বাংলাদেশে অসংখ্য নারী আজও বাবার সম্পত্তিতে নিজেদের বৈধ অংশ পান না। অনেক ক্ষেত্রে তাদের উত্তরাধিকার অধিকার কাগজে-কলমে স্বীকৃত থাকলেও বাস্তবে তা ভাইদের দখলে থেকে যায়। রাষ্ট্রীয়ভাবে নারীর ক্ষমতায়ন, সমঅধিকার ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিয়ে যতই আলোচনা হোক না কেন, পারিবারিক বাস্তবতায় এখনও বহু নারী তাদের অন্যতম মৌলিক অধিকার উত্তরাধিকার সম্পত্তির ন্যায্য অংশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো— এই বঞ্চনাকে অনেক পরিবার অন্যায় বলেও মনে করে না। বরং ‘পারিবারিক সমঝোতা’, ‘সম্পর্ক রক্ষার স্বার্থে ত্যাগ’ কিংবা ‘ভাইয়ের দয়া’র মতো শব্দের আড়ালে একজন নারীর বৈধ অধিকার নীরবে হারিয়ে যায়।
বাস্তবতা হচ্ছে, উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে নারীর অধিকার কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি আইন, ধর্ম ও ন্যায়বিচার স্বীকৃত একটি নির্ধারিত প্রাপ্য। অথচ আমাদের সমাজে এই অধিকারকে এখনও অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয় না।
দীর্ঘদিন ধরে একটি ভুল ধারণা সমাজে প্রচলিত রয়েছে— মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেলে তারা ‘পরের ঘরের মানুষ’ হয়ে যায়। ফলে বাবার সম্পত্তিতে তাদের অধিকার যেন স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়। অথচ বাংলাদেশের প্রচলিত মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী একজন কন্যা কিংবা বোন নির্দিষ্ট অংশের বৈধ উত্তরাধিকারী। একজন নারীর বিবাহ তার উত্তরাধিকার অধিকারকে কোনোভাবেই বাতিল করে না।
ইসলাম নারীকে উত্তরাধিকার সম্পত্তির অধিকার দিয়েছে এমন এক সময়ে, যখন বিশ্বের বহু সমাজেই নারীদের কোনো সম্পত্তিগত স্বীকৃতি ছিল না। পবিত্র কুরআনে উত্তরাধিকার বণ্টনের বিধান অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে ধর্মের দোহাই দিয়ে নারীর প্রাপ্য অধিকার খর্ব করার কোনো সুযোগ নেই। বরং কারও বৈধ অংশ আত্মসাৎ করা ধর্মীয় ও নৈতিক উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই গুরুতর অন্যায়।
বাংলাদেশে মুসলিমদের উত্তরাধিকার বণ্টন ইসলামী উত্তরাধিকার নীতিমালা ও প্রচলিত আইনের আলোকে নির্ধারিত হয়। কোনো উত্তরাধিকারীকে তার বৈধ অংশ থেকে বঞ্চিত করা হলে তিনি আদালতের মাধ্যমে অংশ নির্ধারণ, দখল পুনরুদ্ধার কিংবা অন্যান্য আইনগত প্রতিকার চাইতে পারেন। অর্থাৎ উত্তরাধিকার অধিকার কেবল নৈতিক বা ধর্মীয় বিষয় নয়; এটি একটি স্বীকৃত আইনগত অধিকারও।
কিন্তু বাস্তবে কী ঘটে?
অসংখ্য পরিবারে দেখা যায়, বাবা মৃত্যুবরণ করার পর ভাইয়েরা জমি নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেন, নামজারি সম্পন্ন করেন, এমনকি সম্পত্তি বিক্রিও করে ফেলেন; অথচ বোনদের মতামত নেয়া হয় না। অনেক ক্ষেত্রে বোনদের বলা হয়—
‘তোমার তো স্বামীর বাড়ি আছে।’
‘সম্পত্তি নিলে সম্পর্ক নষ্ট হবে।’
‘ভাইদের বিরুদ্ধে যেও না।’
‘মেয়েরা সম্পত্তি চাইলে পরিবারে অশান্তি হয়।’
এভাবেই আবেগ, সামাজিক চাপ এবং পারিবারিক প্রভাব ব্যবহার করে একজন নারীকে তার বৈধ অধিকার থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়।
আইন পেশায় কাজ করতে গিয়ে প্রায়ই এমন বাস্তব ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়, যেখানে একজন নারী বহু বছর পর জানতে পারেন যে তিনি বাবার সম্পত্তির বৈধ অংশীদার ছিলেন। কিন্তু ততদিনে ভাইয়েরা সম্পত্তি নিজেদের নামে নামজারি করে ফেলেছেন, বিক্রি করে দিয়েছেন অথবা কৌশলে বিভিন্ন কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে তাকে বঞ্চিত করেছেন।
অনেক নারী পারিবারিক সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার ভয়ে আইনি অধিকার দাবি করতেও সাহস পান না। ফলে নীরব বঞ্চনাই তাদের নিয়তি হয়ে দাঁড়ায়।
উত্তরাধিকার বণ্টনের একটি সাধারণ উদাহরণ ধরা যাক, একজন ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলেন। তিনি রেখে গেলেন স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে। ইসলামী উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী প্রথমে মৃত ব্যক্তির ঋণ ও বৈধ খরচ পরিশোধ করা হবে। এরপর স্ত্রী মোট সম্পত্তির ১/৮ অংশ পাবেন, কারণ মৃত ব্যক্তির সন্তান রয়েছে। অবশিষ্ট সম্পত্তি ছেলে ও মেয়েদের মধ্যে বণ্টন হবে, যেখানে একজন ছেলে একজন মেয়ের দ্বিগুণ অংশ পাবে। অর্থাৎ দুই ছেলে ও এক মেয়ের ক্ষেত্রে সম্পত্তি পাঁচ ভাগে ভাগ হবে প্রত্যেক ছেলে দুই ভাগ করে এবং মেয়ে এক ভাগ পাবে।
আবার যদি কোনো ব্যক্তি শুধুমাত্র এক কন্যা সন্তান রেখে মৃত্যুবরণ করেন এবং কোনো ছেলে না থাকে, তাহলে সেই কন্যা মোট সম্পত্তির অর্ধেকের বৈধ উত্তরাধিকারী হবেন। একাধিক কন্যা থাকলে তারা সম্মিলিতভাবে মোট সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত অংশীদার হতে পারেন।
অনেকেই প্রশ্ন করেন নারীরা কেন ছেলেদের তুলনায় কম অংশ পান?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝতে হবে। ইসলামী উত্তরাধিকার ব্যবস্থায় পুরুষের উপর পরিবার পরিচালনা, স্ত্রী-সন্তানের ভরণপোষণ এবং অন্য আর্থিক দায়দায়িত্ব আরোপ করা হয়েছে। অন্যদিকে একজন নারীর ব্যক্তিগত সম্পদের উপর স্বামী বা অন্য কারও কোনো অধিকার নেই। তিনি তার প্রাপ্ত সম্পত্তির পূর্ণ মালিক। উত্তরাধিকার বণ্টনের এই কাঠামো পারিবারিক আর্থিক দায়িত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি নির্ধারিত বিধান।
কিন্তু বাস্তব সমস্যা অন্য জায়গায়। আমাদের সমাজে বহু নারী তাদের নির্ধারিত অংশটুকুও পান না।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই প্রবণতা শুধু গ্রামাঞ্চল বা অশিক্ষিত সমাজে সীমাবদ্ধ নয়। উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত পরিবারেও একই চিত্র দেখা যায়। অনেক শিক্ষিত ভাইও মনে করেন, বোন অংশ নিলে সম্পত্তি ‘অন্য পরিবারে চলে যাবে’। অথচ একজন ছেলে বিয়ে করলে তার সম্পত্তি নিয়ে কখনো এমন প্রশ্ন তোলা হয় না। এই দ্বৈত মানসিকতাই আমাদের সামাজিক বৈষম্যের প্রকৃত প্রতিচ্ছবি।
উত্তরাধিকার বঞ্চনার প্রভাব কেবল একটি সম্পত্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি নারীর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা ও ভবিষ্যতের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বাস্তবে বহু নারী স্বামীর মৃত্যু, বিবাহবিচ্ছেদ কিংবা আর্থিক সংকটের সময় চরম অসহায় অবস্থায় পড়েন। তখন তারা উপলব্ধি করেন— বাবার সম্পত্তিতে ন্যায্য অংশ পেলে হয়তো জীবন এত কঠিন হতো না।
আমরা একদিকে নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলি, অন্যদিকে পরিবারের ভেতরেই তার অর্থনৈতিক অধিকার অস্বীকার করি। এটি নিঃসন্দেহে এক ধরনের সামাজিক ভণ্ডামি। কারণ প্রকৃত ক্ষমতায়ন তখনই সম্ভব, যখন একজন নারী তার আইনগত ও অর্থনৈতিক অধিকার বাস্তবে ভোগ করতে পারবেন।
বোনের প্রাপ্য অংশ আটকে রাখা শুধু আইনের লঙ্ঘন নয়; এটি ন্যায়বিচার, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং ধর্মীয় নির্দেশনারও পরিপন্থী। একজন ভাই যখন বোনের অধিকার অস্বীকার করেন, তখন তিনি শুধু সম্পত্তি নয়, পারিবারিক আস্থা ও সম্পর্কের ভিত্তিও দুর্বল করে দেন।
বর্তমান সময়ে প্রয়োজন কেবল আইনের প্রয়োগ নয়, সামাজিক মানসিকতারও ইতিবাচক পরিবর্তন। পরিবারগুলোকে বুঝতে হবে— বোনকে তার প্রাপ্য অংশ বুঝিয়ে দেয়া মানে সম্পদ হারানো নয়; বরং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। একজন ভাই যখন স্বেচ্ছায় বোনের অধিকার নিশ্চিত করেন, তখন সম্পর্ক আরও মর্যাদাপূর্ণ ও সম্মানজনক হয়। অন্যদিকে অধিকার বঞ্চনা পারিবারিক বিরোধ, মামলা-মোকদ্দমা এবং দীর্ঘস্থায়ী দূরত্ব সৃষ্টি করে।
গণমাধ্যম, আইনজীবী, শিক্ষক, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এবং সচেতন নাগরিকদের এ বিষয়ে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নারীদেরও নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে এবং প্রয়োজন হলে আইনি সহায়তা নিতে হবে।
বাংলাদেশের সংবিধান আইনের দৃষ্টিতে সমতা ও ন্যায়বিচারের যে আদর্শ ধারণ করে, উত্তরাধিকার ক্ষেত্রে নারীর বৈধ অধিকার নিশ্চিত করাও সেই আদর্শেরই অংশ। তাই একজন নারীকে তার ন্যায্য উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা শুধু পারিবারিক বা সামাজিক অন্যায় নয়; এটি ন্যায়বিচারের মৌলিক চেতনাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে নারীর অধিকার কোনো দয়া নয়; এটি তার বৈধ, ধর্মসম্মত ও আইনস্বীকৃত প্রাপ্য। একজন বোনকে তার ন্যায্য অংশ থেকে বঞ্চিত করা শুধু একটি ব্যক্তিগত অন্যায় নয়, বরং একটি সামাজিক অবিচার।
যে সমাজে একজন বোনকে তার প্রাপ্য অধিকার পেতে ভাইয়ের দয়ার ওপর নির্ভর করতে হয়, সেই সমাজকে প্রকৃত অর্থে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ বলা যায় না। একটি সভ্য সমাজের পরিচয় তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন পরিবারের মেয়েরাও সম্মানের সঙ্গে তাদের বৈধ ও ন্যায্য অধিকার ভোগ করতে পারবেন।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: অ্যাডভোকেট, জেলা ও দায়রা জজ আদালত, ঢাকা]

বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০২ জুলাই ২০২৬
বাংলাদেশে অসংখ্য নারী আজও বাবার সম্পত্তিতে নিজেদের বৈধ অংশ পান না। অনেক ক্ষেত্রে তাদের উত্তরাধিকার অধিকার কাগজে-কলমে স্বীকৃত থাকলেও বাস্তবে তা ভাইদের দখলে থেকে যায়। রাষ্ট্রীয়ভাবে নারীর ক্ষমতায়ন, সমঅধিকার ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিয়ে যতই আলোচনা হোক না কেন, পারিবারিক বাস্তবতায় এখনও বহু নারী তাদের অন্যতম মৌলিক অধিকার উত্তরাধিকার সম্পত্তির ন্যায্য অংশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো— এই বঞ্চনাকে অনেক পরিবার অন্যায় বলেও মনে করে না। বরং ‘পারিবারিক সমঝোতা’, ‘সম্পর্ক রক্ষার স্বার্থে ত্যাগ’ কিংবা ‘ভাইয়ের দয়া’র মতো শব্দের আড়ালে একজন নারীর বৈধ অধিকার নীরবে হারিয়ে যায়।
বাস্তবতা হচ্ছে, উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে নারীর অধিকার কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি আইন, ধর্ম ও ন্যায়বিচার স্বীকৃত একটি নির্ধারিত প্রাপ্য। অথচ আমাদের সমাজে এই অধিকারকে এখনও অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয় না।
দীর্ঘদিন ধরে একটি ভুল ধারণা সমাজে প্রচলিত রয়েছে— মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেলে তারা ‘পরের ঘরের মানুষ’ হয়ে যায়। ফলে বাবার সম্পত্তিতে তাদের অধিকার যেন স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়। অথচ বাংলাদেশের প্রচলিত মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী একজন কন্যা কিংবা বোন নির্দিষ্ট অংশের বৈধ উত্তরাধিকারী। একজন নারীর বিবাহ তার উত্তরাধিকার অধিকারকে কোনোভাবেই বাতিল করে না।
ইসলাম নারীকে উত্তরাধিকার সম্পত্তির অধিকার দিয়েছে এমন এক সময়ে, যখন বিশ্বের বহু সমাজেই নারীদের কোনো সম্পত্তিগত স্বীকৃতি ছিল না। পবিত্র কুরআনে উত্তরাধিকার বণ্টনের বিধান অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে ধর্মের দোহাই দিয়ে নারীর প্রাপ্য অধিকার খর্ব করার কোনো সুযোগ নেই। বরং কারও বৈধ অংশ আত্মসাৎ করা ধর্মীয় ও নৈতিক উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই গুরুতর অন্যায়।
বাংলাদেশে মুসলিমদের উত্তরাধিকার বণ্টন ইসলামী উত্তরাধিকার নীতিমালা ও প্রচলিত আইনের আলোকে নির্ধারিত হয়। কোনো উত্তরাধিকারীকে তার বৈধ অংশ থেকে বঞ্চিত করা হলে তিনি আদালতের মাধ্যমে অংশ নির্ধারণ, দখল পুনরুদ্ধার কিংবা অন্যান্য আইনগত প্রতিকার চাইতে পারেন। অর্থাৎ উত্তরাধিকার অধিকার কেবল নৈতিক বা ধর্মীয় বিষয় নয়; এটি একটি স্বীকৃত আইনগত অধিকারও।
কিন্তু বাস্তবে কী ঘটে?
অসংখ্য পরিবারে দেখা যায়, বাবা মৃত্যুবরণ করার পর ভাইয়েরা জমি নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেন, নামজারি সম্পন্ন করেন, এমনকি সম্পত্তি বিক্রিও করে ফেলেন; অথচ বোনদের মতামত নেয়া হয় না। অনেক ক্ষেত্রে বোনদের বলা হয়—
‘তোমার তো স্বামীর বাড়ি আছে।’
‘সম্পত্তি নিলে সম্পর্ক নষ্ট হবে।’
‘ভাইদের বিরুদ্ধে যেও না।’
‘মেয়েরা সম্পত্তি চাইলে পরিবারে অশান্তি হয়।’
এভাবেই আবেগ, সামাজিক চাপ এবং পারিবারিক প্রভাব ব্যবহার করে একজন নারীকে তার বৈধ অধিকার থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়।
আইন পেশায় কাজ করতে গিয়ে প্রায়ই এমন বাস্তব ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়, যেখানে একজন নারী বহু বছর পর জানতে পারেন যে তিনি বাবার সম্পত্তির বৈধ অংশীদার ছিলেন। কিন্তু ততদিনে ভাইয়েরা সম্পত্তি নিজেদের নামে নামজারি করে ফেলেছেন, বিক্রি করে দিয়েছেন অথবা কৌশলে বিভিন্ন কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে তাকে বঞ্চিত করেছেন।
অনেক নারী পারিবারিক সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার ভয়ে আইনি অধিকার দাবি করতেও সাহস পান না। ফলে নীরব বঞ্চনাই তাদের নিয়তি হয়ে দাঁড়ায়।
উত্তরাধিকার বণ্টনের একটি সাধারণ উদাহরণ ধরা যাক, একজন ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলেন। তিনি রেখে গেলেন স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে। ইসলামী উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী প্রথমে মৃত ব্যক্তির ঋণ ও বৈধ খরচ পরিশোধ করা হবে। এরপর স্ত্রী মোট সম্পত্তির ১/৮ অংশ পাবেন, কারণ মৃত ব্যক্তির সন্তান রয়েছে। অবশিষ্ট সম্পত্তি ছেলে ও মেয়েদের মধ্যে বণ্টন হবে, যেখানে একজন ছেলে একজন মেয়ের দ্বিগুণ অংশ পাবে। অর্থাৎ দুই ছেলে ও এক মেয়ের ক্ষেত্রে সম্পত্তি পাঁচ ভাগে ভাগ হবে প্রত্যেক ছেলে দুই ভাগ করে এবং মেয়ে এক ভাগ পাবে।
আবার যদি কোনো ব্যক্তি শুধুমাত্র এক কন্যা সন্তান রেখে মৃত্যুবরণ করেন এবং কোনো ছেলে না থাকে, তাহলে সেই কন্যা মোট সম্পত্তির অর্ধেকের বৈধ উত্তরাধিকারী হবেন। একাধিক কন্যা থাকলে তারা সম্মিলিতভাবে মোট সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত অংশীদার হতে পারেন।
অনেকেই প্রশ্ন করেন নারীরা কেন ছেলেদের তুলনায় কম অংশ পান?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝতে হবে। ইসলামী উত্তরাধিকার ব্যবস্থায় পুরুষের উপর পরিবার পরিচালনা, স্ত্রী-সন্তানের ভরণপোষণ এবং অন্য আর্থিক দায়দায়িত্ব আরোপ করা হয়েছে। অন্যদিকে একজন নারীর ব্যক্তিগত সম্পদের উপর স্বামী বা অন্য কারও কোনো অধিকার নেই। তিনি তার প্রাপ্ত সম্পত্তির পূর্ণ মালিক। উত্তরাধিকার বণ্টনের এই কাঠামো পারিবারিক আর্থিক দায়িত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি নির্ধারিত বিধান।
কিন্তু বাস্তব সমস্যা অন্য জায়গায়। আমাদের সমাজে বহু নারী তাদের নির্ধারিত অংশটুকুও পান না।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই প্রবণতা শুধু গ্রামাঞ্চল বা অশিক্ষিত সমাজে সীমাবদ্ধ নয়। উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত পরিবারেও একই চিত্র দেখা যায়। অনেক শিক্ষিত ভাইও মনে করেন, বোন অংশ নিলে সম্পত্তি ‘অন্য পরিবারে চলে যাবে’। অথচ একজন ছেলে বিয়ে করলে তার সম্পত্তি নিয়ে কখনো এমন প্রশ্ন তোলা হয় না। এই দ্বৈত মানসিকতাই আমাদের সামাজিক বৈষম্যের প্রকৃত প্রতিচ্ছবি।
উত্তরাধিকার বঞ্চনার প্রভাব কেবল একটি সম্পত্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি নারীর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা ও ভবিষ্যতের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বাস্তবে বহু নারী স্বামীর মৃত্যু, বিবাহবিচ্ছেদ কিংবা আর্থিক সংকটের সময় চরম অসহায় অবস্থায় পড়েন। তখন তারা উপলব্ধি করেন— বাবার সম্পত্তিতে ন্যায্য অংশ পেলে হয়তো জীবন এত কঠিন হতো না।
আমরা একদিকে নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলি, অন্যদিকে পরিবারের ভেতরেই তার অর্থনৈতিক অধিকার অস্বীকার করি। এটি নিঃসন্দেহে এক ধরনের সামাজিক ভণ্ডামি। কারণ প্রকৃত ক্ষমতায়ন তখনই সম্ভব, যখন একজন নারী তার আইনগত ও অর্থনৈতিক অধিকার বাস্তবে ভোগ করতে পারবেন।
বোনের প্রাপ্য অংশ আটকে রাখা শুধু আইনের লঙ্ঘন নয়; এটি ন্যায়বিচার, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং ধর্মীয় নির্দেশনারও পরিপন্থী। একজন ভাই যখন বোনের অধিকার অস্বীকার করেন, তখন তিনি শুধু সম্পত্তি নয়, পারিবারিক আস্থা ও সম্পর্কের ভিত্তিও দুর্বল করে দেন।
বর্তমান সময়ে প্রয়োজন কেবল আইনের প্রয়োগ নয়, সামাজিক মানসিকতারও ইতিবাচক পরিবর্তন। পরিবারগুলোকে বুঝতে হবে— বোনকে তার প্রাপ্য অংশ বুঝিয়ে দেয়া মানে সম্পদ হারানো নয়; বরং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। একজন ভাই যখন স্বেচ্ছায় বোনের অধিকার নিশ্চিত করেন, তখন সম্পর্ক আরও মর্যাদাপূর্ণ ও সম্মানজনক হয়। অন্যদিকে অধিকার বঞ্চনা পারিবারিক বিরোধ, মামলা-মোকদ্দমা এবং দীর্ঘস্থায়ী দূরত্ব সৃষ্টি করে।
গণমাধ্যম, আইনজীবী, শিক্ষক, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এবং সচেতন নাগরিকদের এ বিষয়ে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নারীদেরও নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে এবং প্রয়োজন হলে আইনি সহায়তা নিতে হবে।
বাংলাদেশের সংবিধান আইনের দৃষ্টিতে সমতা ও ন্যায়বিচারের যে আদর্শ ধারণ করে, উত্তরাধিকার ক্ষেত্রে নারীর বৈধ অধিকার নিশ্চিত করাও সেই আদর্শেরই অংশ। তাই একজন নারীকে তার ন্যায্য উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা শুধু পারিবারিক বা সামাজিক অন্যায় নয়; এটি ন্যায়বিচারের মৌলিক চেতনাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে নারীর অধিকার কোনো দয়া নয়; এটি তার বৈধ, ধর্মসম্মত ও আইনস্বীকৃত প্রাপ্য। একজন বোনকে তার ন্যায্য অংশ থেকে বঞ্চিত করা শুধু একটি ব্যক্তিগত অন্যায় নয়, বরং একটি সামাজিক অবিচার।
যে সমাজে একজন বোনকে তার প্রাপ্য অধিকার পেতে ভাইয়ের দয়ার ওপর নির্ভর করতে হয়, সেই সমাজকে প্রকৃত অর্থে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ বলা যায় না। একটি সভ্য সমাজের পরিচয় তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন পরিবারের মেয়েরাও সম্মানের সঙ্গে তাদের বৈধ ও ন্যায্য অধিকার ভোগ করতে পারবেন।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: অ্যাডভোকেট, জেলা ও দায়রা জজ আদালত, ঢাকা]

আপনার মতামত লিখুন