বাংলা সাহিত্যের দুই মহীরুহ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং জাতীয় ও বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো কিছু বিতর্ক গভীরভাবে প্রশ্ন তুলেছে। কেউ কেউ দাবি করেন, রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে থামিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কেউ আবার বলেন, নজরুলের প্রতিভার কাছে রবীন্দ্রনাথের অহংকার মাটিতে মিশে গিয়েছিল। আবার কেউ নজরুলকে ‘ইসলামপন্থি’ ও রবীন্দ্রনাথকে ‘হিন্দুত্ববাদী’ আখ্যা দিয়ে তাদের মধ্যে কৃত্রিম দ্বন্দ্ব সৃষ্টির চেষ্টা করছেন। এসব দাবি কতটা সত্যি?
দুই মহীরুহকে নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত গুজব হচ্ছে- রবীন্দ্রনাথ নজরুলের কবিতা বন্ধ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তব তথ্য বলছে উল্টো। ১৯২৩ সালে নজরুল যখন ব্রিটিশ সরকারের রাজদ্রোহিতার অভিযোগে হুগলি জেলে বন্দি, তখন রবীন্দ্রনাথ তার সদ্য প্রকাশিত ‘বসন্ত’ গীতিনাট্যটি নজরুলকে উৎসর্গ করেন। তখন নজরুলের বয়স মাত্র ২৪। আর রবীন্দ্রনাথ ছিলেন প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিক। প্রতিষ্ঠিত কবির পক্ষ থেকে একজন তরুণ ও কারাবন্দি কবিকে বই উৎসর্গ করা ছিল সাহসী ও ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ।
জেলেই নজরুল ৪০ দিন ধরে অনশন করছিলেন। সেই সময় রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে শিয়ালদহ থেকে টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেন: ‘Give up hunger strike, our literature claims you’ (অনশন ভাঙো, আমাদের সাহিত্যের তোমাকে প্রয়োজন)। উল্লেখ্য, এই টেলিগ্রামটি নজরুলের কাছে পৌঁছায়নি। তবে ইতিহাস সাক্ষী রেখেছে রবীন্দ্রনাথের এই উদ্বেগের কথা।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রবীন্দ্রনাথ নজরুলের ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার জন্য আশীর্বাণী লিখে দিয়েছিলেন: ‘কাজী নজরুল ইসলাম কল্যাণীয়েষু, আয় চলে আয়রে ধূমকেতু/ আঁধারে বাঁধ আগুনের সেতু, দুর্দিনের এই দুর্গশিরে উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন’।
তথ্যগুলো স্পষ্ট বলছে, ‘থামিয়ে দেওয়ার’ প্রশ্নই আসে না বরং রবীন্দ্রনাথ নিজ হাতে নজরুলকে এগিয়ে দিয়েছিলেন। লেখক, গবেষক জিয়াউদ্দিন চৌধুরী উল্লেখ করেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথ নজরুলের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করতেন। তাকে বাংলা সাহিত্যের এক নতুন শক্তি হিসেবে দেখতেন।
গবেষকেরা বলছেন, নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা প্রকাশের পর রবীন্দ্রনাথ ঈর্ষান্বিত হয়েছিলেন- এমন দাবিও সঠিক নয়। নজরুল যখন বাংলা সাহিত্যে ঝড় তোলেন (১৯২০-এর দশক), রবীন্দ্রনাথ তখন জীবনের পরিণতিতে।নজরুলের ছিল দ্রোহ ও তারুণ্যের ভাষা, রবীন্দ্রনাথের দার্শনিক গভীরতা। দুই ধারা সম্পূর্ণ আলাদা।
কবি শিহাব সরকার তার এক লেখায় উল্লেখ করেছেন, রবীন্দ্রনাথ যে বিশাল প্রভাব বাংলা সাহিত্যে বিস্তার করেছিলেন, নজরুলও সেই প্রভাবের আওতায় ছিলেন। কিন্তু নিজস্ব মৌলিকত্ব ও প্রতিভার কারণে নজরুল একটি স্বতন্ত্র কাব্যধারা তৈরি করতে সক্ষম হন। দুই কবির পথ চলেছে সমান্তরালে, সংঘর্ষে নয়।
রবীন্দ্রনাথ নিজেই নজরুলের মেধার শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে গেছেন। আর নজরুল নিজেকে সব সময় রবীন্দ্রনাথের শিষ্য মনে করতেন। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর নজরুল লিখেছিলেন শোকগাথা ‘রবিহারা’- যেখানে তিনি রবীন্দ্রনাথকে ‘প্রাণের গুরু’ বলে সম্বোধন করেন। পিতার মতো বড় কবির প্রতি শিষ্যের ভালোবাসাই সেখানে উঠে এসেছে, দ্বেষ বা হিংসা নয়।
নজরুল ও রবীন্দ্রনাথের মধ্যে একটি আলোচিত প্রসঙ্গ হলো ১৯২৭ সালের ডিসেম্বরে রবীন্দ্র পরিষদে রবীন্দ্রনাথের ভাষণ। সেখানে তিনি তরুণ কবিরা ‘রক্ত’-এর পরিবর্তে ‘খুন’ শব্দ ব্যবহার করছেন বলে সমালোচনা করেন। নজরুল তার ‘কান্ডারি হুশিয়ার’ (১৯২৬) কবিতায় ‘খুন’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন- যার ফারসি মূল অর্থ ‘রক্ত’।
গবেষক দেবজানি সেনগুপ্তার মতে, রবীন্দ্রনাথ সরাসরি নজরুলের নাম না নিলেও এটি নজরুলের দিকে ইঙ্গিত ছিল। এ নিয়ে ‘শনিবারের চিঠি’ পত্রিকার গ্রুপের সঙ্গে নজরুলের ভাষাতাত্ত্বিক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। নজরুল ‘বাঘের পিরিতি বালির বাঁধ’ প্রবন্ধে প্রতিক্রিয়া জানান। এটিকে হিন্দু উচ্চবর্গীয় সাংস্কৃতিক গোঁড়ামি বলে চিহ্নিত করেন।
প্রসঙ্গত, সেই বিতর্কের অবসান ঘটান প্রমথ চৌধুরী। তিনি একটি বুদ্ধিদীপ্ত রচনা লিখে পরিস্থিতি শান্ত করেন। নজরুল ও রবীন্দ্রনাথের মধ্যে পুনরায় সাক্ষাৎ ও মিলন ঘটান। এটি প্রমাণ করে, দুজনের মধ্যে ছিল মতপার্থক্য। কিন্তু তা ছিল সাহিত্যিক ও ভাষাতাত্ত্বিক পর্যায়ে, ব্যক্তিগত বিদ্বেষ বা শত্রুতার পর্যায়ে নয়।
সবচেয়ে জটিল বিতর্ক হচ্ছে, নজরুল ‘ইসলামপন্থী’ বনাম রবীন্দ্রনাথ ‘হিন্দুত্ববাদী’। প্রকৃত তথ্য বলছে, উভয়েই ছিলেন সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে।
নজরুল যেমন লিখেছেন ‘উমর ফারুক’ ও ইসলামী গজল, তেমনি লিখেছেন ‘শ্যামাসংগীত’, কীর্তন ও দেবী দুর্গার বন্দনা। তার নিজের ছেলের নাম রাখেন ‘কৃষ্ণ মোহাম্মদ’। গবেষক জিয়াউদ্দিন চৌধুরী এক প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন, নজরুল সম্পর্কে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছিল পাকিস্তান আমলে যখন নির্বাচিতভাবে শুধু ইসলামিক গান ও তার লেখা শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তিনি লিখেছেন, নজরুলের বিস্তৃত ক্যানভাস বোঝার জন্য গভীর সাহিত্যিক আগ্রহের প্রয়োজন।
বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, নজরুল সারা জীবন কুসংস্কার ও ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন।ধর্মের নামে সম্প্রদায়িক বিভাজনের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক ও সাম্যবাদী মানুষ।
অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথকে ‘হিন্দুত্ববাদী’ বলাও ইতিহাসের অপব্যাখ্যা। তিনি সনাতন হিন্দু ধর্মের পৌত্তলিকতা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াই করা ব্রাহ্ম সমাজের অনুসারী ছিলেন। ‘গোরা’ উপন্যাস বা ‘অচলায়তন’ নাটকে তিনি গোঁড়া হিন্দুত্ববাদকে কঠোরভাবে ব্যবচ্ছেদ করেছেন। তার সাহিত্যে ছিল বিশ্বমানবতার জয়গান।
গবেষকেরা বলছেন, এসব গুজবের সূচনা মূলত ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর। জিয়াউদ্দিন চৌধুরী তার প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী নজরুলকে কেবলই ‘মুসলিম কবি’ হিসেবে ব্র্যান্ডিং করতে চেয়েছিল। ‘পূর্ব বাংলার’ বেতার কেন্দ্রগুলোতে বিশেষভাবে নজরুলের শুধু হামদ ও নাত প্রচার করা হতো। যেন এটাই তার লেখার সম্পদ। একই সময়ে রবীন্দ্রনাথকে ‘হিন্দু কবি’ বলে বর্জন করার চেষ্টা চলে।
বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লাইক, শেয়ার ও সস্তা আবেগের ব্যবসা করতে কিছু কুচক্রী মহল সেই পুরোনো মিথ্যাচারগুলোকে নতুন করে ছড়াচ্ছে। নজরুল তার একাধিক রচনায় এই সম্প্রদায়িকতার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। ‘জাতের নামে বাজ্জাতি সব জাত যালিয়াতি খেলছে জুয়া’ গানটি সে সময়ের প্রাসঙ্গিক উদাহরণ।
গবেষক দেবজানি সেনগুপ্তা উল্লেখ করেছেন, নজরুল ও তার সমসাময়িক কবিরা বাংলার এক সমন্বিত ও ধর্মনিরপেক্ষ নন্দনতত্ত্বের পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। নজরুলের অসাম্প্রদায়িক অবস্থান তাকে হিন্দু ও ইসলাম উভয় সম্প্রদায়ের গোঁড়া মহলের সমালোচনার মুখে ফেলেছিল।
জনপ্রিয় একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের সম্পর্ক ছিল পিতা ও পুত্রের মতো, গুরু ও শিষ্যের মতো। তাদের মধ্যে কোনো পেশাগত হিংসা ছিল না। এখন যা ছড়ানো হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ইন্ধনজীবী।নজরুল গবেষক ড. রফিকুল ইসলামও একই মত দেন। তিনি লেখেন, ‘নজরুল নিজে বারবার বলেছেন, রবীন্দ্রনাথ তার অনুপ্রেরণার উৎস। এই দুজনকে পরস্পরের বিপরীতে দাঁড় করানোর চক্রান্ত ইতিহাসের সঙ্গে প্রতারণা।’
(তথ্যসূত্র: ‘এ পয়েন্টলেস ডিবেট’, জিয়াউদ্দিন চৌধুরী, দ্য ডেইলি স্টার, ২০ জানুয়ারি ২০১০। ‘হোয়াই নজরুল স্ট্যান্ডস আউট ইন আ বেঙ্গলি মিলিউ, ইন স্টাইল’, শিহার সরকার, দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ২৩ অক্টোবর, ২০১৭। ‘হোয়াই উই রিমেম্বার (অ্যান্ড ফরগেট) দ্য রিবেল পয়েট কাজী নজরুল ইসলাম’, দ্য ওয়্যার, ২৬ মে, ২০২০। বাংলাপিডিয়া)

সোমবার, ২৫ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৫ মে ২০২৬
বাংলা সাহিত্যের দুই মহীরুহ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং জাতীয় ও বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো কিছু বিতর্ক গভীরভাবে প্রশ্ন তুলেছে। কেউ কেউ দাবি করেন, রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে থামিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কেউ আবার বলেন, নজরুলের প্রতিভার কাছে রবীন্দ্রনাথের অহংকার মাটিতে মিশে গিয়েছিল। আবার কেউ নজরুলকে ‘ইসলামপন্থি’ ও রবীন্দ্রনাথকে ‘হিন্দুত্ববাদী’ আখ্যা দিয়ে তাদের মধ্যে কৃত্রিম দ্বন্দ্ব সৃষ্টির চেষ্টা করছেন। এসব দাবি কতটা সত্যি?
দুই মহীরুহকে নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত গুজব হচ্ছে- রবীন্দ্রনাথ নজরুলের কবিতা বন্ধ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তব তথ্য বলছে উল্টো। ১৯২৩ সালে নজরুল যখন ব্রিটিশ সরকারের রাজদ্রোহিতার অভিযোগে হুগলি জেলে বন্দি, তখন রবীন্দ্রনাথ তার সদ্য প্রকাশিত ‘বসন্ত’ গীতিনাট্যটি নজরুলকে উৎসর্গ করেন। তখন নজরুলের বয়স মাত্র ২৪। আর রবীন্দ্রনাথ ছিলেন প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিক। প্রতিষ্ঠিত কবির পক্ষ থেকে একজন তরুণ ও কারাবন্দি কবিকে বই উৎসর্গ করা ছিল সাহসী ও ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ।
জেলেই নজরুল ৪০ দিন ধরে অনশন করছিলেন। সেই সময় রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে শিয়ালদহ থেকে টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেন: ‘Give up hunger strike, our literature claims you’ (অনশন ভাঙো, আমাদের সাহিত্যের তোমাকে প্রয়োজন)। উল্লেখ্য, এই টেলিগ্রামটি নজরুলের কাছে পৌঁছায়নি। তবে ইতিহাস সাক্ষী রেখেছে রবীন্দ্রনাথের এই উদ্বেগের কথা।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রবীন্দ্রনাথ নজরুলের ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার জন্য আশীর্বাণী লিখে দিয়েছিলেন: ‘কাজী নজরুল ইসলাম কল্যাণীয়েষু, আয় চলে আয়রে ধূমকেতু/ আঁধারে বাঁধ আগুনের সেতু, দুর্দিনের এই দুর্গশিরে উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন’।
তথ্যগুলো স্পষ্ট বলছে, ‘থামিয়ে দেওয়ার’ প্রশ্নই আসে না বরং রবীন্দ্রনাথ নিজ হাতে নজরুলকে এগিয়ে দিয়েছিলেন। লেখক, গবেষক জিয়াউদ্দিন চৌধুরী উল্লেখ করেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথ নজরুলের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করতেন। তাকে বাংলা সাহিত্যের এক নতুন শক্তি হিসেবে দেখতেন।
গবেষকেরা বলছেন, নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা প্রকাশের পর রবীন্দ্রনাথ ঈর্ষান্বিত হয়েছিলেন- এমন দাবিও সঠিক নয়। নজরুল যখন বাংলা সাহিত্যে ঝড় তোলেন (১৯২০-এর দশক), রবীন্দ্রনাথ তখন জীবনের পরিণতিতে।নজরুলের ছিল দ্রোহ ও তারুণ্যের ভাষা, রবীন্দ্রনাথের দার্শনিক গভীরতা। দুই ধারা সম্পূর্ণ আলাদা।
কবি শিহাব সরকার তার এক লেখায় উল্লেখ করেছেন, রবীন্দ্রনাথ যে বিশাল প্রভাব বাংলা সাহিত্যে বিস্তার করেছিলেন, নজরুলও সেই প্রভাবের আওতায় ছিলেন। কিন্তু নিজস্ব মৌলিকত্ব ও প্রতিভার কারণে নজরুল একটি স্বতন্ত্র কাব্যধারা তৈরি করতে সক্ষম হন। দুই কবির পথ চলেছে সমান্তরালে, সংঘর্ষে নয়।
রবীন্দ্রনাথ নিজেই নজরুলের মেধার শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে গেছেন। আর নজরুল নিজেকে সব সময় রবীন্দ্রনাথের শিষ্য মনে করতেন। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর নজরুল লিখেছিলেন শোকগাথা ‘রবিহারা’- যেখানে তিনি রবীন্দ্রনাথকে ‘প্রাণের গুরু’ বলে সম্বোধন করেন। পিতার মতো বড় কবির প্রতি শিষ্যের ভালোবাসাই সেখানে উঠে এসেছে, দ্বেষ বা হিংসা নয়।
নজরুল ও রবীন্দ্রনাথের মধ্যে একটি আলোচিত প্রসঙ্গ হলো ১৯২৭ সালের ডিসেম্বরে রবীন্দ্র পরিষদে রবীন্দ্রনাথের ভাষণ। সেখানে তিনি তরুণ কবিরা ‘রক্ত’-এর পরিবর্তে ‘খুন’ শব্দ ব্যবহার করছেন বলে সমালোচনা করেন। নজরুল তার ‘কান্ডারি হুশিয়ার’ (১৯২৬) কবিতায় ‘খুন’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন- যার ফারসি মূল অর্থ ‘রক্ত’।
গবেষক দেবজানি সেনগুপ্তার মতে, রবীন্দ্রনাথ সরাসরি নজরুলের নাম না নিলেও এটি নজরুলের দিকে ইঙ্গিত ছিল। এ নিয়ে ‘শনিবারের চিঠি’ পত্রিকার গ্রুপের সঙ্গে নজরুলের ভাষাতাত্ত্বিক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। নজরুল ‘বাঘের পিরিতি বালির বাঁধ’ প্রবন্ধে প্রতিক্রিয়া জানান। এটিকে হিন্দু উচ্চবর্গীয় সাংস্কৃতিক গোঁড়ামি বলে চিহ্নিত করেন।
প্রসঙ্গত, সেই বিতর্কের অবসান ঘটান প্রমথ চৌধুরী। তিনি একটি বুদ্ধিদীপ্ত রচনা লিখে পরিস্থিতি শান্ত করেন। নজরুল ও রবীন্দ্রনাথের মধ্যে পুনরায় সাক্ষাৎ ও মিলন ঘটান। এটি প্রমাণ করে, দুজনের মধ্যে ছিল মতপার্থক্য। কিন্তু তা ছিল সাহিত্যিক ও ভাষাতাত্ত্বিক পর্যায়ে, ব্যক্তিগত বিদ্বেষ বা শত্রুতার পর্যায়ে নয়।
সবচেয়ে জটিল বিতর্ক হচ্ছে, নজরুল ‘ইসলামপন্থী’ বনাম রবীন্দ্রনাথ ‘হিন্দুত্ববাদী’। প্রকৃত তথ্য বলছে, উভয়েই ছিলেন সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে।
নজরুল যেমন লিখেছেন ‘উমর ফারুক’ ও ইসলামী গজল, তেমনি লিখেছেন ‘শ্যামাসংগীত’, কীর্তন ও দেবী দুর্গার বন্দনা। তার নিজের ছেলের নাম রাখেন ‘কৃষ্ণ মোহাম্মদ’। গবেষক জিয়াউদ্দিন চৌধুরী এক প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন, নজরুল সম্পর্কে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছিল পাকিস্তান আমলে যখন নির্বাচিতভাবে শুধু ইসলামিক গান ও তার লেখা শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তিনি লিখেছেন, নজরুলের বিস্তৃত ক্যানভাস বোঝার জন্য গভীর সাহিত্যিক আগ্রহের প্রয়োজন।
বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, নজরুল সারা জীবন কুসংস্কার ও ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন।ধর্মের নামে সম্প্রদায়িক বিভাজনের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক ও সাম্যবাদী মানুষ।
অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথকে ‘হিন্দুত্ববাদী’ বলাও ইতিহাসের অপব্যাখ্যা। তিনি সনাতন হিন্দু ধর্মের পৌত্তলিকতা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াই করা ব্রাহ্ম সমাজের অনুসারী ছিলেন। ‘গোরা’ উপন্যাস বা ‘অচলায়তন’ নাটকে তিনি গোঁড়া হিন্দুত্ববাদকে কঠোরভাবে ব্যবচ্ছেদ করেছেন। তার সাহিত্যে ছিল বিশ্বমানবতার জয়গান।
গবেষকেরা বলছেন, এসব গুজবের সূচনা মূলত ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর। জিয়াউদ্দিন চৌধুরী তার প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী নজরুলকে কেবলই ‘মুসলিম কবি’ হিসেবে ব্র্যান্ডিং করতে চেয়েছিল। ‘পূর্ব বাংলার’ বেতার কেন্দ্রগুলোতে বিশেষভাবে নজরুলের শুধু হামদ ও নাত প্রচার করা হতো। যেন এটাই তার লেখার সম্পদ। একই সময়ে রবীন্দ্রনাথকে ‘হিন্দু কবি’ বলে বর্জন করার চেষ্টা চলে।
বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লাইক, শেয়ার ও সস্তা আবেগের ব্যবসা করতে কিছু কুচক্রী মহল সেই পুরোনো মিথ্যাচারগুলোকে নতুন করে ছড়াচ্ছে। নজরুল তার একাধিক রচনায় এই সম্প্রদায়িকতার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। ‘জাতের নামে বাজ্জাতি সব জাত যালিয়াতি খেলছে জুয়া’ গানটি সে সময়ের প্রাসঙ্গিক উদাহরণ।
গবেষক দেবজানি সেনগুপ্তা উল্লেখ করেছেন, নজরুল ও তার সমসাময়িক কবিরা বাংলার এক সমন্বিত ও ধর্মনিরপেক্ষ নন্দনতত্ত্বের পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। নজরুলের অসাম্প্রদায়িক অবস্থান তাকে হিন্দু ও ইসলাম উভয় সম্প্রদায়ের গোঁড়া মহলের সমালোচনার মুখে ফেলেছিল।
জনপ্রিয় একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের সম্পর্ক ছিল পিতা ও পুত্রের মতো, গুরু ও শিষ্যের মতো। তাদের মধ্যে কোনো পেশাগত হিংসা ছিল না। এখন যা ছড়ানো হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ইন্ধনজীবী।নজরুল গবেষক ড. রফিকুল ইসলামও একই মত দেন। তিনি লেখেন, ‘নজরুল নিজে বারবার বলেছেন, রবীন্দ্রনাথ তার অনুপ্রেরণার উৎস। এই দুজনকে পরস্পরের বিপরীতে দাঁড় করানোর চক্রান্ত ইতিহাসের সঙ্গে প্রতারণা।’
(তথ্যসূত্র: ‘এ পয়েন্টলেস ডিবেট’, জিয়াউদ্দিন চৌধুরী, দ্য ডেইলি স্টার, ২০ জানুয়ারি ২০১০। ‘হোয়াই নজরুল স্ট্যান্ডস আউট ইন আ বেঙ্গলি মিলিউ, ইন স্টাইল’, শিহার সরকার, দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ২৩ অক্টোবর, ২০১৭। ‘হোয়াই উই রিমেম্বার (অ্যান্ড ফরগেট) দ্য রিবেল পয়েট কাজী নজরুল ইসলাম’, দ্য ওয়্যার, ২৬ মে, ২০২০। বাংলাপিডিয়া)

আপনার মতামত লিখুন