অন্ধকাহিনী
যারা মিথ্যে বলেছিলো, তারা অপেক্ষা করছে, আমরা তাদের
প্রতারণার জালে পুনরায় পা দিই কি না!
আমাদের গরু ভেবে যে-সব গল্প তারা শুনিয়েছিলো, তাদের শ্যামজ্বর
আমাকে কাহিল করেছে, চিকনগুনিয়াও আক্রান্ত হয়েছিলাম,
দেবতা ভেবে পুজাও করেছি, প্রসাদও দিয়েছি|
দেবতাও মিথ্যা বলে: যারা ধর্মাশ্রয়ে আছো তারা আমাকে বুঝিয়ে বলো:
দেবতা ছলও করে, প্রতারণাও করে|
ছলচাতুরি করে গলায় ফাঁস পরিয়ে দিতে তারা অতিশয় কৌশলী|
বাঘিনীর বাঁটে দুধ নেই, অক্ষম ক্লান্তিতে দূর সুদূরে এখন সে
সন্তান বাৎসল্যে কাতর|
কেউ কেউ বলেছিলো দিল্লিকা লাড্ডু যো খায়া ও ভি পস্তায়া,
যো নেহি খায়া— ও ভি পস্তায়া দিল্লিকা লাড্ডু আমার ভাগ্যে জোটেনি|
যাকে বিশ্বাস করেছি সেও এক মহা বাটপার, সে পরের জিহ্বায়
স্বাদ নেয়, হায়! অন্ধের কী-বা রাত্রি, কী-বা দিন!
আমি এক অন্ধ— অন্ধকারে পথ খুঁজে খুঁজে হয়রান, হাতের যষ্টি
কোথায় যে হারিয়ে ফেলেছি!
কোনো এক উজ্জীবনী ফুলের প্রতি
কোথাও না কোথাও কারো মহা উজ্জীবন বাঁশি হয়ে, গোল হয়ে,
পলাতক হাওয়ার মতোন গগন শিরিষের ডালে ঝুলমান|
দু’একটি পাখির উড়াল আমার আঙুলজলে স্থির হলে,
সহস্র মেঘের ডাকে নিভে যায় বিভাবরী চাঁদ, শ্রবণে বধির হয়েও
খণ্ডিত হয় না অপার্থিব ওড়া তার|
কূলে, পল্লবিত হতে থাকে হরিৎ প্রভাতী নীল আর এক বিরল
ঋতুর পুষ্পবিন্দু, তারও দু’পাশে দু’টি রক্তিম নদী,
তার দুগ্ধ মোহিনী জল আর এক অচেনা গাঙচিল হাস্যবিচ্ছুরিত
বেদনার পাশে— জ্বলজ্বলায়মান,
হিরের মতো তার জাতকীয় চোখ, গাঙচিল বলে: আর যাই বলো,
আমার এই আশ্রয়টি ছেড়ে দিতে পারিনে|
এক অসম্ভব উজ্জয়িনী আমাকে জড়িয়ে রয়েছে, আরও এক
তাৎপর্যমণ্ডিত সুন্দর উড়ে যায় বাষ্পাকারে, যা প্রকাশ্য সুন্দর,
যা ক্ষয় ও বিনাশের পরেও অনঙ্গ সৃজিত|
তোমার হাতের কাটারি আমাকে দুইভাগে কাটে, দ্বিধার ছুরিকা
কাটে শতভাগে, বিভাজিত করে|
একজোড়া জ্বলজ্বলে যৌনকৈতর বৃত্তায়িত হয়ে এক অসাধারণ সুন্দর,
যাকে বিতাড়ন কোনোভাবেই সম্ভব নয়, আর কোনো
নিশিদীপ্ত ফুল যেখানে কখনো ফোটে নাই সেখান থেকেই গন্ধ আসে
তামা-গলা ফুল্ল সম্ভারের|
কালাজ্বর
তোমার জ্বর হলে আমারও জ্বর হয়, হাড় কাঁপানো জ্বর,
মনে হয় আমি যেন জ্বরের প্রজা, তুমি জ্বরের রাণী মৌমাছি.
গতকালও এইরূপ হয়েছিলো, তুমি বললে: কোভিড,
আমি বল্লাম দূর! কী যে বলো না! বিশ^াস হলো না তোমার,
এবার ‘অমিক্রণ’ নিয়ে যাবে আমাকে|
জ্বর! হতেই পারে, কিন্তু এই জ্বর কোনো ব্যাকরণ মানে না,
তবুও তোমার হবে না, যেহেতু তুমি ভালোবাসায় অন্ধ,
এরূপ অন্ধের জ্বর হয় না কখনো| কাশি হয় খুক খুক,
কাশিটা খুব জ্বালাতন করে|
আয়নায় দ্যাখো, তোমার চুমুতে প্রথম যেদিন জ্বর হয়েছিলো
সেই জ্বর আমার হাড়ের ভেতর আখড়া বেঁধেছে|
সেই থেকে আমি তোমার প্রবর জ্বরের ‘অমিক্রণ|’
জ্বরের নিঃস্বতা আমাকে গরিব করেছে, জ্বরপোষা গরিব,
চাল নেই, চুলা নেই, এমনতর গরিব|
তুমি আমাকে জুঁইফুল চিনিয়েছিলে, মাধবীলতাও চিনিয়েছিলে,
আমি ব্যথিত ছিলাম, তুমি সেদিন মর্মস্পর্শী বৃষ্টি হয়ে
আমাকে ভিজিয়ে গিয়েছিলে,
ইচ্ছেমৃত্যু বুকের ভেতরে ডেকে ওঠে মাঝে মাঝে,
মোরগের মতো কোলাহল করে, দুপুরে গলা ফেটে ডাকে|
সমর্পণের আগে যেরূপ দুর্দান্ত ছিলে, আজও সেইরূপ তুমি|
ভালোবাসা দিও, তাকে জ্বর দিও না প্রভু; প্রার্থনা করি:
জ্বর দিও না, জ্বর হলে সে বড় কাহিল হয়ে পড়ে|
খুব চাপা স্বভাবের
গ্রীষ্মকাল, শীত প্রতীক্ষায় কান পেতে রয়েছি, পাখি হলে উড়ে
যেতে পারতাম|
তীব্র রৌদ্রে জ্যোৎস্নাবিন্দু হয়ে পাথরে পাথর ঠুকে কেউ আগুন জ্বালায়,
এই দ্যাখো, এইসব গল্প অল্প অল্প মনে পড়ে, আমার|
খুব চাপা স্বভাবের, নিজের কথা কখনই বলো না,
একহারা নারকেল গাছ, তারা দুই বোন কী সব চুপিচুপি বলে,
কিছুই জানতে দেয় না, আঁটসাঁট আঁচল টেনে এঘর ওঘর করে,
রহস্যটা কী! তারা কতো কী লুকিয়ে রাখে মানুষের শ্যেন
চক্ষু বাঁচিয়ে, ভেবে কূল পাইনে|
এই বয়সের মেয়েদের স্তন বাঁচানোর কতো জেল্লাতি, কেউ কেউ
এটাকে শিকার ধরার জাল হিসেবে ভাবে,
কখনো খোলে, কখনো ঢেকে রাখে, আয়নায় দাঁড়িয়ে আবার
অনুশীলনও করে|
তার শাড়িতেই আগুন দিয়েছিলো উম্মে সালমা,
জানতেও ইচ্ছে করে না, কেনো সে হিংসায় না-জড়িয়ে এরূপ
প্রতিহিংসা বেছে নিয়েছিলো?
অলক্ষ্যে নিঃশব্দ কৌড়ি
কখনই একা হতে দিলে না, জামপাকা মৌসুম, পাতায় পাতায়
মধুঝিরি হাওয়া, আততায়ী দুপুর, পাকাজামে বেরীফলের গন্ধ|
একটি বিকেল যেন বেলীফুলে গাঁথা হয়ে গেছে,
গলাকাটা আয়োজনে তারা আমার রোপিত অরণ্য কেটে নিধন করেছে,
অধরা জ্যোৎস্না খুন না-করে নিরুদ্দিষ্ট হয়ে আছে, কোথাও|
কিন্তু আমি যে তাকে বুকের ভিতরেই লুকায়ে রেখেছি|
রাত্রির সোপানে অবকাশ যাপন, যেন কোনো নিদ্রিত বাগানে
অন্ধকারে ফুল ফুটছে, আমার গা ঘেঁণে রেল যায় শুকনো ধুলো উড়িয়ে,
কোনো বিকার নেই, বহু বছর ধরে এভাবেই বসে থাকে
কায়িক শ্রমিকের দল, রেলের পাশে|
রেল প্রতিদিন যায়, হুইসেল বাজিয়ে যায়, কর্ম না পাওয়া মানুষেরা
নিজেদের কথা বলে নিজেরাই শান্তি পায়| তাছাড়া কার কথা কে
আগে বলেছিলো? কে পরে শুনেছিলো ইত্যকার এইসব, এইসব|
তোমাকে ছেড়ে যাওয়ার ইচ্ছে ছিলো না,
পরাজিত হবে একজন| দু’জন নয়| আমি পরাজিতের একজন,
তুমি পারিজাতের একমাত্র একজন,
তোমার গন্তব্যের দিকেই হোক আমার সৌভাগ্য যাত্রা|
অসীম শূন্যতার ভেতর সে তুমি একা
তোমার জন্য শত সন্ধ্যা, শত নক্ষত্র, শত অন্ত অভিধা সাজিয়ে
রাখার পরও অদৃশ্যেই রয়ে গেলে,
খুব ইচ্ছে করে, এবারের পুজোয় হয়তো দেখা হতে পারে
এরূপ প্রত্যাশায় দিন পেরিয়ে যায়|
জাগর থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে গিয়েছিলে,
তোমার ঘুম কেড়ে নেয়ার পর, তুমি নিমীলিত না-হয়ে উজ্জ্বল হয়েছিলে,
তুমি আমাদের উঠোনবাগানে একটি আনন্দচাঁদ,
মেঘশিখা পৃথিবীর যাবতীয় কামনা আমাকে আর্দ্র করেছে,
তোমার ভিতরে যে প্রবল ভালোবাসা যার কোনো জটিলতা নেই
যা এক সরল ও একরৈখিক রেখায় মিলিত|
ফুল ফুটেছে, পাপড়ি ঝরেছে, আমি তোমার পবিত্রতাকে সম্মান করি,
তুমি তোমার মৌন ভালোবাসায় আমাকে রুদ্ধ করেছো,
দেখা হলে বাসনা পেরিয়ে যাওয়া সবটুকু আবার তোমাকেই দেবো|
প্রজাপতি তুমি একটি অধরা গল্প
সঞ্চিত শোক, লুক্কায়িত মুদ্রার আকুলতা নৈঃশব্দ্যের আগুনে পোড়ে,
তোমার যাবতীয় হারানোর ভয় আমাকে বিদ্রূপ করেছে,
আর ওই একই ভুল বর্ণনা শ্রান্ত-ক্লান্ত করেছে আমার মরদেহ|
আমি নির্বাসন চাইনি, নির্মোহ থেকেছি|
সাহসী ঈগল আর এক খয়েরী ঘোড়ার মৌনমগ্ন জল্লাদ আমাকে
শেষ রক্ষায় অক্ষম ছিলো|
শব্দখেলুড়ের দল তাকে ক্ষমা করেনি, এ-কারণে তোমার—
এলোমেলো ভাঙন আমাকে ঘর ছাড়া করে|
শিকারী হিংস্র হয় না, তার অমিত কৌশল হিংস্রতাকেও হার
মানিয়ে থাকে,
তুমি না-বলেছিলে দু’টি অবর্ণ আঁখি তোমাকে বিপর্যস্ত করেছে
তাই তুমি প্রজাপতি, তাই তুমি একটি অধরা গল্প, প্রাণের|
কারাগারে কোলাহলে
নদীর দীর্ঘশ্বাসেও রয়েছে মৃত্যুর গন্ধ, তুমি আমাকে দূর সমুদ্রে
নিক্ষেপ করেছো, সমুদ্র একটি দীর্ঘ কারাগার, সেখানে—
প্রতিস্রোতের আবহে টিকে থাকা দায়,
বিতর্কিত মেঘ বহু দূরত্ব পাড়ি দিয়ে দক্ষিণে গিয়েছে|
তোমার বিরহ কথা জলের সমাহারে লেখা হয়েছিলো,
লেখা হয়েছিলো সৌন্দর্যবিহীন মৃত্যু আলেখ্য, আমি অপেক্ষায়
থাকি কবে তোমার অগ্নি ফুলকিময় লৌহ শলাকা আমাকে
বিদীর্ণ ও বিধ্বস্ত করে!
সর্বত্র সমুদ্র কম্পন, স্থিরতা নেই কোথাও, পুরো পৃথিবী শত্রু করে
তুমি সিংহের মুখে হাত ঢুকিয়ে দিয়েছো,
আমি দিয়েছি সমগ্র মণ্ডু, আমাকে সহ্য করার শক্তি দাও প্রভু|
আমার দূরে যাওয়া সহ্য হয় না তোমার
তোমাকে প্রশংসা করার যোগ্যতা নেই,
যতক্ষণ না নিজেকে ক্ষমা করি, যতক্ষণ না নিজেকে ভালোবাসি|
আমরা সাত সাত বার হৃদয় ভেঙেছি, একবারও জোড়া দেয়ার
অভিপ্রায় করিনি, ছয় ছয়বার হারিয়েছি ঘোড়া,
খুঁজে পেতে অবহেলা করিনি|
পাখিরাও খাঁচা ভাঙে, তাদের উচ্ছ্বাস এবং বিষণ্নতা লৌহ প্রাচীরে
গচ্ছিত রেখে|
শূন্যতা চাইনি, সম্পর্কের বন্ধন অক্ষুণ্ন রেখে, ভুলে যেতে চাই—
কেউ আমার কখনো আমার ছিলো|
প্রত্যুত্তরের ভঙ্গিতে বলি, আমি তোমার কাঙাল বাউল, তোমার
সোনার বড়শিতে গাঁথা নিগূঢ় সত্য এক নন্দন মীন|
কুসুম ক্রমশ অর্ধেক পিপাসা
ক্রমশ মর্মর, ক্রমশ উড্ডীন চাঁদ পরিচ্ছন্ন পথে পশ্চিমে যায়
ঘোর নিদ্রার আশায়|
সময় সব কিছু বলে, কে তুমি মেঘনার জল, কে আমি পদ্মার জল?
ইরাবতীর ধারার মতোই আমাদের প্রেমজল অর্ধেক
পিপাসা মিটিয়ে থাকে,
বাকি অর্ধেক জটিল-কুটিলতা রেখে ফল্গুধারার দুর্বোধ্য ক্ষুধা|
রোজার চাঁদও জানে মহত্ত্ব, রাত্রির|
তুমিও জানো, শুধু প্রকাশ করো না, এই তো!
রাত্রির উজ্জ্বলতা তোমার মতো সুন্দর নয়, আমি অসত্য বলিনি—
উড়ে যাওয়া চাঁদের ধুলো গায়ে মেখে সুস্নাত হয়েছি|
দিগন্তে নেমে আসা জ্যোৎস্নার সাথে শত সহস্র পতঙ্গ ওড়ে, মরে|
অন্ধকারে উড়ে উড়ে-পুড়ে মরলেও বুঝতে পারি না তারা
মৃত্যু আকাঙ্ক্ষী ছিলো|
অমারাত্রি ধলা কুকুরের সাথে গলা মিলিয়ে, কাঁদে|
চাঁদকে তখন খুব বিহ্বল মনে হয়, তখন রাত্রির আরশিতে অস্থির
হয়ে খুঁজতে থাকি, কই গেলো চাঁদ, কই গেলো ধূলিকণা!
কই গেলো কুসুম আমার?
** কবি আবদুর রাজ্জাক, সত্তরের দশকের বিশিষ্ট কবি ও গদ্যকার

মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ এপ্রিল ২০২৬
অন্ধকাহিনী
যারা মিথ্যে বলেছিলো, তারা অপেক্ষা করছে, আমরা তাদের
প্রতারণার জালে পুনরায় পা দিই কি না!
আমাদের গরু ভেবে যে-সব গল্প তারা শুনিয়েছিলো, তাদের শ্যামজ্বর
আমাকে কাহিল করেছে, চিকনগুনিয়াও আক্রান্ত হয়েছিলাম,
দেবতা ভেবে পুজাও করেছি, প্রসাদও দিয়েছি|
দেবতাও মিথ্যা বলে: যারা ধর্মাশ্রয়ে আছো তারা আমাকে বুঝিয়ে বলো:
দেবতা ছলও করে, প্রতারণাও করে|
ছলচাতুরি করে গলায় ফাঁস পরিয়ে দিতে তারা অতিশয় কৌশলী|
বাঘিনীর বাঁটে দুধ নেই, অক্ষম ক্লান্তিতে দূর সুদূরে এখন সে
সন্তান বাৎসল্যে কাতর|
কেউ কেউ বলেছিলো দিল্লিকা লাড্ডু যো খায়া ও ভি পস্তায়া,
যো নেহি খায়া— ও ভি পস্তায়া দিল্লিকা লাড্ডু আমার ভাগ্যে জোটেনি|
যাকে বিশ্বাস করেছি সেও এক মহা বাটপার, সে পরের জিহ্বায়
স্বাদ নেয়, হায়! অন্ধের কী-বা রাত্রি, কী-বা দিন!
আমি এক অন্ধ— অন্ধকারে পথ খুঁজে খুঁজে হয়রান, হাতের যষ্টি
কোথায় যে হারিয়ে ফেলেছি!
কোনো এক উজ্জীবনী ফুলের প্রতি
কোথাও না কোথাও কারো মহা উজ্জীবন বাঁশি হয়ে, গোল হয়ে,
পলাতক হাওয়ার মতোন গগন শিরিষের ডালে ঝুলমান|
দু’একটি পাখির উড়াল আমার আঙুলজলে স্থির হলে,
সহস্র মেঘের ডাকে নিভে যায় বিভাবরী চাঁদ, শ্রবণে বধির হয়েও
খণ্ডিত হয় না অপার্থিব ওড়া তার|
কূলে, পল্লবিত হতে থাকে হরিৎ প্রভাতী নীল আর এক বিরল
ঋতুর পুষ্পবিন্দু, তারও দু’পাশে দু’টি রক্তিম নদী,
তার দুগ্ধ মোহিনী জল আর এক অচেনা গাঙচিল হাস্যবিচ্ছুরিত
বেদনার পাশে— জ্বলজ্বলায়মান,
হিরের মতো তার জাতকীয় চোখ, গাঙচিল বলে: আর যাই বলো,
আমার এই আশ্রয়টি ছেড়ে দিতে পারিনে|
এক অসম্ভব উজ্জয়িনী আমাকে জড়িয়ে রয়েছে, আরও এক
তাৎপর্যমণ্ডিত সুন্দর উড়ে যায় বাষ্পাকারে, যা প্রকাশ্য সুন্দর,
যা ক্ষয় ও বিনাশের পরেও অনঙ্গ সৃজিত|
তোমার হাতের কাটারি আমাকে দুইভাগে কাটে, দ্বিধার ছুরিকা
কাটে শতভাগে, বিভাজিত করে|
একজোড়া জ্বলজ্বলে যৌনকৈতর বৃত্তায়িত হয়ে এক অসাধারণ সুন্দর,
যাকে বিতাড়ন কোনোভাবেই সম্ভব নয়, আর কোনো
নিশিদীপ্ত ফুল যেখানে কখনো ফোটে নাই সেখান থেকেই গন্ধ আসে
তামা-গলা ফুল্ল সম্ভারের|
কালাজ্বর
তোমার জ্বর হলে আমারও জ্বর হয়, হাড় কাঁপানো জ্বর,
মনে হয় আমি যেন জ্বরের প্রজা, তুমি জ্বরের রাণী মৌমাছি.
গতকালও এইরূপ হয়েছিলো, তুমি বললে: কোভিড,
আমি বল্লাম দূর! কী যে বলো না! বিশ^াস হলো না তোমার,
এবার ‘অমিক্রণ’ নিয়ে যাবে আমাকে|
জ্বর! হতেই পারে, কিন্তু এই জ্বর কোনো ব্যাকরণ মানে না,
তবুও তোমার হবে না, যেহেতু তুমি ভালোবাসায় অন্ধ,
এরূপ অন্ধের জ্বর হয় না কখনো| কাশি হয় খুক খুক,
কাশিটা খুব জ্বালাতন করে|
আয়নায় দ্যাখো, তোমার চুমুতে প্রথম যেদিন জ্বর হয়েছিলো
সেই জ্বর আমার হাড়ের ভেতর আখড়া বেঁধেছে|
সেই থেকে আমি তোমার প্রবর জ্বরের ‘অমিক্রণ|’
জ্বরের নিঃস্বতা আমাকে গরিব করেছে, জ্বরপোষা গরিব,
চাল নেই, চুলা নেই, এমনতর গরিব|
তুমি আমাকে জুঁইফুল চিনিয়েছিলে, মাধবীলতাও চিনিয়েছিলে,
আমি ব্যথিত ছিলাম, তুমি সেদিন মর্মস্পর্শী বৃষ্টি হয়ে
আমাকে ভিজিয়ে গিয়েছিলে,
ইচ্ছেমৃত্যু বুকের ভেতরে ডেকে ওঠে মাঝে মাঝে,
মোরগের মতো কোলাহল করে, দুপুরে গলা ফেটে ডাকে|
সমর্পণের আগে যেরূপ দুর্দান্ত ছিলে, আজও সেইরূপ তুমি|
ভালোবাসা দিও, তাকে জ্বর দিও না প্রভু; প্রার্থনা করি:
জ্বর দিও না, জ্বর হলে সে বড় কাহিল হয়ে পড়ে|
খুব চাপা স্বভাবের
গ্রীষ্মকাল, শীত প্রতীক্ষায় কান পেতে রয়েছি, পাখি হলে উড়ে
যেতে পারতাম|
তীব্র রৌদ্রে জ্যোৎস্নাবিন্দু হয়ে পাথরে পাথর ঠুকে কেউ আগুন জ্বালায়,
এই দ্যাখো, এইসব গল্প অল্প অল্প মনে পড়ে, আমার|
খুব চাপা স্বভাবের, নিজের কথা কখনই বলো না,
একহারা নারকেল গাছ, তারা দুই বোন কী সব চুপিচুপি বলে,
কিছুই জানতে দেয় না, আঁটসাঁট আঁচল টেনে এঘর ওঘর করে,
রহস্যটা কী! তারা কতো কী লুকিয়ে রাখে মানুষের শ্যেন
চক্ষু বাঁচিয়ে, ভেবে কূল পাইনে|
এই বয়সের মেয়েদের স্তন বাঁচানোর কতো জেল্লাতি, কেউ কেউ
এটাকে শিকার ধরার জাল হিসেবে ভাবে,
কখনো খোলে, কখনো ঢেকে রাখে, আয়নায় দাঁড়িয়ে আবার
অনুশীলনও করে|
তার শাড়িতেই আগুন দিয়েছিলো উম্মে সালমা,
জানতেও ইচ্ছে করে না, কেনো সে হিংসায় না-জড়িয়ে এরূপ
প্রতিহিংসা বেছে নিয়েছিলো?
অলক্ষ্যে নিঃশব্দ কৌড়ি
কখনই একা হতে দিলে না, জামপাকা মৌসুম, পাতায় পাতায়
মধুঝিরি হাওয়া, আততায়ী দুপুর, পাকাজামে বেরীফলের গন্ধ|
একটি বিকেল যেন বেলীফুলে গাঁথা হয়ে গেছে,
গলাকাটা আয়োজনে তারা আমার রোপিত অরণ্য কেটে নিধন করেছে,
অধরা জ্যোৎস্না খুন না-করে নিরুদ্দিষ্ট হয়ে আছে, কোথাও|
কিন্তু আমি যে তাকে বুকের ভিতরেই লুকায়ে রেখেছি|
রাত্রির সোপানে অবকাশ যাপন, যেন কোনো নিদ্রিত বাগানে
অন্ধকারে ফুল ফুটছে, আমার গা ঘেঁণে রেল যায় শুকনো ধুলো উড়িয়ে,
কোনো বিকার নেই, বহু বছর ধরে এভাবেই বসে থাকে
কায়িক শ্রমিকের দল, রেলের পাশে|
রেল প্রতিদিন যায়, হুইসেল বাজিয়ে যায়, কর্ম না পাওয়া মানুষেরা
নিজেদের কথা বলে নিজেরাই শান্তি পায়| তাছাড়া কার কথা কে
আগে বলেছিলো? কে পরে শুনেছিলো ইত্যকার এইসব, এইসব|
তোমাকে ছেড়ে যাওয়ার ইচ্ছে ছিলো না,
পরাজিত হবে একজন| দু’জন নয়| আমি পরাজিতের একজন,
তুমি পারিজাতের একমাত্র একজন,
তোমার গন্তব্যের দিকেই হোক আমার সৌভাগ্য যাত্রা|
অসীম শূন্যতার ভেতর সে তুমি একা
তোমার জন্য শত সন্ধ্যা, শত নক্ষত্র, শত অন্ত অভিধা সাজিয়ে
রাখার পরও অদৃশ্যেই রয়ে গেলে,
খুব ইচ্ছে করে, এবারের পুজোয় হয়তো দেখা হতে পারে
এরূপ প্রত্যাশায় দিন পেরিয়ে যায়|
জাগর থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে গিয়েছিলে,
তোমার ঘুম কেড়ে নেয়ার পর, তুমি নিমীলিত না-হয়ে উজ্জ্বল হয়েছিলে,
তুমি আমাদের উঠোনবাগানে একটি আনন্দচাঁদ,
মেঘশিখা পৃথিবীর যাবতীয় কামনা আমাকে আর্দ্র করেছে,
তোমার ভিতরে যে প্রবল ভালোবাসা যার কোনো জটিলতা নেই
যা এক সরল ও একরৈখিক রেখায় মিলিত|
ফুল ফুটেছে, পাপড়ি ঝরেছে, আমি তোমার পবিত্রতাকে সম্মান করি,
তুমি তোমার মৌন ভালোবাসায় আমাকে রুদ্ধ করেছো,
দেখা হলে বাসনা পেরিয়ে যাওয়া সবটুকু আবার তোমাকেই দেবো|
প্রজাপতি তুমি একটি অধরা গল্প
সঞ্চিত শোক, লুক্কায়িত মুদ্রার আকুলতা নৈঃশব্দ্যের আগুনে পোড়ে,
তোমার যাবতীয় হারানোর ভয় আমাকে বিদ্রূপ করেছে,
আর ওই একই ভুল বর্ণনা শ্রান্ত-ক্লান্ত করেছে আমার মরদেহ|
আমি নির্বাসন চাইনি, নির্মোহ থেকেছি|
সাহসী ঈগল আর এক খয়েরী ঘোড়ার মৌনমগ্ন জল্লাদ আমাকে
শেষ রক্ষায় অক্ষম ছিলো|
শব্দখেলুড়ের দল তাকে ক্ষমা করেনি, এ-কারণে তোমার—
এলোমেলো ভাঙন আমাকে ঘর ছাড়া করে|
শিকারী হিংস্র হয় না, তার অমিত কৌশল হিংস্রতাকেও হার
মানিয়ে থাকে,
তুমি না-বলেছিলে দু’টি অবর্ণ আঁখি তোমাকে বিপর্যস্ত করেছে
তাই তুমি প্রজাপতি, তাই তুমি একটি অধরা গল্প, প্রাণের|
কারাগারে কোলাহলে
নদীর দীর্ঘশ্বাসেও রয়েছে মৃত্যুর গন্ধ, তুমি আমাকে দূর সমুদ্রে
নিক্ষেপ করেছো, সমুদ্র একটি দীর্ঘ কারাগার, সেখানে—
প্রতিস্রোতের আবহে টিকে থাকা দায়,
বিতর্কিত মেঘ বহু দূরত্ব পাড়ি দিয়ে দক্ষিণে গিয়েছে|
তোমার বিরহ কথা জলের সমাহারে লেখা হয়েছিলো,
লেখা হয়েছিলো সৌন্দর্যবিহীন মৃত্যু আলেখ্য, আমি অপেক্ষায়
থাকি কবে তোমার অগ্নি ফুলকিময় লৌহ শলাকা আমাকে
বিদীর্ণ ও বিধ্বস্ত করে!
সর্বত্র সমুদ্র কম্পন, স্থিরতা নেই কোথাও, পুরো পৃথিবী শত্রু করে
তুমি সিংহের মুখে হাত ঢুকিয়ে দিয়েছো,
আমি দিয়েছি সমগ্র মণ্ডু, আমাকে সহ্য করার শক্তি দাও প্রভু|
আমার দূরে যাওয়া সহ্য হয় না তোমার
তোমাকে প্রশংসা করার যোগ্যতা নেই,
যতক্ষণ না নিজেকে ক্ষমা করি, যতক্ষণ না নিজেকে ভালোবাসি|
আমরা সাত সাত বার হৃদয় ভেঙেছি, একবারও জোড়া দেয়ার
অভিপ্রায় করিনি, ছয় ছয়বার হারিয়েছি ঘোড়া,
খুঁজে পেতে অবহেলা করিনি|
পাখিরাও খাঁচা ভাঙে, তাদের উচ্ছ্বাস এবং বিষণ্নতা লৌহ প্রাচীরে
গচ্ছিত রেখে|
শূন্যতা চাইনি, সম্পর্কের বন্ধন অক্ষুণ্ন রেখে, ভুলে যেতে চাই—
কেউ আমার কখনো আমার ছিলো|
প্রত্যুত্তরের ভঙ্গিতে বলি, আমি তোমার কাঙাল বাউল, তোমার
সোনার বড়শিতে গাঁথা নিগূঢ় সত্য এক নন্দন মীন|
কুসুম ক্রমশ অর্ধেক পিপাসা
ক্রমশ মর্মর, ক্রমশ উড্ডীন চাঁদ পরিচ্ছন্ন পথে পশ্চিমে যায়
ঘোর নিদ্রার আশায়|
সময় সব কিছু বলে, কে তুমি মেঘনার জল, কে আমি পদ্মার জল?
ইরাবতীর ধারার মতোই আমাদের প্রেমজল অর্ধেক
পিপাসা মিটিয়ে থাকে,
বাকি অর্ধেক জটিল-কুটিলতা রেখে ফল্গুধারার দুর্বোধ্য ক্ষুধা|
রোজার চাঁদও জানে মহত্ত্ব, রাত্রির|
তুমিও জানো, শুধু প্রকাশ করো না, এই তো!
রাত্রির উজ্জ্বলতা তোমার মতো সুন্দর নয়, আমি অসত্য বলিনি—
উড়ে যাওয়া চাঁদের ধুলো গায়ে মেখে সুস্নাত হয়েছি|
দিগন্তে নেমে আসা জ্যোৎস্নার সাথে শত সহস্র পতঙ্গ ওড়ে, মরে|
অন্ধকারে উড়ে উড়ে-পুড়ে মরলেও বুঝতে পারি না তারা
মৃত্যু আকাঙ্ক্ষী ছিলো|
অমারাত্রি ধলা কুকুরের সাথে গলা মিলিয়ে, কাঁদে|
চাঁদকে তখন খুব বিহ্বল মনে হয়, তখন রাত্রির আরশিতে অস্থির
হয়ে খুঁজতে থাকি, কই গেলো চাঁদ, কই গেলো ধূলিকণা!
কই গেলো কুসুম আমার?
** কবি আবদুর রাজ্জাক, সত্তরের দশকের বিশিষ্ট কবি ও গদ্যকার

আপনার মতামত লিখুন