সংবাদ

অগ্রণীতে জালিয়াতি: ভোল্টের ৪ কোটি টাকায় গরুর খামার


মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, চট্টগ্রাম
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬, ০৩:৩৩ পিএম

অগ্রণীতে জালিয়াতি: ভোল্টের ৪ কোটি টাকায় গরুর খামার
ছবি : সংবাদ

চট্টগ্রাম নগরের লালদীঘি জেলা পরিষদ ভবনের দ্বিতীয় তলায় অগ্রণী ব্যাংক পিএলসির পূর্ব করপোরেট শাখা। কঠোর নিরাপত্তার এই ব্যাংকের ভোল্ট থেকে ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা গায়েব হওয়ার ঘটনায় তোলপাড় চলছে ব্যাংকপাড়ায়। এই বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যাংকের ক্যাশ ইনচার্জ মো. কামরুল হোসেন ও তার সহযোগী জাফরুল্লাহ তানভীর এখন কারাগারে। তবে এই জালিয়াতির নেপথ্যে শুধু এই দুজনই কি না, তা নিয়ে জনমনে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

যেভাবে চলত জালিয়াতি
মামলার এজাহার ও পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে জালিয়াতির অভিনব কৌশল। ক্যাশ ইনচার্জ কামরুল হোসেন ভোল্টে টাকা রাখার সময় বড় নোটের (৫০০ বা ১০০০ টাকা) বান্ডিলের ভেতরে সুকৌশলে কম মূল্যমানের নোট (১০ বা ২০ টাকা) ঢুকিয়ে রাখতেন। ফলে ওপর থেকে বান্ডিল দেখে টাকার পরিমাণ সঠিক মনে হলেও বাস্তবে সেখানে থাকত বিপুল ঘাটতি। দীর্ঘ প্রায় ১৪ মাস ধরে এভাবে তিল তিল করে ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা সরিয়ে নেওয়া হয়।

ব্যাংকের টাকা দিয়ে ‘ইশরাত এগ্রো’
তদন্তে জানা যায়, ব্যাংক থেকে সরিয়ে নেওয়া এই বিপুল অর্থ দিয়ে হাটহাজারীর বুড়িশ্চর এলাকায় ‘ইশরাত এগ্রো’ নামে একটি গরুর খামার গড়ে তোলা হয়। সেখানে বর্তমানে ৫০ থেকে ৬০টি গরু রয়েছে। মামলার দ্বিতীয় আসামি জাফরুল্লাহ তানভীর মূলত এই খামারটি দেখাশোনা করতেন। কামরুল হোসেন ও তানভীর মিলে এই অর্থ ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে তথ্য পেয়েছে পুলিশ।

আসামি পক্ষের দাবি
তবে জাফরুল্লাহ তানভীরের বাবা আজিম উল্লাহ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, তার ছেলে কোনোদিন ওই ব্যাংকের গ্রাহকও ছিলেন না। তার অভিযোগ, গত ৯ আগস্ট রাতে ব্যাংক থেকে ফোন করে তার ছেলেকে ডেকে নেওয়া হয় এবং পরে আটকে রেখে সাদা স্ট্যাম্পে সই নেওয়া হয়। তিনি দাবি করেন, কামরুল হোসেন ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্র ধরে মাঝেমধ্যে তার ছেলেকে ব্যবসায়িক লেনদেনের জন্য টাকা দিতেন, যা পরে লাভসহ ফেরত দেওয়া হতো। ব্যাংকের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করলে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে বলে তার বিশ্বাস।

তদারকি নিয়ে প্রশ্ন

ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ অডিট ও দৈনিক তদারকি ব্যবস্থা নিয়ে। ব্যাংকিং নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিদিন লেনদেন শেষে ভোল্টের নগদ টাকা মিলিয়ে দেখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এছাড়া শাখা ব্যবস্থাপক (ম্যানেজার) ও অডিট কর্মকর্তাদের নিয়মিত ভোল্ট পরিদর্শনের কথা। মামলায় বলা হয়েছে, এই জালিয়াতি চলেছে ১ জুন ২০২৫ থেকে ৯ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত (প্রায় ১৪ মাস)। এত দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিদিনের হিসাবে এই বিশাল ঘাটতি কেন ধরা পড়ল না, তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন খোদ ব্যাংক কর্মকর্তারাই।

চট্টগ্রাম জজকোর্টের আইনজীবী আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘একটি ভোল্টের চাবি সাধারণত একাধিক কর্মকর্তার জিম্মায় থাকে। এককভাবে ক্যাশ ইনচার্জের পক্ষে এত টাকা সরানো এবং তা বছরের পর বছর গোপন রাখা প্রায় অসম্ভব। এখানে ব্যাংক ব্যবস্থাপনার চরম গাফিলতি বা উচ্চপদস্থ কারও যোগসাজশ থাকতে পারে।’

আইফোন ও পেনড্রাইভ জব্দ
কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. ইকবাল হোসেন জানিয়েছেন, আসামিদের কাছ থেকে একটি ‘আইফোন ১৬ প্রো’ এবং একটি ‘হনর ৬০০ প্রো’ মডেলের মুঠোফোন জব্দ করা হয়েছে। এছাড়া একটি ৬৪ জিবির পেনড্রাইভ পাওয়া গেছে, যাতে হোয়াটসঅ্যাপে কথোপকথন ও আর্থিক লেনদেনের বিভিন্ন স্ক্রিন রেকর্ড রয়েছে। এই ডিজিটাল প্রমাণগুলো বিশ্লেষণ করলে এই চক্রে আর কারা জড়িত, তা নিশ্চিত হওয়া যাবে।

এদিকে ঘটনার পর থেকে গণমাধ্যম এড়িয়ে চলছেন শাখার জেনারেল ম্যানেজার মোস্তাক আহমেদ। বারবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬


অগ্রণীতে জালিয়াতি: ভোল্টের ৪ কোটি টাকায় গরুর খামার

প্রকাশের তারিখ : ১৩ আগস্ট ২০২৬

featured Image

চট্টগ্রাম নগরের লালদীঘি জেলা পরিষদ ভবনের দ্বিতীয় তলায় অগ্রণী ব্যাংক পিএলসির পূর্ব করপোরেট শাখা। কঠোর নিরাপত্তার এই ব্যাংকের ভোল্ট থেকে ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা গায়েব হওয়ার ঘটনায় তোলপাড় চলছে ব্যাংকপাড়ায়। এই বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যাংকের ক্যাশ ইনচার্জ মো. কামরুল হোসেন ও তার সহযোগী জাফরুল্লাহ তানভীর এখন কারাগারে। তবে এই জালিয়াতির নেপথ্যে শুধু এই দুজনই কি না, তা নিয়ে জনমনে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

যেভাবে চলত জালিয়াতি
মামলার এজাহার ও পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে জালিয়াতির অভিনব কৌশল। ক্যাশ ইনচার্জ কামরুল হোসেন ভোল্টে টাকা রাখার সময় বড় নোটের (৫০০ বা ১০০০ টাকা) বান্ডিলের ভেতরে সুকৌশলে কম মূল্যমানের নোট (১০ বা ২০ টাকা) ঢুকিয়ে রাখতেন। ফলে ওপর থেকে বান্ডিল দেখে টাকার পরিমাণ সঠিক মনে হলেও বাস্তবে সেখানে থাকত বিপুল ঘাটতি। দীর্ঘ প্রায় ১৪ মাস ধরে এভাবে তিল তিল করে ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা সরিয়ে নেওয়া হয়।

ব্যাংকের টাকা দিয়ে ‘ইশরাত এগ্রো’
তদন্তে জানা যায়, ব্যাংক থেকে সরিয়ে নেওয়া এই বিপুল অর্থ দিয়ে হাটহাজারীর বুড়িশ্চর এলাকায় ‘ইশরাত এগ্রো’ নামে একটি গরুর খামার গড়ে তোলা হয়। সেখানে বর্তমানে ৫০ থেকে ৬০টি গরু রয়েছে। মামলার দ্বিতীয় আসামি জাফরুল্লাহ তানভীর মূলত এই খামারটি দেখাশোনা করতেন। কামরুল হোসেন ও তানভীর মিলে এই অর্থ ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে তথ্য পেয়েছে পুলিশ।

আসামি পক্ষের দাবি
তবে জাফরুল্লাহ তানভীরের বাবা আজিম উল্লাহ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, তার ছেলে কোনোদিন ওই ব্যাংকের গ্রাহকও ছিলেন না। তার অভিযোগ, গত ৯ আগস্ট রাতে ব্যাংক থেকে ফোন করে তার ছেলেকে ডেকে নেওয়া হয় এবং পরে আটকে রেখে সাদা স্ট্যাম্পে সই নেওয়া হয়। তিনি দাবি করেন, কামরুল হোসেন ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্র ধরে মাঝেমধ্যে তার ছেলেকে ব্যবসায়িক লেনদেনের জন্য টাকা দিতেন, যা পরে লাভসহ ফেরত দেওয়া হতো। ব্যাংকের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করলে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে বলে তার বিশ্বাস।

তদারকি নিয়ে প্রশ্ন

ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ অডিট ও দৈনিক তদারকি ব্যবস্থা নিয়ে। ব্যাংকিং নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিদিন লেনদেন শেষে ভোল্টের নগদ টাকা মিলিয়ে দেখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এছাড়া শাখা ব্যবস্থাপক (ম্যানেজার) ও অডিট কর্মকর্তাদের নিয়মিত ভোল্ট পরিদর্শনের কথা। মামলায় বলা হয়েছে, এই জালিয়াতি চলেছে ১ জুন ২০২৫ থেকে ৯ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত (প্রায় ১৪ মাস)। এত দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিদিনের হিসাবে এই বিশাল ঘাটতি কেন ধরা পড়ল না, তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন খোদ ব্যাংক কর্মকর্তারাই।

চট্টগ্রাম জজকোর্টের আইনজীবী আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘একটি ভোল্টের চাবি সাধারণত একাধিক কর্মকর্তার জিম্মায় থাকে। এককভাবে ক্যাশ ইনচার্জের পক্ষে এত টাকা সরানো এবং তা বছরের পর বছর গোপন রাখা প্রায় অসম্ভব। এখানে ব্যাংক ব্যবস্থাপনার চরম গাফিলতি বা উচ্চপদস্থ কারও যোগসাজশ থাকতে পারে।’

আইফোন ও পেনড্রাইভ জব্দ
কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. ইকবাল হোসেন জানিয়েছেন, আসামিদের কাছ থেকে একটি ‘আইফোন ১৬ প্রো’ এবং একটি ‘হনর ৬০০ প্রো’ মডেলের মুঠোফোন জব্দ করা হয়েছে। এছাড়া একটি ৬৪ জিবির পেনড্রাইভ পাওয়া গেছে, যাতে হোয়াটসঅ্যাপে কথোপকথন ও আর্থিক লেনদেনের বিভিন্ন স্ক্রিন রেকর্ড রয়েছে। এই ডিজিটাল প্রমাণগুলো বিশ্লেষণ করলে এই চক্রে আর কারা জড়িত, তা নিশ্চিত হওয়া যাবে।

এদিকে ঘটনার পর থেকে গণমাধ্যম এড়িয়ে চলছেন শাখার জেনারেল ম্যানেজার মোস্তাক আহমেদ। বারবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত