সংবাদ

যেখানে জীবনানন্দ ভালোবেসেছিলেন লাবণ্যকে, অনুপ্রেরণার দি‌য়ে‌ছি‌লেন রবিঠাকুরও


​শামীম রিজভী
​শামীম রিজভী
প্রকাশ: ৩০ মে ২০২৬, ১১:০০ পিএম

যেখানে জীবনানন্দ ভালোবেসেছিলেন লাবণ্যকে, অনুপ্রেরণার দি‌য়ে‌ছি‌লেন রবিঠাকুরও

পুরান ঢাকার পাটুয়াটুলীর ঘিঞ্জি রাস্তা, মানুষের অন্তহীন কোলাহল আর রিকশার অবিরাম টুংটাং শব্দের মাঝে হঠাৎ করেই চোখ আটকে যায় রক্তিম এক লাল দালানে।

ব্রিটিশ স্থাপত্যের ছোঁয়ায় নির্মিত, দোতলার সমান উঁচু একতলা এই ভবনটি কেবল কোনো ইট-পাথরের কাঠামো নয়; এটি হলো সুমনা হাসপাতালের কাছে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা ১৮৬৬ সালের ঐতিহাসিক ব্রাহ্মসমাজ মন্দির। দেড় শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে টিকে থাকা এই স্থাপনাটি তৎকালীন ঢাকার সমাজ সংস্কার, নারী শিক্ষা আর আধুনিক মনন গঠনের এক অনন্য বাতিঘর, যার প্রতিটি ধূলিকণায় মিশে আছে ইতিহাসের কিছু পরম মানবিক গল্প।
​১৮৬৬ সালে সমাজ সংস্কারক দীননাথ সেনের নেতৃত্বে যখন এই কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন এখান থেকেই প্রথম দেখা হয়েছিল আধুনিক ঢাকার শিক্ষার স্বপ্ন। আজকের যে ঐতিহ্যবাহী ‘জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়’, তার আঁতুড়ঘর ছিল এই মন্দিরের প্রাঙ্গণেই গড়ে ওঠা ‘ব্রাহ্ম স্কুল’।
শুধু তাই নয়, ঢাকার প্রথম সাধারণ পাঠাগার ‘রাজা রামমোহন রায় লাইব্রেরি’ ছিল এই প্রাঙ্গণেরই এক কোণে। এই মন্দিরের প্রতিটি দেয়াল ছুঁয়ে গেছে ইতিহাসের অবিস্মরণীয় সব নাম।

১৯২৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি যখন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকায় আসেন, তখন এই ব্রাহ্মসমাজ মন্দিরে আয়োজিত এক বিশেষ নারী সমাবেশে তিনি বক্তব্য রেখেছিলেন, যা আজও এক অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে দেওয়ালে দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়।

​তবে এই লাল দালানের সবচেয়ে মধুর আর মানবিক গল্পটি লুকিয়ে আছে বাংলা সাহিত্যের নির্জনতম কবি জীবনানন্দ দাশের জীবনের সাথে। ১৯৩০ সালের ৯ মে, এই মন্দিরের শান্ত-স্নিগ্ধ আবহেই কবি জীবনানন্দ দাশ ভালোবেসে রোহিনী কুমার দাশের কন্যা লাবণ্য দাশের হাত ধরেছিলেন, আবদ্ধ হয়েছিলেন বৈবাহিক পরিণয়সূত্রে।
ব্রাহ্মসমাজের সেক্রেটারি রণবীর পাল রবি সেই 'নস্টালজিক দিনগুলোর' স্মৃতি হাতড়ে আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, "এই সেই পবিত্র বেদি, যেখানে বসে কবি জীবনানন্দ দাশ তার জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করেছিলেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ এখানে এসে যখন নারীদের উদ্দেশ্যে কথা বলে‌ছি‌লেন, তখন এই পুরো প্রাঙ্গণ মুখরিত হয়ে উঠে‌ছি‌লো। অথচ আজ সময়ের আবর্তে মানুষ এসব ভুলে যাচ্ছে।"

​মন্দিরের ভেতরটা এক সুবিশাল এবং অদ্ভুত শান্ত হলঘর। চারপাশের বারান্দা থেকে ভেতরের মূল প্রার্থনা ক‌ক্ষে প্রবেশের জন্য রয়েছে ১৬টি সদর পথ। এখানে কোনো দেব-দেবীর মূর্তি নেই, কারণ ব্রাহ্মরা নিরাকার একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী। উত্তর দিকের সুন্দর একটি বেদিতে বসে প্রতি রবিবার এখনো চলে উপাসনা ও প্রার্থনা সঙ্গীত।
তবে এই দীর্ঘ যাত্রায় কিছু ক্ষতও তৈরি হয়েছে যা আজও কাঁদায় ইতিহাসের অনুসারীদের। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে এক নৃশংস অগ্নিসংযোগে রাজা রামমোহন রায় লাইব্রেরির বহু দুষ্প্রাপ্য বই ও পাণ্ডুলিপি পুড়ে ছাই হয়ে যায়। সেই শূন্যতার কথা স্মরণ করে সেক্রেটারি রণবীর পাল রবি অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে বলেন, "একাত্তরের সেই আগুন আমাদের জ্ঞানের আধারটিকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। এখন আর সেই প্রাচীন বইগুলো নেই, নেই কোনো পাঠক। লাইব্রেরিটা আজ বড্ড নিথর পড়ে থাকে।"

প্রতি রবিবার যখন গোধূলি লগ্নে এই শান্ত হলে ‘সকাতরে ওই কাঁদিছে’ কিংবা ‘আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে’ গানগুলো পিয়ানোর সুরে বেজে ওঠে, তখন মুহূর্তের জন্য মনে হয় সময়টা যেন এক শতাব্দী অতীতে ফিরে গেছে। কিন্তু প্রার্থনা শেষে যখন একে একে বাতিগুলো নিভে যায়, তখন ইতিহাসের এই জীবন্ত সাক্ষীটি জনাকীর্ণ পুরান ঢাকায় যেন আবার বড় বেশি একা হয়ে পড়ে।

কোনো বড় সরকারি বা সামাজিক আয়োজন না থাকলেও, নিজেদের পরম পরিপাটি করে টিকিয়ে রেখেছে একদল নিষ্ঠাবান মানুষ, যারা বিশ্বাস করেন; শত কোলাহলেও ইতিহাস কখনো মরে না।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

রোববার, ৩১ মে ২০২৬


যেখানে জীবনানন্দ ভালোবেসেছিলেন লাবণ্যকে, অনুপ্রেরণার দি‌য়ে‌ছি‌লেন রবিঠাকুরও

প্রকাশের তারিখ : ৩০ মে ২০২৬

featured Image

পুরান ঢাকার পাটুয়াটুলীর ঘিঞ্জি রাস্তা, মানুষের অন্তহীন কোলাহল আর রিকশার অবিরাম টুংটাং শব্দের মাঝে হঠাৎ করেই চোখ আটকে যায় রক্তিম এক লাল দালানে।

ব্রিটিশ স্থাপত্যের ছোঁয়ায় নির্মিত, দোতলার সমান উঁচু একতলা এই ভবনটি কেবল কোনো ইট-পাথরের কাঠামো নয়; এটি হলো সুমনা হাসপাতালের কাছে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা ১৮৬৬ সালের ঐতিহাসিক ব্রাহ্মসমাজ মন্দির। দেড় শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে টিকে থাকা এই স্থাপনাটি তৎকালীন ঢাকার সমাজ সংস্কার, নারী শিক্ষা আর আধুনিক মনন গঠনের এক অনন্য বাতিঘর, যার প্রতিটি ধূলিকণায় মিশে আছে ইতিহাসের কিছু পরম মানবিক গল্প।
​১৮৬৬ সালে সমাজ সংস্কারক দীননাথ সেনের নেতৃত্বে যখন এই কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন এখান থেকেই প্রথম দেখা হয়েছিল আধুনিক ঢাকার শিক্ষার স্বপ্ন। আজকের যে ঐতিহ্যবাহী ‘জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়’, তার আঁতুড়ঘর ছিল এই মন্দিরের প্রাঙ্গণেই গড়ে ওঠা ‘ব্রাহ্ম স্কুল’।
শুধু তাই নয়, ঢাকার প্রথম সাধারণ পাঠাগার ‘রাজা রামমোহন রায় লাইব্রেরি’ ছিল এই প্রাঙ্গণেরই এক কোণে। এই মন্দিরের প্রতিটি দেয়াল ছুঁয়ে গেছে ইতিহাসের অবিস্মরণীয় সব নাম।

১৯২৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি যখন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকায় আসেন, তখন এই ব্রাহ্মসমাজ মন্দিরে আয়োজিত এক বিশেষ নারী সমাবেশে তিনি বক্তব্য রেখেছিলেন, যা আজও এক অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে দেওয়ালে দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়।

​তবে এই লাল দালানের সবচেয়ে মধুর আর মানবিক গল্পটি লুকিয়ে আছে বাংলা সাহিত্যের নির্জনতম কবি জীবনানন্দ দাশের জীবনের সাথে। ১৯৩০ সালের ৯ মে, এই মন্দিরের শান্ত-স্নিগ্ধ আবহেই কবি জীবনানন্দ দাশ ভালোবেসে রোহিনী কুমার দাশের কন্যা লাবণ্য দাশের হাত ধরেছিলেন, আবদ্ধ হয়েছিলেন বৈবাহিক পরিণয়সূত্রে।
ব্রাহ্মসমাজের সেক্রেটারি রণবীর পাল রবি সেই 'নস্টালজিক দিনগুলোর' স্মৃতি হাতড়ে আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, "এই সেই পবিত্র বেদি, যেখানে বসে কবি জীবনানন্দ দাশ তার জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করেছিলেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ এখানে এসে যখন নারীদের উদ্দেশ্যে কথা বলে‌ছি‌লেন, তখন এই পুরো প্রাঙ্গণ মুখরিত হয়ে উঠে‌ছি‌লো। অথচ আজ সময়ের আবর্তে মানুষ এসব ভুলে যাচ্ছে।"

​মন্দিরের ভেতরটা এক সুবিশাল এবং অদ্ভুত শান্ত হলঘর। চারপাশের বারান্দা থেকে ভেতরের মূল প্রার্থনা ক‌ক্ষে প্রবেশের জন্য রয়েছে ১৬টি সদর পথ। এখানে কোনো দেব-দেবীর মূর্তি নেই, কারণ ব্রাহ্মরা নিরাকার একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী। উত্তর দিকের সুন্দর একটি বেদিতে বসে প্রতি রবিবার এখনো চলে উপাসনা ও প্রার্থনা সঙ্গীত।
তবে এই দীর্ঘ যাত্রায় কিছু ক্ষতও তৈরি হয়েছে যা আজও কাঁদায় ইতিহাসের অনুসারীদের। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে এক নৃশংস অগ্নিসংযোগে রাজা রামমোহন রায় লাইব্রেরির বহু দুষ্প্রাপ্য বই ও পাণ্ডুলিপি পুড়ে ছাই হয়ে যায়। সেই শূন্যতার কথা স্মরণ করে সেক্রেটারি রণবীর পাল রবি অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে বলেন, "একাত্তরের সেই আগুন আমাদের জ্ঞানের আধারটিকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। এখন আর সেই প্রাচীন বইগুলো নেই, নেই কোনো পাঠক। লাইব্রেরিটা আজ বড্ড নিথর পড়ে থাকে।"

প্রতি রবিবার যখন গোধূলি লগ্নে এই শান্ত হলে ‘সকাতরে ওই কাঁদিছে’ কিংবা ‘আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে’ গানগুলো পিয়ানোর সুরে বেজে ওঠে, তখন মুহূর্তের জন্য মনে হয় সময়টা যেন এক শতাব্দী অতীতে ফিরে গেছে। কিন্তু প্রার্থনা শেষে যখন একে একে বাতিগুলো নিভে যায়, তখন ইতিহাসের এই জীবন্ত সাক্ষীটি জনাকীর্ণ পুরান ঢাকায় যেন আবার বড় বেশি একা হয়ে পড়ে।

কোনো বড় সরকারি বা সামাজিক আয়োজন না থাকলেও, নিজেদের পরম পরিপাটি করে টিকিয়ে রেখেছে একদল নিষ্ঠাবান মানুষ, যারা বিশ্বাস করেন; শত কোলাহলেও ইতিহাস কখনো মরে না।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত