নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করেও অবৈধ গ্যাস সংযোগ ‘নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না’ তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন এন্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি। ঢাকার আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় অসংখ্য অবৈধ সংযোগ চলছে। দেশে চলমান গ্যাস সংকটে একদিকে সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে; দিনের পর দিন আটকে আছে শিল্পে গ্যাস সংযোগ। প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদও প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। ব্যয়বহুল এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানি করে সংকট সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। অন্যদিকে অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে প্রতিদিন রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকার গ্যাস চুরি হয়ে যাচ্ছে।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সংলগ্ন দুটি উপজেলা- মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া এবং নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের অনেক গ্রামেই রয়েছে তিতাস গ্যাসের অবৈধ সংযোগ। মহাসড়ক থেকে কোথাও এক কিলোমিটার আবার কোথাও দুই থেকে পাঁচ কিলোমিটার পর্যন্ত চলে গেছে অবৈধ বিতরণ লাইন।
কোন কোন স্থানে ছোট নদী এবং খালের ওপর দিয়ে যে ব্রিজ (সেতু) গেছে সেই ব্রিজের ওপর দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে অবৈধ গ্যাস বিতরণ লাইন। এভাবে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার পার হয়ে গ্রামগুলোতে ঢুকেছে অবৈধ গ্যাস লাইন।
ব্রিজ দিয়ে আসা-যাওয়া করা লোকজন দেখছে ব্রিজের পাশ দিয়ে কীভাবে এই লাইন টানা হয়েছে। তবে দেখা পর্যন্তই শেষ। কারণ, এই লাইনের সুবিধাভোগী গ্রামের অনেক বাসিন্দা।
জানতে চাইলে তাদেরই একজন সংবাদকে বলেন, “অনেক টেকা দিয়া লাইন লইসি। আর এই গ্যাসের দাবিতো আমাগোও আছে। দেশের সম্পদ, কেউ পাইবো, কেউ পাইবো না। এইডা কোন নিয়ম?”
বিষয়টি অবৈধ। এই গ্যাস ব্যবহার করা আইনত দ-নীয়। এমন তথ্য দিয়ে প্রশ্ন করা হয়, “আপনি কেন এটি ব্যবহার করছেন?” জবাবে তিনি বলেন, “হ, হ। জানি। তাইলে সরকাররে কন (বলেন) আমাগো লাইন বৈধ কইরা দিতে। আমরা মাসে মাসে বিল দিয়া দিুম।”
একই প্রশ্নের জবাবে আরেকজন বলেন, “এলপি গ্যাসের যেই দাম। হয় এলপি গ্যাস সরকারি রেটে দিতে কন। না হয় পাইপের গ্যাস দেন। নাইলে সবার (ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে যারা বৈধ গ্রাহক) গ্যাস বন্ধ কইরা দেন। তারা কম দামে গ্যাস পাইলে আমাগোও দিতে হইব। আমগোডা কাটতে পারবেন না।”
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সংলগ্ন জামালদি বাসস্ট্যান্ড থেকে একটি রাস্তা বড় ভাটেরচর, টেংগারচর, উত্তর শাহপুর, বৈদ্যারগাঁও, মাথাভাঙ্গা হয়ে উপজেলা পরিষদ ও রসুলপুর খেঁয়া ঘাটে গেছে।
জামালদি-বড় ভাটেরচর ব্রিজ হয়ে অবৈধ গ্যাস লাইনটি ওইপারে গিয়েছিল। তবে এখন সেই লাইন ব্রিজের ওপর দিনে নেই। খোঁজ নিয়ে যানা গেছে, লাইনটি মেঘনার শাখা নদী ফুলিদির তলদেশ দিয়ে নেওয়া হয়েছে।
সরেজমিন দেখা যায়, লাইনটি আরও অগ্রসর হওয়ার ভাটেরচর-টেংগারচর ব্রিজের ওপর দিয়েই টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এই লাইনটি থেকে আশপাশের অনেক গ্রামে অবৈধ গ্যাস সংযোগ ব্যবহার করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সম্প্রতি তিতাস গ্যাস কতৃপক্ষ গজারিয়ায় বেশ কিছু অভিযান পরিচালনা করেছে। অভিযানে অনেকগুলো চুন কারখানার অবৈধ সংযোগ উচ্ছেদ করা হয়েছে। তবে বাসা-বাড়ির লাইন কাটার বিষয়টি ‘খুব একটা গুরুত্ব পাচ্ছে না।’
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সোনারগাঁ উপজেলার কাঁচপুর, মদনপুর, মোগরাপাড়া, বাড়ি মজলিস, পিরোজপুর, পানাম, বৈদ্যেরবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে যাচ্ছে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ। সেখানেও রাষ্ট্রায়ত্ত্ব এই বিতরণ কোম্পানিটির মূল লক্ষ্য অবৈধ চুন কারখানা।
তিতাস গ্যাস কোম্পনির একটি সূত্র জানায়, বড় বড় কিছু অভিযানের মাধ্যমে এক সময় গজারিয়াকে অবৈধ সংযোগ মুক্ত উপজেলা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। পরবর্তিতে আর কেউ যেন অবৈধ সংযোগ নিতে না পারে এজন্য টহল চালু করা হয়। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আবার অবৈধ সংযোগ চালু হওয়া শুরু করে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকায় কর্মরত তিতাস গ্যাসের এক কর্মকর্তা সংবাদকে বলেন, “গজারিয়া এবং সোনারগাঁয়ের অবৈধ লাইন নিয়মিত কাটা হচ্ছে। তিতাস গ্যাসের আওতাধীন সব এলাকায় অবৈধ গ্যাস সংযোগ উচ্ছেদে অভিযান চলামান আছে।”
তিনি বলেন, “অভিযান পরিচালনা করতে গেলে স্থানীয় পুলিশ লাগে। ম্যাজিস্ট্রেট লাগে। চাইলেই তা পাওয়া যায় না। ডিসি অফিসে আবেদন করতে হয়।”
অভিযান পরিচালনায় বিভিন্ন সময় স্থানীয়দের বাধা, হামলার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমাদের (তিতাস গ্যাস) লোকবল সীমিত। গ্যাস বিতরণের জন্য ঠিক আছে। তবে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার জন্য এই লোকবল একেবারেই নগণ্য।”
গজারিয়ায় তিতাস গ্যাসের নকশা বহির্ভূত অনেক এলাকা ও গ্রামে অবৈধ বিতরণ লাইন বসানো হয়েছে। স্থানীয় সূত্র অনুযায়ি, বাউশিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম, ভবেরচর, আনারপুরা, হোসেন্দী, আবদুল্লাহপুরসহ আরো অনেক গ্রামের বাসিন্দারা এখন রান্নায় এই গ্যাস ব্যবহার করেন।
একই অবস্থা সোনারগাঁয়েও। নকশাবহির্ভূত এসব লাইন উচ্ছেদে তিতাস বিভিন্ন সময় অভিযান পরিচালনা করেছে। লাইন বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। উচ্ছেদও করা হয়েছে। তবে কিছুদিন যেতে না যেতেই আবার অবৈধ লাইন বাসনো হচ্ছে। এরজন্য ‘লেনদেন হচ্ছে লাখ লাখ টাকা’।
তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের দাবি, অবৈধ সংযোগ পুরোপুরি উচ্ছেদ করতে হলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের পূর্ণ সহযোগিতা প্রয়োজন, যা অধিকাংশ সময়ই পাওয়া যায় না। রাষ্ট্রের আইন না মানার সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে স্থানীয় মানুষ অবৈধ গ্যাস ব্যবহারে উৎসাহিত হয়।
রাষ্ট্রায়াত্ত্ব প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে যে পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ আছে (নতুন বড় কোন আবিস্কার না হলে) তা দিয়ে আর আট-দশ বছর চলবে।
বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের মোট চাহিদা প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট। সব উৎস মিলিয়ে সরবরাহ করা যাচ্ছে ২৭০ কোটি ঘনফুটের মতো। প্রতিদিন প্রায় ১৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।
এই ঘাটতির প্রভাব পড়ছে শিল্প, বিদ্যুৎ ও গৃহস্থালি খাতে। অনেক শিল্পকারখানা নিয়মিত গ্যাস সংকটে পড়ছে, কোথাও কোথাও গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে অনেক এলাকায় বাসাবাড়িতেও গ্যাসের চাপ স্বল্পতায় ভোগান্তিতে পড়ছেন গৃহিণীরা।
পেট্রোবাংলার আওতাধীন ৬টি বিতরণ কোম্পানির অধীনে বৈধ গ্যাস সংযোগের সংখ্যা ৪৮ লাখের মতো। এই গ্রাহকদের মধ্যে বাসা-বাড়ির চুলার পাশাপাশি শিল্প, বাণিজ্যিক, এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস সরবরাহ করা হয়। সরকারি এই কোম্পানিগুলোর আওতাধীন এলাকায় কমবেশী অবৈধ সংযোগ চলছে।
বিতরণ কোম্পানিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি। এটি বর্তমানে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর, নরসিংদী, নেত্রকোনা, ও কিশোরগঞ্জ জেলায় গ্যাস সরবরাহের দায়িত্বে নিয়োজিত আছে।
তিতাসের গ্রাহক সংখ্যা প্রায় পৌনে ২৮ লাখ। এরমধ্যে আবাসিক গ্রাহক ২৭ লাখ ৫৮ হাজারের বেশী।
সরকারি অন্য বিতরণ কোম্পানিগুলো মধ্যে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রায় ৬ লাখ গ্রাহক সংযোগ রয়েছে। জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেমের সিলেট অঞ্চলে প্রায় ৩ লাখ গ্রাহক সংযোগ রয়েছে। পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানির উত্তরাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার গ্রাহক সংযোগ রয়েছে।
সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানির দক্ষিণাঞ্চল ও খুলনা বিভাগে প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার গ্রাহক সংযোগ রয়েছে। বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির কুমিল্লা ও নোয়াখালী অঞ্চলে প্রায় ৫ লাখ গ্রাহক সংযোগ রয়েছে।

সোমবার, ০১ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩১ মে ২০২৬
নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করেও অবৈধ গ্যাস সংযোগ ‘নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না’ তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন এন্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি। ঢাকার আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় অসংখ্য অবৈধ সংযোগ চলছে। দেশে চলমান গ্যাস সংকটে একদিকে সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে; দিনের পর দিন আটকে আছে শিল্পে গ্যাস সংযোগ। প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদও প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। ব্যয়বহুল এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানি করে সংকট সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। অন্যদিকে অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে প্রতিদিন রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকার গ্যাস চুরি হয়ে যাচ্ছে।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সংলগ্ন দুটি উপজেলা- মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া এবং নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের অনেক গ্রামেই রয়েছে তিতাস গ্যাসের অবৈধ সংযোগ। মহাসড়ক থেকে কোথাও এক কিলোমিটার আবার কোথাও দুই থেকে পাঁচ কিলোমিটার পর্যন্ত চলে গেছে অবৈধ বিতরণ লাইন।
কোন কোন স্থানে ছোট নদী এবং খালের ওপর দিয়ে যে ব্রিজ (সেতু) গেছে সেই ব্রিজের ওপর দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে অবৈধ গ্যাস বিতরণ লাইন। এভাবে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার পার হয়ে গ্রামগুলোতে ঢুকেছে অবৈধ গ্যাস লাইন।
ব্রিজ দিয়ে আসা-যাওয়া করা লোকজন দেখছে ব্রিজের পাশ দিয়ে কীভাবে এই লাইন টানা হয়েছে। তবে দেখা পর্যন্তই শেষ। কারণ, এই লাইনের সুবিধাভোগী গ্রামের অনেক বাসিন্দা।
জানতে চাইলে তাদেরই একজন সংবাদকে বলেন, “অনেক টেকা দিয়া লাইন লইসি। আর এই গ্যাসের দাবিতো আমাগোও আছে। দেশের সম্পদ, কেউ পাইবো, কেউ পাইবো না। এইডা কোন নিয়ম?”
বিষয়টি অবৈধ। এই গ্যাস ব্যবহার করা আইনত দ-নীয়। এমন তথ্য দিয়ে প্রশ্ন করা হয়, “আপনি কেন এটি ব্যবহার করছেন?” জবাবে তিনি বলেন, “হ, হ। জানি। তাইলে সরকাররে কন (বলেন) আমাগো লাইন বৈধ কইরা দিতে। আমরা মাসে মাসে বিল দিয়া দিুম।”
একই প্রশ্নের জবাবে আরেকজন বলেন, “এলপি গ্যাসের যেই দাম। হয় এলপি গ্যাস সরকারি রেটে দিতে কন। না হয় পাইপের গ্যাস দেন। নাইলে সবার (ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে যারা বৈধ গ্রাহক) গ্যাস বন্ধ কইরা দেন। তারা কম দামে গ্যাস পাইলে আমাগোও দিতে হইব। আমগোডা কাটতে পারবেন না।”
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সংলগ্ন জামালদি বাসস্ট্যান্ড থেকে একটি রাস্তা বড় ভাটেরচর, টেংগারচর, উত্তর শাহপুর, বৈদ্যারগাঁও, মাথাভাঙ্গা হয়ে উপজেলা পরিষদ ও রসুলপুর খেঁয়া ঘাটে গেছে।
জামালদি-বড় ভাটেরচর ব্রিজ হয়ে অবৈধ গ্যাস লাইনটি ওইপারে গিয়েছিল। তবে এখন সেই লাইন ব্রিজের ওপর দিনে নেই। খোঁজ নিয়ে যানা গেছে, লাইনটি মেঘনার শাখা নদী ফুলিদির তলদেশ দিয়ে নেওয়া হয়েছে।
সরেজমিন দেখা যায়, লাইনটি আরও অগ্রসর হওয়ার ভাটেরচর-টেংগারচর ব্রিজের ওপর দিয়েই টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এই লাইনটি থেকে আশপাশের অনেক গ্রামে অবৈধ গ্যাস সংযোগ ব্যবহার করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সম্প্রতি তিতাস গ্যাস কতৃপক্ষ গজারিয়ায় বেশ কিছু অভিযান পরিচালনা করেছে। অভিযানে অনেকগুলো চুন কারখানার অবৈধ সংযোগ উচ্ছেদ করা হয়েছে। তবে বাসা-বাড়ির লাইন কাটার বিষয়টি ‘খুব একটা গুরুত্ব পাচ্ছে না।’
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সোনারগাঁ উপজেলার কাঁচপুর, মদনপুর, মোগরাপাড়া, বাড়ি মজলিস, পিরোজপুর, পানাম, বৈদ্যেরবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে যাচ্ছে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ। সেখানেও রাষ্ট্রায়ত্ত্ব এই বিতরণ কোম্পানিটির মূল লক্ষ্য অবৈধ চুন কারখানা।
তিতাস গ্যাস কোম্পনির একটি সূত্র জানায়, বড় বড় কিছু অভিযানের মাধ্যমে এক সময় গজারিয়াকে অবৈধ সংযোগ মুক্ত উপজেলা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। পরবর্তিতে আর কেউ যেন অবৈধ সংযোগ নিতে না পারে এজন্য টহল চালু করা হয়। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আবার অবৈধ সংযোগ চালু হওয়া শুরু করে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকায় কর্মরত তিতাস গ্যাসের এক কর্মকর্তা সংবাদকে বলেন, “গজারিয়া এবং সোনারগাঁয়ের অবৈধ লাইন নিয়মিত কাটা হচ্ছে। তিতাস গ্যাসের আওতাধীন সব এলাকায় অবৈধ গ্যাস সংযোগ উচ্ছেদে অভিযান চলামান আছে।”
তিনি বলেন, “অভিযান পরিচালনা করতে গেলে স্থানীয় পুলিশ লাগে। ম্যাজিস্ট্রেট লাগে। চাইলেই তা পাওয়া যায় না। ডিসি অফিসে আবেদন করতে হয়।”
অভিযান পরিচালনায় বিভিন্ন সময় স্থানীয়দের বাধা, হামলার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমাদের (তিতাস গ্যাস) লোকবল সীমিত। গ্যাস বিতরণের জন্য ঠিক আছে। তবে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার জন্য এই লোকবল একেবারেই নগণ্য।”
গজারিয়ায় তিতাস গ্যাসের নকশা বহির্ভূত অনেক এলাকা ও গ্রামে অবৈধ বিতরণ লাইন বসানো হয়েছে। স্থানীয় সূত্র অনুযায়ি, বাউশিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম, ভবেরচর, আনারপুরা, হোসেন্দী, আবদুল্লাহপুরসহ আরো অনেক গ্রামের বাসিন্দারা এখন রান্নায় এই গ্যাস ব্যবহার করেন।
একই অবস্থা সোনারগাঁয়েও। নকশাবহির্ভূত এসব লাইন উচ্ছেদে তিতাস বিভিন্ন সময় অভিযান পরিচালনা করেছে। লাইন বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। উচ্ছেদও করা হয়েছে। তবে কিছুদিন যেতে না যেতেই আবার অবৈধ লাইন বাসনো হচ্ছে। এরজন্য ‘লেনদেন হচ্ছে লাখ লাখ টাকা’।
তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের দাবি, অবৈধ সংযোগ পুরোপুরি উচ্ছেদ করতে হলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের পূর্ণ সহযোগিতা প্রয়োজন, যা অধিকাংশ সময়ই পাওয়া যায় না। রাষ্ট্রের আইন না মানার সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে স্থানীয় মানুষ অবৈধ গ্যাস ব্যবহারে উৎসাহিত হয়।
রাষ্ট্রায়াত্ত্ব প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে যে পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ আছে (নতুন বড় কোন আবিস্কার না হলে) তা দিয়ে আর আট-দশ বছর চলবে।
বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের মোট চাহিদা প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট। সব উৎস মিলিয়ে সরবরাহ করা যাচ্ছে ২৭০ কোটি ঘনফুটের মতো। প্রতিদিন প্রায় ১৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।
এই ঘাটতির প্রভাব পড়ছে শিল্প, বিদ্যুৎ ও গৃহস্থালি খাতে। অনেক শিল্পকারখানা নিয়মিত গ্যাস সংকটে পড়ছে, কোথাও কোথাও গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে অনেক এলাকায় বাসাবাড়িতেও গ্যাসের চাপ স্বল্পতায় ভোগান্তিতে পড়ছেন গৃহিণীরা।
পেট্রোবাংলার আওতাধীন ৬টি বিতরণ কোম্পানির অধীনে বৈধ গ্যাস সংযোগের সংখ্যা ৪৮ লাখের মতো। এই গ্রাহকদের মধ্যে বাসা-বাড়ির চুলার পাশাপাশি শিল্প, বাণিজ্যিক, এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস সরবরাহ করা হয়। সরকারি এই কোম্পানিগুলোর আওতাধীন এলাকায় কমবেশী অবৈধ সংযোগ চলছে।
বিতরণ কোম্পানিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি। এটি বর্তমানে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর, নরসিংদী, নেত্রকোনা, ও কিশোরগঞ্জ জেলায় গ্যাস সরবরাহের দায়িত্বে নিয়োজিত আছে।
তিতাসের গ্রাহক সংখ্যা প্রায় পৌনে ২৮ লাখ। এরমধ্যে আবাসিক গ্রাহক ২৭ লাখ ৫৮ হাজারের বেশী।
সরকারি অন্য বিতরণ কোম্পানিগুলো মধ্যে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রায় ৬ লাখ গ্রাহক সংযোগ রয়েছে। জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেমের সিলেট অঞ্চলে প্রায় ৩ লাখ গ্রাহক সংযোগ রয়েছে। পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানির উত্তরাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার গ্রাহক সংযোগ রয়েছে।
সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানির দক্ষিণাঞ্চল ও খুলনা বিভাগে প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার গ্রাহক সংযোগ রয়েছে। বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির কুমিল্লা ও নোয়াখালী অঞ্চলে প্রায় ৫ লাখ গ্রাহক সংযোগ রয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন