সংবাদ

তামাকের প্রলোভন থেকে কিশোর-তরুণদের বাঁচান


অরূপরতন চৌধুরী
অরূপরতন চৌধুরী
প্রকাশ: ১ জুন ২০২৬, ০৪:৫১ পিএম

তামাকের প্রলোভন থেকে কিশোর-তরুণদের বাঁচান

তামাকের ক্ষতি জানে না এমন মানুষ নেহায়েত কম। কিন্তু অনেকেই জানেন না যে, তামাক সমগ্র পৃথিবীতে প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর বড় কারণ। বিশ্বের এক নিরব মহামারীর নাম ‘তামাক’। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বে ৮৭ লক্ষাধিক মানুষ তামাকজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। এর মধ্যে প্রায় ১৩ লাখ মানুষ পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হয়, যার বড় অংশ শিশু ও নারী। বাংলাদেশেও তামাক একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা, যা বহুমাত্রিক সংকট আরো প্রকট করে তুলছে। দেশে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ তামাকজনিত রোগে বিশেষ করে- ক্যান্সার, হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি) ও অন্যান্য অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে অকালমৃত্যুবরণ করেন। টোব্যাকো এটলাস-২০২৫ এর তথ্য মতে, তামাকজনিত রোগে বাংলাদেশে প্রতিবছর ১ লাখ ৯৯ হাজারের অধিক মানুষ প্রাণ হারায়! তামাকের সৃষ্ট রোগের চিকিৎসা খরচ ৮৭ হাজার কোটি টাকা! এই লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু এবং আর্থিক ও অন্যান্য সব ক্ষয়-ক্ষতি প্রতিরোধ সম্ভব হবে, যদি প্রকৃতপক্ষে তামাক নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

সর্বগ্রাসী তামাকের ভয়াবহতা রুখে দিতে ১৯৮৭ সাল থেকে ৩১ মে দিনটিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সদস্য দেশগুলোর উদ্যোগে ‘বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস’ হিসেবে পালন করা হচ্ছে। ৯০’র দশক থেকে বাংলাদেশেও তামাকমুক্ত দিবস পালিত হচ্ছে। জনসাধারণের মাঝে তামাক বিরোধী সচেতনতা সৃষ্টি এবং তামাক বিরোধী সামাজিক আন্দোলনটি জোরদারকরণে দিবসটির ভূমিকা অগ্রগণ্য। এক সময় আমরা ব্যক্তি উদ্যোগে ও বেসরকারি সংগঠনগুলোর তৎপরতায় দিবসটি পালন করা হতো। সরকার এর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের আওতায় ‘জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল’ গঠন করে ২০০৭ সালে।

সরকারি-বেসরকারি সংস্থা/দপ্তরসমূহের সমন্বয়ে এবছরও বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস ২০২৬ পালনে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবছর প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে ‘প্রলোভনের মুখোশ উন্মোচন করি, তামাক ও নিকোটিনের আসক্তি প্রতিরোধ করি।’ বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রতিপাদ্যটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ তামাক ও নিকোটিন পণ্য উৎপাদনকারী বহুজাতিক কোম্পানিগুলো শিশু, কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের লক্ষ্য করে নতুন নতুন কৌশলে নেশায় আসক্তির অপকৌশল বাস্তবায়নের মাধ্যমে তামাক পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ করছে। এমনকি তামাক কোম্পানিগুলো রাষ্ট্রীয় আইন, বিধিমালা, নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা করছে না! তাদের প্রধান টার্গেট আমাদের ভষ্যিত প্রজন্ম, যাদেও নেশায় আসক্ত করে বছরের পর বছর মুনাফা অর্জন করতে চায়। উদ্বেগের বিষয় হলো- বাংলাদেশ যখন ‘ইয়ুথ ডিভিডেন্ট’ এর সুফল পেতে চলেছে, সেই সময়ে তামাক কোম্পানিগুলোও তরুণদের নেশার জালে আটকাতে ফাঁদ পেতেছে।

কিশোর-তরুণ: তামাক কোম্পানির প্রধান লক্ষ্য:

তামাক কোম্পানিগুলো জানে, অধিকাংশ ব্যবহারকারী কৈশোরেই নিকোটিন পণ্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়। নিকোটিন অত্যন্ত আসক্তি সৃষ্টিকারী পদার্থ; অল্প বয়সে এটি মস্তিষ্কের বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং ভবিষ্যতে অন্যান্য মাদকাসক্তির ঝুঁকি বাড়ায়। গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বজুড়ে প্রতি ১০ জন কিশোর-কিশোরীর মধ্যে অন্তত ১ জন তামাক বা নিকোটিনজাত পণ্য ব্যবহার করে। বাংলাদেশেও ১৩-১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ধূমপান ও অন্যান্য তামাক ব্যবহার উদ্বেগজনক হারে বিদ্যমান। এটি শুধু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়; বরং দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্যও ক্ষেত্রেও বড় হুমকি। শিশু-কিশোরদের মধ্যে তামাক পণ্য সেবনের ঊর্ধ্বগতি বাংলাদেশকে কোনভাবেই ‘ইয়ুথ ডিভিডেন্ট’ এর সুবিধা তো দিবেই না, বরং আমাদের একটি অসুস্থ প্রজন্ম গড়ে উঠবে, যারা রাষ্ট্রের বোঝা হতে পারে!

ই-সিগারেট বা ভেপ: নিরাপদ নয়, নেশায় আসক্তির নতুন ফাঁদ: তামাক কোম্পানিগুলোর অপ্রচারে অনেকেই বিভ্রান্ত হয়ে মনে করেন, ই-সিগারেট বা ভেপিং তুলনামূলক নিরাপদ। বাস্তবে এটি নিকোটিন আসক্তির আধুনিক রূপ। গ্রামাঞ্চলেও ই-সিগারেট বিপণন, ব্যবহার বাড়ছে। কারণ, ই-সিগারেট পণ্যগুলো অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং এর মধ্যে বিভিন্ন ফ্লেভার ব্যবহার করে থাকে, যা তরুণ ও উঠতি বয়সিদের আর্কষণের মূল কারণ। উপরন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণার মাধ্যমে এগুলোকে তরুণদের কাছে ‘ফ্যাশন’ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে সেগুলো বেচা-কেনা চলছে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, ই-সিগারেটসহ উদীয়মান তামাকজাত পণ্যসমূহ প্রচলিত তামাকের মতোই আসক্তি সৃষ্টিকারী। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে আরও অধিক ক্ষতিকর। আরেকটি গবেষণায় দেখানো হয়েছে, ই-সিগারেট সাধারণ সিগারেটের চেয়ে ১০ গুণ বেশি ক্ষতিকর! ই-সিগারেট ব্যবহারে ফুসফুসের ক্ষতি, হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি, স্ট্রোক এবং আচরণগত সমস্যার আশঙ্কা বাড়ে। জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি বিবেচনায় বাংলাদেশ সরকার ই-সিগারেট আমদানি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ক্ষতিকর বিবেচনায় যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ইতালি, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, ভারতসহ বিশ্বের অন্তত ৪৭টি দেশ ই-সিগারেট সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে। অন্তবর্তী সরকার ‘তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ ২০২৫’ জারী করে দেশে ই-সিগারেট ও ইমাজিং তামাক পণ্য নিষিদ্ধ এবং বিক্রয়স্থলে তামাক পণ্য প্রদর্শন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছিল। কিন্তু, পরিতাপের বিষয় এ বছর সংশোধিত আইনে এ দুটো অতি গুরুত্বপূর্ণ ধারা বাদ দেয়া হয়। ফলে তামাক কোম্পানিগুলো আরো আগ্রাসী হতে পারে। তরুণ প্রজন্মের সুরক্ষায় প্রয়োজনে নতুন আইন করে ই-সিগারেট ও নিকোটিন পণ্য নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন। মহামান্য আপিল বিভাগ সিভিল আপিল নং ২০৪-২০৫/২০০১ মামলায় ০১/০৩/২০১৬ তারিখের রায়ে দেশে যৌক্তিক সময়ের মধ্যে তামাকের ব্যবহার কমিয়ে আনতে পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশনা প্রদান করেন। রায়ে দেশে নতুন কোনো তামাক বা তামাকজাত দ্রব্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন না দেয়া এবং বিদ্যমান তামাক কোম্পানিগুলোকে বিকল্প পণ্য উৎপাদনে উৎসাহিত করার নির্দেশনাও দেয়া হয়। সুতরাং এটি মানতে হবে।

তরুণ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখতে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো জরুরি-

আইন প্রয়োগের মাধমে তামাক পণ্যের সব ধরনের বিজ্ঞাপন, প্রচার ও পৃষ্ঠপোষকতা কঠোরভাবে বন্ধ করা; নাটক, চলচ্চিত্র, ওয়েবসিরিজ, সোস্যাল মিডিয়া ও ডিজিটাল কনটেন্টে ধূমপান, তামাক পণ্য সেবনের দৃশ্য প্রদর্শন বন্ধ করা; প্রয়োজনীয় নীতি গ্রহণ করে ই-সিগারেট, নিকোটিন পাউচ ও ইমার্জিং তামাক পণ্য কঠোর নিয়ন্ত্রণ অথবা নিষিদ্ধ করা; শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ১০০ মিটারের মধ্যে ও আশপাশে তামাকপণ্য বিক্রয় ও প্রচারণা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা; শিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সচেতনতা কর্মসূচি পরিচালনা; তামাক কোম্পানি থেকে সরকারের অংশীদারিত্ব প্রত্যাহার করা। বাংলাদেশ তরুণ ও যুবশক্তির দেশ। এই তরুণরাই আমাদের সামগ্রীক উন্নয়ন, উদ্ভাবন ও নেতৃত্বের মূল চালিকাশক্তি। এই বিপুল জনগোষ্ঠিকে নিকোটিন ও তামাকের আসক্তি থেকে রক্ষা করা মানে, দেশের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখা। আসুন তামাক কোম্পানির ছলনার মুখোশ খুলে দিই। তামাকের বিষাক্ত ছোবল থেকে নিজেকে রক্ষা করি এবং প্রিয়জনদের ও আপনার আশপাশে সবার সুরক্ষা নিশ্চিত করি। তামাকমুক্ত সমাজ ও দেশ গড়ি।

[লেখক: অধ্যাপক, ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজ]


আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

সোমবার, ০১ জুন ২০২৬


তামাকের প্রলোভন থেকে কিশোর-তরুণদের বাঁচান

প্রকাশের তারিখ : ০১ জুন ২০২৬

featured Image

তামাকের ক্ষতি জানে না এমন মানুষ নেহায়েত কম। কিন্তু অনেকেই জানেন না যে, তামাক সমগ্র পৃথিবীতে প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর বড় কারণ। বিশ্বের এক নিরব মহামারীর নাম ‘তামাক’। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বে ৮৭ লক্ষাধিক মানুষ তামাকজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। এর মধ্যে প্রায় ১৩ লাখ মানুষ পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হয়, যার বড় অংশ শিশু ও নারী। বাংলাদেশেও তামাক একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা, যা বহুমাত্রিক সংকট আরো প্রকট করে তুলছে। দেশে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ তামাকজনিত রোগে বিশেষ করে- ক্যান্সার, হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি) ও অন্যান্য অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে অকালমৃত্যুবরণ করেন। টোব্যাকো এটলাস-২০২৫ এর তথ্য মতে, তামাকজনিত রোগে বাংলাদেশে প্রতিবছর ১ লাখ ৯৯ হাজারের অধিক মানুষ প্রাণ হারায়! তামাকের সৃষ্ট রোগের চিকিৎসা খরচ ৮৭ হাজার কোটি টাকা! এই লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু এবং আর্থিক ও অন্যান্য সব ক্ষয়-ক্ষতি প্রতিরোধ সম্ভব হবে, যদি প্রকৃতপক্ষে তামাক নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

সর্বগ্রাসী তামাকের ভয়াবহতা রুখে দিতে ১৯৮৭ সাল থেকে ৩১ মে দিনটিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সদস্য দেশগুলোর উদ্যোগে ‘বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস’ হিসেবে পালন করা হচ্ছে। ৯০’র দশক থেকে বাংলাদেশেও তামাকমুক্ত দিবস পালিত হচ্ছে। জনসাধারণের মাঝে তামাক বিরোধী সচেতনতা সৃষ্টি এবং তামাক বিরোধী সামাজিক আন্দোলনটি জোরদারকরণে দিবসটির ভূমিকা অগ্রগণ্য। এক সময় আমরা ব্যক্তি উদ্যোগে ও বেসরকারি সংগঠনগুলোর তৎপরতায় দিবসটি পালন করা হতো। সরকার এর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের আওতায় ‘জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল’ গঠন করে ২০০৭ সালে।

সরকারি-বেসরকারি সংস্থা/দপ্তরসমূহের সমন্বয়ে এবছরও বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস ২০২৬ পালনে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবছর প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে ‘প্রলোভনের মুখোশ উন্মোচন করি, তামাক ও নিকোটিনের আসক্তি প্রতিরোধ করি।’ বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রতিপাদ্যটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ তামাক ও নিকোটিন পণ্য উৎপাদনকারী বহুজাতিক কোম্পানিগুলো শিশু, কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের লক্ষ্য করে নতুন নতুন কৌশলে নেশায় আসক্তির অপকৌশল বাস্তবায়নের মাধ্যমে তামাক পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ করছে। এমনকি তামাক কোম্পানিগুলো রাষ্ট্রীয় আইন, বিধিমালা, নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা করছে না! তাদের প্রধান টার্গেট আমাদের ভষ্যিত প্রজন্ম, যাদেও নেশায় আসক্ত করে বছরের পর বছর মুনাফা অর্জন করতে চায়। উদ্বেগের বিষয় হলো- বাংলাদেশ যখন ‘ইয়ুথ ডিভিডেন্ট’ এর সুফল পেতে চলেছে, সেই সময়ে তামাক কোম্পানিগুলোও তরুণদের নেশার জালে আটকাতে ফাঁদ পেতেছে।

কিশোর-তরুণ: তামাক কোম্পানির প্রধান লক্ষ্য:

তামাক কোম্পানিগুলো জানে, অধিকাংশ ব্যবহারকারী কৈশোরেই নিকোটিন পণ্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়। নিকোটিন অত্যন্ত আসক্তি সৃষ্টিকারী পদার্থ; অল্প বয়সে এটি মস্তিষ্কের বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং ভবিষ্যতে অন্যান্য মাদকাসক্তির ঝুঁকি বাড়ায়। গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বজুড়ে প্রতি ১০ জন কিশোর-কিশোরীর মধ্যে অন্তত ১ জন তামাক বা নিকোটিনজাত পণ্য ব্যবহার করে। বাংলাদেশেও ১৩-১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ধূমপান ও অন্যান্য তামাক ব্যবহার উদ্বেগজনক হারে বিদ্যমান। এটি শুধু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়; বরং দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্যও ক্ষেত্রেও বড় হুমকি। শিশু-কিশোরদের মধ্যে তামাক পণ্য সেবনের ঊর্ধ্বগতি বাংলাদেশকে কোনভাবেই ‘ইয়ুথ ডিভিডেন্ট’ এর সুবিধা তো দিবেই না, বরং আমাদের একটি অসুস্থ প্রজন্ম গড়ে উঠবে, যারা রাষ্ট্রের বোঝা হতে পারে!

ই-সিগারেট বা ভেপ: নিরাপদ নয়, নেশায় আসক্তির নতুন ফাঁদ: তামাক কোম্পানিগুলোর অপ্রচারে অনেকেই বিভ্রান্ত হয়ে মনে করেন, ই-সিগারেট বা ভেপিং তুলনামূলক নিরাপদ। বাস্তবে এটি নিকোটিন আসক্তির আধুনিক রূপ। গ্রামাঞ্চলেও ই-সিগারেট বিপণন, ব্যবহার বাড়ছে। কারণ, ই-সিগারেট পণ্যগুলো অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং এর মধ্যে বিভিন্ন ফ্লেভার ব্যবহার করে থাকে, যা তরুণ ও উঠতি বয়সিদের আর্কষণের মূল কারণ। উপরন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণার মাধ্যমে এগুলোকে তরুণদের কাছে ‘ফ্যাশন’ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে সেগুলো বেচা-কেনা চলছে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, ই-সিগারেটসহ উদীয়মান তামাকজাত পণ্যসমূহ প্রচলিত তামাকের মতোই আসক্তি সৃষ্টিকারী। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে আরও অধিক ক্ষতিকর। আরেকটি গবেষণায় দেখানো হয়েছে, ই-সিগারেট সাধারণ সিগারেটের চেয়ে ১০ গুণ বেশি ক্ষতিকর! ই-সিগারেট ব্যবহারে ফুসফুসের ক্ষতি, হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি, স্ট্রোক এবং আচরণগত সমস্যার আশঙ্কা বাড়ে। জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি বিবেচনায় বাংলাদেশ সরকার ই-সিগারেট আমদানি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ক্ষতিকর বিবেচনায় যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ইতালি, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, ভারতসহ বিশ্বের অন্তত ৪৭টি দেশ ই-সিগারেট সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে। অন্তবর্তী সরকার ‘তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ ২০২৫’ জারী করে দেশে ই-সিগারেট ও ইমাজিং তামাক পণ্য নিষিদ্ধ এবং বিক্রয়স্থলে তামাক পণ্য প্রদর্শন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছিল। কিন্তু, পরিতাপের বিষয় এ বছর সংশোধিত আইনে এ দুটো অতি গুরুত্বপূর্ণ ধারা বাদ দেয়া হয়। ফলে তামাক কোম্পানিগুলো আরো আগ্রাসী হতে পারে। তরুণ প্রজন্মের সুরক্ষায় প্রয়োজনে নতুন আইন করে ই-সিগারেট ও নিকোটিন পণ্য নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন। মহামান্য আপিল বিভাগ সিভিল আপিল নং ২০৪-২০৫/২০০১ মামলায় ০১/০৩/২০১৬ তারিখের রায়ে দেশে যৌক্তিক সময়ের মধ্যে তামাকের ব্যবহার কমিয়ে আনতে পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশনা প্রদান করেন। রায়ে দেশে নতুন কোনো তামাক বা তামাকজাত দ্রব্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন না দেয়া এবং বিদ্যমান তামাক কোম্পানিগুলোকে বিকল্প পণ্য উৎপাদনে উৎসাহিত করার নির্দেশনাও দেয়া হয়। সুতরাং এটি মানতে হবে।

তরুণ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখতে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো জরুরি-

আইন প্রয়োগের মাধমে তামাক পণ্যের সব ধরনের বিজ্ঞাপন, প্রচার ও পৃষ্ঠপোষকতা কঠোরভাবে বন্ধ করা; নাটক, চলচ্চিত্র, ওয়েবসিরিজ, সোস্যাল মিডিয়া ও ডিজিটাল কনটেন্টে ধূমপান, তামাক পণ্য সেবনের দৃশ্য প্রদর্শন বন্ধ করা; প্রয়োজনীয় নীতি গ্রহণ করে ই-সিগারেট, নিকোটিন পাউচ ও ইমার্জিং তামাক পণ্য কঠোর নিয়ন্ত্রণ অথবা নিষিদ্ধ করা; শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ১০০ মিটারের মধ্যে ও আশপাশে তামাকপণ্য বিক্রয় ও প্রচারণা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা; শিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সচেতনতা কর্মসূচি পরিচালনা; তামাক কোম্পানি থেকে সরকারের অংশীদারিত্ব প্রত্যাহার করা। বাংলাদেশ তরুণ ও যুবশক্তির দেশ। এই তরুণরাই আমাদের সামগ্রীক উন্নয়ন, উদ্ভাবন ও নেতৃত্বের মূল চালিকাশক্তি। এই বিপুল জনগোষ্ঠিকে নিকোটিন ও তামাকের আসক্তি থেকে রক্ষা করা মানে, দেশের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখা। আসুন তামাক কোম্পানির ছলনার মুখোশ খুলে দিই। তামাকের বিষাক্ত ছোবল থেকে নিজেকে রক্ষা করি এবং প্রিয়জনদের ও আপনার আশপাশে সবার সুরক্ষা নিশ্চিত করি। তামাকমুক্ত সমাজ ও দেশ গড়ি।

[লেখক: অধ্যাপক, ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজ]



সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত