বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এখন একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব এবং দ্রুত পরিবর্তিত বৈশ্বিক কর্মবাজার; অন্যদিকে এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ, যারা হবে দক্ষ, সৃজনশীল, মানবিক এবং মূল্যবোধসম্পন্ন। এই বাস্তবতায় শিক্ষা নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু শুধু নতুন কারিকুলাম বা প্রযুক্তি নয়; বরং সেই মানুষটি, যিনি প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেন।
কারণ একটি শিক্ষা ব্যবস্থার প্রাণ কখনো প্রযুক্তি নয়; একজন শিক্ষক। একটি স্মার্ট বোর্ড, একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম কিংবা একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সফটওয়্যার শিক্ষার্থীর শেখাকে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু শেখার অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করতে পারে না। সেই অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করেন একজন চিন্তাশীল, সৃজনশীল, মানবিক এবং দায়িত্বশীল শিক্ষক। প্রযুক্তি শিক্ষকের বিকল্প নয়; বরং একজন দক্ষ শিক্ষকের হাতেই প্রযুক্তি শিক্ষাকে আরও কার্যকর, অংশগ্রহণমূলক এবং আনন্দময় করে তোলে।
এ কারণেই আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ও ইউনেস্কোর ‘রেকমেন্ডেইশন কনসার্নিং দ্য স্টেটাস অফ টিচার্স’ -এ শিক্ষকের পেশাগত মর্যাদা, ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ, উপযুক্ত কর্মপরিবেশ এবং পেশাগত স্বাধীনতাকে মানসম্মত শিক্ষার মৌলিক শর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কারণ আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, শিক্ষকের মানোন্নয়ন ছাড়া শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব নয়।
বাংলাদেশও শিক্ষা ব্যবস্থাকে সময়োপযোগী করার লক্ষ্যে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা, প্রযুক্তির ব্যবহার, গবেষণার প্রসার এবং শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক পাঠদানের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। কিন্তু শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন করলেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। যে মানুষটি প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে নতুন প্রজন্মকে গড়ে তোলেন, তার পেশাগত বিকাশ, সৃজনশীলতা, গবেষণার সুযোগ এবং মানসিক স্বাধীনতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের সমাজে এখনো অনেক সময় শিক্ষকের জ্ঞান, গবেষণা, পাঠদানের দক্ষতা কিংবা মানুষ গড়ার অবদানের চেয়ে তাঁর ব্যক্তিজীবনের শালীন প্রকাশ বেশি আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। আমরা চাই তিনি শিক্ষার্থীদের মুক্তচিন্তা শেখান, অথচ তার নিজের মুক্ত ও মানবিক প্রকাশকে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারি না। আমরা চাই তিনি সৃজনশীল প্রজন্ম গড়ে তুলুন, অথচ তার নিজের সৃজনশীলতাকে অনেক সময় সন্দেহের চোখে দেখি। এই বৈপরীত্য দূর না করলে আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার লক্ষ্যও পূর্ণতা পাবে না।
আজকের পৃথিবীতে একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার পদবি বা বয়স নয়; তার শেখার ক্ষমতা। যে শিক্ষক প্রতিনিয়ত নতুন জ্ঞান অর্জন করেন, প্রযুক্তিকে কাজে লাগান, গবেষণায় যুক্ত থাকেন, সংস্কৃতিচর্চা করেন এবং শিক্ষার্থীদের কৌতূহল জাগিয়ে তোলেন, তিনিই প্রকৃত আধুনিক শিক্ষক। কারণ শিক্ষার্থীরা শুধু বই থেকে শেখে না; তারা শেখে শিক্ষকের চিন্তা, আচরণ, মূল্যবোধ এবং জীবনদর্শন থেকেও।
এই কারণেই শিক্ষকের মানবিক সত্তা, সৃজনশীলতা এবং পেশাগত বিকাশকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। একজন শিক্ষক যত বেশি জ্ঞানচর্চা করবেন, সংস্কৃতিমনা হবেন, সময়ের সঙ্গে নিজেকে আপডেট রাখবেন এবং মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ হবেন, তার শ্রেণিকক্ষও তত বেশি প্রাণবন্ত, চিন্তাশীল ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক হয়ে উঠবে।
শিক্ষা কখনো কেবল তথ্যের আদান-প্রদান নয়; এটি মানুষ গড়ার একটি অবিরাম প্রক্রিয়া। আর মানুষ গড়ার এই কাজটি যিনি করেন, তিনি নিজেও একজন পূর্ণ মানুষ। তাই শিক্ষককে এমন একটি সত্তায় পরিণত করা উচিত নয়, যেখানে তার ব্যক্তিত্ব, অনুভূতি এবং সৃজনশীলতার কোনো স্থান থাকবে না।
আমাদের সমাজে এখনো একটি ভুল ধারণা রয়ে গেছে শিক্ষক মানেই তিনি সব সময় গম্ভীর থাকবেন, ব্যক্তিজীবনকে আড়ালে রাখবেন এবং কেবল শ্রেণিকক্ষেই সীমাবদ্ধ থাকবেন। কিন্তু একজন শিক্ষক যদি শালীনতা ও পেশাগত নৈতিকতা বজায় রেখে নিজের স্বাভাবিক জীবনযাপন করেন, সংস্কৃতিচর্চা করেন, বই পড়েন, গবেষণা করেন কিংবা প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করেন, তাহলে তা তার শিক্ষকতার পরিপন্থী নয়; বরং তাকে আরও সমৃদ্ধ করে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল শিক্ষা, ভার্চুয়াল ল্যাব, ওপেন এডুকেশনাল রিসোর্স এবং বৈশ্বিক জ্ঞানভাণ্ডার আজ শিক্ষকের হাতের নাগালে। এগুলোকে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই; বরং শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের জন্য এগুলোকে দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করতে হবে। যে শিক্ষক প্রযুক্তিকে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, সহযাত্রী হিসেবে গ্রহণ করবেন, তিনিই ভবিষ্যতের শ্রেণিকক্ষের নেতৃত্ব দেবেন।
একইভাবে, যে শিক্ষক বই পড়েন, গবেষণা করেন, নতুন ধারণা নিয়ে ভাবেন, শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করতে উৎসাহ দেন এবং সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রাখেন, তিনি কখনো পুরোনো হয়ে যান না। কারণ একজন শিক্ষক আজীবন শিক্ষার্থী; শেখা থেমে গেলে শিক্ষকতাও থেমে যায়।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন শিক্ষককে আমরা কেমন মানুষ হিসেবে দেখতে চাই? এমন একজন মানুষ, যিনি কেবল পাঠ্যবইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকবেন, নাকি এমন একজন, যিনি জীবনকে জানবেন, সমাজকে বুঝবেন এবং সংস্কৃতির আলোয় নিজেকে সমৃদ্ধ করবেন?
আমাদের মনে রাখতে হবে, শিক্ষকের বয়স নয় শিক্ষকের মনের বয়সই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যিনি প্রতিদিন নতুন কিছু শিখতে আগ্রহী, নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করেন, নতুন বই পড়েন, নতুন ধারণা নিয়ে ভাবেন এবং সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলে নেন, তিনিই প্রকৃত আধুনিক শিক্ষক। আর এমন শিক্ষকই শিক্ষার্থীদের শেখার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে পারেন। কারণ শিক্ষার্থীরা শুধু শিক্ষকের পাঠ নয়; তার কৌতূহল, উদ্যম ও জীবনবোধ থেকেও শিক্ষা গ্রহণ করে।
প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তন কীভাবে সম্ভব? কীভাবে এমন একটি শিক্ষা-পরিবেশ গড়ে তোলা যায়, যেখানে শিক্ষক একই সঙ্গে আধুনিক, দক্ষ, সৃজনশীল এবং মর্যাদাসম্পন্ন পেশাজীবী হিসেবে বিকশিত হতে পারেন? কেবল সমস্যা চিহ্নিত করলেই চলবে না; এর কার্যকর সমাধানের পথও নির্ধারণ করতে হবে। কারণ একজন শিক্ষকের বিকাশ মানেই একটি প্রজন্মের বিকাশ। তাই এই পরিবর্তনের দায় শুধু শিক্ষকের নয়; রাষ্ট্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সমাজ.. সবার। এ লক্ষ্য অর্জনে কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
প্রথমত, শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়নকে নতুনভাবে সাজাতে হবে। বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল শিক্ষণ-পদ্ধতি, গবেষণা, যোগাযোগ দক্ষতা, মানসিক স্বাস্থ্য এবং সৃজনশীল শ্রেণিকক্ষ পরিচালনার ওপর নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সহযোগিতা, মেন্টরশিপ এবং পারস্পরিক শেখার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। একজন শিক্ষকের ভালো উদ্যোগ যেন অন্য শিক্ষকের জন্য অনুপ্রেরণা হয়; নিরুৎসাহ বা ঈর্ষার কারণ নয়।
চতুর্থত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অযাচিত ট্রল, অপপ্রচার এবং সাইবার বুলিংয়ের ক্ষেত্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন এবং সমাজকে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অবশ্যই থাকবে, কিন্তু ব্যক্তিগত অপমান বা চরিত্রহনন কখনোই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অংশ হতে পারে না।
পঞ্চমত, শিক্ষা নীতির বাস্তবায়নে শিক্ষককে অংশীদার করতে হবে। নতুন কারিকুলাম, প্রযুক্তি ব্যবহার, মূল্যায়ন পদ্ধতি বা শিক্ষা সংস্কারের সিদ্ধান্তে মাঠপর্যায়ের শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা ও মতামতকে গুরুত্ব দিলে বাস্তবায়ন আরও কার্যকর হবে।
সবশেষে, শিক্ষকদের প্রতিও একটি প্রত্যাশা রয়েছে। সমাজ যখন তাদের সম্মান দেয়, তখন সেই সম্মানের প্রতিদানও তাদের দিতে হবে নিষ্ঠা, সততা, আজীবন শেখার মানসিকতা এবং পেশাগত নৈতিকতার মাধ্যমে। একজন শিক্ষককে প্রতিদিনই নিজেকে নতুন করে গড়তে হবে। কারণ তিনি শুধু পাঠদান করেন না; তিনি আগামী দিনের নাগরিক তৈরি করেন।
কারণ একজন শিক্ষককে মানুষ থাকতে দিলে তবেই তিনি মানুষ গড়তে পারবেন। একজন শিক্ষকের হাসি, তার সংস্কৃতিচর্চা, তার গবেষণা এবং তার মানবিক সত্তা তার শিক্ষকতাকে ছোট করে না; বরং তাকে আরও সমৃদ্ধ, আরও অনুপ্রেরণাদায়ী করে তোলে। আর এমন শিক্ষকই একটি আলোকিত জাতির সবচেয়ে বড় সম্পদ।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, কৃষি ও জলবায়ু গবেষক
আরও পড়ুন-

বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ জুলাই ২০২৬
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এখন একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব এবং দ্রুত পরিবর্তিত বৈশ্বিক কর্মবাজার; অন্যদিকে এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ, যারা হবে দক্ষ, সৃজনশীল, মানবিক এবং মূল্যবোধসম্পন্ন। এই বাস্তবতায় শিক্ষা নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু শুধু নতুন কারিকুলাম বা প্রযুক্তি নয়; বরং সেই মানুষটি, যিনি প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেন।
কারণ একটি শিক্ষা ব্যবস্থার প্রাণ কখনো প্রযুক্তি নয়; একজন শিক্ষক। একটি স্মার্ট বোর্ড, একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম কিংবা একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সফটওয়্যার শিক্ষার্থীর শেখাকে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু শেখার অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করতে পারে না। সেই অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করেন একজন চিন্তাশীল, সৃজনশীল, মানবিক এবং দায়িত্বশীল শিক্ষক। প্রযুক্তি শিক্ষকের বিকল্প নয়; বরং একজন দক্ষ শিক্ষকের হাতেই প্রযুক্তি শিক্ষাকে আরও কার্যকর, অংশগ্রহণমূলক এবং আনন্দময় করে তোলে।
এ কারণেই আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ও ইউনেস্কোর ‘রেকমেন্ডেইশন কনসার্নিং দ্য স্টেটাস অফ টিচার্স’ -এ শিক্ষকের পেশাগত মর্যাদা, ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ, উপযুক্ত কর্মপরিবেশ এবং পেশাগত স্বাধীনতাকে মানসম্মত শিক্ষার মৌলিক শর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কারণ আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, শিক্ষকের মানোন্নয়ন ছাড়া শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব নয়।
বাংলাদেশও শিক্ষা ব্যবস্থাকে সময়োপযোগী করার লক্ষ্যে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা, প্রযুক্তির ব্যবহার, গবেষণার প্রসার এবং শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক পাঠদানের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। কিন্তু শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন করলেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। যে মানুষটি প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে নতুন প্রজন্মকে গড়ে তোলেন, তার পেশাগত বিকাশ, সৃজনশীলতা, গবেষণার সুযোগ এবং মানসিক স্বাধীনতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের সমাজে এখনো অনেক সময় শিক্ষকের জ্ঞান, গবেষণা, পাঠদানের দক্ষতা কিংবা মানুষ গড়ার অবদানের চেয়ে তাঁর ব্যক্তিজীবনের শালীন প্রকাশ বেশি আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। আমরা চাই তিনি শিক্ষার্থীদের মুক্তচিন্তা শেখান, অথচ তার নিজের মুক্ত ও মানবিক প্রকাশকে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারি না। আমরা চাই তিনি সৃজনশীল প্রজন্ম গড়ে তুলুন, অথচ তার নিজের সৃজনশীলতাকে অনেক সময় সন্দেহের চোখে দেখি। এই বৈপরীত্য দূর না করলে আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার লক্ষ্যও পূর্ণতা পাবে না।
আজকের পৃথিবীতে একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার পদবি বা বয়স নয়; তার শেখার ক্ষমতা। যে শিক্ষক প্রতিনিয়ত নতুন জ্ঞান অর্জন করেন, প্রযুক্তিকে কাজে লাগান, গবেষণায় যুক্ত থাকেন, সংস্কৃতিচর্চা করেন এবং শিক্ষার্থীদের কৌতূহল জাগিয়ে তোলেন, তিনিই প্রকৃত আধুনিক শিক্ষক। কারণ শিক্ষার্থীরা শুধু বই থেকে শেখে না; তারা শেখে শিক্ষকের চিন্তা, আচরণ, মূল্যবোধ এবং জীবনদর্শন থেকেও।
এই কারণেই শিক্ষকের মানবিক সত্তা, সৃজনশীলতা এবং পেশাগত বিকাশকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। একজন শিক্ষক যত বেশি জ্ঞানচর্চা করবেন, সংস্কৃতিমনা হবেন, সময়ের সঙ্গে নিজেকে আপডেট রাখবেন এবং মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ হবেন, তার শ্রেণিকক্ষও তত বেশি প্রাণবন্ত, চিন্তাশীল ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক হয়ে উঠবে।
শিক্ষা কখনো কেবল তথ্যের আদান-প্রদান নয়; এটি মানুষ গড়ার একটি অবিরাম প্রক্রিয়া। আর মানুষ গড়ার এই কাজটি যিনি করেন, তিনি নিজেও একজন পূর্ণ মানুষ। তাই শিক্ষককে এমন একটি সত্তায় পরিণত করা উচিত নয়, যেখানে তার ব্যক্তিত্ব, অনুভূতি এবং সৃজনশীলতার কোনো স্থান থাকবে না।
আমাদের সমাজে এখনো একটি ভুল ধারণা রয়ে গেছে শিক্ষক মানেই তিনি সব সময় গম্ভীর থাকবেন, ব্যক্তিজীবনকে আড়ালে রাখবেন এবং কেবল শ্রেণিকক্ষেই সীমাবদ্ধ থাকবেন। কিন্তু একজন শিক্ষক যদি শালীনতা ও পেশাগত নৈতিকতা বজায় রেখে নিজের স্বাভাবিক জীবনযাপন করেন, সংস্কৃতিচর্চা করেন, বই পড়েন, গবেষণা করেন কিংবা প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করেন, তাহলে তা তার শিক্ষকতার পরিপন্থী নয়; বরং তাকে আরও সমৃদ্ধ করে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল শিক্ষা, ভার্চুয়াল ল্যাব, ওপেন এডুকেশনাল রিসোর্স এবং বৈশ্বিক জ্ঞানভাণ্ডার আজ শিক্ষকের হাতের নাগালে। এগুলোকে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই; বরং শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের জন্য এগুলোকে দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করতে হবে। যে শিক্ষক প্রযুক্তিকে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, সহযাত্রী হিসেবে গ্রহণ করবেন, তিনিই ভবিষ্যতের শ্রেণিকক্ষের নেতৃত্ব দেবেন।
একইভাবে, যে শিক্ষক বই পড়েন, গবেষণা করেন, নতুন ধারণা নিয়ে ভাবেন, শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করতে উৎসাহ দেন এবং সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রাখেন, তিনি কখনো পুরোনো হয়ে যান না। কারণ একজন শিক্ষক আজীবন শিক্ষার্থী; শেখা থেমে গেলে শিক্ষকতাও থেমে যায়।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন শিক্ষককে আমরা কেমন মানুষ হিসেবে দেখতে চাই? এমন একজন মানুষ, যিনি কেবল পাঠ্যবইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকবেন, নাকি এমন একজন, যিনি জীবনকে জানবেন, সমাজকে বুঝবেন এবং সংস্কৃতির আলোয় নিজেকে সমৃদ্ধ করবেন?
আমাদের মনে রাখতে হবে, শিক্ষকের বয়স নয় শিক্ষকের মনের বয়সই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যিনি প্রতিদিন নতুন কিছু শিখতে আগ্রহী, নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করেন, নতুন বই পড়েন, নতুন ধারণা নিয়ে ভাবেন এবং সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলে নেন, তিনিই প্রকৃত আধুনিক শিক্ষক। আর এমন শিক্ষকই শিক্ষার্থীদের শেখার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে পারেন। কারণ শিক্ষার্থীরা শুধু শিক্ষকের পাঠ নয়; তার কৌতূহল, উদ্যম ও জীবনবোধ থেকেও শিক্ষা গ্রহণ করে।
প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তন কীভাবে সম্ভব? কীভাবে এমন একটি শিক্ষা-পরিবেশ গড়ে তোলা যায়, যেখানে শিক্ষক একই সঙ্গে আধুনিক, দক্ষ, সৃজনশীল এবং মর্যাদাসম্পন্ন পেশাজীবী হিসেবে বিকশিত হতে পারেন? কেবল সমস্যা চিহ্নিত করলেই চলবে না; এর কার্যকর সমাধানের পথও নির্ধারণ করতে হবে। কারণ একজন শিক্ষকের বিকাশ মানেই একটি প্রজন্মের বিকাশ। তাই এই পরিবর্তনের দায় শুধু শিক্ষকের নয়; রাষ্ট্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সমাজ.. সবার। এ লক্ষ্য অর্জনে কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
প্রথমত, শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়নকে নতুনভাবে সাজাতে হবে। বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল শিক্ষণ-পদ্ধতি, গবেষণা, যোগাযোগ দক্ষতা, মানসিক স্বাস্থ্য এবং সৃজনশীল শ্রেণিকক্ষ পরিচালনার ওপর নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সহযোগিতা, মেন্টরশিপ এবং পারস্পরিক শেখার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। একজন শিক্ষকের ভালো উদ্যোগ যেন অন্য শিক্ষকের জন্য অনুপ্রেরণা হয়; নিরুৎসাহ বা ঈর্ষার কারণ নয়।
চতুর্থত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অযাচিত ট্রল, অপপ্রচার এবং সাইবার বুলিংয়ের ক্ষেত্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন এবং সমাজকে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অবশ্যই থাকবে, কিন্তু ব্যক্তিগত অপমান বা চরিত্রহনন কখনোই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অংশ হতে পারে না।
পঞ্চমত, শিক্ষা নীতির বাস্তবায়নে শিক্ষককে অংশীদার করতে হবে। নতুন কারিকুলাম, প্রযুক্তি ব্যবহার, মূল্যায়ন পদ্ধতি বা শিক্ষা সংস্কারের সিদ্ধান্তে মাঠপর্যায়ের শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা ও মতামতকে গুরুত্ব দিলে বাস্তবায়ন আরও কার্যকর হবে।
সবশেষে, শিক্ষকদের প্রতিও একটি প্রত্যাশা রয়েছে। সমাজ যখন তাদের সম্মান দেয়, তখন সেই সম্মানের প্রতিদানও তাদের দিতে হবে নিষ্ঠা, সততা, আজীবন শেখার মানসিকতা এবং পেশাগত নৈতিকতার মাধ্যমে। একজন শিক্ষককে প্রতিদিনই নিজেকে নতুন করে গড়তে হবে। কারণ তিনি শুধু পাঠদান করেন না; তিনি আগামী দিনের নাগরিক তৈরি করেন।
কারণ একজন শিক্ষককে মানুষ থাকতে দিলে তবেই তিনি মানুষ গড়তে পারবেন। একজন শিক্ষকের হাসি, তার সংস্কৃতিচর্চা, তার গবেষণা এবং তার মানবিক সত্তা তার শিক্ষকতাকে ছোট করে না; বরং তাকে আরও সমৃদ্ধ, আরও অনুপ্রেরণাদায়ী করে তোলে। আর এমন শিক্ষকই একটি আলোকিত জাতির সবচেয়ে বড় সম্পদ।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, কৃষি ও জলবায়ু গবেষক
আরও পড়ুন-

আপনার মতামত লিখুন