’ হিসেবে তুলে ধরার কৌশল নিয়েছে গেরুয়া
শিবির। সেই ধারাবাহিকতাই এ দিন আরও স্পষ্ট।
শুধু ঝালমুড়ি নয়, বাংলার ঐতিহ্যবাহী মিষ্টিও ছিল আকর্ষণের
কেন্দ্র। রসগোল্লা, সন্দেশ, কালাকাঁদ সবকিছুর মধ্যেই ছিল বাঙালিয়ানার ছোঁয়া। এমনকি
পদ্ম চিহ্ন আঁকা বিশেষ মিষ্টি ও গেরুয়া সাজে পরিবেশিত রসগোল্লাও রাজনৈতিক বার্তাকে
সাংস্কৃতিক মোড়কে তুলে ধরার এক অভিনব প্রয়াস।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ২০১৮ সালের পর থেকে বাংলায়
নিজেদের অবস্থান শক্ত করার পাশাপাশি বিজেপি বুঝেছে, শুধুমাত্র সংগঠন নয় সংস্কৃতির সঙ্গেও
সংযোগ তৈরি করা জরুরি। ‘বহিরাগত’ তকমা ঝেড়ে ফেলতে তাই গত কয়েক বছরে তারা ধারাবাহিকভাবে
বাঙালির আবেগ, ঐতিহ্য ও প্রতীককে নিজেদের প্রচারে জায়গা দিতে শুরু করেছে।
শনিবারের ব্রিগেড সেই কৌশলেরই এক বড় প্রদর্শনী। এখানে শপথের
মঞ্চ যেমন ছিল রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতীক, তেমনই তার চারপাশে গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক আবহ
ছিল গ্রহণযোগ্যতা তৈরির প্রচেষ্টা।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই এই ‘বাঙালিয়ানা’র রাজনৈতিক উপস্থাপনা
কি সত্যিই মানুষের মনে জায়গা করে নিতে পারবে, নাকি তা থেকে যাবে শুধুই মঞ্চসজ্জার অংশ
হিসেবে? সেই উত্তরই দেবে আগামী দিনের বাংলা রাজনীতি।

আপনার মতামত লিখুন