সংবাদ

জীবনের প্রথম উপার্জন সংবাদ থেকে


সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী শিক্ষাবিদ ও লেখক
প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬, ১১:০৮ পিএম

জীবনের প্রথম উপার্জন সংবাদ থেকে

দৈনিক সংবাদ ৭৬ বছরে পদার্পণ করছে, এটা অত্যন্ত ভালো একটি ঘটনা। ধারাবাহিকভাবে এই পত্রিকাটি রয়ে গেছে এবং এটা কখনো থেমে যায়নি। শুরুর কয়েক বছরের মধ্যে এর মালিকানা বদল হয়েছে। সংবাদ যখন প্রথম প্রকাশিত হলো তখন একটা চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল।

আমি তখন স্কুল থেকে বেরিয়ে কলেজে ভর্তি হয়েছি। তো তখন চাঞ্চল্যটা এইরকম যে, সংবাদ বাংলা নামে একটা পত্রিকা বের হলো। আর তখন ‘আজাদ’, ‘জিন্দেগী’ এইরকম পত্রিকার নাম আর কি, ‘তাজবী’ সাপ্তাহিক পত্রিকা আবার ‘মর্নিং নিউজ’ ইংরেজি পত্রিকা। বাংলা নামে একটা পত্রিকা বেরলো।

দ্বিতীয়ত হচ্ছে যে, এখানে যারা তরুণরা কাজ করতেন আমাদের চেনা, আমাদের বয়সে বড়, তারা সকলেই আধুনিক মানুষ ছিলেন, কিছুটা বামপন্থী ছিলেন। কিন্তু প্রথমে এর বিরুদ্ধে একটা বৈরিতা ছিল। অর্থাৎ পত্রিকাটা নামে প্রগতিশীল, কর্মীরা প্রগতিশীল এবং অনেক কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যও। কিন্তু পত্রিকার মালিকানা হচ্ছে মুসলিম লীগের। তো বায়ান্ন সালে সংবাদ আমরা পুড়িয়েছি। এইজন্য যে বায়ান্ন সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে, বাইশে ফেব্রুয়ারি সংখ্যাটা আমাদের মনঃপূত হয়নি। আজিমপুর আমরা থাকতাম ওখানে পত্রিকা বিতরণের একটা জায়গা ছিল, তো ওগুলো পুড়িয়ে দিলাম। আজাদও পোড়ালাম, সংবাদও পোড়ালাম, মর্নিং নিউজও পোড়ালাম।

তো এর পরে যেটা ঘটল সেটা হলো সংবাদের মালিকানা বদল হলো। চুয়ান্ন সালের নির্বাচনের সময় মুসলিম লীগের পতন হওয়ার কারণে এর মালিকানা বদল হয়ে গেল। তখন সংবাদ একেবারে একটা প্রগতিশীল ধারায় চলে গেল। আমার সাথে সংবাদ-এর যোগাযোগের আরেকটি ক্ষেত্র ছিল যে, সংবাদের খেলাঘর পাতায় আমি লিখতাম। আমি তখন খেলাঘরের সদস্য না কিন্তু খেলাঘরে লিখতাম। ছোটদের জন্য লিখতাম। কিশোর বয়সে সেখানে আমার লেখালেখি শুরু। আমার প্রথম উপার্জন লেখক হিসেবে এই সংবাদ থেকে। আমার মনে আছে ঘটনাটা হচ্ছে, আমরা পাড়ায় আজিমপুর কলোনিতে নানা অনুষ্ঠান করতাম।সেই খবর দিতে গিয়ে সংবাদ অফিসে যাই। হাবিবুর রহমান সাহেব ছিলেন তখন ওই খেলাঘরের পরিচালক ভাইয়া নামে। তো আমি লিখে খবরটা নিয়ে গেছি। ওরা বললো, তুমি নাম লিখে দাও সংবাদদাতা কে? আমি আমার নাম লিখলাম। ওরা বললো, তুমি তো লেখ আমাদের এখানে। আমি বললাম হ্যাঁ আমি লিখি। বললেন, আমরা বিল করি তো তুমি একটা বিল পাওনা আছো। ওইখান থেকে আমি পরে বিল ৫ টাকা সংগ্রহ করেছিলাম। ৫ টাকা তখন অনেক টাকা। আমার এটা প্রথম উপার্জন লেখক হিসেবে সংবাদ থেকেই।

তারপরে আমি সংবাদে নিয়মিত লিখি। সংবাদের আবুল হাসানাতই লেখার প্রস্তাবটা নিয়ে এসেছিলেন। জহুর হোসেন চৌধুরী আগে লিখতেন ‘দরবারে জহুর’। তিনি মারা গেলে তার জায়গায় একটা শূন্যতা তৈরি হলো। সংবাদ কিন্তু তখন কলমের জন্য বেশ পরিচিত ছিল এবং সংবাদের পাঠক নির্দিষ্ট ছিল। তারা ওই কলামগুলো খুব উৎসাহের সঙ্গে পড়তেন। তো জহুর আহমেদ চৌধুরীর কলাম ‘দরবারে জহুর’ আর তখন প্রকাশিত হচ্ছে না তিনি পরলোকগমন করেছেন। তো সেখানে আমাকে বলা হলো, আমি খুব আনন্দের সঙ্গে লিখলাম এবং আমাকে খুব স্বাধীনতা দিয়েছে। অনেক সময় এরকম হয়েছে বজলুর রহমান বলেছেন যে আপনার লেখা আমার মনে হয়েছিল যে আপনার সাথে তর্ক করব কিন্তু তাও আমরা ছেপে দিয়েছি। কেননা তখন সমাজতন্ত্রের পতনের একটা আভাস দেখা যাচ্ছে। আমি কিন্তু সমাজতন্ত্রের পক্ষে লিখছি। তখন অনেকে যারা সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করতেন আগে ক্রুশ্চেভের পরবর্তী কালে তারা ওই জায়গা থেকে সরে এসেছেন। কাজেই একটা মতদ্বৈততা ওখানে দেখা দিত কিন্তু তারা ছাপতেন।

আরেকটা জিনিস আমার খুব ভালো লাগত যে প্রতিক্রিয়া আসত। প্রত্যেক সপ্তাহে অনেক প্রতিক্রিয়া আসত। সন্তোষ গুপ্ত ছিলেন সহ-সম্পাদক। উনি এগুলো সংগ্রহ করে আবার একজন লোক আসতেন নিয়ে যেতে। আমার লেখাটা ছাপা হত মঙ্গলবারে। উনি নিয়ে যেতেন রোববারে। তো রোববারে অনেকগুলো প্রতিক্রিয়া পেতাম। এই প্রতিক্রিয়াটা এত ভালো লাগত যে, মানুষ পড়ছে, চিন্তা করছে। সংবাদ-এ টানা ২৪ বছর ‘সময় বহিয়া যায়’ শিরোনামে এবং ‘গাছপাথর’ ছদ্ম নামে লিখেছি। ‘সময় বহিয়া যায়’ শিরোনাম দেয়ার মানে হচ্ছে, সময় চলমান, নানা ঘটনা প্রবাহ বিদ্যমান আর গাছ হচ্ছে স্থির, স্থিরভাবে সবকিছু দেখে। তাই গাছপাথর। এখনও আমি লিখি কিন্তু আগের মতো আর প্রতিক্রিয়া পাই না। এখন আমাদের লেখা ছাপা হয় বা লিখি। পত্রিকাও বের করি কিন্তু প্রতিক্রিয়া পাই না। এতোটা বদলে গেছে। মানুষ একেবারেই একাকি হয়ে গেছে, বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে বা মানুষ মনে করে যে প্রতিক্রিয়া দিয়ে আর কী লাভ হবে। এর কোনো বদল হবে না। তো আমি আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই এই পত্রিকাকে যে, তারা চলেছে এবং ক্রমাগত বিকশিত হয়েছে এবং আরো আরো বিকশিত হোক আরো উন্নত হোক সেই শুভকামনা আমার রইলো।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

রোববার, ১৭ মে ২০২৬


জীবনের প্রথম উপার্জন সংবাদ থেকে

প্রকাশের তারিখ : ১৬ মে ২০২৬

featured Image

দৈনিক সংবাদ ৭৬ বছরে পদার্পণ করছে, এটা অত্যন্ত ভালো একটি ঘটনা। ধারাবাহিকভাবে এই পত্রিকাটি রয়ে গেছে এবং এটা কখনো থেমে যায়নি। শুরুর কয়েক বছরের মধ্যে এর মালিকানা বদল হয়েছে। সংবাদ যখন প্রথম প্রকাশিত হলো তখন একটা চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল।

আমি তখন স্কুল থেকে বেরিয়ে কলেজে ভর্তি হয়েছি। তো তখন চাঞ্চল্যটা এইরকম যে, সংবাদ বাংলা নামে একটা পত্রিকা বের হলো। আর তখন ‘আজাদ’, ‘জিন্দেগী’ এইরকম পত্রিকার নাম আর কি, ‘তাজবী’ সাপ্তাহিক পত্রিকা আবার ‘মর্নিং নিউজ’ ইংরেজি পত্রিকা। বাংলা নামে একটা পত্রিকা বেরলো।

দ্বিতীয়ত হচ্ছে যে, এখানে যারা তরুণরা কাজ করতেন আমাদের চেনা, আমাদের বয়সে বড়, তারা সকলেই আধুনিক মানুষ ছিলেন, কিছুটা বামপন্থী ছিলেন। কিন্তু প্রথমে এর বিরুদ্ধে একটা বৈরিতা ছিল। অর্থাৎ পত্রিকাটা নামে প্রগতিশীল, কর্মীরা প্রগতিশীল এবং অনেক কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যও। কিন্তু পত্রিকার মালিকানা হচ্ছে মুসলিম লীগের। তো বায়ান্ন সালে সংবাদ আমরা পুড়িয়েছি। এইজন্য যে বায়ান্ন সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে, বাইশে ফেব্রুয়ারি সংখ্যাটা আমাদের মনঃপূত হয়নি। আজিমপুর আমরা থাকতাম ওখানে পত্রিকা বিতরণের একটা জায়গা ছিল, তো ওগুলো পুড়িয়ে দিলাম। আজাদও পোড়ালাম, সংবাদও পোড়ালাম, মর্নিং নিউজও পোড়ালাম।

তো এর পরে যেটা ঘটল সেটা হলো সংবাদের মালিকানা বদল হলো। চুয়ান্ন সালের নির্বাচনের সময় মুসলিম লীগের পতন হওয়ার কারণে এর মালিকানা বদল হয়ে গেল। তখন সংবাদ একেবারে একটা প্রগতিশীল ধারায় চলে গেল। আমার সাথে সংবাদ-এর যোগাযোগের আরেকটি ক্ষেত্র ছিল যে, সংবাদের খেলাঘর পাতায় আমি লিখতাম। আমি তখন খেলাঘরের সদস্য না কিন্তু খেলাঘরে লিখতাম। ছোটদের জন্য লিখতাম। কিশোর বয়সে সেখানে আমার লেখালেখি শুরু। আমার প্রথম উপার্জন লেখক হিসেবে এই সংবাদ থেকে। আমার মনে আছে ঘটনাটা হচ্ছে, আমরা পাড়ায় আজিমপুর কলোনিতে নানা অনুষ্ঠান করতাম।সেই খবর দিতে গিয়ে সংবাদ অফিসে যাই। হাবিবুর রহমান সাহেব ছিলেন তখন ওই খেলাঘরের পরিচালক ভাইয়া নামে। তো আমি লিখে খবরটা নিয়ে গেছি। ওরা বললো, তুমি নাম লিখে দাও সংবাদদাতা কে? আমি আমার নাম লিখলাম। ওরা বললো, তুমি তো লেখ আমাদের এখানে। আমি বললাম হ্যাঁ আমি লিখি। বললেন, আমরা বিল করি তো তুমি একটা বিল পাওনা আছো। ওইখান থেকে আমি পরে বিল ৫ টাকা সংগ্রহ করেছিলাম। ৫ টাকা তখন অনেক টাকা। আমার এটা প্রথম উপার্জন লেখক হিসেবে সংবাদ থেকেই।

তারপরে আমি সংবাদে নিয়মিত লিখি। সংবাদের আবুল হাসানাতই লেখার প্রস্তাবটা নিয়ে এসেছিলেন। জহুর হোসেন চৌধুরী আগে লিখতেন ‘দরবারে জহুর’। তিনি মারা গেলে তার জায়গায় একটা শূন্যতা তৈরি হলো। সংবাদ কিন্তু তখন কলমের জন্য বেশ পরিচিত ছিল এবং সংবাদের পাঠক নির্দিষ্ট ছিল। তারা ওই কলামগুলো খুব উৎসাহের সঙ্গে পড়তেন। তো জহুর আহমেদ চৌধুরীর কলাম ‘দরবারে জহুর’ আর তখন প্রকাশিত হচ্ছে না তিনি পরলোকগমন করেছেন। তো সেখানে আমাকে বলা হলো, আমি খুব আনন্দের সঙ্গে লিখলাম এবং আমাকে খুব স্বাধীনতা দিয়েছে। অনেক সময় এরকম হয়েছে বজলুর রহমান বলেছেন যে আপনার লেখা আমার মনে হয়েছিল যে আপনার সাথে তর্ক করব কিন্তু তাও আমরা ছেপে দিয়েছি। কেননা তখন সমাজতন্ত্রের পতনের একটা আভাস দেখা যাচ্ছে। আমি কিন্তু সমাজতন্ত্রের পক্ষে লিখছি। তখন অনেকে যারা সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করতেন আগে ক্রুশ্চেভের পরবর্তী কালে তারা ওই জায়গা থেকে সরে এসেছেন। কাজেই একটা মতদ্বৈততা ওখানে দেখা দিত কিন্তু তারা ছাপতেন।

আরেকটা জিনিস আমার খুব ভালো লাগত যে প্রতিক্রিয়া আসত। প্রত্যেক সপ্তাহে অনেক প্রতিক্রিয়া আসত। সন্তোষ গুপ্ত ছিলেন সহ-সম্পাদক। উনি এগুলো সংগ্রহ করে আবার একজন লোক আসতেন নিয়ে যেতে। আমার লেখাটা ছাপা হত মঙ্গলবারে। উনি নিয়ে যেতেন রোববারে। তো রোববারে অনেকগুলো প্রতিক্রিয়া পেতাম। এই প্রতিক্রিয়াটা এত ভালো লাগত যে, মানুষ পড়ছে, চিন্তা করছে। সংবাদ-এ টানা ২৪ বছর ‘সময় বহিয়া যায়’ শিরোনামে এবং ‘গাছপাথর’ ছদ্ম নামে লিখেছি। ‘সময় বহিয়া যায়’ শিরোনাম দেয়ার মানে হচ্ছে, সময় চলমান, নানা ঘটনা প্রবাহ বিদ্যমান আর গাছ হচ্ছে স্থির, স্থিরভাবে সবকিছু দেখে। তাই গাছপাথর। এখনও আমি লিখি কিন্তু আগের মতো আর প্রতিক্রিয়া পাই না। এখন আমাদের লেখা ছাপা হয় বা লিখি। পত্রিকাও বের করি কিন্তু প্রতিক্রিয়া পাই না। এতোটা বদলে গেছে। মানুষ একেবারেই একাকি হয়ে গেছে, বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে বা মানুষ মনে করে যে প্রতিক্রিয়া দিয়ে আর কী লাভ হবে। এর কোনো বদল হবে না। তো আমি আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই এই পত্রিকাকে যে, তারা চলেছে এবং ক্রমাগত বিকশিত হয়েছে এবং আরো আরো বিকশিত হোক আরো উন্নত হোক সেই শুভকামনা আমার রইলো।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত