আধুনিক যুগে যখন মুঠোফোন বা কম্পিউটারে মুহূর্তেই হিসাব কষা যায়, তখন কুষ্টিয়ার খোকসার এক দুর্গম চরের মানুষ এখনো পড়ে আছেন কয়েক শ বছরের পুরোনো এক ঐতিহ্যে। তাদের হিসাবের খাতা কোনো কাগজ বা ডিজিটাল ডিভাইস নয়, বরং এক টুকরো বাঁশের কঞ্চি। সেই কঞ্চিতে দাগ কেটেই চলে কোটি কোটি টাকার দুধ কেনাবেচা ও মহাজনের কাছ থেকে নেওয়া দাদনের হিসাব।
কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার আমবাড়িয়া ইউনিয়নের কণ্ঠগজরা চর। পদ্মা নদীর বুক চিরে জেগে ওঠা এই চরের প্রায় ২০০ পরিবার মূলত পশুপালনের ওপর নির্ভরশীল। প্রতিটি পরিবারই ১৫টি থেকে শুরু করে দুই-তিন শ পর্যন্ত গরু পালন করে। এখান থেকে প্রতিদিন কয়েক হাজার লিটার দুধ বাজারে যায়। কিন্তু বিস্ময়কর বিষয় হলো, দুধের পরিমাণ আর পাওনা টাকার পূর্ণাঙ্গ হিসাব রাখা হয় বাঁশের কঞ্চির গায়ে ছোট ছোট দাগ কেটে।
চরের বাসিন্দারা জানান, প্রতিটি গাভীর দুধের জন্য আলাদা কঞ্চি বা ‘স্কেল’ ব্যবহার করা হয়। এমনকি মহাজনের কাছ থেকে দাদন হিসেবে নেওয়া লাখ লাখ টাকার হিসাবও রাখা হয় একইভাবে। স্থানীয় কৃষক আকব্বর আলী বলেন, “বাপ-দাদাদের আমল থেকে এই পদ্ধতিতে আমরা হিসাব রাখছি। বাঁশের এই কঞ্চিই আমাদের ‘দুধের খাতা’। আজ পর্যন্ত হিসাব নিয়ে কারও সাথে কোনো গণ্ডগোল বা গড়মিল হয়নি।”
প্রতিদিন ভোরে চরে শুরু হয় দুধ সংগ্রহের ব্যস্ততা। বেলা ১০টা পর্যন্ত চলে দুধ সংগ্রহ আর ওজন করার কাজ। দুধ নিতে আসা ‘ঘোষ’ বা ব্যবসায়ীরা কঞ্চিতে দাগ দিয়ে হিসাব বুঝিয়ে দেন। চরের আমজাদ শেখ ও আহম্মদ আলীর পালের দুই-তিন শ গাভীর দুধের হিসাবও রাখা হয় এই চিরাচরিত প্রথায়।
জাতীয় অর্থনীতিতে এই চরের মানুষ বড় অবদান রাখলেও নাগরিক সুবিধা থেকে তারা এখনো বঞ্চিত। চরের কোথাও এক ইঞ্চি পাকা রাস্তা নেই। বর্ষাকালে মাটির রাস্তাগুলো কর্দমাক্ত ও পানিমগ্ন হয়ে পড়লে চলাফেরা দুষ্কর হয়ে ওঠে। তখন দুর্গম পথ পায়ে হেঁটে বা নৌকায় করে দুধ ও কৃষিপণ্য বাজারে নিতে হয়।
আমবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আকমল হোসেন বলেন, “পদ্মা অববাহিকার এই গ্রামগুলো থেকে বছরে কোটি কোটি টাকার দুধ বিক্রি হয়। কঞ্চিতে দাগ কাটা এই হিসাবের পদ্ধতিটি অদ্ভুত হলেও ভীষণ নির্ভরযোগ্য। শত বছরেও এই হিসাব নিয়ে কোনো দেনদরবার বা সালিশের প্রয়োজন পড়েনি।”
।

বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৯ জুন ২০২৬
আধুনিক যুগে যখন মুঠোফোন বা কম্পিউটারে মুহূর্তেই হিসাব কষা যায়, তখন কুষ্টিয়ার খোকসার এক দুর্গম চরের মানুষ এখনো পড়ে আছেন কয়েক শ বছরের পুরোনো এক ঐতিহ্যে। তাদের হিসাবের খাতা কোনো কাগজ বা ডিজিটাল ডিভাইস নয়, বরং এক টুকরো বাঁশের কঞ্চি। সেই কঞ্চিতে দাগ কেটেই চলে কোটি কোটি টাকার দুধ কেনাবেচা ও মহাজনের কাছ থেকে নেওয়া দাদনের হিসাব।
কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার আমবাড়িয়া ইউনিয়নের কণ্ঠগজরা চর। পদ্মা নদীর বুক চিরে জেগে ওঠা এই চরের প্রায় ২০০ পরিবার মূলত পশুপালনের ওপর নির্ভরশীল। প্রতিটি পরিবারই ১৫টি থেকে শুরু করে দুই-তিন শ পর্যন্ত গরু পালন করে। এখান থেকে প্রতিদিন কয়েক হাজার লিটার দুধ বাজারে যায়। কিন্তু বিস্ময়কর বিষয় হলো, দুধের পরিমাণ আর পাওনা টাকার পূর্ণাঙ্গ হিসাব রাখা হয় বাঁশের কঞ্চির গায়ে ছোট ছোট দাগ কেটে।
চরের বাসিন্দারা জানান, প্রতিটি গাভীর দুধের জন্য আলাদা কঞ্চি বা ‘স্কেল’ ব্যবহার করা হয়। এমনকি মহাজনের কাছ থেকে দাদন হিসেবে নেওয়া লাখ লাখ টাকার হিসাবও রাখা হয় একইভাবে। স্থানীয় কৃষক আকব্বর আলী বলেন, “বাপ-দাদাদের আমল থেকে এই পদ্ধতিতে আমরা হিসাব রাখছি। বাঁশের এই কঞ্চিই আমাদের ‘দুধের খাতা’। আজ পর্যন্ত হিসাব নিয়ে কারও সাথে কোনো গণ্ডগোল বা গড়মিল হয়নি।”
প্রতিদিন ভোরে চরে শুরু হয় দুধ সংগ্রহের ব্যস্ততা। বেলা ১০টা পর্যন্ত চলে দুধ সংগ্রহ আর ওজন করার কাজ। দুধ নিতে আসা ‘ঘোষ’ বা ব্যবসায়ীরা কঞ্চিতে দাগ দিয়ে হিসাব বুঝিয়ে দেন। চরের আমজাদ শেখ ও আহম্মদ আলীর পালের দুই-তিন শ গাভীর দুধের হিসাবও রাখা হয় এই চিরাচরিত প্রথায়।
জাতীয় অর্থনীতিতে এই চরের মানুষ বড় অবদান রাখলেও নাগরিক সুবিধা থেকে তারা এখনো বঞ্চিত। চরের কোথাও এক ইঞ্চি পাকা রাস্তা নেই। বর্ষাকালে মাটির রাস্তাগুলো কর্দমাক্ত ও পানিমগ্ন হয়ে পড়লে চলাফেরা দুষ্কর হয়ে ওঠে। তখন দুর্গম পথ পায়ে হেঁটে বা নৌকায় করে দুধ ও কৃষিপণ্য বাজারে নিতে হয়।
আমবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আকমল হোসেন বলেন, “পদ্মা অববাহিকার এই গ্রামগুলো থেকে বছরে কোটি কোটি টাকার দুধ বিক্রি হয়। কঞ্চিতে দাগ কাটা এই হিসাবের পদ্ধতিটি অদ্ভুত হলেও ভীষণ নির্ভরযোগ্য। শত বছরেও এই হিসাব নিয়ে কোনো দেনদরবার বা সালিশের প্রয়োজন পড়েনি।”
।

আপনার মতামত লিখুন