সংবাদ

জাতীয় লজ্জা থেকে ব্রাজিলের রূপকথা!


সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬, ০৫:৩৫ পিএম

জাতীয় লজ্জা থেকে ব্রাজিলের রূপকথা!

মাত্র ৪৫ মিনিট। এতটুকু সময়ই যেন আলাদা করে দিচ্ছিল গৌরব আর লজ্জার সীমারেখা। হিউস্টনের স্টেডিয়ামে প্রথমার্ধ শেষে ১-০ গোলে পিছিয়ে ড্রেসিংরুমে ফিরছিল ব্রাজিল। কোটি সমর্থকের মনে তখন একটাই ভয়-বিশ্বকাপ থেকে আরেকটি অকাল বিদায়। ১৯৬৬ সালের পর সবচেয়ে দ্রুত বিদায়ের শঙ্কায় দাঁড়িয়ে ছিল পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।

জাপান তখন শুধু এগিয়েই ছিল না, ম্যাচটাও নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল। আর ব্রাজিল? ২০০২ সালের পর বিশ্বকাপের নকআউটে পিছিয়ে পড়ে কখনো ঘুরে দাঁড়িয়ে জেতার ইতিহাস ছিল না তাদের। সবকিছুই যেন বড় এক অঘটনের ইঙ্গিত দিচ্ছিল।

কিন্তু এক ব্যক্তি তখনও শান্ত ছিলেন। তার নাম কার্লো আনচেলত্তি

বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সফল এই কোচ জানেন, বড় ম্যাচ কীভাবে জিততে হয়। পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন্স লিগজয়ী, ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগে শিরোপাজয়ী আনচেলত্তির জন্য এটি আন্তর্জাতিক ফুটবলে প্রথম অধ্যায়। ব্রাজিলের ইতিহাসের প্রথম বিদেশি কোচ হয়েও চাপের কাছে মাথা নত করেননি তিনি।

ম্যাচ শেষে আনচেলত্তি বলেন, “না, আমি উদ্বিগ্ন ছিলাম না। আমার দলের ওপর পুরোপুরি বিশ্বাস ছিল।”

এই বিশ্বাসই যেন বদলে দেয় ম্যাচের গল্প।

বিরতিতে তিনি কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নেননি। চোট পাওয়া লুকাস পাকেতার পরিবর্তে এন্দ্রিককে নামানো ছিল বাধ্যতামূলক পরিবর্তন। কিন্তু আসল পরিবর্তন আসে কৌশলে। প্রথমার্ধে ছোট ছোট পাসে জাপানের রক্ষণ ভাঙতে ব্যর্থ হওয়া ব্রাজিল দ্বিতীয়ার্ধে খেলার ধরনই বদলে ফেলে।

প্রথম ৪৫ মিনিটে যেখানে তারা মাত্র ১২টি ক্রস করেছিল, বিরতির পর সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৮-এ। বারবার উইং ব্যবহার করে বল পাঠানো হয় জাপানের বক্সে। ব্যাক পোস্টে আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের অবস্থান বদলে যায়, আর তাতেই ছন্দ হারিয়ে ফেলে জাপানের রক্ষণ।

এই কৌশল থেকেই আসে কাসেমিরোর সমতাসূচক গোল।

ইংল্যান্ডের সাবেক ডিফেন্ডার স্টিফেন ওয়ারনক বিবিসি রেডিও ৫ লাইভে বলেন, “বিরতিতে আনচেলত্তির কৌশলগত পরিবর্তনই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। ব্রাজিলের ক্রসগুলো সামাল দিতেই পারেনি জাপান।”

এরপর ম্যাচ যত গড়িয়েছে, ততই বেড়েছে ব্রাজিলের চাপ। আর যোগ করা সময়ের পঞ্চম মিনিটে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। জাপানের একটি ভুলের সুযোগ নিয়ে গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লি ঠান্ডা মাথায় বল জালে জড়িয়ে দেন। মুহূর্তেই হিউস্টনজুড়ে শুরু হয় ব্রাজিলের উল্লাস।

৯৫ মিনিটের সেই গোল শুধু একটি ম্যাচ জেতায়নি; বাঁচিয়ে রেখেছে ব্রাজিলের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নও।

আনচেলত্তি বলেন, “ফুটবলে ভুল হবেই, কারণ কেউ নিখুঁত নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভুল থেকে বেরিয়ে এসে সামনে এগিয়ে যাওয়া। আমার দল সেটাই করেছে।”

এই জয় সহজ ছিল না। বরং ঘাম ঝরিয়ে, ধৈর্য ধরে এবং কৌশলের লড়াই জিতে শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে ব্রাজিল। সামনে অপেক্ষা করছে নরওয়ে অথবা আইভরি কোস্ট। তবে জাপানের বিপক্ষে এই নাটকীয় প্রত্যাবর্তন সেলেসাওদের আত্মবিশ্বাসকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে, এতে সন্দেহ নেই।

ম্যাচ শেষে সমর্থকদের মনে সবচেয়ে বড় অনুভূতি ছিল স্বস্তি। আর আনচেলত্তি? তিনি যেন আগেই জানতেন, তার দল পথ খুঁজে নেবে।

বিশ্ব ফুটবলে তাকে অনেকেই ডাকেন ‘চতুর কার্লো’ নামে। হিউস্টনের রাত সেই নামের যথার্থতাই আরও একবার প্রমাণ করল। জাতীয় লজ্জার দোরগোড়া থেকে ব্রাজিলকে ফিরিয়ে এনে তিনি লিখলেন আরেকটি রূপকথা-যে গল্প হয়তো বিশ্বকাপের বাকি পথেও সেলেসাওদের প্রেরণা হয়ে থাকবে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬


জাতীয় লজ্জা থেকে ব্রাজিলের রূপকথা!

প্রকাশের তারিখ : ৩০ জুন ২০২৬

featured Image

মাত্র ৪৫ মিনিট। এতটুকু সময়ই যেন আলাদা করে দিচ্ছিল গৌরব আর লজ্জার সীমারেখা। হিউস্টনের স্টেডিয়ামে প্রথমার্ধ শেষে ১-০ গোলে পিছিয়ে ড্রেসিংরুমে ফিরছিল ব্রাজিল। কোটি সমর্থকের মনে তখন একটাই ভয়-বিশ্বকাপ থেকে আরেকটি অকাল বিদায়। ১৯৬৬ সালের পর সবচেয়ে দ্রুত বিদায়ের শঙ্কায় দাঁড়িয়ে ছিল পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।

জাপান তখন শুধু এগিয়েই ছিল না, ম্যাচটাও নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল। আর ব্রাজিল? ২০০২ সালের পর বিশ্বকাপের নকআউটে পিছিয়ে পড়ে কখনো ঘুরে দাঁড়িয়ে জেতার ইতিহাস ছিল না তাদের। সবকিছুই যেন বড় এক অঘটনের ইঙ্গিত দিচ্ছিল।

কিন্তু এক ব্যক্তি তখনও শান্ত ছিলেন। তার নাম কার্লো আনচেলত্তি

বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সফল এই কোচ জানেন, বড় ম্যাচ কীভাবে জিততে হয়। পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন্স লিগজয়ী, ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগে শিরোপাজয়ী আনচেলত্তির জন্য এটি আন্তর্জাতিক ফুটবলে প্রথম অধ্যায়। ব্রাজিলের ইতিহাসের প্রথম বিদেশি কোচ হয়েও চাপের কাছে মাথা নত করেননি তিনি।

ম্যাচ শেষে আনচেলত্তি বলেন, “না, আমি উদ্বিগ্ন ছিলাম না। আমার দলের ওপর পুরোপুরি বিশ্বাস ছিল।”

এই বিশ্বাসই যেন বদলে দেয় ম্যাচের গল্প।

বিরতিতে তিনি কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নেননি। চোট পাওয়া লুকাস পাকেতার পরিবর্তে এন্দ্রিককে নামানো ছিল বাধ্যতামূলক পরিবর্তন। কিন্তু আসল পরিবর্তন আসে কৌশলে। প্রথমার্ধে ছোট ছোট পাসে জাপানের রক্ষণ ভাঙতে ব্যর্থ হওয়া ব্রাজিল দ্বিতীয়ার্ধে খেলার ধরনই বদলে ফেলে।

প্রথম ৪৫ মিনিটে যেখানে তারা মাত্র ১২টি ক্রস করেছিল, বিরতির পর সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৮-এ। বারবার উইং ব্যবহার করে বল পাঠানো হয় জাপানের বক্সে। ব্যাক পোস্টে আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের অবস্থান বদলে যায়, আর তাতেই ছন্দ হারিয়ে ফেলে জাপানের রক্ষণ।

এই কৌশল থেকেই আসে কাসেমিরোর সমতাসূচক গোল।

ইংল্যান্ডের সাবেক ডিফেন্ডার স্টিফেন ওয়ারনক বিবিসি রেডিও ৫ লাইভে বলেন, “বিরতিতে আনচেলত্তির কৌশলগত পরিবর্তনই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। ব্রাজিলের ক্রসগুলো সামাল দিতেই পারেনি জাপান।”

এরপর ম্যাচ যত গড়িয়েছে, ততই বেড়েছে ব্রাজিলের চাপ। আর যোগ করা সময়ের পঞ্চম মিনিটে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। জাপানের একটি ভুলের সুযোগ নিয়ে গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লি ঠান্ডা মাথায় বল জালে জড়িয়ে দেন। মুহূর্তেই হিউস্টনজুড়ে শুরু হয় ব্রাজিলের উল্লাস।

৯৫ মিনিটের সেই গোল শুধু একটি ম্যাচ জেতায়নি; বাঁচিয়ে রেখেছে ব্রাজিলের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নও।

আনচেলত্তি বলেন, “ফুটবলে ভুল হবেই, কারণ কেউ নিখুঁত নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভুল থেকে বেরিয়ে এসে সামনে এগিয়ে যাওয়া। আমার দল সেটাই করেছে।”

এই জয় সহজ ছিল না। বরং ঘাম ঝরিয়ে, ধৈর্য ধরে এবং কৌশলের লড়াই জিতে শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে ব্রাজিল। সামনে অপেক্ষা করছে নরওয়ে অথবা আইভরি কোস্ট। তবে জাপানের বিপক্ষে এই নাটকীয় প্রত্যাবর্তন সেলেসাওদের আত্মবিশ্বাসকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে, এতে সন্দেহ নেই।

ম্যাচ শেষে সমর্থকদের মনে সবচেয়ে বড় অনুভূতি ছিল স্বস্তি। আর আনচেলত্তি? তিনি যেন আগেই জানতেন, তার দল পথ খুঁজে নেবে।

বিশ্ব ফুটবলে তাকে অনেকেই ডাকেন ‘চতুর কার্লো’ নামে। হিউস্টনের রাত সেই নামের যথার্থতাই আরও একবার প্রমাণ করল। জাতীয় লজ্জার দোরগোড়া থেকে ব্রাজিলকে ফিরিয়ে এনে তিনি লিখলেন আরেকটি রূপকথা-যে গল্প হয়তো বিশ্বকাপের বাকি পথেও সেলেসাওদের প্রেরণা হয়ে থাকবে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত