রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আজ মঙ্গলবার (২৬ মে) ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে। বেলা পৌনে ১২টার দিকে হওয়া ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ময়মনসিংহের ভালুকা। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৩ দশমিক ৪। আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক রুবাইয়াৎ কবীর বলেছেন, এটি স্বল্পমাত্রার ভূমিকম্প। এতে উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো কিছু নেই।
তবে বেশ কিছুদিন ধরে অনুভূত ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল দেখা গেছে দেশের অভ্যন্তরেই। গেল বছর নরসিংদীতে ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্প প্রাণ কেড়েছিল অন্তত ১০ জনের। এর আগে সাতক্ষীরা, ঝিনাইদহ, জয়পুরহাটে কম্পন অনুভূত হয়েছে। ‘নিরাপদ’ হিসেবে চিহ্নিত এলাকাগুলোও এখন ভূমিকম্পের উৎস হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি ও টেকটোনিক অবস্থান বিবেচনায় ভূমিকম্প নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে দেশের অভ্যন্তরে ভূমিকম্পের উৎপত্তির এই ক্রমবর্ধমান প্রবণতা নতুন করে শঙ্কা তৈরি করেছে।
গবেষকরা বলছেন, বাংলাদেশ তিনটি টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত- উত্তরে ইউরেশিয়ান প্লেট, পশ্চিম ও দক্ষিণে ইন্ডিয়ান প্লেট এবং পূর্বে বার্মা মাইক্রোপ্লেট। ইন্ডিয়ান প্লেট উত্তর-পূর্ব দিকে বছরে প্রায় পাঁচ সেন্টিমিটার হারে অগ্রসর হচ্ছে। এই চাপে পূর্ব সীমান্তে ইন্ডিয়ান প্লেট বার্মা প্লেটের নিচে নিমজ্জিত হচ্ছে (সাবডাকশন), উত্তরে হিমালয় অঞ্চলে সংঘর্ষ ঘটছে। এই প্লেট সংঘর্ষের ফলে বিপুল পরিমাণ শক্তি সঞ্চিত হচ্ছে ভূগর্ভে।
দীর্ঘদিন ধরে ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় ভূমিকম্পের শক্তি সঞ্চিত হচ্ছে। এই অঞ্চলের সাবডাকশন জোনে প্রায় হাজার বছর ধরে ৮ থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্পের শক্তি জমেছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। সম্প্রতি দেশের ভেতরেই ভূমিকম্পের উৎপত্তি বৃদ্ধি পাওয়ার ঘটনা এই চাপেরই বহিঃপ্রকাশ বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
তথ্যমতে, গত ১৩ মাসে (ফেব্রুয়ারি ২০২৫ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৬) দেশের অভ্যন্তরে ও সীমান্তবর্তী এলাকায় ৩২টি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছে । ২০১৬ সালের পর এই প্রথম এত অল্প সময়ে এতগুলো ভূমিকম্পের উৎপত্তি রেকর্ড হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবাইয়াত কবির বলেন, ‘২০১৬ সাল থেকে ১৩ মাসে দেশের অভ্যন্তরে এত ভূমিকম্পের উৎপত্তির রেকর্ড নেই। দেশের অভ্যন্তরে এবং সীমান্ত এলাকায় ভূমিকম্পের এই বৃদ্ধি ভূগর্ভে সঞ্চিত বিপুল শক্তিরই প্রকাশ। এটি একটি বড় ভূমিকম্পের ইঙ্গিত বহন করে, যা দীর্ঘদিন ধরেই বলা হয়ে আসছে ।’
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে ভূমিকম্পের ঝুঁকির দিক থেকে তুলনামূলকভাবে ‘নিরাপদ’ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু গত বছরের শেষ দিক থেকে এই অঞ্চলে ভূমিকম্পের সংখ্যা বেড়েছে। গত ২১ নভেম্বর সাতক্ষীরার আশাশুনিতে উৎপত্তি হয় ৫.৪ মাত্রার ভূমিকম্পের। এর আগে ওই বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি সাতক্ষীরার কলারোয়ায় উৎপত্তি হয় ৪.১ মাত্রার ভূমিকম্প। গত বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর যশোরের মনিরামপুরে ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয় ৩.৫ মাত্রায় ।
ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘এই অঞ্চলে ভূমিকম্প বৃদ্ধির পেছনে টেকটোনিক প্লেটের টানের প্রভাব কাজ করছে। দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে বড় কোনো সক্রিয় টেকটোনিক প্লেট সীমানা না থাকায় এখানে খুব বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা কম। তবে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পের উৎপত্তি অব্যাহত থাকতে পারে ।
গত বছরের ২১ নভেম্বর নরসিংদীর মাধবদীতে উৎপত্তি হওয়া ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পটি ছিল সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা। এই ভূমিকম্পটি বিশেষজ্ঞদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি ছিল ইন্ট্রাপ্লেট (প্লেটের অভ্যন্তরীণ) ভূমিকম্প। অর্থাৎ এটি প্লেট সীমানায় নয়, বরং ভারতীয় প্লেটের অভ্যন্তরে অবস্থিত মধুপুর চ্যুতির সক্রিয়তার কারণে ঘটেছে।
মধুপুর চ্যুতি কেন্দ্রীয় বাংলাদেশে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ টেকটোনিক বৈশিষ্ট্য। ১৮৮৫ সালের বঙ্গীয় ভূমিকম্প (মাত্রা প্রায় ৭.০) এই চ্যুতির সাথেই সম্পর্কিত বলে ধারণা করা হয় । গত বছর নরসিংদীর ভূমিকম্প প্রমাণ করে, মধুপুর চ্যুতি এখনও সক্রিয় এবং এটি ভবিষ্যতে বড় ভূমিকম্পের উৎস হতে পারে।
ঘটনাটি আরেকটি কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল- এর উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকার অত্যন্ত কাছে। মাত্র ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পটি দশজনের প্রাণ কেড়েছিল, আহত হয়েছিল আরও অনেকে। ভূ-বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলছেন, বাংলাদেশ সম্প্রতি ভূমিকম্পের একটি সিরিজের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে একটি বিশেষ ‘স্পর্শকাতর’ অবস্থায় রয়েছে্র। যা দেশকে শক্তিশালী ভূমিকম্পের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে ।
তথ্য বলছে, ২০১৭ সালে দেশে ২৮টি ভূমিকম্প রেকর্ড করা হলেও ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪১টি এবং ২০২৪ সালে ৫৪টি। কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, সনাক্তকরণ ব্যবস্থার উন্নতির কারণেও ভূমিকম্প শনাক্তের সংখ্যা বেড়েছে।
২০২৬ সালের মে মাসে এসেও দেশের অভ্যন্তরে ভূমিকম্পের এ ধারা অব্যাহত রয়েছে। ময়মনসিংহের ভালুকায় আজকের ৩.৪ মাত্রার ভূমিকম্পটি আবারও মনে করিয়ে দিল যে, টেকটোনিক প্লেটগুলোর নড়াচড়া থামেনি, বরং তা বাড়ছে।
বাংলাদেশের অবস্থান ভূতাত্ত্বিকভাবে সক্রিয় একটি অঞ্চলে। ১৮৯৭ সালের শিলং ভূমিকম্প (মাত্রা ৮.৭), ১৯১৮ সালের শ্রীমঙ্গল ভূমিকম্প (মাত্রা ৭.৬) থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক নরসিংদীর ঘটনা- প্রমাণ করে বড় ভূমিকম্পের পুনরাবৃত্তি কাল এসে গেছে অনেক আগেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ভূমিকম্প মোকাবিলায় ঢাকা মোটেও প্রস্তুত নয়। মহানগরীর ৮২ শতাংশ ভবন ভূমিকম্প সহনীয় মানদণ্ড পূরণ করে না। বুয়েটের একটি জরিপে বলা হয়েছে, মাত্র ৬ মাত্রার একটি ভূমিকম্পে রাজধানীর ৭০ শতাংশ স্থাপনা ধসে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। আর যদি ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্প হয়, তাহলে ঢাকায় ৭২ হাজার ভবন পুরোপুরি ধসে পড়বে। আরও দেড় লাখ ভবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ঢাকা শহর নরম পলিমাটির ওপর অবস্থিত, যা ভূমিকম্পের কম্পন বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলনের কারণে এই মাটি আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে। যা লিকুইফ্যাকশনের (ভূমি তরল হয়ে যাওয়া) ঝুঁকি তৈরি করছে। তাছাড়া ঢাকার অধিকাংশ উঁচু ভবন পরস্পর এত কাছে যে ভূমিকম্পের সময় তারা একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খেতে পারে। যা দালান ধসের কারণ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হচ্ছে, ভূমিকম্প ঠেকানোর কোনো উপায় নেই, কিন্তু ক্ষয়ক্ষতি কমানোর উপায় আছে। এখনই পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ মে ২০২৬
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আজ মঙ্গলবার (২৬ মে) ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে। বেলা পৌনে ১২টার দিকে হওয়া ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ময়মনসিংহের ভালুকা। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৩ দশমিক ৪। আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক রুবাইয়াৎ কবীর বলেছেন, এটি স্বল্পমাত্রার ভূমিকম্প। এতে উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো কিছু নেই।
তবে বেশ কিছুদিন ধরে অনুভূত ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল দেখা গেছে দেশের অভ্যন্তরেই। গেল বছর নরসিংদীতে ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্প প্রাণ কেড়েছিল অন্তত ১০ জনের। এর আগে সাতক্ষীরা, ঝিনাইদহ, জয়পুরহাটে কম্পন অনুভূত হয়েছে। ‘নিরাপদ’ হিসেবে চিহ্নিত এলাকাগুলোও এখন ভূমিকম্পের উৎস হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি ও টেকটোনিক অবস্থান বিবেচনায় ভূমিকম্প নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে দেশের অভ্যন্তরে ভূমিকম্পের উৎপত্তির এই ক্রমবর্ধমান প্রবণতা নতুন করে শঙ্কা তৈরি করেছে।
গবেষকরা বলছেন, বাংলাদেশ তিনটি টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত- উত্তরে ইউরেশিয়ান প্লেট, পশ্চিম ও দক্ষিণে ইন্ডিয়ান প্লেট এবং পূর্বে বার্মা মাইক্রোপ্লেট। ইন্ডিয়ান প্লেট উত্তর-পূর্ব দিকে বছরে প্রায় পাঁচ সেন্টিমিটার হারে অগ্রসর হচ্ছে। এই চাপে পূর্ব সীমান্তে ইন্ডিয়ান প্লেট বার্মা প্লেটের নিচে নিমজ্জিত হচ্ছে (সাবডাকশন), উত্তরে হিমালয় অঞ্চলে সংঘর্ষ ঘটছে। এই প্লেট সংঘর্ষের ফলে বিপুল পরিমাণ শক্তি সঞ্চিত হচ্ছে ভূগর্ভে।
দীর্ঘদিন ধরে ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় ভূমিকম্পের শক্তি সঞ্চিত হচ্ছে। এই অঞ্চলের সাবডাকশন জোনে প্রায় হাজার বছর ধরে ৮ থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্পের শক্তি জমেছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। সম্প্রতি দেশের ভেতরেই ভূমিকম্পের উৎপত্তি বৃদ্ধি পাওয়ার ঘটনা এই চাপেরই বহিঃপ্রকাশ বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
তথ্যমতে, গত ১৩ মাসে (ফেব্রুয়ারি ২০২৫ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৬) দেশের অভ্যন্তরে ও সীমান্তবর্তী এলাকায় ৩২টি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছে । ২০১৬ সালের পর এই প্রথম এত অল্প সময়ে এতগুলো ভূমিকম্পের উৎপত্তি রেকর্ড হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবাইয়াত কবির বলেন, ‘২০১৬ সাল থেকে ১৩ মাসে দেশের অভ্যন্তরে এত ভূমিকম্পের উৎপত্তির রেকর্ড নেই। দেশের অভ্যন্তরে এবং সীমান্ত এলাকায় ভূমিকম্পের এই বৃদ্ধি ভূগর্ভে সঞ্চিত বিপুল শক্তিরই প্রকাশ। এটি একটি বড় ভূমিকম্পের ইঙ্গিত বহন করে, যা দীর্ঘদিন ধরেই বলা হয়ে আসছে ।’
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে ভূমিকম্পের ঝুঁকির দিক থেকে তুলনামূলকভাবে ‘নিরাপদ’ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু গত বছরের শেষ দিক থেকে এই অঞ্চলে ভূমিকম্পের সংখ্যা বেড়েছে। গত ২১ নভেম্বর সাতক্ষীরার আশাশুনিতে উৎপত্তি হয় ৫.৪ মাত্রার ভূমিকম্পের। এর আগে ওই বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি সাতক্ষীরার কলারোয়ায় উৎপত্তি হয় ৪.১ মাত্রার ভূমিকম্প। গত বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর যশোরের মনিরামপুরে ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয় ৩.৫ মাত্রায় ।
ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘এই অঞ্চলে ভূমিকম্প বৃদ্ধির পেছনে টেকটোনিক প্লেটের টানের প্রভাব কাজ করছে। দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে বড় কোনো সক্রিয় টেকটোনিক প্লেট সীমানা না থাকায় এখানে খুব বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা কম। তবে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পের উৎপত্তি অব্যাহত থাকতে পারে ।
গত বছরের ২১ নভেম্বর নরসিংদীর মাধবদীতে উৎপত্তি হওয়া ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পটি ছিল সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা। এই ভূমিকম্পটি বিশেষজ্ঞদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি ছিল ইন্ট্রাপ্লেট (প্লেটের অভ্যন্তরীণ) ভূমিকম্প। অর্থাৎ এটি প্লেট সীমানায় নয়, বরং ভারতীয় প্লেটের অভ্যন্তরে অবস্থিত মধুপুর চ্যুতির সক্রিয়তার কারণে ঘটেছে।
মধুপুর চ্যুতি কেন্দ্রীয় বাংলাদেশে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ টেকটোনিক বৈশিষ্ট্য। ১৮৮৫ সালের বঙ্গীয় ভূমিকম্প (মাত্রা প্রায় ৭.০) এই চ্যুতির সাথেই সম্পর্কিত বলে ধারণা করা হয় । গত বছর নরসিংদীর ভূমিকম্প প্রমাণ করে, মধুপুর চ্যুতি এখনও সক্রিয় এবং এটি ভবিষ্যতে বড় ভূমিকম্পের উৎস হতে পারে।
ঘটনাটি আরেকটি কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল- এর উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকার অত্যন্ত কাছে। মাত্র ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পটি দশজনের প্রাণ কেড়েছিল, আহত হয়েছিল আরও অনেকে। ভূ-বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলছেন, বাংলাদেশ সম্প্রতি ভূমিকম্পের একটি সিরিজের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে একটি বিশেষ ‘স্পর্শকাতর’ অবস্থায় রয়েছে্র। যা দেশকে শক্তিশালী ভূমিকম্পের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে ।
তথ্য বলছে, ২০১৭ সালে দেশে ২৮টি ভূমিকম্প রেকর্ড করা হলেও ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪১টি এবং ২০২৪ সালে ৫৪টি। কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, সনাক্তকরণ ব্যবস্থার উন্নতির কারণেও ভূমিকম্প শনাক্তের সংখ্যা বেড়েছে।
২০২৬ সালের মে মাসে এসেও দেশের অভ্যন্তরে ভূমিকম্পের এ ধারা অব্যাহত রয়েছে। ময়মনসিংহের ভালুকায় আজকের ৩.৪ মাত্রার ভূমিকম্পটি আবারও মনে করিয়ে দিল যে, টেকটোনিক প্লেটগুলোর নড়াচড়া থামেনি, বরং তা বাড়ছে।
বাংলাদেশের অবস্থান ভূতাত্ত্বিকভাবে সক্রিয় একটি অঞ্চলে। ১৮৯৭ সালের শিলং ভূমিকম্প (মাত্রা ৮.৭), ১৯১৮ সালের শ্রীমঙ্গল ভূমিকম্প (মাত্রা ৭.৬) থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক নরসিংদীর ঘটনা- প্রমাণ করে বড় ভূমিকম্পের পুনরাবৃত্তি কাল এসে গেছে অনেক আগেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ভূমিকম্প মোকাবিলায় ঢাকা মোটেও প্রস্তুত নয়। মহানগরীর ৮২ শতাংশ ভবন ভূমিকম্প সহনীয় মানদণ্ড পূরণ করে না। বুয়েটের একটি জরিপে বলা হয়েছে, মাত্র ৬ মাত্রার একটি ভূমিকম্পে রাজধানীর ৭০ শতাংশ স্থাপনা ধসে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। আর যদি ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্প হয়, তাহলে ঢাকায় ৭২ হাজার ভবন পুরোপুরি ধসে পড়বে। আরও দেড় লাখ ভবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ঢাকা শহর নরম পলিমাটির ওপর অবস্থিত, যা ভূমিকম্পের কম্পন বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলনের কারণে এই মাটি আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে। যা লিকুইফ্যাকশনের (ভূমি তরল হয়ে যাওয়া) ঝুঁকি তৈরি করছে। তাছাড়া ঢাকার অধিকাংশ উঁচু ভবন পরস্পর এত কাছে যে ভূমিকম্পের সময় তারা একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খেতে পারে। যা দালান ধসের কারণ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হচ্ছে, ভূমিকম্প ঠেকানোর কোনো উপায় নেই, কিন্তু ক্ষয়ক্ষতি কমানোর উপায় আছে। এখনই পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

আপনার মতামত লিখুন