নবাবি আমলে পুরান ঢাকার ঈদ মানেই ছিল ভিন্ন আমেজ। জায়নামাজের পাশাপাশি সাজানো হতো হাতি-ঘোড়া। কামানের ধ্বনির সঙ্গে মিলে যেত তাকবীরের সুর। বকশীবাজার থেকে চকবাজার, ঈদের মাঠে ভেসে আসত ‘কাশিদা’ দলের গান। ঢাকাইয়া কোরবানি ও ঈদ উদযাপনের ইতিহাস মানেই নবাবি জৌলুসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়।
মোগল আমলের শেষ দিকে ও ব্রিটিশ আমলের শুরুর দিকে ঢাকার ঈদ মানেই ছিল নবাবদের একচ্ছত্র আধিপত্য। ইতিহাসবিদদের মতে, নবাব সুজাউদ্দিনের অধীনস্থ মুরশিদ কুলি খানের সময় (১৭০৪-২৫) ঈদের দিন দূর্গ থেকে ঈদগাহ মাঠ পর্যন্ত এক কৌশ পথে (প্রায় ৩ কিলোমিটার) প্রচুর পরিমাণ টাকা ছিটিয়ে দেওয়া হতো। নবাবের সঙ্গে ওমরাহ, রাজকর্মচারী আর মুসলমান জনসাধারণ শোভাযাত্রা করে ঈদগাহে যেতেন।
পরবর্তীতে নবাব খাজা আহসানউল্লাহর আমলে (১৮৪৬-১৯০১) বিভিন্ন পঞ্চায়েত থেকে ‘কাশিদা দল’ বের হওয়ার রেওয়াজ শুরু হয়। ‘কাশিদা’ এক ধরনের ছন্দোবদ্ধ স্তবগান, যা ধীর লয়ে ঈদের মাঠে পৌঁছত।
সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, নবাব আব্দুল গণির আমলে ঈদের নামাজের ইমাম হাতির পিঠে চড়ে ঈদগাহে আসতেন! নবাবের নিজস্ব বন্দুকধারী দল নামাজ শেষে আকাশে ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে সালামি জানাত। সেই শব্দে পুরোনো ঢাকার গলিঘুঁজি মুখরিত হয়ে উঠত।
১৯৫৪ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ঢাকা জেলা প্রশাসক ঈদের শোভাযাত্রা বন্ধ করে দেন। পরবর্তী ৪২ বছর পুরান ঢাকার অলিতে গলিতে আর সেই জৌলুস ফেরেনি। ১৯৯১ সালে হাজারীবাগ থেকে কিছু ছোট উদ্যোগ শুরু হলেও তা খুব একটা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
তবে গত বছর (২০২৫) ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন আবার সেই ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছে। ঈদের জামাত, আনন্দ শোভাযাত্রা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে রক্ষিত আছে এমন এক বিরল চিত্রশিল্প, যেখানে ধরা পড়েছে উনিশ শতকের প্রথম ভাগের ঈদের দৃশ্য। আলম মুসাব্বির নামক এক চিত্রকর ৩৯টি জলরঙের ছবি এঁকেছিলেন। ছবিগুলোতে দেখা যায় সাজানো হাতি-উট, রঙিন পালকি আর বিশাল পতাকা।
সামনের সারিতে নায়েব নাজিমরা, পেছনে মোগল ও ইংরেজ জেন্টলম্যান। ফকির থেকে শুরু করে সাধারণ দর্শনার্থীরা দাঁড়িয়ে থাকত রাস্তার দুই পাশে।
কোরবানির সময় নবাব আলিমুল্লাহর ভূমিকা ছিল অনন্য। তিনি ‘আতা পরগনা’র পুরো আয় গরিবদের মধ্যে বণ্টনের জন্য ওয়াক্ফ করে দেন। এটি ছিল নিঃস্বার্থ দানের এক অনবদ্য দৃষ্টান্ত।
আরেকটি মজার ঐতিহাসিক প্রসঙ্গ পাওয়া যায় নবাব সলিমুল্লাহর সমসাময়িক এক ডায়েরিতে। ১৯০৪ সালের এক কোরবানির ঈদে নবাবের নির্দেশে সাধারণ মানুষকে বিনা পয়সায় ক্লাসিক নাটক দেখানো হয়। উপমহাদেশে ঈদের নামাজ আর থিয়েটারের এই কনফিগারেশন সত্যি বিরল!
ঢাকাইয়া কোরবানি মানে কেবল গরু জবাই নয়, এর ইতিহাস জড়িয়ে আছে বন্দুকের সেলামি, হাতির পালকি আর মোগল জৌলুসে। এই ঐতিহ্য বর্তমানে প্রায় বিলুপ্ত হলেও জাতীয় জাদুঘরের দেয়ালে কিংবা নবাবি আমলের ডায়েরির পাতায় এখনো রেখে গেছে এক টুকরো অতীতের স্বাদ।

মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ মে ২০২৬
নবাবি আমলে পুরান ঢাকার ঈদ মানেই ছিল ভিন্ন আমেজ। জায়নামাজের পাশাপাশি সাজানো হতো হাতি-ঘোড়া। কামানের ধ্বনির সঙ্গে মিলে যেত তাকবীরের সুর। বকশীবাজার থেকে চকবাজার, ঈদের মাঠে ভেসে আসত ‘কাশিদা’ দলের গান। ঢাকাইয়া কোরবানি ও ঈদ উদযাপনের ইতিহাস মানেই নবাবি জৌলুসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়।
মোগল আমলের শেষ দিকে ও ব্রিটিশ আমলের শুরুর দিকে ঢাকার ঈদ মানেই ছিল নবাবদের একচ্ছত্র আধিপত্য। ইতিহাসবিদদের মতে, নবাব সুজাউদ্দিনের অধীনস্থ মুরশিদ কুলি খানের সময় (১৭০৪-২৫) ঈদের দিন দূর্গ থেকে ঈদগাহ মাঠ পর্যন্ত এক কৌশ পথে (প্রায় ৩ কিলোমিটার) প্রচুর পরিমাণ টাকা ছিটিয়ে দেওয়া হতো। নবাবের সঙ্গে ওমরাহ, রাজকর্মচারী আর মুসলমান জনসাধারণ শোভাযাত্রা করে ঈদগাহে যেতেন।
পরবর্তীতে নবাব খাজা আহসানউল্লাহর আমলে (১৮৪৬-১৯০১) বিভিন্ন পঞ্চায়েত থেকে ‘কাশিদা দল’ বের হওয়ার রেওয়াজ শুরু হয়। ‘কাশিদা’ এক ধরনের ছন্দোবদ্ধ স্তবগান, যা ধীর লয়ে ঈদের মাঠে পৌঁছত।
সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, নবাব আব্দুল গণির আমলে ঈদের নামাজের ইমাম হাতির পিঠে চড়ে ঈদগাহে আসতেন! নবাবের নিজস্ব বন্দুকধারী দল নামাজ শেষে আকাশে ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে সালামি জানাত। সেই শব্দে পুরোনো ঢাকার গলিঘুঁজি মুখরিত হয়ে উঠত।
১৯৫৪ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ঢাকা জেলা প্রশাসক ঈদের শোভাযাত্রা বন্ধ করে দেন। পরবর্তী ৪২ বছর পুরান ঢাকার অলিতে গলিতে আর সেই জৌলুস ফেরেনি। ১৯৯১ সালে হাজারীবাগ থেকে কিছু ছোট উদ্যোগ শুরু হলেও তা খুব একটা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
তবে গত বছর (২০২৫) ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন আবার সেই ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছে। ঈদের জামাত, আনন্দ শোভাযাত্রা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে রক্ষিত আছে এমন এক বিরল চিত্রশিল্প, যেখানে ধরা পড়েছে উনিশ শতকের প্রথম ভাগের ঈদের দৃশ্য। আলম মুসাব্বির নামক এক চিত্রকর ৩৯টি জলরঙের ছবি এঁকেছিলেন। ছবিগুলোতে দেখা যায় সাজানো হাতি-উট, রঙিন পালকি আর বিশাল পতাকা।
সামনের সারিতে নায়েব নাজিমরা, পেছনে মোগল ও ইংরেজ জেন্টলম্যান। ফকির থেকে শুরু করে সাধারণ দর্শনার্থীরা দাঁড়িয়ে থাকত রাস্তার দুই পাশে।
কোরবানির সময় নবাব আলিমুল্লাহর ভূমিকা ছিল অনন্য। তিনি ‘আতা পরগনা’র পুরো আয় গরিবদের মধ্যে বণ্টনের জন্য ওয়াক্ফ করে দেন। এটি ছিল নিঃস্বার্থ দানের এক অনবদ্য দৃষ্টান্ত।
আরেকটি মজার ঐতিহাসিক প্রসঙ্গ পাওয়া যায় নবাব সলিমুল্লাহর সমসাময়িক এক ডায়েরিতে। ১৯০৪ সালের এক কোরবানির ঈদে নবাবের নির্দেশে সাধারণ মানুষকে বিনা পয়সায় ক্লাসিক নাটক দেখানো হয়। উপমহাদেশে ঈদের নামাজ আর থিয়েটারের এই কনফিগারেশন সত্যি বিরল!
ঢাকাইয়া কোরবানি মানে কেবল গরু জবাই নয়, এর ইতিহাস জড়িয়ে আছে বন্দুকের সেলামি, হাতির পালকি আর মোগল জৌলুসে। এই ঐতিহ্য বর্তমানে প্রায় বিলুপ্ত হলেও জাতীয় জাদুঘরের দেয়ালে কিংবা নবাবি আমলের ডায়েরির পাতায় এখনো রেখে গেছে এক টুকরো অতীতের স্বাদ।

আপনার মতামত লিখুন