কয়েক দিনের ক্ষণস্থায়ী নীরবতার অবসান ঘটিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবারও বেজে উঠেছে যুদ্ধের দামামা। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া এই ভয়াবহ সংঘাত গোটা অঞ্চলকে এক অনিশ্চিত চরম উত্তেজনার মুখে ঠেলে দিয়েছে। ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে কোনো পক্ষই অর্থবহ ছাড় না দেওয়ার কারণেই মধ্যপ্রাচ্যে আবারও সামরিক সংঘাত দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে।
ইরানে মার্কিন বোমাবর্ষণ: নিভে গেল শিশুসহ একই পরিবারের প্রাণ
গতকাল ইরানের কেশম দ্বীপে আবাসিক ভবনে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ভয়াবহ বোমাবর্ষণ চালায়। এতে এক দম্পতি ও তাদের মাত্র দুই বছর বয়সী শিশুসন্তান ঘটনাস্থলেই নিহত হন। বুশেহরের কিশ দ্বীপ থেকেও বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। এছাড়া খুজেস্তান প্রদেশের চারটি স্থানে জোরালো হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী।
পাশাপাশি জানজান প্রদেশে মার্কিন হামলায় ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) তিন সদস্য নিহত হয়েছেন। আইআরজিসি এক বিবৃতিতে তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযান চালানোর কথা নিশ্চিত করে জানিয়েছে, তাদের এই বিশেষ অভিযান টানা দুই ঘণ্টা ধরে চলে।
জর্ডানে ইরানের কড়া পাল্টা জবাব: ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন যুদ্ধবিমান
মার্কিন আগ্রাসনের কঠোর জবাব দিতে দেরি করেনি তেহরানও। জর্ডান ও কুয়েতকে লক্ষ্য করে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। আইআরজিসি জানিয়েছে, জর্ডানের আজরাক বিমানঘাঁটিতে চালানো তাদের হামলায় কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তা ও কারিগরি ব্যক্তি নিহত হয়েছেন।
এছাড়া হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি সর্বাধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। জর্ডানের আজরাক ঘাঁটিতে মার্কিন বিমানবাহিনীর জোরালো উপস্থিতি রয়েছে এবং কেশম দ্বীপে মার্কিন হামলার উপযুক্ত জবাব দিতেই এই আঘাত হানা হয়েছে বলে জানিয়েছে আইআরজিসি।
সংঘাতের পেছনে গভীর কূটনৈতিক ব্যর্থতা
হঠাৎ কেন বন্ধ হলো এই যুদ্ধবিরতি, এমন প্রশ্নের জবাবে আরব পারস্পেকটিভ ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক জেইডন আলকিনানি বলেন, "গত কয়েক দিনে দুপক্ষের কেউই অর্থবহ ছাড় দিতে না চাওয়ায় নতুন করে আবার হামলার ঘটনা ঘটছে। মতবিরোধগুলো অত্যন্ত গুরুতর। এছাড়া দুপক্ষ থেকেই ছাড় দেওয়ার মানসিকতা অত্যন্ত সীমিত।"
তিনি আরও যোগ করেন, "দুপক্ষই সামরিক ও কূটনৈতিক দুটি পথই খোলা রেখেছে। প্রত্যেকেই বিজয়ী হওয়ার আশা করছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র দুই দেশেরই ব্যাপক দায়িত্ব রয়েছে, একদিকে সামরিকভাবে মুখোমুখি হয়ে প্রতীকী ভাবমূর্তি রক্ষা করা, অন্যদিকে মধ্যস্থতার সুযোগ রাখা।"
উপসাগরীয় অঞ্চলে ক্ষয়ক্ষতি ও তীব্র প্রতিবাদ
ইরানের হামলায় কুয়েতে চীনা মালিকানাধীন এক ভবনে এক শ্রমিক নিহত হয়েছেন। কুয়েত সামরিক বাহিনীর মেজর জেনারেল সৌদি আব্দুলআজিজ আল-ওতাইবি জানান, ভবনটির উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে। জর্ডান ও কুয়েতে ইরানের এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে কাতার। তারা একে আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি হুমকি ও আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধের জন্য দায়ী যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল
এদিকে হরমুজ প্রণালি মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক কর্মকাণ্ডের কারণে বন্ধ রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই।
অন্যদিকে, চীন থেকে ইরানের অস্ত্র পাওয়ার খবরের বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "শি জিনপিং আমাকে খুব দৃঢ়ভাবে বলেছেন, তিনি এতে জড়িত থাকবেন না। তিনি জানেন, যদি এমনটি ঘটে, তাহলে আমি খুবই হতাশ হবো।" সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে এখন ঘনিয়ে আসছে এক চরম অস্থিরতার কালো মেঘ।

শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩১ জুলাই ২০২৬
কয়েক দিনের ক্ষণস্থায়ী নীরবতার অবসান ঘটিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবারও বেজে উঠেছে যুদ্ধের দামামা। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া এই ভয়াবহ সংঘাত গোটা অঞ্চলকে এক অনিশ্চিত চরম উত্তেজনার মুখে ঠেলে দিয়েছে। ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে কোনো পক্ষই অর্থবহ ছাড় না দেওয়ার কারণেই মধ্যপ্রাচ্যে আবারও সামরিক সংঘাত দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে।
ইরানে মার্কিন বোমাবর্ষণ: নিভে গেল শিশুসহ একই পরিবারের প্রাণ
গতকাল ইরানের কেশম দ্বীপে আবাসিক ভবনে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ভয়াবহ বোমাবর্ষণ চালায়। এতে এক দম্পতি ও তাদের মাত্র দুই বছর বয়সী শিশুসন্তান ঘটনাস্থলেই নিহত হন। বুশেহরের কিশ দ্বীপ থেকেও বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। এছাড়া খুজেস্তান প্রদেশের চারটি স্থানে জোরালো হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী।
পাশাপাশি জানজান প্রদেশে মার্কিন হামলায় ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) তিন সদস্য নিহত হয়েছেন। আইআরজিসি এক বিবৃতিতে তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযান চালানোর কথা নিশ্চিত করে জানিয়েছে, তাদের এই বিশেষ অভিযান টানা দুই ঘণ্টা ধরে চলে।
জর্ডানে ইরানের কড়া পাল্টা জবাব: ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন যুদ্ধবিমান
মার্কিন আগ্রাসনের কঠোর জবাব দিতে দেরি করেনি তেহরানও। জর্ডান ও কুয়েতকে লক্ষ্য করে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। আইআরজিসি জানিয়েছে, জর্ডানের আজরাক বিমানঘাঁটিতে চালানো তাদের হামলায় কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তা ও কারিগরি ব্যক্তি নিহত হয়েছেন।
এছাড়া হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি সর্বাধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। জর্ডানের আজরাক ঘাঁটিতে মার্কিন বিমানবাহিনীর জোরালো উপস্থিতি রয়েছে এবং কেশম দ্বীপে মার্কিন হামলার উপযুক্ত জবাব দিতেই এই আঘাত হানা হয়েছে বলে জানিয়েছে আইআরজিসি।
সংঘাতের পেছনে গভীর কূটনৈতিক ব্যর্থতা
হঠাৎ কেন বন্ধ হলো এই যুদ্ধবিরতি, এমন প্রশ্নের জবাবে আরব পারস্পেকটিভ ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক জেইডন আলকিনানি বলেন, "গত কয়েক দিনে দুপক্ষের কেউই অর্থবহ ছাড় দিতে না চাওয়ায় নতুন করে আবার হামলার ঘটনা ঘটছে। মতবিরোধগুলো অত্যন্ত গুরুতর। এছাড়া দুপক্ষ থেকেই ছাড় দেওয়ার মানসিকতা অত্যন্ত সীমিত।"
তিনি আরও যোগ করেন, "দুপক্ষই সামরিক ও কূটনৈতিক দুটি পথই খোলা রেখেছে। প্রত্যেকেই বিজয়ী হওয়ার আশা করছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র দুই দেশেরই ব্যাপক দায়িত্ব রয়েছে, একদিকে সামরিকভাবে মুখোমুখি হয়ে প্রতীকী ভাবমূর্তি রক্ষা করা, অন্যদিকে মধ্যস্থতার সুযোগ রাখা।"
উপসাগরীয় অঞ্চলে ক্ষয়ক্ষতি ও তীব্র প্রতিবাদ
ইরানের হামলায় কুয়েতে চীনা মালিকানাধীন এক ভবনে এক শ্রমিক নিহত হয়েছেন। কুয়েত সামরিক বাহিনীর মেজর জেনারেল সৌদি আব্দুলআজিজ আল-ওতাইবি জানান, ভবনটির উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে। জর্ডান ও কুয়েতে ইরানের এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে কাতার। তারা একে আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি হুমকি ও আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধের জন্য দায়ী যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল
এদিকে হরমুজ প্রণালি মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক কর্মকাণ্ডের কারণে বন্ধ রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই।
অন্যদিকে, চীন থেকে ইরানের অস্ত্র পাওয়ার খবরের বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "শি জিনপিং আমাকে খুব দৃঢ়ভাবে বলেছেন, তিনি এতে জড়িত থাকবেন না। তিনি জানেন, যদি এমনটি ঘটে, তাহলে আমি খুবই হতাশ হবো।" সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে এখন ঘনিয়ে আসছে এক চরম অস্থিরতার কালো মেঘ।

আপনার মতামত লিখুন