সংসদে ৭ মার্চের ভাষণ সংবিধান থেকে বাদ দেয়া কথা বলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এই বিষয়ে আরেকটি কলাম লেখার ইচ্ছে আছে। আজ শুধু আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে করা পঞ্চদশ সংশোধনীর কিছু বিধান বাতিল করার তাৎপর্য তুলে ধরব। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেছেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে অনেক ‘আইনি প্রতারণা’ করা হয়েছে। পঞ্চদশ সংশোধনীতে আওয়ামী লীগ সরকার ৫৪টি পরিবর্তন এনেছিল, এই ৫৪টির মধ্যে ৫ আগস্টের পর হাইকোর্ট বাতিল করেছে ৬টি, বর্তমান সংসদের সিদ্ধান্তের ওপর বাকিগুলো ছেড়ে দেয়া হয়েছে। এখন সংসদ বাকি বিধানগুলো বাতিল বা সংশোধন করবে, অথবা হুবুহু রেখে দেবে। তবে এক্ষেত্রে আরেকটি জটিলতা আছে, পঞ্চদশ সংশোধনীর সম্পূর্ণ বাতিল চেয়ে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করা হয়েছে। হাইকোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ও গণভোট পুনর্বহাল করেছে, অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা দখলকারীকে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদানের সংশোধনী বাতিল করা হয়েছে, সংশোধন অযোগ্য সংবিধানের মৌলিক বিধানাবলী সংশ্লিষ্ট ৭ ক এবং ৭ খ অনুচ্ছেদ এবং নিম্ন আদালতকে ক্ষমতা অর্পন সম্পর্কিত বিধান বাতিল করেছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল এবং পুনর্বহাল দুটোই করেছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। জনগণের প্রতিনিধিত্ব না থাকায় ২০১১ সনে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে অবৈধ ঘোষণা করেছিল। অথচ ৫ আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাচ্যুতির পর ২০ নভে¤^র, ২০২৫ তারিখে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ আবার তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের রায়কে ‘ত্রুটিপূর্ণ’ বিবেচনায় অবৈধ ঘোষণা করেছে। অর্থাৎ এক রায়ে বলা হয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অবৈধ, আরেক রায়ে বলা হয়ে অবৈধ ঘোষিত রায় ত্রুটিপূর্ণ ও অবৈধ। সর্বশেষ রায়ের ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে পুনরুজ্জীবিত হয়ে গেল। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দল ও অন্তর্বর্তী সরকার মিলেমিশে ১৮ মাস প্রশাসনকে ভাগবাটোয়ারা করে দেশ শাসন ও নির্বাচন করেছে। নিজেদের পছন্দমত লোক দিয়ে গঠিত নির্বাচন কমিশন ও সরকার দ্বারা অনুষ্ঠিত নির্বাচন যদি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়, তাহলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অপরিহার্যতা কেন তা বোধগম্য হয় না।
পঞ্চদশ সংশোধনী দ্বারা আওয়ামী লীগ গণভোট বাতিল করেছিল, হাইকোর্টের রায়ে তা পুনর্বহাল হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গণভোট হয়েছে, কিন্তু বিএনপি গণভোটের রায় মানছে না। না মানার এই শক্তি বিএনপি পেয়েছে জনগণের কাছ থেকেই। কারণ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপিকে ভোট দিয়ে জয়ী করেছে জনগণই। সংসদ এবং গণভোট দুটোই সরকারের কাজের বৈধতা দেয়, রাষ্ট্রের জন্য আইন পাস করে। সংসদের কাজ সম্পাদিত হয় জনগণের প্রতিনিধির মাধ্যমে, আর গণভোটের মাধ্যমে আইন পাসকরণে জনগণ সরাসরি অংশগ্রহণ করে থাকে। গণভোট প্রক্রিয়ায় ভোটারদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে আইন পাসের ব্যবস্থা থাকলে সংসদ রাখার প্রয়োজন থাকে না। ভিন্ন বিবেচনায়, সংসদ থাকলে গণভোটেরও প্রয়োজন হয় না। অর্থাৎ দুটোর একটি থাকলেই হয়। অভিজ্ঞতা বলে সংসদ লাগবে, কারণ ঘন ঘন গণভোট আয়োজন বাস্তবসম্মত নয়। দ্বিতীয়ত অধিকাংশ ভোটারের আইন বিষয়ক জ্ঞান নেই। কিছুদিন আগে যে বিষয়ের ওপর গণভোট হয়েছে তার আগামাথা কেউ বোঝেনি, ভোট দাতারা অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়েছে। তাই সংসদ ও গণভোট দুটোর প্রয়োগ যুক্তিসঙ্গত বিবেচিত না হওয়ায় আওয়ামী লীগ সরকার পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধান থেকে বাদ দিয়েছিল।
পঞ্চদশ সংশোধনীতে আওয়ামী লীগ সরকার ধর্মনিরপেক্ষতাকে প্রাধান্য দিয়ে একটা গোঁজামিল তৈরি করেছিল। কারণ সংবিধানের প্রস্তাবনায় রাখা হয়েছে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ এবং সংবিধানের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে রাষ্ট্রধর্ম ‘ইসলাম’। ধর্মনিরপেক্ষতার সঙ্গে কোন একটি বিশেষ ধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান সঙ্গতিপূর্ণ নয়, পরষ্পর বিরোধী। রাষ্ট্রের কোন ধর্ম থাকে না, ধর্ম হয় মানুষের। ধর্ম নাযিল হয়েছে মানুষের জন্য, রাষ্ট্রের জন্য নয়। ধর্ম হচ্ছে বিশ্বাস, সম্পর্ক সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে, সেই ধর্মকে রাষ্ট্রীয়করণ অয়ৌক্তিক। ধর্মনিরপেক্ষতা মানে রাষ্ট্রের কোন ধর্মের প্রতি পক্ষপাতিত্ব থাকবে না। কিন্তু তাই বলে রাষ্ট্রের নাগরিকরা ধর্মনিরপেক্ষ নয়, প্রত্যেক নাগরিক তার নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করার অধিকার রাখে। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোন একটি ধর্মকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া স্ববিরোধী এবং গণতন্ত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। নাগরিকের সমঅধিকার না থাকলে তা কখনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা হতে পারে না। তাই গোঁজামিলের ধর্মনিরপেক্ষতা সংবিধানে থাকা-না থাকা সমান।
জোর করে ক্ষমতা দখল রোধে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধানে যে পরিবর্তন এনেছিল তাও অপ্রয়োজনীয়। এই পরিবর্তনে বলা হয়েছিল, কোন ব্যক্তির ক্ষমতাবলে অসংবিধানিকভাবে সংবিধান বাতিল, পরিবর্তন করলে বা পরিবর্তনের ষড়যন্ত্র করলে তার অপরাধ হবে দেশদ্রোহিতার এবং শাস্তি হবে মৃত্যদণ্ড বা যাবজ্জীবন। পাকিস্তানের সংবিধান থেকে সম্ভবত এই পরিবর্তন নকল করা হয়েছে। পাকিস্তানের সংবিধানে একই বিধান থাকা সত্বেও পাকিস্তানে বারবার সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করেছে। পাকিস্তানের জেনারেল জিয়াউল হক জোর করে শাসন ক্ষমতা দখল করেছিলেন, কিন্তু তার কোন শাস্তি হয়নি, শাস্তি হয়েছিল এই আইনের প্রণেতা প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর, তাকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলানো হয়েছে। অস্ত্রের মুখে ক্ষমতা দখলকারী পাকিস্তানের জেনারেল পারভেজ মোশাররফের কোন বিচার হয়নি, বিচার হয়নি বাংলাদেশের হোসেন মোহাম্মদ এরশাদের, বরং পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যখন এই আইন পাস হয় তখন তিনি সংসদেই ছিলেন। আওয়ামী লীগের পঞ্চদশ সংশোধনী দ্বারা সংবিধানে দণ্ডবিধি অন্তর্ভুক্ত করে অবৈধ ক্ষমতা দখল রোধ করা যায়নি, বরং আইন প্রণেতা আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে। তাই এই বিধান রাখা বা বাতিল করার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।
পঞ্চদশ সংশোধনী দ্বারা আওয়ামী লীগ সংসদে নারী আসন ৪৫ থেকে ৫০টিতে উন্নীত করেছিল। মনে হচ্ছে এই পরিবর্তন বাতিল হবে না, বাতিল করার ইচ্ছে থাকলে বর্তমান সংসদে ৫০ জন নারী সংসদ সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হতেন না। সংরক্ষিত আসন নিয়ে কত কথা, শফিক রেহমানের সাপ্তাহিক ‘যায়যায়দিন’-এ এই নারী সাংসদদের ‘সংসদের শোভা ত্রিশ সেট অলংকার’ বলে অভিহিত করা হয়েছিল। ১৯৮৬ সনে এরশাদ সাহেবের আমলে নারীদের জন্য ৩০টি আসন সংরক্ষণ রাখা হয়। দেশের নারীরাও তাদের জন্য এভাবে আসন সংরক্ষিত রাখার বিপক্ষে, তারা জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হতে চায়, তারা চায় তাদের জন্য দেশব্যাপী ১শ’টি আসন নির্ধারণ করা হোক, তারা দলের মনোনয়ন নিয়ে বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হবেন। কিন্তু এই পরিবর্তন অদ্যাবধি হয়নি।
রাজনৈতিক কারণে বাংলাদেশর জনগণের বিভাজন বিপরীতধর্মী, এই বিপরীত মনোভাব সংবিধান সংশোধন, পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান। এক পক্ষ ক্ষমতায় এসে নিজের মনোভাব অনুযায়ী সংবিধানে যা যা সংযোজন-বিয়োজন করে, আরেক পক্ষ ক্ষমতায় এসে তা তা বাতিল করে সংবিধানে নিজেদের মনোভাবের প্রতিফলন ঘটায়। তাই সংবিধানের কাটাছেঁড়া এভাবে চলতে থাকলে এক সময় সংবিধানের আদি রূপ আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

শনিবার, ০৯ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৯ মে ২০২৬
সংসদে ৭ মার্চের ভাষণ সংবিধান থেকে বাদ দেয়া কথা বলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এই বিষয়ে আরেকটি কলাম লেখার ইচ্ছে আছে। আজ শুধু আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে করা পঞ্চদশ সংশোধনীর কিছু বিধান বাতিল করার তাৎপর্য তুলে ধরব। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেছেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে অনেক ‘আইনি প্রতারণা’ করা হয়েছে। পঞ্চদশ সংশোধনীতে আওয়ামী লীগ সরকার ৫৪টি পরিবর্তন এনেছিল, এই ৫৪টির মধ্যে ৫ আগস্টের পর হাইকোর্ট বাতিল করেছে ৬টি, বর্তমান সংসদের সিদ্ধান্তের ওপর বাকিগুলো ছেড়ে দেয়া হয়েছে। এখন সংসদ বাকি বিধানগুলো বাতিল বা সংশোধন করবে, অথবা হুবুহু রেখে দেবে। তবে এক্ষেত্রে আরেকটি জটিলতা আছে, পঞ্চদশ সংশোধনীর সম্পূর্ণ বাতিল চেয়ে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করা হয়েছে। হাইকোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ও গণভোট পুনর্বহাল করেছে, অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা দখলকারীকে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদানের সংশোধনী বাতিল করা হয়েছে, সংশোধন অযোগ্য সংবিধানের মৌলিক বিধানাবলী সংশ্লিষ্ট ৭ ক এবং ৭ খ অনুচ্ছেদ এবং নিম্ন আদালতকে ক্ষমতা অর্পন সম্পর্কিত বিধান বাতিল করেছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল এবং পুনর্বহাল দুটোই করেছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। জনগণের প্রতিনিধিত্ব না থাকায় ২০১১ সনে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে অবৈধ ঘোষণা করেছিল। অথচ ৫ আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাচ্যুতির পর ২০ নভে¤^র, ২০২৫ তারিখে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ আবার তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের রায়কে ‘ত্রুটিপূর্ণ’ বিবেচনায় অবৈধ ঘোষণা করেছে। অর্থাৎ এক রায়ে বলা হয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অবৈধ, আরেক রায়ে বলা হয়ে অবৈধ ঘোষিত রায় ত্রুটিপূর্ণ ও অবৈধ। সর্বশেষ রায়ের ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে পুনরুজ্জীবিত হয়ে গেল। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দল ও অন্তর্বর্তী সরকার মিলেমিশে ১৮ মাস প্রশাসনকে ভাগবাটোয়ারা করে দেশ শাসন ও নির্বাচন করেছে। নিজেদের পছন্দমত লোক দিয়ে গঠিত নির্বাচন কমিশন ও সরকার দ্বারা অনুষ্ঠিত নির্বাচন যদি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়, তাহলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অপরিহার্যতা কেন তা বোধগম্য হয় না।
পঞ্চদশ সংশোধনী দ্বারা আওয়ামী লীগ গণভোট বাতিল করেছিল, হাইকোর্টের রায়ে তা পুনর্বহাল হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গণভোট হয়েছে, কিন্তু বিএনপি গণভোটের রায় মানছে না। না মানার এই শক্তি বিএনপি পেয়েছে জনগণের কাছ থেকেই। কারণ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপিকে ভোট দিয়ে জয়ী করেছে জনগণই। সংসদ এবং গণভোট দুটোই সরকারের কাজের বৈধতা দেয়, রাষ্ট্রের জন্য আইন পাস করে। সংসদের কাজ সম্পাদিত হয় জনগণের প্রতিনিধির মাধ্যমে, আর গণভোটের মাধ্যমে আইন পাসকরণে জনগণ সরাসরি অংশগ্রহণ করে থাকে। গণভোট প্রক্রিয়ায় ভোটারদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে আইন পাসের ব্যবস্থা থাকলে সংসদ রাখার প্রয়োজন থাকে না। ভিন্ন বিবেচনায়, সংসদ থাকলে গণভোটেরও প্রয়োজন হয় না। অর্থাৎ দুটোর একটি থাকলেই হয়। অভিজ্ঞতা বলে সংসদ লাগবে, কারণ ঘন ঘন গণভোট আয়োজন বাস্তবসম্মত নয়। দ্বিতীয়ত অধিকাংশ ভোটারের আইন বিষয়ক জ্ঞান নেই। কিছুদিন আগে যে বিষয়ের ওপর গণভোট হয়েছে তার আগামাথা কেউ বোঝেনি, ভোট দাতারা অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়েছে। তাই সংসদ ও গণভোট দুটোর প্রয়োগ যুক্তিসঙ্গত বিবেচিত না হওয়ায় আওয়ামী লীগ সরকার পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধান থেকে বাদ দিয়েছিল।
পঞ্চদশ সংশোধনীতে আওয়ামী লীগ সরকার ধর্মনিরপেক্ষতাকে প্রাধান্য দিয়ে একটা গোঁজামিল তৈরি করেছিল। কারণ সংবিধানের প্রস্তাবনায় রাখা হয়েছে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ এবং সংবিধানের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে রাষ্ট্রধর্ম ‘ইসলাম’। ধর্মনিরপেক্ষতার সঙ্গে কোন একটি বিশেষ ধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান সঙ্গতিপূর্ণ নয়, পরষ্পর বিরোধী। রাষ্ট্রের কোন ধর্ম থাকে না, ধর্ম হয় মানুষের। ধর্ম নাযিল হয়েছে মানুষের জন্য, রাষ্ট্রের জন্য নয়। ধর্ম হচ্ছে বিশ্বাস, সম্পর্ক সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে, সেই ধর্মকে রাষ্ট্রীয়করণ অয়ৌক্তিক। ধর্মনিরপেক্ষতা মানে রাষ্ট্রের কোন ধর্মের প্রতি পক্ষপাতিত্ব থাকবে না। কিন্তু তাই বলে রাষ্ট্রের নাগরিকরা ধর্মনিরপেক্ষ নয়, প্রত্যেক নাগরিক তার নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করার অধিকার রাখে। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোন একটি ধর্মকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া স্ববিরোধী এবং গণতন্ত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। নাগরিকের সমঅধিকার না থাকলে তা কখনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা হতে পারে না। তাই গোঁজামিলের ধর্মনিরপেক্ষতা সংবিধানে থাকা-না থাকা সমান।
জোর করে ক্ষমতা দখল রোধে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধানে যে পরিবর্তন এনেছিল তাও অপ্রয়োজনীয়। এই পরিবর্তনে বলা হয়েছিল, কোন ব্যক্তির ক্ষমতাবলে অসংবিধানিকভাবে সংবিধান বাতিল, পরিবর্তন করলে বা পরিবর্তনের ষড়যন্ত্র করলে তার অপরাধ হবে দেশদ্রোহিতার এবং শাস্তি হবে মৃত্যদণ্ড বা যাবজ্জীবন। পাকিস্তানের সংবিধান থেকে সম্ভবত এই পরিবর্তন নকল করা হয়েছে। পাকিস্তানের সংবিধানে একই বিধান থাকা সত্বেও পাকিস্তানে বারবার সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করেছে। পাকিস্তানের জেনারেল জিয়াউল হক জোর করে শাসন ক্ষমতা দখল করেছিলেন, কিন্তু তার কোন শাস্তি হয়নি, শাস্তি হয়েছিল এই আইনের প্রণেতা প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর, তাকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলানো হয়েছে। অস্ত্রের মুখে ক্ষমতা দখলকারী পাকিস্তানের জেনারেল পারভেজ মোশাররফের কোন বিচার হয়নি, বিচার হয়নি বাংলাদেশের হোসেন মোহাম্মদ এরশাদের, বরং পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যখন এই আইন পাস হয় তখন তিনি সংসদেই ছিলেন। আওয়ামী লীগের পঞ্চদশ সংশোধনী দ্বারা সংবিধানে দণ্ডবিধি অন্তর্ভুক্ত করে অবৈধ ক্ষমতা দখল রোধ করা যায়নি, বরং আইন প্রণেতা আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে। তাই এই বিধান রাখা বা বাতিল করার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।
পঞ্চদশ সংশোধনী দ্বারা আওয়ামী লীগ সংসদে নারী আসন ৪৫ থেকে ৫০টিতে উন্নীত করেছিল। মনে হচ্ছে এই পরিবর্তন বাতিল হবে না, বাতিল করার ইচ্ছে থাকলে বর্তমান সংসদে ৫০ জন নারী সংসদ সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হতেন না। সংরক্ষিত আসন নিয়ে কত কথা, শফিক রেহমানের সাপ্তাহিক ‘যায়যায়দিন’-এ এই নারী সাংসদদের ‘সংসদের শোভা ত্রিশ সেট অলংকার’ বলে অভিহিত করা হয়েছিল। ১৯৮৬ সনে এরশাদ সাহেবের আমলে নারীদের জন্য ৩০টি আসন সংরক্ষণ রাখা হয়। দেশের নারীরাও তাদের জন্য এভাবে আসন সংরক্ষিত রাখার বিপক্ষে, তারা জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হতে চায়, তারা চায় তাদের জন্য দেশব্যাপী ১শ’টি আসন নির্ধারণ করা হোক, তারা দলের মনোনয়ন নিয়ে বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হবেন। কিন্তু এই পরিবর্তন অদ্যাবধি হয়নি।
রাজনৈতিক কারণে বাংলাদেশর জনগণের বিভাজন বিপরীতধর্মী, এই বিপরীত মনোভাব সংবিধান সংশোধন, পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান। এক পক্ষ ক্ষমতায় এসে নিজের মনোভাব অনুযায়ী সংবিধানে যা যা সংযোজন-বিয়োজন করে, আরেক পক্ষ ক্ষমতায় এসে তা তা বাতিল করে সংবিধানে নিজেদের মনোভাবের প্রতিফলন ঘটায়। তাই সংবিধানের কাটাছেঁড়া এভাবে চলতে থাকলে এক সময় সংবিধানের আদি রূপ আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

আপনার মতামত লিখুন