সংবাদ

পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ যুদ্ধটির নাম ‘মা’


সৈয়দা বদরুন নেসা
সৈয়দা বদরুন নেসা
প্রকাশ: ১০ মে ২০২৬, ১১:০৬ এএম

পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ যুদ্ধটির নাম ‘মা’

মা দিবস পালন করা উচিত কি না-এই প্রশ্ন প্রায়ই ওঠে। কিন্তু সত্য হলো, পৃথিবীতে আমাদের অস্তিত্বের শুরুই একজন মাকে ঘিরে। একজন মা শুধু সন্তান জন্ম দেন না; তিনি নিজের শরীর, ঘুম, স্বপ্ন, সময়- এমনকি অনেক সময় নিজের জীবনটাকেও ধীরে ধীরে সন্তানের জন্য বিলিয়ে দেন।

একজন মা ৯ মাস সন্তানকে গর্ভে ধারণ করেন, তারপর সারাজীবন হৃদয়ে ধারণ করেন। তাই মা দিবস শুধু ফুল বা আনুষ্ঠানিক শুভেচ্ছার দিন নয়; এটি একজন মায়ের অদৃশ্য ত্যাগ, নিঃশব্দ ক্লান্তি এবং অগণিত না-বলা ভালোবাসাকে মনে করার দিন।

কিন্তু সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো- যে মানুষটি একটি সন্তানকে পৃথিবীতে আনার জন্য সবচেয়ে বড় ত্যাগ করেন, অনেক সময় সেই মানুষটিই সবচেয়ে বেশি অসম্মানিত হন।

সন্তানেরা যেমন মাকে সম্মান করবে, তার চেয়েও বেশি সম্মান দেওয়া উচিত সন্তানের বাবার। কারণ একজন নারী যখন মা হন, তখন তিনি শুধু একজন স্ত্রী থাকেন না- তিনি একজন সন্তানের নিরাপদ পৃথিবী হয়ে ওঠেন।

একজন মা ভুল করতেই পারেন। রাগ করতে পারেন। ক্লান্ত হতে পারেন। কিন্তু তার সন্তানের সামনে তাকে ছোট করা, অপমান করা কিংবা অসম্মান করা শুধু একজন নারীকে আঘাত করা নয়; এটি একটি শিশুর নিরাপদ মানসিক জগতকেও ভেঙে দেওয়া।

আজকের সমাজে অনেক সম্পর্কের ভাঙনের শুরু হয় পারস্পরিক অসম্মান থেকে। ধীরে ধীরে সেই দূরত্ব মানসিক ক্লান্তি তৈরি করে। তারপর সম্পর্কের ভেতরে জমে ওঠে নীরব অস্থিরতা। আর সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে সন্তানের ওপর। কারণ শিশু কখনো বাবা-মায়ের মধ্যে বিচারক হতে চায় না। সে শুধু চায় তার প্রিয় মানুষগুলো নিরাপদ থাকুক।

আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, বর্তমানে একক মাতৃত্ব এবং বিচ্ছিন্ন পরিবার কাঠামো বিশ্বজুড়ে দ্রুত বাড়ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, সিঙ্গেল-প্যারেন্ট পরিবারগুলোর বড় অংশে বাবার উপস্থিতি কমে যায়। একই সঙ্গে বহু মা অর্থনৈতিক ও মানসিক চাপ একাই বহন করেন।

আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, এককভাবে সন্তান লালন-পালন করা মায়েদের মানসিক চাপ সাধারণ পরিবারের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। অন্যদিকে চাইল্ড ডেভলপমেন্ট জার্নালের গবেষণায় দেখা গেছে, বিচ্ছেদের পর বহু সন্তান ধীরে ধীরে বাবার নিয়মিত সংস্পর্শ হারিয়ে ফেলে। এই পরিবর্তন শুধু পারিবারিক নয়; এটি একটি সামাজিক ও মানসিক বাস্তবতা।

সন্তান শুধু বড় হয় না, ভেতরেও তৈরি হয়। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, শিশুর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন দামি খেলনা বা বিলাসিতা নয়; বরং আবেগিক নিরাপত্তা। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী ডায়ানা বাউমরিন্ড-এর গবেষণা বলছে, স্নেহ, সম্মান ও মানসিক স্থিরতার পরিবেশে বড় হওয়া শিশুরা ভবিষ্যতে বেশি আত্মবিশ্বাসী ও মানসিকভাবে সুস্থ হয়।

সন্তান আপনার কাছ থেকে নিখুঁততা চায় না; সে চায় নিরাপদ উপস্থিতি। প্রথমত, সন্তানের সামনে সম্মানজনক আচরণ জরুরি। শিশু যখন তার মাকে অসম্মানিত হতে দেখে, তখন তার নিজের ভেতরেও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়। দ্বিতীয়ত, রাগ নয়, স্থিরতা প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, শিশুরা চিৎকারের ভাষা নয়, শান্ত আচরণের ভাষা বেশি মনে রাখে।

তৃতীয়ত, মায়ের মানসিক সুস্থতাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।  একজন ক্লান্ত, ভেঙে পড়া মা প্রতিদিন নিজের ভেতরের যুদ্ধ লুকিয়ে সন্তানের সামনে হাসেন। চতুর্থত, সন্তানের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন “সময়”। অনেক সময় শিশুর কাছে ২০ মিনিট মনোযোগ হাজার টাকার খেলনার চেয়েও মূল্যবান।

মায়েদের যুদ্ধগুলোর সাক্ষী থাকে শুধু রাত। “মায়েরা সন্তানকে শুধু জন্ম দেন না; তারা প্রতিদিন একটু একটু করে নিজেদের জীবন খরচ করে সন্তানকে বড় করেন।”

একজন মা দিনের শেষে শুধু রান্না বা সংসার সামলান না। সন্তানের স্কুল, অসুস্থতা, পড়াশোনা, মানসিক অবস্থা, ভবিষ্যৎ সবকিছু নিয়েই তার ভেতরে চলতে থাকে অদৃশ্য হিসাব। বিশেষ করে এককভাবে সন্তান লালন-পালন করা মায়েদের অনেক দায়িত্ব একাই বহন করতে হয়।

 একজন সিঙ্গেল মায়ের কাঁধে যে অদৃশ্য দায়িত্ব: সূত্র: জার্নাল অব ম্যারেজ অ্যান্ড ফ্যামিলি, ২০২৩

গবেষণায় দেখা গেছে, এসব দায়িত্বের বড় অংশই মায়েদের ওপর এসে পড়ে। অথচ নিজের যত্ন নেওয়ার সময় সবচেয়ে কম থাকে তাদেরই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মজীবী নারীর গল্প অনেকটা এরকম-

দিনে কাজ করেন, দায়িত্ব সামলান, মানুষের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলেন। রাতে হাসপাতালে বসে মেয়ের রিপোর্ট দেখেন। তার মেয়েটি থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত। মেয়ের জ্বর এলে রাত ৩টায় তিনিই জেগে থাকেন। রক্তের ব্যবস্থা, ওষুধের হিসাব, হাসপাতালের লাইনে দাঁড়ানো সব সামলে আবার সকালে স্বাভাবিক মুখে কাজে ফিরতে হয় তাকে।কিন্তু সবচেয়ে কঠিন বিষয় অর্থনৈতিক চাপ নয়। সবচেয়ে কঠিন হলো মানসিক একাকীত্ব।

অনেক সময় সন্তান ঘুমিয়ে গেলে মায়েরাই নিঃশব্দে ভেঙে পড়েন। কারণ পৃথিবী তাদের শক্ত থাকতে শেখায়, কিন্তু মানুষ হিসেবে কাঁদার অধিকার খুব কমই দেয়। তিনি বলেন, “সন্তানের সামনে আমি কাঁদি না। কারণ সে যদি আমাকে ভেঙে পড়তে দেখে, তাহলে তার পৃথিবীটাও ভেঙে যাবে।”

সম্পর্ক তো ভেঙে যায়, তাতে শিশুর পৃথিবীও কি ভাঙে না? অবশ্যই, বিচ্ছেদ সবসময় খারাপ সম্পর্কের ফল নয়। অনেক সময় এটি দীর্ঘদিনের মানসিক অশান্তি থেকে বের হওয়ার সিদ্ধান্তও হতে পারে। কিন্তু সেই পরিবর্তনের ভেতরে শিশুর মানসিক নিরাপত্তা যেন হারিয়ে না যায়, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

শিশু মনোবিজ্ঞানী ম্যারি অ্যানিসওয়ার্থ-এর মতে, শিশুর প্রথম জীবনের নিরাপত্তা তার পুরো ভবিষ্যৎ সম্পর্ককে প্রভাবিত করে। আর জুডিথ ওয়ালেরস্টেইন বলেন, দীর্ঘস্থায়ী পারিবারিক অস্থিরতা শিশুর মনে নীরব ক্ষত তৈরি করতে পারে।

বাবার অনুপস্থিতি সন্তানের মনে যে প্রভাব ফেলে

মূলত, শিশু চায় না পৃথিবী নিখুঁত হোক; সে শুধু চায় তার নিরাপদ মানুষগুলো পাশে থাকুক। কিছু সম্পর্ক কখনো শেষ হয় না। নারী জীবনে অনেক পরিচয় বহন করেন। কন্যা, বোন, স্ত্রী, বন্ধু। কিন্তু একজন নারীর সবচেয়ে গভীর পরিচয় সম্ভবত “মা”। কারণ মাতৃত্ব শুধু সন্তান জন্ম দেওয়ার নাম নয়; এটি নিজের ভেতর থেকে আরেকটি জীবনকে প্রতিদিন আগলে রাখার নাম।

একজন মা সন্তানের প্রথম আশ্রয়, প্রথম শিক্ষক, প্রথম সাহস। পৃথিবীর কাছে তিনি হয়তো সাধারণ একজন মানুষ, কিন্তু একটি সন্তানের কাছে তিনি পুরো পৃথিবী। এই পৃথিবীতে হয়তো অনেক সম্পর্ক বদলে যায়, অনেক মানুষ দূরে সরে যায়, কিন্তু একজন মা সন্তানের চিন্তা থেকে কখনো পুরোপুরি অবসর নেন না।

মায়েরা কখনো পুরোপুরি ঘুমান না। সন্তানের ভয়, জ্বর, ভবিষ্যৎ, কষ্ট সবকিছু তাদের ভেতরে আজীবন জেগে থাকে। সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃশব্দ কিন্তু সবচেয়ে দীর্ঘ যুদ্ধগুলোর একটি একজন মায়ের ভেতরেই চলে। “মায়ের হাতের ছায়া/ বড় হয়ে গেলেও রয়ে যায়/ সন্তানের মাথায়।"

পৃথিবীর সব মায়েরা ভালো থাকুন। কারণ একজন মা ভালো থাকলে, একটি শিশুর পৃথিবীও একটু নিরাপদ হয়ে ওঠে।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, কৃষি ও জলবায়ু গবেষক।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

রোববার, ১০ মে ২০২৬


পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ যুদ্ধটির নাম ‘মা’

প্রকাশের তারিখ : ১০ মে ২০২৬

featured Image

মা দিবস পালন করা উচিত কি না-এই প্রশ্ন প্রায়ই ওঠে। কিন্তু সত্য হলো, পৃথিবীতে আমাদের অস্তিত্বের শুরুই একজন মাকে ঘিরে। একজন মা শুধু সন্তান জন্ম দেন না; তিনি নিজের শরীর, ঘুম, স্বপ্ন, সময়- এমনকি অনেক সময় নিজের জীবনটাকেও ধীরে ধীরে সন্তানের জন্য বিলিয়ে দেন।

একজন মা ৯ মাস সন্তানকে গর্ভে ধারণ করেন, তারপর সারাজীবন হৃদয়ে ধারণ করেন। তাই মা দিবস শুধু ফুল বা আনুষ্ঠানিক শুভেচ্ছার দিন নয়; এটি একজন মায়ের অদৃশ্য ত্যাগ, নিঃশব্দ ক্লান্তি এবং অগণিত না-বলা ভালোবাসাকে মনে করার দিন।

কিন্তু সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো- যে মানুষটি একটি সন্তানকে পৃথিবীতে আনার জন্য সবচেয়ে বড় ত্যাগ করেন, অনেক সময় সেই মানুষটিই সবচেয়ে বেশি অসম্মানিত হন।

সন্তানেরা যেমন মাকে সম্মান করবে, তার চেয়েও বেশি সম্মান দেওয়া উচিত সন্তানের বাবার। কারণ একজন নারী যখন মা হন, তখন তিনি শুধু একজন স্ত্রী থাকেন না- তিনি একজন সন্তানের নিরাপদ পৃথিবী হয়ে ওঠেন।

একজন মা ভুল করতেই পারেন। রাগ করতে পারেন। ক্লান্ত হতে পারেন। কিন্তু তার সন্তানের সামনে তাকে ছোট করা, অপমান করা কিংবা অসম্মান করা শুধু একজন নারীকে আঘাত করা নয়; এটি একটি শিশুর নিরাপদ মানসিক জগতকেও ভেঙে দেওয়া।

আজকের সমাজে অনেক সম্পর্কের ভাঙনের শুরু হয় পারস্পরিক অসম্মান থেকে। ধীরে ধীরে সেই দূরত্ব মানসিক ক্লান্তি তৈরি করে। তারপর সম্পর্কের ভেতরে জমে ওঠে নীরব অস্থিরতা। আর সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে সন্তানের ওপর। কারণ শিশু কখনো বাবা-মায়ের মধ্যে বিচারক হতে চায় না। সে শুধু চায় তার প্রিয় মানুষগুলো নিরাপদ থাকুক।

আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, বর্তমানে একক মাতৃত্ব এবং বিচ্ছিন্ন পরিবার কাঠামো বিশ্বজুড়ে দ্রুত বাড়ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, সিঙ্গেল-প্যারেন্ট পরিবারগুলোর বড় অংশে বাবার উপস্থিতি কমে যায়। একই সঙ্গে বহু মা অর্থনৈতিক ও মানসিক চাপ একাই বহন করেন।

আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, এককভাবে সন্তান লালন-পালন করা মায়েদের মানসিক চাপ সাধারণ পরিবারের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। অন্যদিকে চাইল্ড ডেভলপমেন্ট জার্নালের গবেষণায় দেখা গেছে, বিচ্ছেদের পর বহু সন্তান ধীরে ধীরে বাবার নিয়মিত সংস্পর্শ হারিয়ে ফেলে। এই পরিবর্তন শুধু পারিবারিক নয়; এটি একটি সামাজিক ও মানসিক বাস্তবতা।

সন্তান শুধু বড় হয় না, ভেতরেও তৈরি হয়। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, শিশুর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন দামি খেলনা বা বিলাসিতা নয়; বরং আবেগিক নিরাপত্তা। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী ডায়ানা বাউমরিন্ড-এর গবেষণা বলছে, স্নেহ, সম্মান ও মানসিক স্থিরতার পরিবেশে বড় হওয়া শিশুরা ভবিষ্যতে বেশি আত্মবিশ্বাসী ও মানসিকভাবে সুস্থ হয়।

সন্তান আপনার কাছ থেকে নিখুঁততা চায় না; সে চায় নিরাপদ উপস্থিতি। প্রথমত, সন্তানের সামনে সম্মানজনক আচরণ জরুরি। শিশু যখন তার মাকে অসম্মানিত হতে দেখে, তখন তার নিজের ভেতরেও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়। দ্বিতীয়ত, রাগ নয়, স্থিরতা প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, শিশুরা চিৎকারের ভাষা নয়, শান্ত আচরণের ভাষা বেশি মনে রাখে।

তৃতীয়ত, মায়ের মানসিক সুস্থতাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।  একজন ক্লান্ত, ভেঙে পড়া মা প্রতিদিন নিজের ভেতরের যুদ্ধ লুকিয়ে সন্তানের সামনে হাসেন। চতুর্থত, সন্তানের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন “সময়”। অনেক সময় শিশুর কাছে ২০ মিনিট মনোযোগ হাজার টাকার খেলনার চেয়েও মূল্যবান।

মায়েদের যুদ্ধগুলোর সাক্ষী থাকে শুধু রাত। “মায়েরা সন্তানকে শুধু জন্ম দেন না; তারা প্রতিদিন একটু একটু করে নিজেদের জীবন খরচ করে সন্তানকে বড় করেন।”

একজন মা দিনের শেষে শুধু রান্না বা সংসার সামলান না। সন্তানের স্কুল, অসুস্থতা, পড়াশোনা, মানসিক অবস্থা, ভবিষ্যৎ সবকিছু নিয়েই তার ভেতরে চলতে থাকে অদৃশ্য হিসাব। বিশেষ করে এককভাবে সন্তান লালন-পালন করা মায়েদের অনেক দায়িত্ব একাই বহন করতে হয়।

 একজন সিঙ্গেল মায়ের কাঁধে যে অদৃশ্য দায়িত্ব: সূত্র: জার্নাল অব ম্যারেজ অ্যান্ড ফ্যামিলি, ২০২৩

গবেষণায় দেখা গেছে, এসব দায়িত্বের বড় অংশই মায়েদের ওপর এসে পড়ে। অথচ নিজের যত্ন নেওয়ার সময় সবচেয়ে কম থাকে তাদেরই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মজীবী নারীর গল্প অনেকটা এরকম-

দিনে কাজ করেন, দায়িত্ব সামলান, মানুষের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলেন। রাতে হাসপাতালে বসে মেয়ের রিপোর্ট দেখেন। তার মেয়েটি থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত। মেয়ের জ্বর এলে রাত ৩টায় তিনিই জেগে থাকেন। রক্তের ব্যবস্থা, ওষুধের হিসাব, হাসপাতালের লাইনে দাঁড়ানো সব সামলে আবার সকালে স্বাভাবিক মুখে কাজে ফিরতে হয় তাকে।কিন্তু সবচেয়ে কঠিন বিষয় অর্থনৈতিক চাপ নয়। সবচেয়ে কঠিন হলো মানসিক একাকীত্ব।

অনেক সময় সন্তান ঘুমিয়ে গেলে মায়েরাই নিঃশব্দে ভেঙে পড়েন। কারণ পৃথিবী তাদের শক্ত থাকতে শেখায়, কিন্তু মানুষ হিসেবে কাঁদার অধিকার খুব কমই দেয়। তিনি বলেন, “সন্তানের সামনে আমি কাঁদি না। কারণ সে যদি আমাকে ভেঙে পড়তে দেখে, তাহলে তার পৃথিবীটাও ভেঙে যাবে।”

সম্পর্ক তো ভেঙে যায়, তাতে শিশুর পৃথিবীও কি ভাঙে না? অবশ্যই, বিচ্ছেদ সবসময় খারাপ সম্পর্কের ফল নয়। অনেক সময় এটি দীর্ঘদিনের মানসিক অশান্তি থেকে বের হওয়ার সিদ্ধান্তও হতে পারে। কিন্তু সেই পরিবর্তনের ভেতরে শিশুর মানসিক নিরাপত্তা যেন হারিয়ে না যায়, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

শিশু মনোবিজ্ঞানী ম্যারি অ্যানিসওয়ার্থ-এর মতে, শিশুর প্রথম জীবনের নিরাপত্তা তার পুরো ভবিষ্যৎ সম্পর্ককে প্রভাবিত করে। আর জুডিথ ওয়ালেরস্টেইন বলেন, দীর্ঘস্থায়ী পারিবারিক অস্থিরতা শিশুর মনে নীরব ক্ষত তৈরি করতে পারে।

বাবার অনুপস্থিতি সন্তানের মনে যে প্রভাব ফেলে

মূলত, শিশু চায় না পৃথিবী নিখুঁত হোক; সে শুধু চায় তার নিরাপদ মানুষগুলো পাশে থাকুক। কিছু সম্পর্ক কখনো শেষ হয় না। নারী জীবনে অনেক পরিচয় বহন করেন। কন্যা, বোন, স্ত্রী, বন্ধু। কিন্তু একজন নারীর সবচেয়ে গভীর পরিচয় সম্ভবত “মা”। কারণ মাতৃত্ব শুধু সন্তান জন্ম দেওয়ার নাম নয়; এটি নিজের ভেতর থেকে আরেকটি জীবনকে প্রতিদিন আগলে রাখার নাম।

একজন মা সন্তানের প্রথম আশ্রয়, প্রথম শিক্ষক, প্রথম সাহস। পৃথিবীর কাছে তিনি হয়তো সাধারণ একজন মানুষ, কিন্তু একটি সন্তানের কাছে তিনি পুরো পৃথিবী। এই পৃথিবীতে হয়তো অনেক সম্পর্ক বদলে যায়, অনেক মানুষ দূরে সরে যায়, কিন্তু একজন মা সন্তানের চিন্তা থেকে কখনো পুরোপুরি অবসর নেন না।

মায়েরা কখনো পুরোপুরি ঘুমান না। সন্তানের ভয়, জ্বর, ভবিষ্যৎ, কষ্ট সবকিছু তাদের ভেতরে আজীবন জেগে থাকে। সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃশব্দ কিন্তু সবচেয়ে দীর্ঘ যুদ্ধগুলোর একটি একজন মায়ের ভেতরেই চলে। “মায়ের হাতের ছায়া/ বড় হয়ে গেলেও রয়ে যায়/ সন্তানের মাথায়।"

পৃথিবীর সব মায়েরা ভালো থাকুন। কারণ একজন মা ভালো থাকলে, একটি শিশুর পৃথিবীও একটু নিরাপদ হয়ে ওঠে।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, কৃষি ও জলবায়ু গবেষক।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত