বাংলার মসলিন থেকে চীনের রেশম, বৌদ্ধ সূত্র থেকে জিরাফ উপহার- অবিশ্বাস্যভাবে গড়ে উঠেছিল এই দুই অঞ্চলের সম্পর্ক। যা আজ রাষ্ট্রীয় কূটনীতির ভিত্তি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বর্তমানে চীন সফর করছেন। গেল বছরে দুই দেশ কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্ণ করেছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাই ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ভূরাজনীতির নতুন এই অধ্যায়ে এসে ইতিহাসের পাতা উল্টালে চমকপ্রদ সত্য ধরা পড়ে।
মূলত, চীন ও ঢাকার সম্পর্ক কোনো আধুনিক যুগের সৃষ্টি নয়। হিমালয়, পাহাড়-জঙ্গল পেরিয়ে এই দুই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ শুরু হয়েছিল প্রায় ২২০০ বছর আগে। রেশম পথ, বৌদ্ধ ধর্ম এবং সমুদ্রযাত্রার ওপর ভর করে গড়ে ওঠা এই সম্পর্কের ইতিহাস এক মহাকাব্যিক আখ্যান।
যখন পথ চলা শুরু
চীন ও প্রাচীন বাংলার মধ্যে প্রথম যোগাযোগ শুরু হয় খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে। হান রাজবংশের সম্রাটের দূত ঝাং কিয়ান মধ্য এশিয়া সফর শেষে ফিরে এসে জানান, তিনি সিচুয়ান অঞ্চলের উৎপাদিত রেশমি কাপড় ও বাঁশের পণ্য ভারতীয় উপমহাদেশের বাজারে বিক্রি হতে দেখেছেন। প্রাচীন বাংলাও ছিল সেই বাজারের অন্তর্ভুক্ত।
তথ্য পেয়ে হান সম্রাট উ-দি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় দোভাষী-দূত পাঠালেন। তারা বাংলার গঙ্গা নদীর তীরবর্তী তাম্রলিপ্ত (বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের তমলুক) পর্যন্ত পৌঁছালেন। তখন থেকেই শুরু হয় দক্ষিণ-পশ্চিম রেশম পথে বাণিজ্য- সিচুয়ান ও ইউনান থেকে মিয়ানমার ও আসামের জঙ্গল পেরিয়ে বাংলার গঙ্গা অববাহিকায় পৌঁছানোর এই পথে।
বৌদ্ধ ধর্মের সেতুবন্ধন
খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতক থেকে বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার দুই অঞ্চলের মধ্যে আত্মিক সম্পর্ক তৈরি করে। চীনা পণ্ডিতরা বৌদ্ধ শাস্ত্রের মূল পাণ্ডুলিপি সংগ্রহের জন্য বাংলায় আসতে শুরু করেন। ৪১২ খ্রিষ্টাব্দে চীনা পরিব্রাজক ফ্যাক্সিয়ান বাংলার প্রধান বন্দর তাম্রলিপ্তে প্রায় দুই বছর অবস্থান করেন। বৌদ্ধ সূত্র অনুলিপি করেন। বাংলার মুদ্রা হিসেবে কৌড়ি ব্যবহারেরও প্রমাণ পান তিনি।
৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দে মহান চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং পুণ্ড্রবর্ধন (মহাস্থানগড়), সমতট (ময়নামতি) এবং তাম্রলিপ্ত সফর করেন। বাংলার বৌদ্ধ বিহার, সমৃদ্ধি ও মানুষের উন্নত জীবনযাত্রার প্রশংসা তার ভ্রমণকাহিনিতে লিখে গেছেন। সপ্তম শতকের শেষ দিকে পরিব্রাজক ইজিং বাংলায় দীর্ঘকাল অবস্থান করে চিকিৎসা ও বৌদ্ধ শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন।
অতীশ দীপঙ্করের হিমালয় পেরোনো
১০৪০ খ্রিষ্টাব্দে বাংলার মুন্সীগঞ্জের বজ্রযোগিনী গ্রামের বৌদ্ধ পণ্ডিত অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান তিব্বতের রাজার আমন্ত্রণে হিমালয় পেরিয়ে সেখানে যান। তিনি ১৭ বছর তিব্বত ও চীনের বিভিন্ন অঞ্চলে বৌদ্ধ ধর্মের সংস্কার করেন। জ্ঞানবিজ্ঞানের আলো ছড়ান। তিব্বতে আজও তাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। যা চীন-বাংলার সম্পর্কের এক অনন্য মাইলফলক।
‘পাং-গে-লা’ থেকে ‘মেং-জিয়া-লা’
প্রাচীন চীনে বাংলাকে ডাকা হতো ‘পাং-গে-লা’ নামে। কালক্রমে এই নামই বিবর্তিত হয়ে আজকের চীনা উচ্চারণে দাঁড়িয়েছে ‘মেং-জিয়া-লা’- বাংলাদেশের সমসাময়িক চীনা নাম। একটি নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে দুই দেশের সম্পর্কের গভীরতা।
সম্পর্কের স্বর্ণযুগ
বাংলার শাহী সুলতানি যুগে (ইলিয়াস শাহী রাজবংশ) চীন-বাংলা সম্পর্ক চূড়ান্ত বিকাশ লাভ করে। সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ ১৪০৫ থেকে ১৪১৫ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে চীনের মিং রাজবংশের সম্রাট ইয়ংলে-এর দরবারে দূত পাঠান। এই সময়ে প্রায় প্রতি বছরই দুই দেশের মধ্যে দূত বিনিময় হতো। মিং সম্রাটের কূটনীতি বাংলা ও জৌনপুরের সুলতানদের মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তিতেও সফল হয়েছিল।
চীনা সম্রাটের নির্দেশে বিখ্যাত মুসলিম নৌ-সেনাপতি অ্যাডমিরাল ঝেং হে তার বিশাল নৌবহর নিয়ে দুইবার প্রাচীন বাংলার প্রধান বন্দর চট্টগ্রাম এবং রাজধানী সোনারগাঁওয়ে আসেন। ১৪১৪ খ্রিষ্টাব্দে বাংলার সুলতান চীনা সম্রাটকে পূর্ব আফ্রিকা থেকে আনা একটি জিরাফ উপহার পাঠান। চীনারা এই প্রাণীকে তাদের পৌরাণিক পবিত্র প্রাণী ‘কিলিন’ মনে করে অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলেন। এটি দুই দেশের সম্পর্কের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক ঘটনা।
রেশম বনাম মসলিন
বাংলা-চীন বাণিজ্য সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ। চীন রপ্তানি করত রেশম, সোনা-রূপা, নীল-সাদা চীনামাটি, তামা, লোহা, পারদ। অন্যদিকে বাংলা পাঠাত মুক্তা, প্রবাল, স্ফটিক, ময়ূরের পালক এবং বিশেষ করে বিখ্যাত মসলিন কাপড়। চীনের রেশম বস্ত্র বাংলায় আসত প্রায় দুই সহস্রাব্দ ধরে। হান রাজবংশের শুরু থেকে মিং রাজবংশ পর্যন্ত। অন্যদিকে বাংলার সুতি কাপড় (‘পাই-কাপড়’ বা মসলিন) চীনে বিক্রি হতো।
আরেকটি চমকপ্রদ তথ্য হচ্ছে, বাংলা থেকে কৌড়ি (কাউরি) যেত চীনের ইউনান প্রদেশে, যা সেখানে মুদ্রা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ইউনানে কোনো সমুদ্র উপকূল না থাকায়, বাংলাই ছিল কৌড়ির উৎস। আর বাংলায় রুপোর মুদ্রা তৈরির জন্য চীন থেকে রুপো আমদানি করা হতো। কেন না, বাংলায় রুপোর খনি ছিল না।
চীনা নাবিকের বর্ণনা
ইউয়ান রাজবংশের সময় (১৪শ শতক) চীনা নাবিক ও বণিক ওয়াং দা-ইউয়ান দুবার বাংলা সফর করেন (১৩৩০-১৩৩৪ এবং ১৩৩৭-১৩৩৯)। তার লেখা ‘দাও-ই ঝি-লুয়ে’ গ্রন্থে বাংলার ধানক্ষেত ও আবাদি জমির প্রশংসা করেন। উল্লেখ করেন বাংলায় বছরে তিনবার ফসল হয়। তিনি আরও লিখেছেন, বাংলার জনগণের আচার-ব্যবহার ছিল অত্যন্ত বিশুদ্ধ ও সৎ।
নতুন অধ্যায়
১৯৭৫ সালের ৪ অক্টোবর চীন ও বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। ২০২৫ সালে এই সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ২০২৫ সালকে ‘চীন-বাংলাদেশ জনগণ-থেকে-জনগণ বিনিময় বর্ষ’ ঘোষণা করা হয়েছে। ২০০৬ সালে চীন ভারতকে টপকে বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদারে পরিণত হয়। আজ চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা অংশীদার।
প্রাচীন বাংলার মসলিন আর চীনের রেশম যেমন একসময় হিমালয় পেরিয়ে আদান-প্রদান হয়েছে, তেমনই আজকের কূটনীতি ও অর্থনীতি সেই ঐতিহাসিক পথ ধরেই এগোচ্ছে। আড়াই হাজার বছরের সম্পর্কের ভিত আজও শক্ত- ইতিহাসের সেই সেতুবন্ধনই আধুনিক চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের শিকড়।

শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ জুন ২০২৬
বাংলার মসলিন থেকে চীনের রেশম, বৌদ্ধ সূত্র থেকে জিরাফ উপহার- অবিশ্বাস্যভাবে গড়ে উঠেছিল এই দুই অঞ্চলের সম্পর্ক। যা আজ রাষ্ট্রীয় কূটনীতির ভিত্তি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বর্তমানে চীন সফর করছেন। গেল বছরে দুই দেশ কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্ণ করেছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাই ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ভূরাজনীতির নতুন এই অধ্যায়ে এসে ইতিহাসের পাতা উল্টালে চমকপ্রদ সত্য ধরা পড়ে।
মূলত, চীন ও ঢাকার সম্পর্ক কোনো আধুনিক যুগের সৃষ্টি নয়। হিমালয়, পাহাড়-জঙ্গল পেরিয়ে এই দুই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ শুরু হয়েছিল প্রায় ২২০০ বছর আগে। রেশম পথ, বৌদ্ধ ধর্ম এবং সমুদ্রযাত্রার ওপর ভর করে গড়ে ওঠা এই সম্পর্কের ইতিহাস এক মহাকাব্যিক আখ্যান।
যখন পথ চলা শুরু
চীন ও প্রাচীন বাংলার মধ্যে প্রথম যোগাযোগ শুরু হয় খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে। হান রাজবংশের সম্রাটের দূত ঝাং কিয়ান মধ্য এশিয়া সফর শেষে ফিরে এসে জানান, তিনি সিচুয়ান অঞ্চলের উৎপাদিত রেশমি কাপড় ও বাঁশের পণ্য ভারতীয় উপমহাদেশের বাজারে বিক্রি হতে দেখেছেন। প্রাচীন বাংলাও ছিল সেই বাজারের অন্তর্ভুক্ত।
তথ্য পেয়ে হান সম্রাট উ-দি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় দোভাষী-দূত পাঠালেন। তারা বাংলার গঙ্গা নদীর তীরবর্তী তাম্রলিপ্ত (বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের তমলুক) পর্যন্ত পৌঁছালেন। তখন থেকেই শুরু হয় দক্ষিণ-পশ্চিম রেশম পথে বাণিজ্য- সিচুয়ান ও ইউনান থেকে মিয়ানমার ও আসামের জঙ্গল পেরিয়ে বাংলার গঙ্গা অববাহিকায় পৌঁছানোর এই পথে।
বৌদ্ধ ধর্মের সেতুবন্ধন
খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতক থেকে বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার দুই অঞ্চলের মধ্যে আত্মিক সম্পর্ক তৈরি করে। চীনা পণ্ডিতরা বৌদ্ধ শাস্ত্রের মূল পাণ্ডুলিপি সংগ্রহের জন্য বাংলায় আসতে শুরু করেন। ৪১২ খ্রিষ্টাব্দে চীনা পরিব্রাজক ফ্যাক্সিয়ান বাংলার প্রধান বন্দর তাম্রলিপ্তে প্রায় দুই বছর অবস্থান করেন। বৌদ্ধ সূত্র অনুলিপি করেন। বাংলার মুদ্রা হিসেবে কৌড়ি ব্যবহারেরও প্রমাণ পান তিনি।
৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দে মহান চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং পুণ্ড্রবর্ধন (মহাস্থানগড়), সমতট (ময়নামতি) এবং তাম্রলিপ্ত সফর করেন। বাংলার বৌদ্ধ বিহার, সমৃদ্ধি ও মানুষের উন্নত জীবনযাত্রার প্রশংসা তার ভ্রমণকাহিনিতে লিখে গেছেন। সপ্তম শতকের শেষ দিকে পরিব্রাজক ইজিং বাংলায় দীর্ঘকাল অবস্থান করে চিকিৎসা ও বৌদ্ধ শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন।
অতীশ দীপঙ্করের হিমালয় পেরোনো
১০৪০ খ্রিষ্টাব্দে বাংলার মুন্সীগঞ্জের বজ্রযোগিনী গ্রামের বৌদ্ধ পণ্ডিত অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান তিব্বতের রাজার আমন্ত্রণে হিমালয় পেরিয়ে সেখানে যান। তিনি ১৭ বছর তিব্বত ও চীনের বিভিন্ন অঞ্চলে বৌদ্ধ ধর্মের সংস্কার করেন। জ্ঞানবিজ্ঞানের আলো ছড়ান। তিব্বতে আজও তাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। যা চীন-বাংলার সম্পর্কের এক অনন্য মাইলফলক।
‘পাং-গে-লা’ থেকে ‘মেং-জিয়া-লা’
প্রাচীন চীনে বাংলাকে ডাকা হতো ‘পাং-গে-লা’ নামে। কালক্রমে এই নামই বিবর্তিত হয়ে আজকের চীনা উচ্চারণে দাঁড়িয়েছে ‘মেং-জিয়া-লা’- বাংলাদেশের সমসাময়িক চীনা নাম। একটি নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে দুই দেশের সম্পর্কের গভীরতা।
সম্পর্কের স্বর্ণযুগ
বাংলার শাহী সুলতানি যুগে (ইলিয়াস শাহী রাজবংশ) চীন-বাংলা সম্পর্ক চূড়ান্ত বিকাশ লাভ করে। সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ ১৪০৫ থেকে ১৪১৫ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে চীনের মিং রাজবংশের সম্রাট ইয়ংলে-এর দরবারে দূত পাঠান। এই সময়ে প্রায় প্রতি বছরই দুই দেশের মধ্যে দূত বিনিময় হতো। মিং সম্রাটের কূটনীতি বাংলা ও জৌনপুরের সুলতানদের মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তিতেও সফল হয়েছিল।
চীনা সম্রাটের নির্দেশে বিখ্যাত মুসলিম নৌ-সেনাপতি অ্যাডমিরাল ঝেং হে তার বিশাল নৌবহর নিয়ে দুইবার প্রাচীন বাংলার প্রধান বন্দর চট্টগ্রাম এবং রাজধানী সোনারগাঁওয়ে আসেন। ১৪১৪ খ্রিষ্টাব্দে বাংলার সুলতান চীনা সম্রাটকে পূর্ব আফ্রিকা থেকে আনা একটি জিরাফ উপহার পাঠান। চীনারা এই প্রাণীকে তাদের পৌরাণিক পবিত্র প্রাণী ‘কিলিন’ মনে করে অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলেন। এটি দুই দেশের সম্পর্কের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক ঘটনা।
রেশম বনাম মসলিন
বাংলা-চীন বাণিজ্য সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ। চীন রপ্তানি করত রেশম, সোনা-রূপা, নীল-সাদা চীনামাটি, তামা, লোহা, পারদ। অন্যদিকে বাংলা পাঠাত মুক্তা, প্রবাল, স্ফটিক, ময়ূরের পালক এবং বিশেষ করে বিখ্যাত মসলিন কাপড়। চীনের রেশম বস্ত্র বাংলায় আসত প্রায় দুই সহস্রাব্দ ধরে। হান রাজবংশের শুরু থেকে মিং রাজবংশ পর্যন্ত। অন্যদিকে বাংলার সুতি কাপড় (‘পাই-কাপড়’ বা মসলিন) চীনে বিক্রি হতো।
আরেকটি চমকপ্রদ তথ্য হচ্ছে, বাংলা থেকে কৌড়ি (কাউরি) যেত চীনের ইউনান প্রদেশে, যা সেখানে মুদ্রা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ইউনানে কোনো সমুদ্র উপকূল না থাকায়, বাংলাই ছিল কৌড়ির উৎস। আর বাংলায় রুপোর মুদ্রা তৈরির জন্য চীন থেকে রুপো আমদানি করা হতো। কেন না, বাংলায় রুপোর খনি ছিল না।
চীনা নাবিকের বর্ণনা
ইউয়ান রাজবংশের সময় (১৪শ শতক) চীনা নাবিক ও বণিক ওয়াং দা-ইউয়ান দুবার বাংলা সফর করেন (১৩৩০-১৩৩৪ এবং ১৩৩৭-১৩৩৯)। তার লেখা ‘দাও-ই ঝি-লুয়ে’ গ্রন্থে বাংলার ধানক্ষেত ও আবাদি জমির প্রশংসা করেন। উল্লেখ করেন বাংলায় বছরে তিনবার ফসল হয়। তিনি আরও লিখেছেন, বাংলার জনগণের আচার-ব্যবহার ছিল অত্যন্ত বিশুদ্ধ ও সৎ।
নতুন অধ্যায়
১৯৭৫ সালের ৪ অক্টোবর চীন ও বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। ২০২৫ সালে এই সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ২০২৫ সালকে ‘চীন-বাংলাদেশ জনগণ-থেকে-জনগণ বিনিময় বর্ষ’ ঘোষণা করা হয়েছে। ২০০৬ সালে চীন ভারতকে টপকে বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদারে পরিণত হয়। আজ চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা অংশীদার।
প্রাচীন বাংলার মসলিন আর চীনের রেশম যেমন একসময় হিমালয় পেরিয়ে আদান-প্রদান হয়েছে, তেমনই আজকের কূটনীতি ও অর্থনীতি সেই ঐতিহাসিক পথ ধরেই এগোচ্ছে। আড়াই হাজার বছরের সম্পর্কের ভিত আজও শক্ত- ইতিহাসের সেই সেতুবন্ধনই আধুনিক চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের শিকড়।

আপনার মতামত লিখুন