সংবাদ

সাহিত্য

জন্মসার্ধশতবর্ষে দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার

বাংলা লোকসাহিত্যের সংরক্ষণ ও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের ক্ষেত্রে দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার (১৮৭৭-১৯৯৭) এক অনন্য নাম| তাঁর সংকলিত রূপকথাগুচ্ছ ঠাকুরমার ঝুলি (১৯০৭) বাঙালির সাংস্কৃতিক স্মৃতি, কল্পনা ও নৈতিক বোধের এক নান্দনিক দলিল| দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার সংকলিত সাহিত্য কেবল শিশুতোষ রচনা নয়; বরং এটি একটি গভীর সাংস্কৃতিক ও তাত্ত্বিক তাৎপর্য বহনকারী সাহিত্যভাণ্ডার| তিনি গ্রামবাংলার মৌখিক ঐতিহ্যকে সংগ্রহ করে সাহিত্যিক রূপ দিয়েছেন, যা বাংলা শিশুসাহিত্য ও লোকসাহিত্যের বিকাশে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে| জন্মের সার্ধশতবর্ষে তাঁর সাহিত্য পুনরায় মূল্যায়ন করা প্রয়োজন— এটি বাঙালির সাংস্কৃতিক শিকড়, পরিচয় এবং নান্দনিক চেতনার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত এবং এ প্রবন্ধে তাঁর সাহিত্যকে লোকসাহিত্যতত্ত্ব, কাঠামোবাদ, মনস্তাত্ত্বিক তত্ত্ব এবং উত্তর-ঔপনিবেশিক দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করা হয়েছে| জন্মসার্ধশতবর্ষে দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারকে সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করছি|লোকসাহিত্য একটি জাতির সমষ্টিগত অভিজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ| বাংলা সাহিত্যে লোকঐতিহ্যের উপস্থিতি সুপ্রাচীন হলেও তা সংগৃহীত ও লিখিত আকারে সংরক্ষণের ক্ষেত্রে দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য| দক্ষিণারঞ্জন মিত্রের গল্পগুলো এ তত্ত্বের আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এগুলো সমাজের মূল্যবোধ, বিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক চেতনার প্রতিফলন| ফোকলোর বিশারদ অ্যালান ডানডেস (Alan Dundes) লোকসংস্কৃতি, প্রতীকনির্ভরতা এবং আচরণগত কাঠামোর আলোকে মানবসমাজকে বিশ্লেষণের একটি শক্তিশালী তত্ত্ব নির্মাণ করেন| তাঁর তত্ত্বে বিশেষ গুরুত্ব পায় (১) প্রতীকের ব্যাখ্যা; (২) মিথ ও রীতির মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি; (৩) ব্যক্তিপ্রকাশ ও সামাজিক অবচেতন; এবং (৪) টেক্সটকনটেক্সট কোটেক্সট কাঠামো| লোককথা কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, এগুলো মানব মনের অচেতন স্তর, সামাজিক আচরণের শিকড় ও সাংস্কৃতিক ˆবশিষ্ট্যের নান্দনিক দলিল| বিশেষত লোকবিদ্যার প্রতিটি উপাদান সমাজের গঠন, মনস্তত্ত্ব ও সাংস্কৃতিক ছাপের প্রতিচ্ছবি| ১. প্রতীকের মনস্তত্ত্ব (Psychoanalytic Symbolism): তিনি মনে করেন লোকসাহিত্য কিংবা যেকোনো মানবিক সৃষ্টির গভীরে অবচেতনের প্রতীক কাজ করে| মৌখিক ঐতিহ্য: “ঠাকুমার ঝুলি” মূলত মৌখিকভাবে প্রচলিত গল্পের সংকলন| প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে গল্পগুলো মুখে মুখে প্রচারিত হয়েছে এবং এ মৌখিকতা লোকসাহিত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য, যা গ্রন্থটিকে জীবন্ত সাংস্কৃতিক দলিলে পরিণত করেছে| ২. লোকবিশ্বাস ও লোকধর্ম: গল্পগুলোতে রাক্ষস, খোক্কস, পরী, জাদু, অভিশাপ ইত্যাদি উপাদান রয়েছে, যা গ্রামীণ মানুষের বিশ্বাস ও কল্পনার প্রতিফলন এবং এগুলো কেবল কল্পনা নয়, বরং লোকসমাজের মানসিকতা ও বিশ্বাসব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি| ৩. সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিফলন: রাজা-রাণী, দরিদ্র কৃষক, সৎ বনাম অসৎ চরিত্র— এসবের মাধ্যমে সমাজের শ্রেণিবিন্যাস, নৈতিক মূল্যবোধ ও জীবনযাত্রার রূপ ফুটে ওঠে এবং লোকসাহিত্য এখানে সমাজের আয়না হিসেবে কাজ করে| ৪. আর্কিটাইপ ও চরিত্রধারা: গল্পে নির্দিষ্ট ধরনের চরিত্র বারবার দেখা যায়— নায়ক, খলনায়ক, সহায়ক চরিত্র প্রভৃতি এবং এ পুনরাবৃত্ত চরিত্রগুলো লোকসাহিত্যের আর্কিটাইপ হিসেবে বিবেচিত, যা Carl Jung-এর ধারণার সাথে সম্পর্কিত| ৫. নৈতিক শিক্ষা ও বিনোদন: লোকসাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো শিক্ষা ও বিনোদন এবং গল্পের শেষে সৎ-এর জয় ও অসৎ-এর পরাজয়— এই নৈতিকতা সমাজে আদর্শ স্থাপন করে|কাঠামোবাদ (Structuralism) মূলত একটি তাত্ত্বিক ধারা, যা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মানবচিন্তাকে একটি নির্দিষ্ট “কাঠামো” বা গঠনতান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করে| এর ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে Ferdinand de Saussure-এর ভাষাতত্ত্বে, যেখানে তিনি দেখান যে ভাষা কেবল শব্দের সমষ্টি নয়, বরং একটি সম্পর্কভিত্তিক চিহ্ন-ব্যবস্থা| ঠাকুমার ঝুলিতে কাঠামোবাদ (Structuralism) প্রয়োগ করলে দেখা যায়, এই লোককথা সংকলনটি কেবল গল্পের সমষ্টি নয়, বরং একটি সুসংবদ্ধ গঠন বা কাঠামোর ভেতরে নির্মিত অর্থব্যবস্থা| দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার লোকসাহিত্যের উপাদানগুলোকে সংগৃহীত করে এমনভাবে বিন্যস্ত করেছেন, যেখানে প্রতিটি গল্পের ভেতরে একটি নির্দিষ্ট ন্যারেটিভ কাঠামো কাজ করে| কাঠামোবাদী বিশ্লেষণ:১. ন্যারেটিভ কাঠামো (Narrative Structure): বেশিরভাগ গল্পে একটি নির্দিষ্ট ধারা লক্ষ করা যায়— সূচনা (রাজা-রানী বা সাধারণ চরিত্রের পরিচয়), সংঘাত (দৈত্য, রাক্ষস, অভিশাপ, সংকট), উত্তরণ (নায়কের সংগ্রাম), পরিণতি (সাফল্য/বিবাহ/শাস্তি)২.  দ্বৈত-বিপরীত ((Binary Opposition)): কাঠামোবাদে গুরুত্বপূর্ণ একটি ধারণা হলো বিপরীত দ্বন্দ্ব| এখানে দেখা যায়— ভালো বনাম মন্দ, রাজকন্যা বনাম রাক্ষসী, সভ্য বনাম অসভ্য, আলো বনাম অন্ধকার এবং এ বিপরীত সম্পর্কগুলোই গল্পের অর্থ নির্মাণ করে|৩. চিহ্ন ও প্রতীক (Sign and Szmbol): গল্পের বস্তু, চরিত্র ও ঘটনাগুলো কেবল সরল অর্থ বহন করে না; এগুলো চিহ্ন হিসেবে কাজ করে| যেমন— বন=অজানা ও বিপদের স্থান, রাক্ষস=অশুভ শক্তি, জাদু বস্তু=ক্ষমতা বা মুক্তির প্রতীক, এখানে ফার্দিনান্দ ডি সসুরের চিহ্নতত্ত্ব কার্যকর|৪. পুনরাবৃত্তি ও প্যাটার্ন (Repetition and Pattern): একই ধরনের ঘটনা, চরিত্র বা মোটিফ বারবার ফিরে আসে— যেমন তিনবার চেষ্টা, তিন ভাই কিংবা সাত ভাই, একমাত্র কনিষ্ঠ সন্তানের বিজয় এবং এ পুনরাবৃত্তিই কাঠামোগত ঐক্য সৃষ্টি করে|মনস্তাত্ত্বিক তত্ত্ব (Psychoanalysis): সিগমুন্ড ফ্রয়েডের তত্ত্ব অনুযায়ী, রূপকথার চরিত্রগুলো মানুষের অবচেতন মনের প্রতিফলন| সিগমুন্ড ফ্রয়েড এ তত্ত্বের প্রবর্তক, যিনি মানবমনের তিনটি স্তর— ইড (Id), ইগো (Ego) ও সুপারইগো (Superego)— ধারণা দেন| সাহিত্য বিশ্লেষণে প্রয়োগ: ১. চরিত্রের অবচেতন ইচ্ছা ও ভয় বিশ্লেষণ করা| ২. স্বপ্ন, প্রতীক ও আচরণের মাধ্যমে গোপন মানসিক অবস্থা উন্মোচন| ৩. দমিত আকাঙ্ক্ষা ও মানসিক সংঘাত চিহ্নিত করা| ৪. লেখকের ব্যক্তিগত মনস্তত্ত্বের প্রতিফলন খোঁজা| দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের গল্পেও এ প্রবণতা সুস্পষ্ট| রাক্ষস, খোক্কস, পরী— এসব চরিত্র মানুষের অবচেতন মনের প্রতিফলন| ভয়, আকাঙ্ক্ষা, ভালোবাসা— এসব আবেগ গল্পের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়| শিশুদের মানসিক বিকাশে এ গল্পগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে| মনস্তাত্ত্বিক তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষের আচরণ কেবল বাহ্যিক নয়; এর পেছনে কাজ করে অবচেতন মন, দমিত আকাঙ্ক্ষা, স্মৃতি ও মানসিক দ্বন্দ্ব|উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্ব (Postcolonial Theory): উত্তর উপনিবেশবাদ পরিভাষাটি সত্তরের দশকের শেষ থেকে ব্যবহৃত| জ্ঞান ও সাংস্কৃতিক চর্চা থেকে ঔপনিবেশিকতার প্রভাব কাটিয়ে আত্মপরিচয় অর্জন করা এ দর্শনের মূল কথা| প্রাক-উপনিবেশি অতীতের গৌরবোজ্জ্বল সামাজিক-সাংস্কৃতিক জ্ঞানতাত্ত্বিক অর্জনগুলো শনাক্ত করে সেগুলোর যথাযথ পুনর্মূল্যায়িত করা এবং সে অতীত ইতিহাস, ঐতিহ্য-সংস্কৃতির ভিত্তিতেই নির্ধারণ করা যেতে পারে জাতির বিকাশের গতিপথ| উপনিবেশ শাসকপুষ্ট শিক্ষাব্যবস্থা ও জ্ঞানচর্চা থেকে বের হয়ে আসতে হবে| এডওয়ার্ড ডব্লিউ সাঈদের ‘অরিয়েন্টালিজম’ এবং ইব্রাহিম ফ্রাৎজ ফানোর ‘ব্লাক স্কিন হোয়াইট মাস্ক’ ও ‘রেচেড অব দি আর্থ’ বই ত্রয়ে উপনিবেশিত মানুষের ওপর শাসনের নেতিবাচক প্রভাব দুর্দান্ত মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ| কীভাবে পশ্চিমের রাজনীতিবীদ, লেখক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী শত শত বছর ধরে বিভিন্ন গ্রন্থাদি লিখে প্রাচ্যকে সকল দিক থেকে হীন ও পশ্চিমকে উন্নত বলে প্রচার করেছে| এ হীন ধারণা প্রাচ্যের মানুষের মনে গেঁথে দেয়া উপনিবেশী শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার প্রধান অনুষঙ্গ| উপনিবেশী শাসনের কারণে উপনিবেশকদের সচেতন চেষ্টায় স্থানীয়দের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ক্ষয় হতে হতে একসময়ে বিলীন হয়ে যায় অথবা মরে যায়| ‘উপনিবেশিতের সাংস্কৃতিক শিকড়ের মৃত্যু ও সমাধি তার মনে জন্ম দেয় একরকম হীনম্মন্যতা বোধের| উপনিবেশবাদের চোরাবালিতে নিমজ্জিত সাধারণ মানুষের একটি বড়ো অংশ| কারণ, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে উপনিবেশের অবসান হলেও সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক মুক্তি মেলেনি| ভাব ও বোধের কাছে উপনিবেশায়ন সদাক্রিয়াশীল| গোটা জাতির মধ্যে পশ্চিমারা হীনম্মন্যবোধের যে বীজ পুঁতে দিয়েছে, তা সমূলে উৎপাটিত করার লক্ষ্যে প্রাক-ঔপনিবেশিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ফিরে যাওয়া| সাম্রাজ্যবাদ জাতির অতীত দমন করে যে যে অংশ চাপা দিয়েছে, সে অংশকে চিহ্নিত করে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করা উত্তর উপনিবেশবাদের মূল উদ্দেশ্য| উপনিবেশি প্রভাব ও উত্তর-উপনিবেশি পরিস্থিতির মিশ্রিত কয়েকটি বৈশিষ্ট্য— প্রথমত, স্থানীয় সংস্কৃতির সম্পূর্ণ বা আংশিক বিলুপ্তি| স্থানীয় সংস্কৃতির অবমূল্যায়ন কিংবা এগুলোকে নিকৃষ্টরূপে দেখার প্রবণতা| দ্বিতীয়ত, আত্মপরিচয় সম্পর্কে উপনিবেশিতের হীনম্মন্যতা| তৃতীয়ত, স্থানীয়দের সাংস্কৃতিক, সামাজিক পরিচয় বা বৈশিষ্ট্য নির্দেশক সাধারণীকরণ ও ছাঁচ তৈরি| এর সফল উদাহরণ হতে পারে— প্রাচ্যের মানুষ অলস, নিয়তিবাদী, এশীয় সমাজব্যবস্থায় স্বৈরতান্ত্রিক| চতুর্থত, উপনিবেশি প্রশাসকদের অনুকরণে উপনিবেশিতদের মধ্যে বুর্জোয়া শ্রেণির উত্থান, উপনিবেশগুলো স্বাধীন হওয়ার পরেও তাদের ধ্যান-ধারণা ও ছায়া স্থানীয়দের আচ্ছন্ন করে রেখেছে| এ অবস্থা থেকে বের হয়ে এসে নিজেদের ইতিহাস, ঐতিহ্য-সংস্কৃতিকে ধারণ করে কিংবা পুনরাবৃত্তি করে উপনিবেশি প্রভাবমুক্ত আত্মপরিচয় তৈরি করা| ঔপনিবেশিক প্রভাবের বিপরীতে নিজস্ব সংস্কৃতি সংরক্ষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক| দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের কাজ এ তত্ত্বের আলোকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ| তাঁক কাজ মূলত লোকঐতিহ্যের নির্মাণ লোককথার সংগ্রহ ও পুনরুদ্ধার| তিনি মৌখিক ঐতিহ্যকে লিখিত আকারে সংরক্ষণ করেছেন, যা সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সহায়ক| তাঁর গল্পগুলোতে গ্রামীণ সমাজ, পারিবারিক সম্পর্ক, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং নৈতিক মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটে| তাঁর ভাষা সহজ ও ছন্দোময়| আঞ্চলিক শব্দের ব্যবহার তাঁর গল্পকে জীবন্ত করে তোলে এবং এ ভাষাগত বৈশিষ্ট্য গল্পগুলোকে মৌখিক ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত রাখে| এছাড়াও ঔপনিবেশিক শাসনের সময় তিনি বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি সংরক্ষণ করেছেন| তাঁর কাজ একটি সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে| এটি বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়কে শক্তিশালী করেছে|দক্ষিণারঞ্জন মিত্রের সংকলিত ও সম্পাদিত সাহিত্যকে কেবল শিশুতোষ সাহিত্য হিসেবে দেখা অর্থ হলো তাঁর কর্মযজ্ঞকে সীমিত করে দেখা; বরং তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখা যায়, তাঁর সাহিত্য বহুমাত্রিক— এতে রয়েছে সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য| তাঁর কাজ নিছক সংগ্রহ নয়; বরং এক গভীর নৃতাত্ত্বিক ও ভাষাতাত্ত্বিক চেতনার প্রকাশ| কাঠামোবাদী দৃষ্টিতে তাঁর সংকলিত রূপকথাগুলো এক সুসংগঠিত বয়ান-প্রকরণ অনুসরণ করে, যেখানে চরিত্র, ঘটনা ও প্রতীকের বিন্যাসে গড়ে ওঠে অর্থের এক জটিল জাল| আবার লোকসাহিত্য তত্ত্বের নিরিখে এগুলো মৌখিক ঐতিহ্যের জীবন্ত দলিল— সমষ্টিগত চেতনার ধারক ও বাহক| মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে তাঁর গল্পগুলো মানবমনের গভীর স্তর উন্মোচন করে| রাক্ষস-খোক্কস, পরী-রাজকন্যা— এসব কেবল বাহ্যিক চরিত্র নয়; এগুলো মানুষের অবচেতন ভয়, আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্নের প্রতীকী রূপ| ফলে তাঁর রূপকথা একাধারে শিশুমনের বিনোদন, অন্যদিকে মানবমনের গূঢ় অন্বেষণ| তত্ত্বের আলোকে দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারকে স্মরণ করার অর্থ কেবল একজন সংগ্রাহককে সম্মান জানানো নয়; বরং একটি জাতির লোকঐতিহ্যকে নতুন করে আবিষ্কার করা| তাঁর কাজ মনে করিয়ে দেয়— সাহিত্যের শিকড় প্রোথিত থাকে মানুষের সমষ্টিগত জীবনে, সে শিকড়ের অনুসন্ধানেই লুকিয়ে থাকে জাতির প্রকৃত পরিচয়| জন্মের সার্ধশতবর্ষে দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের সাহিত্য সংগ্রহ স্মরণ কেবল অতীতের স্মৃতি স্মরণ নয়; বরং বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্যও তা প্রাসঙ্গিক ও অনিবার্য| তাত্ত্বিক আলোচনার মাধ্যমে উপলব্ধি করা যায়, তাঁর সংকলিত সাহিত্য একটি সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক দলিল, যা বাংলা সাহিত্যকে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে|

জন্মসার্ধশতবর্ষে দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার