একসময় মরুভূমির বুকে কাফেলা বেয়ে আসা হাজিরা উটের পিঠ থেকে নেমে মিনায় পৌঁছাতেন। তাদের সামনে বসত হাজার হাজার উট, ছাগল আর ভেড়ার বিশাল মাঠ। ধারালো বল্লম দিয়ে দাঁড় করানো উটের বুকে আঘাত করে রক্ত প্রবাহিত করাই ছিল সেই সময়ের রীতি। নাম ‘নহর’। মিনার প্রখর রোদে মাংসের পাতলা ফালি কেটে পাথরে বিছিয়ে শুকানো হতো- যেন বহুদূরের পথে সঙ্গ দেয় ‘আল-কাতিদ’ নামের সেই লবণাক্ত খাবার।
আজ সেই দৃশ্য আর নেই। সৌদি আরবের মিনা উপত্যকায় এখন চলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আধুনিক কসাইখানা, স্বয়ংক্রিয় মেশিন আর অ্যাপের এক ক্লিকে কোরবানি দেওয়ার ব্যবস্থা। কিন্তু প্রাচীন সেই রীতি থেকে বর্তমানের এই ডিজিটাল রূপান্তরের পথটা কেমন ছিল? প্রায় ৪০ বছর আগে এক বিপর্যয়ের কারণেই নাকি শুরু হয়েছিল পরিবর্তনের গল্প।
ইতিহাস বলে, আরব ভূমিতে উট কোরবানি দেওয়ার প্রথা সবচেয়ে সম্মানিত ছিল। মক্কার কাছে মিনা উপত্যকা ছিল কোরবানির মূল কেন্দ্রস্থল। সেখানে ‘নহর’ প্রথায় উটকে দাঁড় করিয়ে সামনের পা বেঁধে ধারালো বল্লম দিয়ে গলার নিচে আঘাত করে রক্ত বের করে দেওয়া হতো। একসঙ্গে হাজার হাজার উটের নহর মিনার পাহাড়কে দিত ভিন্ন এক রূপ।
আর ফ্রিজ বা কোল্ড স্টোরেজের যুগ তো তখন ছিল না। জিলহজ মাসের প্রখর গরমে লাখ লাখ পশুর মাংস নষ্ট হয়ে যেত না- কারণ আরবরা জানত এক জাদুকরী প্রথা। মাংসের চর্বি ও হাড় আলাদা করে পাতলা ফালি করে পাথরের ওপর বিছিয়ে কিংবা সুতোয় গেঁথে রোদে শুকিয়ে নেওয়া হতো। এই শুকনো মাংসের নাম ‘আল-কাতিদ’। মরুযাত্রায় সঙ্গী হতো যা। মাসের পর মাস চলত এই লবণাক্ত মাংস ভরসা করে।
শুধু কোরবানি নয়, ছিল এক অনন্য অর্থনীতি। মোগল বা উসমানি আমলে মিনার পশুর হাটে শুধু স্বর্ণমুদ্রার লেনদেন হতো না। বেদুইনরা তাদের পশুর বিনিময়ে নিত সিরিয়ার সুতি কাপড়, ইয়েমেনের কফি, মসলা বা মদিনার খেজুর। প্রাচীন আরবের অর্থনীতির চালিকাশক্তি ছিল এই বিনিময় প্রথা বা বার্টার সিস্টেম।
বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি হজের পরিধি লাখ থেকে কোটিতে গিয়ে পৌঁছালে মিনায় দেখা দিল চরম বিপর্যয়। লাখ লাখ পশুর রক্ত ও বর্জ্য পচে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াত। মহামারির ঝুঁকি তৈরি হতো। আরও বড় কথা, বিপুল পরিমাণ মাংস নষ্ট হয়ে যেত- যা ছিল মানবিক বিপর্যয়ের সামিল।
এই সংকট মোকাবিলায় ১৯৮৩ সালে যুগান্তকারী উদ্যোগ নেয় সৌদি রাজপরিবার ও ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি)। চালু হয় ‘সৌদি প্রজেক্ট ফর ইউটিলাইজেশন অব হাজি মিট’, সংক্ষেপে ‘আদাহি’ প্রকল্প। এই প্রকল্পের মাধ্যমেই মিনায় তৈরি হয় আধুনিক স্লটারহাউস। বদ্ধ কসাইখানায় স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে পশু জবাই ও মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ শুরু হয়।
প্রাচীন আরবের সেই রোদে মাংস শুকানোর কষ্টকর প্রথা আজ রূপ নিয়েছে অত্যাধুনিক ‘ফ্ল্যাশ ফ্রিজিং’ প্রযুক্তিতে। মিনার আধুনিক কসাইখানাগুলোতে পশু জবাইয়ের পর মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে মাইনাস ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় মাংস জমিয়ে ফেলা হয়। কোনো নষ্ট হয় না, কোনো পচে যায় না।
আর সেই মাংস আর মিনার পাহাড়ে পড়ে থাকে না। বিশেষ রেফ্রিজারেটেড কন্টেইনার জাহাজে করে পৌঁছে যায় এশিয়া ও আফ্রিকার প্রায় ২৮টি দরিদ্র মুসলিম দেশে- ইয়েমেন, সোমালিয়া, সুদান, বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে।
এখন সৌদিতে কোরবানি দিতে আর মিনায় যেতে হয় না। ‘আদাহি’ অ্যাপ ডাউনলোড করলেই বসে বসে কোরবানি দেওয়া যায়। কয়েক ক্লিকে বেছে নেওয়া যায়- কোথায় মাংস যাবে, কোন দরিদ্র দেশে পৌঁছাবে। পছন্দমাফিক মাংস বিতরণের নির্দেশ দেওয়া যায়। মোবাইল ফোনেই চলে আসে রসিদ।
প্রাচীন আরবের যে কোরবানি ছিল কেবল মক্কা ও মিনাকেন্দ্রিক, আজ তা রূপ নিয়েছে এক বৈশ্বিক মানবিক ভ্রাতৃত্বের অনন্য প্রতীকে।
তাছাড়া সময়ের আবর্তে আরবের কোরবানির আকার-আকৃতি বদলে গেছে- পাথরের ওপর মাংস শুকানোর সেই দৃশ্য আর মিনার বুকে দেখা যায় না। কিন্তু কোরবানির আদি চেতনা, ত্যাগের মাধ্যমে মানুষের কল্যাণের সেই মূলকথা, তা প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আরও সুশৃঙ্খল ও বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে।
প্রাচীন আরবের যাযাবর যখন তার কোরবানির পশুর বিনিময়ে খেজুর আর মসলা নিত, আজকের মুসলমান ‘আদাহি’ অ্যাপে ক্লিক করে দরিদ্র দেশে মাংস পাঠাচ্ছেন- শুধু সময়ের ব্যবধান। রূপ বদলালেও মূল দর্শন একটাই- ত্যাগ, আর মানুষের মুখে হাসি ফোটানো।মক্কার তপ্ত বালু থেকে শুরু হওয়া এই ত্যাগের মহিমা আজ পুরো পৃথিবীর ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে হাসি ফোটাচ্ছে। প্রযুক্তির কল্যাণে প্রাচীন মিনার সেই ‘আল-কাতিদ’-এর বদলে এখন সারা বিশ্বের প্লেটে পৌঁছে যাচ্ছে অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে সংরক্ষিত শত টন কোরবানির মাংস।

মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ মে ২০২৬
একসময় মরুভূমির বুকে কাফেলা বেয়ে আসা হাজিরা উটের পিঠ থেকে নেমে মিনায় পৌঁছাতেন। তাদের সামনে বসত হাজার হাজার উট, ছাগল আর ভেড়ার বিশাল মাঠ। ধারালো বল্লম দিয়ে দাঁড় করানো উটের বুকে আঘাত করে রক্ত প্রবাহিত করাই ছিল সেই সময়ের রীতি। নাম ‘নহর’। মিনার প্রখর রোদে মাংসের পাতলা ফালি কেটে পাথরে বিছিয়ে শুকানো হতো- যেন বহুদূরের পথে সঙ্গ দেয় ‘আল-কাতিদ’ নামের সেই লবণাক্ত খাবার।
আজ সেই দৃশ্য আর নেই। সৌদি আরবের মিনা উপত্যকায় এখন চলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আধুনিক কসাইখানা, স্বয়ংক্রিয় মেশিন আর অ্যাপের এক ক্লিকে কোরবানি দেওয়ার ব্যবস্থা। কিন্তু প্রাচীন সেই রীতি থেকে বর্তমানের এই ডিজিটাল রূপান্তরের পথটা কেমন ছিল? প্রায় ৪০ বছর আগে এক বিপর্যয়ের কারণেই নাকি শুরু হয়েছিল পরিবর্তনের গল্প।
ইতিহাস বলে, আরব ভূমিতে উট কোরবানি দেওয়ার প্রথা সবচেয়ে সম্মানিত ছিল। মক্কার কাছে মিনা উপত্যকা ছিল কোরবানির মূল কেন্দ্রস্থল। সেখানে ‘নহর’ প্রথায় উটকে দাঁড় করিয়ে সামনের পা বেঁধে ধারালো বল্লম দিয়ে গলার নিচে আঘাত করে রক্ত বের করে দেওয়া হতো। একসঙ্গে হাজার হাজার উটের নহর মিনার পাহাড়কে দিত ভিন্ন এক রূপ।
আর ফ্রিজ বা কোল্ড স্টোরেজের যুগ তো তখন ছিল না। জিলহজ মাসের প্রখর গরমে লাখ লাখ পশুর মাংস নষ্ট হয়ে যেত না- কারণ আরবরা জানত এক জাদুকরী প্রথা। মাংসের চর্বি ও হাড় আলাদা করে পাতলা ফালি করে পাথরের ওপর বিছিয়ে কিংবা সুতোয় গেঁথে রোদে শুকিয়ে নেওয়া হতো। এই শুকনো মাংসের নাম ‘আল-কাতিদ’। মরুযাত্রায় সঙ্গী হতো যা। মাসের পর মাস চলত এই লবণাক্ত মাংস ভরসা করে।
শুধু কোরবানি নয়, ছিল এক অনন্য অর্থনীতি। মোগল বা উসমানি আমলে মিনার পশুর হাটে শুধু স্বর্ণমুদ্রার লেনদেন হতো না। বেদুইনরা তাদের পশুর বিনিময়ে নিত সিরিয়ার সুতি কাপড়, ইয়েমেনের কফি, মসলা বা মদিনার খেজুর। প্রাচীন আরবের অর্থনীতির চালিকাশক্তি ছিল এই বিনিময় প্রথা বা বার্টার সিস্টেম।
বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি হজের পরিধি লাখ থেকে কোটিতে গিয়ে পৌঁছালে মিনায় দেখা দিল চরম বিপর্যয়। লাখ লাখ পশুর রক্ত ও বর্জ্য পচে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াত। মহামারির ঝুঁকি তৈরি হতো। আরও বড় কথা, বিপুল পরিমাণ মাংস নষ্ট হয়ে যেত- যা ছিল মানবিক বিপর্যয়ের সামিল।
এই সংকট মোকাবিলায় ১৯৮৩ সালে যুগান্তকারী উদ্যোগ নেয় সৌদি রাজপরিবার ও ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি)। চালু হয় ‘সৌদি প্রজেক্ট ফর ইউটিলাইজেশন অব হাজি মিট’, সংক্ষেপে ‘আদাহি’ প্রকল্প। এই প্রকল্পের মাধ্যমেই মিনায় তৈরি হয় আধুনিক স্লটারহাউস। বদ্ধ কসাইখানায় স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে পশু জবাই ও মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ শুরু হয়।
প্রাচীন আরবের সেই রোদে মাংস শুকানোর কষ্টকর প্রথা আজ রূপ নিয়েছে অত্যাধুনিক ‘ফ্ল্যাশ ফ্রিজিং’ প্রযুক্তিতে। মিনার আধুনিক কসাইখানাগুলোতে পশু জবাইয়ের পর মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে মাইনাস ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় মাংস জমিয়ে ফেলা হয়। কোনো নষ্ট হয় না, কোনো পচে যায় না।
আর সেই মাংস আর মিনার পাহাড়ে পড়ে থাকে না। বিশেষ রেফ্রিজারেটেড কন্টেইনার জাহাজে করে পৌঁছে যায় এশিয়া ও আফ্রিকার প্রায় ২৮টি দরিদ্র মুসলিম দেশে- ইয়েমেন, সোমালিয়া, সুদান, বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে।
এখন সৌদিতে কোরবানি দিতে আর মিনায় যেতে হয় না। ‘আদাহি’ অ্যাপ ডাউনলোড করলেই বসে বসে কোরবানি দেওয়া যায়। কয়েক ক্লিকে বেছে নেওয়া যায়- কোথায় মাংস যাবে, কোন দরিদ্র দেশে পৌঁছাবে। পছন্দমাফিক মাংস বিতরণের নির্দেশ দেওয়া যায়। মোবাইল ফোনেই চলে আসে রসিদ।
প্রাচীন আরবের যে কোরবানি ছিল কেবল মক্কা ও মিনাকেন্দ্রিক, আজ তা রূপ নিয়েছে এক বৈশ্বিক মানবিক ভ্রাতৃত্বের অনন্য প্রতীকে।
তাছাড়া সময়ের আবর্তে আরবের কোরবানির আকার-আকৃতি বদলে গেছে- পাথরের ওপর মাংস শুকানোর সেই দৃশ্য আর মিনার বুকে দেখা যায় না। কিন্তু কোরবানির আদি চেতনা, ত্যাগের মাধ্যমে মানুষের কল্যাণের সেই মূলকথা, তা প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আরও সুশৃঙ্খল ও বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে।
প্রাচীন আরবের যাযাবর যখন তার কোরবানির পশুর বিনিময়ে খেজুর আর মসলা নিত, আজকের মুসলমান ‘আদাহি’ অ্যাপে ক্লিক করে দরিদ্র দেশে মাংস পাঠাচ্ছেন- শুধু সময়ের ব্যবধান। রূপ বদলালেও মূল দর্শন একটাই- ত্যাগ, আর মানুষের মুখে হাসি ফোটানো।মক্কার তপ্ত বালু থেকে শুরু হওয়া এই ত্যাগের মহিমা আজ পুরো পৃথিবীর ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে হাসি ফোটাচ্ছে। প্রযুক্তির কল্যাণে প্রাচীন মিনার সেই ‘আল-কাতিদ’-এর বদলে এখন সারা বিশ্বের প্লেটে পৌঁছে যাচ্ছে অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে সংরক্ষিত শত টন কোরবানির মাংস।

আপনার মতামত লিখুন