বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যাওয়া কর্মীদের প্রধান গন্তব্য মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চল। তবে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এই অঞ্চলে বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থান চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। নতুন কর্মী যাওয়ার হার ব্যাপক হারে কমার পাশাপাশি অনেকেই দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছেন। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এই সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। ইতোমধ্যে যুদ্ধের কারণে বিদেশ যাওয়ার কর্মসংস্থান ছাড়পত্র ৫০ শতাংশ কমেছে বলে এক পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে।
বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাব
মিলনায়তনে ‘ইরান ও উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধ: বাংলাদেশি অভিবাসীদের ওপর প্রভাব এবং করণীয়’
শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেছে অভিবাসন খাতের বেসরকারি গবেষণা সংস্থা
রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (রামরু)।
সংবাদ সম্মেলনে
জানানো হয়, গত বছর বিদেশে যাওয়া কর্মীদের ৮২ শতাংশই গেছেন মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় দেশগুলোতে।
আর মোট প্রবাসী আয়ের ৪৬ শতাংশ এসেছে এই অঞ্চল থেকে। বর্তমানে সেখানে প্রায় ৫০ লাখ বাংলাদেশি
প্রবাসী অবস্থান করছেন। কিন্তু যুদ্ধের কারণে গত বছরের তুলনায় এবারের মার্চ মাসে বিদেশ
যাওয়ার কর্মসংস্থান ছাড়পত্র ৫০ শতাংশ কমেছে। এর মধ্যে যুদ্ধের কারণে অন্তত ৯ জন শ্রমিক
নিহত হয়েছেন এবং ইরান থেকে ২০০ কর্মীকে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) মাধ্যমে
উদ্ধার করে দেশে ফেরানো হয়েছে।
রামরুর প্রতিষ্ঠাতা
চেয়ার তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, ‘নিরাপত্তা না থাকায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে অনেক বিনিয়োগ তুরস্কে
চলে যাচ্ছে। কর্মসংস্থান কমে যাওয়ায় অবৈধ অভিবাসন বেড়ে যেতে পারে। নতুন শ্রমবাজার খুঁজতে
সামগ্রিক কাঠামো বদলাতে হবে এবং নাগরিক সমাজকে নিয়ে আন্তমন্ত্রণালয় কমিটি করে সরকারকে
দ্রুত কাজ শুরু করতে হবে।’
সংবাদ সম্মেলনে
ইরান থেকে ফিরে আসা কয়েকজন কর্মী তাদের ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। গত ২১ মার্চ
ও ১১ এপ্রিল আজারবাইজান হয়ে দেশে ফেরেন ২০০ জন বাংলাদেশি। কুমিল্লার মো. আব্দুল্লাহ
গত বছরের নভেম্বরে ঋণ করে ইরানে গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘মিসাইলের বিকট শব্দে রাতে ঘুমানো
যেত না। বাঁচব কি না সেই আতঙ্কে রাতে কালেমা পড়ে ঘুমাতাম।’ দেশে ফিরতে পারায় সরকারের
প্রতি কৃতজ্ঞতা জানালেও ঋণের বোঝা নিয়ে এখন তিনি চরম দিশেহারা।
আরেক ভুক্তভোগী
আব্দুল্লাহ আল কায়সার জানান, গত আগস্টে ইরানে যাওয়ার পর ইসরায়েলি হামলার রাতে তার মালিক
তাকে রেখেই নিরাপদ স্থানে চলে যান। চারদিকে মুহুর্মুহু হামলা ও অন্ধকার দেখে তিনি আতঙ্কিত
হয়ে পড়েন। পাঁচ লাখ টাকা খরচ করে গিয়ে এখন তিনি নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরেছেন।
রামরুর লিখিত বক্তব্যে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাশেদ আলম ভূঁইয়া ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক
জালাল উদ্দিন শিকদার জানান, শুধু ইরান নয়, বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য জুড়েই নিরাপত্তাঝুঁকি
তৈরি হয়েছে। দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলায় সেখানে কর্মরত বাংলাদেশি নারী
গৃহকর্মীরা চরম ঝুঁকিতে আছেন।
সৌদি আরবের একটি
ডেলিভারি প্রতিষ্ঠানের গুদামের উদাহরণ টেনে বলা হয়, সেখানে ৪০০ কর্মীর মধ্যে ছাঁটাইয়ের
পর এখন মাত্র ৬৫ জন আছেন। এছাড়া সৌদি আরবের ‘ভিশন ২০৩০’ মেগা প্রকল্পগুলো বাধাগ্রস্ত
হলে কর্মসংস্থানের সুযোগ আরও কমবে এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে বসবাসকারী ২০ লাখ বাংলাদেশির
জীবন ও জীবিকা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
সংকট মোকাবিলায়
ও প্রবাসী কর্মীদের সুরক্ষায় রামরু বেশ কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরে। যুদ্ধে যুক্ত দেশগুলোতে
বাংলাদেশিদের জন্য ২৪ ঘণ্টা বাংলা ভাষায় হটলাইন চালু করা। জরুরি অবস্থায় দেশে ফিরে
আসার নিয়ম ও প্রয়োজনীয় তথ্য সংবলিত নির্দেশিকা তৈরি করে দূতাবাসগুলোতে পাঠানো। আটকে
পড়া প্রবাসীদের সহায়তার জন্য সরকারের রাজস্ব বাজেট থেকে জরুরি তহবিল বরাদ্দ করা। বাতিল
হওয়া ফ্লাইট, আটকে পড়া অভিবাসী, ভিসার অবস্থা ও প্রত্যাবাসনের তথ্য দ্রুত জানতে একটি
সেন্ট্রাল মনিটরিং ড্যাশবোর্ড চালু করা। করোনা মহামারির সময়ের মতো ফিরে আসা প্রবাসীদের
পুনর্বাসনে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ।

বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ মে ২০২৬
বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যাওয়া কর্মীদের প্রধান গন্তব্য মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চল। তবে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এই অঞ্চলে বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থান চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। নতুন কর্মী যাওয়ার হার ব্যাপক হারে কমার পাশাপাশি অনেকেই দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছেন। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এই সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। ইতোমধ্যে যুদ্ধের কারণে বিদেশ যাওয়ার কর্মসংস্থান ছাড়পত্র ৫০ শতাংশ কমেছে বলে এক পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে।
বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাব
মিলনায়তনে ‘ইরান ও উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধ: বাংলাদেশি অভিবাসীদের ওপর প্রভাব এবং করণীয়’
শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেছে অভিবাসন খাতের বেসরকারি গবেষণা সংস্থা
রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (রামরু)।
সংবাদ সম্মেলনে
জানানো হয়, গত বছর বিদেশে যাওয়া কর্মীদের ৮২ শতাংশই গেছেন মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় দেশগুলোতে।
আর মোট প্রবাসী আয়ের ৪৬ শতাংশ এসেছে এই অঞ্চল থেকে। বর্তমানে সেখানে প্রায় ৫০ লাখ বাংলাদেশি
প্রবাসী অবস্থান করছেন। কিন্তু যুদ্ধের কারণে গত বছরের তুলনায় এবারের মার্চ মাসে বিদেশ
যাওয়ার কর্মসংস্থান ছাড়পত্র ৫০ শতাংশ কমেছে। এর মধ্যে যুদ্ধের কারণে অন্তত ৯ জন শ্রমিক
নিহত হয়েছেন এবং ইরান থেকে ২০০ কর্মীকে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) মাধ্যমে
উদ্ধার করে দেশে ফেরানো হয়েছে।
রামরুর প্রতিষ্ঠাতা
চেয়ার তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, ‘নিরাপত্তা না থাকায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে অনেক বিনিয়োগ তুরস্কে
চলে যাচ্ছে। কর্মসংস্থান কমে যাওয়ায় অবৈধ অভিবাসন বেড়ে যেতে পারে। নতুন শ্রমবাজার খুঁজতে
সামগ্রিক কাঠামো বদলাতে হবে এবং নাগরিক সমাজকে নিয়ে আন্তমন্ত্রণালয় কমিটি করে সরকারকে
দ্রুত কাজ শুরু করতে হবে।’
সংবাদ সম্মেলনে
ইরান থেকে ফিরে আসা কয়েকজন কর্মী তাদের ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। গত ২১ মার্চ
ও ১১ এপ্রিল আজারবাইজান হয়ে দেশে ফেরেন ২০০ জন বাংলাদেশি। কুমিল্লার মো. আব্দুল্লাহ
গত বছরের নভেম্বরে ঋণ করে ইরানে গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘মিসাইলের বিকট শব্দে রাতে ঘুমানো
যেত না। বাঁচব কি না সেই আতঙ্কে রাতে কালেমা পড়ে ঘুমাতাম।’ দেশে ফিরতে পারায় সরকারের
প্রতি কৃতজ্ঞতা জানালেও ঋণের বোঝা নিয়ে এখন তিনি চরম দিশেহারা।
আরেক ভুক্তভোগী
আব্দুল্লাহ আল কায়সার জানান, গত আগস্টে ইরানে যাওয়ার পর ইসরায়েলি হামলার রাতে তার মালিক
তাকে রেখেই নিরাপদ স্থানে চলে যান। চারদিকে মুহুর্মুহু হামলা ও অন্ধকার দেখে তিনি আতঙ্কিত
হয়ে পড়েন। পাঁচ লাখ টাকা খরচ করে গিয়ে এখন তিনি নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরেছেন।
রামরুর লিখিত বক্তব্যে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাশেদ আলম ভূঁইয়া ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক
জালাল উদ্দিন শিকদার জানান, শুধু ইরান নয়, বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য জুড়েই নিরাপত্তাঝুঁকি
তৈরি হয়েছে। দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলায় সেখানে কর্মরত বাংলাদেশি নারী
গৃহকর্মীরা চরম ঝুঁকিতে আছেন।
সৌদি আরবের একটি
ডেলিভারি প্রতিষ্ঠানের গুদামের উদাহরণ টেনে বলা হয়, সেখানে ৪০০ কর্মীর মধ্যে ছাঁটাইয়ের
পর এখন মাত্র ৬৫ জন আছেন। এছাড়া সৌদি আরবের ‘ভিশন ২০৩০’ মেগা প্রকল্পগুলো বাধাগ্রস্ত
হলে কর্মসংস্থানের সুযোগ আরও কমবে এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে বসবাসকারী ২০ লাখ বাংলাদেশির
জীবন ও জীবিকা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
সংকট মোকাবিলায়
ও প্রবাসী কর্মীদের সুরক্ষায় রামরু বেশ কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরে। যুদ্ধে যুক্ত দেশগুলোতে
বাংলাদেশিদের জন্য ২৪ ঘণ্টা বাংলা ভাষায় হটলাইন চালু করা। জরুরি অবস্থায় দেশে ফিরে
আসার নিয়ম ও প্রয়োজনীয় তথ্য সংবলিত নির্দেশিকা তৈরি করে দূতাবাসগুলোতে পাঠানো। আটকে
পড়া প্রবাসীদের সহায়তার জন্য সরকারের রাজস্ব বাজেট থেকে জরুরি তহবিল বরাদ্দ করা। বাতিল
হওয়া ফ্লাইট, আটকে পড়া অভিবাসী, ভিসার অবস্থা ও প্রত্যাবাসনের তথ্য দ্রুত জানতে একটি
সেন্ট্রাল মনিটরিং ড্যাশবোর্ড চালু করা। করোনা মহামারির সময়ের মতো ফিরে আসা প্রবাসীদের
পুনর্বাসনে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ।

আপনার মতামত লিখুন