সংবাদ

লাশবাহী খাঁচায় পরিণত দেশের কারাগার

অ্যাম্বুলেন্স ও ডাক্তার সংকটে পথেই ঝরছে কারা বন্দীর প্রাণ


বাকী বিল্লাহ
বাকী বিল্লাহ
প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬, ১১:০৫ পিএম

অ্যাম্বুলেন্স ও ডাক্তার সংকটে পথেই ঝরছে কারা বন্দীর প্রাণ

  • ৭৫টি কারাগারে অ্যাম্বুলেন্স, ডাক্তার ও যানবাহনের চরম সংকট
  • গত ১৯ দিনে হাসপাতালে নেয়ার পথে রাস্তাই ১৯ বন্দীর মৃত্যু
  • ৫ বছরে ৬’শর বেশী বন্দী হাসপাতালে নেওয়ার পথে রাস্তায় মৃত্যু
  • কারা হাসপাতালে ডাক্তারের পদ আছে ১৪১টি; ডাক্তার আছে মাত্র ২জন
  • অ্যাম্বুলেন্সের জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে: কারা অধিদপ্তর

সারাদেশের কারাগারগুলো যেন এক একটি সুরক্ষিত খাঁচা, যেখানে অপরাধের সাজা খাটতে এসে বন্দীরা বরণ করছেন নির্মম মৃত্যু। দেশের ৭৫টি কারাগারে ধারণক্ষমতার চেয়ে বহুগুণ বেশি, প্রায় ৮০ হাজারেরও বেশি বন্দী দিন কাটাচ্ছেন। এর মধ্যে কেবল ফাঁসির আসামির সংখ্যাই প্রায় হাজার ৭০০ জন। বছরের পর বছর চার দেয়ালের ভেতরে বন্দি জীবন কাটাতে কাটাতে এসব মানুষের অনেকেই ব্রেন স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাকসহ নানা জটিল কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছেন।

নিয়ম অনুযায়ী, কারাগারে কেউ অসুস্থ হলে তাকে প্রথমে কারা হাসপাতালে এবং পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য বাইরের সরকারি হাসপাতালে নেওয়ার কথা। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হলো, দেশের ৪৬টি কারাগারেই কোনো অ্যাম্বুলেন্স নেই। চিকিৎসকের অভাব আর জরুরি মুহূর্তে যাতায়াতের নূন্যতম সুবিধা না থাকায় প্রতিনিয়ত বন্দীদের লাশ বের হচ্ছে কারাগার থেকে। সিএনজি, অটোরিকশা কিংবা খোলা পিকআপ ভ্যানে করে হাসপাতালে নেওয়ার পথেই মাঝরাস্তায় নিভে যাচ্ছে শত শত প্রাণ। আবার অনেককে অচেতন অবস্থায় হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করছেন। এই অকাল নির্মম মৃত্যু ঠেকাতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বারবার প্রস্তাব পাঠানো হলেও অজ্ঞাত এক রহস্যজনক কারণে তা বছরের পর বছর ঝুলে আছে।

১৯ দিনে ১৯ মৃত্যু: পথেই শেষ নিশ্বাস

কারা অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক এক ভয়াবহ পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চলতি মে মাসের গত ১৯ দিনেই কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়া ১৯ জন বন্দী হাসপাতালের পথেই কিংবা জরুরি বিভাগে নেওয়ার পরপরই মারা গেছেন। এর মধ্যে গত মে মহসিন আলী নামে একজন হাজতি স্ট্রোক করে মারা যান, যা কারা কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে। মে জয়পুরহাট কারাগারে সবুর সরকার নামে একজন বন্দী স্ট্রোকের শিকার হয়ে প্রাণ হারান। এর ঠিক কয়েকদিন পর, ১২ মে একই কারাগারের কয়েদি বাহেজ আলী হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হন এবং হাসপাতালে নেওয়ার পথেই তার মৃত্যু হয়।

একই দিনে অর্থাৎ ১২ মে হবিগঞ্জ কারাগারে মঞ্জু মিয়া নামে আরেক বন্দী স্ট্রোক করে মারা যান। এর আগেও গত মে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার- এর কয়েদী জাবেদ (৫০) স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান। ৩০ এপ্রিল কাশিমপুর মহিলা কারাগারের অসুস্থ কয়েদি খুকি বেগমকে (৬০) আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনি রাস্তায়ই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

২৬ এপ্রিল যশোর কারাগারে সিজানুর রহমান নামে একজন হাজতি স্ট্রোক করলে তাকে সিএনজি-অটোরিকশায় করে হাসপাতালে নেওয়ার পথেই তার মৃত্যু হয়। এছাড়া ৩০ এপ্রিল সিরাজগঞ্জ কারাগারে স্ট্রোক করা কয়েদী আব্দুস সালাম (৩৫) এবং গাজীপুর কারাগারে স্ট্রোক করা কয়েদী আকবর আলী (৭২) একইভাবে পথেই মারা যান। গত মে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়া কয়েদী লাভলুর ভাগ্যেও জুটেছে একই পরিণতি।

পাঁচ বছরে মৃত্যু ছাড়িয়েছে ৬০০, আশঙ্কাজনক তথ্য অন্য সূত্রের

কারাগার থেকে প্রাপ্ত সরকারি তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২১ সাল থেকে শুরু করে চলতি ২০২৬ সালের মে মাসের ১৯ তারিখ মঙ্গলবার পর্যন্ত পথেই মারা যাওয়া বন্দীর অফিশিয়াল সংখ্যা ৬শরও বেশি। তবে কারাগারের ভেতরের আরেকটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, প্রকৃত পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। যথাযথ পরিবহনের অভাবে হাসপাতালে নেওয়ার পথে প্রকৃতপক্ষে ৯শ থেকে হাজার বন্দী মারা গেছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

কারা অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ সালে কারাগার থেকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে রাস্তায় ৮৯ জন, ২০২২ সালে ৮২ জন, ২০২৩ সালে ১৪৩ জন, ২০২৪ সালে ১২৯ জন এবং ২০২৫ সালে ৫৪ জন বন্দীর মৃত্যু হয়েছে। আর চলতি ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত চার মাসে ২৭ জন বন্দীর মৃত্যু হয়েছে, যার সাথে মে মাসের এই ১৯ দিনেই যুক্ত হয়েছে আরও ১৯টি প্রাণ।

২২টি অ্যাম্বুলেন্স দিয়ে চলছে ৭৫ কারাগার, ৪৬টিতে শূন্যতা

কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশের ৭৫টি কারাগারের জন্য এই মুহূর্তে জরুরি ভিত্তিতে কমপক্ষে ৯৯টি অ্যাম্বুলেন্স প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে সচল বা অচল মিলিয়ে অ্যাম্বুলেন্স আছে মাত্র ২২টি। এর মানে হলো, দেশের ৪৬টি কারাগারে কোনো অ্যাম্বুলেন্সের অস্তিত্বই নেই। ২০১৯ সাল থেকে এই অ্যাম্বুলেন্স সংকট দেশজুড়ে চরম আকার ধারণ করেছে। যে ২২টি অ্যাম্বুলেন্স কোনোমতে টিকে আছে, তার মধ্যে ১৫টি রাজস্বভুক্ত এবং ৭টি বিভিন্ন প্রকল্পের অধীনে পাওয়া।

এগুলোও এতটাই পুরনো যে, জোড়াতালি দিয়ে কোনোমতে চালানো হচ্ছে। ফলে কোনো বন্দী গুরুতর হৃদরোগে আক্রান্ত হলে তাৎক্ষণিক অ্যাম্বুলেন্স না পেয়ে কারারক্ষীরা বাধ্য হয়ে পিকআপ ভ্যান বা অটোরিকশায় করে রোগীকে রওনা করান। ঝাঁকুনি আর কালক্ষেপণের কারণে বেশিরভাগ রোগীই হাসপাতালের বারান্দা ছোঁয়ার আগে রাস্তায় মারা যান।

১৪১ পদের বিপরীতে ডাক্তার মাত্র জন!

কারাগারের চিকিৎসা ব্যবস্থার কঙ্কালসার রূপ ফুটে উঠেছে এর জনবল কাঠামোতে। সারাদেশে কারাগারের ভেতরের হাসপাতালগুলোতে অনুমোদিত ডাক্তারের পদ রয়েছে ১৪১টি। কিন্তু বর্তমানে এই ১৪১টি পদের বিপরীতে স্থায়ী ডাক্তার আছেন মাত্র জন! বাকি পদগুলো পুরোপুরি শূন্য। কোনো কোনো কারা হাসপাতালে সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মাধ্যমে ডেপুটেশনে (প্রেষণে) ডাক্তাররা দায়িত্ব পালন করলেও তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে ফাঁকিবাজির বিস্তর অভিযোগ।

কারারক্ষী বন্দীদের সূত্রে জানা গেছে, ডেপুটেশনের চিকিৎসকেরা ঠিকমতো কর্মস্থলে যান না, আর গেলেও এক ঘণ্টার বেশি থাকেন না। ফলে ছোটখাটো সাধারণ রোগ ব্যাধির জন্যও বন্দীদের দূরবর্তী সরকারি হাসপাতালে পাঠাতে হয়। সেখানে গিয়ে বহির্বিভাগে বা জরুরি বিভাগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে অপেক্ষা করতে করতে রোগীর অবস্থা আরও কাহিল হয়ে পড়ে। অনেক সময় এই টানা হেঁচড়ার কারণে সুস্থ মানুষও আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েন।

পুরনো নড়বড়ে যানবাহন, অটোরিকশাই ভরসা কর্মকর্তাদের

অ্যাম্বুলেন্স ডাক্তারের তীব্র সংকটের পাশাপাশি পুরো কারা প্রশাসনে চলছে তীব্র যানবাহন সংকট। কারাগারে যেসব সাধারণ যানবাহন বা গাড়ি রয়েছে, সেগুলোর বেশিরভাগই পুরনো নড়বড়ে। জরুরি সরকারি কাজে বা বন্দীদের আদালতে আনা-নেওয়ার সময় মাঝরাস্তায় হঠাৎ গাড়ি বন্ধ হয়ে যাওয়া এখন নিত্যদিনের ঘটনা। দেশের জেলা বিভাগীয় কারাগারগুলোতে বর্তমানে রাজস্বভুক্ত কোনো নিজস্ব যানবাহন নেই বললেই চলে।

জাইকার (JICA) প্রকল্পের অধীনে পাওয়া কয়েকটি গাড়ি রয়েছে, যার বয়স ১৫ বছরেরও বেশি। এসব পুরনো গাড়িকে রাজস্বভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও মন্ত্রণালয়ের আমলাতান্ত্রিক ধীরগতির কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। উল্টো প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় গাড়িগুলো সরকারি পরিবহন পুলে জমা দেওয়ার জন্য উপর মহল থেকে বারবার চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।

কারা কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমানে কারাগারের ভেতরে পরিচালিত ক্যান্টিনের লভ্যাংশ দিয়ে এই ভাঙাচোরা গাড়িগুলোর মেরামত জ্বালানি খরচ মেটানো হচ্ছে। অথচ নিয়ম অনুযায়ী, সারাদেশে কমপক্ষে ৭৫টি পিকআপ ভ্যান এবং জিপ দরকার অন্তত ৩৬টি। কিন্তু আছে মাত্র হাতেগোনা ২৩টি। গাড়ি নষ্ট থাকায় বাধ্য হয়ে কারা কর্মকর্তারা সিএনজি অটোরিকশা, এমনকি রিকশায় করে যাতায়াত করছেন।

আবারও পাঠানো হলো প্রস্তাব, এবার আশাবাদী কর্তৃপক্ষ

এই চরম অব্যবস্থাপনা অ্যাম্বুলেন্স সংকট নিয়ে কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন) জান্নাত-উল-ফরহাদ মুঠোফোনে সরাসরি সংকটের কথা স্বীকার করে বলেন, "কারাগারগুলোতে পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স, নিজস্ব যানবাহন প্রয়োজনীয় ডাক্তার থাকলে অন্তত বন্দীদের সময়মতো হাসপাতালে নিয়ে সঠিক চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করা যেত। এখন অ্যাম্বুলেন্স না থাকায় হাসপাতালে নেওয়ার পথেই অনেকে মারা যান এবং জরুরি বিভাগে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা তাদের মৃত ঘোষণা করেন। এই সংকট দূর করতে ৪৪টি নতুন অ্যাম্বুলেন্স কেনার জন্য আমরা জরুরি ভিত্তিতে মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছি। এর আগেও বিভিন্ন সময় আমরা প্রস্তাব পাঠিয়েছি, কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। তবে আমরা অত্যন্ত আশাবাদী যে এইবার মন্ত্রণালয় বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে দ্রুত ব্যবস্থা নেবে।"

ডাক্তার সংকট প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, "কারা হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকের যে পদগুলো রয়েছে, তার প্রায় সবই শূন্য। এই শূন্য পদগুলোতে যদি দ্রুত ডাক্তার নিয়োগ দেওয়া যেত, তবে বন্দীরা কারাগারের ভেতরেই কিছুটা হলেও প্রাথমিক চিকিৎসা পেতেন। এখন সেই সুযোগ না থাকায় ছোটখাটো রোগের জন্যও সরকারি হাসপাতালে ছুটতে হচ্ছে। বিশেষ করে বিভাগীয় শহরের চেয়ে জেলা কারাগারগুলোতে বন্দীদের এই সমস্যা অনেক বেশি তীব্র আকার ধারণ করেছে।"

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বুধবার, ২০ মে ২০২৬


অ্যাম্বুলেন্স ও ডাক্তার সংকটে পথেই ঝরছে কারা বন্দীর প্রাণ

প্রকাশের তারিখ : ১৯ মে ২০২৬

featured Image

  • ৭৫টি কারাগারে অ্যাম্বুলেন্স, ডাক্তার ও যানবাহনের চরম সংকট
  • গত ১৯ দিনে হাসপাতালে নেয়ার পথে রাস্তাই ১৯ বন্দীর মৃত্যু
  • ৫ বছরে ৬’শর বেশী বন্দী হাসপাতালে নেওয়ার পথে রাস্তায় মৃত্যু
  • কারা হাসপাতালে ডাক্তারের পদ আছে ১৪১টি; ডাক্তার আছে মাত্র ২জন
  • অ্যাম্বুলেন্সের জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে: কারা অধিদপ্তর

সারাদেশের কারাগারগুলো যেন এক একটি সুরক্ষিত খাঁচা, যেখানে অপরাধের সাজা খাটতে এসে বন্দীরা বরণ করছেন নির্মম মৃত্যু। দেশের ৭৫টি কারাগারে ধারণক্ষমতার চেয়ে বহুগুণ বেশি, প্রায় ৮০ হাজারেরও বেশি বন্দী দিন কাটাচ্ছেন। এর মধ্যে কেবল ফাঁসির আসামির সংখ্যাই প্রায় হাজার ৭০০ জন। বছরের পর বছর চার দেয়ালের ভেতরে বন্দি জীবন কাটাতে কাটাতে এসব মানুষের অনেকেই ব্রেন স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাকসহ নানা জটিল কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছেন।

নিয়ম অনুযায়ী, কারাগারে কেউ অসুস্থ হলে তাকে প্রথমে কারা হাসপাতালে এবং পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য বাইরের সরকারি হাসপাতালে নেওয়ার কথা। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হলো, দেশের ৪৬টি কারাগারেই কোনো অ্যাম্বুলেন্স নেই। চিকিৎসকের অভাব আর জরুরি মুহূর্তে যাতায়াতের নূন্যতম সুবিধা না থাকায় প্রতিনিয়ত বন্দীদের লাশ বের হচ্ছে কারাগার থেকে। সিএনজি, অটোরিকশা কিংবা খোলা পিকআপ ভ্যানে করে হাসপাতালে নেওয়ার পথেই মাঝরাস্তায় নিভে যাচ্ছে শত শত প্রাণ। আবার অনেককে অচেতন অবস্থায় হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করছেন। এই অকাল নির্মম মৃত্যু ঠেকাতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বারবার প্রস্তাব পাঠানো হলেও অজ্ঞাত এক রহস্যজনক কারণে তা বছরের পর বছর ঝুলে আছে।

১৯ দিনে ১৯ মৃত্যু: পথেই শেষ নিশ্বাস

কারা অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক এক ভয়াবহ পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চলতি মে মাসের গত ১৯ দিনেই কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়া ১৯ জন বন্দী হাসপাতালের পথেই কিংবা জরুরি বিভাগে নেওয়ার পরপরই মারা গেছেন। এর মধ্যে গত মে মহসিন আলী নামে একজন হাজতি স্ট্রোক করে মারা যান, যা কারা কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে। মে জয়পুরহাট কারাগারে সবুর সরকার নামে একজন বন্দী স্ট্রোকের শিকার হয়ে প্রাণ হারান। এর ঠিক কয়েকদিন পর, ১২ মে একই কারাগারের কয়েদি বাহেজ আলী হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হন এবং হাসপাতালে নেওয়ার পথেই তার মৃত্যু হয়।

একই দিনে অর্থাৎ ১২ মে হবিগঞ্জ কারাগারে মঞ্জু মিয়া নামে আরেক বন্দী স্ট্রোক করে মারা যান। এর আগেও গত মে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার- এর কয়েদী জাবেদ (৫০) স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান। ৩০ এপ্রিল কাশিমপুর মহিলা কারাগারের অসুস্থ কয়েদি খুকি বেগমকে (৬০) আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনি রাস্তায়ই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

২৬ এপ্রিল যশোর কারাগারে সিজানুর রহমান নামে একজন হাজতি স্ট্রোক করলে তাকে সিএনজি-অটোরিকশায় করে হাসপাতালে নেওয়ার পথেই তার মৃত্যু হয়। এছাড়া ৩০ এপ্রিল সিরাজগঞ্জ কারাগারে স্ট্রোক করা কয়েদী আব্দুস সালাম (৩৫) এবং গাজীপুর কারাগারে স্ট্রোক করা কয়েদী আকবর আলী (৭২) একইভাবে পথেই মারা যান। গত মে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়া কয়েদী লাভলুর ভাগ্যেও জুটেছে একই পরিণতি।

পাঁচ বছরে মৃত্যু ছাড়িয়েছে ৬০০, আশঙ্কাজনক তথ্য অন্য সূত্রের

কারাগার থেকে প্রাপ্ত সরকারি তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২১ সাল থেকে শুরু করে চলতি ২০২৬ সালের মে মাসের ১৯ তারিখ মঙ্গলবার পর্যন্ত পথেই মারা যাওয়া বন্দীর অফিশিয়াল সংখ্যা ৬শরও বেশি। তবে কারাগারের ভেতরের আরেকটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, প্রকৃত পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। যথাযথ পরিবহনের অভাবে হাসপাতালে নেওয়ার পথে প্রকৃতপক্ষে ৯শ থেকে হাজার বন্দী মারা গেছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

কারা অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ সালে কারাগার থেকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে রাস্তায় ৮৯ জন, ২০২২ সালে ৮২ জন, ২০২৩ সালে ১৪৩ জন, ২০২৪ সালে ১২৯ জন এবং ২০২৫ সালে ৫৪ জন বন্দীর মৃত্যু হয়েছে। আর চলতি ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত চার মাসে ২৭ জন বন্দীর মৃত্যু হয়েছে, যার সাথে মে মাসের এই ১৯ দিনেই যুক্ত হয়েছে আরও ১৯টি প্রাণ।

২২টি অ্যাম্বুলেন্স দিয়ে চলছে ৭৫ কারাগার, ৪৬টিতে শূন্যতা

কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশের ৭৫টি কারাগারের জন্য এই মুহূর্তে জরুরি ভিত্তিতে কমপক্ষে ৯৯টি অ্যাম্বুলেন্স প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে সচল বা অচল মিলিয়ে অ্যাম্বুলেন্স আছে মাত্র ২২টি। এর মানে হলো, দেশের ৪৬টি কারাগারে কোনো অ্যাম্বুলেন্সের অস্তিত্বই নেই। ২০১৯ সাল থেকে এই অ্যাম্বুলেন্স সংকট দেশজুড়ে চরম আকার ধারণ করেছে। যে ২২টি অ্যাম্বুলেন্স কোনোমতে টিকে আছে, তার মধ্যে ১৫টি রাজস্বভুক্ত এবং ৭টি বিভিন্ন প্রকল্পের অধীনে পাওয়া।

এগুলোও এতটাই পুরনো যে, জোড়াতালি দিয়ে কোনোমতে চালানো হচ্ছে। ফলে কোনো বন্দী গুরুতর হৃদরোগে আক্রান্ত হলে তাৎক্ষণিক অ্যাম্বুলেন্স না পেয়ে কারারক্ষীরা বাধ্য হয়ে পিকআপ ভ্যান বা অটোরিকশায় করে রোগীকে রওনা করান। ঝাঁকুনি আর কালক্ষেপণের কারণে বেশিরভাগ রোগীই হাসপাতালের বারান্দা ছোঁয়ার আগে রাস্তায় মারা যান।

১৪১ পদের বিপরীতে ডাক্তার মাত্র জন!

কারাগারের চিকিৎসা ব্যবস্থার কঙ্কালসার রূপ ফুটে উঠেছে এর জনবল কাঠামোতে। সারাদেশে কারাগারের ভেতরের হাসপাতালগুলোতে অনুমোদিত ডাক্তারের পদ রয়েছে ১৪১টি। কিন্তু বর্তমানে এই ১৪১টি পদের বিপরীতে স্থায়ী ডাক্তার আছেন মাত্র জন! বাকি পদগুলো পুরোপুরি শূন্য। কোনো কোনো কারা হাসপাতালে সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মাধ্যমে ডেপুটেশনে (প্রেষণে) ডাক্তাররা দায়িত্ব পালন করলেও তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে ফাঁকিবাজির বিস্তর অভিযোগ।

কারারক্ষী বন্দীদের সূত্রে জানা গেছে, ডেপুটেশনের চিকিৎসকেরা ঠিকমতো কর্মস্থলে যান না, আর গেলেও এক ঘণ্টার বেশি থাকেন না। ফলে ছোটখাটো সাধারণ রোগ ব্যাধির জন্যও বন্দীদের দূরবর্তী সরকারি হাসপাতালে পাঠাতে হয়। সেখানে গিয়ে বহির্বিভাগে বা জরুরি বিভাগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে অপেক্ষা করতে করতে রোগীর অবস্থা আরও কাহিল হয়ে পড়ে। অনেক সময় এই টানা হেঁচড়ার কারণে সুস্থ মানুষও আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েন।

পুরনো নড়বড়ে যানবাহন, অটোরিকশাই ভরসা কর্মকর্তাদের

অ্যাম্বুলেন্স ডাক্তারের তীব্র সংকটের পাশাপাশি পুরো কারা প্রশাসনে চলছে তীব্র যানবাহন সংকট। কারাগারে যেসব সাধারণ যানবাহন বা গাড়ি রয়েছে, সেগুলোর বেশিরভাগই পুরনো নড়বড়ে। জরুরি সরকারি কাজে বা বন্দীদের আদালতে আনা-নেওয়ার সময় মাঝরাস্তায় হঠাৎ গাড়ি বন্ধ হয়ে যাওয়া এখন নিত্যদিনের ঘটনা। দেশের জেলা বিভাগীয় কারাগারগুলোতে বর্তমানে রাজস্বভুক্ত কোনো নিজস্ব যানবাহন নেই বললেই চলে।

জাইকার (JICA) প্রকল্পের অধীনে পাওয়া কয়েকটি গাড়ি রয়েছে, যার বয়স ১৫ বছরেরও বেশি। এসব পুরনো গাড়িকে রাজস্বভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও মন্ত্রণালয়ের আমলাতান্ত্রিক ধীরগতির কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। উল্টো প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় গাড়িগুলো সরকারি পরিবহন পুলে জমা দেওয়ার জন্য উপর মহল থেকে বারবার চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।

কারা কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমানে কারাগারের ভেতরে পরিচালিত ক্যান্টিনের লভ্যাংশ দিয়ে এই ভাঙাচোরা গাড়িগুলোর মেরামত জ্বালানি খরচ মেটানো হচ্ছে। অথচ নিয়ম অনুযায়ী, সারাদেশে কমপক্ষে ৭৫টি পিকআপ ভ্যান এবং জিপ দরকার অন্তত ৩৬টি। কিন্তু আছে মাত্র হাতেগোনা ২৩টি। গাড়ি নষ্ট থাকায় বাধ্য হয়ে কারা কর্মকর্তারা সিএনজি অটোরিকশা, এমনকি রিকশায় করে যাতায়াত করছেন।

আবারও পাঠানো হলো প্রস্তাব, এবার আশাবাদী কর্তৃপক্ষ

এই চরম অব্যবস্থাপনা অ্যাম্বুলেন্স সংকট নিয়ে কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন) জান্নাত-উল-ফরহাদ মুঠোফোনে সরাসরি সংকটের কথা স্বীকার করে বলেন, "কারাগারগুলোতে পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স, নিজস্ব যানবাহন প্রয়োজনীয় ডাক্তার থাকলে অন্তত বন্দীদের সময়মতো হাসপাতালে নিয়ে সঠিক চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করা যেত। এখন অ্যাম্বুলেন্স না থাকায় হাসপাতালে নেওয়ার পথেই অনেকে মারা যান এবং জরুরি বিভাগে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা তাদের মৃত ঘোষণা করেন। এই সংকট দূর করতে ৪৪টি নতুন অ্যাম্বুলেন্স কেনার জন্য আমরা জরুরি ভিত্তিতে মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছি। এর আগেও বিভিন্ন সময় আমরা প্রস্তাব পাঠিয়েছি, কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। তবে আমরা অত্যন্ত আশাবাদী যে এইবার মন্ত্রণালয় বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে দ্রুত ব্যবস্থা নেবে।"

ডাক্তার সংকট প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, "কারা হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকের যে পদগুলো রয়েছে, তার প্রায় সবই শূন্য। এই শূন্য পদগুলোতে যদি দ্রুত ডাক্তার নিয়োগ দেওয়া যেত, তবে বন্দীরা কারাগারের ভেতরেই কিছুটা হলেও প্রাথমিক চিকিৎসা পেতেন। এখন সেই সুযোগ না থাকায় ছোটখাটো রোগের জন্যও সরকারি হাসপাতালে ছুটতে হচ্ছে। বিশেষ করে বিভাগীয় শহরের চেয়ে জেলা কারাগারগুলোতে বন্দীদের এই সমস্যা অনেক বেশি তীব্র আকার ধারণ করেছে।"


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত