কিছুদিন আগে সংসদে পাস হওয়া ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬’ নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। এ আইনের মাধ্যমে একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণ পুনরায় ফিরে পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন সাবেক মালিকরা, তাও তুলনামূলক সহজ শর্তে। ফলে নতুন সরকারের এই পদক্ষেপকে অনেকেই অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যাংক সংস্কার উদ্যোগের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হিসেবে দেখছেন।
ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই আহসান এইচ মনসুরকে অপসারণ এবং একজন ব্যবসায়ীকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ দেয়ায় ওয়াকিবহাল মহলে সন্দেহ দানা বেঁধেছিল যে বিএনপি সরকার সম্ভবত পুঁজি-লুটেরা ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনের পথে হাঁটতে যাচ্ছে। সম্প্রতি ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) নেতাদের সঙ্গে এক বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, ইসলামি ধারার পাঁচ ব্যাংকের একীভূত কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি তিনি এ-ও জানিয়েছেন, নামমাত্র শর্তে পুরোনো মালিকদের ফেরার সুযোগ দেয়া হবে না।
তবে ব্যাংক উদ্যোক্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, সংশোধিত আইনের ধারায় যাঁরা ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে গেছেন, তাদের ফেরার সুযোগ রাখা হয়েছে। এ নিয়ে তারা শঙ্কিত। তাদের মতে, অতীতে ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম ও লুটপাটের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা আবার ফিরে এলে খাতে নতুন করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে।
কারা ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে গেছে, তা সাধারণ মানুষও জানে। তাই তাদের ফেরার সুযোগ দেয়া হলে ব্যাংক খাতের প্রতি জনগণের আস্থা আরও কমে যেতে পারে। এতে নতুন করে সংকট সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সরকারের আরও গভীরভাবে ভাবা উচিত। যদিও গভর্নর ব্যাংক মালিক-উদ্যোক্তাদের সঙ্গে বৈঠকে আশ্বস্ত করেছেন যে সংশোধিত আইনের শর্ত পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হলে সাবেক মালিকদের ফেরার সুযোগ হবে না। একই সঙ্গে পাঁচটি ব্যাংকের চলমান একীভূতকরণ প্রক্রিয়াও অব্যাহত থাকবে।
এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা প্রণয়নের আগে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত ছিল। তাহলে সিদ্ধান্তগুলো আরও গ্রহণযোগ্য ও কার্যকর হতো।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে ইতিহাসের অন্যতম চ্যালেঞ্জিং সময় অতিক্রম করছে। একদিকে খেলাপি ঋণের পাহাড়, অন্যদিকে মূলধন ও নিরাপত্তা সঞ্চিতির ঘাটতির তীব্র চাপ। এই টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্যেই ‘ব্যাংক রেজল্যুশন (সংশোধিত) আইন’ এবং এর বিশেষ কিছু ধারা নিয়ে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে ব্যাংক উদ্যোক্তাদের মধ্যে। বিশেষ করে, যারা একসময় ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ বা লুটপাট করে চলে গেছেন, আইনি ফাঁকফোকরে তাদের আবার মালিকানায় ফেরার সুযোগ থাকা নিয়ে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলো বাংলাদেশের আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। এমন সময়ে জবাবদিহির দুর্বলতা প্রকাশ পেলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ব্যাংকিং খাতের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বিএবি গভর্নরকে দেয়া চিঠিতে ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা ফেরাতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ও সংস্কার প্রস্তাব পেশ করেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ নিষ্পত্তির জন্য মালয়েশিয়া বা দক্ষিণ কোরিয়ার আদলে একটি পেশাদার ‘জাতীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি’ প্রতিষ্ঠা এবং অর্থঋণ আদালত আইন সংশোধন করে স্থগিতাদেশের অপব্যবহার রোধ ও ফাস্ট-ট্র্যাক রিকভারি বেঞ্চ চালু করা।
সংগঠনটি সংকটাপন্ন ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উৎসাহভাতা বন্ধ না করার অনুরোধ জানিয়েছে, যাতে দক্ষ জনবল ধরে রাখা সম্ভব হয়। ব্যাসেল-৩ অনুযায়ী মূলধন পর্যাপ্ততা বজায় রাখতে স্টক লভ্যাংশের ওপর অতিরিক্ত কর থেকে অব্যাহতি দাবি করেছে। পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় থাকা ব্যাংকগুলোকে সরাসরি ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে না পাঠিয়ে একটি বিশেষ ‘ট্রান্সফরমেশন ক্যাটাগরিতে রাখার প্রস্তাবও দিয়েছে।
বিএনপি সরকার একীভূত পাঁচ ব্যাংকের মালিকানা আবার পুরোনো মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার সুযোগ রেখে আইন তৈরি করেছে। এটি একটি ঐতিহাসিক ভুল সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
১৯৮২ সাল থেকে দেশে বেসরকারি মালিকানায় ব্যাংক স্থাপিত হতে শুরু করে। বর্তমানে বেসরকারি ব্যাংকের সংখ্যা প্রায় পঞ্চাশে পৌঁছেছে। বাংলাদেশে এখন মোট ব্যাংকের সংখ্যা ৬১। অর্থনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, দেশে এতগুলো ব্যাংকের প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজমের’ স্বার্থে অতীতের সরকারগুলো বিপুলসংখ্যক বেসরকারি ব্যাংকের লাইসেন্স দিয়েছে। বাংলাদেশের ৫৫ বছরে যেসব ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি ধনবান হয়েছেন, তাদের একটি বড় অংশ কোনো না কোনো ব্যাংকের মালিক বা পরিচালক। তারা নিজেদের ব্যাংক থেকে খুব বেশি ঋণ নিতে না পারলেও একে অন্যের ব্যাংক থেকে বিপুল ঋণ গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছেন। এভাবে তারা দেশের ব্যাংকঋণের ওপর প্রায় একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন। দেশের খেলাপি ঋণের বড় অংশ তাদের কাছেই আটকে রয়েছে।
বাংলাদেশের অধিকাংশ ধনকুবেরের ক্ষেত্রে অর্থনীতি ও রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন এবং ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষকতা একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। ব্যাংকের মালিকানা-বিতরণ ছিল সেই পৃষ্ঠপোষকতার অন্যতম মাধ্যম।
সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ মোট ব্যাংকঋণের বড় অংশ। এই বিপুল খেলাপি ঋণ উদ্ধারের বিষয়ে বর্তমান সরকার কতটা আন্তরিক, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, বিশেষ করে পুরনো মালিকদের ফেরার সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায়।
দেশের দুর্বল ও সংকটাপন্ন ব্যাংকিং খাতকে পুনরুদ্ধারের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল ‘ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’। এর মূল লক্ষ্য ছিল অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে পুনর্গঠন করা এবং দায়ীদের স্থায়ীভাবে মালিকানা থেকে অপসারণ করা। কিন্তু অধ্যাদেশকে আইনে রূপ দেয়ার সময় নতুন ধারা যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি বদলে গেছে।
সব মিলিয়ে নতুন আইনটি ব্যাংকিং খাতের সংস্কার প্রক্রিয়াকে কোন দিকে নিয়ে যাবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা ও বিতর্ক আরও জোরদার হয়েছে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্টদের মধ্যেও তীব্র সমালোচনা ও ক্ষোভ দেখা যাচ্ছে।
আগের অধ্যাদেশে যেখানে দায়ীদের জন্য কোনো ধরনের ছাড় ছিল না, সেখানে এখন কিস্তিতে মালিকানা ফিরে পাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। ফলে এটি ব্যাংক খাতে অনিয়ম ও লুটপাটে জড়িতদের জন্য এক ধরনের সুবিধা বা প্রণোদনা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
নতুন আইনের সম্ভাব্য সুবিধাভোগীদের নিয়ে ব্যাংকপাড়ায় ব্যাপক আলোচনা চলছে। খাতসংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা সতর্ক করে বলেছেন, একবার কোনো ব্যাংক সাবেক মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দিলে তা পুনরুদ্ধার করা কঠিন হবে। যাদের কারণে ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের হাতেই আবার নিয়ন্ত্রণ তুলে দেয়া সুশাসনের পরিপন্থী।
অতীতে যেসব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ ও ব্যাংককে মূলধন সংকটে ফেলার অভিযোগ রয়েছে, তারা যদি আবার নিয়ন্ত্রণে ফিরে আসে, তাহলে সাধারণ গ্রাহকদের আমানতের নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। এমনকি আতঙ্কিত হয়ে আমানতকারীরা অর্থ তুলে নেয়ার চেষ্টা করলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যাংক নয়, পুরো আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সাবেক মালিকরা পুনরায় নিয়ন্ত্রণে এলে ব্যাংকগুলোর পরিচালনা কাঠামো এবং আমানতকারীদের অর্থ ফেরত পাওয়ার বিষয়টিও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে। পাশাপাশি তাদের প্রত্যাবর্তন চলমান একীভূতকরণ প্রক্রিয়াকেও বিঘ্নিত করতে পারে।
যেসব ব্যক্তি আগে ব্যাংক থেকে অর্থ পাচার বা অনিয়মিত ঋণ গ্রহণের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তারা যদি সামান্য অংশ পরিশোধ করে আবার ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে ফিরতে পারেন, তবে তা আর্থিক খাতে দায়মুক্তির সংস্কৃতিকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে। এতে অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত হওয়ার বদলে দায়ীদের কার্যত পুরস্কৃত করা হবে এবং ব্যাংকিং খাতে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার]

সোমবার, ০১ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০১ জুন ২০২৬
কিছুদিন আগে সংসদে পাস হওয়া ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬’ নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। এ আইনের মাধ্যমে একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণ পুনরায় ফিরে পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন সাবেক মালিকরা, তাও তুলনামূলক সহজ শর্তে। ফলে নতুন সরকারের এই পদক্ষেপকে অনেকেই অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যাংক সংস্কার উদ্যোগের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হিসেবে দেখছেন।
ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই আহসান এইচ মনসুরকে অপসারণ এবং একজন ব্যবসায়ীকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ দেয়ায় ওয়াকিবহাল মহলে সন্দেহ দানা বেঁধেছিল যে বিএনপি সরকার সম্ভবত পুঁজি-লুটেরা ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনের পথে হাঁটতে যাচ্ছে। সম্প্রতি ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) নেতাদের সঙ্গে এক বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, ইসলামি ধারার পাঁচ ব্যাংকের একীভূত কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি তিনি এ-ও জানিয়েছেন, নামমাত্র শর্তে পুরোনো মালিকদের ফেরার সুযোগ দেয়া হবে না।
তবে ব্যাংক উদ্যোক্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, সংশোধিত আইনের ধারায় যাঁরা ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে গেছেন, তাদের ফেরার সুযোগ রাখা হয়েছে। এ নিয়ে তারা শঙ্কিত। তাদের মতে, অতীতে ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম ও লুটপাটের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা আবার ফিরে এলে খাতে নতুন করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে।
কারা ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে গেছে, তা সাধারণ মানুষও জানে। তাই তাদের ফেরার সুযোগ দেয়া হলে ব্যাংক খাতের প্রতি জনগণের আস্থা আরও কমে যেতে পারে। এতে নতুন করে সংকট সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সরকারের আরও গভীরভাবে ভাবা উচিত। যদিও গভর্নর ব্যাংক মালিক-উদ্যোক্তাদের সঙ্গে বৈঠকে আশ্বস্ত করেছেন যে সংশোধিত আইনের শর্ত পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হলে সাবেক মালিকদের ফেরার সুযোগ হবে না। একই সঙ্গে পাঁচটি ব্যাংকের চলমান একীভূতকরণ প্রক্রিয়াও অব্যাহত থাকবে।
এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা প্রণয়নের আগে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত ছিল। তাহলে সিদ্ধান্তগুলো আরও গ্রহণযোগ্য ও কার্যকর হতো।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে ইতিহাসের অন্যতম চ্যালেঞ্জিং সময় অতিক্রম করছে। একদিকে খেলাপি ঋণের পাহাড়, অন্যদিকে মূলধন ও নিরাপত্তা সঞ্চিতির ঘাটতির তীব্র চাপ। এই টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্যেই ‘ব্যাংক রেজল্যুশন (সংশোধিত) আইন’ এবং এর বিশেষ কিছু ধারা নিয়ে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে ব্যাংক উদ্যোক্তাদের মধ্যে। বিশেষ করে, যারা একসময় ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ বা লুটপাট করে চলে গেছেন, আইনি ফাঁকফোকরে তাদের আবার মালিকানায় ফেরার সুযোগ থাকা নিয়ে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলো বাংলাদেশের আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। এমন সময়ে জবাবদিহির দুর্বলতা প্রকাশ পেলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ব্যাংকিং খাতের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বিএবি গভর্নরকে দেয়া চিঠিতে ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা ফেরাতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ও সংস্কার প্রস্তাব পেশ করেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ নিষ্পত্তির জন্য মালয়েশিয়া বা দক্ষিণ কোরিয়ার আদলে একটি পেশাদার ‘জাতীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি’ প্রতিষ্ঠা এবং অর্থঋণ আদালত আইন সংশোধন করে স্থগিতাদেশের অপব্যবহার রোধ ও ফাস্ট-ট্র্যাক রিকভারি বেঞ্চ চালু করা।
সংগঠনটি সংকটাপন্ন ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উৎসাহভাতা বন্ধ না করার অনুরোধ জানিয়েছে, যাতে দক্ষ জনবল ধরে রাখা সম্ভব হয়। ব্যাসেল-৩ অনুযায়ী মূলধন পর্যাপ্ততা বজায় রাখতে স্টক লভ্যাংশের ওপর অতিরিক্ত কর থেকে অব্যাহতি দাবি করেছে। পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় থাকা ব্যাংকগুলোকে সরাসরি ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে না পাঠিয়ে একটি বিশেষ ‘ট্রান্সফরমেশন ক্যাটাগরিতে রাখার প্রস্তাবও দিয়েছে।
বিএনপি সরকার একীভূত পাঁচ ব্যাংকের মালিকানা আবার পুরোনো মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার সুযোগ রেখে আইন তৈরি করেছে। এটি একটি ঐতিহাসিক ভুল সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
১৯৮২ সাল থেকে দেশে বেসরকারি মালিকানায় ব্যাংক স্থাপিত হতে শুরু করে। বর্তমানে বেসরকারি ব্যাংকের সংখ্যা প্রায় পঞ্চাশে পৌঁছেছে। বাংলাদেশে এখন মোট ব্যাংকের সংখ্যা ৬১। অর্থনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, দেশে এতগুলো ব্যাংকের প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজমের’ স্বার্থে অতীতের সরকারগুলো বিপুলসংখ্যক বেসরকারি ব্যাংকের লাইসেন্স দিয়েছে। বাংলাদেশের ৫৫ বছরে যেসব ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি ধনবান হয়েছেন, তাদের একটি বড় অংশ কোনো না কোনো ব্যাংকের মালিক বা পরিচালক। তারা নিজেদের ব্যাংক থেকে খুব বেশি ঋণ নিতে না পারলেও একে অন্যের ব্যাংক থেকে বিপুল ঋণ গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছেন। এভাবে তারা দেশের ব্যাংকঋণের ওপর প্রায় একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন। দেশের খেলাপি ঋণের বড় অংশ তাদের কাছেই আটকে রয়েছে।
বাংলাদেশের অধিকাংশ ধনকুবেরের ক্ষেত্রে অর্থনীতি ও রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন এবং ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষকতা একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। ব্যাংকের মালিকানা-বিতরণ ছিল সেই পৃষ্ঠপোষকতার অন্যতম মাধ্যম।
সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ মোট ব্যাংকঋণের বড় অংশ। এই বিপুল খেলাপি ঋণ উদ্ধারের বিষয়ে বর্তমান সরকার কতটা আন্তরিক, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, বিশেষ করে পুরনো মালিকদের ফেরার সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায়।
দেশের দুর্বল ও সংকটাপন্ন ব্যাংকিং খাতকে পুনরুদ্ধারের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল ‘ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’। এর মূল লক্ষ্য ছিল অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে পুনর্গঠন করা এবং দায়ীদের স্থায়ীভাবে মালিকানা থেকে অপসারণ করা। কিন্তু অধ্যাদেশকে আইনে রূপ দেয়ার সময় নতুন ধারা যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি বদলে গেছে।
সব মিলিয়ে নতুন আইনটি ব্যাংকিং খাতের সংস্কার প্রক্রিয়াকে কোন দিকে নিয়ে যাবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা ও বিতর্ক আরও জোরদার হয়েছে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্টদের মধ্যেও তীব্র সমালোচনা ও ক্ষোভ দেখা যাচ্ছে।
আগের অধ্যাদেশে যেখানে দায়ীদের জন্য কোনো ধরনের ছাড় ছিল না, সেখানে এখন কিস্তিতে মালিকানা ফিরে পাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। ফলে এটি ব্যাংক খাতে অনিয়ম ও লুটপাটে জড়িতদের জন্য এক ধরনের সুবিধা বা প্রণোদনা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
নতুন আইনের সম্ভাব্য সুবিধাভোগীদের নিয়ে ব্যাংকপাড়ায় ব্যাপক আলোচনা চলছে। খাতসংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা সতর্ক করে বলেছেন, একবার কোনো ব্যাংক সাবেক মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দিলে তা পুনরুদ্ধার করা কঠিন হবে। যাদের কারণে ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের হাতেই আবার নিয়ন্ত্রণ তুলে দেয়া সুশাসনের পরিপন্থী।
অতীতে যেসব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ ও ব্যাংককে মূলধন সংকটে ফেলার অভিযোগ রয়েছে, তারা যদি আবার নিয়ন্ত্রণে ফিরে আসে, তাহলে সাধারণ গ্রাহকদের আমানতের নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। এমনকি আতঙ্কিত হয়ে আমানতকারীরা অর্থ তুলে নেয়ার চেষ্টা করলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যাংক নয়, পুরো আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সাবেক মালিকরা পুনরায় নিয়ন্ত্রণে এলে ব্যাংকগুলোর পরিচালনা কাঠামো এবং আমানতকারীদের অর্থ ফেরত পাওয়ার বিষয়টিও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে। পাশাপাশি তাদের প্রত্যাবর্তন চলমান একীভূতকরণ প্রক্রিয়াকেও বিঘ্নিত করতে পারে।
যেসব ব্যক্তি আগে ব্যাংক থেকে অর্থ পাচার বা অনিয়মিত ঋণ গ্রহণের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তারা যদি সামান্য অংশ পরিশোধ করে আবার ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে ফিরতে পারেন, তবে তা আর্থিক খাতে দায়মুক্তির সংস্কৃতিকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে। এতে অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত হওয়ার বদলে দায়ীদের কার্যত পুরস্কৃত করা হবে এবং ব্যাংকিং খাতে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার]

আপনার মতামত লিখুন