দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ ফুরিয়ে আসছে। সোমবার (২২ জুন) জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ি, দেশে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুদ আছে ৭ দশমিক ৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ)।
একজন সংসদ সদস্যের (এমপি) প্রশ্নের জবাবে জ্বালানিমন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের বর্তমান চাহিদা দৈনিক প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। চাহিদার বিপরীতে সরবরাহের পরিমান দৈনিক ২ হাজার ৬৫৪ মিলিয়ন ঘনফুট। ঘাটতির পরিমান দৈনিক প্রায় ১ হাজার ১৪৬ মিলিয়ন ঘনফুট।
মজুদ গ্যাসে কতদিন চলবে এ তথ্য পাওয়া না গেলও মন্ত্রীর দেওয়া পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গ্যাসের উত্তোলনযোগ্য মজুদ যতটুকু, তাতে প্রায় ৮ বছর (৭ বছর ১০ মাসের মতো) চলবে। এদিন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদে প্রশ্নোত্তর টেবিলে উপস্থাপিত হয়।
সাতক্ষীরা-২ আসনের এমপি মুহাম্মদ আব্দুল খালেকের প্রশ্নের জবাবে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে গত সাড়ে তিন মাসে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) ১৭ হাজার ৩৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলা শুরু হয়। ইরানও ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে স্থাপিত মার্কিন ঘাঁটিতে পল্টা হামলা শুরু করে। শুরু হয় মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ।
বিপিসির লোকসান
ওই যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার কথা উল্লে করে মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, “মে মাস থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কিছুটা কমতে শুরু করেছে। এর পরও দেশীয় বাজারের তুলনায় বেশি। জুন মাসে প্রতি লিটার ডিজেলের খরচ ১৭৫ টাকা ২২ পয়সা, অকটনের খরচ ১৬০ টাকা ৭০ টাকা পয়সা। তবে সরকার জনস্বার্থে ডিজেলের দাম বাড়ায়নি। পেট্রোল, অকটেনের দাম লিটারে ৫ টাকা বৃদ্ধির পরও বিপিসি দৈনিক প্রায় ৭৮ কোটি টাকা লোকসান দিতে হচ্ছে।”
জ্বালানি মন্ত্রী আরও বলেন, “আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে অনেক কমে দেশে জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণ করায় লোকসান সত্ত্বেও বিপিসি নিজস্ব তহবিল দিয়ে তিন মাস ধরে আমদানি কার্যক্রম সচল রেখে চলেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে দেশের বাজারেও জ্বালানির দাম হ্রাস বিবেচনা করা হবে।”
কয়লা শুধু বড়পুকুরিয়া থেকে
সংরক্ষিত নারী আসনের এমপিসেলিনা সুলতানার প্রশ্নে জ্বালানি মন্ত্রী বলেন, “দেশে এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত কয়লা ক্ষেত্র পাঁচটি। বড়পুকুরিয়া, ফুলবাড়ি, দিঘীপাড়া, খালাসীপাড়া ও জামালগঞ্জ। এর মধ্যে শুধুমাত্র বড়পুকুরিযা কয়লাক্ষেত্র থেকে ২০০৫ সাল থেকে বাণিজ্যিকভাবে কয়লা উত্তোলন করা হচ্ছে। ফুলবাড়ী ও দিঘীপাড়া কয়লাক্ষেত্রের সমীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে।”
নরসিংদী-৫ আসনের এমপি মো. আশরাফ উদ্দিনের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, “তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সহজলভ্য হওয়ায় আবাসিক খাতে নতুন গ্যাস সংযোগ চালুর আপাতত কোনো পরিকল্পনা নেই সরকারের। এলএনজি ঘাটতি থাকায় ২০২৫ সালের ২৩ জুলাই থেকে বিদ্যুৎ, সার ও বিশেষায়িত শিল্পাঞ্চল ব্যতীত আবাসিক, বাণিজ্যিক ও সিএনজি শ্রেণিতে নতুন গ্যাস সংযোগ প্রদান স্থগিত রাখা হয়েছে।”
সিরাজগঞ্জ-১ আসনের সদস্য মো. সেলিম রেজার প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, সচল ১৩৭টি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা ২৯ হাজার ৫৯৩ মেগাওয়াট।
চট্টগ্রাম-১৫ আসনের এমপি শাহাজাহান চৌধুরীর প্রশ্নে জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, “সব কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র অবসরে পাঠানো হয়েছে। সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালার মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস্য থেকে সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে।”
গ্যাসের মজুত ৭.৬৩ টিসিএফ
মেহেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. তাজউদ্দীন খানের প্রশ্নের জবাবে ইকবাল হাসান বলেন, “২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশের উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুতের পরিমাণ ছিল ৭ দশমিক ৬৩ টিসিএফ (ট্রিলিয়ন ঘনফুট)।”
মন্ত্রী বলেন, আটটি গ্রাহক শ্রেণির অনুমোদিত গ্যাস লোডের ভিত্তিতে বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত গড়ে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ ছিল প্রায় ২ হাজার ৬৫৪ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ১৪৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি রয়ে গেছে।
ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বলেও তিনি সংসদকে জানান।
দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধির কর্মসূচির আওতায় ২০৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, এর মধ্যে ইতোমধ্যে ২৮টি কূপে খনন ও ওয়ার্কওভার কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। তিনি জানান, অবশিষ্ট কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য মন্ত্রণালয়, পেট্রোবাংলা এবং সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
নতুন সম্ভাব্য গ্যাসক্ষেত্র চিহ্নিত করতে চলমান সিসমিক জরিপ কার্যক্রমের বিষয়েও তিনি আলোকপাত করেন। মন্ত্রী বলেন, ব্লক-৭ ও ব্লক-৯ এলাকায় প্রায় ৪ হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার দ্বিমাত্রিক (২ডি) সিসমিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে এবং বর্তমানে এসব তথ্য প্রক্রিয়াকরণের কাজ চলছে। এছাড়া হবিগঞ্জ, বাখরাবাদ ও মেঘনা গ্যাসক্ষেত্রের আশপাশে ১ হাজার ৪৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে ত্রিমাত্রিক (৩ডি) সিসমিক জরিপ শিগগিরই শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ইকবাল হাসান মাহমুদ আরো জানান, ভোলার চরফ্যাশন এলাকায় ৬৬০ বর্গকিলোমিটার, জামালপুরে ৬৫০ বর্গকিলোমিটার, তিতাস, হবিগঞ্জ ও নরসিংদী গ্যাসক্ষেত্র সংলগ্ন এলাকায় ৬৩২ বর্গকিলোমিটার এবং লামিগাঁও, লালাবাজার, গোয়াইনঘাট, কৈলাশটিলা দক্ষিণ ও ফেঞ্চুগঞ্জ পশ্চিম গ্যাসক্ষেত্র সংলগ্ন কাঠামোতে ৮৮২ বর্গকিলোমিটার এলাকায় আরো ৩ডি সিসমিক জরিপের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অনুসন্ধান প্রতিষ্ঠান বাপেক্স-কে শক্তিশালী করার অংশ হিসেবে ২ হাজার এবং ১ হাজার ৫০০ হর্স পাওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন দু’টি নতুন ড্রিলিং রিগ ক্রয়ের কার্যক্রমও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
জ্বালানি মন্ত্রী আরো বলেন, ভোলায় আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্রগুলোকে জাতীয় গ্যাস গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত করার লক্ষ্যে ভোলা-বরিশাল-জাজিরা-মাওয়া-আমিনবাজার গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণের নীতিগত সিদ্ধান্ত সরকার গ্রহণ করেছে এবং এ লক্ষ্যে বাস্তবায়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
৩৪৫৭টি সোলার ইরিগেশন
শেরপুর-২ আসনের এমপি মোহাম্মদ ফাহিম চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে জ্বালানি মন্ত্রী জানান, কৃষি খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং পরিবেশবান্ধব সেচ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে দেশে বর্তমানে ৩ হাজার ৪৫৭টি সোলার ইরিগেশন (সৌরচালিত সেচ ব্যবস্থা) স্থাপন করা হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি), বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ), পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (আরডিএ) এবং বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (বাপবিবো)-এর বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় এসব সৌরচালিত সেচ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। তিনি জানান, কৃষি উৎপাদন ব্যয় কমানো, ডিজেলের ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাস এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার সোলার সেচ পাম্প স্থাপনে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।
মন্ত্রী বলেন, কৃষিখাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং টেকসই সেচ ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।

বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২২ জুন ২০২৬
দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ ফুরিয়ে আসছে। সোমবার (২২ জুন) জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ি, দেশে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুদ আছে ৭ দশমিক ৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ)।
একজন সংসদ সদস্যের (এমপি) প্রশ্নের জবাবে জ্বালানিমন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের বর্তমান চাহিদা দৈনিক প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। চাহিদার বিপরীতে সরবরাহের পরিমান দৈনিক ২ হাজার ৬৫৪ মিলিয়ন ঘনফুট। ঘাটতির পরিমান দৈনিক প্রায় ১ হাজার ১৪৬ মিলিয়ন ঘনফুট।
মজুদ গ্যাসে কতদিন চলবে এ তথ্য পাওয়া না গেলও মন্ত্রীর দেওয়া পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গ্যাসের উত্তোলনযোগ্য মজুদ যতটুকু, তাতে প্রায় ৮ বছর (৭ বছর ১০ মাসের মতো) চলবে। এদিন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদে প্রশ্নোত্তর টেবিলে উপস্থাপিত হয়।
সাতক্ষীরা-২ আসনের এমপি মুহাম্মদ আব্দুল খালেকের প্রশ্নের জবাবে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে গত সাড়ে তিন মাসে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) ১৭ হাজার ৩৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলা শুরু হয়। ইরানও ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে স্থাপিত মার্কিন ঘাঁটিতে পল্টা হামলা শুরু করে। শুরু হয় মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ।
বিপিসির লোকসান
ওই যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার কথা উল্লে করে মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, “মে মাস থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কিছুটা কমতে শুরু করেছে। এর পরও দেশীয় বাজারের তুলনায় বেশি। জুন মাসে প্রতি লিটার ডিজেলের খরচ ১৭৫ টাকা ২২ পয়সা, অকটনের খরচ ১৬০ টাকা ৭০ টাকা পয়সা। তবে সরকার জনস্বার্থে ডিজেলের দাম বাড়ায়নি। পেট্রোল, অকটেনের দাম লিটারে ৫ টাকা বৃদ্ধির পরও বিপিসি দৈনিক প্রায় ৭৮ কোটি টাকা লোকসান দিতে হচ্ছে।”
জ্বালানি মন্ত্রী আরও বলেন, “আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে অনেক কমে দেশে জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণ করায় লোকসান সত্ত্বেও বিপিসি নিজস্ব তহবিল দিয়ে তিন মাস ধরে আমদানি কার্যক্রম সচল রেখে চলেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে দেশের বাজারেও জ্বালানির দাম হ্রাস বিবেচনা করা হবে।”
কয়লা শুধু বড়পুকুরিয়া থেকে
সংরক্ষিত নারী আসনের এমপিসেলিনা সুলতানার প্রশ্নে জ্বালানি মন্ত্রী বলেন, “দেশে এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত কয়লা ক্ষেত্র পাঁচটি। বড়পুকুরিয়া, ফুলবাড়ি, দিঘীপাড়া, খালাসীপাড়া ও জামালগঞ্জ। এর মধ্যে শুধুমাত্র বড়পুকুরিযা কয়লাক্ষেত্র থেকে ২০০৫ সাল থেকে বাণিজ্যিকভাবে কয়লা উত্তোলন করা হচ্ছে। ফুলবাড়ী ও দিঘীপাড়া কয়লাক্ষেত্রের সমীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে।”
নরসিংদী-৫ আসনের এমপি মো. আশরাফ উদ্দিনের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, “তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সহজলভ্য হওয়ায় আবাসিক খাতে নতুন গ্যাস সংযোগ চালুর আপাতত কোনো পরিকল্পনা নেই সরকারের। এলএনজি ঘাটতি থাকায় ২০২৫ সালের ২৩ জুলাই থেকে বিদ্যুৎ, সার ও বিশেষায়িত শিল্পাঞ্চল ব্যতীত আবাসিক, বাণিজ্যিক ও সিএনজি শ্রেণিতে নতুন গ্যাস সংযোগ প্রদান স্থগিত রাখা হয়েছে।”
সিরাজগঞ্জ-১ আসনের সদস্য মো. সেলিম রেজার প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, সচল ১৩৭টি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা ২৯ হাজার ৫৯৩ মেগাওয়াট।
চট্টগ্রাম-১৫ আসনের এমপি শাহাজাহান চৌধুরীর প্রশ্নে জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, “সব কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র অবসরে পাঠানো হয়েছে। সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালার মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস্য থেকে সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে।”
গ্যাসের মজুত ৭.৬৩ টিসিএফ
মেহেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. তাজউদ্দীন খানের প্রশ্নের জবাবে ইকবাল হাসান বলেন, “২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশের উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুতের পরিমাণ ছিল ৭ দশমিক ৬৩ টিসিএফ (ট্রিলিয়ন ঘনফুট)।”
মন্ত্রী বলেন, আটটি গ্রাহক শ্রেণির অনুমোদিত গ্যাস লোডের ভিত্তিতে বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত গড়ে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ ছিল প্রায় ২ হাজার ৬৫৪ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ১৪৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি রয়ে গেছে।
ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বলেও তিনি সংসদকে জানান।
দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধির কর্মসূচির আওতায় ২০৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, এর মধ্যে ইতোমধ্যে ২৮টি কূপে খনন ও ওয়ার্কওভার কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। তিনি জানান, অবশিষ্ট কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য মন্ত্রণালয়, পেট্রোবাংলা এবং সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
নতুন সম্ভাব্য গ্যাসক্ষেত্র চিহ্নিত করতে চলমান সিসমিক জরিপ কার্যক্রমের বিষয়েও তিনি আলোকপাত করেন। মন্ত্রী বলেন, ব্লক-৭ ও ব্লক-৯ এলাকায় প্রায় ৪ হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার দ্বিমাত্রিক (২ডি) সিসমিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে এবং বর্তমানে এসব তথ্য প্রক্রিয়াকরণের কাজ চলছে। এছাড়া হবিগঞ্জ, বাখরাবাদ ও মেঘনা গ্যাসক্ষেত্রের আশপাশে ১ হাজার ৪৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে ত্রিমাত্রিক (৩ডি) সিসমিক জরিপ শিগগিরই শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ইকবাল হাসান মাহমুদ আরো জানান, ভোলার চরফ্যাশন এলাকায় ৬৬০ বর্গকিলোমিটার, জামালপুরে ৬৫০ বর্গকিলোমিটার, তিতাস, হবিগঞ্জ ও নরসিংদী গ্যাসক্ষেত্র সংলগ্ন এলাকায় ৬৩২ বর্গকিলোমিটার এবং লামিগাঁও, লালাবাজার, গোয়াইনঘাট, কৈলাশটিলা দক্ষিণ ও ফেঞ্চুগঞ্জ পশ্চিম গ্যাসক্ষেত্র সংলগ্ন কাঠামোতে ৮৮২ বর্গকিলোমিটার এলাকায় আরো ৩ডি সিসমিক জরিপের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অনুসন্ধান প্রতিষ্ঠান বাপেক্স-কে শক্তিশালী করার অংশ হিসেবে ২ হাজার এবং ১ হাজার ৫০০ হর্স পাওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন দু’টি নতুন ড্রিলিং রিগ ক্রয়ের কার্যক্রমও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
জ্বালানি মন্ত্রী আরো বলেন, ভোলায় আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্রগুলোকে জাতীয় গ্যাস গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত করার লক্ষ্যে ভোলা-বরিশাল-জাজিরা-মাওয়া-আমিনবাজার গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণের নীতিগত সিদ্ধান্ত সরকার গ্রহণ করেছে এবং এ লক্ষ্যে বাস্তবায়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
৩৪৫৭টি সোলার ইরিগেশন
শেরপুর-২ আসনের এমপি মোহাম্মদ ফাহিম চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে জ্বালানি মন্ত্রী জানান, কৃষি খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং পরিবেশবান্ধব সেচ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে দেশে বর্তমানে ৩ হাজার ৪৫৭টি সোলার ইরিগেশন (সৌরচালিত সেচ ব্যবস্থা) স্থাপন করা হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি), বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ), পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (আরডিএ) এবং বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (বাপবিবো)-এর বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় এসব সৌরচালিত সেচ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। তিনি জানান, কৃষি উৎপাদন ব্যয় কমানো, ডিজেলের ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাস এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার সোলার সেচ পাম্প স্থাপনে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।
মন্ত্রী বলেন, কৃষিখাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং টেকসই সেচ ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।

আপনার মতামত লিখুন