যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে
সাল ২০২৪। সেপ্টেম্বর শেষ হয় হয়। ইসরায়েলের সঙ্গে হওয়া যুদ্ধে হিজবুল্লাহর টিকে থাকা দায়। সংগঠনটি এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল।
ইসরায়েলের ৮০টি বোমা লেবাননের এই সংগঠনের সদর দপ্তর ধ্বংস করে দিয়েছিল। নিহত হয়েছিলেন সংগঠনটির বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা। তাদের মধ্যে ছিলেন হাসান নাসরাল্লাহও। মনে হচ্ছিল, ইসরায়েলিরা তাকে খুঁজে বের করে ফেলেছিল; এমনকি মাটির ৬০ ফুট নিচেও তিনি নিরাপদ ছিলেন না।
হিজবুল্লাহর কমান্ডারদের সন্দেহ হচ্ছিল যে, ইসরায়েল তাদের ফোনে আড়ি পেতেছে। এমনকি তারা কী বলছে বা করছে তার সবই জানতে পারছে শত্রুপক্ষ। ইসরায়েল হাজার হাজার পেজার ও ওয়াকিটকিতেও বিস্ফোরক বসিয়ে দিয়েছিল, যার ফল হয়েছিল ভয়াবহ।
তাই বেঁচে থাকা কমান্ডাররা ফোন ফেলে মোটরসাইকেল ও স্কুটারে চড়ে হারেত হরেইক, চিয়াহ এবং বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলের অন্য এলাকায় ছুটতে শুরু করেন। এসব এলাকা স্থানীয়ভাবে দাহিয়েহ নামে পরিচিত।
সবকিছুই যেন হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল। নাসরাল্লাহ যেখানে নিরাপদ ছিলেন না, সেখানে আর কারও নিরাপদ থাকবার কথা নয়।
এবার হিজবুল্লাহকে শেষ ভরসার পরিকল্পনায় যেতে হলো যে পরিকল্পনা কখনো বাস্তবায়ন করতে হবে বলে কমান্ডাররা ভাবেননি। দাহিয়েহর বিভিন্ন জায়গায়, যেমন বেকারি, ব্যাংকের শাখা কিংবা ফোনের দোকানের মতো পরিচিত স্থানে একে অন্যের সঙ্গে দেখা করতে হবে।
যোগাযোগ করতে হবে চোখে চোখ রেখে। শুধু সামনাসামনি।
একত্র হওয়ার পর তারা সংগঠনকে আবার সংগঠিত করা এবং দক্ষিণ লেবাননে আসন্ন ইসরায়েলি স্থল অভিযানের মুখোমুখি হওয়ার পরিকল্পনা করেন। সেখান থেকেই হিজবুল্লাহর ঘুরে দাঁড়ানোর শুরু যে ঘুরে দাঁড়ানো একসময় সংগঠনটিকে পতনের কিনারা থেকে ফিরিয়ে আনে এবং এর সামরিক কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করে।
মিডল ইস্ট আই হিজবুল্লাহ সম্পর্কে ঘনিষ্ঠ জ্ঞান থাকা সাতজন ব্যক্তি, সংগঠনটির ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ব্যক্তি, লেবাননের রাজনীতিক ও কর্মকর্তা এবং কয়েকজন আরব কূটনীতিকের সঙ্গে কথা বলেছে। তাদের প্রায় সবাই পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন।
তারা জানিয়েছেন, তীব্র আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কীভাবে হিজবুল্লাহ একটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল এবং পরাজয়ের পর কীভাবে সংগঠনটি তার সামরিক শাখাকে আবার দাঁড় করাতে সক্ষম হয়।
সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে, সংগঠনটির ভবিষ্যৎ নিয়ে অভ্যন্তরীণ আলোচনায় কী উঠে এসেছে, ২০২৩ সালের পর লেবাননে ইসরায়েলের দুটি যুদ্ধে ইরানের ভূমিকা কী ছিল, হিজবুল্লাহর অর্থনৈতিক সংকট কতটা গভীর এবং সংগঠনটি যে শিয়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব ও সুরক্ষার দাবি করে, সেই জনগোষ্ঠীর মধ্যে কতটা অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে ওয়াকিটকি বিস্ফোরণের ঘটনা কীভাবে প্রায় গণহত্যায় রূপ নিতে পারত হিজবুল্লাহ কীভাবে পুরনো রকেট প্রযুক্তিকে নতুন কাজে ব্যবহার করেছে কীভাবে ভিডিও গেমে অভ্যস্ত তরুণেরা যুদ্ধের গতিপথ বদলে দিয়েছে হতাশ ডনাল্ড ট্রাম্প কেন হিজবুল্লাহর সঙ্গে সরাসরি কথা বলার দাবি করেছিলেন এটি ২০২৪ সালে ইসরায়েলের কাছে হিজবুল্লাহর পরাজয়, ১৫ মাস পর নতুন এক যুদ্ধে সংগঠনটির বিস্ময়কর পুনরুত্থান এবং বর্তমানে হিজবুল্লাহর অবস্থার গল্প যখন দেশের ভেতরে ও বাইরে তার শত্রুরা সংগঠনটির সামরিক শক্তি চিরতরে ভোঁতা করে দিতে চাইছে।
যুদ্ধের আগে বন্ধ দরজার ভেতরে হিজবুল্লাহর সদস্যদের মধ্যে মোটামুটি একটি বিষয়ে ঐকমত্য আছে—২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলে হামলা চালানো ছিল গভীর ও ঐতিহাসিক ভুল। অন্তত যেভাবে হামলাটি করা হয়েছিল, তা ভুল ছিল।
তিনটি সূত্র বলছে, সিদ্ধান্তটি একান্তই নাসরাল্লাহর ছিল এবং হিজবুল্লাহর নির্বাহী সংস্থা শুরা কাউন্সিলের ভেতরে এর বিরোধিতা করেছিলেন কেউ কেউ।
চলতি মাসের শুরুতে ইসরায়েলের আর্মি রেডিও প্যালেস্টাইনি সংগঠন হামাসের ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলার আগের কয়েক মাস ও বছরজুড়ে হামাস ও হিজবুল্লাহর মধ্যে আলোচনার বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী উদ্ধার করেছে বলে দাবি করা অভ্যন্তরীণ নথির বরাত দিয়ে আর্মি রেডিও জানায়, গাজায় হামাসের নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ার নাসরাল্লাহকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সমন্বিত আকস্মিক হামলায় যোগ দেয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। হিজবুল্লাহর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, সাবেক সংসদ সদস্য এবং সীমান্ত ও সম্পদ বিভাগের প্রধান নাওয়াফ মুসাভি এসব প্রতিবেদনকে ‘মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ’ বলে উড়িয়ে দেন।
তিনি মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘এটা নিছক প্রচারণা, মাটির বাস্তবতা নয়।’
তবে হিজবুল্লাহর অন্য কয়েকজন সদস্য পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, ইসরায়েলি প্রতিবেদনে কিছুটা সত্যতা থাকতে পারে।
বছরের পর বছর ধরে ইরান এবং তার মিত্র রাষ্ট্র ও সশস্ত্র সংগঠনগুলোর জোট ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ বা প্রতিরোধের অক্ষ একটি কৌশল গড়ে তুলেছে ‘ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট’। এর লক্ষ্য ছিল ইসরায়েলকে চারদিক থেকে শত্রু দিয়ে ঘিরে রাখা, যাতে সব দিক থেকেই হামলার আশঙ্কা থাকে।
এই কৌশলের মূল চালিকাশক্তি ছিলেন প্রয়াত ইরানি জেনারেল কাসেম সোলেইমানি এবং নাসরাল্লাহ। তার ক্যারিশমা, সামরিক সাফল্য ও রাজনৈতিক দক্ষতা তাকে আঞ্চলিকভাবে অত্যন্ত প্রভাবশালী করে তুলেছিল।
আরবি ভাষায় দক্ষ এবং অসংখ্য যুদ্ধে অভিজ্ঞ সোলেইমানি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) বিদেশে পরিচালিত এলিট ইউনিট কুদস ফোর্সের প্রধান হিসেবে ইরানের মিত্রদের তদারক ও কখনো কখনো নির্দেশ দিতেন। এসব মিত্রের মধ্যে ছিল ইরাকের আধাসামরিক বাহিনী এবং ইয়েমেনের আনসার আল্লাহ যা হুতিদের নামে বেশি পরিচিত।
ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যেও তার ছিল গভীর প্রভাব। তার ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদা তেহরানকে এমন সক্রিয় এবং ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে প্রভাবিত করতে পারত, যেসব ক্ষেত্রে ইরান সাধারণত ‘কৌশলগত ধৈর্য’ অবলম্বন করে অপেক্ষাকৃত সতর্ক নীতি অনুসরণ করতে আগ্রহী ছিল।
দু’জনের এই একই ধরনের গতিশীলতার উদাহরণ হিসেবে একটি সূত্র ২০১২ সালের একটি কথোপকথনের কথা বলেন। সে সময় সোলেইমানি নাসরাল্লাহকে বাশার আল-আসাদের সমর্থনে সিরিয়ার যুদ্ধে হিজবুল্লাহর হস্তক্ষেপের পরামর্শ দিয়েছিলেন।
সূত্রটি বলেন, ‘নাসরাল্লাহ বলেছিলেন, ‘আপনি ঠিক বলেছেন, আমাদের যেতে হবে। তবে আমাদের তো গতকালই সিরিয়ায় থাকা উচিত ছিল।’
২০২০ সালের জানুয়ারিতে বাগদাদে মার্কিন ড্রোন হামলায় সোলেইমানির হত্যাকাণ্ড ছিল একটি বড় মোড়। প্রতিরোধের ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট কৌশলের প্রধান চালিকাশক্তিকে হারায় জোটটি। কৌশলটি ধীরে ধীরে গতি হারাতে থাকে। হিজবুল্লাহর তিনটি সূত্রের মতে, শেষ পর্যন্ত এ কারণেই ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস নিজেই সিদ্ধান্ত নেয়ার পথে যায়।
দুটি সূত্র জানায়, হামলার পর তৎকালীন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেইন আমির-আবদুল্লাহিয়ান বৈরুত সফর করে নাসরাল্লাহকে স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে তেহরান শুধু নৈতিকভাবে যুদ্ধকে সমর্থন করতে প্রস্তুত।
নাসরাল্লাহও ইরানিদের মতোই ভয় পেতেন, এতে যুক্তরাষ্ট্রের ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে। তাই তিনি আগেই সীমিতভাবে হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ৮ অক্টোবর তিনি ইসরায়েলের দিকে এক দফা রকেট ছোড়ার নির্দেশ দেন। গাজায় যখন বোমা পড়ছিল, তখনই তিনি একটি ‘সমর্থন ফ্রন্ট’ খুলে দেন।
তবে তার কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা, বিশেষ করে রাদওয়ান ফোর্সের বিশেষ অভিযান ইউনিটের প্রধান ইব্রাহিম আকিল এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন। তাদের মত ছিল, হিজবুল্লাহকে হয় পুরোপুরি যুদ্ধে যেতে হবে, নয়তো একেবারেই যাওয়া যাবে না।
অল্পের জন্য এড়ানো বড় বিপর্যয় এক বছর ধরে হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যে সীমান্তজুড়ে পাল্টাপাল্টি হামলা চলেছে। জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় সংঘাত এড়ানোর যে সীমারেখাটি কার্যত সীমান্ত হিসেবে কাজ করে, সেই ব্লু লাইনের দুই পাশে প্রায় ৭ হাজার রকেট, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং বিমান ও কামানের হামলা হয়েছে।
লেবাননের ক্ষয়ক্ষতি ইসরায়েলের তুলনায় ছিল বহুগুণ বেশি। সীমান্তের দক্ষিণে ইসরায়েলের ৭০ জনের বিপরীতে লেবাননে নিহত হন প্রায় ২ হাজার মানুষ।
তবু হিজবুল্লাহ বিপুলসংখ্যক ইসরায়েলি সেনাকে ব্যস্ত রাখতে পেরেছিল। এর ফলে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ থেকে কিছু সম্পদ ও সেনা অন্যদিকে সরাতে হয়েছে এবং উত্তরাঞ্চল থেকে প্রায় ৬০ হাজার ইসরায়েলিকে সরিয়ে নিতে হয়েছে।
দুই পক্ষই কিছু অলিখিত সীমার মধ্যে কাজ করছিল। অর্থাৎ নির্দিষ্ট কোনো হামলা বা লক্ষ্যবস্তুর জবাবে একই ধরনের প্রতিক্রিয়া জানানো হবে এমন একটি বোঝাপড়া ছিল। নাসরাল্লাহ সতর্ক করে দিয়েছিলেন, দাহিয়েহতে হামলা হলে তার জবাব দেয়া হবে তেল আবিবে।
কিন্তু ইসরায়েল ধীরে ধীরে সেই সীমা ঠেলে দিতে থাকে এবং হিজবুল্লাহর সংকল্প পরীক্ষা করতে থাকে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে দাহিয়েহতে ইসরায়েলি হামলায় হামাসের জ্যেষ্ঠ নেতা সালেহ আল-আরুরি নিহত হন।
এর জবাবে হিজবুল্লাহ মেরন পর্বতে ইসরায়েলি একটি সামরিক ঘাঁটিতে বড় ধরনের রকেট হামলা চালায়। দলটির সূত্রগুলো বলছে, হামলার লক্ষ্য তেল আবিব করা হয়নি, কারণ আরুরি ছিলেন প্যালেস্টাইনি, লেবাননি নন। তাই জবাবের মাত্রাও সে অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়েছিল।
ছয় মাস পর হিজবুল্লাহর শীর্ষ সামরিক কমান্ডার ফুয়াদ শুকর নিহত হলে সংগঠনটি প্রতিশোধ হিসেবে ইসরায়েলের দিকে এক হাজার রকেট ছোড়ার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু ইসরায়েল আগেই হামলা চালিয়ে অধিকাংশ রকেট উৎক্ষেপণস্থল ধ্বংস করে দেয়।
হিজবুল্লাহর দুটি সূত্র বলছে, ইসরায়েলিরা পুরো সময়ই সংগঠনটির নেতৃত্বের প্রতিক্রিয়ার পরিকল্পনা শুনছিল।
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি এসে হিজবুল্লাহর নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা ব্যবস্থায় কতটা বড় ধরনের ফাঁক তৈরি হয়েছে, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
২০২৪ সালের ১৭ ও ১৮ সেপ্টেম্বর ইসরায়েল হাজার হাজার পেজার এবং শত শত ওয়াকিটকি বিস্ফোরিত করে। ইসরায়েলের সমর্থকেরা এই অভিযানকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে অভিহিত করেছেন, যেন কোনো জেমস বন্ডের সিনেমার ঘটনা।
ভুয়া কোম্পানি ব্যবহার করে হিজবুল্লাহর সরবরাহব্যবস্থায় ঢুকে মোসাদ যোগাযোগের এসব যন্ত্রে বিস্ফোরক ঢুকিয়ে দেয়। এতে প্রায় ৪০ জন নিহত এবং হাজার হাজার মানুষ আহত হন।
তৎকালীন মোসাদপ্রধান ডেভিড বার্নিয়া বলেছিলেন, এটি ছিল ‘আমাদের মিশন বাস্তবায়নের স্পষ্ট উদাহরণ’। হামলাটির স্মারক হিসেবে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ডনাল্ড ট্রাম্পকে একটি সোনার পেজার উপহারও দিয়েছিলেন।
হিজবুল্লাহর সূত্রগুলো অস্বীকার করে না যে এটি ছিল ভয়াবহ আঘাত। তবে তাদের দাবি, অভিযানটি শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে।
১৭ সেপ্টেম্বর বিস্ফোরিত পেজারগুলোই সংবাদ শিরোনাম কেড়ে নিয়েছিল। কিন্তু প্রকৃত লক্ষ্য ছিল ওয়াকিটকি যেগুলো আকারে বড়, বেশি বিস্ফোরক বহন করত এবং মাঠপর্যায়ের যোদ্ধারা ব্যবহার করতেন।
হিজবুল্লাহর পেজারগুলো মূলত লোকজনকে ডাকার কাজে ব্যবহৃত হতো এবং সেগুলোর ব্যবহারকারী ছিলেন বেশির ভাগই বেসামরিক সদস্য। ২০২২ সাল থেকেই ইসরায়েল সংগঠনটিকে এসব নষ্ট করা যন্ত্র সরবরাহ করতে শুরু করেছিল। হামলার সময় প্রায় ২ হাজার ৫০০ পেজার ব্যবহারে ছিল।
কিন্তু ওয়াকিটকি অভিযানের প্রস্তুতি নাকি চলছিল এক দশক ধরে। দুটি সূত্রের মতে, ১৮ সেপ্টেম্বর ইসরায়েল ওই অভিযান শুরু করার সময় ১৫ হাজার ওয়াকিটকি গুদামে রাখা ছিল। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সেগুলো তখন বন্ধ ছিল।
এই সংখ্যা আগে মোসাদের এক এজেন্টের দেয়া তথ্যের সঙ্গেও মেলে। ওই এজেন্ট দাবি করেছিলেন, একটি গোপন ইসরায়েলি ভুয়া কোম্পানি হিজবুল্লাহকে ১৬ হাজার ওয়াকিটকি সরবরাহ করেছিল।
পেজার হামলার পরদিন মাত্র কয়েকশ’ ওয়াকিটকি বিস্ফোরিত হয়, যেখানে হাজার হাজার পেজার বিস্ফোরিত হয়েছিল। কিন্তু ওয়াকিটকির হামলার ভয়াবহতা ছিল বেশি। দ্বিতীয় হামলায় অন্তত ২৫ জন নিহত হন, আগের দিন নিহত হয়েছিলেন ১২ জন।
হিজবুল্লাহর দুটি সূত্রের মতে, ইসরায়েল কেন আগেভাগে হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তার কারণ হলো মোসাদ হিজবুল্লাহর অভ্যন্তরীণ আলোচনা শুনছিল এবং তারা জানত, হাতে আর সময় নেই।
সেপ্টেম্বরের শুরুতেই হিজবুল্লাহ ও ইরান বুঝতে পারে, যুদ্ধ আর সীমিত রাখা সম্ভব নয়। লেবাননের সংগঠনটি তখন সর্বশক্তি দিয়ে যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
১৯ সেপ্টেম্বর একটি বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। সেখানে হিজবুল্লাহর নেতৃত্ব বড় ধরনের উত্তেজনা বৃদ্ধির পরিকল্পনায় আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেবে। ওই পরিকল্পনায় স্থল অভিযানও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
কিন্তু হিজবুল্লাহর একটি পরিদর্শক দল সংগঠনটিকে সরবরাহ করা পেজারগুলো নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করতে থাকে।
যন্ত্রগুলো এরই মধ্যে দুবার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল। তারপরও সন্দেহ কাটেনি। তাই কয়েকটি নমুনা আরও পরীক্ষা করার জন্য ইরানে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়।
সূত্রগুলোর মতে, এই সিদ্ধান্তই ইসরায়েলকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করে।
একটি সূত্র বলেন, ‘পেজারগুলো যদি বিস্ফোরিত না হতো, তাহলে ওয়াকিটকিগুলো চালু করে হাজার হাজার যোদ্ধার মধ্যে বিতরণ করা হতো। এরপর সেগুলো বিস্ফোরিত করা হতো।’
হিজবুল্লাহর পরাজয় ৬৬ দিন ধরে ইসরায়েল হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ভয়াবহ বিমান ও স্থল অভিযান চালায়। একের পর এক আঘাতে সংগঠনটিকে বিপর্যস্ত করে ফেলে তারা।
ইসরায়েল শুধু নাসরাল্লাহকেই হত্যা করেনি; তার চাচাতো ভাই ও উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচিত হাশেম সাফিয়েদ্দিনকেও হত্যা করে।
হিজবুল্লাহর সামরিক নেতৃত্বের অধিকাংশই নিহত হন। তাদের মধ্যে ছিলেন আকিল এবং তার রাদওয়ান ফোর্সের কমান্ডাররা। তাঁরা এমন একটি কমান্ড সেন্টারে বৈঠক করছিলেন, যেটি ২০০৬ সালের ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ যুদ্ধের সময় নাসরাল্লাহ ব্যবহার করেছিলেন।
হিজবুল্লাহর পুরো ইউনিট, গোলাবারুদের গুদাম এবং সংগঠনটির সম্ভাব্য হামলায় ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত রাখা অন্য লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করা হয়।
এর আগে মিডল ইস্ট আইকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যে কমান্ডাররা এই হামলা থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন, তাদের বেশির ভাগই বেঁচে যান কারণ তারা ফোন ধরেননি।
দক্ষিণে হিজবুল্লাহর ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন ইউনিট সংগঠনটিকে সময় কিনে দেয়। উত্তরে হিজবুল্লাহর নেতৃত্বের ওপর যে বিপর্যয় নেমে এসেছে, সে সম্পর্কে কোনো ধারণা ছাড়াই তারা আক্রমণকারী ইসরায়েলি সেনাদের সঙ্গে লড়াই করতে থাকে। দক্ষিণে হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা ইসরায়েলি সেনাদের আটকে রাখার সময় ইরান তার মিত্রকে সহায়তা করতে এগিয়ে আসে।
দুটি সূত্রের মতে, হিজবুল্লাহর সামরিক কাঠামো ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের মতো। প্রতিটি কমান্ডারের একজন করে ইরানি পড়ঁহঃবৎঢ়ধৎঃ বা সমপর্যায়ের প্রতিনিধি থাকে।
হিজবুল্লাহর বিভিন্ন ইউনিট ও বিভাগের প্রধান এবং তাদের ডেপুটিদের হত্যা করা হলে সেই শূন্যতা পূরণে ইরানি প্রতিনিধিরা লেবাননে আসেন। একটি সূত্র জানায়, তাদের মধ্যে ছিলেন সোলেইমানির উত্তরসূরি এবং কুদস ফোর্সের প্রধান ইসমাইল কায়ানি। কুদস ফোর্সের লেবানন শাখার প্রধান আব্বাস নিলফোরুশান নাসরাল্লাহর সঙ্গে হিজবুল্লাহর সদর দপ্তরে হামলায় নিহত হন।
হিজবুল্লাহ মনে করে, তাদের প্রতিরোধক্ষমতা ইসরায়েলকে বিস্মিত করেছিল। শেষ পর্যন্ত ইসরায়েল যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়।
সংগঠনটির সূত্রগুলো বলছে, নেতানিয়াহু মনে করেছিলেন, আর কোনো ইসরায়েলি সেনার জীবন ঝুঁকিতে না ফেলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চাপের মাধ্যমে রাজনৈতিকভাবে হিজবুল্লাহকে শেষ করে দেয়া সম্ভব।
লেবানন ও আন্তর্জাতিক মহলে তখন প্রায় বদ্ধমূল ধারণা তৈরি হয় যে হিজবুল্লাহ ‘ছিন্নভিন্ন’ হয়ে গেছে এবং তার সামরিক শক্তি আগের মাত্রার ২০ শতাংশে নেমে এসেছে যদি আদৌ এতটা থেকেও থাকে।
হিজবুল্লাহকে শেষ করা না গেলে লেবাননকে পুরোপুরি ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচানো যাবে না এমন ধারণার পক্ষে জনমত তৈরি হতে থাকে।
একজন আরব কূটনীতিকের মতে, হিজবুল্লাহ এতটা দুর্বল হয়ে পড়ায় সৌদিরা উচ্ছ্বসিত হয়েছিল। ওই কূটনীতিক বলেন, মিসরীয়রা ফরাসিদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে হিজবুল্লাহকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল যে সবচেয়ে শক্তিশালী সশস্ত্র অরাষ্ট্রীয় সংগঠন হিসেবে তাদের সময় শেষ। এখন নেতাদের উচিত সম্মানজনকভাবে সরে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়া।
হিজবুল্লাহর সূত্রগুলোর মতে, সংগঠনটি তখন টিকে থাকার লড়াইয়ে ছিল এবং বড় ধরনের ছাড় দেয়ার বিষয়েও আগ্রহী ছিল।
সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের পতন হিজবুল্লাহর অবস্থানকে আরও দুর্বল করে।
এক দশক ধরে ঘৃণিত স্বৈরশাসককে ক্ষমতায় রাখতে সিরিয়ার বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াই করে হিজবুল্লাহ বহু যোদ্ধা, অর্থ এবং আরব জনগণের বড় অংশের সহানুভূতি হারিয়েছিল। লেবাননে যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার দিনই যখন সিরিয়ায় বিদ্রোহীদের আকস্মিক অভিযান শুরু হয়, তখন আবার আসাদকে বাঁচানোর মতো অবস্থায় ছিল না হিজবুল্লাহ।
আসাদের পতনে হিজবুল্লাহর শত্রুরা আরও সাহসী হয়ে ওঠে। যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে হিজবুল্লাহকে লিতানি নদীর দক্ষিণ থেকে সব বাহিনী সরিয়ে নেয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু এরপর বিভিন্ন দেশ ও লেবাননের রাজনৈতিক দলগুলো আরও উত্তর দিকে সরে যাওয়ার দাবি জানাতে শুরু করে।
এক আরব কূটনীতিক মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘আসাদ পতনের পর বক্তব্যের ধরন বদলে যায়। লিতানি নদীর উত্তরে সরে যাওয়ার দাবিও ওঠে, যদিও আমরা সবাই জানতাম, মূল চুক্তিতে এমন কিছু ছিল না।’
হিজবুল্লাহর প্রতি এই সর্বোচ্চ চাপের নীতি সংগঠনটির অবস্থানও আরও কঠোর ও আগ্রাসী করে তোলে। যুদ্ধবিরতি চুক্তি বারবার লঙ্ঘন করে ইসরায়েলের প্রায় প্রতিদিনের হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে।
হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ এক সূত্র বলেন, ‘লেবানন রাষ্ট্র এবং যুক্তরাষ্ট্র হিজবুল্লাহকে রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে টেনে নেয়ার একটি সুযোগ হারিয়েছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরের পর হিজবুল্লাহ জানিয়েছিল, তারা আলোচনার জন্য উন্মুক্ত। এমনকি ইরানের সঙ্গে জুনের যুদ্ধেও তারা অংশ নেয়নি।’
‘কিন্তু ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত থাকা এবং রাষ্ট্রের কোনো বিকল্প পথ দেখাতে অনিচ্ছার কারণে তাদের আর নমনীয় থাকার সুযোগ ছিল না।’
প্রতিরক্ষা থেকে আক্রমণে বাইরে থেকে দেখলে মনে হচ্ছিল, ১৫ মাসের যুদ্ধবিরতিতে হিজবুল্লাহর সামরিক শাখা রক্তক্ষরণে ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে।
ইসরায়েলের অবিরাম হামলায় যেন ‘হাজার ক্ষত’ দিয়ে মৃত্যু নয়, বরং ৩ হাজার বিমান, ড্রোন ও কামানের হামলা নেমে এসেছিল।
হিজবুল্লাহর অধিকাংশ কমান্ডার এবং তাদের উত্তরসূরিদের হত্যা করার পর এবার তাদের উত্তরসূরিদের উত্তরসূরিদেরও একে একে হত্যা করা হচ্ছিল।
এদিকে ইসরায়েলি সেনা ও ঠিকাদারেরা পাঁচটি সামরিক ঘাঁটি শক্তিশালী ও সম্প্রসারিত করে। সীমান্তের পাশে শিয়া-অধ্যুষিত প্রতিটি শহর ও গ্রাম প্রায় মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া হয়।
হিজবুল্লাহর এক সূত্র বলেন, ‘সীমান্ত এলাকা এখন ফুটবল মাঠের মতো পুরোপুরি সমতল। একটি ভবনও দাঁড়িয়ে নেই; নেই বাড়ি, নেই মসজিদ।’
সংগঠনটির পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো প্রতিক্রিয়া না আসায় মনে হচ্ছিল, তারা হয় এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে যে আর দাঁড়াতে পারছে না, অথবা নিজেদের রক্ষার সাহস হারিয়েছে।
বাস্তবে হিজবুল্লাহ তখন বড় ধরনের সামরিক পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। লক্ষ্য ছিল এমন একটি কাঠামো তৈরি করা, যাতে আবারও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নিজেদের সামলে লড়াই করা যায়।
দুই জ্যেষ্ঠ সূত্র মিডল ইস্ট আইকে বলেন, সামরিক শাখাটি অতিরিক্ত বড় ও জটিল হয়ে উঠেছিল। কার্যকরভাবে কাজ করার জন্য এটি ছিল অতিরিক্ত ভারী ও ধীরগতির। যুদ্ধ সেই কাঠামোকে আরও পঙ্গু করে দিয়েছিল।
সমাধান ছিল কাঠামোটিকে একেকটি অংশে ভেঙে ফেলা।
সূত্রগুলোর মতে, ইউনিট ও বিভাগগুলোকে একে অন্যের কাছ থেকে পুরোপুরি স্বাধীন করে দেয়া হয়। এর ভিত্তি ছিল প্রয়াত হিজবুল্লাহ কমান্ডার ইমাদ মুগনিয়েহর নেতৃত্বে কার্যকর হওয়া গেরিলা যুদ্ধের মডেল। প্রতিটি ইউনিটকে কিছু নির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়। এগুলো ছিল আগে থেকেই নির্ধারিত বিভিন্ন পরিস্থিতির জন্য এক ধরনের যুদ্ধ-নির্দেশিকা। ফলে যুদ্ধের উত্তপ্ত সময়ে কেন্দ্রীয় কমান্ডের নির্দেশের অপেক্ষা না করেও ইউনিটগুলো কার্যকরভাবে কাজ করতে পারতো।
নতুন নির্দেশনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল যোদ্ধাদের শেষ গুলি পর্যন্ত লড়াই করতেই হবে, এমন নয়। প্রয়োজন হলে কোনো ইউনিটকে এলাকা ছেড়ে দেওয়ার অনুমতিও দেয়া হয়।
চলতি বছরের মার্চে এই নতুন কাঠামোর প্রথম বড় পরীক্ষা হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে এবং দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করে।
খামেনি ছিলেন হিজবুল্লাহ এবং বহু শিয়া লেবাননির কাছে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় নেতা। হিজবুল্লাহ ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ‘ভিলায়াত আল-ফকিহ’ মতবাদ অনুসরণ করে। খামেনি হত্যার জবাবে সীমান্তের ওপারে ছয়টি রকেট ছোড়া হয়।
তবে হিজবুল্লাহর বর্ণনা অনুযায়ী, সংগঠনটি একই সঙ্গে নিশ্চিত হয়েছিল যে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সুযোগ নিয়ে ইসরায়েল লেবাননে নতুন হামলা চালাতে যাচ্ছে। তাই তারা আগেভাগেই হামলা করার সিদ্ধান্ত নেয়। পরবর্তী সময়ে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের কিছু প্রতিবেদনেও এই মূল্যায়নের সমর্থন পাওয়া যায়।
এক সূত্র বলেন, ‘মার্চে ওই রকেট ছোড়ার সিদ্ধান্ত ছিল সম্পূর্ণ নাঈম কাসেমের সিদ্ধান্ত।’ তিনি নাসরাল্লাহর উত্তরসূরি হিসেবে সংগঠনটির মহাসচিব হয়েছেন। ‘তবে ইরানও এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছিল।’
অন্য এক সূত্র বলেন, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের জবাবে খামেনি হত্যার অনেক আগেই হিজবুল্লাহর ইসরায়েলে হামলা করা উচিত ছিল—ইরানের পরামর্শ ছিল এমনই। ‘কিন্তু হিজবুল্লাহ ভিন্ন হিসাব করেছিল।’
আকাশ থেকে মৃত্যু মধ্যপ্রাচ্যে এখন গেমিং ক্যাফের অভাব নেই।
জেরুজালেম থেকে তেহরান, কায়রো পর্যন্ত ধোঁয়ায় ভারী অন্ধকার ঘরে তরুণদের দেখা যায় পর্দার সামনে বসে ফিফা কিংবা সর্বশেষ ফার্স্ট-পারসন-ভিউ (এফপিভি) শুটিং গেমে একে অপরকে চ্যালেঞ্জ করতে।
দাহিয়েহতে হিজবুল্লাহর অভিজ্ঞ সদস্যরা জেন-জি তরুণদের দেখে হতাশ হতেন। আমেরিকান প্রোগ্রামারদের বানানো কাল্পনিক যুদ্ধে তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা নষ্ট করছে এটাই তাদের চোখে পড়তো। ইসরায়েলিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা প্রবীণদের মনে হতো, তরুণেরা বুঝি নরম হয়ে যাচ্ছে।
তারা জানতেন না, এই তরুণেরাই পরের যুদ্ধে শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধের গতিপথ বদলে দেবে।
২০২৬ সালের মার্চে আবার যুদ্ধ শুরু হলে ইসরায়েলি সেনারা লিতানি নদীর দক্ষিণে এবং তারও বাইরে লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। ব্যক্তিগত বাড়ি, পরিত্যক্ত সামরিক ঘাঁটি, এমনকি একটি ক্রুসেডার দুর্গেও তারা প্রায় ৩০০টি অবস্থান গড়ে তোলে।
আগের যুদ্ধে তীব্র লড়াই হওয়া বিন্ত জবেইলের মতো শহরগুলো হিজবুল্লাহ নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী ছেড়ে দেয়। কিন্তু কোথাও ইসরায়েল নিরাপদ ছিল না। ইসরায়েলি সেনাদের সারাক্ষণ বিরক্ত করা, হয়রানি করা এবং লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছে। ২ মার্চের পর থেকে দক্ষিণ লেবাননে প্রায় ২০ ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছে।
লক্ষ্য ছিল, ইসরায়েলি সেনারা যাতে কোনো অবস্থানকে স্থায়ী ঘাঁটিতে পরিণত করার সুযোগ না পায়। ২০২৪ সালে সীমান্তে পাঁচটি ঘাঁটি তৈরির মতো ঘটনা যেন আর না ঘটে। এ কাজে হিজবুল্লাহ ড্রোন ব্যবহার করছে।
ইসরায়েলের সঙ্গে প্রতিটি নতুন দফার লড়াইয়ে নতুন কোনো অস্ত্র হাজির করার প্রবণতা রয়েছে হিজবুল্লাহর। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের সামরিক উদ্ভাবনক্ষমতার জানান দেয়।
২০০৬ সালে ছিল করনেট অ্যান্টি-ট্যাংক ক্ষেপণাস্ত্র। এটি ইসরায়েলি সাঁজোয়া যান ভেদ করে বড় ধরনের কৌশলগত বিস্ময় সৃষ্টি করেছিল। এবার ব্যবহার করা হচ্ছে এফপিভি ড্রোন। এগুলো ফাইবার-অপটিক কেবলের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ায় বৈদ্যুতিন বাধা দিয়ে এগুলো ঠেকানো কঠিন।
নেতানিয়াহু সস্তা কিন্তু প্রাণঘাতী এই উড়ন্ত যন্ত্রগুলোকে ‘কেন্দ্রীয় হুমকি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ড্রোনগুলো শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং পুরো হামলার ভিডিও ধারণ করে।
ইউক্রেনের মতোই এসব আক্রমণাত্মক ড্রোন পরিচালনার দক্ষতা এসেছে ভিডিও গেমের সংস্কৃতি থেকে। দুটি সূত্রের মতে, এখন হিজবুল্লাহর ড্রোনচালকদের বড় অংশই লেবাননের গেমার।
প্রযুক্তিটি অবশ্য একেবারে নতুন নয়। ২০২৪ সালের যুদ্ধেও হিজবুল্লাহ ড্রোন ব্যবহার করেছিল। তবে এরপর উৎপাদন বহুগুণ বেড়েছে। ড্রোনগুলোও উন্নত করা হয়েছে। এখন এগুলো বেশি বিস্ফোরক বহন করতে পারে এবং ফলে মারকাভা ট্যাংকের জন্য আরও বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।
হিজবুল্লাহর জন্য সৌভাগ্যের বিষয় হলো, ড্রোন তৈরির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপকরণগুলোর অনেকটাই তাদের আগে থেকেই ছিল।
২০২৪ সালের যুদ্ধে হিজবুল্লাহ আলমাস-১ নামে উন্নত ফাইবার-অপটিক অ্যান্টি-ট্যাংক গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার শুরু করে। এতে টেলিভিশন ও তাপীয় চিত্রনির্ভর যৌথ নির্দেশনা ব্যবস্থা ছিল। এটি একটি ইসরায়েলি স্পাইক ক্ষেপণাস্ত্রের নকশা উল্টোভাবে বিশ্লেষণ করে তৈরি করা হয়েছিল, যা আগে হিজবুল্লাহর হাতে এসেছিল।
সমস্যা ছিল, ফাইবার-অপটিক কেবলটির দৈর্ঘ্য মাত্র ৮-১০ কিলোমিটার। ফলে সীমান্তপারের সংঘর্ষে ক্ষেপণাস্ত্রটি খুব বেশি কার্যকর ছিল না।
২০২৬ সালে সংঘাত যখন মূলত লেবাননের মাটিতে সীমাবদ্ধ, তখন এই সীমা আর সমস্যা ছিল না। আলমাস ক্ষেপণাস্ত্রের জন্য মজুত করে রাখা বিপুল পরিমাণ কেবল বরং অপেক্ষাকৃত ছোট ও গোপন এফপিভি ড্রোনে ব্যবহারের জন্য কাজে লাগানো হয়।
হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ এক সূত্র বলেন, ‘ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গুণগত সুবিধা পাওয়ার জন্য হিজবুল্লাহ তার সামরিক শাখাকে বড় করেছিল। এখন তারা কৌশল বদলেছে এবং প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করছে। ড্রোন তার সবচেয়ে ভালো উদাহরণ।’
প্রযুক্তিগতভাবে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ বর্তমানে যুদ্ধবিরতি পালন করছে। ১৬ এপ্রিল থেকে এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর। তবে দুই পক্ষের হামলা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে লেবানন রাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি যুদ্ধ থেকে লেবাননকে আলাদা রাখার চেষ্টা করছে।
ওয়াশিংটনে আলোচনার মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে যে কাঠামো তৈরি হয়েছে, সেটি লেবাননে ব্যাপক সমালোচিত। এখন পর্যন্ত এর ফলে ‘পরীক্ষামূলক প্রকল্পের’ আওতায় লেবাননের সেনাবাহিনীকে দক্ষিণের মাত্র একটি শহরে মোতায়েনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে—যদিও ইসরায়েল ওই শহর দখল করেই রাখেনি।
এদিকে লেবানন রাষ্ট্র ও ইসরায়েল সরকারের সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও যুদ্ধবিরতির মূল ভরসা এখনো কার্যত ইরান। ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করলে ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দিয়েছে।
দক্ষিণ লেবাননে শিগগিরই স্বাভাবিক জীবন ফিরবে এমন কোনো লক্ষণ নেই। হিজবুল্লাহর সূত্র ও লেবাননের কর্মকর্তারা বলছেন, এটি যুদ্ধের বিরতি; যুদ্ধের সমাপ্তি নয়। লেবাননের শিয়াদের মধ্যে প্রশ্ন লেবানন-ইসরায়েল সীমান্তের ভূখণ্ডের মধ্যে এক অদ্ভুত মিল রয়েছে। লেবাননের দিকে বিস্তৃত সাইট্রাস ও তামাকের খেত, বিদেশে সফল হয়ে ওঠা প্রবাসীদের পাঠানো অর্থে নির্মিত টেরাকোটার ছাদওয়ালা বাড়ি। সরু আঁকাবাঁকা সড়কের দিকে কলাগাছের পাতা এমনভাবে ঝুঁকে আছে, যেন পথ চলতি গাড়িতে ওঠার জন্য হাত তুলেছে।
দক্ষিণে ইসরায়েলি বাড়ি ও কৃষিজমি সমুদ্রের পাশে সুশৃঙ্খল সারিতে সাজানো। কিরিয়াত শিমোনার নিচের সমভূমিতে ছড়িয়ে আছে জিগস পাজলের মতো ভূমিরেখা।
দুই পাশের উঁচু জায়গাগুলো থেকে বাসিন্দারা কৌতূহল নিয়ে বেড়া ও জাতিসংঘের টহল দেয়া কাঁচা রাস্তার ওপারে তাকিয়ে একে অন্যের জীবন ও পৃথিবী দেখতে পারেন।
ভূমিটি যেন অভিন্ন যমজ। কিন্তু নাকবার বিপর্যয়ে তারা আলাদা হয়ে গেছে এবং এখন তাদের চরিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।
এখান থেকেই হিজবুল্লাহর প্রথম সদস্য এবং মূল সমর্থকদের উঠে আসা। ১৯৮০-এর দশকের শুরুর দিকে ইসরায়েলি আগ্রাসনে বাস্তুচ্যুত শিয়া লেবাননিরা আমাল আন্দোলন থেকে সরে এসে হিজবুল্লাহর দিকে ঝুঁকেছিল। তাদের আকৃষ্ট করেছিল প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থাবিরোধী বক্তব্য এবং সশস্ত্র প্রতিরোধের অঙ্গীকার।
আজ এই জনগোষ্ঠীগুলোই হিজবুল্লাহর গত দুই যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সংগঠনটির সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের সামাজিক চুক্তিও আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি দুর্বল হয়ে পড়েছে।
দক্ষিণ লেবাননে প্রায় ৬ লাখ মানুষ এখনও নিজ বাড়ি থেকে বাস্তুচ্যুত। তাদের অনেকের বাড়িঘর আর নেই। গাজায় শহর ও গ্রাম নিশ্চিহ্ন করার যে নীতি ইসরায়েল অনুসরণ করেছে, লেবাননেও তার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে।
হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ এক সূত্র বলেন, ‘শিয়া সমাজের ভেতরে প্রশ্ন বাড়ছে, এটা নিশ্চিত।’
দাহিয়েহতে নিহত যোদ্ধাদের একটি কবরস্থানেও অসন্তোষের চাপা গুঞ্জন শোনা যায়। এখানে নিহত সন্তান, ভাইবোন ও স্বামীদের জন্য নীরবে প্রার্থনা করা হয়। কবরগুলোর মাঝখানে ছোট শিশুরা ছুটে বেড়ায়; কোনো কোনো কবরে একসঙ্গে চারজন যোদ্ধার মরদেহ শায়িত।
একজন দর্শনার্থী বলেন, ‘শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করে নিহত আমার বন্ধুদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এসেছি। কিন্তু যা কিছু ঘটেছে, তা নিয়ে আমার গুরুতর আপত্তি আছে।’
গত দুই যুদ্ধ ছিল ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ সালের গৃহযুদ্ধের পর শিয়া জনগোষ্ঠীর জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘাত।
গাজা যুদ্ধে হিজবুল্লাহর হস্তক্ষেপের বিষয়ে লেবানন ও অঞ্চলের এমনকি ঐতিহ্যগতভাবে হিজবুল্লাহবিরোধী কিছু জনগোষ্ঠীর মধ্যেও সহানুভূতি ছিল। কিন্তু মার্চে ইসরায়েলে হামলা চালিয়ে আবারও ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া ডেকে আনার সিদ্ধান্ত ক্ষোভ ও বিস্ময় সৃষ্টি করেছে।
লেবাননের উপপ্রধানমন্ত্রী তারেক মিত্র যেমন মিডল ইস্ট আইকে বলেছেন, এটি ছিল ‘এমন এক যুদ্ধ, যা লেবানন চায়নি, শুরু করেনি।’
তবে জ্যেষ্ঠ হিজবুল্লাহ কর্মকর্তা নাওয়াফ মুসাভির যুক্তি, শুধু আলোচনার মাধ্যমে ইসরায়েল কখনো লেবানন ছাড়বে না। তার মতে, যুদ্ধের জন্য হিজবুল্লাহকে দায়ী করা হচ্ছে ‘তথ্যকে উল্টো করে দেখানোর একটি গণমাধ্যম প্রচারণার’ অংশ হিসেবে।
তিনি বলেন, ‘দখলদারিত্বকে সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত না করে এই প্রচারণা প্রতিরোধকেই সমস্যা হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে।’
‘ধরুন, হিজবুল্লাহ নেই। তাহলেও লেবাননের জনগণের ভূমি মুক্ত করার ইচ্ছা প্রকাশকারী একটি সংগঠন থাকত। তখন সেই সংগঠনই সমস্যা হয়ে দাঁড়াত এমনকি তার নাম যদি আমেরিকার ডেমোক্রেটিক পার্টিও হতো।’
যে দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখা হোক, প্রায় ৫ লাখ শিয়া মানুষ গৃহহীন। রাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনা করে কিংবা হিজবুল্লাহ শক্তি প্রয়োগ করে—কেউই তাদের ঘরে ফিরিয়ে নিতে পারেনি।
এদিকে হিজবুল্লাহও আগের মতো সামাজিক কল্যাণসেবা দিতে পারছে না। সূত্রগুলোর মতে, এর একটি কারণ ভয়াবহ আর্থিক সংকট। তবে সংগঠনটির হাতে থাকা অর্থের বড় অংশও এখন সামরিক কাজে অগ্রাধিকার পাচ্ছে।
এক সূত্র বলেন, ‘আগে সংগঠনটি বাড়িভাড়া, বাড়ি সংস্কার ও কল্যাণসেবার খরচ দিত। এখন তা বন্ধ। কারণ সিরিয়ার মধ্য দিয়ে ইরানের সঙ্গে স্থলপথ আর খোলা নেই। ইরান ও লেবাননের মধ্যে বিমান চলাচলও সীমিত। কিছুটা হলেও এই শূন্যতা শিয়া সমাজের ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দাতব্য উদ্যোগ পূরণ করছে।’
এই অসন্তোষ হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে আরও আনুষ্ঠানিক, শক্তিশালী ও সংগঠিত শিয়া বিরোধিতায় রূপ নেয় কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
ইসরায়েলের প্রকাশ্য সাম্প্রদায়িক লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের নীতি—যেখানে দক্ষিণ লেবাননের বাসিন্দাদের ‘শিয়া শত্রু জনগোষ্ঠী’ বলা হয়েছে—বরং শিয়া সমাজকে হিজবুল্লাহর আরও কাছে ঠেলে দিয়েছে।
লেবাননের অন্য ধর্মাবলম্বীদের একটি অংশের বৈরিতাও একই কাজ করেছে। তাদের কেউ কেউ শিয়া স্বদেশবাসীর দুর্দশার প্রতি খুব কম সহানুভূতি দেখিয়েছে; বরং আমাল ও হিজবুল্লাহর উত্থানের আগে ঐতিহাসিকভাবে প্রান্তিক থাকা এই সম্প্রদায়ের পতন দেখে যেন আনন্দই পেয়েছে।
হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ এক সূত্র বলেন, ‘শিয়াদের মধ্যে অস্তিত্বের ওপর হুমকি তৈরি হয়েছে এমন অনুভূতি রয়েছে।’ চাপের মুখে সম্প্রদায় কীভাবে একত্র হচ্ছে, তার উদাহরণ হিসেবে তিনি আমাল আন্দোলন ও এর নেতা নাবিহ বেরির সাম্প্রতিক ভূমিকার কথা বলেন।
‘আমাল আদর্শগতভাবে ইরানের ঘনিষ্ঠ নয়। কিন্তু খামেনির জন্য শোকসভায় বেরি বলেছিলেন, আমালের সঙ্গে ইরানের কৌশলগত অংশীদারিত্ব রয়েছে। এটি নিছক কথার কথা ছিল না।’
সূত্রটি আরও বলেন, ‘ব্যক্তিগত আলাপে হতাশা থেকে জন্ম নেয়া অসন্তোষের কথা শোনা যায়। কিন্তু সীমিত বিরোধিতার বেশি কিছু আমরা দেখিনি। নতুন কোনো গতিশীলতার ইঙ্গিত দেয়ার মতো উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটেনি।’
‘আগের সেই হিজবুল্লাহ আর নেই’ ২০২৬ সালের আগস্টে এসে হিজবুল্লাহর অবস্থান কোথায়?
সামরিকভাবে সংগঠনটি ভয়াবহভাবে দুর্বল হয়েছে। যদিও দ্রুতগতি ও গেরিলাধাঁচের বাহিনীতে রূপান্তরের নতুন কৌশল কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।
গত দুই যুদ্ধে কতজন হিজবুল্লাহ সদস্য নিহত হয়েছেন, তার কোনো সরকারি সংখ্যা নেই। তবে সংগঠনটির সূত্রগুলোর ধারণা, নিহতের সংখ্যা ৪ হাজার থেকে ১০ হাজারের মধ্যে হতে পারে। তাদের অধিকাংশই নিহত হয়েছেন ২০২৪ সালে। হিজবুল্লাহর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বৃত্তের ঘনিষ্ঠ এক সূত্র বলেন, ‘২০২৩ সালের হিজবুল্লাহ আর আজকের হিজবুল্লাহ এক নয়।’
‘হিজবুল্লাহর বিশাল রকেট শক্তি ছিল, সীমান্তে উপস্থিতি ছিল এবং ইসরায়েলের জন্য বাস্তব ও গুরুতর হুমকি ছিল। তাদের পেছনে সমর্থন ও সরবরাহের যে ব্যবস্থা ছিল, তা গোটা অঞ্চল পেরিয়ে আফগানিস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।’ হিজবুল্লাহর গ্যালিলি অঞ্চলে হামলার যে কোনো পরিকল্পনা থাকলেও তা এখন বিলীন। সংগঠনটির এক সূত্র বলেন, আজকের স্লোগান জেরুজালেমের বদলে লেবাননকে রক্ষার কথা বলে।
তীব্র চাপের মধ্যেও সংগঠনটির নেতৃত্ব টিকে থাকার সক্ষমতা ও কৌশলগত দক্ষতা দেখিয়েছে। নাঈম কাসেম মহাসচিব হওয়ার পর শুরুতে তাকে নিয়ে কিছুটা ঠাট্টা-বিদ্রুপ হয়েছিল।
নাসরাল্লাহর মতো তার আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব নেই। সাফিয়েদ্দিনের মতো ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বও নেই নাসরাল্লাহর মতো তিনিও ছিলেন সাইয়্যেদ, অর্থাৎ নবীর বংশধর। তবু কাসেম অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে হিজবুল্লাহকে পরিচালনা করেছেন। একই সঙ্গে তিনি নিজেও ইসরায়েলি হত্যাচেষ্টার লক্ষ্য।
চলতি বছরের শুরুতে তার বড় একটি পুনর্গঠন ছিল গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। এর মাধ্যমে তিনি নিজের ভাবনা অনুযায়ী সংগঠনটিকে নতুন করে সাজান এবং প্রভাবশালী কয়েকজন নেতাকে প্রান্তিক করে দেন। কাজটি বড় ধরনের বাধা ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছে বলে মনে হয়।
রাজনৈতিক বৃত্তের ঘনিষ্ঠ সূত্রটি বলেন, ‘কাসেমের ক্যারিশমা নেই—এমন অনেক কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু তিনি এখন একটি রূপান্তরকালীন সময়ে সংগঠনটিকে আবার গড়ে তুলছেন।’
‘তিনি প্রমাণ করেছেন যে তিনি সংগঠনটির অবস্থান ধরে রাখতে পারেন, পুরো সংগঠন পুনর্গঠন করতে পারেন এবং এর মধ্যে ঐক্য সুসংহত করতে পারেন।’
হিজবুল্লাহর সব জ্যেষ্ঠ সামরিক নেতা নিহত হলেও প্রতিষ্ঠাতা প্রজন্মের কাসেম ও হিজবুল্লাহর সংসদীয় ব্লকের প্রধান মোহাম্মদ রাদ এখনও নিজ নিজ অবস্থানে আছেন।
দ্বিতীয় প্রজন্মের প্রভাবশালী নেতারাও আছেন। তাদের মধ্যে হাসান ফাদলাল্লাহ সামনে এসেছেন এবং আরও প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন। মুসাভি বলেন, ‘আমরা একটি প্রতিরোধ আন্দোলন। আমাদের নেতাদের হত্যার ঝুঁকি আছে। তাই প্রতিটি পদে এমন একজন বিকল্প থাকতে হবে, যিনি কোনো কর্মকর্তা নিহত বা শহীদ হলে তার জায়গা নিতে পারবেন।’
তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, বলা যায় প্রথম প্রজন্ম নিহত হয়েছে, দ্বিতীয় প্রজন্মও নিহত হয়েছে এবং তৃতীয় প্রজন্মের অনেকেও নিহত হয়েছেন। তবু প্রতিরোধ অব্যাহত থাকবে।’
‘ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্ম সম্পর্কে শক্তিশালী তথ্য ছিল। কিন্তু এখন তারা এমন একটি নতুন প্রজন্মের সঙ্গে লড়ছে, যাদের তারা চেনে না।’
এই দুর্বলতার সময়ে মনে হতে পারে, নাসরাল্লাহর আমলের তুলনায় ইরান এখন হিজবুল্লাহকে আরও বেশি সরাসরি পরিচালনা করছে। কিন্তু সূত্রগুলোর বক্তব্য, বাস্তবে মাটিতে ইরানি উপদেষ্টার সংখ্যা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় কম।
রাজনৈতিক বৃত্তের ঘনিষ্ঠ সূত্রটি বলেন, ‘আমার মনে হয়, বর্তমান সময়ে ইরানের উপস্থিতি সবচেয়ে কম। এর কারণ লজিস্টিক সমস্যা। সিরিয়া এখন আর ইরানিদের জন্য আগের মতো উন্মুক্ত নয়। বিমান চলাচলও কঠিন।’
‘তবে রাজনৈতিক ও কৌশলগত পর্যায়ে সমন্বয় অবশ্যই আছে। এই সমন্বয় হয়তো এখন সবচেয়ে শক্তিশালী।’
তিনি বলেন, অঞ্চলের পাশাপাশি হিজবুল্লাহর ভবিষ্যৎও নির্ভর করছে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার আলোচনা ও সংঘাতের ওপর।
ইরানের যুদ্ধ তেহরান ও হিজবুল্লাহর সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করেছে। ইরান এমন কোনো যুদ্ধ-সমাপ্তির আলোচনায় যেতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, যাতে লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে না।
বদলে যাচ্ছে রাজনৈতিক সমীকরণ
লেবানন রাষ্ট্রের সঙ্গে হিজবুল্লাহর সম্পর্ক এখন সবচেয়ে তলানিতে।
২ মার্চ ইসরায়েলে হিজবুল্লাহর হামলা, এরপর প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালামের হিজবুল্লাহর সামরিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা এবং প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনের ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির উদ্যোগ সব মিলিয়ে সংগঠনটি ও রাষ্ট্রের মধ্যে দূরত্ব আরও বেড়েছে।
সূত্রগুলো বলছে, ২০২৪ সালের ইসরায়েলি আগ্রাসনের পর হিজবুল্লাহর ভেতরে সংগঠনটির ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুতর আলোচনা হয়েছিল। সশস্ত্র আন্দোলন থেকে শুধু রাজনৈতিক সংগঠনে রূপান্তরিত হওয়া সম্ভব কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল।
হিজবুল্লাহ এখন সংসদের সবচেয়ে বড় দল এবং বহু বছর ধরে লেবানন রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।
লেবাননের সাম্প্রদায়িক ক্ষমতা ভাগাভাগির ব্যবস্থার মাধ্যমে তৈরি রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া একটি রাষ্ট্রবিরোধী সংগঠন হিসেবে হিজবুল্লাহর জন্ম হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে টিকে থাকা ও শক্তিশালী হওয়ার জন্য সংগঠনটি সেই দল ও ব্যক্তিত্বগুলোরই অনেক বৈশিষ্ট্য গ্রহণ করেছে, যাদের একসময় তারা ঘৃণা করত।
২০১৯ সালের রাষ্ট্রবিরোধী গণবিক্ষোভের সময়ও তারা রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে সুরক্ষা দিয়েছিল। বিক্ষোভকে বিদেশি ষড়যন্ত্র হিসেবে তুলে ধরে সমর্থকদের পাঠিয়ে তারা বিক্ষোভকারীদের শিবির ভেঙে দেয়।
রাজনৈতিক বৃত্তের ঘনিষ্ঠ সূত্রটির মতে, দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বালু যখন তাদের পায়ের নিচ থেকে সরে যাচ্ছে, তখন হিজবুল্লাহ আবারও নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে পারে। তিনি বলেন, ‘অস্ত্র ত্যাগ এবং সেটি কীভাবে বা কোন রূপে হতে পারে—এসব নিয়ে দলের ভেতরে পেছনে আলোচনা চলছে। কিন্তু যুদ্ধের সময়ে কোনো প্রস্তাব সামনে আনা সম্ভব নয়।’
‘গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নাঈম কাসেমের কোনো অলঙ্ঘনীয় সীমারেখা নেই।’ স্বাভাবিকভাবেই, এমন কিছু নেতা আছেন যারা অস্ত্র ত্যাগ এবং রাষ্ট্র বা পশ্চিমা বিশ্বের কাছে ছাড় দেয়ার ধারণায় ক্ষুব্ধ।
একজন সূত্র বলেন, ‘এটা শুধু আমার ব্যক্তিগত মত, অবশ্যই দলের মত নয়। আমার মনে হয়, হিজবুল্লাহর উচিত বোমা হামলা ও হত্যার মাধ্যমে আবার উন্মত্ত অবস্থায় ফিরে যাওয়া। আশির দশকের হিজবুল্লাহতে ফিরে যাওয়া।’
‘কিন্তু বিষয়টি এত সহজ নয়। আমরা এখন সমাজের গভীরে প্রোথিত।’
আরেকটি জটিলতা হলো, ইসরায়েল এবং আন্তর্জাতিক মহল ও লেবাননের কিছু পক্ষ লেবাননের সেনাবাহিনীর ওপর হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার চাপ দিচ্ছে। দেশটির অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এতে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যেতে পারে। এমনকি ইকোনমিস্টও লেবাননের সেনাবাহিনীকে আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়ে নিবন্ধ প্রকাশ করেছে।
গত মাসে তারা লিখেছে, ‘ভয় বোঝা যায়, কিন্তু তা নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত হতে পারে না। সেনাবাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’
মিত্রি মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ইসরায়েল হয়তো এমন পরিস্থিতি দেখতে চাইবে। ‘কিন্তু আমার মনে হয়, সেনাবাহিনী কিংবা হিজবুল্লাহ কেউই একে অপরের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ফাঁদে পা দিতে চায় না।’
অন্যদিকে মুসাভি বলেন, ‘লেবাননে এমন কেউ অস্ত্র হাতে প্রতিরোধের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে আমি তা মনে করি না। কারণ দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরার অর্থ হবে লেবানন ধ্বংস হওয়ার আগেই নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনা।’
একটার পর একটা ভয়াবহ আঘাত এবং আগাম মৃত্যুঘোষণা সত্ত্বেও হিজবুল্লাহ এবং ইরান নেতৃত্বাধীন প্রতিরোধের অক্ষ এখনও জীবিত। তারা সশস্ত্র, প্রভাবশালী এবং বর্তমানে প্রতিরোধ শক্তি হিসেবে নতুন করে সক্রিয়। একই সময়ে ইসরায়েলি সেনারা লেবাননের বিস্তীর্ণ এলাকায় অবস্থান করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে যে কাঠামো তৈরি হয়েছে, সেটিকে ব্যাপকভাবে আত্মসমর্পণ হিসেবে দেখা হচ্ছে এবং নেতানিয়াহু প্রকাশ্যেই তা নিয়ে ঠাট্টা করেছেন। কিন্তু এই কাঠামো হিজবুল্লাহকে রাজনৈতিকভাবে কিছুটা সময়ও দিয়েছে।
এক সূত্র বলেন, ‘সরকারের বিরুদ্ধে হিজবুল্লাহর অবস্থান আরও শক্ত হয়েছে, কারণ সংগঠনটির অনেক শত্রুও ওই কাঠামোর সমালোচনা করেছে।’
সূত্রটির মতে, অঞ্চলটির প্রতিটি আলোচনা ও দর-কষাকষির কেন্দ্রে এখনো হিজবুল্লাহ রয়েছে। এমনকি ওভাল অফিসেও।
দুটি হিজবুল্লাহ সূত্র এবং একজন লেবাননি কূটনৈতিক সূত্রের মতে, সাম্প্রতিক কয়েকটি যুদ্ধবিরতি আলোচনা নিয়ে ডনাল্ড ট্রাম্প এতটাই হতাশ হয়ে পড়েছিলেন যে তিনি ওয়াশিংটনে লেবাননের রাষ্ট্রদূতকে ফোন করে হিজবুল্লাহর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের ব্যবস্থা করতে বলেন।
এক সূত্রের ভাষ্য, ‘এরপর কর্মকর্তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং হিজবুল্লাহর যে কারও ফোন নম্বর খুঁজতে শুরু করেন। তারা যেসব শিয়াকে চিনতেন, এমনকি অপরিচিত শায়খদেরও ফোন করছিলেন যাতে কথা বলার জন্য সঠিক ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়া যায়।’
তিনটি সূত্রই জানিয়েছে, ট্রাম্পের এই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল।
(মিডল ইস্ট আই থেকে অনূদিত)

শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৫ আগস্ট ২০২৬
যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে
সাল ২০২৪। সেপ্টেম্বর শেষ হয় হয়। ইসরায়েলের সঙ্গে হওয়া যুদ্ধে হিজবুল্লাহর টিকে থাকা দায়। সংগঠনটি এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল।
ইসরায়েলের ৮০টি বোমা লেবাননের এই সংগঠনের সদর দপ্তর ধ্বংস করে দিয়েছিল। নিহত হয়েছিলেন সংগঠনটির বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা। তাদের মধ্যে ছিলেন হাসান নাসরাল্লাহও। মনে হচ্ছিল, ইসরায়েলিরা তাকে খুঁজে বের করে ফেলেছিল; এমনকি মাটির ৬০ ফুট নিচেও তিনি নিরাপদ ছিলেন না।
হিজবুল্লাহর কমান্ডারদের সন্দেহ হচ্ছিল যে, ইসরায়েল তাদের ফোনে আড়ি পেতেছে। এমনকি তারা কী বলছে বা করছে তার সবই জানতে পারছে শত্রুপক্ষ। ইসরায়েল হাজার হাজার পেজার ও ওয়াকিটকিতেও বিস্ফোরক বসিয়ে দিয়েছিল, যার ফল হয়েছিল ভয়াবহ।
তাই বেঁচে থাকা কমান্ডাররা ফোন ফেলে মোটরসাইকেল ও স্কুটারে চড়ে হারেত হরেইক, চিয়াহ এবং বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলের অন্য এলাকায় ছুটতে শুরু করেন। এসব এলাকা স্থানীয়ভাবে দাহিয়েহ নামে পরিচিত।
সবকিছুই যেন হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল। নাসরাল্লাহ যেখানে নিরাপদ ছিলেন না, সেখানে আর কারও নিরাপদ থাকবার কথা নয়।
এবার হিজবুল্লাহকে শেষ ভরসার পরিকল্পনায় যেতে হলো যে পরিকল্পনা কখনো বাস্তবায়ন করতে হবে বলে কমান্ডাররা ভাবেননি। দাহিয়েহর বিভিন্ন জায়গায়, যেমন বেকারি, ব্যাংকের শাখা কিংবা ফোনের দোকানের মতো পরিচিত স্থানে একে অন্যের সঙ্গে দেখা করতে হবে।
যোগাযোগ করতে হবে চোখে চোখ রেখে। শুধু সামনাসামনি।
একত্র হওয়ার পর তারা সংগঠনকে আবার সংগঠিত করা এবং দক্ষিণ লেবাননে আসন্ন ইসরায়েলি স্থল অভিযানের মুখোমুখি হওয়ার পরিকল্পনা করেন। সেখান থেকেই হিজবুল্লাহর ঘুরে দাঁড়ানোর শুরু যে ঘুরে দাঁড়ানো একসময় সংগঠনটিকে পতনের কিনারা থেকে ফিরিয়ে আনে এবং এর সামরিক কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করে।
মিডল ইস্ট আই হিজবুল্লাহ সম্পর্কে ঘনিষ্ঠ জ্ঞান থাকা সাতজন ব্যক্তি, সংগঠনটির ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ব্যক্তি, লেবাননের রাজনীতিক ও কর্মকর্তা এবং কয়েকজন আরব কূটনীতিকের সঙ্গে কথা বলেছে। তাদের প্রায় সবাই পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন।
তারা জানিয়েছেন, তীব্র আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কীভাবে হিজবুল্লাহ একটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল এবং পরাজয়ের পর কীভাবে সংগঠনটি তার সামরিক শাখাকে আবার দাঁড় করাতে সক্ষম হয়।
সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে, সংগঠনটির ভবিষ্যৎ নিয়ে অভ্যন্তরীণ আলোচনায় কী উঠে এসেছে, ২০২৩ সালের পর লেবাননে ইসরায়েলের দুটি যুদ্ধে ইরানের ভূমিকা কী ছিল, হিজবুল্লাহর অর্থনৈতিক সংকট কতটা গভীর এবং সংগঠনটি যে শিয়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব ও সুরক্ষার দাবি করে, সেই জনগোষ্ঠীর মধ্যে কতটা অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে ওয়াকিটকি বিস্ফোরণের ঘটনা কীভাবে প্রায় গণহত্যায় রূপ নিতে পারত হিজবুল্লাহ কীভাবে পুরনো রকেট প্রযুক্তিকে নতুন কাজে ব্যবহার করেছে কীভাবে ভিডিও গেমে অভ্যস্ত তরুণেরা যুদ্ধের গতিপথ বদলে দিয়েছে হতাশ ডনাল্ড ট্রাম্প কেন হিজবুল্লাহর সঙ্গে সরাসরি কথা বলার দাবি করেছিলেন এটি ২০২৪ সালে ইসরায়েলের কাছে হিজবুল্লাহর পরাজয়, ১৫ মাস পর নতুন এক যুদ্ধে সংগঠনটির বিস্ময়কর পুনরুত্থান এবং বর্তমানে হিজবুল্লাহর অবস্থার গল্প যখন দেশের ভেতরে ও বাইরে তার শত্রুরা সংগঠনটির সামরিক শক্তি চিরতরে ভোঁতা করে দিতে চাইছে।
যুদ্ধের আগে বন্ধ দরজার ভেতরে হিজবুল্লাহর সদস্যদের মধ্যে মোটামুটি একটি বিষয়ে ঐকমত্য আছে—২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলে হামলা চালানো ছিল গভীর ও ঐতিহাসিক ভুল। অন্তত যেভাবে হামলাটি করা হয়েছিল, তা ভুল ছিল।
তিনটি সূত্র বলছে, সিদ্ধান্তটি একান্তই নাসরাল্লাহর ছিল এবং হিজবুল্লাহর নির্বাহী সংস্থা শুরা কাউন্সিলের ভেতরে এর বিরোধিতা করেছিলেন কেউ কেউ।
চলতি মাসের শুরুতে ইসরায়েলের আর্মি রেডিও প্যালেস্টাইনি সংগঠন হামাসের ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলার আগের কয়েক মাস ও বছরজুড়ে হামাস ও হিজবুল্লাহর মধ্যে আলোচনার বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী উদ্ধার করেছে বলে দাবি করা অভ্যন্তরীণ নথির বরাত দিয়ে আর্মি রেডিও জানায়, গাজায় হামাসের নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ার নাসরাল্লাহকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সমন্বিত আকস্মিক হামলায় যোগ দেয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। হিজবুল্লাহর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, সাবেক সংসদ সদস্য এবং সীমান্ত ও সম্পদ বিভাগের প্রধান নাওয়াফ মুসাভি এসব প্রতিবেদনকে ‘মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ’ বলে উড়িয়ে দেন।
তিনি মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘এটা নিছক প্রচারণা, মাটির বাস্তবতা নয়।’
তবে হিজবুল্লাহর অন্য কয়েকজন সদস্য পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, ইসরায়েলি প্রতিবেদনে কিছুটা সত্যতা থাকতে পারে।
বছরের পর বছর ধরে ইরান এবং তার মিত্র রাষ্ট্র ও সশস্ত্র সংগঠনগুলোর জোট ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ বা প্রতিরোধের অক্ষ একটি কৌশল গড়ে তুলেছে ‘ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট’। এর লক্ষ্য ছিল ইসরায়েলকে চারদিক থেকে শত্রু দিয়ে ঘিরে রাখা, যাতে সব দিক থেকেই হামলার আশঙ্কা থাকে।
এই কৌশলের মূল চালিকাশক্তি ছিলেন প্রয়াত ইরানি জেনারেল কাসেম সোলেইমানি এবং নাসরাল্লাহ। তার ক্যারিশমা, সামরিক সাফল্য ও রাজনৈতিক দক্ষতা তাকে আঞ্চলিকভাবে অত্যন্ত প্রভাবশালী করে তুলেছিল।
আরবি ভাষায় দক্ষ এবং অসংখ্য যুদ্ধে অভিজ্ঞ সোলেইমানি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) বিদেশে পরিচালিত এলিট ইউনিট কুদস ফোর্সের প্রধান হিসেবে ইরানের মিত্রদের তদারক ও কখনো কখনো নির্দেশ দিতেন। এসব মিত্রের মধ্যে ছিল ইরাকের আধাসামরিক বাহিনী এবং ইয়েমেনের আনসার আল্লাহ যা হুতিদের নামে বেশি পরিচিত।
ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যেও তার ছিল গভীর প্রভাব। তার ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদা তেহরানকে এমন সক্রিয় এবং ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে প্রভাবিত করতে পারত, যেসব ক্ষেত্রে ইরান সাধারণত ‘কৌশলগত ধৈর্য’ অবলম্বন করে অপেক্ষাকৃত সতর্ক নীতি অনুসরণ করতে আগ্রহী ছিল।
দু’জনের এই একই ধরনের গতিশীলতার উদাহরণ হিসেবে একটি সূত্র ২০১২ সালের একটি কথোপকথনের কথা বলেন। সে সময় সোলেইমানি নাসরাল্লাহকে বাশার আল-আসাদের সমর্থনে সিরিয়ার যুদ্ধে হিজবুল্লাহর হস্তক্ষেপের পরামর্শ দিয়েছিলেন।
সূত্রটি বলেন, ‘নাসরাল্লাহ বলেছিলেন, ‘আপনি ঠিক বলেছেন, আমাদের যেতে হবে। তবে আমাদের তো গতকালই সিরিয়ায় থাকা উচিত ছিল।’
২০২০ সালের জানুয়ারিতে বাগদাদে মার্কিন ড্রোন হামলায় সোলেইমানির হত্যাকাণ্ড ছিল একটি বড় মোড়। প্রতিরোধের ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট কৌশলের প্রধান চালিকাশক্তিকে হারায় জোটটি। কৌশলটি ধীরে ধীরে গতি হারাতে থাকে। হিজবুল্লাহর তিনটি সূত্রের মতে, শেষ পর্যন্ত এ কারণেই ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস নিজেই সিদ্ধান্ত নেয়ার পথে যায়।
দুটি সূত্র জানায়, হামলার পর তৎকালীন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেইন আমির-আবদুল্লাহিয়ান বৈরুত সফর করে নাসরাল্লাহকে স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে তেহরান শুধু নৈতিকভাবে যুদ্ধকে সমর্থন করতে প্রস্তুত।
নাসরাল্লাহও ইরানিদের মতোই ভয় পেতেন, এতে যুক্তরাষ্ট্রের ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে। তাই তিনি আগেই সীমিতভাবে হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ৮ অক্টোবর তিনি ইসরায়েলের দিকে এক দফা রকেট ছোড়ার নির্দেশ দেন। গাজায় যখন বোমা পড়ছিল, তখনই তিনি একটি ‘সমর্থন ফ্রন্ট’ খুলে দেন।
তবে তার কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা, বিশেষ করে রাদওয়ান ফোর্সের বিশেষ অভিযান ইউনিটের প্রধান ইব্রাহিম আকিল এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন। তাদের মত ছিল, হিজবুল্লাহকে হয় পুরোপুরি যুদ্ধে যেতে হবে, নয়তো একেবারেই যাওয়া যাবে না।
অল্পের জন্য এড়ানো বড় বিপর্যয় এক বছর ধরে হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যে সীমান্তজুড়ে পাল্টাপাল্টি হামলা চলেছে। জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় সংঘাত এড়ানোর যে সীমারেখাটি কার্যত সীমান্ত হিসেবে কাজ করে, সেই ব্লু লাইনের দুই পাশে প্রায় ৭ হাজার রকেট, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং বিমান ও কামানের হামলা হয়েছে।
লেবাননের ক্ষয়ক্ষতি ইসরায়েলের তুলনায় ছিল বহুগুণ বেশি। সীমান্তের দক্ষিণে ইসরায়েলের ৭০ জনের বিপরীতে লেবাননে নিহত হন প্রায় ২ হাজার মানুষ।
তবু হিজবুল্লাহ বিপুলসংখ্যক ইসরায়েলি সেনাকে ব্যস্ত রাখতে পেরেছিল। এর ফলে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ থেকে কিছু সম্পদ ও সেনা অন্যদিকে সরাতে হয়েছে এবং উত্তরাঞ্চল থেকে প্রায় ৬০ হাজার ইসরায়েলিকে সরিয়ে নিতে হয়েছে।
দুই পক্ষই কিছু অলিখিত সীমার মধ্যে কাজ করছিল। অর্থাৎ নির্দিষ্ট কোনো হামলা বা লক্ষ্যবস্তুর জবাবে একই ধরনের প্রতিক্রিয়া জানানো হবে এমন একটি বোঝাপড়া ছিল। নাসরাল্লাহ সতর্ক করে দিয়েছিলেন, দাহিয়েহতে হামলা হলে তার জবাব দেয়া হবে তেল আবিবে।
কিন্তু ইসরায়েল ধীরে ধীরে সেই সীমা ঠেলে দিতে থাকে এবং হিজবুল্লাহর সংকল্প পরীক্ষা করতে থাকে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে দাহিয়েহতে ইসরায়েলি হামলায় হামাসের জ্যেষ্ঠ নেতা সালেহ আল-আরুরি নিহত হন।
এর জবাবে হিজবুল্লাহ মেরন পর্বতে ইসরায়েলি একটি সামরিক ঘাঁটিতে বড় ধরনের রকেট হামলা চালায়। দলটির সূত্রগুলো বলছে, হামলার লক্ষ্য তেল আবিব করা হয়নি, কারণ আরুরি ছিলেন প্যালেস্টাইনি, লেবাননি নন। তাই জবাবের মাত্রাও সে অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়েছিল।
ছয় মাস পর হিজবুল্লাহর শীর্ষ সামরিক কমান্ডার ফুয়াদ শুকর নিহত হলে সংগঠনটি প্রতিশোধ হিসেবে ইসরায়েলের দিকে এক হাজার রকেট ছোড়ার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু ইসরায়েল আগেই হামলা চালিয়ে অধিকাংশ রকেট উৎক্ষেপণস্থল ধ্বংস করে দেয়।
হিজবুল্লাহর দুটি সূত্র বলছে, ইসরায়েলিরা পুরো সময়ই সংগঠনটির নেতৃত্বের প্রতিক্রিয়ার পরিকল্পনা শুনছিল।
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি এসে হিজবুল্লাহর নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা ব্যবস্থায় কতটা বড় ধরনের ফাঁক তৈরি হয়েছে, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
২০২৪ সালের ১৭ ও ১৮ সেপ্টেম্বর ইসরায়েল হাজার হাজার পেজার এবং শত শত ওয়াকিটকি বিস্ফোরিত করে। ইসরায়েলের সমর্থকেরা এই অভিযানকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে অভিহিত করেছেন, যেন কোনো জেমস বন্ডের সিনেমার ঘটনা।
ভুয়া কোম্পানি ব্যবহার করে হিজবুল্লাহর সরবরাহব্যবস্থায় ঢুকে মোসাদ যোগাযোগের এসব যন্ত্রে বিস্ফোরক ঢুকিয়ে দেয়। এতে প্রায় ৪০ জন নিহত এবং হাজার হাজার মানুষ আহত হন।
তৎকালীন মোসাদপ্রধান ডেভিড বার্নিয়া বলেছিলেন, এটি ছিল ‘আমাদের মিশন বাস্তবায়নের স্পষ্ট উদাহরণ’। হামলাটির স্মারক হিসেবে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ডনাল্ড ট্রাম্পকে একটি সোনার পেজার উপহারও দিয়েছিলেন।
হিজবুল্লাহর সূত্রগুলো অস্বীকার করে না যে এটি ছিল ভয়াবহ আঘাত। তবে তাদের দাবি, অভিযানটি শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে।
১৭ সেপ্টেম্বর বিস্ফোরিত পেজারগুলোই সংবাদ শিরোনাম কেড়ে নিয়েছিল। কিন্তু প্রকৃত লক্ষ্য ছিল ওয়াকিটকি যেগুলো আকারে বড়, বেশি বিস্ফোরক বহন করত এবং মাঠপর্যায়ের যোদ্ধারা ব্যবহার করতেন।
হিজবুল্লাহর পেজারগুলো মূলত লোকজনকে ডাকার কাজে ব্যবহৃত হতো এবং সেগুলোর ব্যবহারকারী ছিলেন বেশির ভাগই বেসামরিক সদস্য। ২০২২ সাল থেকেই ইসরায়েল সংগঠনটিকে এসব নষ্ট করা যন্ত্র সরবরাহ করতে শুরু করেছিল। হামলার সময় প্রায় ২ হাজার ৫০০ পেজার ব্যবহারে ছিল।
কিন্তু ওয়াকিটকি অভিযানের প্রস্তুতি নাকি চলছিল এক দশক ধরে। দুটি সূত্রের মতে, ১৮ সেপ্টেম্বর ইসরায়েল ওই অভিযান শুরু করার সময় ১৫ হাজার ওয়াকিটকি গুদামে রাখা ছিল। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সেগুলো তখন বন্ধ ছিল।
এই সংখ্যা আগে মোসাদের এক এজেন্টের দেয়া তথ্যের সঙ্গেও মেলে। ওই এজেন্ট দাবি করেছিলেন, একটি গোপন ইসরায়েলি ভুয়া কোম্পানি হিজবুল্লাহকে ১৬ হাজার ওয়াকিটকি সরবরাহ করেছিল।
পেজার হামলার পরদিন মাত্র কয়েকশ’ ওয়াকিটকি বিস্ফোরিত হয়, যেখানে হাজার হাজার পেজার বিস্ফোরিত হয়েছিল। কিন্তু ওয়াকিটকির হামলার ভয়াবহতা ছিল বেশি। দ্বিতীয় হামলায় অন্তত ২৫ জন নিহত হন, আগের দিন নিহত হয়েছিলেন ১২ জন।
হিজবুল্লাহর দুটি সূত্রের মতে, ইসরায়েল কেন আগেভাগে হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তার কারণ হলো মোসাদ হিজবুল্লাহর অভ্যন্তরীণ আলোচনা শুনছিল এবং তারা জানত, হাতে আর সময় নেই।
সেপ্টেম্বরের শুরুতেই হিজবুল্লাহ ও ইরান বুঝতে পারে, যুদ্ধ আর সীমিত রাখা সম্ভব নয়। লেবাননের সংগঠনটি তখন সর্বশক্তি দিয়ে যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
১৯ সেপ্টেম্বর একটি বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। সেখানে হিজবুল্লাহর নেতৃত্ব বড় ধরনের উত্তেজনা বৃদ্ধির পরিকল্পনায় আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেবে। ওই পরিকল্পনায় স্থল অভিযানও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
কিন্তু হিজবুল্লাহর একটি পরিদর্শক দল সংগঠনটিকে সরবরাহ করা পেজারগুলো নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করতে থাকে।
যন্ত্রগুলো এরই মধ্যে দুবার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল। তারপরও সন্দেহ কাটেনি। তাই কয়েকটি নমুনা আরও পরীক্ষা করার জন্য ইরানে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়।
সূত্রগুলোর মতে, এই সিদ্ধান্তই ইসরায়েলকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করে।
একটি সূত্র বলেন, ‘পেজারগুলো যদি বিস্ফোরিত না হতো, তাহলে ওয়াকিটকিগুলো চালু করে হাজার হাজার যোদ্ধার মধ্যে বিতরণ করা হতো। এরপর সেগুলো বিস্ফোরিত করা হতো।’
হিজবুল্লাহর পরাজয় ৬৬ দিন ধরে ইসরায়েল হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ভয়াবহ বিমান ও স্থল অভিযান চালায়। একের পর এক আঘাতে সংগঠনটিকে বিপর্যস্ত করে ফেলে তারা।
ইসরায়েল শুধু নাসরাল্লাহকেই হত্যা করেনি; তার চাচাতো ভাই ও উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচিত হাশেম সাফিয়েদ্দিনকেও হত্যা করে।
হিজবুল্লাহর সামরিক নেতৃত্বের অধিকাংশই নিহত হন। তাদের মধ্যে ছিলেন আকিল এবং তার রাদওয়ান ফোর্সের কমান্ডাররা। তাঁরা এমন একটি কমান্ড সেন্টারে বৈঠক করছিলেন, যেটি ২০০৬ সালের ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ যুদ্ধের সময় নাসরাল্লাহ ব্যবহার করেছিলেন।
হিজবুল্লাহর পুরো ইউনিট, গোলাবারুদের গুদাম এবং সংগঠনটির সম্ভাব্য হামলায় ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত রাখা অন্য লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করা হয়।
এর আগে মিডল ইস্ট আইকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যে কমান্ডাররা এই হামলা থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন, তাদের বেশির ভাগই বেঁচে যান কারণ তারা ফোন ধরেননি।
দক্ষিণে হিজবুল্লাহর ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন ইউনিট সংগঠনটিকে সময় কিনে দেয়। উত্তরে হিজবুল্লাহর নেতৃত্বের ওপর যে বিপর্যয় নেমে এসেছে, সে সম্পর্কে কোনো ধারণা ছাড়াই তারা আক্রমণকারী ইসরায়েলি সেনাদের সঙ্গে লড়াই করতে থাকে। দক্ষিণে হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা ইসরায়েলি সেনাদের আটকে রাখার সময় ইরান তার মিত্রকে সহায়তা করতে এগিয়ে আসে।
দুটি সূত্রের মতে, হিজবুল্লাহর সামরিক কাঠামো ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের মতো। প্রতিটি কমান্ডারের একজন করে ইরানি পড়ঁহঃবৎঢ়ধৎঃ বা সমপর্যায়ের প্রতিনিধি থাকে।
হিজবুল্লাহর বিভিন্ন ইউনিট ও বিভাগের প্রধান এবং তাদের ডেপুটিদের হত্যা করা হলে সেই শূন্যতা পূরণে ইরানি প্রতিনিধিরা লেবাননে আসেন। একটি সূত্র জানায়, তাদের মধ্যে ছিলেন সোলেইমানির উত্তরসূরি এবং কুদস ফোর্সের প্রধান ইসমাইল কায়ানি। কুদস ফোর্সের লেবানন শাখার প্রধান আব্বাস নিলফোরুশান নাসরাল্লাহর সঙ্গে হিজবুল্লাহর সদর দপ্তরে হামলায় নিহত হন।
হিজবুল্লাহ মনে করে, তাদের প্রতিরোধক্ষমতা ইসরায়েলকে বিস্মিত করেছিল। শেষ পর্যন্ত ইসরায়েল যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়।
সংগঠনটির সূত্রগুলো বলছে, নেতানিয়াহু মনে করেছিলেন, আর কোনো ইসরায়েলি সেনার জীবন ঝুঁকিতে না ফেলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চাপের মাধ্যমে রাজনৈতিকভাবে হিজবুল্লাহকে শেষ করে দেয়া সম্ভব।
লেবানন ও আন্তর্জাতিক মহলে তখন প্রায় বদ্ধমূল ধারণা তৈরি হয় যে হিজবুল্লাহ ‘ছিন্নভিন্ন’ হয়ে গেছে এবং তার সামরিক শক্তি আগের মাত্রার ২০ শতাংশে নেমে এসেছে যদি আদৌ এতটা থেকেও থাকে।
হিজবুল্লাহকে শেষ করা না গেলে লেবাননকে পুরোপুরি ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচানো যাবে না এমন ধারণার পক্ষে জনমত তৈরি হতে থাকে।
একজন আরব কূটনীতিকের মতে, হিজবুল্লাহ এতটা দুর্বল হয়ে পড়ায় সৌদিরা উচ্ছ্বসিত হয়েছিল। ওই কূটনীতিক বলেন, মিসরীয়রা ফরাসিদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে হিজবুল্লাহকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল যে সবচেয়ে শক্তিশালী সশস্ত্র অরাষ্ট্রীয় সংগঠন হিসেবে তাদের সময় শেষ। এখন নেতাদের উচিত সম্মানজনকভাবে সরে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়া।
হিজবুল্লাহর সূত্রগুলোর মতে, সংগঠনটি তখন টিকে থাকার লড়াইয়ে ছিল এবং বড় ধরনের ছাড় দেয়ার বিষয়েও আগ্রহী ছিল।
সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের পতন হিজবুল্লাহর অবস্থানকে আরও দুর্বল করে।
এক দশক ধরে ঘৃণিত স্বৈরশাসককে ক্ষমতায় রাখতে সিরিয়ার বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াই করে হিজবুল্লাহ বহু যোদ্ধা, অর্থ এবং আরব জনগণের বড় অংশের সহানুভূতি হারিয়েছিল। লেবাননে যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার দিনই যখন সিরিয়ায় বিদ্রোহীদের আকস্মিক অভিযান শুরু হয়, তখন আবার আসাদকে বাঁচানোর মতো অবস্থায় ছিল না হিজবুল্লাহ।
আসাদের পতনে হিজবুল্লাহর শত্রুরা আরও সাহসী হয়ে ওঠে। যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে হিজবুল্লাহকে লিতানি নদীর দক্ষিণ থেকে সব বাহিনী সরিয়ে নেয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু এরপর বিভিন্ন দেশ ও লেবাননের রাজনৈতিক দলগুলো আরও উত্তর দিকে সরে যাওয়ার দাবি জানাতে শুরু করে।
এক আরব কূটনীতিক মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘আসাদ পতনের পর বক্তব্যের ধরন বদলে যায়। লিতানি নদীর উত্তরে সরে যাওয়ার দাবিও ওঠে, যদিও আমরা সবাই জানতাম, মূল চুক্তিতে এমন কিছু ছিল না।’
হিজবুল্লাহর প্রতি এই সর্বোচ্চ চাপের নীতি সংগঠনটির অবস্থানও আরও কঠোর ও আগ্রাসী করে তোলে। যুদ্ধবিরতি চুক্তি বারবার লঙ্ঘন করে ইসরায়েলের প্রায় প্রতিদিনের হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে।
হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ এক সূত্র বলেন, ‘লেবানন রাষ্ট্র এবং যুক্তরাষ্ট্র হিজবুল্লাহকে রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে টেনে নেয়ার একটি সুযোগ হারিয়েছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরের পর হিজবুল্লাহ জানিয়েছিল, তারা আলোচনার জন্য উন্মুক্ত। এমনকি ইরানের সঙ্গে জুনের যুদ্ধেও তারা অংশ নেয়নি।’
‘কিন্তু ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত থাকা এবং রাষ্ট্রের কোনো বিকল্প পথ দেখাতে অনিচ্ছার কারণে তাদের আর নমনীয় থাকার সুযোগ ছিল না।’
প্রতিরক্ষা থেকে আক্রমণে বাইরে থেকে দেখলে মনে হচ্ছিল, ১৫ মাসের যুদ্ধবিরতিতে হিজবুল্লাহর সামরিক শাখা রক্তক্ষরণে ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে।
ইসরায়েলের অবিরাম হামলায় যেন ‘হাজার ক্ষত’ দিয়ে মৃত্যু নয়, বরং ৩ হাজার বিমান, ড্রোন ও কামানের হামলা নেমে এসেছিল।
হিজবুল্লাহর অধিকাংশ কমান্ডার এবং তাদের উত্তরসূরিদের হত্যা করার পর এবার তাদের উত্তরসূরিদের উত্তরসূরিদেরও একে একে হত্যা করা হচ্ছিল।
এদিকে ইসরায়েলি সেনা ও ঠিকাদারেরা পাঁচটি সামরিক ঘাঁটি শক্তিশালী ও সম্প্রসারিত করে। সীমান্তের পাশে শিয়া-অধ্যুষিত প্রতিটি শহর ও গ্রাম প্রায় মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া হয়।
হিজবুল্লাহর এক সূত্র বলেন, ‘সীমান্ত এলাকা এখন ফুটবল মাঠের মতো পুরোপুরি সমতল। একটি ভবনও দাঁড়িয়ে নেই; নেই বাড়ি, নেই মসজিদ।’
সংগঠনটির পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো প্রতিক্রিয়া না আসায় মনে হচ্ছিল, তারা হয় এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে যে আর দাঁড়াতে পারছে না, অথবা নিজেদের রক্ষার সাহস হারিয়েছে।
বাস্তবে হিজবুল্লাহ তখন বড় ধরনের সামরিক পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। লক্ষ্য ছিল এমন একটি কাঠামো তৈরি করা, যাতে আবারও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নিজেদের সামলে লড়াই করা যায়।
দুই জ্যেষ্ঠ সূত্র মিডল ইস্ট আইকে বলেন, সামরিক শাখাটি অতিরিক্ত বড় ও জটিল হয়ে উঠেছিল। কার্যকরভাবে কাজ করার জন্য এটি ছিল অতিরিক্ত ভারী ও ধীরগতির। যুদ্ধ সেই কাঠামোকে আরও পঙ্গু করে দিয়েছিল।
সমাধান ছিল কাঠামোটিকে একেকটি অংশে ভেঙে ফেলা।
সূত্রগুলোর মতে, ইউনিট ও বিভাগগুলোকে একে অন্যের কাছ থেকে পুরোপুরি স্বাধীন করে দেয়া হয়। এর ভিত্তি ছিল প্রয়াত হিজবুল্লাহ কমান্ডার ইমাদ মুগনিয়েহর নেতৃত্বে কার্যকর হওয়া গেরিলা যুদ্ধের মডেল। প্রতিটি ইউনিটকে কিছু নির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়। এগুলো ছিল আগে থেকেই নির্ধারিত বিভিন্ন পরিস্থিতির জন্য এক ধরনের যুদ্ধ-নির্দেশিকা। ফলে যুদ্ধের উত্তপ্ত সময়ে কেন্দ্রীয় কমান্ডের নির্দেশের অপেক্ষা না করেও ইউনিটগুলো কার্যকরভাবে কাজ করতে পারতো।
নতুন নির্দেশনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল যোদ্ধাদের শেষ গুলি পর্যন্ত লড়াই করতেই হবে, এমন নয়। প্রয়োজন হলে কোনো ইউনিটকে এলাকা ছেড়ে দেওয়ার অনুমতিও দেয়া হয়।
চলতি বছরের মার্চে এই নতুন কাঠামোর প্রথম বড় পরীক্ষা হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে এবং দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করে।
খামেনি ছিলেন হিজবুল্লাহ এবং বহু শিয়া লেবাননির কাছে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় নেতা। হিজবুল্লাহ ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ‘ভিলায়াত আল-ফকিহ’ মতবাদ অনুসরণ করে। খামেনি হত্যার জবাবে সীমান্তের ওপারে ছয়টি রকেট ছোড়া হয়।
তবে হিজবুল্লাহর বর্ণনা অনুযায়ী, সংগঠনটি একই সঙ্গে নিশ্চিত হয়েছিল যে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সুযোগ নিয়ে ইসরায়েল লেবাননে নতুন হামলা চালাতে যাচ্ছে। তাই তারা আগেভাগেই হামলা করার সিদ্ধান্ত নেয়। পরবর্তী সময়ে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের কিছু প্রতিবেদনেও এই মূল্যায়নের সমর্থন পাওয়া যায়।
এক সূত্র বলেন, ‘মার্চে ওই রকেট ছোড়ার সিদ্ধান্ত ছিল সম্পূর্ণ নাঈম কাসেমের সিদ্ধান্ত।’ তিনি নাসরাল্লাহর উত্তরসূরি হিসেবে সংগঠনটির মহাসচিব হয়েছেন। ‘তবে ইরানও এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছিল।’
অন্য এক সূত্র বলেন, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের জবাবে খামেনি হত্যার অনেক আগেই হিজবুল্লাহর ইসরায়েলে হামলা করা উচিত ছিল—ইরানের পরামর্শ ছিল এমনই। ‘কিন্তু হিজবুল্লাহ ভিন্ন হিসাব করেছিল।’
আকাশ থেকে মৃত্যু মধ্যপ্রাচ্যে এখন গেমিং ক্যাফের অভাব নেই।
জেরুজালেম থেকে তেহরান, কায়রো পর্যন্ত ধোঁয়ায় ভারী অন্ধকার ঘরে তরুণদের দেখা যায় পর্দার সামনে বসে ফিফা কিংবা সর্বশেষ ফার্স্ট-পারসন-ভিউ (এফপিভি) শুটিং গেমে একে অপরকে চ্যালেঞ্জ করতে।
দাহিয়েহতে হিজবুল্লাহর অভিজ্ঞ সদস্যরা জেন-জি তরুণদের দেখে হতাশ হতেন। আমেরিকান প্রোগ্রামারদের বানানো কাল্পনিক যুদ্ধে তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা নষ্ট করছে এটাই তাদের চোখে পড়তো। ইসরায়েলিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা প্রবীণদের মনে হতো, তরুণেরা বুঝি নরম হয়ে যাচ্ছে।
তারা জানতেন না, এই তরুণেরাই পরের যুদ্ধে শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধের গতিপথ বদলে দেবে।
২০২৬ সালের মার্চে আবার যুদ্ধ শুরু হলে ইসরায়েলি সেনারা লিতানি নদীর দক্ষিণে এবং তারও বাইরে লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। ব্যক্তিগত বাড়ি, পরিত্যক্ত সামরিক ঘাঁটি, এমনকি একটি ক্রুসেডার দুর্গেও তারা প্রায় ৩০০টি অবস্থান গড়ে তোলে।
আগের যুদ্ধে তীব্র লড়াই হওয়া বিন্ত জবেইলের মতো শহরগুলো হিজবুল্লাহ নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী ছেড়ে দেয়। কিন্তু কোথাও ইসরায়েল নিরাপদ ছিল না। ইসরায়েলি সেনাদের সারাক্ষণ বিরক্ত করা, হয়রানি করা এবং লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছে। ২ মার্চের পর থেকে দক্ষিণ লেবাননে প্রায় ২০ ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছে।
লক্ষ্য ছিল, ইসরায়েলি সেনারা যাতে কোনো অবস্থানকে স্থায়ী ঘাঁটিতে পরিণত করার সুযোগ না পায়। ২০২৪ সালে সীমান্তে পাঁচটি ঘাঁটি তৈরির মতো ঘটনা যেন আর না ঘটে। এ কাজে হিজবুল্লাহ ড্রোন ব্যবহার করছে।
ইসরায়েলের সঙ্গে প্রতিটি নতুন দফার লড়াইয়ে নতুন কোনো অস্ত্র হাজির করার প্রবণতা রয়েছে হিজবুল্লাহর। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের সামরিক উদ্ভাবনক্ষমতার জানান দেয়।
২০০৬ সালে ছিল করনেট অ্যান্টি-ট্যাংক ক্ষেপণাস্ত্র। এটি ইসরায়েলি সাঁজোয়া যান ভেদ করে বড় ধরনের কৌশলগত বিস্ময় সৃষ্টি করেছিল। এবার ব্যবহার করা হচ্ছে এফপিভি ড্রোন। এগুলো ফাইবার-অপটিক কেবলের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ায় বৈদ্যুতিন বাধা দিয়ে এগুলো ঠেকানো কঠিন।
নেতানিয়াহু সস্তা কিন্তু প্রাণঘাতী এই উড়ন্ত যন্ত্রগুলোকে ‘কেন্দ্রীয় হুমকি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ড্রোনগুলো শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং পুরো হামলার ভিডিও ধারণ করে।
ইউক্রেনের মতোই এসব আক্রমণাত্মক ড্রোন পরিচালনার দক্ষতা এসেছে ভিডিও গেমের সংস্কৃতি থেকে। দুটি সূত্রের মতে, এখন হিজবুল্লাহর ড্রোনচালকদের বড় অংশই লেবাননের গেমার।
প্রযুক্তিটি অবশ্য একেবারে নতুন নয়। ২০২৪ সালের যুদ্ধেও হিজবুল্লাহ ড্রোন ব্যবহার করেছিল। তবে এরপর উৎপাদন বহুগুণ বেড়েছে। ড্রোনগুলোও উন্নত করা হয়েছে। এখন এগুলো বেশি বিস্ফোরক বহন করতে পারে এবং ফলে মারকাভা ট্যাংকের জন্য আরও বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।
হিজবুল্লাহর জন্য সৌভাগ্যের বিষয় হলো, ড্রোন তৈরির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপকরণগুলোর অনেকটাই তাদের আগে থেকেই ছিল।
২০২৪ সালের যুদ্ধে হিজবুল্লাহ আলমাস-১ নামে উন্নত ফাইবার-অপটিক অ্যান্টি-ট্যাংক গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার শুরু করে। এতে টেলিভিশন ও তাপীয় চিত্রনির্ভর যৌথ নির্দেশনা ব্যবস্থা ছিল। এটি একটি ইসরায়েলি স্পাইক ক্ষেপণাস্ত্রের নকশা উল্টোভাবে বিশ্লেষণ করে তৈরি করা হয়েছিল, যা আগে হিজবুল্লাহর হাতে এসেছিল।
সমস্যা ছিল, ফাইবার-অপটিক কেবলটির দৈর্ঘ্য মাত্র ৮-১০ কিলোমিটার। ফলে সীমান্তপারের সংঘর্ষে ক্ষেপণাস্ত্রটি খুব বেশি কার্যকর ছিল না।
২০২৬ সালে সংঘাত যখন মূলত লেবাননের মাটিতে সীমাবদ্ধ, তখন এই সীমা আর সমস্যা ছিল না। আলমাস ক্ষেপণাস্ত্রের জন্য মজুত করে রাখা বিপুল পরিমাণ কেবল বরং অপেক্ষাকৃত ছোট ও গোপন এফপিভি ড্রোনে ব্যবহারের জন্য কাজে লাগানো হয়।
হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ এক সূত্র বলেন, ‘ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গুণগত সুবিধা পাওয়ার জন্য হিজবুল্লাহ তার সামরিক শাখাকে বড় করেছিল। এখন তারা কৌশল বদলেছে এবং প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করছে। ড্রোন তার সবচেয়ে ভালো উদাহরণ।’
প্রযুক্তিগতভাবে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ বর্তমানে যুদ্ধবিরতি পালন করছে। ১৬ এপ্রিল থেকে এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর। তবে দুই পক্ষের হামলা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে লেবানন রাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি যুদ্ধ থেকে লেবাননকে আলাদা রাখার চেষ্টা করছে।
ওয়াশিংটনে আলোচনার মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে যে কাঠামো তৈরি হয়েছে, সেটি লেবাননে ব্যাপক সমালোচিত। এখন পর্যন্ত এর ফলে ‘পরীক্ষামূলক প্রকল্পের’ আওতায় লেবাননের সেনাবাহিনীকে দক্ষিণের মাত্র একটি শহরে মোতায়েনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে—যদিও ইসরায়েল ওই শহর দখল করেই রাখেনি।
এদিকে লেবানন রাষ্ট্র ও ইসরায়েল সরকারের সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও যুদ্ধবিরতির মূল ভরসা এখনো কার্যত ইরান। ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করলে ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দিয়েছে।
দক্ষিণ লেবাননে শিগগিরই স্বাভাবিক জীবন ফিরবে এমন কোনো লক্ষণ নেই। হিজবুল্লাহর সূত্র ও লেবাননের কর্মকর্তারা বলছেন, এটি যুদ্ধের বিরতি; যুদ্ধের সমাপ্তি নয়। লেবাননের শিয়াদের মধ্যে প্রশ্ন লেবানন-ইসরায়েল সীমান্তের ভূখণ্ডের মধ্যে এক অদ্ভুত মিল রয়েছে। লেবাননের দিকে বিস্তৃত সাইট্রাস ও তামাকের খেত, বিদেশে সফল হয়ে ওঠা প্রবাসীদের পাঠানো অর্থে নির্মিত টেরাকোটার ছাদওয়ালা বাড়ি। সরু আঁকাবাঁকা সড়কের দিকে কলাগাছের পাতা এমনভাবে ঝুঁকে আছে, যেন পথ চলতি গাড়িতে ওঠার জন্য হাত তুলেছে।
দক্ষিণে ইসরায়েলি বাড়ি ও কৃষিজমি সমুদ্রের পাশে সুশৃঙ্খল সারিতে সাজানো। কিরিয়াত শিমোনার নিচের সমভূমিতে ছড়িয়ে আছে জিগস পাজলের মতো ভূমিরেখা।
দুই পাশের উঁচু জায়গাগুলো থেকে বাসিন্দারা কৌতূহল নিয়ে বেড়া ও জাতিসংঘের টহল দেয়া কাঁচা রাস্তার ওপারে তাকিয়ে একে অন্যের জীবন ও পৃথিবী দেখতে পারেন।
ভূমিটি যেন অভিন্ন যমজ। কিন্তু নাকবার বিপর্যয়ে তারা আলাদা হয়ে গেছে এবং এখন তাদের চরিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।
এখান থেকেই হিজবুল্লাহর প্রথম সদস্য এবং মূল সমর্থকদের উঠে আসা। ১৯৮০-এর দশকের শুরুর দিকে ইসরায়েলি আগ্রাসনে বাস্তুচ্যুত শিয়া লেবাননিরা আমাল আন্দোলন থেকে সরে এসে হিজবুল্লাহর দিকে ঝুঁকেছিল। তাদের আকৃষ্ট করেছিল প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থাবিরোধী বক্তব্য এবং সশস্ত্র প্রতিরোধের অঙ্গীকার।
আজ এই জনগোষ্ঠীগুলোই হিজবুল্লাহর গত দুই যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সংগঠনটির সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের সামাজিক চুক্তিও আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি দুর্বল হয়ে পড়েছে।
দক্ষিণ লেবাননে প্রায় ৬ লাখ মানুষ এখনও নিজ বাড়ি থেকে বাস্তুচ্যুত। তাদের অনেকের বাড়িঘর আর নেই। গাজায় শহর ও গ্রাম নিশ্চিহ্ন করার যে নীতি ইসরায়েল অনুসরণ করেছে, লেবাননেও তার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে।
হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ এক সূত্র বলেন, ‘শিয়া সমাজের ভেতরে প্রশ্ন বাড়ছে, এটা নিশ্চিত।’
দাহিয়েহতে নিহত যোদ্ধাদের একটি কবরস্থানেও অসন্তোষের চাপা গুঞ্জন শোনা যায়। এখানে নিহত সন্তান, ভাইবোন ও স্বামীদের জন্য নীরবে প্রার্থনা করা হয়। কবরগুলোর মাঝখানে ছোট শিশুরা ছুটে বেড়ায়; কোনো কোনো কবরে একসঙ্গে চারজন যোদ্ধার মরদেহ শায়িত।
একজন দর্শনার্থী বলেন, ‘শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করে নিহত আমার বন্ধুদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এসেছি। কিন্তু যা কিছু ঘটেছে, তা নিয়ে আমার গুরুতর আপত্তি আছে।’
গত দুই যুদ্ধ ছিল ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ সালের গৃহযুদ্ধের পর শিয়া জনগোষ্ঠীর জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘাত।
গাজা যুদ্ধে হিজবুল্লাহর হস্তক্ষেপের বিষয়ে লেবানন ও অঞ্চলের এমনকি ঐতিহ্যগতভাবে হিজবুল্লাহবিরোধী কিছু জনগোষ্ঠীর মধ্যেও সহানুভূতি ছিল। কিন্তু মার্চে ইসরায়েলে হামলা চালিয়ে আবারও ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া ডেকে আনার সিদ্ধান্ত ক্ষোভ ও বিস্ময় সৃষ্টি করেছে।
লেবাননের উপপ্রধানমন্ত্রী তারেক মিত্র যেমন মিডল ইস্ট আইকে বলেছেন, এটি ছিল ‘এমন এক যুদ্ধ, যা লেবানন চায়নি, শুরু করেনি।’
তবে জ্যেষ্ঠ হিজবুল্লাহ কর্মকর্তা নাওয়াফ মুসাভির যুক্তি, শুধু আলোচনার মাধ্যমে ইসরায়েল কখনো লেবানন ছাড়বে না। তার মতে, যুদ্ধের জন্য হিজবুল্লাহকে দায়ী করা হচ্ছে ‘তথ্যকে উল্টো করে দেখানোর একটি গণমাধ্যম প্রচারণার’ অংশ হিসেবে।
তিনি বলেন, ‘দখলদারিত্বকে সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত না করে এই প্রচারণা প্রতিরোধকেই সমস্যা হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে।’
‘ধরুন, হিজবুল্লাহ নেই। তাহলেও লেবাননের জনগণের ভূমি মুক্ত করার ইচ্ছা প্রকাশকারী একটি সংগঠন থাকত। তখন সেই সংগঠনই সমস্যা হয়ে দাঁড়াত এমনকি তার নাম যদি আমেরিকার ডেমোক্রেটিক পার্টিও হতো।’
যে দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখা হোক, প্রায় ৫ লাখ শিয়া মানুষ গৃহহীন। রাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনা করে কিংবা হিজবুল্লাহ শক্তি প্রয়োগ করে—কেউই তাদের ঘরে ফিরিয়ে নিতে পারেনি।
এদিকে হিজবুল্লাহও আগের মতো সামাজিক কল্যাণসেবা দিতে পারছে না। সূত্রগুলোর মতে, এর একটি কারণ ভয়াবহ আর্থিক সংকট। তবে সংগঠনটির হাতে থাকা অর্থের বড় অংশও এখন সামরিক কাজে অগ্রাধিকার পাচ্ছে।
এক সূত্র বলেন, ‘আগে সংগঠনটি বাড়িভাড়া, বাড়ি সংস্কার ও কল্যাণসেবার খরচ দিত। এখন তা বন্ধ। কারণ সিরিয়ার মধ্য দিয়ে ইরানের সঙ্গে স্থলপথ আর খোলা নেই। ইরান ও লেবাননের মধ্যে বিমান চলাচলও সীমিত। কিছুটা হলেও এই শূন্যতা শিয়া সমাজের ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দাতব্য উদ্যোগ পূরণ করছে।’
এই অসন্তোষ হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে আরও আনুষ্ঠানিক, শক্তিশালী ও সংগঠিত শিয়া বিরোধিতায় রূপ নেয় কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
ইসরায়েলের প্রকাশ্য সাম্প্রদায়িক লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের নীতি—যেখানে দক্ষিণ লেবাননের বাসিন্দাদের ‘শিয়া শত্রু জনগোষ্ঠী’ বলা হয়েছে—বরং শিয়া সমাজকে হিজবুল্লাহর আরও কাছে ঠেলে দিয়েছে।
লেবাননের অন্য ধর্মাবলম্বীদের একটি অংশের বৈরিতাও একই কাজ করেছে। তাদের কেউ কেউ শিয়া স্বদেশবাসীর দুর্দশার প্রতি খুব কম সহানুভূতি দেখিয়েছে; বরং আমাল ও হিজবুল্লাহর উত্থানের আগে ঐতিহাসিকভাবে প্রান্তিক থাকা এই সম্প্রদায়ের পতন দেখে যেন আনন্দই পেয়েছে।
হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ এক সূত্র বলেন, ‘শিয়াদের মধ্যে অস্তিত্বের ওপর হুমকি তৈরি হয়েছে এমন অনুভূতি রয়েছে।’ চাপের মুখে সম্প্রদায় কীভাবে একত্র হচ্ছে, তার উদাহরণ হিসেবে তিনি আমাল আন্দোলন ও এর নেতা নাবিহ বেরির সাম্প্রতিক ভূমিকার কথা বলেন।
‘আমাল আদর্শগতভাবে ইরানের ঘনিষ্ঠ নয়। কিন্তু খামেনির জন্য শোকসভায় বেরি বলেছিলেন, আমালের সঙ্গে ইরানের কৌশলগত অংশীদারিত্ব রয়েছে। এটি নিছক কথার কথা ছিল না।’
সূত্রটি আরও বলেন, ‘ব্যক্তিগত আলাপে হতাশা থেকে জন্ম নেয়া অসন্তোষের কথা শোনা যায়। কিন্তু সীমিত বিরোধিতার বেশি কিছু আমরা দেখিনি। নতুন কোনো গতিশীলতার ইঙ্গিত দেয়ার মতো উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটেনি।’
‘আগের সেই হিজবুল্লাহ আর নেই’ ২০২৬ সালের আগস্টে এসে হিজবুল্লাহর অবস্থান কোথায়?
সামরিকভাবে সংগঠনটি ভয়াবহভাবে দুর্বল হয়েছে। যদিও দ্রুতগতি ও গেরিলাধাঁচের বাহিনীতে রূপান্তরের নতুন কৌশল কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।
গত দুই যুদ্ধে কতজন হিজবুল্লাহ সদস্য নিহত হয়েছেন, তার কোনো সরকারি সংখ্যা নেই। তবে সংগঠনটির সূত্রগুলোর ধারণা, নিহতের সংখ্যা ৪ হাজার থেকে ১০ হাজারের মধ্যে হতে পারে। তাদের অধিকাংশই নিহত হয়েছেন ২০২৪ সালে। হিজবুল্লাহর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বৃত্তের ঘনিষ্ঠ এক সূত্র বলেন, ‘২০২৩ সালের হিজবুল্লাহ আর আজকের হিজবুল্লাহ এক নয়।’
‘হিজবুল্লাহর বিশাল রকেট শক্তি ছিল, সীমান্তে উপস্থিতি ছিল এবং ইসরায়েলের জন্য বাস্তব ও গুরুতর হুমকি ছিল। তাদের পেছনে সমর্থন ও সরবরাহের যে ব্যবস্থা ছিল, তা গোটা অঞ্চল পেরিয়ে আফগানিস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।’ হিজবুল্লাহর গ্যালিলি অঞ্চলে হামলার যে কোনো পরিকল্পনা থাকলেও তা এখন বিলীন। সংগঠনটির এক সূত্র বলেন, আজকের স্লোগান জেরুজালেমের বদলে লেবাননকে রক্ষার কথা বলে।
তীব্র চাপের মধ্যেও সংগঠনটির নেতৃত্ব টিকে থাকার সক্ষমতা ও কৌশলগত দক্ষতা দেখিয়েছে। নাঈম কাসেম মহাসচিব হওয়ার পর শুরুতে তাকে নিয়ে কিছুটা ঠাট্টা-বিদ্রুপ হয়েছিল।
নাসরাল্লাহর মতো তার আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব নেই। সাফিয়েদ্দিনের মতো ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বও নেই নাসরাল্লাহর মতো তিনিও ছিলেন সাইয়্যেদ, অর্থাৎ নবীর বংশধর। তবু কাসেম অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে হিজবুল্লাহকে পরিচালনা করেছেন। একই সঙ্গে তিনি নিজেও ইসরায়েলি হত্যাচেষ্টার লক্ষ্য।
চলতি বছরের শুরুতে তার বড় একটি পুনর্গঠন ছিল গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। এর মাধ্যমে তিনি নিজের ভাবনা অনুযায়ী সংগঠনটিকে নতুন করে সাজান এবং প্রভাবশালী কয়েকজন নেতাকে প্রান্তিক করে দেন। কাজটি বড় ধরনের বাধা ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছে বলে মনে হয়।
রাজনৈতিক বৃত্তের ঘনিষ্ঠ সূত্রটি বলেন, ‘কাসেমের ক্যারিশমা নেই—এমন অনেক কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু তিনি এখন একটি রূপান্তরকালীন সময়ে সংগঠনটিকে আবার গড়ে তুলছেন।’
‘তিনি প্রমাণ করেছেন যে তিনি সংগঠনটির অবস্থান ধরে রাখতে পারেন, পুরো সংগঠন পুনর্গঠন করতে পারেন এবং এর মধ্যে ঐক্য সুসংহত করতে পারেন।’
হিজবুল্লাহর সব জ্যেষ্ঠ সামরিক নেতা নিহত হলেও প্রতিষ্ঠাতা প্রজন্মের কাসেম ও হিজবুল্লাহর সংসদীয় ব্লকের প্রধান মোহাম্মদ রাদ এখনও নিজ নিজ অবস্থানে আছেন।
দ্বিতীয় প্রজন্মের প্রভাবশালী নেতারাও আছেন। তাদের মধ্যে হাসান ফাদলাল্লাহ সামনে এসেছেন এবং আরও প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন। মুসাভি বলেন, ‘আমরা একটি প্রতিরোধ আন্দোলন। আমাদের নেতাদের হত্যার ঝুঁকি আছে। তাই প্রতিটি পদে এমন একজন বিকল্প থাকতে হবে, যিনি কোনো কর্মকর্তা নিহত বা শহীদ হলে তার জায়গা নিতে পারবেন।’
তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, বলা যায় প্রথম প্রজন্ম নিহত হয়েছে, দ্বিতীয় প্রজন্মও নিহত হয়েছে এবং তৃতীয় প্রজন্মের অনেকেও নিহত হয়েছেন। তবু প্রতিরোধ অব্যাহত থাকবে।’
‘ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্ম সম্পর্কে শক্তিশালী তথ্য ছিল। কিন্তু এখন তারা এমন একটি নতুন প্রজন্মের সঙ্গে লড়ছে, যাদের তারা চেনে না।’
এই দুর্বলতার সময়ে মনে হতে পারে, নাসরাল্লাহর আমলের তুলনায় ইরান এখন হিজবুল্লাহকে আরও বেশি সরাসরি পরিচালনা করছে। কিন্তু সূত্রগুলোর বক্তব্য, বাস্তবে মাটিতে ইরানি উপদেষ্টার সংখ্যা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় কম।
রাজনৈতিক বৃত্তের ঘনিষ্ঠ সূত্রটি বলেন, ‘আমার মনে হয়, বর্তমান সময়ে ইরানের উপস্থিতি সবচেয়ে কম। এর কারণ লজিস্টিক সমস্যা। সিরিয়া এখন আর ইরানিদের জন্য আগের মতো উন্মুক্ত নয়। বিমান চলাচলও কঠিন।’
‘তবে রাজনৈতিক ও কৌশলগত পর্যায়ে সমন্বয় অবশ্যই আছে। এই সমন্বয় হয়তো এখন সবচেয়ে শক্তিশালী।’
তিনি বলেন, অঞ্চলের পাশাপাশি হিজবুল্লাহর ভবিষ্যৎও নির্ভর করছে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার আলোচনা ও সংঘাতের ওপর।
ইরানের যুদ্ধ তেহরান ও হিজবুল্লাহর সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করেছে। ইরান এমন কোনো যুদ্ধ-সমাপ্তির আলোচনায় যেতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, যাতে লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে না।
বদলে যাচ্ছে রাজনৈতিক সমীকরণ
লেবানন রাষ্ট্রের সঙ্গে হিজবুল্লাহর সম্পর্ক এখন সবচেয়ে তলানিতে।
২ মার্চ ইসরায়েলে হিজবুল্লাহর হামলা, এরপর প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালামের হিজবুল্লাহর সামরিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা এবং প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনের ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির উদ্যোগ সব মিলিয়ে সংগঠনটি ও রাষ্ট্রের মধ্যে দূরত্ব আরও বেড়েছে।
সূত্রগুলো বলছে, ২০২৪ সালের ইসরায়েলি আগ্রাসনের পর হিজবুল্লাহর ভেতরে সংগঠনটির ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুতর আলোচনা হয়েছিল। সশস্ত্র আন্দোলন থেকে শুধু রাজনৈতিক সংগঠনে রূপান্তরিত হওয়া সম্ভব কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল।
হিজবুল্লাহ এখন সংসদের সবচেয়ে বড় দল এবং বহু বছর ধরে লেবানন রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।
লেবাননের সাম্প্রদায়িক ক্ষমতা ভাগাভাগির ব্যবস্থার মাধ্যমে তৈরি রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া একটি রাষ্ট্রবিরোধী সংগঠন হিসেবে হিজবুল্লাহর জন্ম হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে টিকে থাকা ও শক্তিশালী হওয়ার জন্য সংগঠনটি সেই দল ও ব্যক্তিত্বগুলোরই অনেক বৈশিষ্ট্য গ্রহণ করেছে, যাদের একসময় তারা ঘৃণা করত।
২০১৯ সালের রাষ্ট্রবিরোধী গণবিক্ষোভের সময়ও তারা রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে সুরক্ষা দিয়েছিল। বিক্ষোভকে বিদেশি ষড়যন্ত্র হিসেবে তুলে ধরে সমর্থকদের পাঠিয়ে তারা বিক্ষোভকারীদের শিবির ভেঙে দেয়।
রাজনৈতিক বৃত্তের ঘনিষ্ঠ সূত্রটির মতে, দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বালু যখন তাদের পায়ের নিচ থেকে সরে যাচ্ছে, তখন হিজবুল্লাহ আবারও নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে পারে। তিনি বলেন, ‘অস্ত্র ত্যাগ এবং সেটি কীভাবে বা কোন রূপে হতে পারে—এসব নিয়ে দলের ভেতরে পেছনে আলোচনা চলছে। কিন্তু যুদ্ধের সময়ে কোনো প্রস্তাব সামনে আনা সম্ভব নয়।’
‘গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নাঈম কাসেমের কোনো অলঙ্ঘনীয় সীমারেখা নেই।’ স্বাভাবিকভাবেই, এমন কিছু নেতা আছেন যারা অস্ত্র ত্যাগ এবং রাষ্ট্র বা পশ্চিমা বিশ্বের কাছে ছাড় দেয়ার ধারণায় ক্ষুব্ধ।
একজন সূত্র বলেন, ‘এটা শুধু আমার ব্যক্তিগত মত, অবশ্যই দলের মত নয়। আমার মনে হয়, হিজবুল্লাহর উচিত বোমা হামলা ও হত্যার মাধ্যমে আবার উন্মত্ত অবস্থায় ফিরে যাওয়া। আশির দশকের হিজবুল্লাহতে ফিরে যাওয়া।’
‘কিন্তু বিষয়টি এত সহজ নয়। আমরা এখন সমাজের গভীরে প্রোথিত।’
আরেকটি জটিলতা হলো, ইসরায়েল এবং আন্তর্জাতিক মহল ও লেবাননের কিছু পক্ষ লেবাননের সেনাবাহিনীর ওপর হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার চাপ দিচ্ছে। দেশটির অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এতে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যেতে পারে। এমনকি ইকোনমিস্টও লেবাননের সেনাবাহিনীকে আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়ে নিবন্ধ প্রকাশ করেছে।
গত মাসে তারা লিখেছে, ‘ভয় বোঝা যায়, কিন্তু তা নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত হতে পারে না। সেনাবাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’
মিত্রি মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ইসরায়েল হয়তো এমন পরিস্থিতি দেখতে চাইবে। ‘কিন্তু আমার মনে হয়, সেনাবাহিনী কিংবা হিজবুল্লাহ কেউই একে অপরের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ফাঁদে পা দিতে চায় না।’
অন্যদিকে মুসাভি বলেন, ‘লেবাননে এমন কেউ অস্ত্র হাতে প্রতিরোধের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে আমি তা মনে করি না। কারণ দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরার অর্থ হবে লেবানন ধ্বংস হওয়ার আগেই নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনা।’
একটার পর একটা ভয়াবহ আঘাত এবং আগাম মৃত্যুঘোষণা সত্ত্বেও হিজবুল্লাহ এবং ইরান নেতৃত্বাধীন প্রতিরোধের অক্ষ এখনও জীবিত। তারা সশস্ত্র, প্রভাবশালী এবং বর্তমানে প্রতিরোধ শক্তি হিসেবে নতুন করে সক্রিয়। একই সময়ে ইসরায়েলি সেনারা লেবাননের বিস্তীর্ণ এলাকায় অবস্থান করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে যে কাঠামো তৈরি হয়েছে, সেটিকে ব্যাপকভাবে আত্মসমর্পণ হিসেবে দেখা হচ্ছে এবং নেতানিয়াহু প্রকাশ্যেই তা নিয়ে ঠাট্টা করেছেন। কিন্তু এই কাঠামো হিজবুল্লাহকে রাজনৈতিকভাবে কিছুটা সময়ও দিয়েছে।
এক সূত্র বলেন, ‘সরকারের বিরুদ্ধে হিজবুল্লাহর অবস্থান আরও শক্ত হয়েছে, কারণ সংগঠনটির অনেক শত্রুও ওই কাঠামোর সমালোচনা করেছে।’
সূত্রটির মতে, অঞ্চলটির প্রতিটি আলোচনা ও দর-কষাকষির কেন্দ্রে এখনো হিজবুল্লাহ রয়েছে। এমনকি ওভাল অফিসেও।
দুটি হিজবুল্লাহ সূত্র এবং একজন লেবাননি কূটনৈতিক সূত্রের মতে, সাম্প্রতিক কয়েকটি যুদ্ধবিরতি আলোচনা নিয়ে ডনাল্ড ট্রাম্প এতটাই হতাশ হয়ে পড়েছিলেন যে তিনি ওয়াশিংটনে লেবাননের রাষ্ট্রদূতকে ফোন করে হিজবুল্লাহর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের ব্যবস্থা করতে বলেন।
এক সূত্রের ভাষ্য, ‘এরপর কর্মকর্তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং হিজবুল্লাহর যে কারও ফোন নম্বর খুঁজতে শুরু করেন। তারা যেসব শিয়াকে চিনতেন, এমনকি অপরিচিত শায়খদেরও ফোন করছিলেন যাতে কথা বলার জন্য সঠিক ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়া যায়।’
তিনটি সূত্রই জানিয়েছে, ট্রাম্পের এই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল।
(মিডল ইস্ট আই থেকে অনূদিত)

আপনার মতামত লিখুন