সংবাদ

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পেও বাড়ছে খেলাপি ঋণ


আকতার হোসাইন
আকতার হোসাইন
প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৩৯ পিএম

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পেও বাড়ছে খেলাপি ঋণ

বাংলা সাহিত্যের অন্নদামঙ্গল কাব্যের বিখ্যাত একটি লাইন হলো, ‘নগর পুড়িলে দেবালয় কি এড়ায়’ অর্থাৎ, কোনো শহরে বড় বিপদ এলে সেখান থেকে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানই ক্ষতির হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারে না; সবাই কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তেমনি ১ আগস্ট ২০২৬ তারিখের পত্রিকাগুলোতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন চোখে পড়লো, যেখানে বলা হয়েছে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে গত এক বছরে প্রায় দ্বিগুণ হাওে খেলাপি ঋণগ্রহীতার সংখ্যা বেড়েছে। সুতরাং ভাববার বিষয় হলোÑ কেন প্রতিটি ক্ষেত্রেই খেলাপি ঋণ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকার বিভিন্নভাবে নানা উপায়ে চেষ্টা করছে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে কীভাবে সহযোগিতা করে দেশের অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করানো যায়। দেশে কখনো ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে খেলাপি ঋণ আতঙ্কজনক পর্যায়ে ছিল না। এই খাতটি বরাবরই ভালো অবস্থানে ছিল, যেখানে খেলাপি ঋণের পরিমাণও ছিল কাক্সিক্ষত পর্যায়ে। তাই এই খাতে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পাওয়ায় ভঙ্গুর ব্যাংকিং খাত আরও আতঙ্কিত হয়ে উঠেছে। এর অন্যতম কারণ হতে পারে অর্থনৈতিক মন্দা অথবা ব্যাংকিং খাতে দক্ষ জনবলের অভাব। আবার, ব্যাংকিং খাতে ঋণ নিয়ে ঋণ পরিশোধ না করার যে অপসংস্কৃতি বিদ্যমান রয়েছে, তারও ধারাবাহিকতায় এমনটি হতে পারে। অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই খাতটি কেন আতঙ্কজনক পর্যায়ে যাচ্ছে? বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত মার্চ শেষে এক কোটি টাকার চেয়ে কম ঋণ রয়েছে এমন খেলাপি ঋণগ্রহীতার সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৪৫ লাখ ৪৩ হাজার। অথচ গত বছরের মার্চে এই সংখ্যা ছিল ২১ লাখ ৬৩ হাজার। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) খাতের মোট ঋণের ৩৪ শতাংশের বেশি এখন খেলাপি ঋণ। আবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে, মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে এক কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণের মোট পরিমাণ ছিল প্রায় ৪ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে ১৫ শতাংশই খেলাপি হয়ে গেছে। টাকার অঙ্কে খেলাপির হার কম হলেও, গ্রাহক বিবেচনায় খেলাপি ঋণগ্রহীতার সংখ্যা বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ হারে। গত বছরের মার্চে এই শ্রেণীর খেলাপি ঋণগ্রহীতার সংখ্যা ছিল ২১ লাখ ৬৩ হাজার ৩২৩। গত মার্চ শেষে এই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৪৫ লাখ ৪৩ হাজার ৪৮৫। অর্থাৎ এক বছরে প্রায় ২৪ লাখ ঋণগ্রহীতা নতুন করে খেলাপি হয়েছে। অর্থাৎ টাকার পরিমাণের চেয়ে ঋণগ্রহীতার সংখ্যা অনেক বেশি হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা অনেকটা দেশের অর্থনীতির অবস্থারই প্রতিফলন বলে মনে হয়। দেশের অর্থনীতির অবস্থা ভালো থাকলে খেলাপি ঋণগ্রহীতার সংখ্যা এতটা বাড়ত না। প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই উল্লেখ করেছে, ছোট ছোট ঋণের খেলাপি গ্রাহকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া খুচরা পর্যায়ে ঋণের গুণগত মানের ব্যাপক অবনতির ইঙ্গিত বহন করে। এসব ঋণে খেলাপি ঋণগ্রহীতার সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে রয়েছে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, পরিবারের ঋণের বোঝা বৃদ্ধি, এসএমই কার্যক্রমের মন্থর গতি এবং কৃষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কমে যাওয়া যাকে মূল কারণ মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এছাড়াও রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতির উচ্চচাপ। বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেও মনে করে, বড় বড় ঋণ খেলাপি হলে আর্থিক খাতে ক্ষতি বেশি হয়। তবে ছোট ছোট ঋণ হিসাবের খেলাপি দ্রুত বেড়ে যাওয়া সামগ্রিক খাতের জন্য একটি অশনি সংকেত বহন করে। এবার দেখা যাক, এই খাতে কেন বাড়ছে খেলাপি ঋণ। বিষয়টি গত এক বছরে যে পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে, তার ফলাফল এক বছরের নয়। অর্থাৎ এর যাত্রা শুরু হয়েছিল কোভিড মহামারির সময় থেকে, যার ফলশ্রুতিতে আজকের এই অবস্থা। এর পাশাপাশি রয়েছে বাজার সিন্ডিকেটের প্রভাব এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি, যা এর অন্যতম  কারণ বলে মনে করা হয়। বাজার সিন্ডিকেটের প্রভাবের বড় একটি উদাহরণ হলো, প্রথম আলোর ৩০ জুলাই ২০২৬ তারিখের এক প্রতিবেদন, যার শিরোনাম ছিল ‘কৃষক থেকে খুচরা বাজারে আসতে চালের দাম দ্বিগুণ’। প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়, ‘কৃষক পর্যায়ে প্রতি কেজি পাইজাম চাল গড়ে ৩০ টাকা ৬৫ পয়সায় বিক্রি হয়। ওই চাল ব্যাপারী, মিলার, আড়তদার ঘুরে খুচরা পর্যায়ে বিক্রি হয় ৫৯ টাকা ৬৯ পয়সায়। তার মানে, কৃষক বা ফার্ম থেকে খুচরা পর্যায়ে আসতে চালের দাম দ্বিগুণ হচ্ছে। একইভাবে কৃষক বা ফার্ম থেকে খুচরা পর্যায়ে ভোক্তাদের কাছে আসতে মসুর ডালের দাম বাড়ছে ৭৮ শতাংশ, পেঁয়াজে ৮৭ শতাংশ, আলুতে ৫০ শতাংশ, কাঁচা মরিচে ১১৬ শতাংশ, বেগুনে ৭২ শতাংশ, ডিমে ২৫ শতাংশ, গরুর মাংসে ১৩ শতাংশ, মাছে ১০ শতাংশ এবং ব্রয়লার মুরগিতে ২২ শতাংশ।’ এ থেকে বোঝা যায়, উৎপাদক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হলেও ভোক্তাকে উচ্চমূল্যই পরিশোধ করতে হচ্ছে। এই উদাহরণ থেকে একটি বিষয় প্রতীয়মান যে, একজন কৃষক কৃষিঋণ নিয়ে যে ফসল ফলান, তার উপযুক্ত দাম না পাওয়ায় তিনি কাঙিক্ষত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেন না। ফলে ব্যাংক থেকে গৃহীত ঋণ যথাসময়ে পরিশোধ করতে পারেন না।

এ কারণে ঋণটি খেলাপি হয়। আবার উচ্চমূল্যস্ফীতির ফলে মানুষের আয় কমে যায়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে। কারণ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উৎপাদিত পণ্যের ক্রেতা কম থাকলে কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জিত হয় না। ফলে ব্যাংক থেকে গৃহীত ঋণখেলাপি হয়। আবার একজন চাকরিজীবী বছর শেষে ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট পান। অথচ ১০ শতাংশ মূল্যস্ফীতির কারণে তার মোট খরচ ১০ শতাংশই বৃদ্ধি পায়। এর বিপরীতে ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট হলে বাকি ৫ শতাংশ ঘাটতি থেকে যায়, যা একসময় ব্যাংকঋণের ওপর প্রভাব ফেলে। ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বাধাগ্রস্ত হয়। বর্তমান পরিস্থিতিই তার বাস্তব উদাহরণ। আবার অর্থনীতির উপাদানগুলোকে গিটারের তারের সঙ্গে তুলনা করা যায়। যেখানে গিটারের যেকোনো একটি তার ছিঁড়ে গেলে বা নষ্ট হলে গিটারটি আর বাজে না। অর্থাৎ বাকিগুলোও বিকল হয়ে যায়। অর্থনীতির উপাদানগুলোও ঠিক তেমনই। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে দীর্ঘদিন মুদ্রা সংকোচন নীতির মাধ্যমে সুদের হার বৃদ্ধি করা হলো। ফলে দেশে বেকারত্ব বেড়ে গেল, যার প্রভাব পড়লো ব্যাংকিং খাতে। আর ঠিক এ কারণেই দেশে ব্যাংকিং খাতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে খেলাপি ঋণগ্রহীতার সংখ্যা বেশি। এ থেকে উত্তরণের একটিই উপায়, তা হলো কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ। একমাত্র এটিই পারে এ সমস্যা থেকে উত্তরণ ঘটাতে। সেই অপেক্ষায় দেশ ও জাতি।

[লেখক: ব্যাংকার]  


আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬


ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পেও বাড়ছে খেলাপি ঋণ

প্রকাশের তারিখ : ১৫ আগস্ট ২০২৬

featured Image

বাংলা সাহিত্যের অন্নদামঙ্গল কাব্যের বিখ্যাত একটি লাইন হলো, ‘নগর পুড়িলে দেবালয় কি এড়ায়’ অর্থাৎ, কোনো শহরে বড় বিপদ এলে সেখান থেকে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানই ক্ষতির হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারে না; সবাই কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তেমনি ১ আগস্ট ২০২৬ তারিখের পত্রিকাগুলোতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন চোখে পড়লো, যেখানে বলা হয়েছে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে গত এক বছরে প্রায় দ্বিগুণ হাওে খেলাপি ঋণগ্রহীতার সংখ্যা বেড়েছে। সুতরাং ভাববার বিষয় হলোÑ কেন প্রতিটি ক্ষেত্রেই খেলাপি ঋণ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকার বিভিন্নভাবে নানা উপায়ে চেষ্টা করছে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে কীভাবে সহযোগিতা করে দেশের অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করানো যায়। দেশে কখনো ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে খেলাপি ঋণ আতঙ্কজনক পর্যায়ে ছিল না। এই খাতটি বরাবরই ভালো অবস্থানে ছিল, যেখানে খেলাপি ঋণের পরিমাণও ছিল কাক্সিক্ষত পর্যায়ে। তাই এই খাতে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পাওয়ায় ভঙ্গুর ব্যাংকিং খাত আরও আতঙ্কিত হয়ে উঠেছে। এর অন্যতম কারণ হতে পারে অর্থনৈতিক মন্দা অথবা ব্যাংকিং খাতে দক্ষ জনবলের অভাব। আবার, ব্যাংকিং খাতে ঋণ নিয়ে ঋণ পরিশোধ না করার যে অপসংস্কৃতি বিদ্যমান রয়েছে, তারও ধারাবাহিকতায় এমনটি হতে পারে। অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই খাতটি কেন আতঙ্কজনক পর্যায়ে যাচ্ছে? বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত মার্চ শেষে এক কোটি টাকার চেয়ে কম ঋণ রয়েছে এমন খেলাপি ঋণগ্রহীতার সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৪৫ লাখ ৪৩ হাজার। অথচ গত বছরের মার্চে এই সংখ্যা ছিল ২১ লাখ ৬৩ হাজার। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) খাতের মোট ঋণের ৩৪ শতাংশের বেশি এখন খেলাপি ঋণ। আবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে, মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে এক কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণের মোট পরিমাণ ছিল প্রায় ৪ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে ১৫ শতাংশই খেলাপি হয়ে গেছে। টাকার অঙ্কে খেলাপির হার কম হলেও, গ্রাহক বিবেচনায় খেলাপি ঋণগ্রহীতার সংখ্যা বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ হারে। গত বছরের মার্চে এই শ্রেণীর খেলাপি ঋণগ্রহীতার সংখ্যা ছিল ২১ লাখ ৬৩ হাজার ৩২৩। গত মার্চ শেষে এই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৪৫ লাখ ৪৩ হাজার ৪৮৫। অর্থাৎ এক বছরে প্রায় ২৪ লাখ ঋণগ্রহীতা নতুন করে খেলাপি হয়েছে। অর্থাৎ টাকার পরিমাণের চেয়ে ঋণগ্রহীতার সংখ্যা অনেক বেশি হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা অনেকটা দেশের অর্থনীতির অবস্থারই প্রতিফলন বলে মনে হয়। দেশের অর্থনীতির অবস্থা ভালো থাকলে খেলাপি ঋণগ্রহীতার সংখ্যা এতটা বাড়ত না। প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই উল্লেখ করেছে, ছোট ছোট ঋণের খেলাপি গ্রাহকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া খুচরা পর্যায়ে ঋণের গুণগত মানের ব্যাপক অবনতির ইঙ্গিত বহন করে। এসব ঋণে খেলাপি ঋণগ্রহীতার সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে রয়েছে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, পরিবারের ঋণের বোঝা বৃদ্ধি, এসএমই কার্যক্রমের মন্থর গতি এবং কৃষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কমে যাওয়া যাকে মূল কারণ মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এছাড়াও রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতির উচ্চচাপ। বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেও মনে করে, বড় বড় ঋণ খেলাপি হলে আর্থিক খাতে ক্ষতি বেশি হয়। তবে ছোট ছোট ঋণ হিসাবের খেলাপি দ্রুত বেড়ে যাওয়া সামগ্রিক খাতের জন্য একটি অশনি সংকেত বহন করে। এবার দেখা যাক, এই খাতে কেন বাড়ছে খেলাপি ঋণ। বিষয়টি গত এক বছরে যে পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে, তার ফলাফল এক বছরের নয়। অর্থাৎ এর যাত্রা শুরু হয়েছিল কোভিড মহামারির সময় থেকে, যার ফলশ্রুতিতে আজকের এই অবস্থা। এর পাশাপাশি রয়েছে বাজার সিন্ডিকেটের প্রভাব এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি, যা এর অন্যতম  কারণ বলে মনে করা হয়। বাজার সিন্ডিকেটের প্রভাবের বড় একটি উদাহরণ হলো, প্রথম আলোর ৩০ জুলাই ২০২৬ তারিখের এক প্রতিবেদন, যার শিরোনাম ছিল ‘কৃষক থেকে খুচরা বাজারে আসতে চালের দাম দ্বিগুণ’। প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়, ‘কৃষক পর্যায়ে প্রতি কেজি পাইজাম চাল গড়ে ৩০ টাকা ৬৫ পয়সায় বিক্রি হয়। ওই চাল ব্যাপারী, মিলার, আড়তদার ঘুরে খুচরা পর্যায়ে বিক্রি হয় ৫৯ টাকা ৬৯ পয়সায়। তার মানে, কৃষক বা ফার্ম থেকে খুচরা পর্যায়ে আসতে চালের দাম দ্বিগুণ হচ্ছে। একইভাবে কৃষক বা ফার্ম থেকে খুচরা পর্যায়ে ভোক্তাদের কাছে আসতে মসুর ডালের দাম বাড়ছে ৭৮ শতাংশ, পেঁয়াজে ৮৭ শতাংশ, আলুতে ৫০ শতাংশ, কাঁচা মরিচে ১১৬ শতাংশ, বেগুনে ৭২ শতাংশ, ডিমে ২৫ শতাংশ, গরুর মাংসে ১৩ শতাংশ, মাছে ১০ শতাংশ এবং ব্রয়লার মুরগিতে ২২ শতাংশ।’ এ থেকে বোঝা যায়, উৎপাদক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হলেও ভোক্তাকে উচ্চমূল্যই পরিশোধ করতে হচ্ছে। এই উদাহরণ থেকে একটি বিষয় প্রতীয়মান যে, একজন কৃষক কৃষিঋণ নিয়ে যে ফসল ফলান, তার উপযুক্ত দাম না পাওয়ায় তিনি কাঙিক্ষত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেন না। ফলে ব্যাংক থেকে গৃহীত ঋণ যথাসময়ে পরিশোধ করতে পারেন না।

এ কারণে ঋণটি খেলাপি হয়। আবার উচ্চমূল্যস্ফীতির ফলে মানুষের আয় কমে যায়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে। কারণ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উৎপাদিত পণ্যের ক্রেতা কম থাকলে কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জিত হয় না। ফলে ব্যাংক থেকে গৃহীত ঋণখেলাপি হয়। আবার একজন চাকরিজীবী বছর শেষে ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট পান। অথচ ১০ শতাংশ মূল্যস্ফীতির কারণে তার মোট খরচ ১০ শতাংশই বৃদ্ধি পায়। এর বিপরীতে ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট হলে বাকি ৫ শতাংশ ঘাটতি থেকে যায়, যা একসময় ব্যাংকঋণের ওপর প্রভাব ফেলে। ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বাধাগ্রস্ত হয়। বর্তমান পরিস্থিতিই তার বাস্তব উদাহরণ। আবার অর্থনীতির উপাদানগুলোকে গিটারের তারের সঙ্গে তুলনা করা যায়। যেখানে গিটারের যেকোনো একটি তার ছিঁড়ে গেলে বা নষ্ট হলে গিটারটি আর বাজে না। অর্থাৎ বাকিগুলোও বিকল হয়ে যায়। অর্থনীতির উপাদানগুলোও ঠিক তেমনই। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে দীর্ঘদিন মুদ্রা সংকোচন নীতির মাধ্যমে সুদের হার বৃদ্ধি করা হলো। ফলে দেশে বেকারত্ব বেড়ে গেল, যার প্রভাব পড়লো ব্যাংকিং খাতে। আর ঠিক এ কারণেই দেশে ব্যাংকিং খাতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে খেলাপি ঋণগ্রহীতার সংখ্যা বেশি। এ থেকে উত্তরণের একটিই উপায়, তা হলো কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ। একমাত্র এটিই পারে এ সমস্যা থেকে উত্তরণ ঘটাতে। সেই অপেক্ষায় দেশ ও জাতি।

[লেখক: ব্যাংকার]  



সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত