সংবাদ

ফুটবলের উৎস ২৩০০ বছর আগে চীনে


বিশাখা চৌধুরী
বিশাখা চৌধুরী
প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬, ০৯:৫২ পিএম

ফুটবলের উৎস ২৩০০ বছর আগে চীনে
ছবি: এআই

আমাদের অনেকের ধারণা, ফুটবলের জন্ম কেবল ইংল্যান্ডে। কিন্তু ফিফা স্বীকৃতি দিয়েছে, ফুটবলের সবচেয়ে প্রাচীন প্রাতিষ্ঠানিক রূপটির উৎপত্তি হয়েছিল প্রায় ২৩০০ বছর আগে প্রাচীন চীনে।

তখন এই খেলার নাম ছিল ‘কুজু’। সামরিক প্রশিক্ষণ থেকে রাজকীয় বিনোদন- কীভাবে ‘কুজু’ আধুনিক ফুটবলে রূপান্তরিত হলো, সেই ইতিহাস ভীষণ রোমাঞ্চকর।

‘কুজু’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হচ্ছে- ‘কু’ মানে পায়ে লাথি মারা। আর 'জু' মানে চামড়ার তৈরি বল। অর্থাৎ, পায়ে বল লাথি মেরে খেলা। খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় ও দ্বিতীয় শতকে চীনের যুদ্ধরত রাজ্যসমূহের যুগে এবং পরবর্তীতে হান রাজবংশের আমলে এই খেলার ব্যাপক প্রচলন ঘটে।

কুজুর জন্ম হয়েছিল মূলত যুদ্ধের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে। হান রাজবংশের সামরিক জেনারেলরা লক্ষ্য করলেন, যুদ্ধ না থাকলে সৈন্যরা দীর্ঘ সময় অলস হয়ে পড়ে। তাদের পায়ের পেশি দুর্বল হয়ে যায়। সৈন্যদের শারীরিক ফিটনেস, ক্ষিপ্রতা আর দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য কুজু বাধ্যতামূলক করা হয়।

বলটি ছিল পশুর শক্ত চামড়ার ভেতরে চুল বা পালক ঠাসা। আজকের ফুটবলের মতো বাউন্স করত না, বরং বেশ ভারী ছিল। পরবর্তীতে হান সম্রাট লিউ বাং নিজে কুজুর ভক্ত হয়ে ওঠেন। তিনি রাজপ্রাসাদের ভেতরেই ‘কুজু মাঠ’ তৈরি করেছিলেন। যেখানে পেশাদার দলগুলো রাজার সামনে প্রতিযোগিতায় নামত।

ট্যাংক যুগে (৬১৮-৯০৭ খ্রি.) চীনারা পালক বা চুলের পরিবর্তে পশুর মূত্রথলি ব্যবহার করে বাতাসভর্তি বল তৈরি করতে শেখে। বলটি হালকা হয়। বাতাসে ভেসে থাকার ক্ষমতা পায়।

প্রাচীন কুজু মূলত দুই পদ্ধতিতে খেলা হতো। ‘ঝু কিউ’ পদ্ধতিতে মাঠের মাঝখানে প্রায় ৩০ ফুট উঁচু বাঁশের জাল থাকত। দুই দলের খেলোয়াড়রা কেবল পা, বুক বা মাথা দিয়ে বল পাস করে সেই উঁচু নেটের ভেতর বল ঢোকানোর চেষ্টা করত।

পেশাদার ক্লাব

সং রাজবংশের আমলে (৯৬০-১২৭৯ খ্রি.) কুজু সম্পূর্ণ পেশাদার রূপ নেয়। ‘কিশি শে’ নামে বিশ্বের প্রথম পেশাদার ফুটবল ক্লাবের জন্ম হয়। খেলোয়াড়রা টাকা বা রাজকীয় উপাধির বিনিময়ে খেলতেন। নির্দিষ্ট নিয়ম অমান্য করলে রেফারি বা বিচারক দ্বারা শাস্তির বিধান ছিল।

কুজু খেলার পেছনে প্রাচীন চীনাদের গভীর সামাজিক ও যুদ্ধকালীন মনস্তত্ত্ব কাজ করত। প্রথমত, এই খেলার এক ধরনের অহিংস যুদ্ধ। কনফুসীয় দর্শনে বিশ্বাসী চীনারা সরাসরি সহিংসতা পছন্দ করত না। কুজু ছিল রক্তপাতহীন এক কৃত্রিম যুদ্ধ- তরবারি বা বল্লম দিয়ে মানুষ হত্যা না করে, একটি বলকে জয় করার মাধ্যমে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের মনস্তাত্ত্বিক বিকল্প।

চীনের রাজনৈতিক কাঠামো সবসময় ‘সমষ্টিগত শৃঙ্খলাকে’ প্রাধান্য দিয়েছে। কুজুতে একা কেউ গোল দিতে পারত না- নিখুঁত পাসের মাধ্যমে পুরো দলকে বল জালের কাছে নিয়ে যেতে হতো। এই খেলাটি শেখাত কীভাবে ব্যক্তিগত অহংকার ভুলে দলের স্বার্থে একসাথে কাজ করতে হয়।

আধুনিক ফুটবলের জন্ম

১৪শ শতকে মিং রাজবংশের শাসনে কুজু তার গৌরব হারায়। অতিরিক্ত জুয়া, মদ্যপান এবং বিনোদনের নামে রাজনৈতিক অবক্ষয়ের কারণে মিং শাসকরা নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। তবে সিল্ক রোড এবং সমুদ্রযাত্রার মাধ্যমে পায়ে বল খেলার ধারণা এশিয়া থেকে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে ইউরোপে পৌঁছায়।

১৮৬৩ সালে ইংল্যান্ড এই আদি ধারণাকে পুঁজি করে, হাত দিয়ে বল ছোঁয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে এবং মাঠের দুই প্রান্তে গোলপোস্ট বসিয়ে আধুনিক ফুটবলের নিয়মকানুন চূড়ান্ত করে।

আজকের মেসি বা রোনালদোর নিখুঁত ড্রিবলিং বা বাইসাইকেল কিকের পেছনের অদৃশ্য সুতোটি বাঁধা রয়েছে হাজার বছর আগের প্রাচীন চীনা সৈন্যদের কুজু খেলার মাঠে। চীন ফুটবলকে দিয়েছিল প্রাণ আর পা। ইংল্যান্ড দিয়েছে আধুনিক পোশাক ও বৈশ্বিক নিয়ম।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬


ফুটবলের উৎস ২৩০০ বছর আগে চীনে

প্রকাশের তারিখ : ২৬ জুন ২০২৬

featured Image

আমাদের অনেকের ধারণা, ফুটবলের জন্ম কেবল ইংল্যান্ডে। কিন্তু ফিফা স্বীকৃতি দিয়েছে, ফুটবলের সবচেয়ে প্রাচীন প্রাতিষ্ঠানিক রূপটির উৎপত্তি হয়েছিল প্রায় ২৩০০ বছর আগে প্রাচীন চীনে।

তখন এই খেলার নাম ছিল ‘কুজু’। সামরিক প্রশিক্ষণ থেকে রাজকীয় বিনোদন- কীভাবে ‘কুজু’ আধুনিক ফুটবলে রূপান্তরিত হলো, সেই ইতিহাস ভীষণ রোমাঞ্চকর।

‘কুজু’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হচ্ছে- ‘কু’ মানে পায়ে লাথি মারা। আর 'জু' মানে চামড়ার তৈরি বল। অর্থাৎ, পায়ে বল লাথি মেরে খেলা। খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় ও দ্বিতীয় শতকে চীনের যুদ্ধরত রাজ্যসমূহের যুগে এবং পরবর্তীতে হান রাজবংশের আমলে এই খেলার ব্যাপক প্রচলন ঘটে।

কুজুর জন্ম হয়েছিল মূলত যুদ্ধের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে। হান রাজবংশের সামরিক জেনারেলরা লক্ষ্য করলেন, যুদ্ধ না থাকলে সৈন্যরা দীর্ঘ সময় অলস হয়ে পড়ে। তাদের পায়ের পেশি দুর্বল হয়ে যায়। সৈন্যদের শারীরিক ফিটনেস, ক্ষিপ্রতা আর দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য কুজু বাধ্যতামূলক করা হয়।

বলটি ছিল পশুর শক্ত চামড়ার ভেতরে চুল বা পালক ঠাসা। আজকের ফুটবলের মতো বাউন্স করত না, বরং বেশ ভারী ছিল। পরবর্তীতে হান সম্রাট লিউ বাং নিজে কুজুর ভক্ত হয়ে ওঠেন। তিনি রাজপ্রাসাদের ভেতরেই ‘কুজু মাঠ’ তৈরি করেছিলেন। যেখানে পেশাদার দলগুলো রাজার সামনে প্রতিযোগিতায় নামত।

ট্যাংক যুগে (৬১৮-৯০৭ খ্রি.) চীনারা পালক বা চুলের পরিবর্তে পশুর মূত্রথলি ব্যবহার করে বাতাসভর্তি বল তৈরি করতে শেখে। বলটি হালকা হয়। বাতাসে ভেসে থাকার ক্ষমতা পায়।

প্রাচীন কুজু মূলত দুই পদ্ধতিতে খেলা হতো। ‘ঝু কিউ’ পদ্ধতিতে মাঠের মাঝখানে প্রায় ৩০ ফুট উঁচু বাঁশের জাল থাকত। দুই দলের খেলোয়াড়রা কেবল পা, বুক বা মাথা দিয়ে বল পাস করে সেই উঁচু নেটের ভেতর বল ঢোকানোর চেষ্টা করত।

পেশাদার ক্লাব

সং রাজবংশের আমলে (৯৬০-১২৭৯ খ্রি.) কুজু সম্পূর্ণ পেশাদার রূপ নেয়। ‘কিশি শে’ নামে বিশ্বের প্রথম পেশাদার ফুটবল ক্লাবের জন্ম হয়। খেলোয়াড়রা টাকা বা রাজকীয় উপাধির বিনিময়ে খেলতেন। নির্দিষ্ট নিয়ম অমান্য করলে রেফারি বা বিচারক দ্বারা শাস্তির বিধান ছিল।

কুজু খেলার পেছনে প্রাচীন চীনাদের গভীর সামাজিক ও যুদ্ধকালীন মনস্তত্ত্ব কাজ করত। প্রথমত, এই খেলার এক ধরনের অহিংস যুদ্ধ। কনফুসীয় দর্শনে বিশ্বাসী চীনারা সরাসরি সহিংসতা পছন্দ করত না। কুজু ছিল রক্তপাতহীন এক কৃত্রিম যুদ্ধ- তরবারি বা বল্লম দিয়ে মানুষ হত্যা না করে, একটি বলকে জয় করার মাধ্যমে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের মনস্তাত্ত্বিক বিকল্প।

চীনের রাজনৈতিক কাঠামো সবসময় ‘সমষ্টিগত শৃঙ্খলাকে’ প্রাধান্য দিয়েছে। কুজুতে একা কেউ গোল দিতে পারত না- নিখুঁত পাসের মাধ্যমে পুরো দলকে বল জালের কাছে নিয়ে যেতে হতো। এই খেলাটি শেখাত কীভাবে ব্যক্তিগত অহংকার ভুলে দলের স্বার্থে একসাথে কাজ করতে হয়।

আধুনিক ফুটবলের জন্ম

১৪শ শতকে মিং রাজবংশের শাসনে কুজু তার গৌরব হারায়। অতিরিক্ত জুয়া, মদ্যপান এবং বিনোদনের নামে রাজনৈতিক অবক্ষয়ের কারণে মিং শাসকরা নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। তবে সিল্ক রোড এবং সমুদ্রযাত্রার মাধ্যমে পায়ে বল খেলার ধারণা এশিয়া থেকে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে ইউরোপে পৌঁছায়।

১৮৬৩ সালে ইংল্যান্ড এই আদি ধারণাকে পুঁজি করে, হাত দিয়ে বল ছোঁয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে এবং মাঠের দুই প্রান্তে গোলপোস্ট বসিয়ে আধুনিক ফুটবলের নিয়মকানুন চূড়ান্ত করে।

আজকের মেসি বা রোনালদোর নিখুঁত ড্রিবলিং বা বাইসাইকেল কিকের পেছনের অদৃশ্য সুতোটি বাঁধা রয়েছে হাজার বছর আগের প্রাচীন চীনা সৈন্যদের কুজু খেলার মাঠে। চীন ফুটবলকে দিয়েছিল প্রাণ আর পা। ইংল্যান্ড দিয়েছে আধুনিক পোশাক ও বৈশ্বিক নিয়ম।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত