বৈষম্যহীন মানবিক সমাজ। সমতা, সমদৃষ্টির সমাজ। পঞ্চাশ, ষাটের দশকে যাদের জন্ম তাদের স্বপ্নের সমাজে এসব উপাদান টগবগ করতো। মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের সংবিধানে কী অযাচিত ভাবে মূলনীতি হিসেবে সমাজতন্ত্র এসেছিল। জন আকাক্সক্ষায় কী অন্তর্ভূক্তিমূলক মানবিক সমাজের এজেন্ডা ছিল না। এখন যেমন ধর্ম এসেছে রাজনীতিতে তখন উদ্যাম আকাক্সক্ষা স্রোতে সমতা, সাম্য, মানবিকতা এসেছিল তরুণদের হৃদয়ে। স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রলীগ খুব বেশি সুবিধা করতে পারেনি। তরুণদের আকাক্সক্ষার মানবিক সমাজ গড়ার জন্য সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে ছাত্ররা আস্থা রেখেছিল সমাজতন্ত্রকে ধারণ করা ছাত্র সংগঠনগুলোতে। সে কারণে ‘ছাত্র ইউনিয়ন’ এর উপর আস্থা ছিল তরুণ শিক্ষার্থীদের। এরপর জাসদ ছাত্রলীগ, সারাদেশে তারুণদের বুকে ঝড় তোলে। সে ঝড় কতটুকু ছাত্ররাজনীতির ময়দানকে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করতে পেরেছিল সে মূল্যায়ন না হয় ভিন্ন ভাবে করা যেতে পারে। তবে গবেষণা গ্রন্থে প্রবেশ না করেই এটা বলা যায় যে স্বাধীন বাংলাদেশে তরুণ সমাজ সাম্য, মৈত্রী, নায্যতাভিত্তিক একটি দেশ গড়তে চেয়েছিলো। ইতিহাসের পাতায় নয় পঞ্চাশের শেষ অথবা ষাটের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত যাদের জন্ম তাদের জীবন অভিজ্ঞতা পাঠ করলেই সেই সত্য উন্মোচন করা সহজ।
চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার আকাক্সক্ষার কথা শুনে পঞ্চাশ ষাটের দশকের অনেকেই অগ্রহ সহকারে আন্দোলনটিকে অনুসরণ এবং সমর্থন করতে থাকেন। আন্দোলনের শুরুতেই আমরা শুনতে পাই, ‘বঙ্গবন্ধুর বাংলায়, বৈষম্যের ঠাই নাই’, ‘আমার সোনার বাংলায় বৈষম্যের ঠাই নাই’ এসব স্লোগান বদ্ধ সমাজকে অনেকটা চমকে দেয়। নড়ে চড়ে ওঠে সাধারণ মানুষ, শিক্ষত মধ্যবিত্ত স্বাপ্নিক মানুষের দল। এবার কী তাহলে প্রকৃত অর্থে বৈষম্য নিরসন হতে যাচ্ছে। আশায় বুক বাঁধে অনেক আবেগী, সহজ সরল নাগরিক। যৌবনে যারা বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন তারা অনেকেই ভেবেছিলেন সাম্যবাদী নজরুলের স্বপ্নের কাল বোশেখী বোধ হয় এলো। ‘অনেকেই জয়ধ্বণি’ দেয়া শুরু করলেন। কেউ উচ্চস্বরে কেউ নিম্ন স্বরে। দূর থেকে তারা ‘নৃত্য পাগল’ তরুণদের আকাক্সক্ষা আন্তরিক কৌতুহলে পর্যবেক্ষণ শুরু করলেন রাজপথের দিকে তাকিয়ে। রাজপথেও নজরুলের গান চলছে। ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর/তোরা সব জয়ধ্বনি কর/ঐনূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখির ঝড়/তোরা সব জয়ধ্বনি কর/ আসল এবার অনাগত প্রলয়-নেশায় নৃত্যুপাগল/সিন্ধু-পারের সিংহ-দ্বারে ধমক হেনে ভাঙল আগল?’ আগল তাহলে ভাঙতে যাচ্ছে। সাতচল্লিশ পূর্ব বিপ্লবীদের অনেকেই আগল ভাঙতে চেয়েছিলেন। সত্তর আশির দশকের দ্বিমেরু বিশিষ্ট পৃথিবীতে দেশে দেশে আগল ভাঙার রাজনীতি দেখেছি আমরা। আগল শেষ পর্যন্ত ভাঙেনি। আগল ভাঙার রাজনীতিতে যারা নিবেদিত ছিলেন, তারা অনেকেই হতাশ হয়ে নিজের আদর্শের বিপরীত পথে হেঁটে হেঁটে হারিয়ে গেছেন আগল ভাঙার রাজনীতির প্রান্তর থেকে।
চব্বিশের আন্দোলনের যারা পরিকল্পনা করেছিলেন তারা জানতেন মধ্যবিত্ত বাঙালি পাগল হয় আগল ভাঙার গানে। পরিকল্পনা যে ভাবে করা উচিত ছিল ঠিক সে ভাবেই করা হয়েছিল। হৃদয় হরণ করা গ্রাফিতি আঁকা হয়েছিল দেয়ালে দেয়ালে। মনে আছে এখনও, একটি ছোট গাছের ডালে কয়েকটি পাতা। পাতাগুলোতে লেখা ছিল ‘হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ , খ্রিস্টান, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠি’। ডালের নিচে লেখা, ‘পাতা ছেড়াঁ নিষেধ’ এই যে মহামিলনের, মহা সৌহার্দ্যরে বার্তা দেয়ালে দেয়ালে একে দেয়া হয়েছিলো সে বার্তা হৃদয় ছুয়ে গেছে। এই আন্দোলনের গানগুলোর দিকে খেয়াল করুন, মোহিনী চৌধুরীর সেই অমর গান, মুক্তির মন্দির সোপান তলে কত প্রাণ হলো বলিদান। গানটি শুনলে হৃদয়ের কোনের নিস্প্রভ আগুন জ্বলে ওঠে। ‘কত বিপ্লবী বন্ধুর রক্তে রাঙা/বন্দীশালার ওই শিকল ভাঙা/তারা কি ফিরিবে আজ সু-প্রভাতে/যত তরুণ অরুণ গেছে অস্তাচলে/যারা স্বর্গগত তারা এখনও জানেন/স্বর্গের চেয়ে প্রিয় জন্মভূমি।’ আহা, স্বর্গের চেয়েও প্রিয় জন্মভূমি। এরকম সঙ্গীতের বাণী যখন দেশ প্রেমিক বাঙালির কর্ণ কূহরে প্রবেশ করে তখন তাদের চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরে না হয় তারা মিছিলে যায়। আন্দোলনের শুরুতে মধ্যবিত্ত প্রগতিকামী বাঙালি ভেবেছিল, চণ্ডিদাসের সেই অমর বাণী, আব্দুল হাকিমের অকৃত্রিম দেশ প্রেমের ধারাবাহিকতায় রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের মানব ধর্মের উত্থান হিসেবে হলো বুঝি আবার। নায্যতা ভিত্তিক, মানবিক সমাজ গড়ার প্রত্যয় বুকে ধারণ করে ঢাকার দেয়ালে ম্লান হয়ে গেলেও এখনও গ্রাফিতেতে লেখা আছে, ‘বিপ্লব শেষে তুমিও যদি স্বৈরাচারী হয়ে যাও, বিপ্লব তোমার পিছু ছাড়বে না।’ কথাটি মিথ্যে মনে হয়নি। তখনো, এখনও এবং ভবিষ্যতেও মনে হবে না।
নারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে, শুধু সঙ্গে নয় সামনে নিয়ে ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি’ কিংবা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ‘তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেবোরে’ গান গেয়ে আকাশ বাতাস বিদীর্ন করে দিয়েছিল মিছিলে মিছিলে। এর পর বিস্ময় নিয়ে দেখা গেলো তীরে নৌকা ভেড়ার পর পরই নারীদেরকে কারা যেনো পেছনে নিয়ে গেলো। ধীরে ধীরে নারী আবার অবরোধ বাসিনী হয়ে গেলো প্রায় এবং তাদের স্বর নিচে নেমে এলো। আর গান! বাউলদের আখড়ায়, বাউল গানের আসরে আগুন ধরিয়ে দেয়া হলো। ‘তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগরের’ মতো গান আর মিছিলে শুনা গেলোনা। গণতন্ত্রের মুক্তির জন্য যেদেশে সাতচল্লিশের পর থেকে আনন্দ শুরু হয়েছিল সে দেশে গণতন্ত্রের মুক্তি আন্দোলনের লড়াইকে আইসিইউ তে পাঠিয়ে দেয়া হলো গণমাধ্যমগুলোতে আঘাত করা শুরু করা হলো। প্রথম আলো, ডেইলি স্টারসহ যারা ভিন্নমত পরিবেশন করতেন তাদের মুখ বন্ধ করার জন্য আগুন ধরিয়ে দেয়া হলো। বাঙালির অহংঙ্কারের প্রতিষ্ঠান ছায়ানট, উদীচিতে আগুন জ্বললো দাউ দাউ করে। বিপ্লবের মূল বার্তার সাথে অরাজনৈতিক , শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত বাঙালিরা বিপ্লবত্তোর কর্মকান্ডের কোন সাদৃশ্য খুজে না পেয়ে হতাশ হলেন।
আন্দোলনের শুরুতে আমরা কোন ধর্মীয় বার্তা খুজে পাইনি। পাঁচ আগস্টের পর দেখা গেলো একদল লোক ধর্মের নামে কবর থেকে লাশ উঠিয়ে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে। গাছে ঝুলিয়ে মৃত লাশকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে উল্লাস করতে দেখা গেলো। প্রান্তিক মানুষেরা সরে গেলো আন্দোলন থেকে। আমরা এক বিস্ময়কর নির্লিপ্ততা, উদাসীনতার শাসন দেখতে পেলাম অন্তর্বর্তী সরকারের আঠারো মাস। প্রথম আলো, ডেইলি স্টার অফিসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পৌঁছুতে, পোঁছুতে সাংবাদিক নূরুল কবির পৌঁছে গেলেন। কতো আর্তি জানালেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আমরা দেখতে পেলাম সেই ট্র্যানশলেশনের সে বিখ্যাত বাক্য ব্যবহার করতে। রোগি মারা যাওয়ার অপেক্ষায় ডাক্তার। ‘ডাক্তার আসিবার পূর্বে রোগি মারা গেলো।’ অর্থাৎ অগ্নি সংযোগ শেষে তার উপস্থিত হলেন। রোগির মৃত্যুর পর আমরা শুনতে পেলাম, ‘যোগাযোগের অনেক চেষতা করা হয়েছে’। তবে কার্যকর যোগাযোগের চিহ্ন নাগরিক সমাজ খুঁজে পেলোনা।
পাঁচ আগস্টের পর আমরা বৈষম্য নিরসনের স্লোগান আর শুনতে পেলাম না। বৈষম্য নিরসনের উপায় নিয়ে কোন সেমিনার, সিম্পোজিয়ামের আয়োজন দেখতে পেলাম না। পথে প্রান্তরে কোনো মিছিল নেই। অগ্নি ঝরা কোনো বক্তব্যও নেই। বৈষম্য নিরসন দারিদ্রের মতো যাদু ঘরে চলে গেলো । আমাদের বয়সী মানুষ যারা ষাটের দশকে জন্ম নিয়েছেন তারা জীবন ভর ঠকতে, ঠকতে, অধিক শোকে পাথর হয়ে গেলেন। যারা অষ্টপ্রহর সমতার সমাজের স্বপ্ন দেখে দেখে প্রান্তিকের সাথে মিশে একাকার হয়ে গিয়েছিলেন তার বিস্ময়ে বিমূঢ় প্রায়।
আন্দোলনের প্রতিশ্রুতি যদিও নেতৃত্ব দানকারীরা বিস্মৃত হয়েছেন, প্রান্তিক মানুষেরা কিন্তু মোটেই বিস্মৃত হননি। আন্দোলনের মধ্যমনি যারা ছিলেন তাদেরকে ফিরে তাকাতে হবে। জন আকাক্সক্ষাকে মূর্ত করার জন্য তারা কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন আর বাস্তবে এখন কী ঘটছে। নিছক সরকার পরিবর্তনের জন্য এ’দেশে অনেক আন্দোলন অভুত্থ্যান হয়েছে। আন্দোলন শেষে প্রতারিত হয়েছে মানুষ। বারবার প্রত্যাখ্যাত, প্রতারিত হলে আর একটি বিপ্লব অপেক্ষা করে প্রত্যাখাকারীদের সামনে।
হাছন, লালন, রাধারমণ, শাহ করিমের দেশের মানুষ আমরা। বড়ই কোমল আমাদের হৃদয়, যুগপৎ কঠিনও বটে। আমরা আর অস্থিরতা চাইনা। অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি, শোষণ বঞ্চনাহীন সমাজ আমাদের আকাক্সক্ষা। এই আকাক্সক্ষা প্রত্যাশার কথা প্রান্তিকেরা দেয়ালে লিখতে পারিনা, তবে মনের গহীনে পুষে রাখে। এবার উদ্ভট উটের পিঠ থেকে নেমে, সমাজকে, রাষ্ট্রকে বুঝিয়ে দিতে হবে মালিকানা। প্রান্তিকের মালিকানা। শত শত বছরের আকাক্সক্ষার শোষন হীন, বৈষম্য মুক্ত রাষ্ট্র গড়ে তুলতে না পারলে সামনে মহা বিপদের সাইরেন শুনা যেতে পারে। আন্দোলনের সময় লেখা সেই গ্রাফিতিরা বাণী, বিপ্লব শেষে তুমি যদি স্বৈরাচার হয়ে যাও বিপ্লপব তোমার পিছু ছাড়বে না। ‘কথাটি মনে রাখার, দায়িত্ব শুধু সরকারের নয় সব নাগরিকের।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]

শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৫ আগস্ট ২০২৬
বৈষম্যহীন মানবিক সমাজ। সমতা, সমদৃষ্টির সমাজ। পঞ্চাশ, ষাটের দশকে যাদের জন্ম তাদের স্বপ্নের সমাজে এসব উপাদান টগবগ করতো। মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের সংবিধানে কী অযাচিত ভাবে মূলনীতি হিসেবে সমাজতন্ত্র এসেছিল। জন আকাক্সক্ষায় কী অন্তর্ভূক্তিমূলক মানবিক সমাজের এজেন্ডা ছিল না। এখন যেমন ধর্ম এসেছে রাজনীতিতে তখন উদ্যাম আকাক্সক্ষা স্রোতে সমতা, সাম্য, মানবিকতা এসেছিল তরুণদের হৃদয়ে। স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রলীগ খুব বেশি সুবিধা করতে পারেনি। তরুণদের আকাক্সক্ষার মানবিক সমাজ গড়ার জন্য সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে ছাত্ররা আস্থা রেখেছিল সমাজতন্ত্রকে ধারণ করা ছাত্র সংগঠনগুলোতে। সে কারণে ‘ছাত্র ইউনিয়ন’ এর উপর আস্থা ছিল তরুণ শিক্ষার্থীদের। এরপর জাসদ ছাত্রলীগ, সারাদেশে তারুণদের বুকে ঝড় তোলে। সে ঝড় কতটুকু ছাত্ররাজনীতির ময়দানকে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করতে পেরেছিল সে মূল্যায়ন না হয় ভিন্ন ভাবে করা যেতে পারে। তবে গবেষণা গ্রন্থে প্রবেশ না করেই এটা বলা যায় যে স্বাধীন বাংলাদেশে তরুণ সমাজ সাম্য, মৈত্রী, নায্যতাভিত্তিক একটি দেশ গড়তে চেয়েছিলো। ইতিহাসের পাতায় নয় পঞ্চাশের শেষ অথবা ষাটের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত যাদের জন্ম তাদের জীবন অভিজ্ঞতা পাঠ করলেই সেই সত্য উন্মোচন করা সহজ।
চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার আকাক্সক্ষার কথা শুনে পঞ্চাশ ষাটের দশকের অনেকেই অগ্রহ সহকারে আন্দোলনটিকে অনুসরণ এবং সমর্থন করতে থাকেন। আন্দোলনের শুরুতেই আমরা শুনতে পাই, ‘বঙ্গবন্ধুর বাংলায়, বৈষম্যের ঠাই নাই’, ‘আমার সোনার বাংলায় বৈষম্যের ঠাই নাই’ এসব স্লোগান বদ্ধ সমাজকে অনেকটা চমকে দেয়। নড়ে চড়ে ওঠে সাধারণ মানুষ, শিক্ষত মধ্যবিত্ত স্বাপ্নিক মানুষের দল। এবার কী তাহলে প্রকৃত অর্থে বৈষম্য নিরসন হতে যাচ্ছে। আশায় বুক বাঁধে অনেক আবেগী, সহজ সরল নাগরিক। যৌবনে যারা বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন তারা অনেকেই ভেবেছিলেন সাম্যবাদী নজরুলের স্বপ্নের কাল বোশেখী বোধ হয় এলো। ‘অনেকেই জয়ধ্বণি’ দেয়া শুরু করলেন। কেউ উচ্চস্বরে কেউ নিম্ন স্বরে। দূর থেকে তারা ‘নৃত্য পাগল’ তরুণদের আকাক্সক্ষা আন্তরিক কৌতুহলে পর্যবেক্ষণ শুরু করলেন রাজপথের দিকে তাকিয়ে। রাজপথেও নজরুলের গান চলছে। ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর/তোরা সব জয়ধ্বনি কর/ঐনূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখির ঝড়/তোরা সব জয়ধ্বনি কর/ আসল এবার অনাগত প্রলয়-নেশায় নৃত্যুপাগল/সিন্ধু-পারের সিংহ-দ্বারে ধমক হেনে ভাঙল আগল?’ আগল তাহলে ভাঙতে যাচ্ছে। সাতচল্লিশ পূর্ব বিপ্লবীদের অনেকেই আগল ভাঙতে চেয়েছিলেন। সত্তর আশির দশকের দ্বিমেরু বিশিষ্ট পৃথিবীতে দেশে দেশে আগল ভাঙার রাজনীতি দেখেছি আমরা। আগল শেষ পর্যন্ত ভাঙেনি। আগল ভাঙার রাজনীতিতে যারা নিবেদিত ছিলেন, তারা অনেকেই হতাশ হয়ে নিজের আদর্শের বিপরীত পথে হেঁটে হেঁটে হারিয়ে গেছেন আগল ভাঙার রাজনীতির প্রান্তর থেকে।
চব্বিশের আন্দোলনের যারা পরিকল্পনা করেছিলেন তারা জানতেন মধ্যবিত্ত বাঙালি পাগল হয় আগল ভাঙার গানে। পরিকল্পনা যে ভাবে করা উচিত ছিল ঠিক সে ভাবেই করা হয়েছিল। হৃদয় হরণ করা গ্রাফিতি আঁকা হয়েছিল দেয়ালে দেয়ালে। মনে আছে এখনও, একটি ছোট গাছের ডালে কয়েকটি পাতা। পাতাগুলোতে লেখা ছিল ‘হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ , খ্রিস্টান, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠি’। ডালের নিচে লেখা, ‘পাতা ছেড়াঁ নিষেধ’ এই যে মহামিলনের, মহা সৌহার্দ্যরে বার্তা দেয়ালে দেয়ালে একে দেয়া হয়েছিলো সে বার্তা হৃদয় ছুয়ে গেছে। এই আন্দোলনের গানগুলোর দিকে খেয়াল করুন, মোহিনী চৌধুরীর সেই অমর গান, মুক্তির মন্দির সোপান তলে কত প্রাণ হলো বলিদান। গানটি শুনলে হৃদয়ের কোনের নিস্প্রভ আগুন জ্বলে ওঠে। ‘কত বিপ্লবী বন্ধুর রক্তে রাঙা/বন্দীশালার ওই শিকল ভাঙা/তারা কি ফিরিবে আজ সু-প্রভাতে/যত তরুণ অরুণ গেছে অস্তাচলে/যারা স্বর্গগত তারা এখনও জানেন/স্বর্গের চেয়ে প্রিয় জন্মভূমি।’ আহা, স্বর্গের চেয়েও প্রিয় জন্মভূমি। এরকম সঙ্গীতের বাণী যখন দেশ প্রেমিক বাঙালির কর্ণ কূহরে প্রবেশ করে তখন তাদের চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরে না হয় তারা মিছিলে যায়। আন্দোলনের শুরুতে মধ্যবিত্ত প্রগতিকামী বাঙালি ভেবেছিল, চণ্ডিদাসের সেই অমর বাণী, আব্দুল হাকিমের অকৃত্রিম দেশ প্রেমের ধারাবাহিকতায় রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের মানব ধর্মের উত্থান হিসেবে হলো বুঝি আবার। নায্যতা ভিত্তিক, মানবিক সমাজ গড়ার প্রত্যয় বুকে ধারণ করে ঢাকার দেয়ালে ম্লান হয়ে গেলেও এখনও গ্রাফিতেতে লেখা আছে, ‘বিপ্লব শেষে তুমিও যদি স্বৈরাচারী হয়ে যাও, বিপ্লব তোমার পিছু ছাড়বে না।’ কথাটি মিথ্যে মনে হয়নি। তখনো, এখনও এবং ভবিষ্যতেও মনে হবে না।
নারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে, শুধু সঙ্গে নয় সামনে নিয়ে ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি’ কিংবা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ‘তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেবোরে’ গান গেয়ে আকাশ বাতাস বিদীর্ন করে দিয়েছিল মিছিলে মিছিলে। এর পর বিস্ময় নিয়ে দেখা গেলো তীরে নৌকা ভেড়ার পর পরই নারীদেরকে কারা যেনো পেছনে নিয়ে গেলো। ধীরে ধীরে নারী আবার অবরোধ বাসিনী হয়ে গেলো প্রায় এবং তাদের স্বর নিচে নেমে এলো। আর গান! বাউলদের আখড়ায়, বাউল গানের আসরে আগুন ধরিয়ে দেয়া হলো। ‘তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগরের’ মতো গান আর মিছিলে শুনা গেলোনা। গণতন্ত্রের মুক্তির জন্য যেদেশে সাতচল্লিশের পর থেকে আনন্দ শুরু হয়েছিল সে দেশে গণতন্ত্রের মুক্তি আন্দোলনের লড়াইকে আইসিইউ তে পাঠিয়ে দেয়া হলো গণমাধ্যমগুলোতে আঘাত করা শুরু করা হলো। প্রথম আলো, ডেইলি স্টারসহ যারা ভিন্নমত পরিবেশন করতেন তাদের মুখ বন্ধ করার জন্য আগুন ধরিয়ে দেয়া হলো। বাঙালির অহংঙ্কারের প্রতিষ্ঠান ছায়ানট, উদীচিতে আগুন জ্বললো দাউ দাউ করে। বিপ্লবের মূল বার্তার সাথে অরাজনৈতিক , শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত বাঙালিরা বিপ্লবত্তোর কর্মকান্ডের কোন সাদৃশ্য খুজে না পেয়ে হতাশ হলেন।
আন্দোলনের শুরুতে আমরা কোন ধর্মীয় বার্তা খুজে পাইনি। পাঁচ আগস্টের পর দেখা গেলো একদল লোক ধর্মের নামে কবর থেকে লাশ উঠিয়ে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে। গাছে ঝুলিয়ে মৃত লাশকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে উল্লাস করতে দেখা গেলো। প্রান্তিক মানুষেরা সরে গেলো আন্দোলন থেকে। আমরা এক বিস্ময়কর নির্লিপ্ততা, উদাসীনতার শাসন দেখতে পেলাম অন্তর্বর্তী সরকারের আঠারো মাস। প্রথম আলো, ডেইলি স্টার অফিসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পৌঁছুতে, পোঁছুতে সাংবাদিক নূরুল কবির পৌঁছে গেলেন। কতো আর্তি জানালেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আমরা দেখতে পেলাম সেই ট্র্যানশলেশনের সে বিখ্যাত বাক্য ব্যবহার করতে। রোগি মারা যাওয়ার অপেক্ষায় ডাক্তার। ‘ডাক্তার আসিবার পূর্বে রোগি মারা গেলো।’ অর্থাৎ অগ্নি সংযোগ শেষে তার উপস্থিত হলেন। রোগির মৃত্যুর পর আমরা শুনতে পেলাম, ‘যোগাযোগের অনেক চেষতা করা হয়েছে’। তবে কার্যকর যোগাযোগের চিহ্ন নাগরিক সমাজ খুঁজে পেলোনা।
পাঁচ আগস্টের পর আমরা বৈষম্য নিরসনের স্লোগান আর শুনতে পেলাম না। বৈষম্য নিরসনের উপায় নিয়ে কোন সেমিনার, সিম্পোজিয়ামের আয়োজন দেখতে পেলাম না। পথে প্রান্তরে কোনো মিছিল নেই। অগ্নি ঝরা কোনো বক্তব্যও নেই। বৈষম্য নিরসন দারিদ্রের মতো যাদু ঘরে চলে গেলো । আমাদের বয়সী মানুষ যারা ষাটের দশকে জন্ম নিয়েছেন তারা জীবন ভর ঠকতে, ঠকতে, অধিক শোকে পাথর হয়ে গেলেন। যারা অষ্টপ্রহর সমতার সমাজের স্বপ্ন দেখে দেখে প্রান্তিকের সাথে মিশে একাকার হয়ে গিয়েছিলেন তার বিস্ময়ে বিমূঢ় প্রায়।
আন্দোলনের প্রতিশ্রুতি যদিও নেতৃত্ব দানকারীরা বিস্মৃত হয়েছেন, প্রান্তিক মানুষেরা কিন্তু মোটেই বিস্মৃত হননি। আন্দোলনের মধ্যমনি যারা ছিলেন তাদেরকে ফিরে তাকাতে হবে। জন আকাক্সক্ষাকে মূর্ত করার জন্য তারা কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন আর বাস্তবে এখন কী ঘটছে। নিছক সরকার পরিবর্তনের জন্য এ’দেশে অনেক আন্দোলন অভুত্থ্যান হয়েছে। আন্দোলন শেষে প্রতারিত হয়েছে মানুষ। বারবার প্রত্যাখ্যাত, প্রতারিত হলে আর একটি বিপ্লব অপেক্ষা করে প্রত্যাখাকারীদের সামনে।
হাছন, লালন, রাধারমণ, শাহ করিমের দেশের মানুষ আমরা। বড়ই কোমল আমাদের হৃদয়, যুগপৎ কঠিনও বটে। আমরা আর অস্থিরতা চাইনা। অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি, শোষণ বঞ্চনাহীন সমাজ আমাদের আকাক্সক্ষা। এই আকাক্সক্ষা প্রত্যাশার কথা প্রান্তিকেরা দেয়ালে লিখতে পারিনা, তবে মনের গহীনে পুষে রাখে। এবার উদ্ভট উটের পিঠ থেকে নেমে, সমাজকে, রাষ্ট্রকে বুঝিয়ে দিতে হবে মালিকানা। প্রান্তিকের মালিকানা। শত শত বছরের আকাক্সক্ষার শোষন হীন, বৈষম্য মুক্ত রাষ্ট্র গড়ে তুলতে না পারলে সামনে মহা বিপদের সাইরেন শুনা যেতে পারে। আন্দোলনের সময় লেখা সেই গ্রাফিতিরা বাণী, বিপ্লব শেষে তুমি যদি স্বৈরাচার হয়ে যাও বিপ্লপব তোমার পিছু ছাড়বে না। ‘কথাটি মনে রাখার, দায়িত্ব শুধু সরকারের নয় সব নাগরিকের।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]

আপনার মতামত লিখুন