শিক্ষার পবিত্র আলো ছড়ানোর কথা যে প্রতিষ্ঠানের, সেখানেই ৯ বছরের এক নিষ্পাপ শিশুর ওপর চলল মধ্যযুগীয় বর্বরতা। মায়ের কাছে আগের নির্যাতনের কথা বলে দেওয়ার ‘অপরাধে’ এবার আরও ভয়ঙ্কর রূপ নিলেন শিক্ষকেরা। চড়-থাপ্পড় বা সাধারণ বেত্রাঘাত নয়, প্রকাশ্যেই শিশুটিকে কাঠের স্কেল দিয়ে এলোপাতাড়ি মারধরের পর গলাটিপে শ্বাসরোধ করে শূন্যে তুলে আছাড় দেওয়া হলো ফ্লোরে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা সদরের পিটিআই
শান্তিমোড় রোডস্থ ‘আল্ হিদায়া হিফজুল কুরআন মডেল মাদ্রাসা’য় তৃতীয় শ্রেণীর নাজেরা বিভাগের
ছাত্র মোঃ নূর-ই-সাফি এই নৃশংসতার শিকার হয়েছে। লোমহর্ষক এই নির্যাতনের সিসিটিভি ফুটেজ
ছড়িয়ে পড়ার পর পুরো এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। তীব্র ক্ষোভের মুখে পুলিশ অভিযান চালিয়ে
অভিযুক্ত দুই মাদ্রাসা শিক্ষককে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে।
গ্রেপ্তার শিক্ষকরা হলেন: রাজশাহীর
গোদাগাড়ী এলাকার বাসিন্দা মো. সাকির আলী ও মো. নাহিদ আলী।
শরীরের দাগ ও সিসিটিভি ফুটেজে উন্মোচিত
হলো শিক্ষকের পৈশাচিকতা
মাদ্রাসার ভেতর প্রতিনিয়ত অমানুষিক
নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হতো শিশু সাফিকে। শিক্ষকরা হুমকি দিয়েছিল, বাড়িতে এই কথা জানালে
আরও বড় শাস্তি দেওয়া হবে। ভয়ে মুখ বুজে সব সহ্য করত নয় বছরের শিশুটি। গত ১৩ মে সকালে
প্রতিদিনের মতোই সকাল ৬টায় মাদ্রাসায় যায় সাফি।
কিন্তু অন্য ছাত্রদের মুখে তার
ওপর নির্যাতনের কথা শুনতে পেয়ে মা যখন তাকে চেপে ধরেন, তখন সাফি কান্নাজড়িত কণ্ঠে শুধু
বলে, "আমাকে একটু মারছে।" কিন্তু মায়ের মন তো আর বোঝে না। সাফিকে কাপড় খুলে
পরীক্ষা করতেই মায়ের চোখ চড়কগাছ। পুরো শরীরে ছড়িয়ে আছে নৃশংস মারধরের কালশিটে আলামত।
পরবর্তীতে শিশুটির মামা মোখলেসুর রহমান মাদ্রাসায় গিয়ে সিসিটিভি ফুটেজ উদ্ধার করলে
বেরিয়ে আসে সেই গা শিউরে ওঠা দৃশ্য।
ফুটেজে দেখা যায়, সাফি অন্য সহপাঠীদের
সঙ্গে বসে পড়ালেখা করছিল। হঠাৎ প্রধান অভিযুক্ত শিক্ষক সাকির আলী পাশের রুম থেকে বের
হয়ে অন্য এক শিক্ষকের কাছ থেকে একটি কাঠের স্কেল (বেত) চেয়ে নেন। এরপরই শুরু হয় অন্ধের
মতো পেটানো। মারের চোটে সাফি চিৎকার করে মাদ্রাসার ফ্লোরে লুটিয়ে পড়ে, মাথা থেকে ছিটকে
যায় টুপি। কিন্তু ঘাতক শিক্ষকের মন গলেনি। ২ নম্বর আসামি নাহিদ আলীর হুকুমে সাকির আলী
একপর্যায়ে শিশুটিকে হত্যার উদ্দেশ্যে গলাটিপে ধরে টেনে হিঁচড়ে শূন্যে তুলে ধরে এবং
সজোরে নিচে আছাড় মারে। এই পৈশাচিক দৃশ্য দেখে ক্লাসের অন্য শিশুরা ভয়ে মাথা নিচু করে
থরথর করে কাঁপছিল, এমনকি ভয়ে দুজন ছাত্রকে ক্লাস ফেলে দৌড়ে পালাতেও দেখা যায়।
ঘটনা ধামাচাপা দিতে জোর তৎপরতা
মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের
নির্যাতনের ভয়াবহতা দেখে সাফিকে
দ্রুত চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এরপর ভাগিনাকে বাঁচাতে ও ন্যায়বিচারের
আশায় তার মামা বাকী বিল্লাহ বাদী হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের
করেন। তবে মামলা দায়েরের পর থেকেই ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার জন্য জোর তৎপরতা শুরু করেছে
মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ। তারা এটিকে ‘পারিবারিক বিষয়’ আখ্যা দিয়ে আপস-মিমাংসার চেষ্টা চালাচ্ছে।
এ বিষয়ে মামলার বাদী ও শিশুর মামা
মুঠোফোনে ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, "মামলা করার পর মাদ্রাসার দুই শিক্ষককে গ্রেপ্তার
করা হয়েছে। তারা বর্তমানে কারাগারে আছে। তবে ঘটনাটি পারিবারিকভাবে মিমাংসা করার জন্য
মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ নানাভাবে আমাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।" পরিবারটি এই ঘটনার
সুষ্ঠু তদন্ত ও অভিযুক্ত শিক্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছে।
অপরাধীদের ছাড় দেওয়া হবে না: আশ্বস্ত
করল পুলিশ প্রশাসন
নির্মম এই শিশু নির্যাতনের খবর
পাওয়ামাত্রই দ্রুত অ্যাকশনে যায় স্থানীয় প্রশাসন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত
কর্মকর্তা (ওসি) একরামুল হোসাইণ মুঠোফোনে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, "ঘটনা
শোনার পর পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে যায়। তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে দুই শিক্ষককে গ্রেপ্তার
করে আইনী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।"
অন্যদিকে, পুলিশের রাজশাহী বিভাগীয়
ডিআইজি অফিস থেকেও বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে। ডিআইজি
অফিস থেকে স্পষ্ট বার্তা দিয়ে বলা হয়েছে, "ঘটনাটি জানার পর পুলিশ তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা
নিয়েছে। নির্যাতনের ভিডিওসহ অন্যান্য সব তথ্যপ্রমাণ আমাদের হাতে এসেছে এবং অপরাধীদের
কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।"
উল্লেখ্য, এর আগেও দেশের বিভিন্ন
প্রান্তে মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে ব্যাপক লেখালেখি হলেও থামছে না এই নির্মমতা,
যা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে চরম ক্ষোভ ও উদ্বেগ বিরাজ করছে।

রোববার, ১৭ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৬ মে ২০২৬
শিক্ষার পবিত্র আলো ছড়ানোর কথা যে প্রতিষ্ঠানের, সেখানেই ৯ বছরের এক নিষ্পাপ শিশুর ওপর চলল মধ্যযুগীয় বর্বরতা। মায়ের কাছে আগের নির্যাতনের কথা বলে দেওয়ার ‘অপরাধে’ এবার আরও ভয়ঙ্কর রূপ নিলেন শিক্ষকেরা। চড়-থাপ্পড় বা সাধারণ বেত্রাঘাত নয়, প্রকাশ্যেই শিশুটিকে কাঠের স্কেল দিয়ে এলোপাতাড়ি মারধরের পর গলাটিপে শ্বাসরোধ করে শূন্যে তুলে আছাড় দেওয়া হলো ফ্লোরে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা সদরের পিটিআই
শান্তিমোড় রোডস্থ ‘আল্ হিদায়া হিফজুল কুরআন মডেল মাদ্রাসা’য় তৃতীয় শ্রেণীর নাজেরা বিভাগের
ছাত্র মোঃ নূর-ই-সাফি এই নৃশংসতার শিকার হয়েছে। লোমহর্ষক এই নির্যাতনের সিসিটিভি ফুটেজ
ছড়িয়ে পড়ার পর পুরো এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। তীব্র ক্ষোভের মুখে পুলিশ অভিযান চালিয়ে
অভিযুক্ত দুই মাদ্রাসা শিক্ষককে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে।
গ্রেপ্তার শিক্ষকরা হলেন: রাজশাহীর
গোদাগাড়ী এলাকার বাসিন্দা মো. সাকির আলী ও মো. নাহিদ আলী।
শরীরের দাগ ও সিসিটিভি ফুটেজে উন্মোচিত
হলো শিক্ষকের পৈশাচিকতা
মাদ্রাসার ভেতর প্রতিনিয়ত অমানুষিক
নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হতো শিশু সাফিকে। শিক্ষকরা হুমকি দিয়েছিল, বাড়িতে এই কথা জানালে
আরও বড় শাস্তি দেওয়া হবে। ভয়ে মুখ বুজে সব সহ্য করত নয় বছরের শিশুটি। গত ১৩ মে সকালে
প্রতিদিনের মতোই সকাল ৬টায় মাদ্রাসায় যায় সাফি।
কিন্তু অন্য ছাত্রদের মুখে তার
ওপর নির্যাতনের কথা শুনতে পেয়ে মা যখন তাকে চেপে ধরেন, তখন সাফি কান্নাজড়িত কণ্ঠে শুধু
বলে, "আমাকে একটু মারছে।" কিন্তু মায়ের মন তো আর বোঝে না। সাফিকে কাপড় খুলে
পরীক্ষা করতেই মায়ের চোখ চড়কগাছ। পুরো শরীরে ছড়িয়ে আছে নৃশংস মারধরের কালশিটে আলামত।
পরবর্তীতে শিশুটির মামা মোখলেসুর রহমান মাদ্রাসায় গিয়ে সিসিটিভি ফুটেজ উদ্ধার করলে
বেরিয়ে আসে সেই গা শিউরে ওঠা দৃশ্য।
ফুটেজে দেখা যায়, সাফি অন্য সহপাঠীদের
সঙ্গে বসে পড়ালেখা করছিল। হঠাৎ প্রধান অভিযুক্ত শিক্ষক সাকির আলী পাশের রুম থেকে বের
হয়ে অন্য এক শিক্ষকের কাছ থেকে একটি কাঠের স্কেল (বেত) চেয়ে নেন। এরপরই শুরু হয় অন্ধের
মতো পেটানো। মারের চোটে সাফি চিৎকার করে মাদ্রাসার ফ্লোরে লুটিয়ে পড়ে, মাথা থেকে ছিটকে
যায় টুপি। কিন্তু ঘাতক শিক্ষকের মন গলেনি। ২ নম্বর আসামি নাহিদ আলীর হুকুমে সাকির আলী
একপর্যায়ে শিশুটিকে হত্যার উদ্দেশ্যে গলাটিপে ধরে টেনে হিঁচড়ে শূন্যে তুলে ধরে এবং
সজোরে নিচে আছাড় মারে। এই পৈশাচিক দৃশ্য দেখে ক্লাসের অন্য শিশুরা ভয়ে মাথা নিচু করে
থরথর করে কাঁপছিল, এমনকি ভয়ে দুজন ছাত্রকে ক্লাস ফেলে দৌড়ে পালাতেও দেখা যায়।
ঘটনা ধামাচাপা দিতে জোর তৎপরতা
মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের
নির্যাতনের ভয়াবহতা দেখে সাফিকে
দ্রুত চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এরপর ভাগিনাকে বাঁচাতে ও ন্যায়বিচারের
আশায় তার মামা বাকী বিল্লাহ বাদী হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের
করেন। তবে মামলা দায়েরের পর থেকেই ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার জন্য জোর তৎপরতা শুরু করেছে
মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ। তারা এটিকে ‘পারিবারিক বিষয়’ আখ্যা দিয়ে আপস-মিমাংসার চেষ্টা চালাচ্ছে।
এ বিষয়ে মামলার বাদী ও শিশুর মামা
মুঠোফোনে ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, "মামলা করার পর মাদ্রাসার দুই শিক্ষককে গ্রেপ্তার
করা হয়েছে। তারা বর্তমানে কারাগারে আছে। তবে ঘটনাটি পারিবারিকভাবে মিমাংসা করার জন্য
মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ নানাভাবে আমাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।" পরিবারটি এই ঘটনার
সুষ্ঠু তদন্ত ও অভিযুক্ত শিক্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছে।
অপরাধীদের ছাড় দেওয়া হবে না: আশ্বস্ত
করল পুলিশ প্রশাসন
নির্মম এই শিশু নির্যাতনের খবর
পাওয়ামাত্রই দ্রুত অ্যাকশনে যায় স্থানীয় প্রশাসন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত
কর্মকর্তা (ওসি) একরামুল হোসাইণ মুঠোফোনে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, "ঘটনা
শোনার পর পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে যায়। তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে দুই শিক্ষককে গ্রেপ্তার
করে আইনী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।"
অন্যদিকে, পুলিশের রাজশাহী বিভাগীয়
ডিআইজি অফিস থেকেও বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে। ডিআইজি
অফিস থেকে স্পষ্ট বার্তা দিয়ে বলা হয়েছে, "ঘটনাটি জানার পর পুলিশ তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা
নিয়েছে। নির্যাতনের ভিডিওসহ অন্যান্য সব তথ্যপ্রমাণ আমাদের হাতে এসেছে এবং অপরাধীদের
কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।"
উল্লেখ্য, এর আগেও দেশের বিভিন্ন
প্রান্তে মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে ব্যাপক লেখালেখি হলেও থামছে না এই নির্মমতা,
যা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে চরম ক্ষোভ ও উদ্বেগ বিরাজ করছে।

আপনার মতামত লিখুন