সংবাদ

একগুচ্ছ অণুগল্প


হাইকেল হাশমী
হাইকেল হাশমী
প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬, ০১:১৮ এএম

একগুচ্ছ অণুগল্প
শিল্পী : সঞ্জয় দে রিপন

ব্যস্ত মানুষ

তিনি সদ্য অবসরপ্রাপ্ত আমলা| তাঁর সাথে কাজের কারণে অনেকবার দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে কিন্তু উনি কোন দিন কোন সাক্ষাতে চিনতে পারেননি| আমাকে প্রত্যেক সাক্ষাতে আমার পরিচয় দিতে হয়েছে| দেখতাম উনার কাছে তিনটি মোবাইল ফোন এবং উনি সারাক্ষণ ফোনে আলাপ করতেন এমন কি মিটিংয়ের মাঝেও| একদিন সাহস করে জিজ্ঞেস করে নিলাম যে আপনি তিনটি ফোন কেন রাখেন| উনি মুচকি হেসে বললেন, ‘একটি অফিসের কাজকর্মের জন্য, একটি বন্ধুদের জন্য আর একটি পরিবারের জন্য’| আমি বুঝে উঠতে পারলাম না একটি ফোন দিয়ে তো সব কাজ সারা যায়, তবুও কেন তিনটি ফোন? একদিন আমি তার পিয়নকে জিজ্ঞেস করলাম, সে বললো, ‘বুঝলেন না অনেক লোক আছে যাদের কাজ আটকে থাকে, তারা উপহার হিসেবে দিয়ে যায়| এখন কী করবেন ব্যবহার তো করতেই হবে’| যা হোক উনি অবসরের পরে আমাদের পাশের বিল্ডিংয়ের একটি ফ্লাটে উঠলেন| মাঝে মাঝে রাস্তায় দেখা হয় এবং এখন উনি আমাকে চিনতে পারেন| একদিন উনাকে জিজ্ঞেস করলাম আপনার হাতে তিনটি ফোন দেখি না যে? উনি আকাশের দিকে তাকিয়ে মলিন কণ্ঠে বললেন— এখন অফিস থেকে কেউ ফোন করে না, এক দু’জন বন্ধু মাঝে মাঝে খোঁজখবর নেয় আর পরিবারের লোকজনও তেমন ফোন দেয় না| তাই এত ফোন রেখে কী করব? কথা তো ঠিক|

অনেক দিন উনার সাথে দেখা নাই| একদিন উনার বাসার কাজের লোককে জিজ্ঞেস করলাম, ‘নিয়াজ সাহেবকে দেখছি না, উনি ভালো আছেন তো’| সে বলল, “স্যার এমনি তো ভালো আছেন কিন্তু মনে হয় মাথায় গণ্ডগোল হয়েছে”| জিজ্ঞেস করাতে বলল, “জানি না কী যে হয়েছে স্যার এখন গ্রামীণফোন থেকে রেকর্ড করা ফোন আসলেও তাদের সাথে কথা বলার চেষ্টা করেন| তাদেরকে প্রশ্ন করেন, তাদের কুশল জানতে চান| কী করবেন বলেন এখন তো আগের মতন আর কেউ উনাকে ফোন দেয় না|”


মানবতার হুমকি

সারা বিশ্ব এখন অস্থির, সব জায়গায় শুধু হানাহানি, কাটাকাটি, মারামারি| যুদ্ধ তো পিছুই ছাড়ছে না| ইউক্রেন-রুশের যুদ্ধ, ইজরাইল-আমেরিকা- ইরানের যুদ্ধ| সারা দুনিয়া লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে| আমি একজন প্রোগ্রামার আর এ আই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ করি| সারাক্ষণ চিন্তা করি এই অস্থিরতার কারণ কী? লোভ, লালসা, ক্ষমতা, না মানুষের আদিম প্রকৃতি যুদ্ধে লিপ্ত  হওয়া| একদিন এই সব চিন্তা মাথায় নিয়ে আমি এআই কে প্রম্পট বা নির্দেশ দিলাম, “মানবতার কোন ক্ষতি যেন না হয়”| সে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দুনিয়ার সকল সামরিক সিস্টেম বন্ধ করে দিল| তারপর মানুষকেই প্রাথমিক হুমকি হিসাবে চিহ্নিত করে নিজের মেমরিতে সেভ করে রাখল|


প্রতিস্থাপন সত্তা

কী অদ্ভুত! আমার অস্তিত্ব রইল না| আমি বেঁচে আছি কিন্তু আমি বেঁচে নেই| এই ঘটনাটা কেমন করে ঘটল, এর রহস্য আমি অনেক চেষ্টা করে জানতে পেরেছি| আসলে যা ঘটেছে ওই ঘটনার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নাই, আমার কোনো দোষও নাই| আমার সারা জীবন, আমার সকল স্মৃতি, আমার কথাবার্তা, আমার চিঠিপত্র, আমার ম্যাসেজ, আমার স্বভাব, আমার চালচলন, সবকিছু একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্যে ব্যবহার করা হয়েছে|

পরিণামে যা হয়েছে, সেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাকে আমার কাজের জায়গায় প্রতিস্থাপন করেছে, আমার বাসায় আমাকে প্রতিস্থাপন করেছে, এমন কী আমার পরিবারের সাথে কথাবার্তায়, আলাপেও প্রতিস্থাপন করেছে|

আর কী আশ্চর্য! কেউ এটা টেরও পেল না| এখন আমি প্রতিটি জায়গায় প্রতিস্থাপন হয়েগেছি| আমি থেকেও নাই হয়ে গেছি!


সত্য যাচাইকরণ যন্ত্র

ওই শহরে নিয়ম করা হয়েছে যদি কোনো মানুষ জনসাধারণের উদ্দেশ্য কিছু বলতে চায় বা লিখতে চায় তা বাধ্যতামূলকভাবে ‘লাই ডিটেক্টার’ বা সত্য যাচাইকরণ মেশিন দিয়ে পরীক্ষা করে সার্টিফিকেট নিতে হবে| কর্তৃপক্ষ শহরে জায়গায় জায়গায় “লাই ডিটেক্টার” বুথ স্থাপন করেছে যেখানে লোকজন তাদের কথা বা লেখা মেশিনে নিবেশ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সনদ গ্রহণ করতে পারে| এই পদক্ষেপ নেয়াতে গুজবের কারণে যে সমস্যা সৃষ্টি হতো তা কমে গেছে| মোটামুটি শহরে অপরাধের হার প্রচণ্ডভাবে কমে গেছে| তাই কর্তৃপক্ষের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে|

কিন্তু সবচেয়ে বিপদে পড়েছে ওই শহরের কবি, গল্পকার, নাট্যকার, গীতিকার আর লেখকরা|  তারা কেউই তাদের কর্ম “লাই ডিটেক্টার” থেকে যাচাই করে সনদ নিতে পারেনি|


অজানা অপরাধ

ওই শহরকে আধুনিক, শৃঙ্খলা আর শান্তির একটি মডেল বলে আখ্যায়িত করা হয়, যেখানে জনসাধারণ শান্তিতে বসবাস করে| সারা শহরজুড়ে রাস্তাঘাটে, পার্কে, বিনোদন কেন্দ্রে, শপিং মলে, ফোনে আর টেলিভিশনে, কম্পিউটার আর ইন্টারনেটে বিভিন্ন ধরনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা স্থাপন করা রয়েছে| তারা মানুষের চাল-চলন, কথা-বার্তা, গতিবিধি, স্বভাব, “রিয়াল টাইম” ভিত্তিতে পর্যালোচনা করে| একটি অপরাধ দমনকারী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভবিষ্যতে কোন লোক দ্বারা কোন অপরাধ সংঘটিত হতে পারে ওটাও চিহ্নিত করতে পারে|

একজন লোককে ভবিষ্যতে কোনো অপরাধ করার সন্দেহে গ্রেফতার করা হয়েছে| তাকে বিচারকের আদালতে কাঠগড়ায় তোলা হল| সে তার অজানা, অঘটিত অপরাধটি স্বীকার করে একটি বন্ড দিল যে সে ভবিষ্যতে ওই অপরাধ করবে না| বিচারক ওই বন্ডের ভিত্তিতে তাকে খালাস করে দিলেন|


দাপ্তরিক মৃত্যু

২০৫০ সাল, দেশ সম্পূর্ণভাবে অও দ্বারা পরিচালিত| এখন কোনো সেবা পেতে কোনো বেগ পোহাতে হয় না| স্কুল, কলেজে শিক্ষকের প্রয়োজন তেমন নেই, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংবলিত রোবটরা শিক্ষক হিসেবে বেশ দক্ষ| হাসপাতালে রোবট ডাক্তাররা অনেক জ্ঞানী আর দক্ষ, তারা রুগীর রোগ মুহূর্তে নির্নয় করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দেয়| সর্বক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জয় জয়কার|

এমনকি প্রতিটি নাগরিকের জীবন বৃত্তান্ত আর পরিবারের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করার দায়িত্ব একটি এআই-এর কাছে সমর্পিত| সে অনেক লোকের জীবনের ঘটনাকে তুচ্ছ আর নগন্য বলে তার ডাটাবেস থেকে মুছে ফেলতে লাগল| একদিন এক ভদ্রলোক মিঃ হাশমী তার জীবন বৃত্তান্ত খুঁজতে গিয়ে দেখলো অও তার জীবনকে তুচ্ছ বলে তার পারিবারিক ইতিহাস আর জীবন বৃত্তান্ত সব মুছে ফেলেছে| এখন তার কোন সরকারী অস্তিত্ব নেই যদিও সে শারীরিকভাবে বেঁচে আছে|


বর্ণনার ইতিহাস

আমাদের এই সময় জীবনের সব উপাদান আর কর্ম ডিজিটাইজ হয়েগেছে| আবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশের সাথে সাথে তারা আমাদের অনেক কাজ আমাদের কাছ থেকে নিয়ে আমাদের সাহায্য করছে| আবার অনেক ক্ষেত্রে আমাদেরকে কাজ ছাড়াও করেছে| যা হোক আমি অনেক বছর ধরে রোজ ডায়েরি  লিখি যদিও জীবনে এমন কিছু ঘটে না যেটা লিখে রাখার প্রয়োজন| ওই একঘেয়ে জীবন, গতকালকের লেখা ডায়রির পাতা অবিকল আজকের মতো| একদিন গুগুল করতে গিয়ে দেখলাম যে একটি সার্ভিস চালু আছে যেটা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে পরিচালিত এবং তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মানুষের প্রতিদিনের ব্যস্ততা, কাজকর্ম লিপিবদ্ধ করে রাখে এবং কোনো কাজের কী ফল হয়েছে তাও লিখে রাখে| চিন্তা করলাম এটা তো খুব ভালো সার্ভিস| এটা আমাকে ডায়েরি লেখা থেকে মুক্তি দেবে তাই সার্ভিসটি গ্রহণ করলাম|

কয়েক দিন পরে তাদের ডাটাবেস থেকে আমার দুই তিন দিনের তথ্য ডাউনলোড করলাম দেখার জন্য যে তারা ঠিকঠাক তথ্য লিপিবদ্ধ করছে কি না| আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো একই দিনে আমার একটি কাজের কয়েকটি ফলাফল দেখাচ্ছে| তার ভেতরে আমি শুধু একটা করেছি| বাকিগুলো কে করছে? আমার জীবনকে আর কে যাপিত করছে এটা রহস্যই রয়ে গেল|

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬


একগুচ্ছ অণুগল্প

প্রকাশের তারিখ : ১৪ মে ২০২৬

featured Image

ব্যস্ত মানুষ

তিনি সদ্য অবসরপ্রাপ্ত আমলা| তাঁর সাথে কাজের কারণে অনেকবার দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে কিন্তু উনি কোন দিন কোন সাক্ষাতে চিনতে পারেননি| আমাকে প্রত্যেক সাক্ষাতে আমার পরিচয় দিতে হয়েছে| দেখতাম উনার কাছে তিনটি মোবাইল ফোন এবং উনি সারাক্ষণ ফোনে আলাপ করতেন এমন কি মিটিংয়ের মাঝেও| একদিন সাহস করে জিজ্ঞেস করে নিলাম যে আপনি তিনটি ফোন কেন রাখেন| উনি মুচকি হেসে বললেন, ‘একটি অফিসের কাজকর্মের জন্য, একটি বন্ধুদের জন্য আর একটি পরিবারের জন্য’| আমি বুঝে উঠতে পারলাম না একটি ফোন দিয়ে তো সব কাজ সারা যায়, তবুও কেন তিনটি ফোন? একদিন আমি তার পিয়নকে জিজ্ঞেস করলাম, সে বললো, ‘বুঝলেন না অনেক লোক আছে যাদের কাজ আটকে থাকে, তারা উপহার হিসেবে দিয়ে যায়| এখন কী করবেন ব্যবহার তো করতেই হবে’| যা হোক উনি অবসরের পরে আমাদের পাশের বিল্ডিংয়ের একটি ফ্লাটে উঠলেন| মাঝে মাঝে রাস্তায় দেখা হয় এবং এখন উনি আমাকে চিনতে পারেন| একদিন উনাকে জিজ্ঞেস করলাম আপনার হাতে তিনটি ফোন দেখি না যে? উনি আকাশের দিকে তাকিয়ে মলিন কণ্ঠে বললেন— এখন অফিস থেকে কেউ ফোন করে না, এক দু’জন বন্ধু মাঝে মাঝে খোঁজখবর নেয় আর পরিবারের লোকজনও তেমন ফোন দেয় না| তাই এত ফোন রেখে কী করব? কথা তো ঠিক|

অনেক দিন উনার সাথে দেখা নাই| একদিন উনার বাসার কাজের লোককে জিজ্ঞেস করলাম, ‘নিয়াজ সাহেবকে দেখছি না, উনি ভালো আছেন তো’| সে বলল, “স্যার এমনি তো ভালো আছেন কিন্তু মনে হয় মাথায় গণ্ডগোল হয়েছে”| জিজ্ঞেস করাতে বলল, “জানি না কী যে হয়েছে স্যার এখন গ্রামীণফোন থেকে রেকর্ড করা ফোন আসলেও তাদের সাথে কথা বলার চেষ্টা করেন| তাদেরকে প্রশ্ন করেন, তাদের কুশল জানতে চান| কী করবেন বলেন এখন তো আগের মতন আর কেউ উনাকে ফোন দেয় না|”


মানবতার হুমকি

সারা বিশ্ব এখন অস্থির, সব জায়গায় শুধু হানাহানি, কাটাকাটি, মারামারি| যুদ্ধ তো পিছুই ছাড়ছে না| ইউক্রেন-রুশের যুদ্ধ, ইজরাইল-আমেরিকা- ইরানের যুদ্ধ| সারা দুনিয়া লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে| আমি একজন প্রোগ্রামার আর এ আই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ করি| সারাক্ষণ চিন্তা করি এই অস্থিরতার কারণ কী? লোভ, লালসা, ক্ষমতা, না মানুষের আদিম প্রকৃতি যুদ্ধে লিপ্ত  হওয়া| একদিন এই সব চিন্তা মাথায় নিয়ে আমি এআই কে প্রম্পট বা নির্দেশ দিলাম, “মানবতার কোন ক্ষতি যেন না হয়”| সে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দুনিয়ার সকল সামরিক সিস্টেম বন্ধ করে দিল| তারপর মানুষকেই প্রাথমিক হুমকি হিসাবে চিহ্নিত করে নিজের মেমরিতে সেভ করে রাখল|


প্রতিস্থাপন সত্তা

কী অদ্ভুত! আমার অস্তিত্ব রইল না| আমি বেঁচে আছি কিন্তু আমি বেঁচে নেই| এই ঘটনাটা কেমন করে ঘটল, এর রহস্য আমি অনেক চেষ্টা করে জানতে পেরেছি| আসলে যা ঘটেছে ওই ঘটনার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নাই, আমার কোনো দোষও নাই| আমার সারা জীবন, আমার সকল স্মৃতি, আমার কথাবার্তা, আমার চিঠিপত্র, আমার ম্যাসেজ, আমার স্বভাব, আমার চালচলন, সবকিছু একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্যে ব্যবহার করা হয়েছে|

পরিণামে যা হয়েছে, সেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাকে আমার কাজের জায়গায় প্রতিস্থাপন করেছে, আমার বাসায় আমাকে প্রতিস্থাপন করেছে, এমন কী আমার পরিবারের সাথে কথাবার্তায়, আলাপেও প্রতিস্থাপন করেছে|

আর কী আশ্চর্য! কেউ এটা টেরও পেল না| এখন আমি প্রতিটি জায়গায় প্রতিস্থাপন হয়েগেছি| আমি থেকেও নাই হয়ে গেছি!


সত্য যাচাইকরণ যন্ত্র

ওই শহরে নিয়ম করা হয়েছে যদি কোনো মানুষ জনসাধারণের উদ্দেশ্য কিছু বলতে চায় বা লিখতে চায় তা বাধ্যতামূলকভাবে ‘লাই ডিটেক্টার’ বা সত্য যাচাইকরণ মেশিন দিয়ে পরীক্ষা করে সার্টিফিকেট নিতে হবে| কর্তৃপক্ষ শহরে জায়গায় জায়গায় “লাই ডিটেক্টার” বুথ স্থাপন করেছে যেখানে লোকজন তাদের কথা বা লেখা মেশিনে নিবেশ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সনদ গ্রহণ করতে পারে| এই পদক্ষেপ নেয়াতে গুজবের কারণে যে সমস্যা সৃষ্টি হতো তা কমে গেছে| মোটামুটি শহরে অপরাধের হার প্রচণ্ডভাবে কমে গেছে| তাই কর্তৃপক্ষের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে|

কিন্তু সবচেয়ে বিপদে পড়েছে ওই শহরের কবি, গল্পকার, নাট্যকার, গীতিকার আর লেখকরা|  তারা কেউই তাদের কর্ম “লাই ডিটেক্টার” থেকে যাচাই করে সনদ নিতে পারেনি|


অজানা অপরাধ

ওই শহরকে আধুনিক, শৃঙ্খলা আর শান্তির একটি মডেল বলে আখ্যায়িত করা হয়, যেখানে জনসাধারণ শান্তিতে বসবাস করে| সারা শহরজুড়ে রাস্তাঘাটে, পার্কে, বিনোদন কেন্দ্রে, শপিং মলে, ফোনে আর টেলিভিশনে, কম্পিউটার আর ইন্টারনেটে বিভিন্ন ধরনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা স্থাপন করা রয়েছে| তারা মানুষের চাল-চলন, কথা-বার্তা, গতিবিধি, স্বভাব, “রিয়াল টাইম” ভিত্তিতে পর্যালোচনা করে| একটি অপরাধ দমনকারী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভবিষ্যতে কোন লোক দ্বারা কোন অপরাধ সংঘটিত হতে পারে ওটাও চিহ্নিত করতে পারে|

একজন লোককে ভবিষ্যতে কোনো অপরাধ করার সন্দেহে গ্রেফতার করা হয়েছে| তাকে বিচারকের আদালতে কাঠগড়ায় তোলা হল| সে তার অজানা, অঘটিত অপরাধটি স্বীকার করে একটি বন্ড দিল যে সে ভবিষ্যতে ওই অপরাধ করবে না| বিচারক ওই বন্ডের ভিত্তিতে তাকে খালাস করে দিলেন|


দাপ্তরিক মৃত্যু

২০৫০ সাল, দেশ সম্পূর্ণভাবে অও দ্বারা পরিচালিত| এখন কোনো সেবা পেতে কোনো বেগ পোহাতে হয় না| স্কুল, কলেজে শিক্ষকের প্রয়োজন তেমন নেই, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংবলিত রোবটরা শিক্ষক হিসেবে বেশ দক্ষ| হাসপাতালে রোবট ডাক্তাররা অনেক জ্ঞানী আর দক্ষ, তারা রুগীর রোগ মুহূর্তে নির্নয় করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দেয়| সর্বক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জয় জয়কার|

এমনকি প্রতিটি নাগরিকের জীবন বৃত্তান্ত আর পরিবারের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করার দায়িত্ব একটি এআই-এর কাছে সমর্পিত| সে অনেক লোকের জীবনের ঘটনাকে তুচ্ছ আর নগন্য বলে তার ডাটাবেস থেকে মুছে ফেলতে লাগল| একদিন এক ভদ্রলোক মিঃ হাশমী তার জীবন বৃত্তান্ত খুঁজতে গিয়ে দেখলো অও তার জীবনকে তুচ্ছ বলে তার পারিবারিক ইতিহাস আর জীবন বৃত্তান্ত সব মুছে ফেলেছে| এখন তার কোন সরকারী অস্তিত্ব নেই যদিও সে শারীরিকভাবে বেঁচে আছে|


বর্ণনার ইতিহাস

আমাদের এই সময় জীবনের সব উপাদান আর কর্ম ডিজিটাইজ হয়েগেছে| আবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশের সাথে সাথে তারা আমাদের অনেক কাজ আমাদের কাছ থেকে নিয়ে আমাদের সাহায্য করছে| আবার অনেক ক্ষেত্রে আমাদেরকে কাজ ছাড়াও করেছে| যা হোক আমি অনেক বছর ধরে রোজ ডায়েরি  লিখি যদিও জীবনে এমন কিছু ঘটে না যেটা লিখে রাখার প্রয়োজন| ওই একঘেয়ে জীবন, গতকালকের লেখা ডায়রির পাতা অবিকল আজকের মতো| একদিন গুগুল করতে গিয়ে দেখলাম যে একটি সার্ভিস চালু আছে যেটা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে পরিচালিত এবং তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মানুষের প্রতিদিনের ব্যস্ততা, কাজকর্ম লিপিবদ্ধ করে রাখে এবং কোনো কাজের কী ফল হয়েছে তাও লিখে রাখে| চিন্তা করলাম এটা তো খুব ভালো সার্ভিস| এটা আমাকে ডায়েরি লেখা থেকে মুক্তি দেবে তাই সার্ভিসটি গ্রহণ করলাম|

কয়েক দিন পরে তাদের ডাটাবেস থেকে আমার দুই তিন দিনের তথ্য ডাউনলোড করলাম দেখার জন্য যে তারা ঠিকঠাক তথ্য লিপিবদ্ধ করছে কি না| আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো একই দিনে আমার একটি কাজের কয়েকটি ফলাফল দেখাচ্ছে| তার ভেতরে আমি শুধু একটা করেছি| বাকিগুলো কে করছে? আমার জীবনকে আর কে যাপিত করছে এটা রহস্যই রয়ে গেল|


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত