সংবাদ

জনপ্রতিনিধিরা দাপ্তরিক চেয়ারে বসেন কোন আইনে?


শরীফ আহমেদ
শরীফ আহমেদ
প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬, ০৮:২০ পিএম

জনপ্রতিনিধিরা দাপ্তরিক চেয়ারে বসেন কোন আইনে?

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় প্রত্যেক দায়িত্বশীল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতার একটি নির্দিষ্ট সীমারেখা থাকে। সেই সীমারেখা রক্ষা করাই সুশাসন, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা এবং রাষ্ট্রীয় প্রটোকলের অন্যতম ভিত্তি। কিন্তু আমাদের দেশে প্রায়ই দেখা যায়, কিছু জনপ্রতিনিধি সরকারি কর্মকর্তাদের নির্ধারিত আসনে বসেন, দাপ্তরিক কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করেন কিংবা প্রশাসনিক কর্তৃত্ব প্রদর্শনের চেষ্টা করেন। এসব আচরণ শুধু অনভিপ্রেতই নয়, বরং রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ও ক্ষমতার পৃথকীকরণের নীতিরও পরিপন্থী।

আইন ও জনপ্রশাসনের সুস্পষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যবহৃত দাপ্তরিক চেয়ার কেবল তাদের জন্যই নির্ধারিত। কোনো সংসদ সদস্য বা জনপ্রতিনিধি সেই চেয়ারে বসতে পারেন না।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রেও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে- জনপ্রতিনিধিরা সরকারি কর্মকর্তাদের দাপ্তরিক ফাইলে স্বাক্ষর করতে পারবেন না, প্রশাসনিক নির্দেশ দিতে পারবেন না এবং কর্মকর্তাদের নির্ধারিত আসনও ব্যবহার করতে পারবেন না। সরকারি দপ্তরে সফরের সময় তাদের জন্য আলাদা ভিজিটর চেয়ার, সোফা কিংবা সভার সভাপতি হিসেবে পৃথক আসনের ব্যবস্থা থাকে।

এখানে বিষয়টি কেবল একটি চেয়ারকে ঘিরে নয়; এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য, প্রটোকল এবং দায়িত্ববোধের প্রশ্ন। একজন সংসদ সদস্য জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে আইন প্রণয়ন, নীতিনির্ধারণ এবং জনগণের দাবি সংসদে তুলে ধরার দায়িত্ব পালন করেন। অন্যদিকে মাঠ প্রশাসনের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং নির্বাহী সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দায়িত্ব সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর ন্যস্ত। সংবিধান ও প্রশাসনিক কাঠামো একটি সুশৃঙ্খল রাষ্ট্র পরিচালনার স্বার্থে এই দুই দায়িত্বকে আলাদা রেখেছে।

যখন কোনো জনপ্রতিনিধি সরকারি কর্মকর্তার চেয়ারে বসেন কিংবা নির্বাহী কর্তৃত্বের প্রতীকী প্রকাশ ঘটান, তখন তা শুধু প্রটোকল ভঙ্গের বিষয় নয়; বরং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর ফলে সাধারণ মানুষের কাছেও একটি ভুল বার্তা পৌঁছে যায়- যেন জনপ্রতিনিধিরা প্রশাসনের ওপর সরাসরি কর্তৃত্ব রাখেন। অথচ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসন- উভয়েরই নিজ নিজ দায়িত্ব ও সীমারেখার মধ্যে থেকে কাজ করাই কাম্য।

দুঃখজনকভাবে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে অনেক সময় ক্ষমতার প্রদর্শনকে প্রভাবের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। ফলে কিছু জনপ্রতিনিধি মনে করেন, প্রশাসনিক প্রটোকল মেনে চলা হয়তো তাদের মর্যাদার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বাস্তবে বিষয়টি সম্পূর্ণ উল্টো। আইন, নিয়ম ও প্রটোকল মেনে চলাই একজন দায়িত্বশীল জনপ্রতিনিধির রাজনৈতিক পরিপক্বতা ও গণতান্ত্রিক চেতনার পরিচায়ক।

রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে যদি ক্ষমতার সীমারেখা সম্মান করা হয়, তবে প্রশাসনিক জবাবদিহিতা, নিরপেক্ষতা ও সুশাসন আরও শক্তিশালী হবে। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই- কেউ কারও প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং সবাই নিজ নিজ দায়িত্বের সীমারেখার মধ্যে থেকে রাষ্ট্র পরিচালনায় ভূমিকা রাখবেন।

তাই সরকারি কর্মকর্তার নির্ধারিত চেয়ার শুধু একটি আসন নয়; এটি রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা, সাংবিধানিক ভারসাম্য এবং দায়িত্ববোধের প্রতীক।

লেখক: সাংবাদিক। Email :Sharifnews1@gmail.com

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬


জনপ্রতিনিধিরা দাপ্তরিক চেয়ারে বসেন কোন আইনে?

প্রকাশের তারিখ : ১৫ আগস্ট ২০২৬

featured Image

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় প্রত্যেক দায়িত্বশীল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতার একটি নির্দিষ্ট সীমারেখা থাকে। সেই সীমারেখা রক্ষা করাই সুশাসন, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা এবং রাষ্ট্রীয় প্রটোকলের অন্যতম ভিত্তি। কিন্তু আমাদের দেশে প্রায়ই দেখা যায়, কিছু জনপ্রতিনিধি সরকারি কর্মকর্তাদের নির্ধারিত আসনে বসেন, দাপ্তরিক কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করেন কিংবা প্রশাসনিক কর্তৃত্ব প্রদর্শনের চেষ্টা করেন। এসব আচরণ শুধু অনভিপ্রেতই নয়, বরং রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ও ক্ষমতার পৃথকীকরণের নীতিরও পরিপন্থী।

আইন ও জনপ্রশাসনের সুস্পষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যবহৃত দাপ্তরিক চেয়ার কেবল তাদের জন্যই নির্ধারিত। কোনো সংসদ সদস্য বা জনপ্রতিনিধি সেই চেয়ারে বসতে পারেন না।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রেও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে- জনপ্রতিনিধিরা সরকারি কর্মকর্তাদের দাপ্তরিক ফাইলে স্বাক্ষর করতে পারবেন না, প্রশাসনিক নির্দেশ দিতে পারবেন না এবং কর্মকর্তাদের নির্ধারিত আসনও ব্যবহার করতে পারবেন না। সরকারি দপ্তরে সফরের সময় তাদের জন্য আলাদা ভিজিটর চেয়ার, সোফা কিংবা সভার সভাপতি হিসেবে পৃথক আসনের ব্যবস্থা থাকে।

এখানে বিষয়টি কেবল একটি চেয়ারকে ঘিরে নয়; এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য, প্রটোকল এবং দায়িত্ববোধের প্রশ্ন। একজন সংসদ সদস্য জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে আইন প্রণয়ন, নীতিনির্ধারণ এবং জনগণের দাবি সংসদে তুলে ধরার দায়িত্ব পালন করেন। অন্যদিকে মাঠ প্রশাসনের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং নির্বাহী সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দায়িত্ব সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর ন্যস্ত। সংবিধান ও প্রশাসনিক কাঠামো একটি সুশৃঙ্খল রাষ্ট্র পরিচালনার স্বার্থে এই দুই দায়িত্বকে আলাদা রেখেছে।

যখন কোনো জনপ্রতিনিধি সরকারি কর্মকর্তার চেয়ারে বসেন কিংবা নির্বাহী কর্তৃত্বের প্রতীকী প্রকাশ ঘটান, তখন তা শুধু প্রটোকল ভঙ্গের বিষয় নয়; বরং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর ফলে সাধারণ মানুষের কাছেও একটি ভুল বার্তা পৌঁছে যায়- যেন জনপ্রতিনিধিরা প্রশাসনের ওপর সরাসরি কর্তৃত্ব রাখেন। অথচ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসন- উভয়েরই নিজ নিজ দায়িত্ব ও সীমারেখার মধ্যে থেকে কাজ করাই কাম্য।

দুঃখজনকভাবে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে অনেক সময় ক্ষমতার প্রদর্শনকে প্রভাবের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। ফলে কিছু জনপ্রতিনিধি মনে করেন, প্রশাসনিক প্রটোকল মেনে চলা হয়তো তাদের মর্যাদার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বাস্তবে বিষয়টি সম্পূর্ণ উল্টো। আইন, নিয়ম ও প্রটোকল মেনে চলাই একজন দায়িত্বশীল জনপ্রতিনিধির রাজনৈতিক পরিপক্বতা ও গণতান্ত্রিক চেতনার পরিচায়ক।

রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে যদি ক্ষমতার সীমারেখা সম্মান করা হয়, তবে প্রশাসনিক জবাবদিহিতা, নিরপেক্ষতা ও সুশাসন আরও শক্তিশালী হবে। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই- কেউ কারও প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং সবাই নিজ নিজ দায়িত্বের সীমারেখার মধ্যে থেকে রাষ্ট্র পরিচালনায় ভূমিকা রাখবেন।

তাই সরকারি কর্মকর্তার নির্ধারিত চেয়ার শুধু একটি আসন নয়; এটি রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা, সাংবিধানিক ভারসাম্য এবং দায়িত্ববোধের প্রতীক।

লেখক: সাংবাদিক। Email :Sharifnews1@gmail.com


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত