সংবাদ

এক হাত নেই, তবু কৃষকের ভরসা মফিজ


জেলা বার্তা পরিবেশক, ঝিনাইদহ
জেলা বার্তা পরিবেশক, ঝিনাইদহ
প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬, ০৮:৩৭ পিএম

এক হাত নেই, তবু কৃষকের ভরসা মফিজ
ঝিনাইদহে এক হাত হারানো উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মফিজ উদ্দিন মাঠে গিয়ে কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছেন। ছবি : সংবাদ

ভোরের কুয়াশা কাটতে না কাটতেই মোটরসাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন মফিজ উদ্দিন। গন্তব্য ঝিনাইদহ সদরের হলিধানী ব্লকের কোনো এক ফসলের মাঠ। সেখানে অপেক্ষায় থাকেন রোগাক্রান্ত ফসলের চিন্তায় ব্যাকুল কৃষকেরা। মফিজ উদ্দিনের ডান হাতটি নেই, ২০০৯ সালে এক সড়ক দুর্ঘটনায় সেটি হারিয়েছেন। তবে শারীরিক এই সীমাবদ্ধতা তার দায়িত্ব পালনে কখনো বাধা হতে পারেনি। বরং অদম্য মনোবল নিয়ে তিনি আজ হাজারো কৃষকের আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছেন।

মফিজ উদ্দিন ঝিনাইদহ সদর উপজেলার হলিধানী ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত। এই ব্লকের ৪ হাজার ৫৫৩ জন কৃষকের সরকারি কৃষিসেবা নিশ্চিত করার দায়িত্ব তার কাঁধে। স্থানীয় কৃষকদের কাছে মফিজ উদ্দিন মানেই বিপদের বন্ধু। ধান, গম বা সবজির মাঠে কোনো রোগ দেখা দিলে এক ফোন কলেই তিনি মোটরসাইকেল চালিয়ে হাজির হন খেতে।

ঝিনাইদহ সদর উপজেলার কালিচরণপুর ইউনিয়নের ছোট মান্দারবাড়িয়া গ্রামের মৃত আফসার উদ্দিন জোয়ার্দারের ছেলে মফিজ উদ্দিন। সাত ভাই ও দুই বোনের বড় সংসারে বেড়ে ওঠা মফিজের জীবন বদলে যায় ২০০৯ সালের ১১ জানুয়ারি। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অবস্থায় ট্রাকচাপায় তার ডান হাতটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে ২০১৩ সালে তিনি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন। ২০২২ সাল থেকে তিনি নিজ জেলা ঝিনাইদহে কর্মরত।

মাঠের কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মফিজ উদ্দিনের অফিস কোনো দালানকোঠা নয়, বরং কৃষকের মাঠ। কৃষক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘ধানের জমিতে রোগ দেখা দিলে মফিজ ভাইকে ফোন দিলেই চলে আসেন। এক হাত না থাকলেও কাজের ক্ষেত্রে তাঁকে কখনো দুর্বল মনে হয়নি।’

আরেক কৃষক আলামীন বলেন, ‘অনেক কর্মকর্তা অফিসে বসে থাকেন। কিন্তু মফিজ স্যার প্রতিদিন মাঠে থাকেন। তিনি আমাদের সমস্যাকে নিজের মনে করেন।’

নিজের জীবনযুদ্ধ নিয়ে মফিজ উদ্দিন বলেন, ‘দুর্ঘটনার পর অনেকেই ভেবেছিলেন আমি আর কিছু করতে পারব না। কিন্তু আমি বিশ্বাস করতাম, মানুষ চাইলে সব বাধা জয় করতে পারে। কৃষকদের জন্য কাজ করার ইচ্ছাটাই আমাকে শক্তি দেয়। কোনো কৃষকের ভালো ফলন হলে বা তার মুখে হাসি দেখলে আমি সবচেয়ে বড় পুরস্কার পাই।’

ঝিনাইদহ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নূর-এ-নবী বলেন, ‘মফিজ উদ্দিন অত্যন্ত দায়িত্বশীল ও পরিশ্রমী কর্মকর্তা। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তার কাজে কখনো বাধা হয়নি। তিনি কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক আস্থা অর্জন করেছেন।’

হাত হারিয়ে অনেকেই জীবনযুদ্ধে থেমে যান, কিন্তু মফিজ উদ্দিন প্রমাণ করেছেন মনোবল থাকলে এক হাত দিয়েই জয় করা যায় পৃথিবী। ঝিনাইদহের কৃষকদের কাছে তিনি আজ সাহস ও দায়িত্ববোধের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

রোববার, ১৪ জুন ২০২৬


এক হাত নেই, তবু কৃষকের ভরসা মফিজ

প্রকাশের তারিখ : ১৪ জুন ২০২৬

featured Image

ভোরের কুয়াশা কাটতে না কাটতেই মোটরসাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন মফিজ উদ্দিন। গন্তব্য ঝিনাইদহ সদরের হলিধানী ব্লকের কোনো এক ফসলের মাঠ। সেখানে অপেক্ষায় থাকেন রোগাক্রান্ত ফসলের চিন্তায় ব্যাকুল কৃষকেরা। মফিজ উদ্দিনের ডান হাতটি নেই, ২০০৯ সালে এক সড়ক দুর্ঘটনায় সেটি হারিয়েছেন। তবে শারীরিক এই সীমাবদ্ধতা তার দায়িত্ব পালনে কখনো বাধা হতে পারেনি। বরং অদম্য মনোবল নিয়ে তিনি আজ হাজারো কৃষকের আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছেন।

মফিজ উদ্দিন ঝিনাইদহ সদর উপজেলার হলিধানী ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত। এই ব্লকের ৪ হাজার ৫৫৩ জন কৃষকের সরকারি কৃষিসেবা নিশ্চিত করার দায়িত্ব তার কাঁধে। স্থানীয় কৃষকদের কাছে মফিজ উদ্দিন মানেই বিপদের বন্ধু। ধান, গম বা সবজির মাঠে কোনো রোগ দেখা দিলে এক ফোন কলেই তিনি মোটরসাইকেল চালিয়ে হাজির হন খেতে।

ঝিনাইদহ সদর উপজেলার কালিচরণপুর ইউনিয়নের ছোট মান্দারবাড়িয়া গ্রামের মৃত আফসার উদ্দিন জোয়ার্দারের ছেলে মফিজ উদ্দিন। সাত ভাই ও দুই বোনের বড় সংসারে বেড়ে ওঠা মফিজের জীবন বদলে যায় ২০০৯ সালের ১১ জানুয়ারি। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অবস্থায় ট্রাকচাপায় তার ডান হাতটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে ২০১৩ সালে তিনি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন। ২০২২ সাল থেকে তিনি নিজ জেলা ঝিনাইদহে কর্মরত।

মাঠের কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মফিজ উদ্দিনের অফিস কোনো দালানকোঠা নয়, বরং কৃষকের মাঠ। কৃষক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘ধানের জমিতে রোগ দেখা দিলে মফিজ ভাইকে ফোন দিলেই চলে আসেন। এক হাত না থাকলেও কাজের ক্ষেত্রে তাঁকে কখনো দুর্বল মনে হয়নি।’

আরেক কৃষক আলামীন বলেন, ‘অনেক কর্মকর্তা অফিসে বসে থাকেন। কিন্তু মফিজ স্যার প্রতিদিন মাঠে থাকেন। তিনি আমাদের সমস্যাকে নিজের মনে করেন।’

নিজের জীবনযুদ্ধ নিয়ে মফিজ উদ্দিন বলেন, ‘দুর্ঘটনার পর অনেকেই ভেবেছিলেন আমি আর কিছু করতে পারব না। কিন্তু আমি বিশ্বাস করতাম, মানুষ চাইলে সব বাধা জয় করতে পারে। কৃষকদের জন্য কাজ করার ইচ্ছাটাই আমাকে শক্তি দেয়। কোনো কৃষকের ভালো ফলন হলে বা তার মুখে হাসি দেখলে আমি সবচেয়ে বড় পুরস্কার পাই।’

ঝিনাইদহ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নূর-এ-নবী বলেন, ‘মফিজ উদ্দিন অত্যন্ত দায়িত্বশীল ও পরিশ্রমী কর্মকর্তা। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তার কাজে কখনো বাধা হয়নি। তিনি কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক আস্থা অর্জন করেছেন।’

হাত হারিয়ে অনেকেই জীবনযুদ্ধে থেমে যান, কিন্তু মফিজ উদ্দিন প্রমাণ করেছেন মনোবল থাকলে এক হাত দিয়েই জয় করা যায় পৃথিবী। ঝিনাইদহের কৃষকদের কাছে তিনি আজ সাহস ও দায়িত্ববোধের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত