মাদকদ্রব্য, ধূমপান ও তামাক সেবন মানুষের অকাল মৃত্যু এবং স্বাস্থ্যহানীর অন্যতম প্রধান কারণ। মাদকাসক্তি একটি রোগ। মাদকাসক্ত ব্যক্তির আসক্তি তাকে মানসিক ও শারীরিক রোগসহ বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সৃষ্টি করে। আমাদের তরুণ প্রজন্ম মাদকের নেশায় বুদ হয়ে বিপথগামী হয়ে পড়ছে। বর্তমানে বাংলাদেশের বড় অংশের জনগোষ্ঠী কিশোর-তরুণ, যে কারণে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীকে বলা হয় ইয়ুথ ডিভিডেন্ট। বেসরকারি হিসেব মতে, দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা প্রায় ৮০ লাখ। মাদকসেবীদের অধিকাংশই বয়সে তরুণ। ভয়ঙ্কর তথ্য হচ্ছে, ইয়াবা সেবনকারী শতকরা ৮৫ ভাগই তরুণ যুবসমাজ! আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ এ সংখ্যা ১ কোটি ছাড়িয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের বিভিন্ন রোগের মতো এইচআইভি এইডসের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা মাদক গ্রহণকালীন সময়ে অনিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন ও ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ।
গবেষণায় দেখা যায়, মাদকাসক্তদের মধ্যে শতকরা ৯৮ ভাগই ধূমপায়ী এবং তাদের মধ্যে শতকরা ৬০ ভাগ বিভিন্ন অপরাধ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত, যা গবেষণায় প্রমাণিত। ধূমপানে অভ্যস্ততার মধ্য দিয়ে তরুণরা মাদকদ্রব্য সেবন শুরু করে থাকে। পরবর্তীতে ইয়াবা, ফেনসিডিল, সিসা, হেরোইন, কোকেন, আফিম, কোডিন, মরফিন, এলএসডিসহ বিভিন্ন মরণ নেশায় আসক্ত হয়। ক্রমাš^য়ে মাদকাসক্তরা কিডনি, লিভার, মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কাজকর্ম নষ্ট হয়ে যাওয়ার মতো জটিল রোগে আক্রান্ত হয়। এটা অনস্বীকার্য যে, তরুণদের মাদকের করাল গ্রাস থেকে বাঁচাতে হলে মাদক নিয়ন্ত্রণের কোনো বিকল্প নাই। সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে ও স্বাস্থ্যকর জীবনের জন্য তরুণদের ধূমপান, মাদকসহ সব নেশা থেকে দূরে থাকা জরুরি। কিন্তু, বিভিন্ন পদক্ষেপ স্বত্ত্বেও থেমে নেই সর্বণাশা মাদকের বিস্তার। মাদকের সঙ্গে জড়িত অসাধু চক্র আমাদের যুবসমাজকে ধ্বংসের দারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে।
মাদক নির্মূল কার্যক্রম বাস্তবায়নে সমন্বিত প্রতিরোধ কার্যক্রম বাস্তবায়ন জরুরি। যেখানে মনোসামাজিক, নৈতিক ও সামাজিকরণ শিক্ষা প্রদান এর বিষয়সমূহ সর্বস্তরে পরিচালনার উদ্যেগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। মাদকাসক্তির চিকিৎসা: মাদক শব্দটি শুনলে বেশিরভাগ মানুষই বিচলিত হয় বা ভয় পায়, আর মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের ঘৃণা ও নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে থাকেন। মাদকাসক্ত ব্যক্তিদেরকে শাষণ, ঘৃণা বা অবহেলা না করে তাকে স্নেহ ভালোবাসা দিয়ে নিরাময় কেন্দ্রে পরিপূর্ণ চিকিৎসা দেয়া জরুরি। যাতে তারা সমাজের বোঝা না হয়ে সুস্থ হয়ে আবার পরিবারে ফিরে আসতে পারে। তাই পিতা-মাতার প্রতি অনুরোধ আপনার সন্তানকে মাদকাসক্ত হওয়ার কারণে লুকিয়ে রাখবেন না, ঘৃণা করবেন না বরং তাকে স্নেহ ভালোবাসা দিয়ে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে নিয়ে যান। তাকে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা দিন। সঠিক চিকিৎসা সহায়তা পাওয়ার মাধ্যমে সুস্থ হয়ে একদিন তারাই সমাজকে সঠিক পথে পরিচালিত করবে। একই সঙ্গে মাদকাসক্তি প্রতিরোধে চাহিদা, সরবরাহ কমানোর সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা ও পূণর্বাসনকেও সমানভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। সামাজিক মাধ্যমে নজরদারি: বাংলাদেশে সামাজিক মাধ্যসমূহে মাদকদ্রব্য বিক্রি, কৌশলী প্রচার ও ক্রেতা আকর্ষণের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
তাই মাদকের বিস্তার রোধে সামাজিক মাধ্যমে কঠোর নজরদারি জোরদার করা জরুরি। এ লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সাইবার সক্ষমতা বৃদ্ধি, মাদকসংক্রান্ত পোস্ট, পেজ, গ্রুপ ও অ্যাকাউন্ট দ্রুত শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সংশ্লিষ্ট সামাজিক মাধ্যম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের (যেমন: বিটিআরসি, আইসিটি বিভাগ, সাইবার নিরাপত্তা) সঙ্গে সমš^য় জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে অনলাইনে মাদক বিক্রির কলা- কৌশল ও ডার্কয়েব ইত্যাদি শনাক্তে প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণ সক্রিয় করা প্রয়োজন। পাশাপাশি তরুণদের মধ্যে মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতামূলক প্রচারণা বৃদ্ধি, বেআইনি অনলাইন কার্যক্রম রিপোর্ট করার ব্যবস্থা চালু এবং সাইবার অপরাধ দমনে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। করণীয়: কিশোর-তরুণ প্রজন্মকে মাদকমুক্ত রাখতে শক্তিশালী প্রতিরোধ কার্যক্রম জরুরি। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, ‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিওর’ অর্থাৎ- চিকিৎসার চাইতে প্রতিরোধ ভালো।
এটা যদিও স্বাস্থ্যগত অসুখ ও তার চিকিৎসা এবং রোগ প্রতিরোধকে বুঝায় ও একই পদ্ধতি ব্যবহার করে মাদকাসক্তি সমস্যা মোকাবিলা ও তার সুষ্ঠু সমাধানের দিকে এগিয়ে যাওয়াই ভালো। বেকারত্ব, দারিদ্র্য, সামাজিক অস্থিরতা, মাদকের বিস্তার, সামাজিক অবক্ষয় এবং শিক্ষার মানের অবনতিসহ বিভিন্ন কারণে মানুষের মধ্যে হতাশা ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় মাদকের উৎপাদন, পাচার ও অবৈধ ব্যবসার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি তরুণদের জন্য সুস্থ সাংস্কৃতিক ও বিনোদনমূলক পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কারণ, মাদকাসক্তি শুধু ব্যক্তির স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না, বরং অনেককে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তেও প্ররোচিত করে। তাই মাদকের বিস্তার কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা গেলে সামাজিক অপরাধ হ্রাস এবং নিরাপদ সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব।
পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব আমাদের সন্তান ও ভবিষ্যত প্রজন্মকে সঠিকভাবে পথ- নির্দেশনা দিয়ে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। সমাজে অনেক প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি আছে যারা স্ব উদ্যোগে এ বিষয়ে কাজ করছে। সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয় এবং সুনির্দিষ্ট দপ্তর আছে যারা তরুণদের উন্নয়নে অঙ্গীকারাবদ্ধ। কাজ হচ্ছে তবে ভয় জেঁকে বসছে। মাদক জোঁকের মতো জেকে বসেছে তরুণদের দেহে। যদি এই জোঁকের পাল থেকে তরুণদের রক্ষা করা না যায় তাহলেই সর্বণাশ। যে বৈষম্যহীন সমাজ ও নতুন বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেরাব কথা আমারে তরুণদের, তারাই পথভ্রষ্ট হয়ে যাবে। আগামীর বাংলাদেশ পগড়ে ঘোরতর অমানিশায়, অনিশ্চয়তায়! দেশ থেকে মাদকের বিস্তার রোধে শক্তিশালী সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশের পাশাপাশি সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ হলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে মাদক পাচার ও সরবরাহ চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ও কার্যকর অভিযান পরিচালনা করা। মাদক পাচার ও ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি, গোষ্ঠী এবং নেটওয়ার্ককে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে মাদক কারবারের অর্থনৈতিক ও সাংগঠনিক ভিত্তি ভেঙে দিয়ে এর নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করতে হবে। মাদকাসক্তির চিকিৎসায় সরকারকে আরও বিনিয়োগ করতে হবে। বর্তমানে সারা দেশে সরকারিভাবে ৬টি বেসরকারিভাবে ৩৮০টি মাদকনিরাময় কেন্দ্র রয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক মানসম্মত পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা এবং বিদ্যমান সেবার সক্ষমতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। এসব কেন্দ্রে শুধু মাদক থেকে বিরত রাখাই নয়, বরং পরিকল্পিত পুনর্বাসন কর্মসূচির মাধ্যমে নৈতিক শিক্ষা, মানসিক সহায়তা, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। পাশাপাশি, বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর জন্য নিজ নিজ ধর্মীয় মূল্যবোধের আলোকে কাউন্সেলিং ও নৈতিক দিকনির্দেশনার সুযোগ নিশ্চিত করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে পুনর্বাসিত ব্যক্তিরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসে সমাজ ও রাষ্ট্রে দায়িত্বশীল ও উৎপাদনশীল নাগরিক হিসেবে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবেন।
[লেখক: সদস্য, জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ টাস্কফোর্স কমিটি (স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়)]

শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ জুন ২০২৬
মাদকদ্রব্য, ধূমপান ও তামাক সেবন মানুষের অকাল মৃত্যু এবং স্বাস্থ্যহানীর অন্যতম প্রধান কারণ। মাদকাসক্তি একটি রোগ। মাদকাসক্ত ব্যক্তির আসক্তি তাকে মানসিক ও শারীরিক রোগসহ বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সৃষ্টি করে। আমাদের তরুণ প্রজন্ম মাদকের নেশায় বুদ হয়ে বিপথগামী হয়ে পড়ছে। বর্তমানে বাংলাদেশের বড় অংশের জনগোষ্ঠী কিশোর-তরুণ, যে কারণে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীকে বলা হয় ইয়ুথ ডিভিডেন্ট। বেসরকারি হিসেব মতে, দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা প্রায় ৮০ লাখ। মাদকসেবীদের অধিকাংশই বয়সে তরুণ। ভয়ঙ্কর তথ্য হচ্ছে, ইয়াবা সেবনকারী শতকরা ৮৫ ভাগই তরুণ যুবসমাজ! আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ এ সংখ্যা ১ কোটি ছাড়িয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের বিভিন্ন রোগের মতো এইচআইভি এইডসের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা মাদক গ্রহণকালীন সময়ে অনিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন ও ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ।
গবেষণায় দেখা যায়, মাদকাসক্তদের মধ্যে শতকরা ৯৮ ভাগই ধূমপায়ী এবং তাদের মধ্যে শতকরা ৬০ ভাগ বিভিন্ন অপরাধ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত, যা গবেষণায় প্রমাণিত। ধূমপানে অভ্যস্ততার মধ্য দিয়ে তরুণরা মাদকদ্রব্য সেবন শুরু করে থাকে। পরবর্তীতে ইয়াবা, ফেনসিডিল, সিসা, হেরোইন, কোকেন, আফিম, কোডিন, মরফিন, এলএসডিসহ বিভিন্ন মরণ নেশায় আসক্ত হয়। ক্রমাš^য়ে মাদকাসক্তরা কিডনি, লিভার, মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কাজকর্ম নষ্ট হয়ে যাওয়ার মতো জটিল রোগে আক্রান্ত হয়। এটা অনস্বীকার্য যে, তরুণদের মাদকের করাল গ্রাস থেকে বাঁচাতে হলে মাদক নিয়ন্ত্রণের কোনো বিকল্প নাই। সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে ও স্বাস্থ্যকর জীবনের জন্য তরুণদের ধূমপান, মাদকসহ সব নেশা থেকে দূরে থাকা জরুরি। কিন্তু, বিভিন্ন পদক্ষেপ স্বত্ত্বেও থেমে নেই সর্বণাশা মাদকের বিস্তার। মাদকের সঙ্গে জড়িত অসাধু চক্র আমাদের যুবসমাজকে ধ্বংসের দারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে।
মাদক নির্মূল কার্যক্রম বাস্তবায়নে সমন্বিত প্রতিরোধ কার্যক্রম বাস্তবায়ন জরুরি। যেখানে মনোসামাজিক, নৈতিক ও সামাজিকরণ শিক্ষা প্রদান এর বিষয়সমূহ সর্বস্তরে পরিচালনার উদ্যেগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। মাদকাসক্তির চিকিৎসা: মাদক শব্দটি শুনলে বেশিরভাগ মানুষই বিচলিত হয় বা ভয় পায়, আর মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের ঘৃণা ও নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে থাকেন। মাদকাসক্ত ব্যক্তিদেরকে শাষণ, ঘৃণা বা অবহেলা না করে তাকে স্নেহ ভালোবাসা দিয়ে নিরাময় কেন্দ্রে পরিপূর্ণ চিকিৎসা দেয়া জরুরি। যাতে তারা সমাজের বোঝা না হয়ে সুস্থ হয়ে আবার পরিবারে ফিরে আসতে পারে। তাই পিতা-মাতার প্রতি অনুরোধ আপনার সন্তানকে মাদকাসক্ত হওয়ার কারণে লুকিয়ে রাখবেন না, ঘৃণা করবেন না বরং তাকে স্নেহ ভালোবাসা দিয়ে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে নিয়ে যান। তাকে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা দিন। সঠিক চিকিৎসা সহায়তা পাওয়ার মাধ্যমে সুস্থ হয়ে একদিন তারাই সমাজকে সঠিক পথে পরিচালিত করবে। একই সঙ্গে মাদকাসক্তি প্রতিরোধে চাহিদা, সরবরাহ কমানোর সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা ও পূণর্বাসনকেও সমানভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। সামাজিক মাধ্যমে নজরদারি: বাংলাদেশে সামাজিক মাধ্যসমূহে মাদকদ্রব্য বিক্রি, কৌশলী প্রচার ও ক্রেতা আকর্ষণের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
তাই মাদকের বিস্তার রোধে সামাজিক মাধ্যমে কঠোর নজরদারি জোরদার করা জরুরি। এ লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সাইবার সক্ষমতা বৃদ্ধি, মাদকসংক্রান্ত পোস্ট, পেজ, গ্রুপ ও অ্যাকাউন্ট দ্রুত শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সংশ্লিষ্ট সামাজিক মাধ্যম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের (যেমন: বিটিআরসি, আইসিটি বিভাগ, সাইবার নিরাপত্তা) সঙ্গে সমš^য় জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে অনলাইনে মাদক বিক্রির কলা- কৌশল ও ডার্কয়েব ইত্যাদি শনাক্তে প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণ সক্রিয় করা প্রয়োজন। পাশাপাশি তরুণদের মধ্যে মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতামূলক প্রচারণা বৃদ্ধি, বেআইনি অনলাইন কার্যক্রম রিপোর্ট করার ব্যবস্থা চালু এবং সাইবার অপরাধ দমনে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। করণীয়: কিশোর-তরুণ প্রজন্মকে মাদকমুক্ত রাখতে শক্তিশালী প্রতিরোধ কার্যক্রম জরুরি। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, ‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিওর’ অর্থাৎ- চিকিৎসার চাইতে প্রতিরোধ ভালো।
এটা যদিও স্বাস্থ্যগত অসুখ ও তার চিকিৎসা এবং রোগ প্রতিরোধকে বুঝায় ও একই পদ্ধতি ব্যবহার করে মাদকাসক্তি সমস্যা মোকাবিলা ও তার সুষ্ঠু সমাধানের দিকে এগিয়ে যাওয়াই ভালো। বেকারত্ব, দারিদ্র্য, সামাজিক অস্থিরতা, মাদকের বিস্তার, সামাজিক অবক্ষয় এবং শিক্ষার মানের অবনতিসহ বিভিন্ন কারণে মানুষের মধ্যে হতাশা ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় মাদকের উৎপাদন, পাচার ও অবৈধ ব্যবসার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি তরুণদের জন্য সুস্থ সাংস্কৃতিক ও বিনোদনমূলক পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কারণ, মাদকাসক্তি শুধু ব্যক্তির স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না, বরং অনেককে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তেও প্ররোচিত করে। তাই মাদকের বিস্তার কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা গেলে সামাজিক অপরাধ হ্রাস এবং নিরাপদ সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব।
পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব আমাদের সন্তান ও ভবিষ্যত প্রজন্মকে সঠিকভাবে পথ- নির্দেশনা দিয়ে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। সমাজে অনেক প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি আছে যারা স্ব উদ্যোগে এ বিষয়ে কাজ করছে। সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয় এবং সুনির্দিষ্ট দপ্তর আছে যারা তরুণদের উন্নয়নে অঙ্গীকারাবদ্ধ। কাজ হচ্ছে তবে ভয় জেঁকে বসছে। মাদক জোঁকের মতো জেকে বসেছে তরুণদের দেহে। যদি এই জোঁকের পাল থেকে তরুণদের রক্ষা করা না যায় তাহলেই সর্বণাশ। যে বৈষম্যহীন সমাজ ও নতুন বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেরাব কথা আমারে তরুণদের, তারাই পথভ্রষ্ট হয়ে যাবে। আগামীর বাংলাদেশ পগড়ে ঘোরতর অমানিশায়, অনিশ্চয়তায়! দেশ থেকে মাদকের বিস্তার রোধে শক্তিশালী সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশের পাশাপাশি সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ হলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে মাদক পাচার ও সরবরাহ চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ও কার্যকর অভিযান পরিচালনা করা। মাদক পাচার ও ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি, গোষ্ঠী এবং নেটওয়ার্ককে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে মাদক কারবারের অর্থনৈতিক ও সাংগঠনিক ভিত্তি ভেঙে দিয়ে এর নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করতে হবে। মাদকাসক্তির চিকিৎসায় সরকারকে আরও বিনিয়োগ করতে হবে। বর্তমানে সারা দেশে সরকারিভাবে ৬টি বেসরকারিভাবে ৩৮০টি মাদকনিরাময় কেন্দ্র রয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক মানসম্মত পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা এবং বিদ্যমান সেবার সক্ষমতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। এসব কেন্দ্রে শুধু মাদক থেকে বিরত রাখাই নয়, বরং পরিকল্পিত পুনর্বাসন কর্মসূচির মাধ্যমে নৈতিক শিক্ষা, মানসিক সহায়তা, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। পাশাপাশি, বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর জন্য নিজ নিজ ধর্মীয় মূল্যবোধের আলোকে কাউন্সেলিং ও নৈতিক দিকনির্দেশনার সুযোগ নিশ্চিত করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে পুনর্বাসিত ব্যক্তিরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসে সমাজ ও রাষ্ট্রে দায়িত্বশীল ও উৎপাদনশীল নাগরিক হিসেবে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবেন।
[লেখক: সদস্য, জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ টাস্কফোর্স কমিটি (স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়)]

আপনার মতামত লিখুন