সংবাদ

গুপ্ত ধনের সন্ধানে!


আনোয়ারুল হক
আনোয়ারুল হক
প্রকাশ: ৪ আগস্ট ২০২৬, ০২:১৬ পিএম

গুপ্ত ধনের সন্ধানে!
আমাদের নতুন প্রজন্মের ফিকে হয়ে যাওয়া স্বপ্নকে আবার উজ্জ্বল করার জন্য দেশের বুকে যে অন্তর্নিহিত শক্তি রয়েছে তা পূনর্জীবিত করার রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তি কোথায়?

গুপ্তধন বলতে সাধারণত মাটির নিচে, সমুদ্রের গভীরে বা গোপন কোনো স্থানে লুকিয়ে থাকা মূল্যবান সম্পদকে বোঝায়। পৃথিবীতে এমন অনেক ধন-সম্পদ লুকিয়ে আছে যা আজও খুঁজে পাওয়া যায়নি। পুরোনো মন্দির, ডুবন্ত জাহাজ বা অজানা দ্বীপে এই ধরনের গুপ্তধন লুকিয়ে থাকার কথা শোনা যায়। সাহিত্য ও কল্পবিজ্ঞানেও এটি অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি বিষয়। বাংলা ভাষায় প্রধানত ফেলুদা ও ব্যোমকেশ বক্সী চরিত্র দু’টিকে নিয়েই সবচেয়ে জনপ্রিয় গোয়েন্দা কাহিনি ভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছিল। এর বাইরেও  ‘গুপ্তধনের সন্ধানে’, ‘গুপ্তধন কষ্টিপাথর’ এ ধরনের অ্যাডভেঞ্চার ও রহস্যধর্মী বিভিন্ন বাংলা নাটক ও সিনেমা রয়েছে। মুহম্মদ জাফর ইকবাল রচিত বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীতেও ভিন্নধর্মী রোমাঞ্চকর সব গল্প ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুপ্তধন বা গুপ্তধর্মী রাজনীতি যা জুলাই আন্দোলনের পূর্ব পর্যন্ত সুপ্ত অবস্থায় ছিলো তা প্রকৃতই বিষ্ময় সৃষ্টি করেছে। শুধু বাংলাদেশই নয় গোটা উপমহাদেশ জুড়েই চলছে সুপ্ত মনে গুপ্তধনের সন্ধান! আমাদের পাশের দেশ ভারত বর্ষের দিকে তাকালেও দেখা যায় সেই কবে থেকে সেখানে ‘গুপ্তধনের’ সন্ধান চলছে। গুপ্তধন সন্ধানের নামে তারা বাবরি মসজিদের নীচে ‘হিন্দু মন্দিরের স্থাপনা’ আবিষ্কার করলেন, মসজিদকে গুঁড়িয়ে দিলেন। গোটা ভারতবর্ষ জুড়ে হিন্দুত্ববাদের আস্ফালন শুরু হলো। চূড়ান্ত পর্বে এসে হিন্দুত্ববাদীরা এককালের বামপন্থী প্রভাবিত রাজ্য যা দখলে নিয়েছিলো মমতা ব্যনার্জীর তৃণমূল কংগ্রেস, তাদের ১৫ বছরের অপশাসনের জেরে সে রাজ্যপাট তুলে দিতে হলো ‘গুপ্তধনের’ সন্ধানে নিয়োজিত হিন্দুত্ববাদীদের হাতে। সেখানেও নির্বাচনের পরে গুপ্তধর্মী রাজনীতিবিদরা দলে দলে খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসে হিন্দুত্ববাদীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন।  পিছিয়ে পড়া বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠীর ভোটকে নিজপক্ষে এক রাখতে মমতা ব্যানার্জি সুযোগ পেলেই মুসলিমদের সুড়সুড়ি দেয়ার যে রাজনীতি করেছেন তাতে আপাত লাভ পেলেও শেষ পর্যন্ত বুমেরাং হয়েছে। তার এ ভূমিকায় কার্যত হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার পালে হাওয়া লেগেছে এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের বড় অংশ বিজেপির সাথে একাট্টা হয়েছে। বাংলাদেশেও আওয়ামী লীগের অপশাসন এবং তার প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল বিএনপিকে জবরদস্তিমূলকভাবে পার্লামেন্টারী রাজনীতির বাইরে রাখায় এখানেও উত্থান হয়েছে ইসলামী উগ্রবাদী সাম্প্রদায়িক ও বিভাজনের শক্তির। যে ধরনের অসুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশে মৌলবাদের উত্থান হয় তারই চাষাবাদ চলেছিল দীর্ঘ সময়ের আওয়ামী শাসনামলে।

লেখালেখির অভ্যাস না থাকলেও দু’বছর আগের রক্তাক্ত জুলাই মাসে যখন রক্তপাতের বিরুদ্ধে কলম তুলে নেই তখন কিছু শুভার্থী আমাকে ‘জুলাই কলামিস্ট’ হিসাবে উপহাস করতে থাকেন। তারা জুলাই আন্দোলনের ঘোর বিরোধী। তারা মনে করেন কোনো স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন নয় বরং দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে শেখ হাসিনার সরকারকে উৎখাত করা হয়েছে। আর এ ধারণা থেকেই ইদানীং কালের বহুল আলোচিত দুটি শব্দ ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’ সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তুলেছে। জুলাই আন্দোলনের আগে মেটিকুলাস ডিজাইন নিয়ে দেশের রাজনীতিতে কখনও এতো আলোচনা নজরে আসেনি। এমনকি আন্দোলনের দিনগুলোতেও এ আলোচনা তেমনটা হয় নি। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে বিজিত শক্তি ও তাদের সমর্থকদের দিক থেকে আমরা শুনে আসছি ‘সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও ছক মাফিক এক ষড়যন্ত্র মূলক ঘটনাবলীর মধ্য দিয়ে সরকার উৎখাত করা হয়েছে। তাদের উল্লেখিত এই ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’- কেই সংক্ষেপে বলা হচ্ছে মেটিকুলাসলি ডিজাইনড। আবার বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীক গুপ্তধর্মী রাজনীতি যা জুলাই আন্দোলনের পূর্ব পর্যন্ত সুপ্ত অবস্থায় ছিল,  আন্দোলনের সমাপ্তিকালে যে রূপে তার আবির্ভাব হলো তা ‘মেটিকুলাসলি ডিজাইনড’ তত্ত্বকে কিছতা হলেও প্রাসঙ্গিক করে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কিছু উক্তিও এ তত্ত্বের সারবত্তাকে কিছতা প্রতিষ্ঠিত করেছে।

জুলাই জাগরণের শুরুটা কিন্তু হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের অর্ধশতাব্দী পার হয়ে যাওয়ার পরেও চাকরি ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক মুক্তিযোদ্ধা কোটা প্রথা এবং তার রাজনৈতিক ব্যবহার নিয়ে। সাধারণ ছাত্র এবং চাকুরী প্রার্থীরা কোটা সংস্কারের দাবিতে ইতিপূর্বেও আন্দোলন করেছিলেন। ২০১৮ সালে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের ব্যাপক ক্ষোভ ও টানা বিক্ষোভের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে কোটা পদ্ধতি বাতিলের ঘোষণা দেন। কোটা সংস্কারের পথে না যেয়ে তিনি রাগান্বিত স্বরে এবং অভিমানের সুরে পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘কোটা নিয়ে যখন এত কথা, তখন সব কোটাই বাতিল করে দিলাম’। তখন আন্দোলন বন্ধ হলেও কার্যতঃ তিনি সমস্যা সমাধান না করে সমস্যা জিইয়ে রাখলেন। তার এ অভিমানী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা হলো বা করানো হলো।

২০২৪ সালে নিরপেক্ষ ব্যবস্থায় সংসদ নির্বাচনের দাবীতে দেশের বুকে গড়ে ওঠা বিশাল আন্দোলনকে দমন করে তিনি যখন তার মত করে নির্বাচন সম্পন্ন করতে সমর্থ হলেন, তখন মামলাটা দ্রুত নিষ্পত্তি করে রায় বের করার জন্য তোড়জোড় শুরু হলো। আদালত কোটা বাতিলের সরকারি সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করলে, নতুন করে আবার শুরু হ’ল আন্দোলন। আন্দোলনের শুরুতে শ্লোগান শুনলাম কোটা না মেধা - মেধা মেধা, বঙ্গবন্ধুর বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই, শেখ হাসিনার বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই - ইত্যাদি। তৎকালীন দুই ছাত্র সমন্বয়ক, বর্তমানে এনসিপির দুই সিপাহসালার ছাত্রলীগের সাথেই ছিলেন। সারজিস আলম ছাত্রলীগের হয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়ে হল সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে গনভবনে যেয়ে শেখ হাসিনার সাথে ফটোশুটে অংশ নিয়েছিলেন। হাসনাত আব্দুল্লাহ কোনো কমিটিতে না থাকলেও ফেসবুকে শেখ মুজিবের গুনগান করতেন। মুজিব শতবর্ষে বঙ্গবন্ধুর গুনগান করে তার লেখা ২০২০ সালের পত্রিকা ঘাঁটলেই পাওয়া যায়। আর ছাত্র শিবির নেতা এবং বর্তমান ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম সহ শিবিরের অনেকেই ছাত্র লীগের অভ্যন্তরে সুপ্ত বা গুপ্ত অবস্থায় ছিলেন। অবশ্য শেখ হাসিনার সরকার পরিবর্তনের পরে সাদিক কায়েম বললেন হাসিনার নামে জয়ধ্বনি দিতে ‘বাধ্য’ হয়েছি। অবশ্য কে কিভাবে তাকে বাধ্য করলেন তার বয়ান আমাদের জানা না থাকলেও জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ছাত্র লীগের অভ্যন্তরে থাকা সারজিস আলম, হাসনাত আব্দুল্লাহ, সাদিক কায়েম সহ অনেক ‘গুপ্তধনের’ সন্ধান আমরা পেয়েছি।

এই গুপ্ত বাহিনী যে ধরনের শ্লোগানই দিক না কেনো, যেহেতু কোটা বাতিলের সিদ্ধান্তটি  ছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ‘অভিমানী সিদ্ধান্ত’, তাই আদালতের রায়ের পর আন্দোলনকারীদের সমর্থন না করে, বরং আন্দোলনকে দমন করতে সরকার একের পর এক কঠোর পদক্ষেপ নিতে থাকে। এক পর্যায়ে ছাত্রলীগকেও লাঠিসোটা দিয়ে নামানো হয় আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে। আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্র লীগের হামলায় আহত ছাত্রীদের রক্তাক্ত ছবি সারাদেশের ছাত্র ছাত্রীদের আরও বিক্ষুব্ধ করে তোলে। আর রংপুরে দুহাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকা আবু সাঈদকে টার্গেট করে একটার পর একটা গুলি করে হত্যার দৃশ্য প্রচারিত হওয়ার পর ছাত্রদের প্রতিবাদী আন্দোলনে যেনো এক বাঁধ ভাঙা জোয়ারের সৃষ্টি হয়। আর তা রোধ করার ব্যর্থ চেষ্টা করতে যেয়ে গুলিবিদ্ধ ‘পানি ওয়ালা’ মুগ্ধ, রিক্সার পাদানিতে গুলিবিদ্ধ গোলাম নাফিজ, পিতার বুকে গুলিবিদ্ধ শিশুর ছবি — বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতার এক প্লাবন সৃষ্টি করে। বিনা ভোটে, নৈশ ভোটে ও ড্যামি ভোটে ক্ষমতা দখলে রাখতে পারলেও জনবিচ্ছিন্নতা এমন পর্যায়ে চলে গিয়েছিল যে, ক্ষমতাসীন সরকার এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়। দলের বিশাল কর্মীবাহিনীরও নৈতিক মনোবল সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। 

একদিকে গোটা দেশের সকল শহর এলাকায় আন্দোলনের ব্যাপকতা ও প্রায় প্রতিদিন শতাধিক তরুণের আত্মাহুতির মত পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর বন্দুকের নল ঘুরে যায় এবং পর্দার অন্তরালের খেলায়ও শেখ হাসিনা পরাভূত হন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা শেখ মুজিবের পরিবারকে নির্বংশ করার সেই পুরানো শক্তিও এই সুযোগে রাজনীতিতে ও স্টাবলিশমেন্টে শক্ত অবস্থান নেয়। এ পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনা দেশত্যাগের প্রস্তাব মেনে নিতে বাধ্য হন। একই সাথে ৫ আগস্টের পরেও রাজপথে থাকা আন্দোলনকারীদের বড়ো অংশেরই আওয়ামী বিরোধী রোষ এতো তীব্র ছিল যে উপরতলা থেকে একেবারে নিচুতলার নেতৃত্বও আপাতত দেশ ছেড়ে যাওয়া সবথেকে নিরাপদ মনে করেন। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনকালে বিরোধীরা যেমন আইনি সুরক্ষা পায় নি, তেমনি তারাও পাবেন না এবং প্রতিশোধ প্রতিহিংসার শিকার হবেন - এ বিবেচনা থেকে আওয়ামী লীগের নেতারা গনহারে দেশত্যাগ করেন।

সামরিক বেসামরিক স্টাবলিশমেন্ট ও রাজনৈতিক সমঝোতায় মুহাম্মদ ইউনূস একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের আগে সেনাসদরে সেনানেতৃত্বের বাছাইকৃত রাজনৈতিক নেতাদের সভায়, সেনাবাহিনী প্রধান সভার উপস্থিতিকে পরিচিত করাতে যেয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী জামায়াতে ইসলামের আমীরের নাম সর্বপ্রথম ঘোষণা করায় এবং একাধিকবার তা উচ্চারণ করায় সর্বসাধারণ অফিসিয়ালী সর্বপ্রথম ‘গুপ্তধনের’ সন্ধান পায়। স্বৈরাচার পতনে উচ্ছ্বাসিত সাধারণ মানুষ সেনাপ্রধানের এ আচরণে একটা ধাক্কা খেলেও মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেয়ায় আবার কিছুটা আশ্বস্তও হয়। নোবেলজয়ী  ইউনূস পশ্চিমা দুনিয়ার সমর্থনপুষ্ট হলেও সাধারণভাবে মানুষের মাঝে ‘উদার গণতন্ত্রী, অসাম্প্রদায়িক ও নারী ক্ষমতায়নে বিশ্বাসী’ একজন সমাজ সংস্কারক হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেছিলেন।

শেখ হাসিনার সাথে তার সম্পর্ক সাপে নেউলে হলেও আওয়ামী লীগের অনেকেই ইউনূসকে প্রতিদ্বন্দ্বী বানানোটা সমর্থন করতেন না এবং তার প্রতি নমনীয় ছিলেন। পেশাগত প্রয়োজনে ২০২২- ২৩ সালে আমার একজন প্রবীণ আওয়ামী লীগার ও জাতীয় সংসদ সদস্যের ড্রইংরুমে যাতায়াত ছিলো। আমি অবাক হয়ে দেখতাম একজন সিটিং এমপির ড্রইংরুমে একটিমাত্র ছবি শোভা পেত এবং সেটা তার সঙ্গে ইউনূসের ছবি। অনেক বিষয়েই বিশেষত অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন না করায় নেতৃত্বের প্রতি তার ক্ষোভ ছিল। তিনি আমাকে বলতেন তার মতালম্বী অনেকেই আওয়ামী লীগে আছেন।

ইউনূসের সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয় না থাকলেও তার দুই ভাইকে চিনতাম। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্র হওয়ায় পরিচিত ছিলেন এবং তাকে একজন অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিবাদী মানুষ হিসেবেই দেখেছি। অপর একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তার সাথে সরাসরি কথা না হলেও দূর থেকেই দেখতাম জানতাম। তিনি বিজ্ঞান আন্দোলনে প্রগতিশীল শিশু কিশোর সংগঠন খেলাঘরের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন। ইউনূস বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে প্রবাসে থাকাকালীন মুক্তিযুদ্ধের সাথে সংহতি সমাবেশগুলোতে  যোগ দিতেন। তার প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে যত বিতর্ক ও সমালোচনা হোক না কেন তারপরেও এটাই সত্য আশির দশক জুড়ে গ্রামীণ ব্যাংক নারী ক্ষমতায়নে অসামান্য অবদান রেখেছে। জামায়াত ইসলামসহ ধর্মীয় উগ্রবাদীরা গ্রামীণ ব্যাংক কার্যক্রমের বিরোধী ছিলো। তাই সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পরে এক অস্থির ও অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে ইউনূস দেশের রক্ষনশীল অংশের মানুষের পাশাপাশি প্রাথমিকভাবে অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিবাদীদেরও সমর্থন পেয়েছেন। তবে দেশের অভ্যন্তরে একটা কথা প্রচলিত ছিলো যে, একমাত্র শেখ হাসিনাই ইউনূসকে ঠিকমতো চিনেছিলেন। 

আর আমরা তার শাসনামল দেখে তাকে নতুন করে জানলাম, চিনলাম। তিনিই প্রকৃত ‘গুপ্তধন’ যিনি জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আবির্ভূত হলেন এক নতুন বেশে, নতুন রূপে। নিশ্চয়ই শেখ হাসিনা তার প্রতি সুবিচার করেননি। কিন্তু ব্যক্তিজীবনে অসাম্প্রদায়িক ও একজন নোবেল জয়ী মানুষ শুধুমাত্র একজনের প্রতি প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে দেশের জন্মযুদ্ধ বিরোধী সাম্প্রদায়িক শক্তির সাথে মিলিত হয়ে দেশের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিলেন! এমনকি বাংলাদেশের ইতিহাসের সাথে যেহেতু আওয়ামী লীগ, শেখ মুজিব, মুক্তিযুদ্ধ মিশে আছে তাই দেশের ইতিহাসকেই তিনি পাল্টে দিতে চাইলেন। জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এবং তারই পৃষ্টপোষকতায় যে তরুণ নেতৃত্বের আবির্ভাব হলো ইতিহাস মুছে ফেলার আকাঙ্ক্ষা থেকে তাদের বিকাশের সম্ভাবনাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়ে তিনি তাদেরকে ঠেলে দিলেন মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী জামায়াতে ইসলামের কোলে। জুলাই আন্দোলনের তরুণ নেতৃত্বের বড় অংশটি তার পৃষ্ঠপোষকতায় ক্ষমতা, বিলাসিতা,উগ্রতা ও প্রতিহিংসার পথ বেছে নিলেন। শেখ হাসিনা আমলের ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দের চেয়েও নিম্নমানের কিছু যে থাকতে পারে, এদের কাউকে কাউকে না দেখলে আমরা বিশ্বাসই করতাম না! জুলাই আন্দোলনের পরবর্তী দিনগুলোতে যখন মব উল্লম্ফনের সংস্কৃতি আবির্ভূত হলো, মুক্তিযুদ্ধের স্মারক, ভাস্কর্য এবং ৩২নং এর ঐতিহাসিক বাড়িটি ভেঙে ফেলা হলো, তখন অনেকেই এসব  ঘটনাকে মনে করেছিলেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দূর্বল অন্তর্বর্তী সরকারের অক্ষমতা হিসেবে। কিন্তু পরবর্তীতে এটা পরিষ্কার হতে থাকে ইউনূস ইতিহাসের নতুন নায়ক হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে এবং দূর ভবিষ্যতেও আওয়ামী প্রত্যাবর্তন রুখে দিতে পুরনো ইতিহাস সবটাই মুছে ফেলতে চান। তাই অনেকটা অন্তর্বর্তী সরকার প্রধানের মৌন সমর্থনেই চলেছিল ইতিহাস মুছে ফেলার উগ্রবাদী মব উল্লম্ফন ও ধংসাত্মক অভিযান। ক্রোধ, প্রতিহিংসা ও ঘৃণার সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিয়ে নারী স্বাধীনতার বিরুদ্ধে, মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে, বাঙালির শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মুক্তচিন্তার বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করা হলো। আবার এ ধরনের অনেক কার্যক্রমকে শুধু ইনডেমনিটি দিয়েই  ইউনূস স্বস্তিতে ছিলেন না, পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হতে বানিজ্য চুক্তির নামে দেশটাই তুলে দিলেন বিশ্ব মোড়লের হাতে। অন্তর্বর্তী সরকার প্রধানই হয়ে উঠলেন উগ্রবাদীদের ‘গুপ্ত ধন’। আর ‘ক্ষমতা মানুষের আসল রূপটি প্রকাশ করে’ উর্দু সাহিত্যিক সাদাত হাসান মান্টোর এ উক্তিটির সত্যতাকেও ইউনূস গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত করলেন।

দীর্ঘ সময়কাল ক্ষমতায় থাকার গভীর আকাঙ্ক্ষা থাকলেও অন্তর্বর্তী সরকার হিসেবে নিরপেক্ষ ভূমিকা গ্রহণ করতে না পারায় ইউনূসের জনপ্রিয়তা দ্রুত হ্রাস পায়। অন্যদিকে রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থতা এবং বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে তিনি লন্ডন বৈঠক করতে ও নির্বাচন দিতে বাধ্য হন। নিজ পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে তোলা দলের নির্বাচনী রাজনীতিতে বিশেষ সম্ভাবনা না থাকায় তাদেরকে জুড়ে দেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী রাজনৈতিক দল ও শক্তি সমূহের সঙ্গে। কথিত আছে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার স্বার্থে কিছু আসনে  ইউনূস সমর্থিত তরুণদের দল এমনকি জামাতেরও কয়েকটি আসনে বিএনপিকে পরাজয় মেনে নিতে হয়। বিএনপির এই নমনীয়তা ও আপোষকামীতার সুযোগে বিএনপি সরকারকেও অন্তর্বর্তী সরকারের বর্ধিত সংস্করণ হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা খুবই জোরালোভাবে ক্রিয়াশীল। সরকারি বিভিন্ন সিদ্ধান্তেও তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।

গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য যে ধরনের শক্তি — তথা সামাজিক, রাজনৈতিক, মতাদর্শিক শক্তি দরকার — সেই শক্তি তো বাংলাদেশে খুবই দুর্বল। তার ফলে সরকার পতন হলে নতুন আর একটা বিপদের মধ্যে দেশ পড়ে যেতে পারে - এই আশঙ্কা তো ছিলই । জুলাই আন্দোলনে নির্বিচার হত্যা যজ্ঞের বিরুদ্ধে যেসকল উদার গণতন্ত্রী ও বামপন্থার সমর্থকরা রুখে দাঁড়িয়েছিলেন তাদের উদ্দেশে আওয়ামী লীগে সংগঠিত নয় তবে আওয়ামী সমর্থক এমন অনেকেই বলা শুরু করলেন, ‘এই তো আপনাদের জন্য এরকম হলো। আগেই তো জানা ছিল এটা কার হাতে যাবে।’ অথচ এই কথাটা যারা বলেন তারা যদি নিজেরা মনে করতেন যে আওয়ামী লীগের শাসন থাকা দরকার, তাহলে তো আওয়ামী লীগের অপকর্ম কিংবা লুণ্ঠন, দুর্নীতি, স্বৈরতন্ত্র -- এগুলোর বিরুদ্ধে তাদেরই আগ বাড়িয়ে মুখ খোলা উচিত ছিল। আওয়ামী লীগকে চাপে রাখা দরকার ছিলো। তাতো তারা করেননি। আবার সরকার পতনের পর আওয়ামী লীগের ‘শবযাত্রায়’ও তারা শামিল হননি। সোশ্যাল মিডিয়ায় এক নাগাড়ে তারা গেয়ে চলেছেন ‘ আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’! বামপন্থী রাজনীতিতে ‘বিলোপবাদ’ নামে তত্বের কথা জানা ছিল। এখন এক নতুন তত্ত্বের আবিষ্কার আমাদের সমাজে দেখতে পাচ্ছি যাকে বলা যেতেপারে ‘বিলাপবাদ’। যার মূল সুর আওয়ামী লীগ সরকার পতনে বিলাপ।

বিলাপ করে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটানো যাবেনা। আবার সোশ্যাল মিডিয়ায় হুমকি ধামকি দিয়েও গ্রহনযোগ্যতা সৃষ্টি হবে না। এ কথা ঠিক দেশে বর্তমানে যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তাতে করে রাজনৈতিক অংগনে আওয়ামী লীগের বা জনসমর্থনপুষ্ট ভিন্ন কোনো সামাজিক গণতন্ত্রী দলের উপস্থিতি থাকলে সাম্প্রদায়িক ধর্মান্ধ শক্তির উগ্র মূর্তিকে নিয়ন্ত্রনে রেখে কিছতা ইতিবাচক রাজনৈতিক ভারসাম্য সৃষ্টি হতে পারতো। তবে আওয়ামী লীগের উপস্থিতির কলাকৌশল, আইনি লড়াই, জনমত গঠন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকেই করতে হবে, সেজন্য তারা কতটুকু প্রস্তুত স্পষ্ট নয়। আত্মসমালোচনা না করে শুধু ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ফেরী করে ভবিষ্যতের পথ রচনায় কোনো ইতিবাচক ভূমিকা রাখা যাবে বলে মনে হয় না। আওয়ামী লীগ সমর্থকেরা কিভাবে অস্বীকার করবেন যে, দীর্ঘ দিনের স্বৈরাচারী ও কতৃত্ববাদী শাসন এবং অবাধ লুন্ঠনের রাজত্ব কায়েম করায় তাদের কথিত ষড়যন্ত্রের ভ্রুণ আওয়ামী লীগের জঠরেই সৃষ্টি হয়েছিল। বাংলাদেশের ইতিহাসের নানা পর্বে আওয়ামী লীগের যেমন রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস তেমনি এক দীর্ঘ সময় অপশাসন আর দুঃশাসনের ফলশ্রুতিতে ‘৭১ এর পরাজিত ধর্মান্ধ শক্তিকে ক্ষমতার মসনদের অংশীদার বা ক্ষমতার কাছাকাছি আনার কলঙ্কের ইতিহাসও তারা সৃষ্টি করেছেন। তাই কেবল এক উজ্জ্বল অতীতের দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে অথবা হুমকি ধামকির মনস্টার ইমেজ নিয়ে বিরাজমান বাস্তবতাকে মোকাবেলা করা যাবে না।

সবার জন্য বাসযোগ্য একটি বাংলাদেশের জন্য কি আমাদের নতুন কোনো গুপ্তধনের সন্ধানে নামতে হবে? বাংলাদেশ নামক দেশটার অভ্যন্তরেই রয়েছে এক অন্তর্নিহিত শক্তি। ‘৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ‘৬৯ -এর গন অভ্যুত্থান এবং ‘৭১ এর মুক্তি যুদ্ধ এ দেশটির মাঝে এক অন্তর্নিহিত শক্তি সৃষ্টি করে দিয়েছে। সেই শক্তি ১৯৯০ -এ স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটিয়েছে। ভুল নেতৃত্বের হাতে পড়লেও সেই অন্তর্নিহিত শক্তিই তারুণ্যের বাঁধভাংগা জোয়ারে জুলাই’২৪  জাগরণ সৃষ্টি করেছে এবং আমাদের সামনে এক নতুন প্রজন্মকে হাজির করেছে, যাদের চিন্তাভাবনা ও মনোজগৎ আমাদের অনেকেরই জানা-বোঝার বাইরে। জুলাইয়ের তারুণ্য যে বৈশিষ্ট্য নিয়ে হাজির হয়েছিলো, সেখানে সুস্পষ্টভাবে বৈষম্যমুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক এক সমাজের স্বপ্ন এঁকেছিল তারা। যে নেতৃত্বের পিছনে এ স্বপ্ন নিয়ে তারা শামিল হয়েছিলো সে নেতৃত্ব ভিন্ন পথে, বিভাজনের পথে অগ্রসর হওয়ায় এবং শেষ পর্যন্ত ধর্মীয় উগ্রবাদীদের কোলে আশ্রয় নেওয়ায় তাদের স্বপ্ন ফিকে হয়ে গেছে। জুলাই আন্দোলনের দুই বছর পূর্তিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মলিন হয়ে পড়া গ্রাফিতি সমূহ আবার উজ্জ্বল করার কাজ চলছে। কিন্তু আমাদের নতুন প্রজন্মের ফিকে হয়ে যাওয়া স্বপ্নকে আবার উজ্জ্বল করার জন্য দেশের বুকে যে অন্তর্নিহিত শক্তি রয়েছে তা পূনর্জীবিত করার রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তি কোথায়?

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬


গুপ্ত ধনের সন্ধানে!

প্রকাশের তারিখ : ০৪ আগস্ট ২০২৬

featured Image

গুপ্তধন বলতে সাধারণত মাটির নিচে, সমুদ্রের গভীরে বা গোপন কোনো স্থানে লুকিয়ে থাকা মূল্যবান সম্পদকে বোঝায়। পৃথিবীতে এমন অনেক ধন-সম্পদ লুকিয়ে আছে যা আজও খুঁজে পাওয়া যায়নি। পুরোনো মন্দির, ডুবন্ত জাহাজ বা অজানা দ্বীপে এই ধরনের গুপ্তধন লুকিয়ে থাকার কথা শোনা যায়। সাহিত্য ও কল্পবিজ্ঞানেও এটি অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি বিষয়। বাংলা ভাষায় প্রধানত ফেলুদা ও ব্যোমকেশ বক্সী চরিত্র দু’টিকে নিয়েই সবচেয়ে জনপ্রিয় গোয়েন্দা কাহিনি ভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছিল। এর বাইরেও  ‘গুপ্তধনের সন্ধানে’, ‘গুপ্তধন কষ্টিপাথর’ এ ধরনের অ্যাডভেঞ্চার ও রহস্যধর্মী বিভিন্ন বাংলা নাটক ও সিনেমা রয়েছে। মুহম্মদ জাফর ইকবাল রচিত বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীতেও ভিন্নধর্মী রোমাঞ্চকর সব গল্প ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।


তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুপ্তধন বা গুপ্তধর্মী রাজনীতি যা জুলাই আন্দোলনের পূর্ব পর্যন্ত সুপ্ত অবস্থায় ছিলো তা প্রকৃতই বিষ্ময় সৃষ্টি করেছে। শুধু বাংলাদেশই নয় গোটা উপমহাদেশ জুড়েই চলছে সুপ্ত মনে গুপ্তধনের সন্ধান! আমাদের পাশের দেশ ভারত বর্ষের দিকে তাকালেও দেখা যায় সেই কবে থেকে সেখানে ‘গুপ্তধনের’ সন্ধান চলছে। গুপ্তধন সন্ধানের নামে তারা বাবরি মসজিদের নীচে ‘হিন্দু মন্দিরের স্থাপনা’ আবিষ্কার করলেন, মসজিদকে গুঁড়িয়ে দিলেন। গোটা ভারতবর্ষ জুড়ে হিন্দুত্ববাদের আস্ফালন শুরু হলো। চূড়ান্ত পর্বে এসে হিন্দুত্ববাদীরা এককালের বামপন্থী প্রভাবিত রাজ্য যা দখলে নিয়েছিলো মমতা ব্যনার্জীর তৃণমূল কংগ্রেস, তাদের ১৫ বছরের অপশাসনের জেরে সে রাজ্যপাট তুলে দিতে হলো ‘গুপ্তধনের’ সন্ধানে নিয়োজিত হিন্দুত্ববাদীদের হাতে। সেখানেও নির্বাচনের পরে গুপ্তধর্মী রাজনীতিবিদরা দলে দলে খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসে হিন্দুত্ববাদীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন।  পিছিয়ে পড়া বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠীর ভোটকে নিজপক্ষে এক রাখতে মমতা ব্যানার্জি সুযোগ পেলেই মুসলিমদের সুড়সুড়ি দেয়ার যে রাজনীতি করেছেন তাতে আপাত লাভ পেলেও শেষ পর্যন্ত বুমেরাং হয়েছে। তার এ ভূমিকায় কার্যত হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার পালে হাওয়া লেগেছে এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের বড় অংশ বিজেপির সাথে একাট্টা হয়েছে। বাংলাদেশেও আওয়ামী লীগের অপশাসন এবং তার প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল বিএনপিকে জবরদস্তিমূলকভাবে পার্লামেন্টারী রাজনীতির বাইরে রাখায় এখানেও উত্থান হয়েছে ইসলামী উগ্রবাদী সাম্প্রদায়িক ও বিভাজনের শক্তির। যে ধরনের অসুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশে মৌলবাদের উত্থান হয় তারই চাষাবাদ চলেছিল দীর্ঘ সময়ের আওয়ামী শাসনামলে।


লেখালেখির অভ্যাস না থাকলেও দু’বছর আগের রক্তাক্ত জুলাই মাসে যখন রক্তপাতের বিরুদ্ধে কলম তুলে নেই তখন কিছু শুভার্থী আমাকে ‘জুলাই কলামিস্ট’ হিসাবে উপহাস করতে থাকেন। তারা জুলাই আন্দোলনের ঘোর বিরোধী। তারা মনে করেন কোনো স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন নয় বরং দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে শেখ হাসিনার সরকারকে উৎখাত করা হয়েছে। আর এ ধারণা থেকেই ইদানীং কালের বহুল আলোচিত দুটি শব্দ ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’ সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তুলেছে। জুলাই আন্দোলনের আগে মেটিকুলাস ডিজাইন নিয়ে দেশের রাজনীতিতে কখনও এতো আলোচনা নজরে আসেনি। এমনকি আন্দোলনের দিনগুলোতেও এ আলোচনা তেমনটা হয় নি। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে বিজিত শক্তি ও তাদের সমর্থকদের দিক থেকে আমরা শুনে আসছি ‘সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও ছক মাফিক এক ষড়যন্ত্র মূলক ঘটনাবলীর মধ্য দিয়ে সরকার উৎখাত করা হয়েছে। তাদের উল্লেখিত এই ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’- কেই সংক্ষেপে বলা হচ্ছে মেটিকুলাসলি ডিজাইনড। আবার বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীক গুপ্তধর্মী রাজনীতি যা জুলাই আন্দোলনের পূর্ব পর্যন্ত সুপ্ত অবস্থায় ছিল,  আন্দোলনের সমাপ্তিকালে যে রূপে তার আবির্ভাব হলো তা ‘মেটিকুলাসলি ডিজাইনড’ তত্ত্বকে কিছতা হলেও প্রাসঙ্গিক করে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কিছু উক্তিও এ তত্ত্বের সারবত্তাকে কিছতা প্রতিষ্ঠিত করেছে।


জুলাই জাগরণের শুরুটা কিন্তু হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের অর্ধশতাব্দী পার হয়ে যাওয়ার পরেও চাকরি ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক মুক্তিযোদ্ধা কোটা প্রথা এবং তার রাজনৈতিক ব্যবহার নিয়ে। সাধারণ ছাত্র এবং চাকুরী প্রার্থীরা কোটা সংস্কারের দাবিতে ইতিপূর্বেও আন্দোলন করেছিলেন। ২০১৮ সালে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের ব্যাপক ক্ষোভ ও টানা বিক্ষোভের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে কোটা পদ্ধতি বাতিলের ঘোষণা দেন। কোটা সংস্কারের পথে না যেয়ে তিনি রাগান্বিত স্বরে এবং অভিমানের সুরে পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘কোটা নিয়ে যখন এত কথা, তখন সব কোটাই বাতিল করে দিলাম’। তখন আন্দোলন বন্ধ হলেও কার্যতঃ তিনি সমস্যা সমাধান না করে সমস্যা জিইয়ে রাখলেন। তার এ অভিমানী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা হলো বা করানো হলো।


২০২৪ সালে নিরপেক্ষ ব্যবস্থায় সংসদ নির্বাচনের দাবীতে দেশের বুকে গড়ে ওঠা বিশাল আন্দোলনকে দমন করে তিনি যখন তার মত করে নির্বাচন সম্পন্ন করতে সমর্থ হলেন, তখন মামলাটা দ্রুত নিষ্পত্তি করে রায় বের করার জন্য তোড়জোড় শুরু হলো। আদালত কোটা বাতিলের সরকারি সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করলে, নতুন করে আবার শুরু হ’ল আন্দোলন। আন্দোলনের শুরুতে শ্লোগান শুনলাম কোটা না মেধা - মেধা মেধা, বঙ্গবন্ধুর বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই, শেখ হাসিনার বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই - ইত্যাদি। তৎকালীন দুই ছাত্র সমন্বয়ক, বর্তমানে এনসিপির দুই সিপাহসালার ছাত্রলীগের সাথেই ছিলেন। সারজিস আলম ছাত্রলীগের হয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়ে হল সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে গনভবনে যেয়ে শেখ হাসিনার সাথে ফটোশুটে অংশ নিয়েছিলেন। হাসনাত আব্দুল্লাহ কোনো কমিটিতে না থাকলেও ফেসবুকে শেখ মুজিবের গুনগান করতেন। মুজিব শতবর্ষে বঙ্গবন্ধুর গুনগান করে তার লেখা ২০২০ সালের পত্রিকা ঘাঁটলেই পাওয়া যায়। আর ছাত্র শিবির নেতা এবং বর্তমান ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম সহ শিবিরের অনেকেই ছাত্র লীগের অভ্যন্তরে সুপ্ত বা গুপ্ত অবস্থায় ছিলেন। অবশ্য শেখ হাসিনার সরকার পরিবর্তনের পরে সাদিক কায়েম বললেন হাসিনার নামে জয়ধ্বনি দিতে ‘বাধ্য’ হয়েছি। অবশ্য কে কিভাবে তাকে বাধ্য করলেন তার বয়ান আমাদের জানা না থাকলেও জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ছাত্র লীগের অভ্যন্তরে থাকা সারজিস আলম, হাসনাত আব্দুল্লাহ, সাদিক কায়েম সহ অনেক ‘গুপ্তধনের’ সন্ধান আমরা পেয়েছি।


এই গুপ্ত বাহিনী যে ধরনের শ্লোগানই দিক না কেনো, যেহেতু কোটা বাতিলের সিদ্ধান্তটি  ছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ‘অভিমানী সিদ্ধান্ত’, তাই আদালতের রায়ের পর আন্দোলনকারীদের সমর্থন না করে, বরং আন্দোলনকে দমন করতে সরকার একের পর এক কঠোর পদক্ষেপ নিতে থাকে। এক পর্যায়ে ছাত্রলীগকেও লাঠিসোটা দিয়ে নামানো হয় আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে। আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্র লীগের হামলায় আহত ছাত্রীদের রক্তাক্ত ছবি সারাদেশের ছাত্র ছাত্রীদের আরও বিক্ষুব্ধ করে তোলে। আর রংপুরে দুহাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকা আবু সাঈদকে টার্গেট করে একটার পর একটা গুলি করে হত্যার দৃশ্য প্রচারিত হওয়ার পর ছাত্রদের প্রতিবাদী আন্দোলনে যেনো এক বাঁধ ভাঙা জোয়ারের সৃষ্টি হয়। আর তা রোধ করার ব্যর্থ চেষ্টা করতে যেয়ে গুলিবিদ্ধ ‘পানি ওয়ালা’ মুগ্ধ, রিক্সার পাদানিতে গুলিবিদ্ধ গোলাম নাফিজ, পিতার বুকে গুলিবিদ্ধ শিশুর ছবি — বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতার এক প্লাবন সৃষ্টি করে। বিনা ভোটে, নৈশ ভোটে ও ড্যামি ভোটে ক্ষমতা দখলে রাখতে পারলেও জনবিচ্ছিন্নতা এমন পর্যায়ে চলে গিয়েছিল যে, ক্ষমতাসীন সরকার এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়। দলের বিশাল কর্মীবাহিনীরও নৈতিক মনোবল সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। 


একদিকে গোটা দেশের সকল শহর এলাকায় আন্দোলনের ব্যাপকতা ও প্রায় প্রতিদিন শতাধিক তরুণের আত্মাহুতির মত পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর বন্দুকের নল ঘুরে যায় এবং পর্দার অন্তরালের খেলায়ও শেখ হাসিনা পরাভূত হন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা শেখ মুজিবের পরিবারকে নির্বংশ করার সেই পুরানো শক্তিও এই সুযোগে রাজনীতিতে ও স্টাবলিশমেন্টে শক্ত অবস্থান নেয়। এ পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনা দেশত্যাগের প্রস্তাব মেনে নিতে বাধ্য হন। একই সাথে ৫ আগস্টের পরেও রাজপথে থাকা আন্দোলনকারীদের বড়ো অংশেরই আওয়ামী বিরোধী রোষ এতো তীব্র ছিল যে উপরতলা থেকে একেবারে নিচুতলার নেতৃত্বও আপাতত দেশ ছেড়ে যাওয়া সবথেকে নিরাপদ মনে করেন। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনকালে বিরোধীরা যেমন আইনি সুরক্ষা পায় নি, তেমনি তারাও পাবেন না এবং প্রতিশোধ প্রতিহিংসার শিকার হবেন - এ বিবেচনা থেকে আওয়ামী লীগের নেতারা গনহারে দেশত্যাগ করেন।


সামরিক বেসামরিক স্টাবলিশমেন্ট ও রাজনৈতিক সমঝোতায় মুহাম্মদ ইউনূস একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের আগে সেনাসদরে সেনানেতৃত্বের বাছাইকৃত রাজনৈতিক নেতাদের সভায়, সেনাবাহিনী প্রধান সভার উপস্থিতিকে পরিচিত করাতে যেয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী জামায়াতে ইসলামের আমীরের নাম সর্বপ্রথম ঘোষণা করায় এবং একাধিকবার তা উচ্চারণ করায় সর্বসাধারণ অফিসিয়ালী সর্বপ্রথম ‘গুপ্তধনের’ সন্ধান পায়। স্বৈরাচার পতনে উচ্ছ্বাসিত সাধারণ মানুষ সেনাপ্রধানের এ আচরণে একটা ধাক্কা খেলেও মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেয়ায় আবার কিছুটা আশ্বস্তও হয়। নোবেলজয়ী  ইউনূস পশ্চিমা দুনিয়ার সমর্থনপুষ্ট হলেও সাধারণভাবে মানুষের মাঝে ‘উদার গণতন্ত্রী, অসাম্প্রদায়িক ও নারী ক্ষমতায়নে বিশ্বাসী’ একজন সমাজ সংস্কারক হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেছিলেন।


শেখ হাসিনার সাথে তার সম্পর্ক সাপে নেউলে হলেও আওয়ামী লীগের অনেকেই ইউনূসকে প্রতিদ্বন্দ্বী বানানোটা সমর্থন করতেন না এবং তার প্রতি নমনীয় ছিলেন। পেশাগত প্রয়োজনে ২০২২- ২৩ সালে আমার একজন প্রবীণ আওয়ামী লীগার ও জাতীয় সংসদ সদস্যের ড্রইংরুমে যাতায়াত ছিলো। আমি অবাক হয়ে দেখতাম একজন সিটিং এমপির ড্রইংরুমে একটিমাত্র ছবি শোভা পেত এবং সেটা তার সঙ্গে ইউনূসের ছবি। অনেক বিষয়েই বিশেষত অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন না করায় নেতৃত্বের প্রতি তার ক্ষোভ ছিল। তিনি আমাকে বলতেন তার মতালম্বী অনেকেই আওয়ামী লীগে আছেন।


ইউনূসের সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয় না থাকলেও তার দুই ভাইকে চিনতাম। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্র হওয়ায় পরিচিত ছিলেন এবং তাকে একজন অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিবাদী মানুষ হিসেবেই দেখেছি। অপর একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তার সাথে সরাসরি কথা না হলেও দূর থেকেই দেখতাম জানতাম। তিনি বিজ্ঞান আন্দোলনে প্রগতিশীল শিশু কিশোর সংগঠন খেলাঘরের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন। ইউনূস বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে প্রবাসে থাকাকালীন মুক্তিযুদ্ধের সাথে সংহতি সমাবেশগুলোতে  যোগ দিতেন। তার প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে যত বিতর্ক ও সমালোচনা হোক না কেন তারপরেও এটাই সত্য আশির দশক জুড়ে গ্রামীণ ব্যাংক নারী ক্ষমতায়নে অসামান্য অবদান রেখেছে। জামায়াত ইসলামসহ ধর্মীয় উগ্রবাদীরা গ্রামীণ ব্যাংক কার্যক্রমের বিরোধী ছিলো। তাই সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পরে এক অস্থির ও অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে ইউনূস দেশের রক্ষনশীল অংশের মানুষের পাশাপাশি প্রাথমিকভাবে অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিবাদীদেরও সমর্থন পেয়েছেন। তবে দেশের অভ্যন্তরে একটা কথা প্রচলিত ছিলো যে, একমাত্র শেখ হাসিনাই ইউনূসকে ঠিকমতো চিনেছিলেন। 


আর আমরা তার শাসনামল দেখে তাকে নতুন করে জানলাম, চিনলাম। তিনিই প্রকৃত ‘গুপ্তধন’ যিনি জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আবির্ভূত হলেন এক নতুন বেশে, নতুন রূপে। নিশ্চয়ই শেখ হাসিনা তার প্রতি সুবিচার করেননি। কিন্তু ব্যক্তিজীবনে অসাম্প্রদায়িক ও একজন নোবেল জয়ী মানুষ শুধুমাত্র একজনের প্রতি প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে দেশের জন্মযুদ্ধ বিরোধী সাম্প্রদায়িক শক্তির সাথে মিলিত হয়ে দেশের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিলেন! এমনকি বাংলাদেশের ইতিহাসের সাথে যেহেতু আওয়ামী লীগ, শেখ মুজিব, মুক্তিযুদ্ধ মিশে আছে তাই দেশের ইতিহাসকেই তিনি পাল্টে দিতে চাইলেন। জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এবং তারই পৃষ্টপোষকতায় যে তরুণ নেতৃত্বের আবির্ভাব হলো ইতিহাস মুছে ফেলার আকাঙ্ক্ষা থেকে তাদের বিকাশের সম্ভাবনাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়ে তিনি তাদেরকে ঠেলে দিলেন মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী জামায়াতে ইসলামের কোলে। জুলাই আন্দোলনের তরুণ নেতৃত্বের বড় অংশটি তার পৃষ্ঠপোষকতায় ক্ষমতা, বিলাসিতা,উগ্রতা ও প্রতিহিংসার পথ বেছে নিলেন। শেখ হাসিনা আমলের ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দের চেয়েও নিম্নমানের কিছু যে থাকতে পারে, এদের কাউকে কাউকে না দেখলে আমরা বিশ্বাসই করতাম না! জুলাই আন্দোলনের পরবর্তী দিনগুলোতে যখন মব উল্লম্ফনের সংস্কৃতি আবির্ভূত হলো, মুক্তিযুদ্ধের স্মারক, ভাস্কর্য এবং ৩২নং এর ঐতিহাসিক বাড়িটি ভেঙে ফেলা হলো, তখন অনেকেই এসব  ঘটনাকে মনে করেছিলেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দূর্বল অন্তর্বর্তী সরকারের অক্ষমতা হিসেবে। কিন্তু পরবর্তীতে এটা পরিষ্কার হতে থাকে ইউনূস ইতিহাসের নতুন নায়ক হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে এবং দূর ভবিষ্যতেও আওয়ামী প্রত্যাবর্তন রুখে দিতে পুরনো ইতিহাস সবটাই মুছে ফেলতে চান। তাই অনেকটা অন্তর্বর্তী সরকার প্রধানের মৌন সমর্থনেই চলেছিল ইতিহাস মুছে ফেলার উগ্রবাদী মব উল্লম্ফন ও ধংসাত্মক অভিযান। ক্রোধ, প্রতিহিংসা ও ঘৃণার সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিয়ে নারী স্বাধীনতার বিরুদ্ধে, মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে, বাঙালির শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মুক্তচিন্তার বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করা হলো। আবার এ ধরনের অনেক কার্যক্রমকে শুধু ইনডেমনিটি দিয়েই  ইউনূস স্বস্তিতে ছিলেন না, পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হতে বানিজ্য চুক্তির নামে দেশটাই তুলে দিলেন বিশ্ব মোড়লের হাতে। অন্তর্বর্তী সরকার প্রধানই হয়ে উঠলেন উগ্রবাদীদের ‘গুপ্ত ধন’। আর ‘ক্ষমতা মানুষের আসল রূপটি প্রকাশ করে’ উর্দু সাহিত্যিক সাদাত হাসান মান্টোর এ উক্তিটির সত্যতাকেও ইউনূস গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত করলেন।


দীর্ঘ সময়কাল ক্ষমতায় থাকার গভীর আকাঙ্ক্ষা থাকলেও অন্তর্বর্তী সরকার হিসেবে নিরপেক্ষ ভূমিকা গ্রহণ করতে না পারায় ইউনূসের জনপ্রিয়তা দ্রুত হ্রাস পায়। অন্যদিকে রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থতা এবং বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে তিনি লন্ডন বৈঠক করতে ও নির্বাচন দিতে বাধ্য হন। নিজ পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে তোলা দলের নির্বাচনী রাজনীতিতে বিশেষ সম্ভাবনা না থাকায় তাদেরকে জুড়ে দেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী রাজনৈতিক দল ও শক্তি সমূহের সঙ্গে। কথিত আছে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার স্বার্থে কিছু আসনে  ইউনূস সমর্থিত তরুণদের দল এমনকি জামাতেরও কয়েকটি আসনে বিএনপিকে পরাজয় মেনে নিতে হয়। বিএনপির এই নমনীয়তা ও আপোষকামীতার সুযোগে বিএনপি সরকারকেও অন্তর্বর্তী সরকারের বর্ধিত সংস্করণ হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা খুবই জোরালোভাবে ক্রিয়াশীল। সরকারি বিভিন্ন সিদ্ধান্তেও তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।


গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য যে ধরনের শক্তি — তথা সামাজিক, রাজনৈতিক, মতাদর্শিক শক্তি দরকার — সেই শক্তি তো বাংলাদেশে খুবই দুর্বল। তার ফলে সরকার পতন হলে নতুন আর একটা বিপদের মধ্যে দেশ পড়ে যেতে পারে - এই আশঙ্কা তো ছিলই । জুলাই আন্দোলনে নির্বিচার হত্যা যজ্ঞের বিরুদ্ধে যেসকল উদার গণতন্ত্রী ও বামপন্থার সমর্থকরা রুখে দাঁড়িয়েছিলেন তাদের উদ্দেশে আওয়ামী লীগে সংগঠিত নয় তবে আওয়ামী সমর্থক এমন অনেকেই বলা শুরু করলেন, ‘এই তো আপনাদের জন্য এরকম হলো। আগেই তো জানা ছিল এটা কার হাতে যাবে।’ অথচ এই কথাটা যারা বলেন তারা যদি নিজেরা মনে করতেন যে আওয়ামী লীগের শাসন থাকা দরকার, তাহলে তো আওয়ামী লীগের অপকর্ম কিংবা লুণ্ঠন, দুর্নীতি, স্বৈরতন্ত্র -- এগুলোর বিরুদ্ধে তাদেরই আগ বাড়িয়ে মুখ খোলা উচিত ছিল। আওয়ামী লীগকে চাপে রাখা দরকার ছিলো। তাতো তারা করেননি। আবার সরকার পতনের পর আওয়ামী লীগের ‘শবযাত্রায়’ও তারা শামিল হননি। সোশ্যাল মিডিয়ায় এক নাগাড়ে তারা গেয়ে চলেছেন ‘ আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’! বামপন্থী রাজনীতিতে ‘বিলোপবাদ’ নামে তত্বের কথা জানা ছিল। এখন এক নতুন তত্ত্বের আবিষ্কার আমাদের সমাজে দেখতে পাচ্ছি যাকে বলা যেতেপারে ‘বিলাপবাদ’। যার মূল সুর আওয়ামী লীগ সরকার পতনে বিলাপ।


বিলাপ করে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটানো যাবেনা। আবার সোশ্যাল মিডিয়ায় হুমকি ধামকি দিয়েও গ্রহনযোগ্যতা সৃষ্টি হবে না। এ কথা ঠিক দেশে বর্তমানে যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তাতে করে রাজনৈতিক অংগনে আওয়ামী লীগের বা জনসমর্থনপুষ্ট ভিন্ন কোনো সামাজিক গণতন্ত্রী দলের উপস্থিতি থাকলে সাম্প্রদায়িক ধর্মান্ধ শক্তির উগ্র মূর্তিকে নিয়ন্ত্রনে রেখে কিছতা ইতিবাচক রাজনৈতিক ভারসাম্য সৃষ্টি হতে পারতো। তবে আওয়ামী লীগের উপস্থিতির কলাকৌশল, আইনি লড়াই, জনমত গঠন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকেই করতে হবে, সেজন্য তারা কতটুকু প্রস্তুত স্পষ্ট নয়। আত্মসমালোচনা না করে শুধু ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ফেরী করে ভবিষ্যতের পথ রচনায় কোনো ইতিবাচক ভূমিকা রাখা যাবে বলে মনে হয় না। আওয়ামী লীগ সমর্থকেরা কিভাবে অস্বীকার করবেন যে, দীর্ঘ দিনের স্বৈরাচারী ও কতৃত্ববাদী শাসন এবং অবাধ লুন্ঠনের রাজত্ব কায়েম করায় তাদের কথিত ষড়যন্ত্রের ভ্রুণ আওয়ামী লীগের জঠরেই সৃষ্টি হয়েছিল। বাংলাদেশের ইতিহাসের নানা পর্বে আওয়ামী লীগের যেমন রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস তেমনি এক দীর্ঘ সময় অপশাসন আর দুঃশাসনের ফলশ্রুতিতে ‘৭১ এর পরাজিত ধর্মান্ধ শক্তিকে ক্ষমতার মসনদের অংশীদার বা ক্ষমতার কাছাকাছি আনার কলঙ্কের ইতিহাসও তারা সৃষ্টি করেছেন। তাই কেবল এক উজ্জ্বল অতীতের দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে অথবা হুমকি ধামকির মনস্টার ইমেজ নিয়ে বিরাজমান বাস্তবতাকে মোকাবেলা করা যাবে না।


সবার জন্য বাসযোগ্য একটি বাংলাদেশের জন্য কি আমাদের নতুন কোনো গুপ্তধনের সন্ধানে নামতে হবে? বাংলাদেশ নামক দেশটার অভ্যন্তরেই রয়েছে এক অন্তর্নিহিত শক্তি। ‘৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ‘৬৯ -এর গন অভ্যুত্থান এবং ‘৭১ এর মুক্তি যুদ্ধ এ দেশটির মাঝে এক অন্তর্নিহিত শক্তি সৃষ্টি করে দিয়েছে। সেই শক্তি ১৯৯০ -এ স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটিয়েছে। ভুল নেতৃত্বের হাতে পড়লেও সেই অন্তর্নিহিত শক্তিই তারুণ্যের বাঁধভাংগা জোয়ারে জুলাই’২৪  জাগরণ সৃষ্টি করেছে এবং আমাদের সামনে এক নতুন প্রজন্মকে হাজির করেছে, যাদের চিন্তাভাবনা ও মনোজগৎ আমাদের অনেকেরই জানা-বোঝার বাইরে। জুলাইয়ের তারুণ্য যে বৈশিষ্ট্য নিয়ে হাজির হয়েছিলো, সেখানে সুস্পষ্টভাবে বৈষম্যমুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক এক সমাজের স্বপ্ন এঁকেছিল তারা। যে নেতৃত্বের পিছনে এ স্বপ্ন নিয়ে তারা শামিল হয়েছিলো সে নেতৃত্ব ভিন্ন পথে, বিভাজনের পথে অগ্রসর হওয়ায় এবং শেষ পর্যন্ত ধর্মীয় উগ্রবাদীদের কোলে আশ্রয় নেওয়ায় তাদের স্বপ্ন ফিকে হয়ে গেছে। জুলাই আন্দোলনের দুই বছর পূর্তিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মলিন হয়ে পড়া গ্রাফিতি সমূহ আবার উজ্জ্বল করার কাজ চলছে। কিন্তু আমাদের নতুন প্রজন্মের ফিকে হয়ে যাওয়া স্বপ্নকে আবার উজ্জ্বল করার জন্য দেশের বুকে যে অন্তর্নিহিত শক্তি রয়েছে তা পূনর্জীবিত করার রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তি কোথায়?

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত